ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ৩
অনামিকা আহমেদ
নিজের ঠিক পেছন থেকে ইশতিহার এর সেই পরিচিত ভরাট ঠান্ডা কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই রূপ ভ*য়ার্ত চোখে পেছন ফিরে চায়। দেখতে পায় ইশতিহার ও তার দিকে অস্বাভাবিক রকমের রক্তি*মচোখে তাকিয়ে আছে। এই দৃষ্টি রূপের চেনা, ইশতিহার এর খুব মেজাজ খারাপ হলে তার চোখের সাদা অংশ লাল হয়ে আসে, ঘাড়ের রগগুলো ফুলে উঠে, চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। এসব লক্ষণ তার মধ্যে বর্তমানে বিদ্যমান দেখে রূপ ভয়ে কেঁপে উঠে। তার শিরদাঁড়া বেয়ে এক শীতল শিহরন বয়ে যায়। ইশতিহার এর এক পা এগোতেই রূপ থরথরিয়ে কাঁপতে কাঁপতে চেয়ার থেকে পড়ে যায়।
নার্স তাড়াহুড়া করে রূপ তে তুলতে গেলে ইশতিহার তাকে ইশারায় পিছু হটতে বলে। নার্স হাত গুটিয়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালে ইশতিহার নিজে এসে রূপ কে তোলে। এসময় কৌশলে রূপের হাতের ওপর জোরে এক চিমটি বসায়। রূপ অস্ফুট আ*র্তনাদ করে উঠে, কিন্তু তার চোখ যেনো ইশতিহার এর রাগী মুখের থেকে সরছেই না। ইশতিহার এর কাছে যেনো ধরা না পড়ে তাই সে শহরের দূরের এক হাসপাতালে এসেছিল, কিন্তু নসিব তাকে ইশতিহার এর মুখোমুখি করেই ছাড়ল।
ইশতিহার এবার রূপ তে ছেড়ে দিয়ে এপ্রোনের পকেটে হাত গুঁজে নার্সের চোখে চোখ রেখে বলে,
” এই বাচ্চা এবরশন করানো হবে না আপনি ফর্ম টা ছিঁড়ে ফেলুন।”
নার্স মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে ফর্ম টা ছিঁড়তেই যাবে ঠিক তখনই রূপ তাকে বাধা দিয়ে বলে,
” না ছিঁড়বেন না, আমি এই বাচ্চা নষ্ট করবো।”
মাথা নিচু করেই রূপ কথাগুলো বলে, ইশতিহার এর চোখের দিকে তাকানোর তার সাহস হয় না।
” আপনারা প্লীজ একটা সিদ্ধান্তে আসুন। একজন বলছেন করাবেন আরেকজন বলছেন করাবেন না। আরও অনেক পেশেন্ট লাইনে আছে। তাদের কেসও আমাকে হ্যান্ডেল করতে হবে।”
নার্স আর কথা শেষ হতেই ইশতিহার নির্বিকার গলায় বলে উঠে,
” আপনি আমার মতামতটা শুনুন। এই বাচ্চা এবরশন করানো হবে না। ফর্ম টা ছিঁড়ে প্লীজ একটু রুমের বাইরে যান, আমার স্ত্রীর সাথে আমার কিছু কথা আছে। ”
ইশতিহার এর কথা শুনে রূপ তাজ্জব বনে যায়, চোখ দুটো তার গোল গোল হয়ে কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়। সে কিছুতেই এই লোকটার সাথে এক রুমে বদ্ধ থাকবে না। কারণ কথা অমান্য করার অ*পরাধে তাকে যে ইশতিহার এর রোষা*নলে পড়তে হবে রূপ ভালই বুঝতে পারছে। তাই নার্স ফরম টা ডাস্টবিনে ফেলে চলে যেতে নিলে সে নার্স কে আটকাতে চায়। কিন্তু পেছন থেকে তাকে ধরে ফেলে ইশতিহার। নিজের কাছে টেনে নিয়ে রূপের থুতনি শক্ত করে চেপে ধরে বলে,
” কি ভেবেছিস আমি কিছু জানতে পারব না তুই কোথায় কি করে বেড়াচ্ছিস? আমার অবর্তমানে তুই আমার বাচ্চাকে গলা টিপে মেরে ফেলবি আর আমি চুপচাপ সেটা হতে দিবো? তুই এতটা নিচে কিভাবে নামতে পারলি রূপ? ও তো তোর নিজের সন্তান, তোর গর্ভে একটু একটু করে বড় হচ্ছে। এই কাজ টা করার আগে কি তোর একটুও মায়া হলো না?”
রূপ আ*ক্রোশে ঝাড়া মেরে ইশতিহার এর হাত সরিয়ে নেয়। তারপর গটগট করে বলে,
” নিজের অনাগত সন্তান কে মেরে ফেলা একজন মায়ের জন্য ঠিক কতটা কঠিন আপনি কি জানেন ডাক্টার ইশতিহার? আপনারা পুরুষ জাতি নিজেদের লাল*সা মেটানোর জন্য নারীদের দেহ ব্যবহার করেন, তারপর প্রয়োজন শেষে ছুঁড়ে ফেলে দেন। আপনার কাছে হয়তো এই সন্তানটা নিজের উত্তরসূরি কিন্তু আমার কাছে সে অ*বৈধ, কলংক*স্বরূপ। এই বাচ্চা জন্ম নিলে লোকে আমাকে মন্দ কথা বলবে আপনাকে না।”
কথাগুলো এক শ্বাসে বলে ফেলে রূপ কাদতে কাদতে মেঝেতে পড়ে যায়। তার এই আবেগমিশ্রীত কথাগুলো যেনো ইশতিহার কেও নাড়িয়ে দেয়। রূপ নিজের অজান্তে মাথা গরম করে ঠিক কী বলেছে সেটা সে নিজেও জানে না। যা মুখে এসেছে তাই গরগর করে বলে ফেলেছে।
কয়েক মুহূর্ত এভাবেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকার পর ইশতিহার রূপের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
” রূপ উঠে দাড়া। আর চোখ মুছ, আমরা এক্ষুনি বেরোবো।”
” না আমি এবরশন না করিয়ে কোথাও যাবো না। এতে আপনি আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেও আমার কিছু করার নেই।”
ইশতিহার আবারও তার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকালে রূপ একটু দমে গিয়ে উঠে দাঁড়ায়। পরমুহুর্তেই ইশতিহার তার হাত ধরে রুম থেকে বের হওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যেতে চাইলে রূপ নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। বলে,
” বললাম তো যাবো না। আপনি আমাকে জোর করতে পারেন না, আমি আপনার স্ত্রী নই।”
ইশতিহার এর মুখে কিছু বলে না। সোজা রূপ তে নিজের কাঁধে তুলে তার কোমর জড়িয়ে তাকে নিয়ে হাটা দেয়।হাসপাতালের করিডোর দিয়ে ইশতিহার তাকে নিয়ে এভাবেই হেঁটে যাচ্ছে। সবাই তাদের দেখে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। রূপ তো লজ্জায় মরে যাচ্ছে, নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ইশতিহার এর পিঠে সে কম কিল বসাচ্ছে না। কিন্তু লোকটার শরীর যেনো লোহার তৈরি, কিছুতেই কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
হাসপাতালের বাইরে এসে রূপ কে গাড়িতে তুলে ইশতিহার ফোনে কাউকে আসতে বলে নিজেও গাড়িতে উঠে পড়ে। গাড়ি স্টার্ট দিতেই রূপ আবারো হাত পা ছোড়াছুড়ি করা শুরুর করে।
” আপনি আমাকে কোথায় নিজে যাচ্ছেন? আমি আপনার সাথে কোথাও যাবো না, আমাকে যেতে দিন। আমি আপনার কেনা দা*সী নই যে সবসময় অধিকার ফলাবেন।”
রূপের কথা শুনতেই ইশতিহার দাঁত কিড়মিড় করে উঠে। সজোরে স্টিয়ারিং এ আঘাত করে রূপের এক হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বলে,
” তুই স্বীকৃতি চাস তো? আমার বউয়ের পরিচয় চাস তাই না? সেটাই দিতে যাচ্ছি, কাজী অফিসে যাচ্ছি, সেখানেই আমাদের বিয়ে হবে।”
বিয়ের পর্ব ঘুচিয়ে সন্ধ্যার দিকে ইশতিহার এর রূপ গাড়ি করে ফিরে। রূপ এখনও মনমরা হয়ে বসে আছে, দুজনের কেউই ফেরার পথে একটাও কথা বলেনি। রূপ কেবল জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে চোখের পানি মুছেছে। নিজের ভালবাসার পুরুষের নামে নিজের নাম জুড়েছে তবুও কেনো জানি তার মনে ভীষণই কু ডাকছে। তার ওপর চাচী কে না বলেই ঘটনাটা ঘটেছে, তিনি শুনলে নিশ্চয়ই ভীষণ কষ্ট পাবেন। এমন হাজারো চিন্তা মাথায় এলো তার, কিন্তু ভেবে ভেবে সমস্যার কোনো সমাধান মিলল না।
বাড়ির সামনে এসে ইশতিহার গাড়ি দাঁড় করায়। কিন্তু রূপ নিজের চিন্তায় এতটাই মসগুল ছিল যে ব্যাপারটা সে খেয়াল করলো না। এবার ইশতিহার হালকা কাশি দিয়ে গলাটা ঝেড়ে বলে,
” নিজে থেকে নামবি নাকি আবারো কোলে করে নিয়ে যেতে হবে।”
ইশতিহার এর কথা শুনে রূপ এর অভিমান জমে। সে কখন থেকে কেঁদেই চলেছে অথচ এই হৃদয়বিহীন লোকটা তার মাথায় পর্যন্ত হাত রাখলো না। রূপ নড়ল না, কোনো উত্তর ও দিলো না। ইশতিহার হতাশায় একটু মাথা নাড়িয়ে গাড়ি থেকে নেমে রূপের পাশের জানালায় হাত রেখে বলে,
” তুই বারবার আমাকে কঠোর হতে বাধ্য করিস রূপ। জানিস আমার রাগে মাথা ঠিক থাকে না, তবুও তোর আমাকে রাগানো চাই। ”
কথাটা শুনতেই রূপ তার জ্বলজ্বলে চোখে একটার ইশতিহার এর দিকে তাকায়। তারপর নিজেই দরজা খুলে নেমে পরে। ইশতিহার নিজের বুকের বা পাশে হাত চেপে ধরে বলে,
” এই মেয়েটা চোখ দিয়ে নির্ঘাত একদিন আমাকে মেরে ফেলবে।”
রূপ ইশতিহার কে সম্পূর্ণ ইগনোর করে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়। এসময় ইশতিহার তাকে ছুঁয়ে নানা ভাবে উক্ত*ক্ত করার চেষ্টা করে যেমন কখনও চুল ছুঁয়ে, কখনও ওড়নায় তান দিয়ে আবারও কখনও হাত ধরে। রূপ এসব পাত্তা না দিয়ে বারবার ইশতিহার এর থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বাড়িতে চলে আসে। বাড়িতে পা রাখামাত্রই কেও তার কাছে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। রূপ মানুষটার মুখ দেখতে না পারলেও তার শক্ত শরীর আর পুরুষালি গন্ধ শুকে মানুষটাকে আন্দাজ করতে পারল।
ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ২
” তোকে কতদিন পর দেখলাম রূপ। অনেক বড় হয়ে গেছিস। আর আমাদের কেও আলাদা করতে পারবে না। চিন্তা করিস না আমি আর তোকে ছেড়ে যাবো না, সারা জীবন তোর ছায়া হয়ে থাকবো।”
