ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ৬
অনামিকা আহমেদ
ঝিরঝিরে বৃষ্টিকে একপ্রকার উপেক্ষা করেই আদনান হন্যে হয়ে ছুটে চলেছে সেই অজানা মেয়েটার পানে। রাস্তায় জমা কাদা আর বৃষ্টির পানিতে ভিজে আদনানের একাকার অবস্থা, তবুও সেদিকে আদনানের ভ্রুক্ষেপ নেই। মেয়েটা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দু হাত প্রসারিত করে চোখ বুজে বৃষ্টি কে আলিঙ্গন করছে। চোখ বোজা থাকায় হয়তো তার চোখে পড়ল না তার এই স্নিগ্ধ রূপে বিমোহিত হয়ে এক পুরুষ ঠিক কতটা পাগলা*মি করছে।
দুরত্ব যত ঘুচে যাচ্ছে মেয়েটার মুখমণ্ডল ততই স্পষ্ট হচ্ছে আদনানের চোখে। ক্রমেই তার মুখে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠে, ঠিক তার মনের মতন মেয়েটি। বন্ধ সে চোখ জোড়ায় দেওয়া কাজল পানি লেগে লেপ্টে গেছে,কিন্তু তাতে তার রূপ একবিন্দুও কমে নি বরং বেড়েছে। হাতে পড়া কাচের চুড়ির নিচে বিন্দু বিন্দু পানি জমেছে, কিছুক্ষণ পর পর বিন্ধুগুলো পতিত হচ্ছে কংক্রিটের মেঝের ওপর।
আদনানের শ্বাস ঘন হতে থাকে, শব্দ করে বুক উঠা নামা করছে কিন্তু সেটা কি এতটা পথ দৌড়ানোর জন্য হচ্ছে নাকি অতিরিক্ত আবেগে ভেসে যাওয়ার কারণে হচ্ছে তা বলা দায়। হঠাৎই আকাশ ফেটে বিদ্যুৎ চমকায়। বিকট শব্দ আর চোখ ধাঁধানো আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আলোর তেজ সহ্য না করতে পেরে আদনান নিজের কনুই দিকে চোখ ঢেকে ফেলে। পরমুহুর্তেই আবারও সামনে দিকে তাকালে সেই মেয়েটাকে আর সে দেখতে পায় না। এক মুহূর্তেই তার হাস্যোজ্বল চেহারায় কালো মেঘ জমে যায়। বাড়ির সামনে লোহার গেইটে পাগলের মতো কড়া নাড়তে থাকে সে। এতে গার্ড বেরিয়ে এলে আদনান কে দেখামাত্র গার্ড তাকে চিনে যায়। আসলে সকালে হাসপাতালে যাওয়ার সময় ইশতিহার তাকে আদনানের আসার খবর জানিয়েছিল। গার্ড নিজের মাথার ক্যাপ টা ঠিক করে গলাটা ঝেড়ে বলে,
” আপনি আদনান স্যার না? আপনার জন্য কখন থেকে ইশতিহার স্যার অপেক্ষা করছে। চলুন ভেতরে চলুন। বাইরে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো?”
আদনান গার্ড এর কথার কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করলো না। এমনকি কথাগুলো তার কান অবধি পৌঁছালো কিনা সন্দেহ। তার ব্যা*থাতুর চোখ দুটো কেবল তার মায়াবিনীর পানে ছুটতে চাইলো, কিন্তু তার কোনো অস্তিত্ব পেলো না।
আদনান এর জন্য আর মির্জা ম্যানশন এ এলাহী কাণ্ড। সুলেখা সব নিজের হাতে সামলেছে, তবে তার ছোট যা আমরিন ও তাকে হাতে হাতে সাহায্য করেছে। বাড়ির কর্তা বলতে গেলে ইশতিহার এর বাবা আমির মির্জা। তার দুজন ভাই, মেঝো আখতার মির্জা যিনি কিনা রূপের বাবা। তবে বাবা মেয়ের সম্পর্ক শুধু খাতা কলমে, ক্ষমতায় কুলোলে আখতার সেটাও মুছে দিতেন, কেননা তিনি কখনও রূপ কে নিজের মেয়ে হিসেবে মানতেই পারেননি। ছেলের আকাঙ্ক্ষা তাকে এতটাই গ্রাস করেছিল যে জন্মের পর থেকে মা ম*রা রূপের দিকে কখনও মায়াভরা দৃষ্টিতে কখনও চেয়েছেন বলে মনে হয়না। সে যাক, আমির মির্জার ছোট ভাই খোকন মির্জা, আমরিন আর তার মোটে তিনটি সন্তান, বড় ছেলে আখিল আর ছোট দুই মেয়ে অরুণা আর আঁখি। অরুণা আর রূপ পিঠাপিঠি বোন। রূপ তার চেয়ে বছর দেড়েক বড় হবে। তবে বয়স কাছাকাছি হলেও রূপের সাথে অরুণার সম্পর্ক তেমন ভালো না। রূপ দেখতে আগুন সুন্দরী যেখানে অরুণার গায়ের বরণ শ্যামলা। তাই ছোট থেকে রূপের সাথে প্রায়ই তাকে দাঁড়িপাল্লায় মাপা হতো, সেই থেকেই অরুণার মনে রূপের প্রতি এক প্রকারের বিতৃষ্ণা জমেছে, সেই সাথে মায়ের কু পরামর্শ যেনো ছোট ফাটলকে আরও বড় করে তুলেছে।
রাত বাড়তেই বাড়ির সকলে ভিড় জমায় ডাইনিং রুমে। বাড়ির পুরুষরা একে একে চেয়ার পেতে বসে গেছে। আদনান বসেছে ইশতিহার এর পাশে। ইশতিহার এর আরেক পাশের চেয়ারটা খালি, অবশ্য সেই জোর করে খালি রেখেছে। একটু আগেই অরুণা তার পাশের খালি চেয়ারটা টেনে বসতে এসেছিল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ ইশতিহার এর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর রাগী অভিব্যক্তি দেখে সে ছুটে নিজের বাবার পাশে বসে পড়ে।
সুলেখা আর আমরিন এর সাথে সাথে কাজে হাত লাগাচ্ছে রূপ। ব্যস্ত থাকার কারণে বিকেল থেকে নিজের মুখশ্রী ইশতিহার কে দেখানোর সময় মিলেনি, তাতে অবশ্য ইশতিহার মনে মনে ফুঁসছে। কিন্তু বাল্যবন্ধু আদনান কে সাথে পাওয়ায় তার এই রাগ রাতের জন্য মুলতবি রইলো। সকলের মুখে হাসি লেপটানো, কেমন আদনান এর মুখটা কেমন উদাস। ইশতিহার বার বার তার কারণ জিজ্ঞাসা করলেও আদনান কেবল ক্লান্তির দোহাই দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।
মাংসের বাতিটা নিয়ে রূপ আসতেই ইশতিহার তাকে চোখের ইশারায় তাকে বলে তার পাশে বসতে। কিন্তু রূপ তাকে সম্পূর্ণ ইগনোর করে একে একে সবার পাতে তরকারি দিতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে ইশতিহার এর কথা মানলে ভরা মজলিশে একটা কেলেংকারি বাঁধবেই যেটা রূপ ভালো করেই জানে।
এসময় সুলেখা আর আমরিন রান্না ঘর ছেড়ে এলে তিনি রূপের হাত থেকে বাটি কেড়ে নিয়ে বলে,
” যা খেতে বস, বেড়ে দেওয়ার জন্য তো আমরা আছি নাকি। আর গিন্নিপনা করেছিস আর না।”
রূপ ও তার বড় চাচির আদেশ মোতাবেকই কাজ করে। মাথাটা নিচু করে সে চুপচাপ খেতে বসে যায়। কিন্তু এসময় ঘটে এক বিপত্তি, রুপম রূপের হাত টেনে তাকে নিজের পাশে বসিয়ে ফেলে, যেটা দেখতে একটু কটু লাগলেও কেও যেনো কিছুই বলে না। কেবল ইশতিহার রাগে নিজের জায়গা ছেড়ে দাঁড়িয়ে যায়। তার উঠে দাঁড়ানোর বেগ এতটাই প্রবল ছিল যে চেয়ারটা মাটিতে পড়ে বিকট আওয়াজ হয়।
” ইশতিহার, চুপচাপ খেতে বস। এটা তোমার বেডরুম না যে যা নয় তাই করবে, এখানে তোমার বয়োজ্যেষ্ঠরা আছে তাদের একটু সম্মান করো। ”
” আমাকে মাফ করবে আম্মু, তোমার এই কথাটা আমি রাখতে পারলাম না।তোমার ভাইয়ের ছেলে দেখে আমি কিছু বলছি না। কিন্তু কাল থেকে দেখছি এনি রূপের আশেপাশে ঘুরঘুর করছে। আজ এখন তো উনি সব সীমা পার করে ফেলেছেন। তাও তুমি কিছু বলবে না, এই মির্জা বংশের মেয়েদের কি কোনো সম্মান নেই যে যে যখন পারবে তাদের ছুঁইয়ে যাবে?”
” ইশতিহার বোসো।”
আমির সাহেবের একদফা গুরুগম্ভীর কন্ঠ কানে আসতেই ইশতিহার নিজের বাবার দিকে চায়। লোকটা বেশি কথা বলেন না, কিন্তু বললে সে কথা টলানোর ক্ষমতা কারোর থাকে না, এমনকি ইশতিহার ও না।
ইশতিহার এবার দাঁতে দাঁত চেপে ভয়ংকর দৃষ্টিতে রূপের দিকে তাকিয়ে চেয়ার তুলে বসে পড়ে। রাগে সে সাপের মত হিসহিস শব্দে ফুঁসছে, ইশতিহার বাড়াবাড়ি রকমের কিছু করে ফেলার আগেই আদনান তার হাত চেপে ধরে। মাথা নাড়িয়ে বোঝায় সে যেনো এখন কিছু না বলে। ইশতিহার আরেকবার তাকায় রুপম আর রূপের দিকে। রুপম আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি দিচ্ছে। গা জ্বলে যাচ্ছে তার। বাড়ির কেও না থাকলে আজ এখানেই রুপমের সমাধি দিয়ে দিত সে।
” আমি রূপ আর রুপমের বিয়ে ঠিক করেছি। রূপের বিয়ের বয়স হয়েছে, আর রুপম তো আর খারাপ ছেলে নয়, রূপ কে সুখে রাখবে সে। নিজেদের মধ্যে চেনাশোনা পাত্র থাকতে কেনো খামোখা দূরে ছেলে খুঁজতে যাবো। তাই ভেবেছি এই মাসের শেষ দিকেই রূপ আর রুপমের আকদ হবে, রুপমের মা বাবাকে জানানো হয়েছে। তারা রাজি।”
সুলেখা বেশ হাসি মুখে কথাটা পারে সকলের সামনে। তার কথাটা শুনলেই আঁখি নিজের জায়গা থেকে একপ্রকার লাফিয়ে উঠে।
” বাহ রূপ আপুর বিয়ে, খুব মজা হবে। আমি অপুর বিয়ের দিন একটা লাল লেহেঙ্গা পড়বো।”
কথাটা বলতেই তার মা আমরিন পেছন থেকে তার মাথায় গাট্টা দেয়। বড় মেয়ের কানে বি*ষমন্ত্র দিতে পারলেও আঁখি কে তিনি কোনোভাবেই বশ করতে পারেন না। দিনে দিনে মেয়েটা রূপের নেওটা হচ্ছে। আমরিন একটা বকুনি দিয়ে আঁখি কে আবারো বসিয়ে দিয়ে বলেন,
” ঘরোয়া আয়োজনে এত আনুষ্ঠানিকতা কিসের? পরিবারের কয়জন উপস্থিত থাকবে, আমরা বাড়ির মানুষই মিলে সব সামলে নিবো।”
এই কথাটা বলে আমরিন জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে। রূপ সবার কথা শুনলেও সে শুধু ভাবছে আজ রাতে তার ওপর দিয়ে কি যাবে। দুশ্চিন্তার মাঝে হঠাৎই তার পেট মোচড় দেয়। মনে হতে থাকে পেটের ভেতরের সব কিছু গলা দিয়ে বের হয়ে আসবে।
রূপ কোনোমতে হাত দিয়ে মুখ চেপে চেয়ার থেকে উঠে বাথরুমের দিকে দৌড় দেয়। রূপের এই অবস্থা দেখে রুপম আর সুলেখা বেশ বিচলিত হয়ে পড়ে।
” মেয়েটা যে কি করে? একটু যদি নিজের খেয়াল নিত। কতবার পই পই করে বলেছি সময় মতো খাবার খেতে। কে শুনে কার কথা? দেখ গিয়ে অম্বল বাধিয়েছে আবার।”
মায়ের কথা শুনে ইশতিহার স্ফীত হাসে। গায়ে জালা ধরানো দৃষ্টিতে রুপমের চোখে চোখ রেখে বলে,
” এসিডিটির জন্য রূপের হঠাৎ হঠাৎ বমি হচ্ছে এটা তোমাদের কে বলেছে? প্রেগ*ন্যান্সির দুই তিন মাসে এমন বমি বমি ভাব, মাথা ঘুরানো টা স্বাভাবিক তাই না মা? আমি গর্ভে থাকতে তোমারও তো এমন হয়েছিল। আশ্চর্য দুই সন্তানের জননী হয়েও কিভাবে এত বড় ভুল করে ফেললে?”
ইশতিহার এর কথায় সবার যেনো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। শুধু আমরিন ই বোধয় মনে মনে খুশি হয়, যাক রূপ তে সকলের সামনে খারাপ দুশ্চরিত্রা প্রমাণ করার উপায় তার হাতে এসেছে, সে কি আর তা ছাড়ে?
” প্রেগ*ন্যান্ট? রূপ প্রেগ*ন্যান্ট? দেখেছো ভাবি বলেছিলাম না এই মেয়ের সমস্যা আছে। মায়ের মতোই বাঁধিয়ে রাখার মতো চরিত্র হয়েছে। না জানি কোন ছেলের সাথে শুইয়ে পেট বাধিয়েছে।”
এই বলে আমরিন নিজের সহজাত হাসিটা দেওয়ার আগেই ইশতিহার গর্জে উঠে।
ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ৫
” নেহাত আপনি আমার চাচী বয়সে বড় বলে আপনাকে কিছু বললাম না, নয়তো এক্ষুনি আপনার প্রাণ নিতে আমার হাত কাপতো না। যার নামে আপনি এতক্ষণ ক*লঙ্ক ছড়াছিলেন জেনে রাখুন সে আর কেউ নয় বরং এই ইশতিহার মির্জার বিবাহিতা স্ত্রী। রূপের গর্ভে আমার সন্তান বড় হচ্ছে।”
