Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৮

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৮

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৮
রুপান্জলি

,,,মাঝে কেটেছে ছয়দিন,, অর্পনা এখনো বাবার বাড়িতেই আর এখান থেকেই ভার্সিটিতে এসেছে। ইরাদ বাড়ি গিয়েছে আজ সাতদিন,, যাওয়ার পর শুধু একটা টেক্সট দিয়েছিলো,, আর যোগাযোগ হয়নি। মেয়েটা বাড়িতে গেলে যোগাযোগ করতে চায়না,, তারাও কল দেয়না। ইরার বাড়ির মানুষ মুসলিমদের পছন্দ করেনা,, বিশেষ করে ওর বাবা। এই কারনেই তারা ইরাকে কল দিতে ভয় পায়,, যদি পরে ওর কোনো প্রবলেম হয়?

,,, শহিদ মিনারের সিরিতে বসে আছে চারজন,, অরুন আর রাত উপরের সিরিতে পাশাপাশি বসে আছে,, পল্লব আর অর্পনা বসেছে এক সিরি নিচে,, সবাই ইরাকে ভিষণ মিস করছে। মনটা কেমন যেনো করছে,, খালি মনে হচ্ছে কোথায় যেনো কিছু একটা ঠিক হচ্ছেনা। কিন্তু কোথায় কি হয়েছে তা কেউ বুঝতে পারছেনা। তবে অর্পনার মন খারাপের কারনটা অন্য রকম,, ইরার সাথে সাথে আরও একটা বিষয় নিয়ে আপসেট সে। কিছুক্ষন আগে ফোন স্ক্রল করার সময় হুট করে একটা পোস্ট সামনে এলো। সুস্মিতা কাইসার তার স্বামীকে নিয়ে হজের পোষাক পরে ছবি পোস্ট করেছেন,, ক্যাপশনে লিখেছে “” মাম্মা পাপ্পা খুব দ্রুতই ফিরছি সোনা বাচ্চারা”” সাথে মেয়ে ও ছেলেকে মেনশন দিয়েছে। অর্পনার মন খারাপের সাথে সাথে রাগ ও হচ্ছে ভিষণ। সে আর তার বাবা প্রতিনিয়ত কষ্টে মরছে আর ঐ মহিলা স্বামী নিয়ে বেশ সুখেই ই আছে। ঐ মহিলার প্রতি মায়া রাখা ঠিক না,, আজকের পর মনে মনেও ওই মহিলাকে মাম্মা ডাকবে না সে। মনের মাঝে এতোদিন চলা দোটানা টুকু কাটিয়ে দারুন এক খানা সিদ্ধান্ত নিলে অর্পনা। সে বিষয়টা নিয়ে ভাবতে ভাবতে অরুনের হাটুতে মাথা ঠেকিয়ে দিলো। সবাইকে এরকম মন মরা হয়ে থাকতে দেখে পল্লব হুট করেই গেয়ে উঠলো “” কচু বনে হেগে গেলো কালো কুকুরে,,

,,, সবাই মন খারাপ করেই বললো– নগেনের মা মারলো বারি,, ডেকির মুগুরে।
,,, সাথে সাথে হাসির জোয়ার বয়ে গেলো। বন্ধু বান্ধব সাথে থাকলে হাসির কারন লাগে না,, এদের মুখ দেখলেই আপনাআপনি হাসি চলে আসে। সেখানে এমন একটা গান,, এই গানটা আবার ইদানিং রাত্রির খুব প্রিয় হয়ে দাড়িয়েছে,, মাঝেমধ্যেই গুনগুন করো গায়। ওদের হাসির মাঝেই ওদের সামনে একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এসে হাজির হলো,, তার হাতে রেকর্ড স্পিকার, পিছনে ক্যামেরা ম্যান। ঢাবির ক্যাম্পাস,কার্জন হল, টিএইচসি চত্তর, রমনা পার্ক এমনকি ঢাকার অলিতে গলিতেও এরকম কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের দেখা যায়। তারা ঘুরে ঘুরে জনগনকে এটা ওটা প্রশ্ন করে,, গিফ্ট টিফ্ট করে,, আবার ব্রেক-আপ ও করায়। মেয়েটাকে দেখে সবাই সিরিয়াস হয়ে বসলো,, উনি এসে নম্রতার সহিত প্রশ্ন করলেন — আপনারা ফ্রেন্ড?
,,, পল্লব ত্যাড়া জবাব দিলো — নাহ জামাই বউ,, কিছু বলবেন?
,,শেষের কথাটা কিছুটা সিরিয়াস ভাবে বলেছে,, বিব্রত বোধ করলেন মেয়েটি,, বললেন — বিরক্ত করলাম?
,,, অর্পনা হুট করেই হেসে ফেললো সাথে বাকি তিনজন — না না,, ও মজা করছিলো। বলুন,,হ্যা আমরা ফ্রেন্ড, একদম জিগরি দোস্ত।

,,, মেয়েটি সস্থির নিশ্বাস ফেলে হাসলো — আপনাদের মধ্যে কেউ মিঙ্গেল আছে?
,,, পল্লব অরুন আর রাতকে দেখিয়ে বললো– ওরা দুজন আছে একে অপরের সাথে। আমার কেউ নেই আর উনার একটা হাসবেন্ড আছে। ( অর্পনাকে দেখিয়ে)
,,, মেয়েটির মুখের হাসি চওড়া হলো,, অর্পনার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো– আপু আপনি বিবাহিত?
,,, অর্পনা মেয়েটিকে ইজি ফিল করাতে উঠে দাড়ালো, সামনাসামনি হয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো — হুম!! বছর খানিক আগে মরেছিলাম।
,,, মেয়েটি থতমত খেয়ে বললো — মানে?
,,, বিবাহ করিয়াছিলাম আরকি। বলুন আপনি।
,,, মেয়েটি হেসে ফেললো– তাই বলুন,, আপনারা বন্ধু বান্ধব বেশ মজার। কথায় কথায় শক খায়িয়ে দেন।
,,, বিনিময় হাসলো অর্পনা,, সাথে সবাই। মেয়েটি এবার বোধহয় কিছুটা ফ্রী হতে পেরেছে। মেয়েটা সংকোচ হীন প্রশ্ন করলো — আপু!! আপনি কি আপনার হাসবেন্ডের লয়্যালিটি টেস্ট করতে চান?
,,, না না, প্রয়োজন নেই। আমাদের সম্পর্ক অমন না। আমরা একে অপরকে অনেক বিশ্বাস করি। সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে,, যে একবার আমার প্রেমে পরবে সে আর কখনো কোনো মেয়ের দিকে ফিরেও তাকাবেনা,, অন্য কাউকে রুচিতেই লাগবেনা।

,,,, অর্পনার কথার প্রতিটি উচ্চারনে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসও কঠোর এটিটিউড। মেয়েটি খানিক অবাক হয়েছে — আপনি এতেটা কনফিডেন্ট? ওকে!! তাহলে চেক করাই যাক। আমার বেশ কৌতুহল হচ্ছে। আমিও দেখতে চাই আপনার স্বামী আপনার প্রেমে কতোটা মশগুল।
,,, অর্পনার মত না থাকলেও তার বন্ধু বান্ধবের বেশ মত আছে। তারা দ্বীপের লয়্যালিটি চেক করার জন্য হুটুপুটি শুরু করে দিয়েছে। অরুন তো অর্পনার দিকে বই ছুড়ে মেরেছে,, রাজি না হলে মারবে বলে হুমকি ও দিয়েছে,, রাত্রি অনুরোধ করছে তারা একটু এন্টারটেইন হতে চায়। পল্লব বলছে ঢং না করে রাজি হয়ে যেতে। কি করার? বন্ধু বান্ধবের আবদার কখনো ফেলতে পারেনা মেয়েটা,, তারা প্রান চাইলে সেটাও কবুল। অগত্যা মেয়েটাকে দ্বীপের পারশোনাল নম্বরটা দিলো,, এটা শুধু তার আর দ্বীপের পরিবারের কাছে আছে। মেয়েটি দ্বীপের পরিচয় জানতে চাইলে অর্পনা বললো,, কল দিলেই বুঝতে পারবেন। মেয়েটি শায় জানিয়ে কল ঢুকালো তবে ওপাশ থেকে রেসপন্স পাওয়া গেলো না। পরপর চারবার কল দেওয়ার পরেও যখন রেসপন্স পাওয়া গেলো না,, অর্পনা বললো– বিজি আছে মেবি,, একটু পরে দিন।

,,, পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে কল দেওয়ার পর এবার কল ধরলো দ্বীপ,, ওপাশ থেকে ভেসে এলো গম্ভীর ভারি কন্ঠের সালাম। মেয়েটি নম্রতার সহিত সালামের উত্তর নিলো। দ্বীপ বোধহয় কোনো কারনে রেগে আছে,, তার কন্ঠ অত্যন্ত রুক্ষ —
,,, দ্বীপ জোহান মির্জা বলছি,, আপনি?
,,, নাম শুনে চোখ বড়ো বড়ো তাকালো মেয়েটি,, ফোন স্পিকারে ছিলো। মেয়েটি অর্পনাকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো– আপনি রাজনীতি বীদ দ্বীপ মির্জার ওয়াইফ?
,,, অর্পনা মাথা নাড়ালো,, মেয়েটা চুপসে গেলো,, লোকটার গম্ভীর মুখ দেখলেই কেমন ভয় ভয় করে। কয়েকদিন পরপর ই নিউজে হামলা, প্রতি হামলা আরও নানান ধরনের খবর পাবলিস্ট হয়। এরকম একটা লোকের সাথে প্রেম বাক্য আলোচনা করা চারটে খানি কথা না। মেশেটা অভিব্যাক্তি বুঝে অর্পনা ইশারায় কথা বলতে বললো,, মেয়েটি সাহস নিয়ে বললো– আমি আহানা।
,,, কোন আহানা? আমি কি আপনাকে চিনি?
,,, দ্বীপের সরাসরি প্রশ্নে কিছুটা ভরকালো মেয়েটা — না!! আসলে আমি আপনাকে চিনি। আপনার সাথে আমার একটু গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিলো।

,,, দ্রুত বলুন!!
,,,বার বার দ্বীপের গম্ভীর জবাবে মেয়েটা এক নিশ্বাসে বলে ফেললো– আপনাকে আমার অনেক পছন্দ মানে ভালো লাগে আরকি। আমরা কি ডেটে যেতে পারি?
,,, বলেই মেয়েটি চোখ বন্ধ করে নিলো। যদি আবার ধমক টমক খায় সেই ভয়ে,, তবে ওপাশ থেকে কোনো শব্দ এলো না। অর্পনা মেয়েটির বাম পাশে দাড়িয়ে ছিলো,, মেয়েটির ফোন ও বাম পাশেই ছিলো। অর্পনা আর ফোনের দূরত্ব কয়েক ইঞ্চির হবে। অনেকটা সময় পর ওপাশ থেকে উত্তর এলো–
,,, আপনার পাশে দাড়িয়ে যে অনবরত নিশ্বাস গ্রহন এবং ত্যাগ করছে তাকে ফোনটা দিন।
,,, এই পর্যায়ে অর্পনা সহ অরুন, পল্লব, রাত্রি সবার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলো। মেয়েটি আমতা আমতা করে বললো– মানে?
,,, আমার ওয়াইফকে ফোনটা দিন।
,,, দ্বীপের এহেন কথায় রাত্রি “”ভাইয়া ব্রাভো”” বলে চিৎকার করে উঠলো,, অরুন, পল্লব,, অর্পনা এখনো অবাকের চরম পর্যায়ে। মেয়েটি ঠোঁট উল্টে অর্পনার কাছে ফোন এগিয়ে দিলো। অর্পনা নিলো সেটা,, সে শিউর ছিলো দ্বীপ এসবে পাত্তা দিবেনা কিন্তু এভাবে নিশ্বাসের শব্দ শুনে যে ওকে চিনে ফেলবে,, এটা কখনোই কল্পনা করতে পারেনি। সে ফোন কানে তুলে নরম স্বরে বললো — হুম বলুন।

,,, ম্যাম!! আপনার কন্ঠনালী কার্যক্ষমতা হাড়িয়েছে?
,,, কই,, নাতো।
,,, তাহলে অন্যকে দিয়ে কল করালেন কেনো?
,,, অর্পনা একবার মেয়েটির দিকে তাকালো,, মেয়েটা মুখ কাচুমাচু করে দাড়িয়ে আছে। দ্বীপ যেহেতু নিজের বউকে সবার সামনে প্রকাশ করতে পছন্দ করেনা,, নিজের জিনিস নিজের মতো সিকিউর করে রাখতে চায়,, সেহেতু অর্পনাকে কেউ চিনে না। সবাই শুধু এটুকুই জানে দ্বীপ মির্জা বিবাহিত কিন্তু কাকে বিয়ে করেছে সে নিয়ে ধারনা নেই। অর্পনা মুচকি হেসে মেয়েটাকে আশ্বাস দিয়ে বললো — অন্য না,, উনি একজন ইনফ্লুয়েন্সার। হেটে হেটে কনটেন্ট বানাচ্ছিলেন। আমায় বললো আপনার লয়্যালিটি চেক করবে তাই আমি ই ফোন নম্বর দিয়েছি।
,,, অর্পনার সরল স্বীকারুক্তিতে রিয়্যাক্ট করলো না দ্বীপ,, যদিও ব্যাপারটা তার পছন্দ হয়নি কিন্তু অর্পনার সাথে রুড হওয়া তার কাম্য নয়,, তাই বিষয়টা এভোয়েট করে বললো– হুম বুঝলাম,, ক্লাস নেই?

,,, আছে কিন্তু করবো না।
,,, কেনো?
,,, ইরাদকে মিস করছি তাই ক্লাস বাঙ্ক,,
,,, তাহলে বাসায় যান।
,,, ফিরতে ফিরতে সন্ধা হবে।
,,,, কেনো? কোথাও যাবেন?
,,, একটু সুহাসিনী আন্টির কলেজে যাবো।
,,, দ্বীপ বোধয় বউয়ের অভিব্যাক্তি বুঝলো– সাবধানে যাবেন,, খুব লেইট হলে টেক্ট পাঠাবেন,, নিতে আসবো।
,,, আচ্ছা!!
,,, রাখছি তবে।
,,, দ্বীপ কল কাটতে নিলে বাধা দিলো অর্পনা– শুনুন না!!
,,, বলুন
,,, একবার প্রপোজ করুন না।
,,, কিসের?
,,, ভালোবাসার,, বলুন ভালোবাসি।
,,, শুনতে চাইতে নিষেধ করেছিলাম,, আপনি কথা দিয়েছিলেন চাইবেন না,, এখন আবার বায়না করছেন কেনো?
,,, আপনিও তো বলেছিলেন আর ভালোবাসি বলবেন না, কিন্তু সেদিন তো বলেছিলেন। একবার লাস্ট বারের মতো বলেন।

,,, নো,,
,,, প্লিজ হাসবেন্ড।
,,, না বললাম তো।
— প্লিজ!!
,,, অর্পনার জোরাজোরিতে হার মানতে বাধ্য হলো দ্বীপ,, কিছুটা অনিহা নিয়েই বললো– ওয়েল!! আই লাভ ইউ।
,,, দ্বীপ যতখানি অনিহা নিয়ে কথাটা বলেছে তার থেকেও কয়েক গুন বেশি অবহেলা ছুড়ে দিয়ে অর্পনা ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো– কিসের লাভ ইউ? সুন্দরী মেয়ে দেখলেই ভালোবাসা উৎলে উঠে তাই না? আয়নায় কখনো নিজের চেহারা দেখেছেন? আমার সাথে আপনাকে যায়? ফালতু লোক। ফোন রাখেন।
,,, সবাই এতোক্ষণ উৎসুক দৃষ্টিতে অর্পনার দিকে তাকিয়ে ছিলো। অর্পনা কাউকে এভাবে রিকোয়েস্ট করছে তাদের যেনো বিশ্বাস ই হচ্ছিলো না। বর্তমানে তারা অবাকের শীর্ষে অবস্থান করছে। একটা মেয়ে কি পরিমানের পল্টিবাজ হলে এরকম কথা বলতে পারে? ওপাশে থাকা লোকটাও বোধহয় ভরকে গিয়েছে,, এরকম উত্তর আশা করেনি। ওপাশ থেকে এবার উত্তর এলো — দিন দিন আপনি ধরিবাজ হয়ে যাচ্ছেন না? হুট হাট পল্টি নিচ্ছেন। হিসেবটা রাতের জন্য তোলা রইলো,, রাতে দেখা হচ্ছে।
,,, অর্পনার স্ব-গর্বিত মুখটা চুপসে এই টুকুনি হয়ে গেলো,, লোকটা তাকে হুমকি দিলো? সে কি ভয় পায় নাকি ঐ লোককে? পায় ই তো। লোকটা রেগে গেলে অর্পনা খুব ভয় পায়,, যতই নিজেকে সাহসী প্রমান করার চেষ্টা করুক না কেনো? অর্পনা একটা জায়গায় এসে থমকে যায়,, আর সেটা একমাত্র দ্বীপ মির্জা। দ্বীপ কল কাটতেই সবাই শব্দ করে হেসে ফেললো,, অর্পনাও হাসলো। মেয়েটার দিকে ফোন এগিয়ে দিতেই মেয়েটা অবাক কন্ঠে সুধালো — দ্বীপ মির্জা আপনার সাথে এভাবে কথা বলে? এতোটা নরম স্বরে?

,,, অর্পনা মাথা ঝাকালো,, মেয়েটি ঠোঁট উল্টে বললো– আপনার সাথে হাসে?
,,, অবশ্যই।
,,, তাহলে আদার্স টাইমে মুখ এমন করে রাখে কেনো? যেনো খুব রেগে আছে,, কন্ঠ অত্যন্ত রুক্ষ শুনায়,,
,,, আদার্স আর আমি কি এক হলাম? আমি উনার বউ, ভালোবাসা। ভালোবাসাকে যত্ন করে আগলে রাখতে হয়। দ্বীপ মির্জা রাজনীতি বীদ হিসেবে যেমনি হোক হাসবেন্ড হিসেবে অকল্পনীয় সুন্দর।

,,, ভার্সিটির মোড় থেকে রিকশা নিয়েছে চারজন,, উদ্দশ্য ডি. এম. আর.সি. কলেজ। ওখানেই বহুবছর ধরে শিক্ষক হিসেবে চাকরি রত রয়েছেন সুহাসিনী। ছেলে মেয়েদের আলাদা আলাদা সিফ্টিং থাকায় সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত ওখানেই উপস্থিত থাকেন। অর্পনারা আপাতত সেদিকেই রওনা দিয়েছে,, চারজন সেই আগের নিয়মেই রিকশায় উঠে বসলো,, উপরে বসেছে অরুন আর পল্লব। রাত্রি বসেছে অরুনের নিচে আর অর্পনা বসেছে পল্লবের নিচে। ইরাদটাকে খুব মিস করছে তারা,, ও থাকলে অর্পনা ইরাদ আর রাত্রির কোলে বসতো,, অর্পনার ওজন কম থাকায় বরাবর তাকেই কোলে বসতে হয়। এ নিয়ে অর্পনার কোনোদিনি তেমন আপত্তি ছিলো না। আপত্তি থাকার কথাও না,, কোলে চড়তে কার না ভালো লাগে? রিকশাওয়ালা মামা প্যাডেল চাপতেই অর্পনা রাত্রির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো —
,,, রাত তর মাম্মা কি বিয়ার খায়?
,,,,অর্পনার আকষ্মিক প্রশ্নে পল্লব আর অরুন শব্দ করে হেসে ফেললো,, রাত্রি থতমত খেয়ে বললো — কি আবোল তাবোল বকছিস? মাম্মা এসব খাবে কেনো? মাম্মা না মেয়ে? মেয়েরা এসব খায়?
,,, অর্পনা ভাবুক হলো– খায়না তাইনা? তাহলে কি খায়? কি খেতে ভালোবাসে ?
,,, অর্পনাকে ভাবুক দেখে সবাই সিরিয়াস হলো। রাত্রি কপালে ভাজ ফেলে বললো– কেনো? হঠাৎ এই প্রশ্ন?
,,, বলনা বাপ,, এতো প্রশ্ন করিস কেনো?
,,, মাম্মা তো কাচ্চি লাভার,, তুই কি মাম্মাকে কাচ্চি খাওয়াবি?
,,, অর্পনা উত্তর করলো না,, রিকশাওয়ালার উদ্দেশ্য বললো — মামা!! কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টের সামনে যান।

,,, বিকাল হওয়ার দরুন বর্তমানে ছেলেদের সিফ্ট চলছে। মাত্রই ক্লাস নিয়ে বের হলো সুহাসিনী,, ক্লাস থেকে বের হতেই পিয়ন এগিয়ে এলো। জানালো উনার মেয়ে উনার জন্য টিচার্স রুমে অপেক্ষা করছে। সুহাসিনী দ্রুত গতিতে সেদিকে পা বাড়ালেন। হঠাৎ মেয়েটা কেনো এলো? রাত তো সচারাচর এদিকে আসেনা,, কোনো বিপদ আপদ হলো না তো? আসলে একলা মা তো,, সারাক্ষণ ই মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তিত থাকেন। চিন্তিত সুহাসিনী রেস্ট রুমে আসতেই মেয়ের বন্ধু বান্ধব সহ মেয়েকে দেখে সস্থি পেলেন। টিচার্স রুমে আপাতত তারা ছাড়া কেউ নেই,, পরবর্তী ক্লাসটা ৪৫ মিনিটের হওয়ায় স্যার, ম্যামরা সব বর্তমান ক্লাস শেষ করে পরবর্তী ক্লাসে ঢুকে যাবেন। তিনিও ঢুকে যেতেন কিন্তু পিয়ন এসে খবর দেওয়ায় রেস্ট রুমে চলে এসেছে। ভিতরে ঢুকতেই মাকে দেখে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো রাত্রি। সুহাসিনী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললেন– আপনারা সবাই হঠাৎ এখানে? কাজ ছিলো?
,,, রাত্রি বললো — অর্পনা নিয়ে এসেছে,, ও তোমায় কি যেনো বলবে।

,,, সুহাসিনী একবার অর্পনার দিকে তাকালো। অরুন এগিয়ে গিয়ে নম্রতার সহিত সালাম দিলো,, শ্বাশুড়ি বলে কথা। সুহাসিনী উত্তর করলেন,, টুকটাক খোজখবর ও নিলেন। পল্লবের ভাবান্তর নেই,, সে নির্বিকার ভাবে টিচার্স চেয়ারে বসে আছে। রাতের মায়ের সাথে ওর অতো সক্ষতার প্রয়োজন নেই,, পল্লব তো আর রাতের কেউ হয়না যে বিয়ে করার জন্য শ্বাশুড়ির মন জয় করতে হবে। রাতের যে আপন সেই নাহয় ওসব করুক। পল্লব নির্বিকার থাকলেও সুহাসিনী পল্লবের সাথেও টুকটাক কথা বললো,, পরিবারের সবার খোজ খবর নিলো। পিয়নকে ডেকে বললো ক্যান্টিন থেকে চা বিস্কুট পাঠাতে। পিয়ন চলে যেতেই এবার অর্পনার দিকে মনোযোগী হলো। অর্পনা চেয়ারে বসে টেবিলে আঙুল দ্বারা খটখট শব্দ করে গানের সুর তুলছে। গিটার বাজানোর অদম্য দক্ষতা থাকার দরুন টেবিলের খটখটের শব্দটাও অসম্ভব মধুর ঠেকছে৷ সুহাসী অর্পনার উদ্দেশ্য প্রশ্ন করলো — কেমন আছো তুমি? ওদিক ফিরে আছো কেনো? কথা বলতে এসে আমার দিকে তো তাকাচ্ছই না।

,,, অর্পনার হাতের খটখটানি থেমে গেলো,, ঘাড় বাকিয়ে সুহাসিনীর দিকে তাকিয়ে বললো — আমার সামনাসামনি চেয়ারটাতে এসে বসুন,, আমি ফেইস টু ফেইস,, আই টু আই কথা বলতে পছন্দ করি।
,,, সুহাসিনীর ভাবান্তর হলো না,, শুরু থেকেই মেয়েটার এই উগ্র স্বভাব সম্পর্কে ধারনা রয়েছে উনার। রাতের সাথে অর্পনার চার বছরের উঠা বসা,, বহুবার দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে,, মেয়েটা সবার সাথে এভাবেই কথা বলে। সুহাসিনী ভাবলেন হয়তো রাত আর অরুনের ব্যাপারে কথা বলবে তাই অরুনকে একবার ভালো মতো পর্যবেক্ষণ করে টেবিলের অপর প্রান্তে অর্পনার সামনাসামনি বসলো। অরুন অর্পনার পাশে বসলো,, রাত্রি ঘুরে গিয়ে মায়ের পিছনে দাড়ালো। সবার ধারনা অর্পনা অরুন আর রাতের বিষয়েই কিছু বলবে,, তাই দুজনেই মোটামুটি ভয় পাচ্ছে। অর্পনা পল্লবের হাতে থাকা কাচ্চির প্যাকেট গুলো থেকে একটা খুলে টেবিলের উপর রাখলো,, ভ্রু কুচকে নিলো সুহাসিনী। অর্পনার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই অর্পনা সেটা সুহাসিনীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো — আমি এমনি এমনি সার্থ ছাড়া কাউকে কিছু দেইনা,, কিছু দিলে অবশ্যই তার বিনিময় চাই।

,,, সুহাসিনী একবার ঘাড় বাকিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন,, রাত্রি ভয়ার্ত ঢোক গিললো। সুহাসিনী অর্পনার চোখে চোখ রেখে সুধালো– এটার বিনিময়ে কি দিতে হবে?
,,, তেমন কিছুই না,, আমার পাপ্পাকে বিয়ে করবেন। জাস্ট এটুকুই।
,,, সিলেবাসের বাহিরে উত্তর পেয়ে চমকে গেলেন সুহাসিনী,, অরুন, পল্লব, রাত্রি হতবিহ্বল নজরে তাকিয়ে আছে। সুহাসিনী মৃধু চিৎকার করে বললেন– হোয়াট?
,,, অর্পনা আঙুল তুলে শাসিয়ে বললো– ডন্ট সাউট,, আপনি এখনো আমার জুনিয়র পজিসনে আছেন। আমার বয়স যাই হোক না কেনো আমি কিন্তু এক বছর আগে বিয়ে করেছি,, সু আমি সম্মান ডিসার্ভ করি।
,,, বলেই গর্বের সহিত শিরদাঁড়া টানটান করলো যেনো বিয়ে করে অনেক মহা মুল্যবান কাজ করে ফেলেছে। অর্পনার কথায় হাসি পেলো সুহাসিনীর তবে হাসলো না। মুখে প্রোফেসর টাইপ ভাব নিয়ে বললো — হুম তারপর?
,,, অর্পনা মুখটা আরও গম্ভীর করে বললো– এখানে আপনারো লাভ রয়েছে। যেমন,, আমার পাপ্পার মতো একটা হেন্ডসাম খিটখিটে ডিটেকটিভকে আঙুলের ইশারায় ঘুরাতে পারবেন,, তার উপর দখল দারি করতে পারবেন,, তাকে ধমক দিতে পারবেন আবার ঝগড়াও করতে পারবেন,, ভালোবাসা টালোবাসার বিষয়ে না যাই। সেসব আপনাদের একান্ত ব্যাপার। এবার বলুন রাজি?

,,, সুহাসিনী তপ্ত শ্বাস ফেলে বললেন– তোমার পাপ্পা এসব জানে?
,, নাহ!! আগে আপনার সাথে ডিল ফাইনাল করে তারপর পাপ্পার সাথে ডিল করবো,, সিম্পল!!
,,, বিয়ে একটা ডিল?
,,, অর্পনা ভাবলো না, এরকম সংবেদনশীল একটা প্রশ্নের উত্তর সে সেকেন্ডের গতিতে দিলো– কমিটমেন্ট তো? বিয়ে মানে দু প্রান্তের মানুষের একসাথে থাকার একটা কমিটম্যান্ট। আর যদি ডিলের কথা বলেন তাহলে,, এই পৃথিবীতে যা হয় কিংবা আমি যাই করি সবটাই আমার কাছে একটা ডিল,, প্রজেক্ট ও ধরতে পারেন।
,,, সুহাসিনী এবার বেশ সিরিয়াস হলো,, কপালে তিনটে ভাজ পরলো। রাত্রি অসহায় চোখে পল্লবের দিকে তাকিয়ে আছে যেনো এই মুহুর্তে কি করবে তার উত্তর খুজছে তার কাছে। পল্লব সুহাসিনীর দিকে তাকিয়ে ছিলো,, হঠাৎ রাতের দিকে নজর পরতেই দেখলো ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সে ঘার বাকিয়ে অরুনের দিকে তাকালো,, অরুন বোকা বনে অর্পনার দিকে তাকিয়ে। যেই শ্বাশুড়িকে অরুন জমের মতো ভয় পায়, এই মেয়ে কিনা কান্টিনিউয়াসলি তার সাথে উদ্ভট কথাবার্তা বলে যাচ্ছে। পল্লব অরুনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে রাত্রির দিকে তাকালো,, চোখ দ্বারা আস্বস্থ করলো বিষয়টা নিয়ে না ভাবতে,, সে আছে। আর অর্পনা যাই করুক রাতের ভালোর জন্যই করবে। সুহাসিনীর মুখ চোখের এহেন অবস্থা দেখে অর্পনা বললো–

,,, আমার কথায় আপনার রাগ হয়ে থাকলে, দুঃখিত!” আমি এমোনি বরং আরও কঠোর। আমার পাপ্পার সাথে বিয়ে হওয়ার পর আপনার আর আমার ভবিষ্যত বন্ডিং বর্তমানের থেকে কিছুটা উন্নত হতে পারে কিন্তু মা মেয়ে টাইপ হবে না। কজ,, আমি মা ডিসার্ভ করিনা। বাকি রইলো আমার পাপ্পা!! সে নি-সন্দেহে ভালো মানুষ তাই আপনি কখনো ঠকবেন না,, আমি কথা দিচ্ছি৷
,,, সুহাসিনী মন দিয়ে শুনলো প্রতিটি কথা। মেয়েটা মা চায়না তবে বাবার বউ চায়। এরকমটা তো সচারচর দেখা যায়না। সন্তানরা কখনোই নিজের মায়ের জায়গায় অন্য কাউকে এলাউ করেনা সেখানে নিজ থেকে এসে প্রস্তাব দেওয়া। এটাতো বিশাল আশ্চর্যের একটা ব্যাপার। সুহাসিনী বিষয়টা চেপে রাখলেন না,, প্রশ্ন করলেন– হঠাৎ এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারন?

,,,, অর্পনা এবার কিছুটা চিন্তিত হলো,, চোখে মুখে মা মা ভাব। যেনো ছেলের জন্য বউ খুজতে এসে ছেলের নামে অভিযোগ সাজাচ্ছে — কারন আমার পাপ্পাটা দিনকে দিন বখে যাচ্ছে,, বড্ড অনিয়ম করে। আমি শ্বশুর বাড়ি যাবার পর সে যেনো একেবারে সাপের পাঁচ পা দেখে নিয়েছে। সারাক্ষণ বাহিরে বাহিরে ঘুরে বেড়ায়,, বাহিরের খাবার খায়,, বাড়িতে ঠিক মতো রান্না বান্না করেনা,, বাজারটাও করেনা জানেন? যেনো সে ২০-২৫ বছরের ব্যাচলর,, পাখা গজিয়েছে তার,, এদিক ওদিক উড়ে বেড়ানো ছাড়া কোনো কাজ নেই। এইতো সপ্তাহ খানিক আগে বাড়িতে এসেছি,, এসে দেখি বাড়ির যা তা অবস্থা করে রেখেছে,, ফ্রিজে ডিম আর সালাদ ব্যাতিত কিছু নেই। তাই আমার মনে হচ্ছে এবার আমার পাপ্পার পাখাটা কেটে দেওয়া উচিৎ,, শাসন করার জন্য বাড়িতে একটা বউ আনতেই হবে। আমি তো আর সবসময় থাকতে পারবো না তাইনা? আমারও তো একটা সংসার আছে নাকি?
,,, সুহাসিনী মাথা নাড়িয়ে শায় জানালেন,, সত্যি ই তো অর্পনার একটা সংসার আছে যতই শুয়ে বসে, গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াক না কেনো তবুও তো ওটা অর্পনারি সংসার। মির্জা বাড়ির বড়ো বউ বলে কথা।সুহাসিনীর সাথে সাথে বাকিরাও মাথা নাড়ালো,, এটা একটা সিরিয়াস সংসারি মেয়ের জনম জনমের সংসারি জীবন কথা। সুহাসিনী বললেন– সেটা নাহয় বুঝলাম কিন্তু এই কাজের জন্য আমি ই কেনো?

,,, অর্পনা সরল স্বীকারোক্তি দিলো — অস্বীকার করবো না,, আপনি আমার দেখা স্রেষ্ঠ নারী যাকে নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করা যায়। আমার পাপ্পা অতীতে মারাত্মক ভাবে ঠকে গিয়েছে। তাই আমি এমন কাউকে চাই, যে আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত,, আমার পাপ্পাকে ঠকাবে না, কষ্ট দিবে না,, মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট ছেড়ে যাবে না।
,,, আমাকে এতোটা ট্রাস্ট করছো? আমি যদি ছেড়ে যাই?
,,, অর্পনা এবার চেয়ারে গা হেলিয়ে দিলো,, এক হাতে ঘাড় ডলে ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বললো– রাস্তা রাখবো না,, ডিরেক্ট স্যুট। আগের বার যিনি আমার পাপ্পাকে কষ্ট দিয়েছিলো তিনি সম্পর্কে আমার মা হয় বলে ছাড় পেয়েছে। আমায় জন্ম না দিলে আমার পাপ্পাকে কষ্ট দেওয়ার অপরাধে সে এখন আল্লাহ এর নিকট থাকতো।
,,, সুহাসিনী চোখ ছোট ছোট করে বললো — হুমকি দিচ্ছো?
,,,, অর্পনা সুহাসিনীর চোখে চোখ রাখলো,, হরিনী চোখ জোড়ায় ভয়াবহতার আভাস,, নির্লিপ্ত জবাব দিলো– ধরে নিন তাই!!

,,,, সুহাসিনী এবার সকল গম্ভীরতা দূরে সরিয়ে মিষ্টি করে হাসলেন,, অর্পনার অভিব্যাক্তি নরম হলো। শীতল চাহনিতে চেয়ে রইলো ৪৫ উর্ধ রমনির পানে। রমনিটি শ্যামলা হলেও অসম্ভব মায়াবী,, অর্পনা জীবনে শতাধিক বার মনে মনে এই রমনির রুপের বর্ননা খুজেছে তবে ঠিক ঠাক ভাবে সাজাতে পারেনি। সুহাসিনী হাত বাড়িয়ে অর্পনার কাচ্চিটা নিলো,, ঠোঁটে হাসি রেখেই বললো — আমি এটা নিচ্ছি তবে বিনিময়ে কিছু দিতে পারবো না। আমি আমার জীবনের অর্ধেকেরো বেশি সময় একা একা পার করে দিয়েছি,, বাকিটা জীবন একাই কাটাতে চাই মা। তুমি আমার বিষয়টা খুব ভালে করেই জানো,, আমি অত্যন্ত সিম্পল একটা মেয়ে,, জীবনে অনেক স্ট্রাগল করেছি। আমি স্ট্রাগলেই অভ্যস্ত,, এই বয়সে এসে আর সুখ সাচ্ছন্দ্য চাইনা। আমি দুঃখিত,, তোমার প্রস্তাবটা রাখতে পারলাম না।
অর্পনা বিচলিত হলো না, প্রত্যাক্ষানে অপমান বোধ ও করেনি। সে বোধহয় এমন উত্তরের জন্য প্রস্তুত ছিলো। অর্পনা এবার সুহাসিনীর হাসির বিপরীতে মুচকি হেসে বললো — অর্পনা জামান আজ প্রথমবার বিনিময় ছাড়া এটা আপনাকে দিয়ে দিলো,, কজ ইউর স্মাইল ভেরি এট্রাক্টিব এন্ড গরজিওয়্যাস। তবে এই মুহুর্তে আপনার ডিসিশন ফাইনাল করা হচ্ছে না,, আপনি সময় নিন,, ভাবুন,, প্রয়োজনে আমি পাপ্পার সাথে আপনার মিট করার ব্যাবস্থা করে দিবো। কথা বার্তা বলে দেখুন,, যাই হয়ে যাক সব পেরিয়ে আপনার উত্তরটা যেনো হ্যা হয়। আমি যেহেতু একবার আপনাকে আমার পাপ্পার ওয়াইফ বানাবো বলে ঠিক করে নিয়েছি সেহেতু এটাই হবে। সেটা আজ হোক কিংবা পরশু।

,,, পড়ার টেবিলে বসে আকাশ কুসুম ভাবনায় বিভোর রাত্রি,, ক্ষনে ক্ষনে বইয়ের পৃষ্ঠা খুলছে আর বন্ধ করছে,, কলম দিয়ে আঁকিবুঁকি করছে। আঁকিবুঁকি শেষে কলম কামরে ভাবনায় মশগুল হচ্ছে। ফিরতি পথে অর্পনা তার মতামত জানতে চেয়েছে কিন্তু রাত্রি কিছুই বলতে পারেনি। কি বলবে? মাম্মা তো রাজি হচ্ছে না। সে নিজে নিজে রাজি হয়ে গেলে মাম্মা যদি রাগ করে? কিন্তু তার তো অর্পনার পাপ্পাকে পাপ্পা হিসেবে ভিষন পছন্দ। গত চার বছর যাবত ঈদের আগের রাতে শপিং করা,, মাঝেমধ্যে ঘুরতে যাওয়া, চলতি পথে হুট করে দেখা হয়ে গেলে খোজ খবর নেওয়া,, চার বছর যাবত তো কতই দেখা হলো উনার সাথে কিন্তু কখনোই বাবা বাবা ফিলিংস আসেনি কিন্তু কক্সবাজারে যখন আরশাদ আঙ্কেল ওকে নিজ হাতে খাইয়ে দিলো এরপর থেকে কিভাবে কিভাবে যেনো রাত্রি উনাকে বাবার আসনে বসিয়ে ফেলেছে। তারপর আজ যখন অর্পনা তাকে বোন বানাতে চাইলো রাত্রির খুব বলতে ইচ্ছা হচ্ছিলো। “”আমি রাজি!! আমি তর পাপ্পাকে পাপ্পা বানাতে চাই আর তকে বোন। “”কিন্তু কিছুই বলা হলো না। রাত্রি উসখুস করতে করতে অরুনকে মেসেজ পাঠালো। অরুনের সাথে কথা বলে মনের টানাপোড়েন টুকু যদি একটু কমানো যায় তাহলে বোধহয় কিছুটা সস্থি মিলবে। এই সময়টা অরুনের পড়ার সময় তাই সহসাই অরুন বয়েজ পাঠালো”” বেইব!! তকে আমি এক ঘন্টা পর কল দিচ্ছি। “” রাত্রির মন আরও খারাপ হলো,, এই মুহুর্তে মনটা হালকা করার জন্য বন্ধু বান্ধবকে খুব প্রয়োজন। ইরাদ তো অনলাইনে নেই বহুদিন,, কি হয়েছে আল্লাহ জানেন। অর্পনার সাথেও এটা নিয়ে ডিসকাস করা যাবেনা,, এখন বাকি থাকে পল্লব। অগত্যা পল্লবের আইডিতে ম্যাসেজ পাঠালো–

,,, আছিস?
,,, সেকেন্ডের গতিতে রিপ্লাই এলো– বল।
,,, কি করছিস?
,,, নাচতেছি তুই?
,,, ঘোড়ার ডিম পারি।
,,, তুই ঘোড়ার ডিম পারিস কেনো? তুই কি ঘোড়া?
,,, পল্লবের আকষ্মিক প্রশ্নে ব্যাবাচেকা খেয়ে গেলো রাত্রি– এই না না,, এমনি কথার কথা বললাম আরকি। তুই কি সত্যি ই নাচতেছিস?
,,, হুম!!
,,, ভিডিও কল দেই?
,,, ইচ্ছা।

,,, পল্লবের উত্তর শুনার আগেই কল ঢুকালো রাত্রি সাথে সাথে ওপাশ থেকে কল ধরলো পল্লব। মেয়েটা যা দেখার আশায় কল দিয়েছিলো তার কিছুই পেলো না বরং ওপশে অন্ধকার। আকাশে আজ বড়ো করে চাদ উঠেছে যার ফলে পল্লবের মুখোয়বের অবয়ব বুঝা যাচ্ছে,,, চাদের আলোয় সিল্কি চুলগুলো জ্বল জ্বল করছে,, বাতাসের তোপে উড়ছেও কিছুটা। ফোনের ব্রাইটনেস বোধহয় একদম কমিয়ে রেখেছে তাই রাত্রির রুমে জ্বলা আলোর তারতম্যে কখনো পল্লবের চেহারা লাল দেখাচ্ছে আবার কখনো ফ্যাকাশে,, আবার কখনো অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। রাত্রি বিরক্তি সূচক শব্দ করে বললো– এই আহাম্মক কই তুই? আমি তো তকে দেখতে পাচ্ছি না।

,,, ছাঁদে আছি।
,,, চাঁদ দেখিস?
,,, হুম! কিভাবে বুঝলি?
,,, অনাহিতা আপু বহুবার বলেছে তুই নাকি গত চার বছর যাবত সন্ধায় চাঁদ উঠলেই চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকিস? চাঁদে অতো কি দেখিস? চাঁদ কি তর বউ?
,,, পল্লব খিন হাসলো– আমি কি চাঁদ পাওয়ার যোগ্যতা রাখি? আমার অতো সামর্থ্য নেই।
,,, পল্লবের কথায় আগ্রহী হলো রাত্রি,, নিজ মন গড়া মতো ঘটনা বানিয়ে বললো– কি বলিস? তুই চাঁদে যেতে চাস? আচ্ছা ভাবিস না। একদিন আমি যখন খুব বড়ো হয়ে যাবো, জব টব করবো তখন তকে আমার টাকা দিয়ে চাঁদে নিয়ে যাবো।

,,, ততোদিনে তর বিয়ে হয়ে যাবে।
,,, হলে হবে!! অরুন ই তো,, ও কি মানা করবে?
,,, এতোক্ষণ পল্লব অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলো এবার রাতের দিকে তাকালো,, সামনের রমনি একটা বোকা,, নিজেকে সিকিউর করতে জানে না। পল্লব চোখ সরিয়ে অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে বললো– হুম অরুন ই তো। তুই অরুনকে পেয়ে খুব হেপি?
,,, রাত্রি ফোনটা পড়ার টেবিলে রেখে দুদিকে হাত ছড়িয়ে বললো– অন্নেক!! এইযে এত্তোগুলা।
,,, রাত্রির বাচ্চামি দেখো না চাইতেও হেসে ফেললো পল্লব,, রাত্রিও হাসলো। অনেকটা হাসাহাসির পর পল্লব সিরিয়াস ভাবে প্রশ্ন করলো — আচ্ছা রাত!! অরুনকে ভালোবাসার রিজন কি? ওকে এতোটা ভালোবাসিস কেনো?
,,, রাত্রি টেবিলে দুহাতের কনুই ঠেকিয়ে কজিতে গাল ঠেকিয়ে বললো– রিজন? তেমন করে কিছু ভাবিনি। অরুন আমায় খেপাতো আমিও খেপাতাম। ঝগড়াঝাঁটি হতো, একসময় কি যেনো হয়ে গেলো তারপর থেকে আবার কিভাবে যেনো কি হয়ে গেলো। সব তো তরা জানিস ই, সব তো তদের সামনেই হলো।

,,, যদি অরুনের সাথে তর বিয়ে না হয়,, খুব কষ্ট পাবি?
,,, আমি বোধহয় মরেই যাবো।
,,, এই পর্যায়ে আর কিছু বললো না পল্লব। ফোনের আড়ালে থাকা জ্বলন্ত সিগারেট টা এবার ঠোটে চাপলো। লম্বা টান দিতেই রাত চিৎকার করে বললো — তুই আবার সিগারেট খাচ্ছিস? স্ক্রিনশট নিবো? অর্পনকে পাঠাবো?
,,, আমি জানি তুই এটা করবি না।
,,, করতেও তো পারি।
,,, কি কারনে কল দিয়েছিস? অর্পনার প্রস্তাব নিয়ে আপসেট?
,,, হুম রে,, কি করবো? মাম্মা তো রাজি না।
,,, তর আঙ্কেলকে কেমন মনে হয়?
,,, বাবা হিসেবে বেস্ট।
,,, তুই উনার মেয়ে হতে চাস?
,,, এরকম বাবা কে না চায়? আর মাম্মা তো সারাজীবন একাই থাকলো,, এখন যখন লাইফ গোছানোর জন্য একজন উপযুক্ত ব্যাক্তি এলো তখন লাইফটা গুছিয়ে নেওয়া উচিৎ। আমিও তো মাম্মার সাথে সারাজীবন থাকবো না।

,,, তাহলে আন্টির সাথে কথা বল,, আমাকে যা যা বলেছিস আন্টিকেও বল। দেখবি তর কথা ফিরাতে পারবে না।
,,, আমার অতো সাহস নেই,, মাম্মা যদি ধমক দেয়?
,,, কিছু পেতে হলে কষ্ট তো করতেই হবে,, ধমকের সাথে সাথে মারধর ও খেতে হতে পারে। চল যাহ!! আন্টিকে মনে চলা কথাগুলো বলে দে। একটু হাতে পায়ে ধরার হলেও ধরবি। অর্পনাকে বোন হিসেবে পেতে এটুকু করতে পারবি না?
,,, পারবো, কিন্তু মাম্মা যদি বকে? সাহস পাচ্ছিনা।
,,, ন্যাকার বাচ্চা!! থাপ্পড় খাবি?
,,, বকিস কেনো? তুই জানিস না আমি কতো ভিতু?
,,, পল্লব সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে ধোয়া ছেড়ে বললো– একটা বড়ো করো দম নে,, মনে কর তুই অর্পনার মতো সাহসী। বিকালে দেখলি না অর্পনা তর মাম্মার সাথে কিভাবে কথা বললো? ওটাকে ফলো কর।
,,, রাত্রি পল্লবের কথা মতো দম নিলো। মনে মনে অর্পনাকে কল্পনা করে শিরদাঁড়া সোজা করলো,, নিজের মাঝে অদম্য সাহস অনুভব করে বিস্তর হাসলো— তুই এতোটা পারফ্যাক্ট কি করে বলতো? সব সমস্যার সমাধান নিয়ে ঘুরিস?

,,, ১৭, ১৮ টা প্রেম করেছি তো!! তাই ন্যাকা মেয়েদের কিভাবে হেন্ডেল করতে হয় জানি।
,,, পল্লব!! তুই সত্যি ই এতোগুলো প্রেম করেছিস?
,,, তুই যখন বলেছিস মিথ্যা তো আর বলবি না। আর আমার চেহারা দেখেই তো বুঝা যায় আমি একটা প্লে বয়।
,,, পল্লবের কথাটা কেমন যেনো শুনালো। রাত্রির মনে পরে গেলো কয়েক বছর আগের কথা। একদম শুরুর দিকে এসব বলে বলে পল্লবকে পাগল করে দিতো সে। একদিন হুট করেই পল্লব স্বীকার করলো,, সত্যি ই ও অনেক গুলো প্রেম করেছে,, ওর অনেকগুলো প্রেমিকা ছিলো তবে বর্তমানে তারা ওর এক্স। সেই থেকেই এই এক্সের কাহিনি শুরু হয়েছে। তবে এটার আসলেই কতোটুকু সত্যতা রয়েছে সেই সম্পর্কে কারোর ধারনা নেই। রাত্রির হঠাৎ ই কেমন কান্না পেলো,, কেনো পেলো জানা নেই। সে নাক টেনে বললো — পল্লব তুই সিগারেটটা ফেলে দে আমার চোখ জ্বালা করছে।

,,, আমি সিগারেট খাচ্ছি এখানে,, তর চোখ জ্বালা করবে কেনো?
,,, তর সিগারেট খাওয়াটা আমার পছন্দ হচ্ছেনা।
,,, তাতে আমার কি আসে যায়?
,,, কিছু আসে যায় না?
,,, পল্লবের খুব রাগ হলো,, দাতে দাত পিষে তীক্ত কন্ঠে বললো— হেই!! কি আসবে যাবে? তুই জাস্ট আমার ফ্রেন্ড,, প্রেমিকা না। এসব নেকামি আমার সাথে না করে অরুনের সাথে কর যাহ!!
,,, তর ব্যাবহার খুব খারাপ।
,,, আমি এমনি।
,,, তকে যদি আর কখনো কল দিয়েছি তাহলে আমার নাম পাল্টে জরিনা রাখবো। যাহ!! হেইট ইউ।
,,, আই অলসু হেইট ইউ,, দয়া করে আমাকে পারশোনাল্লি কল দিস না বিরক্ত লাগে।
,,, রাতের চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো, পল্লব স্ক্রিনে চোখ রেখেই কল কেটে চোখ বুঝে নিলো। ফোনটা ছুড়ে মারতে নিয়েও মারলো না,, এটা ভাঙলে আবার কত থেকে কিনবে? সবাই চাইলেই জিনিস পত্র ভেঙে রাগ মিটাতে পারেনা। এসব করতে অগাত থাকতে হয়। পল্লব ফোনটা পকেটে রেখে বুকের বাম পাশে হাত রাখলো পরপর শক্তি খাটিয়ে আঘাত করে বললো — একদম জ্বালাবি না!! আমাকে জ্বালালে সি*গারেটের নিকোটিনে তকে জ্বালিয়ে খাক করে দিবো।

,,, সুহাসিনী মেঝেতে বসে বিছানার সাথে হেলান দিয়ে কোলের উপর বালিশ রেখে খাতা দেখছেন। গতকাল দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস টেস্ট নিয়েছিলেন সেটার আবার আগামীকাল রেসাল্ট দিতে হবে। সুহাসিনী যখন লাল কালির দাগে খাতা দেখতে ব্যাস্ত তখনি ফোপাঁতে ফোপাঁতে রুমে এলো রাত্রি। এসে মায়ের সামনে দাড়িয়ে রইলো। চোখ তুলে তাকালেন সুহাসিনী,, মেয়েটাকে বেশি আদর দিয়ে ফেলেছেন,, তাইতো এখনো বাচ্চাদের মতো ফোপায়। সুহাসিনীর মনে হলো ২৩ বছরের রাত না বরং ৮ বছরের রাত মুড়ি, আইসক্রিম খাওয়ার বায়না ধরে ফোপাচ্ছে। তিনি খাতা সহ বালিশটা দূরে সরিয়ে হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকলেন। রাত্রি হুট করে মায়ের কোলে মাথা রেখে মেঝেতে শুয়ে পরলো। পল্লব এসব বলায় তার যে কেনো কান্না পাচ্ছে বুঝতেই পারছে না। তবুও রাত্রি কাদলো,, অনেকটা সময় কাদলো,, সুহাসিনী বাধা দিলেন না। রাত্রি যখন কাদতে কাদতে ক্লান্ত হয়ে শুধু হেচকি তুলতে থাকলো তখন সুহাসিনী প্রশ্ন করলো — কি পাওনি বলে এতোটা কান্নাকাটি করলে?

,,, রাত্রির আবারও কান্না পেলো,, সে কান্নার জোর কিছুটা বাড়িয়ে বললো– কিছুই পেলাম না, সবাই খারাপ ব্যাবহার করে, যা খুশি বলে। কারোর জীবনে আমার কোনো দাম নেই,, তোমার জীবনেও না।
,,, বুঝলাম কিন্তু কে খারাপ ব্যাবহার করেছে শুনি?
,,, পল্লব!!
,,, খুব বিশাল ঝামেলা? আমি কথা বলবো?
,,, রাত্রি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো– তেমন কিছু না,, আমরা মিটিয়ে নিবো।
,,, ওকে!! তাহলে এবার কান্নাকাটি বাদ দিয়ে যাও গিয়ে ঘুমাও। আজ আর পড়তে বসতে হবে না।
,,, পল্লবের নামে কিছুটা নালিশ দিতে পারে রাত্রির মনটা শান্ত হয়েছে। সে দুহাতে চোখ মুছে বাচ্চাদের মতো করে বললো —
,,, মাম্মা!! আমাকে পাপ্পা এনে দাও। আমি আরশাদ আঙ্কেলকে পাপ্পা বানাতে চাই।
,,, মেয়ের আকষ্মিক কথায় কিছুটা অসস্থিতিতে পরলেন সুহাসিনী — এটা হয়না রাত, এই বয়সে এসে আমি বিয়ে করতে পারবো না।
,,, সমস্যা কোথায় মাম্মা? আর তোমার কি এমন বয়স হলো যে এভাবে বুড়ি মহিলাদের মতো কথা বলছো?
,,, বিরক্ত হলেন সুহাসিনী– যা বুঝো না তা নিয়ে কথা বলবে না।
,,, রাত্রি মায়ের বিরক্তি ভরা মুখটার দিকে তাকালো,, মলিন কন্ঠে সুধালো — তুমি কি এখনো ঐ কাপুরুষটাকে ভালোবাসো?

,,, কার কথা বলছো?
,,, যে আমায় জন্ম দিয়েছিলো।
,,, মেয়ের কথায় তপ্ত শ্বাস ফেললেন সুহাসিনী,, মেয়েটা তো জানে না সে যে মেয়েটার সারোগেসি মাদার। জানানো উচিৎ ও না,, অতো বড়ো সত্যি মেয়েটা মানতে পারবে না উল্টো আরও ভুল বুঝে নিজের ক্ষতি করে ফেলবে। তাই মেহমাদকে যখন বাবা ভাবছে তখন ভাবুক। ভাবনাতে তো আর মেহমাদের কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে না। আর না তার মা মেয়ের পরিচয় চাইতে মেহমাদের কাছে যাবে। রাত তো মেহমাদকে চিনেই না,, শুধু ডায়েরি পড়ে নামটা জেনেছিলো। মাকে গভীর ভাবনায় দেখে রাত্রি বললো —
,,, মাম্মা,, আরশাদ আঙ্কেল খুব ভালো। আমাকে অনেক আদর করে। আমরা যখন কক্সবাজার ছিলাম,, জানো? উনি আমাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছে। আমার উনাকে পাপ্পা হিসেবে চাই মাম্মা। রাজি হয়ে যাও না,, প্লিজ প্লিজ!!
,,, সুহাসিনী মেয়ের টানা টানা মায়াবী চোখ জোড়াতে হাত রাখলেন। হাত দ্বারা সেগুলো বন্ধ করে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন– এতো কথা বলতে হবে না ঘুমাও,, তুমি ঘুমালে আমি খাতা দেখবো।

,,,, বৃষ্টির ঝিরিঝিরি শব্দটা অর্পনার বেশ পছন্দ,, ঘুমের সময় খুব আড়াম বোধ হয়,, শান্তি লাগে। অর্পনা পরম শান্তিতে দ্বীপের উন্মুক্ত বুকে নাক ঘষে আরও খানিকটা মিশে গেলো। দ্বীপের তখন সজাগ,, নামাজ পরে ফিরে আসার পর আর ঘুম হয়নি,,অর্পনা ঘুমাচ্ছে বলে সে এখনো শুয়ে আছে। অর্পনার কান্ডে মুচকি হেসে অর্পনাকে বুকের উপর তুলে গা হেলিয়ে সোজা হয়ে শুলো। অর্পনাও কিছুটা সজাগ ছিলো,, দ্বীপের কান্ডে কমফোর্টার থেকে মুখ বের করে নিভু নিভু চোখে দ্বীপের দিকে তাকালো। দ্বীপ ওর দিকেই তাকিয়ে, অর্পনা ঘুমু কন্ঠে সুধালো — ঘুমাননি?
,,, ওহুম ঘুম পাচ্ছে না।
,,, অর্পনা চোখ কচলে চোখ থেকে ঘুমদের তাড়িয়ে হামি দিতে দিতে বললো — তাহলে আমাকেও ডাকতেন,, দুজন মিলে একসাথে এক্সারসাইজ করতাম।

,,, বলতে বলতে কম্ফোর্টার সরিয়ে উঠে বসলো। দ্বীপের থেকে সরে এসে ঝানালার পর্দা সরিয়ে দিলো। থাই এক পাশে সরিয়ে বেলকনির দরজাটা খুলে দিলো। বাহিরে বর্তমানে তুমুল বৃষ্টি,, এই বৃষ্টি টা একটা সময় অর্পনার জন্য তীব্র আতঙ্কের ছিলো তবে এখন নেই। কারন, এমোনি এক বৃষ্টি মুখর রাতে প্রথমবারের মতো প্রেমের বৃষ্টিতে ভিজেছিলো সে আর দ্বীপ। যখন তারা প্রেমে মত্ত ছিলো তখন প্রকৃতিও তার উত্তাল পাত্তাল ঝড়ে ধরনীকে রাঙিয়ে দিয়েছিলো। তাই এই বৃষ্টির দিনে অর্পনার আলাদা একটা অনুভুতি কাজ করে। অর্পনা বারান্দার ভিতর ঢুকে রেলিং ঘেঁষে দাড়ালো। হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুতেই দ্বীপ পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। অর্পনা জানতো দ্বীপ ওর পিছু পিছু আসবে। অর্পন একটু বৃষ্টির পানি হাতে নিয়ে দ্বীপের দিকে ছুড়ে মারলো। হাইটে কম হওয়ায় পানিটুকু দ্বীপের উন্মুক্ত বুকে ছিটকে পরলো। দ্বীপ বিরক্ত হলো, অর্পনাকে ঘুরিয়ে নিজের দিকে ফিরিয়ে বললো — তুমি জানো না, আমি এসব পছন্দ করিনা? নিজে দিয়েছো এবার নিজ থেকে মুছে দাও।
,,, দ্বীপ ভেবেছিলো অর্পনা নাকচ করে দিবে কিন্তু দ্বীপকে হতবিহ্বল করে দিয়ে অর্পনা ঠোঁট দাবিয়ে সেই পানির ফোটা গুলো শুষে নিলো,, দ্বীপ চোখ বুঝে শক্ত পোক্ত ঢোক গিললো। অর্পনা একটা গাড়ো চুম্বন করে বললো– আমি ফাকা রাস্তায় বৃষ্টিতে ভিজে নাচতে চাই। আপনি কি আমার ইচ্ছেটা পূরন করবেন?
,,,দ্বীপ প্রতিত্তোর করলো না। অর্পনাকে ছেড় রুমে গেলো,, ফোন নিয়ে বিহান, শাহিন মির্জা, মাহিন মির্জাকে মেসেজ পাঠালো। আপাতত তার শ্বশুর বাড়ির সামনের রোড টা ২০ মিনিটের জন্য খালি চাই তার। এদিকে জানবাহন কেনো? কোনো পথচারি ও যেনো আসতে না পারে।

,,, দ্বীপ অর্পনাকে নিয়ে অর্পনাদের ভিতরের গলি পেড়িয়ে মেইন রোডে এসে থামলো। বৃষ্টিতে দুজনেই ভিজে চুপচুপা,, অর্পনা গভীর দৃষ্টিতে দ্বীপকে পর্যবেক্ষণ করছে। লোকটার কাছে আবদার করতে সময়ের প্রয়োজন পরলেও সেই আবদার পূরন করতে লোকটা একটু ও সময় নেয়না। এতোটা ভালোবাসা কি সত্যি ই প্রয়োজনীয়? অর্পনা দ্বীপের থেকে নজর সরিয়ে চারপাশে চোখ বুলালো,, আসেপাশে মানুষ তো দূর একটা কাক পক্ষি ও নেই। অর্পনা আবারও দ্বীপের দিকে তাকালো। দ্বীপ অর্পনার হাত ছেড়ে দিয়ে রাস্তার দিকে ইশারা করে বললো– তোমার ফাকা রাস্তা। এবার নাচো,,
,,, অর্পনা দ্বীপের দিকে তাকিয়ে পিছাতে পিছাতে বললো– শিউর?
,,, দ্বীপ মুচকি হেসে শায় জানিয়ে বললো — জাস্ট টেন মিনিট,, বেশি ভিজলে জ্বর আসবে।
,,, অর্পনা কানে তুললো না। দুদিকে হাত ছড়িয়ে লাফিয়ে উঠলো। ঘুরে ঘুরে নাচলো কতক্ষণ। ছুটে এদিক ওদিক গেলো আবার দৌড়ে এসে দ্বীপকে জড়িয়ে ধরলো। আবার দৌড়ে অনেকটা দূরে গেলো,, অর্পনার চঞ্চলতায় ওর লম্বা চুল গুলো এদিকে ওদিকে ছুটোছুটি করছে,, গায়ের উড়নাটাও মাঝে মধ্যে উড়ে নিজের উপস্থিতির প্রমান দিচ্ছে। দ্বীপ সটান দাড়িয়ে থেকে বউয়ের কার্যকলাপ দেখছে। মেয়েটার সবসময়কার অভিব্যাক্তি দেখে কেউ বুঝতে পারবে না অর্পনা ভিতর থেকে এতোটা চঞ্চল। অর্পনা নাচতে নাচতে ল্যাম্প পোস্টের নিচে বসলো। ওখানে কিছুক্ষণ বসে থেকে আবারও উঠে দৌড়ে দ্বীপের সামনে গেলো। দ্বীপের দিকে হাত বাড়িয়ে বললো — আমাকে তাড়া করুন।

,,, দ্বীপ নাকোচ করে বললো — একদমি না,, এই বৃষ্টির পানিতে ছোটাছুটি করলে পরে ব্যাথা পাবে।
,,, অর্পনা বারন মানলো না একটু একটু করে ছুটতে ছুটতে বললো– আমায় না আটকালে আমি কিন্তু অনেক দূরে হাড়িয়ে যাবো,, আর কখনো পাবেন না আমায়,, আসুন না।
,,, দ্বীপ অবাধ্য অর্পনার অবাধ্যতায় বিরক্ত হলো,, মন রাখতে ছুটে গেলো অর্পনার পিছু। এই পর্যায়ে বৃষ্টির মাত্রা তীব্র থেকে তীব্র হলো। অর্পনা দৌড়াতে দৌড়াতে পিছু ফিরে চাইলো, দ্বীপকে কাছে দেখে পায়ের জোর বাড়াতেই আকাশ ফেটে বিজলি চমকালো। কিছুক্ষণের মাঝেই বাজ পরবে। অর্পনা ভয় পেয়ে উল্টো ঘুরে দ্বীপের গলা জড়িয়ে ঝুলে পরলো,, যার ফলে সহসাই মাটি থেকে অনেকটা উপরে উঠে গেলো অর্পনার পা। দ্বীপ শক্ত করে ওর কোমর জড়িয়ে ধরলো। তখনি তীব্র শব্দে বাজ পরলো। অর্পনা দ্বীপের গলায় মুখ গুজে কেপে উঠলো,, বৃষ্টিতে ভিজার ফলে মেয়েটা থরথর করে কাপছে,, যেটা ওকে কাছে পাওয়ার পর অনুভব করলো দ্বীপ। সে কিছুটা গম্ভীর কন্ঠে বললো– অনেক হয়েছে,, চলো এবার নয়তো জ্বর চলে আসবে।

,,, অর্পনা মানলো না উল্টো ঠেলে ঠুলে, শক্তি খাটিয়ে নিজেকে দ্বীপের থেকে ছাড়াতে চাইলো তবে দ্বীপ ছাড়লো না, শক্ত ধমকে চুপ করিয়ে দিলো। অর্পনা মুখ চুন করে এদিক ওদিক তাকাতেই দূরে মাটিতে পরা কাঠগোলাপ দেখে অর্পনার চোখ চকচক করে উঠলো। সে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে সেদিকে আঙুল তাক করে বললো — আমাকে কয়েকটা কাঠগোলাপ এনে দিন,, আমি বাধ্য মেয়ের মতো বাড়ি ফিরে যাবো।
,,, দ্বীপ তপ্ত শ্বাস ফেলে অর্পনাকে নামাতে নিলে অর্পনা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো — এভাবেই আমাকে নিয়ে যান।
,,, কথা বাড়ালো না দ্বীপ,, অর্পনার কোমরটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে কাঠগোলাপ গাছের নিচে নিয়ে দাড় করালো। অর্পনা দুদিকে হাত ছড়িয়ে বায়না করলো — গাছটা একটু নাড়ান তো,, দেখি আপনার কতো শক্তি ।
,,, দ্বীপ ভ্রু কুচকে বিরক্তিকর কন্ঠে বললো– এসব কি ধরনের পাগলামি? আমি এখন রাস্তাঘাটে এসব করবো?
,,, অর্পনার ভাবাবেগ হলো না — তাতে কি? আপনি আর আমি ই তো,, আর তো কেউ দেখছে না ? নাকি আমার সামনে লজ্জা পাচ্ছেন? আমার সামনে লজ্জা পাবেন না,, আমি তো আপনাকে কতো ভাবেই দেখি তাই না? শুরু করুন।

,,, বলেই চোখ টিপলো। মেয়ে মানুষ যে এতোটা ঠোঁট কাটা হয় জানা ছিলো না দ্বীপের,, সে ফের তপ্ত নিশ্বাস ফেলে গাছের গোড়ায় হাত রাখলো,, গাছটা মোটামুটি মোটা তবে পুরুষ মানুষের শক্তির কাছে কিছুই না। দ্বীপ এক হাতে নাড়াতেই ঝরঝর করে অর্পনার উপর কাঠগোলাপ ঝরতে লাগলো। অর্পনা চেখ বুঝে আবারও দুদিকে হাত ছড়িয়ে দিলো। কাঠগোলাপের বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা অর্পনাকে জীবন্ত কাঠগোলাপের ন্যায় ঠেকছে,, দ্বীপ বিমোহিত নজরে তাকিয়ে রইলো। শুরুতে কপালে বিরক্তির ভাজ থাকলে এবার চোখ জুড়ে মুগ্ধতা। সে এবার মুগ্ধ হয়ে হাতের জোর বাড়ালো এরপর একেবারে সব ফুল ঝরে গাছ ফাকা হওয়ার পর ক্ষান্ত হলো। ফুল পরা বন্ধ হতেই চোখ মেলে তাকালো অর্পনা। ফুল পরে চুলের এখানে ওখানে আটকে গিয়েছে,, পায়ের তলায় বিছিয়ে আছে অসংখ্য কাঠগোলাপ। সে হুট করেই মাটিতে বসে পরলো,,ফুল কুড়িয়ে উড়নায় নিতে নিতে বললো — আমাকে একটু হেল্প করুন তো,, এই সবগুলো ফুল আমার চাই।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৭ (২)

,,, বউয়ের একটার পর একটা বাচ্চামি ভরা আবদারে এবার চরম বিরক্ত হলো দ্বীপ । সে এখন রাস্তায় বসে বসে ফুল টোকাবে? কতোটা খারাপ দিন আসলে এমনটা করতে হয়। মেয়েটা কি ভুলে গিয়েছে তার বয়স কত? তার বয়স গুনে গুনে ৩২ বছর, এসব তার বয়সি ছেলেদের মানায়? এসব করবে টিনএজ-রা,, টিনএজদের দ্বারাই ওসব ন্যাকামি গুলো সম্ভব। দ্বীপ এতোটা ন্যাকামি করতে পারবে না। অগত্যা এগিয়ে গিয়ে ফুল কুড়াতে থাকা রমনিকে এক ঝটকায় কাধে তুলে নিয়ে হাটা ধরলো,, আকষ্মিক কান্ডে লাফিয়ে উঠলো অর্পনা। ফুলের দিকে হাত বাড়িয়ে মোচড়ামুচড়ি করে বললো — আমার ফুল,, ছাড়ুন বদমাস লোক,, দ্বীপ ছাড়ুন না। দ্বীপ!! আমার ফুল।
,,, মেয়েটার চিৎকারের তোয়াক্কা করলো না দ্বীপ,, উল্টো ওপাশ থেকে ধেয়ে এলো গম্ভীর, রুক্ষ স্বর — কিপ মাউথ সাট,, আরেকবার চিৎকার করলে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিতে দুবার ভাববো না।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here