Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৭ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৭ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৭ (২)
রুপান্জলি

পাহাড়ের চূড়ায় দাড়িয়ে আছে ইরাদ,, শেষ রাতের বৃষ্টিতে শরীরে থাকা সাদা কাপর খানা ভিজে চুপচুপা,, বাতাসের ঝাপ্টায় পরনের উড়নাটা ধপধপ শব্দ তুলে উড়ছে। সকালের আবছা আলোয় দূর থেকে দেখলে যেকেউ তাকে আত্মা হিসেবে গন্য করবে। গন্য করার ফুসরত নেই,, ইরাদ তো আত্মাই,, তার বাবা ভাইরা খুব যত্নের সহিত তার দেহটাকে কফিনের ভিতর রেখে মাটি চাপা দিয়ে দিয়েছে,, আর তার নাম দিয়েছে সমাধি,, ইরাদের সমাধি।

,,সমাধিতে নিজের নাম দেখে আর বাড়ির ভিতরে তার ছবিকে কেন্দ্র করে সবাইকে এক ধ্যানে বাইবেল পাঠ শুনতে দেখে রাগ সামলাতে পারলো না ইরাদ। ছুটে গিয়ে নিজের ছবিতে থাকা মালাটা ছুড়ে ফেলে দিলো,, বাবা ভাইদের দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিজের ছবিটাও আছড়ে ফেললো মেঝেতে। ইরার বাবা ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকালেন,, চোখে মুখে অবজ্ঞা, ঘৃনা। পাত্তা দিলো না ইরাদ,, ছুটে গেলো স্টোর রুমের দিকে। ইরাদদের হলরুমের একপাশে স্টোর রুমের অবস্থান,,এই রুমটাকে স্টোর রুম কম অস্ত্রের কারখানা বলা বেশি গ্রহণ যোগ্য হবে। এটা আগে গেস্ট রুম হিসেবে পরিচিত ছিলো যেটাকে ২৭ বছর আগে ইরার বাবা অস্ত্র সস্ত্রের কারখানা হিসেবে তৈরি করেছে। ইরাদ সেখান থেকে একটা মোটা হকি স্টিক নিয়ে বের হলো পরপর এগিয়ে গিয়ে খাবার টেবিলে সজোরে বাড়ি মারলো। কাচের তৈরি টেবিলটা মুহুর্তেই ভেঙে মেঝেতে লুটিয়ে পরলো,, সাথে কাচের প্লেট আর গ্লাস ভাঙার শব্দে মুখরিত চারিপাশ। ততোক্ষণে ইরার বাবা, ভাইরা উঠে দাড়িয়েছে,, ফাদার ভীতটতস্থ হয়ে সরে গেলেন। ইরাদ খুব একটা রাগে না,, আর যখন রেগে যায় তখন ঠিক ভুল মাথায় থাকেনা। সে মুহুর্তেই হকিস্টিক দিয়ে হলরুমের নাজেহাল অবস্থা করে ছেড়েছে। দামি দামি আসভাবপত্র ভাঙার পর হলরুমের এক কোনায় সোভা পাওয়া বড়ো একোরিয়ামটায় বারি মেরে চিৎকার করে বললো — হোয়াট দ্যা হেল ম্যান? আর ইউ অল কিডিং উইথ মি? আমি জীবিত থাকা সত্ত্বেও কোন সাহসে আমার সমাধি তৈরি করা হলো? ঐ সমাধির ভিতর কি দিয়েছেন আপনারা? আমার মাথা? ওপ্স!! মাথা কিভাবে দিবেন? মাথা তো আমার সাথেই আছে। আম্মা!! আম্মা!! আম্মা!! আপনি কোথায়? আপনার স্বামী, সন্তানের মাথার তাড় তোড় ছিড়ে গিয়েছে নাকি? আম্মা!!

,,, ইরার ডাকাডাকি শুনে ঘরের ভিতর বন্দি থাকা ইরার মা এমালিয়া পারবিন দরজা ধাক্কাতে লাগলেন। সাথে সাথে শুনা গেলো চাচিদের ঘর থেকেও দরজা ধাক্কানোর শব্দ,,, যা বুঝার বুঝে গেলো ইরাদ৷ তার বাপ চাচা মিলে মা চাচিদের আটকে রেখে তার জন্য শোক সভা বসিয়েছে। ইরাদ বাবা চাচার দিকে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকালো। ইরার বড়ো ভাই তেড়ে এসে ইরার গালে সজোরে থাপ্পড় মারলো,, ইরাদ গালে হাত দিয়ে ফুসে তাকাতেই আবারো গালে চর পরলো,, আগাম বার্তা ছাড়া চুল খামচে ধরলো জোসেফ,, ইরার হাত থেকে হকি স্টিকটা কেড়ে নিয়ে বললো — তুই এখানে কি করছিস? তকে বাড়িতে ঢুকার পারমিশন কে দিয়েছে? ঢাকায় ন*ষ্টামি করে আমাদের মান সম্মান খয়িয়ে তর সাধ মিটেনি? কোন সাহসে নিজের কলঙ্কিত মুখটা দেখাতে এসেছিস?
,,, ইরাদ চুলের ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো। যে ভাই তাকে কখনো ধমক পর্যন্ত দেয়নি সে আজ তার চুলে ধরেছে। মুহুর্তেই কেদে দিলো ইরাদ — ভাইজান ছাড়েন,, ব্যাথা পাচ্ছি আমি।

,,, জোসেফোর ভাবান্তর হলো না,, হাতের জোর বাড়িয়ে বললো– ব্যাথা পা মন চায় মরে যা,, যা করার সওদাগর বাড়ির বাহিরে গিয়ে করবি। তুই আমাদের কেউ না,, আব্বুজান তকে লিখিত ভাবে অস্বীকার করেছে আর পুরো এলাকাবাসি জানে তুই মৃত। সবাই সচোক্ষে তর সমাধি দেখেছে,, বুঝতে পেরেছিস? তুই আমাদের কাছে স্রেফ মৃত।
,,, ভাইয়ের কথায় বড্ড অভিমান হলো ইরাদের। সে বাবার দিকে তাকালো পরপর চাচা আর চাচাতো ভাইদের দিকে। ইরার ছোট ভাইটা ওর দিকে মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে,, ইরাদ ব্যাথিত কন্ঠে সুধালো — কি করেছি আমি? কেনো আমাকে জীবিত রেখে মৃত ঘোষণা করা হলো? আব্বুজান!! আমি কিন্তু কষ্ট পাচ্ছি। বলুন না,, কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছেন?
,,, ইরার বাবা মুখ ফিরিয়ে নিলেন,, জোসেফ ইরার গালে আরও একটা চর মেরে দাতে দাত চেপে বললো– তুই আমাদের ধর্মকে অবমাননা করেছিস,, একটা মুসলিমের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার পরেও তর এই উদ্ধত কতোটুকু গ্রহণ যোগ্য? কু*লাঙ্গারের বাচ্চা।

,, বলেই ইরাদকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিলো ,, ফুপিয়ে উঠলো ইরাদ। ইরার বড় চাচার একমাত্র সন্তান ইসরাইল ছুটে এসে টেনে তুললো ইরাদকে,, এই ছেলেটার সাথে ইরার ছোট থেকেই বিয়ের কথা চলছে। ইরার প্রতি বড্ড উইক ইসরাইল,, কিন্তু বাবা চাচার বিরুদ্ধে সে যেতে পারবে না। বাবা চাচার বিরুদ্ধে যাওয়া মানে বাড়ির আঙিনায় আরও একটা সমাধি তৈরি করা। সে ইরাদকে টেনে তুলে শান্ত স্বরে বললো — চলে যাও জাহিন!! আব্বু, বড়ো আব্বু!! চাচা কেউ তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক না। কথা বলবেও না। এই মুহুর্তে তোমার এখানে থাকা মানে এই শোক সভাটা সত্যি করে তোলা। তোমাকে জোসেফ ভাইয়া আরও আঘাত করলে আমার ভিষন কষ্ট হবে,, তাই প্লিজ চলে যাও।
,,, অভিমান দূরে সরিয়ে ফুসে উঠলো ইরাদ,, ইসরাইলের থেকে দূরে সরে চিৎকার করে বললো– না গেলে কি করবেন আপনারা? মেরে ফেলবেন? আচ্ছা!! মরতে রাজি আছি,, আগে বলুন আমি কি করেছি? কিসের জন্য এই নাট্য মঞ্চ সাজানো হলো?

,,, বোনের কান্নায় আজ আর মায়া হলো না জোসেফের। সে তেড়ে ইরার গালে আরও একটা চর বসালো। চওড়া দেহের অধিকারি জোসেফের পরপর চারটে চর খেয়ে মাথা ঘুরে মেঝেতে আছরে পরলো ইরাদ। এই পর্যায়ে ঠোঁট ফেটে রক্ত গড়ালো,, কপালে হালকা চিড় ধরেছে। ইরাদ ফুপিয়ে উঠলো, ইসরাইল এগিয়ে যেতে নিলে ধাক্কা মারলো জোসেফ,, চিৎকার করে বললো– কি করেছিস মানে? বড়ো গলায় আবার জিজ্ঞেস করছিস? সিদ্বার্থ কে? ওর সাথে তর কি সম্পর্ক? ওর সাথে রাতবিরেতে কি করতি তুই? একসাথে বসে থাকা, কাধে মাথা রেখে ঘুমানো ,, চুম্বন করা,, আর কি কি করা বাকি আছে? নাকি কিছুই নেই? সব করা শেষ? ন*ষ্টার বাচ্চা। তুই একটা সময় আমার বোন ছিলি ভাবতেও আমার লজ্জা লাগছে।
,,, বড়ো ভাইয়ের মুখে সিদ্বার্থের নাম শুনে কান্না থামিয়ে চোখ তুলে তাকালো ইরাদ,, ভাইয়া সিদ্বার্থের নাম কিভাবে জানলো? ভাইয়ার তো জানার কথা না। ইরাদ গালের ব্যাথা ভুলে অবাক কন্ঠে সুধালো — আপনাকে এসব কে বলেছে ভাইজান? কত থেকে শুনেছেন এসব?

,,, তাচ্ছিল্য হাসলো জোসেফ,, ইরার দুই চাচা ভাঙা কাচ পেরিয়ে সোফায় গিয়ে বসলো। জোসেফ ইরার ছোট চাচার ছেলে রাফায়ালকে তার ঘর থেকে ফোন এনে দেবার নির্দেশ দিতেই রাফায়েল ছুটে গেলো উপরের ঘরে। যেই তোড়ে গিয়েছে সেই তোড়েই ছেলেটা জোসেফের ফোন হাতে ফিরে এসেছে। ফোন এগিয়ে দিতেই জোসেফ ফোন ঘেটে কিছু একটা বের করে ইরাদের দিকে এগিয়ে দিলো। ইরাদ নিলো সেটা, চোখ বুলাতেই মুখটা কেমন শীতল হয়ে এলো,, চোখের কোনায় জল চিকচিক করছে,,,

ফোনের স্ক্রিনে ভাসছে তার আর সিদ্বার্থের একসাথে কাটানো সময়ের একটার পর একটা ভিডিও। হসপিটালের ওয়েটিং রুমে একসাথে বসে থাকা, করিডরে দাড়িয়ে থাকা,, সিদ্বার্থের আনা খাবার খাওয়া,, এমনকি সিদ্বার্থের কাধে মাথা রেখে ঘুমানোর ভিডিওটা স্পট দৃশ্যমান। একসাথে হসপিটালে থাকা কালিন সময়ে একদিন সকালে ঘুম ভেঙে ইরাদ নিজেকে সিদ্বার্থের কাধে মাথা রাখা অবস্থায় পায়। সবটাই হয়তো ঘুমের ঘোরে হয়েছে,, সেই ভিডিওটাই ফোনের স্ক্রিনে ভাসছে। সবকটাই সি সি টিভি ফুটেজ থেকে কালেক্ট করা ভিডিও। ইরাদ পরবর্তী ভিডিওতে ক্লিক করতেই সিদ্বার্থ আর তার করা মেসেজের স্ক্রিন রেকর্ডিং ভেসে উঠলো। ইরাদ বোকা বোকা নজরে একটার পর একটা মেসেজ পরতে লাগলো। অস্বিকার করার জো নেই,, তার আর সিদ্বার্থের কিছু কিছু কনভারসেসন খুবি ঢিপ ছিলো,, একদম হাসবেন্ড ওয়াইফ টাইপ। সেগুলোই এখানে হাইলাইট করছে বেশি। ইরাদকে এবার অবাকের শীর্ষে পৌঁছে দিতে স্ক্রিনে ভেসে উঠলো মোমের আলোয় করা তার আর সিদ্বার্থের সেই চূম্বনের দৃশ্য,, কেপে উঠলো ইরাদ। চোখের ছলছল করা পানি এবার গাল ছুয়েছে।

সে মাথা নত করে নিলো,, এই বিষয়ে আর কিছু বলার নেই তার,, বহু গলাবাজি করেছে,, আর শক্তি অবশিষ্ট নেই। সে খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছে এটা কার কাজ। সিদ্বার্থ তাকে পাবেনা বলে তার ভাইদের এসব পাঠালো? অথচ ইরাদ সিডকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলো,, মনটা সিদ্বার্থের নামে লিখে দেওয়া যায় কিনা তার চিন্তা করেছিলো। আর লোকটা তাকে আবারও এভাবে ঠকিয়ে দিলো? লোকটা কি জানে? ইরার বাবার কাছে সবার আগে তার ধর্ম তারপর মান সম্মান এরপর ছেলেরা। ইরার বাবা তো তাকে ভালোই বাসে না,, ইরা মেয়ে বলে তাকে তেমন গুরুত্ব ও দেয়নি কোনোদিন। যেই ভাইটা ভালোবাসতো সেও আজ ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ইরাকে মাথা নত করে নিতে দেখে তাচ্ছিল্য হাসলো জোসেফ। ফোনটা কেড়ে নিয়ে বললো–

,,, প্রমান পেয়েছিস? এবার বেড়িয়ে যা। আমি চাচ্ছিনা আমার হাতে আমার আদরের ছোট বোনের মৃত্যু হোক।
,,, ইরাদ কাপা কাপা পায়ে উঠে দাড়ালো,, তার এখনো মাথা ঘুরছে,, সে পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে ইমানুয়েল সওদাগরের সামনে দাড়ালো,, কাতর কন্ঠে ডাকলো– আব্বুজান!! একবার আমার দিকে তাকান। আমি মানছি আমি ভুল করেছি কিন্তু এটা কেমন শাস্তি দিচ্ছেন? আপনি আমায় জীবিত রেখে সমাধি তৈরি করতে পারলেন? আপনার কষ্ট হলো না? মানছি মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছি বলে আপনি আমায় কখনো আদর করেননি তাই বলে আমায় জীবিত রেখে মেরে দিলেন? আব্বু,, আব্বু!! বলেন না,, আমার জন্য আপনার মায়া হলো না?

,,, বলতে বলতে বাবার সাদা ফতুয়ার অংশ ধরে টানতে লাগলো,, তবুও ইমানুয়েল সওদাগরের
ভাবান্তর হলো না,, ওর দিকে ফিরেও তাকালো না। ইরাদ কাদতে কাদতে বাবার বুকে মাথা ঠেকালো। ফোপাঁতে ফোপাঁতে আব্বু আব্বু বলে ডাকতে লাগলো। মেয়ের ডাকে মায়া হলো না ইমানুয়েল সওদাগরের,, উনার কাছে আগে নিজের ধর্ম তারপর সম্মান ,, ইরাদ এই দুটোকেই চরম ভাবে অবমাননা করেছে। আজ ছেলেটা বিয়ে না দিলে ভিডিও গুলো নেট দুনিয়ায় ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে,, কাল হয়তো ছেড়েও দিবে। তখন উনার সম্মান রাস্তার ধূলোয় মিশে যাবে,, সমাজে মুখ দেখাতে পারবেন না। নিজের সম্মানের কাছে মেয়ে কিছুই না,, এরকম হাজারটা মেয়ে তিনি বছরে দশটা জন্ম দিতে পারবেন। এমানুয়েল সওদাগর নিজের পাষানতার প্রমান দিতে মেয়েকে নিজের থেকে ছিটকে দূর সরিয়ে দিলেন,, বাবার দানবীয় ধাক্কায় আবারও মেঝেতে আছড়ে পরলো ইরাদ,, এবার কপাল ফেটেও রক্ত গড়ালো। এমানুয়েল সওদাগর চলে যেতে নিলে ইরাদ তাড়াহুড়ো করে বাবার পা জড়িয়ে ধরলো — আব্বু!! মাফ করে দেন,, আমাকে এতো বড়ো শাস্তি দিবেন না। আপনি আমায় ভালো না বাসেন,, আমি আপনাদেরকে অনেক ভালোবাসি আব্বু। আমি আপনাদের ছাড়া কিভাবে থাকবো? আমার সাথে এমটা করবে না,, আব্বুজান!! ও আব্বু!!

,,, ইমানুয়েল সওদাগর ক্ষিপ্ত মেজাজে পা ছাড়াতে চাইলেন ইরাদ ছাড়লো না। ছাড়াতে না পেরে তিনি ফ্যাসফ্যাসে গলায় আওড়ালেন– নিজের মায়ের ভালো চাইলে এখনি আমার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাও নয়তো তোমার উপর উঠা সকল রাগ তোমার মায়ের উপর মিটাবো। তুমি খুব ভালো করেই জানো আমার বাড়িতে তোমার মায়ের অবস্থান ঠিক কোথায়।

,,, থমকে গেলো ইরাদ,, তাদের পরিবারে মেয়ে বউদের দাসী রুপে দেখা হয়,, সারাদিন খারাপ ব্যাবহার আর রাত হলে নির্মম অত্যাচার। এসব সে ছোট থেকেই দেখে আসছে। মা সারাদিন খেটে খুটে সংসার সামলানোর পরেও বাবার মুখ থেকে দুটো মিষ্টি কথা বের হয়না। অথচ রাত হলেই হায়নার মতো ঝাপিয়ে পরে ।ইরার ছোট ভাই যখন মায়ের গর্ভে তখনো এক চুল ছাড় দেননি তিনি। মা বহুবার বাচার জন্য ভিক্ষা চেয়েছে কিন্তু বাবা মাকে সেই ভিক্ষাটা পর্যন্ত দেয়নি। ইরাদ তখন ছোট,, একই ঘরেই তো থাকতো,, মায়ের যন্ত্রণার কারন সে বুঝতো না কিন্তু মায়ের আর্তনাদে সেও কাদতো। সে কাদলে বাবা তাকে নিজেদের ঘরে রাখতো না, মেরে মুরে বের করে দিতো। ইরাদ তো তখন ছোট,, মাকে ছাড়া থাকতে পারতো না,, কষ্ট হতো,, তাই মায়ের সাথে থাকার লোভে মায়ের যন্ত্রণা দেখেও চোখ বুঝে চুপটি করে মায়ের পাশে শুয়ে থাকতো। তার বাবা তাকে কখনো দেখতে পারেনি,, এমনকি তার জন্মের পর তাকে জন্ম দেওয়ার অপরাদে তার মাকে মেরে শরীরে লবন ছিটিয়ে দেওয়ার আগেও দুবার ভাবেননি। ইরার মায়ের একটাই অপরাধ,, তিনি মেয়ে জন্ম দিয়েছিলেন। ইরার মাঝে মধ্যে বড্ড আফসোস হয়,, সে কেনো মেয়ে হয়ে জন্ম নিলো? কেনো বাবা চাচার কাজে লাগলো না? সে একটা অকর্মণ্য,, অন্য ধ্বংস করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি জীবনে। নাহ!! আরও একটা জিনিস ধ্বংস করেছে সে,, তার মাকে সযত্নে ধ্বংস করেছে ইরাদ। তাকে জন্ম দেওয়ার পর থেকে আজো পর্যন্ত কম যন্ত্রনা তো ভোগতে হয়নি মাকে। আর না,, এবার আর মাকে নিজের অপরাধের শাস্তি পেতে দিবে না ইরাদ। এমনিতেও তো সে এখানে থাকেনা,, থাকতে ভালো লাগেনা। রোজ রোজ মায়ের এই যন্ত্রণা, হাহাকার দেখতে দেখতে অতিষ্ঠ সে। এতোদিন মাকে একবার দেখার জন্য আসতো,, আজকের পর আর কখনো এখানে পা দিবে না। সেও ভুলে যাবে বাবা, চাচা, ভাইদের। তবে মা, চাচি, বোনদের সে খুব মিস করবে,, একদিন তাদের মুক্তির পথ ও খুজে দিবে ইরাদ। ইরার ভাবনার মাঝে শুনা গেলো ইরার বাবার কর্কশ ধ্বনির স্বর—

,,, কলঙ্কিত হলেও এটা সত্যি তোমাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম। তোমার প্রতি আমার একটা দায়িত্ব রয়েছে,, যার ফল স্বরুপ এখনো তোমার একাউন্ট লক করা হয়নি। সেখানে যেই পরিমান টাকা আছে,, সেই টাকায় তোমার এক জীবন দিব্যি পার হয়ে যাবে। আপাতত আমাকে ক্ষমা দাও আর বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাও। জোসেফ!! এই কুলাঙ্গারকে গেইটের বাহিরে ছুড়ে ফেলে আসো।
,,, বলেই লাত্থি দিয়ে নিজের পা থেকে সরিয়ে দিলেন। বাবার কান্ডে তাচ্ছিল্য হাসলো ইরাদ,, কপাল আর ঠোঁট বেয়ে এখনো রক্ত ঝরছে,, কান্নার তোপে চোখ দুটো লাল। উপরের তলায় মা চিৎকার করে জাহিন জাহিন বলে ডাকছে,, ইরার কান্না পেলো তবে জেদ মিটলো না। সে বাবার উদ্দেশ্য সমান ভাবে চিৎকার করে বললো — আপনি আমার বাবা না হলে আপনাকে আমি অনেক আগেই খুন করতাম,, বিশ্বাস করুন। ভাববেন না আবারও আপনার পায়ে পরবো। ইরাদ এসা ফেসা টাইপ ব্যাক্তিত্ব নিয়ে চলে না। আপনার ওসব পাপের টাকা ইরাদের লাগবেনা,, ওগুলো আপনার বাজারের মা*গীদের দিবেন। আপনি কোন মুখে আমাকে কুলাঙ্গার বলেন? যদি আমার চরিত্র খারাপ হয়ে থাকে তাহলে আমি আপনার রক্তই পেয়েছি। আপনার নিজেরি তো চরিত্র ঠিক নেই,, আপনি নিজেই একটা কুলাঙ্গার। হিসেব বরাবর,, কুলাঙ্গারের ঘরে আমিও একটা কুলাঙ্গার হয়ে,,

,,, বাকিটা শেষ করতে পারলো না ইরাদ তার আগাই ইরার চুল টেনে ধরলেন ইমানুয়েল সওদাগর,, চুল ধরে টেনে দাড় করিয়ল গালে কষে তিনটে চর বসালেন,, ইসরাইল ছুটে এলো,, ইরাদকে ধরতে নিলে এমানুয়েল সওদাগর চিৎকার করে বললেন — ইশ্বরের কসম,, ওর কাছে যে এগুবে আগামিকাল তার অবস্থা ও ওর মতোই হবে।
,,, সরে গেলো ইসরাইল,, জাহিনের জন্য তার বুক পুড়ছে কিন্তু মেয়ে মানুষের প্রতি দয়া দেখানো তাদের বংশে বেমানান। এমানুয়েল সওদাগর ইরার চুল টানতে টানতে বাড়ি থেকে বের করার উদ্দেশ্য দরজার দিকে পা বাড়ালো। বাবার পায়ের জোরের সাথে পেরে উঠছে না ইরাদ,, একপ্রকার টেনে হিচরে নিয়ে যাচ্ছে ওকে। তখনি ইরার কানে বাজলো মায়ের চিৎকার। ইরাদ শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে বললো — আম্মা!! আম্মা!! আপনি কাদবেন না,, আমি আবার আসবো। নিজের একটা ব্যাবস্থা করে আপনাকে নিয়ে যাবো। এই নরপশুর কাছে বেশিদিন থাকতে হবেনা আপনায়,, আম্মা!! কাদবেন না,, আমার জন্য অপেক্ষা করবেন,, আমি আসবো। কথা দিচ্ছি।

পাহারি বাতাসের তোপে কাপন ধরেছে ইরার শরীরে,, গতকাল সন্ধা থেকে সে এখানেই বসে আছে,, শরীরে তীব্র জ্বর,, জ্বলছে ভিষণ,, মনে হচ্ছে শরীরে কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। মাথাটা প্রচন্ড রকমের ঘুরছে,, মনে হচ্ছে এখনি মাটিতে লুটিয়ে পরবে। ইরাদ নিভু নিভু দৃষ্টিতে মাটিতে আছড়ে পরা আধ ভাঙা ফোনটা হাতে তুলে নিলো। এই প্রথম বারের মতো ভিডিও কল দিলো সিদ্বার্থের ফোনে। সময়ের তারতম্যের ফলে আমেরিকায় এখন সদ্য সন্ধা রাত। এই সময়ে সিদ্বার্থ ফ্রি আছে কিনা সেই সম্পর্কে ধারনা নেই ইরার। ধারনা রাখতেও চায়না, সে একবার সিদ্বার্থকে ধন্যবাদ জানাতে চায়।

,,, সিদ্বার্থ তখন স্যুটিং এ ব্যাস্ত,, একটা মোস্ট ফেমাস কোম্পানির মডেল হিসেবে ফটো স্যুট করছে সে। স্যুটিং এর মাঝে হঠাৎ ইরার ভিডিও কল পেয়ে স্যুটিং স্পট ছেড়ে বেড়িয়ে এলো সিদ্বার্থ। ফোনে তাকিয়ে যখন দেখলো ইরাদ ভিডিও কল দিয়েছে তখন যেনো সিদ্বার্থের মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গিয়েছ। সে বোধহয় এরকমটা কল্পনাতেও আশা করেনি,, সিদ্বার্থ অবাক দৃষ্টিতে ইরার দিকে তাকিয়ে,, ঠোঁট ফুরে বেড়িয়ে এলো — মাই লাভ!! তুমি আমায় কল করেছো? এটা কি স্বপ্ন নাকি ভুল? আমার মাথা ঠিক আছে তো?
,,, বলেই মাথায় সিরিয়াস ভাবে দুটো চাপর মারলো,, ইরাদ মুচকি হাসলো,, সাথে সাথে থমকে গেলো সিদ্বার্থ। ইরার হাসিতে প্রান নেই,, মুখটা কেমন তেল চকচক করছে,, ঠোটে কাটা দাগ ফুলে আছে,, কপালের ও একই অবস্থা, চোখটা অসম্ভব ফোলা,, সিদ্বার্থের বুকে কাপন ধরলো। সে বিচলিত কন্ঠে সুধালো — কি হয়েছে ইরাদ? কোথায় আছো তুমি? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেনো?মাই লাভ!!!

,,,, ইরাদ এবার শব্দ করে হাসলো,, হাসিটা তবুও ব্যাথাতুর ঠেকলো। ইরাদ তীব্র অভিমান নিয়ে ভাঙা কন্ঠে আওড়ালো — আমাকে মেরে ফেলার জন্য খুব ধন্যবাদ সিড,, আজ খুব হালকা লাগছে,, জানেন? শুনেছি মানুষ যখন অতিমাত্রায় কষ্ট পায় তখন নাকি সে বেচে থাকে ঠিকি কিন্তু তার দেহে প্রান থাকেনা ,, নিষ্প্রাণ, পাথর হয়ে যায়। অথচ আমাকে দেখুন,, আমার প্রানটা ঠিকি আছে কিন্তু দেহটা নেই,, কি অদ্ভুত না? এরকম একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটানোর জন্য আপনাকে আমার অন্তরের অন্তর স্থল হতে ধন্যবাদ।

,,, পুরোপুরি বাংলা না বুুঝায় সিদ্বার্থ ইরার ম্যাক্সিমাম কথাই বুঝতে পারেনি। তবুও মনে হলো ইরাদ তার কারনে কষ্ট পেয়েছে,, হয়তো ইরাদকে ঠকিয়ে আদি সেজে কথা বলায় ইরাদ এখনো তাকে এসব বলে যাচ্ছে। কিন্তু কি করার? সে তো বার বার ক্ষমা চেয়েছে,, আবারও চাইতে রাজি। সিদ্বার্থ অসহায় চোখে ইরার দিকে তাকালো,, অত্যন্ত কাতর স্বরে বললো — সরি মাই লাভ!! আমি এটা করতে চাইনি,, আমি নিরুপায় ছিল,,,
,,, সিদ্বার্থের কথার মাঝেই থামিয়ে দিলো ইরাদ,, রাগ অভিমান, কষ্ট সবকিছু মিশিয়ে চিৎকার করে বললো– সরি সরি সরি!! সরি মাই ফ্যুট। আপনি আমার লাইফটা হেল করে দিয়েছেন। কি অপরাধ করেছিলাম আমি? ভালোবেসে অপরাধ করেছি ? ভালোবাসা কি অপরাধ? আর কখনো আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবেন না আপনি। সামনেও আসবেন না। আমি আপনার মুখটাও দেখতে চাইনা। আপনি যদি আমায় ভালোবেসে থাকেন তাহলে আর কোনোদিন,, এক মুহুর্তের জন্য ও আমার সামনে এসে দাড়াবেন না। যদি কখনো দাড়ান তাহলে আমার মরা মুখ দেখবেন। ইশ্বর যদি আমায় নাও নেয় তাহলে আমি নিজে আত্মহাতি দিবো,, তবুও আপনার মুখ দর্শন করবো না,, ইশ্বরের কসম!!

,,, বলেই অর্ধভাঙা ফোনটা পাহার থেকে ছুড়ে ফেলে দিলো ইরাদ,, ওপাশের ব্যাক্তিটির অভিব্যাক্তি বুঝার চেষ্টা করলো না। সে হাড়িয়ে যাবে,, অনেক দূরে,, বহু দূরে,, যেখান থেকে কেউ ওকে খুজে পাবেনা। আর কেউ ওকে কাদাতে পারবে না,, ঠকাতে পারবেনা,, যন্ত্রণার অনলে পোড়াতে পারবে না। ইরাদ হাটু মুরে পাহারের কোল ঘেসে বসে পরলো। আজ ফোনের জায়গায় সে থাকতো,, এখান থেকে লাফ দিয়ে মরে যেতো,, শুধু মায়ের জন্য পারছে না। সে ছাড়া যে মায়ের দুনিয়ায় কেউ নেই। সে মরে গেলে মাকে মুক্তি দিবে কে?

,,,, অর্পনার অসুস্থতার খবর শুনে বিকালের দিকে মির্জা বাড়িতে উপস্থিত হয়েছেন আরশাদ জামান। সেই থেকেই মির্জা কর্তিদের আয়োজনের শেষ নেই। রোমানা বেগম নতুন উদ্দমে রান্না বান্না করে আরশাদ জামানকে খাওয়ানোর তোরজোর চালাচ্ছেন,, আরশাদ জামান অবশ্য সচারাচর ভারি খাবার খান না,, ডায়েট কন্ট্রোল করেন তবুও আত্মীয়ের আপ্পায়নে মানা করতে পারলেন না। নিজেও খেলেন সাথে পাশে বসিয়ে মেয়েকেও খাওয়ালেন। খাওয়া দাওয়া শেষে আবদার করলেন মেয়েকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার। অর্পনা বাপের বাড়ি যায়না বহুদিন,, আবার তিনিও ইদানীং খুব একটা ঢাকা থাকেন না। আবার কখন, কোথায় ডিউটি পরে যায় জানা নেই। আরশাদ জামানের আবদারের বিপরীতে আর কোনো কথা বলতে পারলেন না রোমানা বেগম। এমনিতেই ঈদ,, ঈদের পর মেয়ের বাবার বাড়ি যাওয়াটা অতি আবশ্যক। তার উপর তিনি অর্পনাকে নিয়ে বেশ চিন্তিত। যতই উপরে উপরে কঠোর হোক না কেনো মেয়েটার জন্য কাল থেকে উনার অন্তর পুড়ছে। এই মুহুর্তে মেয়েটাকে একটু সুন্দর, সুখের সময় দেওয়া উচিৎ,, এতে করে যদি মনটা ভালো থাকে আর এরকম ভয়াবহ জীবন থেকে নিজেকে বের করে আনতে পারে,, তাহলে উনার থেকে খুশি বোধহয় কেউ হবে না। রোমানা বেগম আপত্তি না করলেও অর্পনা বাধ সেধে বললো — পাপ্পা!! উনাকে আগে জিজ্ঞেস করে নেই,, উনি অনুমতি দিলে তারপর যাবো।

,,, আরশাদ জামান বড্ড অবাক হলেন,, কাউকে কইফিয়ত না দেওয়া মেয়েটাও এখন উনার কাছে যাওয়ার জন্য কারোর অনুমতির আশা করছে। এটা বড়ি আশ্চর্য জনক না? এভাবেই যদি একটু একটু করে সবটা পাল্টে যেতো। অর্পনা শুধু বাহির থেকেই না ভিতর থেকেও একটা স্বাভাবিক জীবন পেতো তাহলে উনার জীবনে আর কোনো আক্ষেপ থাকতো না। আরশাদ জামান মাথা নেড়ে শায় জানাতেই দ্বীপকে ভিডিও কল করলো অর্পনা। দ্বীপ তখন মিটিং এ,, অর্পনা অসুস্থ হওয়ায় ফোন কাছেই রেখেছিলো,, কল ঢুকার সেকেন্ডের মাঝেই কল পিক করলো দ্বীপ । অর্পনা মুচকি হেসে বললো– ফোন নিয়ে বসে ছিলেন নাকি?
,,, ওপাশে স্যুট বুট পরা লোকটার চোখে উদ্যেগ,, সে অসুস্থ বলে আজ কাজে যেতে চাননি,, অর্পনা একপ্রকার জোর করে পাঠিয়েছে। সে এতোটাও অসুস্থ নয় যে কাজ বাজ রেখে বাড়িতে বসে থাকতে হবে। দ্বীপ ফোনে দৃশ্যমান রমনির চোখে তাকিয়ে সুধালো— ঠিক আছো? শরীর খারাপ লাগছে? আমি চলে আসবো?
,,, অর্পনা মাথা নাড়িয়ে না করলো,, বেক ক্যামেরায় আরশাদ জামানকে দেখিয়ে বললে– পাপ্পা এসেছে,, বলছে বাড়ি যেতে,, যাবো?

,,, তুমি যেতে চাও?
,,, গেলে ভালো লাগতো।
,,, ওকে যাও।
,,, আপনি যাবেন রাতে?
,,, দ্বীপ ঠোটে দুষ্ট হাসি ফুটিয়ে এক ভ্রু উচিয়ে বললো
— রাতে?
,,, লজ্জায় অর্পনার গাল দুটো লাল হয়ে উঠলো,, সে চোখ পাকিয়ে শাসালো– থামুন!! কিসব বলেন আপনি!! পাপ্পা আর শাশুমা একটু দূরেই দাড়িয়ে আছে,, শুনলে কি ভাববে?
,,, দ্বীপ নিরুত্তাপ,, তার সামনে যে সবাই তার সিদ্ধান্তর অপেক্ষায় বসে আছে সেদিকে যেনো কোনো খেয়াল ই নেই। সে তো তার বউয়ের লাজুক মুখটা পর্যবেক্ষণ করতে ব্যাস্ত। দ্বীপ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বললো– দোষটা আমার নয় ম্যাম,, দোষটা আপনার!! হাসবেন্ডকে সবার সামনে কল দিতে হয়না,, সেটা জানেন না আপনি?
,,, অর্পনা তীব্র লজ্জায় সামনে আসা চুল গুলো কানের পিঠে গুজে দিয়ে বললো– জানি না!! আর জানতেও চাইনা। সারাক্ষণ কথার উল্টো পাল্টা মিনিং বের করেন আপনি। বলুন না, যাবেন?
,,, দ্বীপ এবার সিরিয়াস হলো,, কন্ঠে আদর মিশ্রিত করে কোমল স্বরে বললো– যাবো,, চিন্তা করোনা। আর হে সাবধানে যেও,, একা থাকবে না। আমি যতক্ষণ না যাবো ততোক্ষণ পাপ্পার সাথে থাকবে। ঠিক আছে?
,,, অর্পনা মাথা নাড়িয়ে শায় জানিয়ে কল কেটে মলিন হাসলো,, লোকটা তাকে সুস্থ করতে কতোকিছু করছে অথচ লোকটা মানতেই রাজি না সে আর কখনো ঠিক হতে পারবে না। এই রোগ সারার নয়,, এই রোগ তার রক্তে মিশে গিয়েছে। সে চাইলেও একটা স্বাভাবিক জীবন পেতে পারবে না। আর না পারবে অতীতের সেই ভয়াঙ্কর দিনগুলোর কথা ভুলতে। যতদিন সেই ভয়ানক সৃতি গুলো মাথায় ঘুরপাক খাবে ততোদিন সে কোনোভাবেই সুস্থ একটা জীবন পাবেনা।

,,, অর্পনাদের ফ্লাটের সামনে এসে গাড়ি থামতেই অর্পনা ধীরে ধীরে নেমে পরলো,, এটা তার আপন বাড়ি,, আপন গলি,, কতোদিন পর এই গলিতে পা রাখলো সে? এই গলিটার বাতাসে কেমন নিজ নিজ একটা ব্যাপার আছে,, শান্তি শান্তি লাগে। আরশাদ জামান গাড়িটা পার্কিং লটে পার্ক করে মেয়ের পাশাপাশি দাড়িয়ে হাতের কনুই এগিয়ে দিলেন,, অর্পনা এক গাল হেসে পাপ্পার কনুইয়ের ভিতর হাত ঢুকিয়ে দিলো। বাবা মেয়েতে কাপল স্টাইলে গট গট পায়ে লিফ্ট এড়িয়ায় পৌছালো। ইতিমধ্যে লিফ্টে মানুষ ভর্তি,, একেবারে উপর তলাতে সোনালী ব্যাংক,, তাই লিফ্ট সবসময় এরকম ভরপুর থাকে। এখন উপরে উঠতে গেলে আবার লিফ্ট নামার জন্য অপেক্ষা করতে হবে কিন্তু অপেক্ষা শব্দটা যে অর্পনার সাথে যায়না। অর্পনা আরশাদ জামানের দিকে তাকিয়ে নাক কুচকালো,, আরশাদ জামান মুচকি হেসে মেয়েকে সবার সামনেই পাজা কোলা করে সিরির দিকে হাটা দিলেন। অর্পনা পাপ্পার গলা জড়িয়ে ধরে গালে চুমু দিয়ে বললো — আমার সুপার হিরো!! চার্জিং পাওয়ার বাড়িয়ে দিলাম,, এবার উড়ে উড়ে চলে যাও।
,,, আরশাদ জামান মাথা নাড়িয়ে উপরের দিকে হাটা দিলেন। এটা আজকের ঘটনা নয়,, অর্পনার বয়স যখন তিন বছর,, সে একদম বাবার কপিক্যাট হওয়ার প্রচেষ্টায়,, তখন থেকেই বাবার থেকেও এক দাপ উপরে ছিলো তার এটিটিউড। সে কোনো মতেই লিফ্টের জন্য অপেক্ষা করতে রাজি না,, অগত্যা মেয়ের ইগুকে প্রাধান্য দিতে প্রতিবার আরশাদ জামান মেয়েকে কোলে নিয়ে সিরি পেরিয়ে ফ্লাটে পৌছাতেন। সেই তিন বছর থেকে আজ ২৩ বছর। এতো বছরে পাপ্পার কাছে অর্পনার মূল্য একটু ও কমেনি,, বরং বাড়তে বাড়তে এখন আকাশ ছুয়েছে। আরশাদ জামান হয়তো আহামরি বড়োলোক নয় কিন্তু উনার আর উনার মেয়ের দুনিয়ায় আরশাদ জামান একজন রাজা আর অর্পনা জামান উনার রাজকন্যা। এক তলা সিরি পারি দিয়ে থেপে গেলেন আরশাদ জামান,, অসহায় কন্ঠে বললেন– পারছি না মাম্মা,, চার্জ কমে গিয়েছে।

,,, অর্পনা বিস্তর হেসে পাপ্পার গালে একসাথে আট দশটা চুমু খেয়ে বললো — এবার?
,,, আরশাদ জামান যেনো হুট করেই তরতাজা হয়ে উঠেছেন,, এমন একটা ভাব নিয়ে এক প্রকার উড়ে যাওয়ার নেয় সিরি বাইতে লাগলো। অর্পনার চোখে ভাসছে ছোট বেলার সৃতি,, যখন পাপ্পা তাকে কোলে নিয়ে উপরে উঠতো আর মাঝপথে দাড়িয়ে গিয়ে চুমু খাওয়ার বায়না করতো তখন মাম্মা পাশে পাশে হাটতে হাটতে বিরক্তিকর কন্ঠে বলতো — বাপ বেটি দুটোই পাগল,, এদেরকে এসাইলামে পাঠানোর ব্যাবস্থা করবো আমি,, নয়তো দুই পাগলের সাথে থাকতে থাকতে আমিও পাগল হয়ে যাবো।
,,, মাম্মা তার কথা রেখেছে,, বাপ বেটি দুজনকেই পাগলা গারদে পাঠিয়েছে। একজন পাগল ছিলো আরেকজন পাগলের সাথে ছিলো। ইসস!! মাম্মাটাও না,, সবসময় এতো সত্যি বলতে হয় বুঝি? এতো সত্যি বলতে নেই। কিছু কিছু সত্যি যে সবার জন্য মঙ্গল জনক হয়না। বাবা মেয়েতে খুনসুটি করতে করতে ফ্লাটের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই তাজ্জব বনে গেলো অর্পনা। এটা তাদের বাড়ি? কি অবস্থা করেছে পাপ্পা। মির্জা বাড়ি আর দ্বীপের পরিপাটি রুমটাতে থাকতে থাকতে এখন তাদের বাড়িটাকে অর্পনার কাছে বন-বাদার মনে হচ্ছে। সে পুরো ঘরটাতে চোখ ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে বললো — ছি বাডি!! তোমার হাউজ এতো নির্জীব কেনো,, আই ডন্ট লাইক দেট। তুমি বাড়িতে থাকো না?

,,, আরশাদ জামান মেয়েকে নিয়ে টি টেবিলে বসালেন,, পায়ের জোতা জোড়া খুলে দিতে দিতে বললেন– আমার হাওজের সকল সৌন্দর্য কেড়ে নিয়ে আমার প্রিন্সেস শ্বশুর বাড়ি চলে গিয়েছিলো তাই আমার হাউজ এতোটা নির্জীব। এবার আমার প্রিসেস চলে এসেছে কিছুক্ষণের মাঝেই বাড়িটা ঝলমল করে উঠবে। ওয়েট এন্ড সি।
,,, বলেই অর্পনার জোতা জোড়া সো-রেকে নিয়ে রাখলো পরপর এগিয়ে গিয়ে ঝানালার থাই খুলে পর্দা সরিয়ে দিলো,, সাথে সাথে উত্তর হতে হরহর করে বাতাস ঢুকলো ভিতরে। অর্পনা উঠে গিয়ে সোফার কবার গুলো ঠিক করে কূসন গুলো ঠিক জায়গায় রেখে দিলো। রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলতেই দেখলো ডিম, গাজর, শসা, ল্যাটুস, এবোকাডো ছাড়া কিছুই নেই। না মাংস আর শাক সবজি। যা বুঝার বুঝে নিলো অর্পনা। সে চলে যাওয়ার পর থেকে পাপ্পা রেগুলার এসব সালাদ, ডিম পোজ খেয়েই দিন কাটায়। অর্পনা রাগী দৃষ্টিতে পাপ্পার দিকে তাকালো,, চোখে মুখে অপরাধী ভাব নিয়ে দাড়িয়ে আছেন আরশাদ জামান। কে বলবে তিনি একজন ডিটেকটিভ? বড়ো বড়ো ক্রাইম রিপোর্ট রিসার্চ করে ক্রিমিনাল খুজে বের করেন? একজন অবোধ বাচ্চা যেমন তার মায়ের কাছে কইফিয়ত দেয়,, আরশাদ জামান তেমন করেই বললেন– গতকালকেই ফ্রিজ খালি হয়েছে,, বিশ্বাস করো। আমি একটু ও অনিয়ম করিনা,, সত্যি!!

,,,, অর্পনা তপ্ত শ্বাস ফেলে আরশাদ জামানের দিকে এগিয়ে এলো,, পাপ্পার হাত ধরে টেনে রাগি কন্ঠে বললো — চলো আজকে একসাথে বাজার করবো,, পুরো একমাসের খাবার রেখে যাবো আমি। তোমাকে আর একটুখানি ও বিশ্বাস করা হবে না আজ থেকে। দিনদিন বখে যাচ্ছো তুমি,, কথা বার্তার পরোয়া করছো না।
,,, আরশাদ জামান মুখ চুন করে মেয়ের সাথে সাথে গেলেন,, মেয়ের হাব ভাবে নিজেকে আসামি বলে মনে হচ্ছে উনার। মেয়েটাকে কিভাবে বুঝাবেন? অর্পনা নেই বলে তিনি এই বাড়িটাতে এক মুহুর্ত শান্তিতে বসতে পারেনা, রান্না করতে ইচ্ছা করেনা,, খেতে মন চায়না। যেদিকে যায় সেদিকেই শুন্যতা। আগে তো আদি ছিলো,, তিনি, আদি আর অর্পনা। তিনজনেতে মিলে খুব সুন্দর একটা সংসার হয়েছিলো তাদের। আদি সারাক্ষণ অর্পনার পিছন পিছন ঘুর ঘুর করতো, অর্পনা বার বার তাকে ইগনর করতো, তীক্ত কথা শুনাতো আবার একসাথে গেইম খেলতো, ঝগড়া করতো, একসাথে শপিং করতো,, রেস্টুরেন্টে যেতো,, রাতবিরেতে বাইক রাইডে যেতো,, অর্পনা জিতলে ফিরে এসে আরশাদ জামানের কাছে নিজের বড়াই করতো আর হেড়ে গেলে আদিকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে বলতো। এক কথায় বলতে গেলে আদি আর অর্পনার খুনসুটিতে পুরো বাড়িটা মেতে থাকতো। অথচ আজ কেউ নেই,, অর্পনার সাথে সাথে আদিটাও কোথায় যেনো চলে গেলো,, যোগাযোগ হয়না বহুদিন। আরশাদ জামান কেনো যেনো আদিকে ঘৃণা করতে পারেনা,, আদি এমন একটা চরিত্র যাকে ঘৃণা করার কথা থাকলেও করা যায়না। আদি হয়তো অতীতে ভুল করেছিলো কিন্তু অর্পনাকে ভালোবাসার বেলায় সেই ভালোবাসার কোনো তুলনা হয়না। আরশাদ জামান স্বীকার করতে বাধ্য,, উনার পরে যদি কেউ অর্পনাকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্রয় দিয়ে থাকে তাহলে সেটা আদি। পাবেনা জেনেও এতোটা পাগলামি করা আদির পক্ষেই সম্ভব। আদি অর্পনাকে যতটা ভালোবেসেছে এতোটা ভালো বোধয় তিনিও মেয়েকে বাসতে পারেননি। আরশাদ জামান নিজ চোখে দেখেছে আদির আহাজারি,, যন্ত্রণা,, কান্না। বহুবার উনার কাছে রিকোয়েস্ট করেছে যেনো অর্পনাকে একটু বুঝায় কিন্তু মেয়েটা বুঝলো না। এতো বড়ো অন্যায় করার পরেও আদির ভালোবাসা দেখে আরশাদ জামান ভাবে রেখেছিলেন মেয়েকে আদির হাতেই তুলে দিবেন কিন্তু নিয়তিতে বোধহয় অন্যকিছু লিখা ছিলো। তাই হয়তো অর্পনা ডায়েরিটা পেয়েছিলো সাথে দ্বীপকেও।

,,,, দ্বীপ যখন ফ্লাটের সামনে এসে কলিং বেল বাজালো,, বাপ বেটি তখন রান্নাঘরে। দুজনেই মাস্টার সের্ফের মতো কিচেন ইউনিফর্ম পরা। অর্পনা কিচেন কেবিনেটের উপর বসে পাপ্পাকে রান্নার নির্দেশ দিচ্ছে আর আরশাদ জামান রান্না করছে। এটাও আজকের ব্যাপার নয় ,, অনেক আগে থেকেই এসব হয়ে আসছে। এভাবেই বছরের পর বছর পাপ্পাকে হেল্পিং হেন্ড বানিয়ে রান্না বান্না করে যাচ্ছে অর্পনা যেমন ভাবে বিহানকে দিয়ে করিয়েছিলো। আজকে তারা বাবা মেয়েতে মিলে একটা নতুন রেসিপি ফলো করে ভুনা খিচুরি রান্না করছে। হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ হতেই নাক কুচকালেন আরশাদ জামান,, অর্পনার দিকে তাকিয়ে বললেন — বিরক্তিকর ছেলেটা চলে এসেছে,, এখন আবার আমার মাম্মাকে নিয়ে টানাটানি করবে। কাবাব-মে হাড্ডি।

,,, অর্পনা শব্দ করে হেসে ফেললো ,, ইস্স!! তার পৃথিবীটা কত্তো সুন্দর। সে ক্যবিনেট থেকে নামতে নিলে আরশাদ জামান বাধা দিলেন,, নিজে থেকেই এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। বাহিরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে,, যার ফলে পার্কিং লট থেকে লিফ্ট এড়িয়ায় আসতে আসতে খানিক ভিজে গিয়েছে দ্বীপ,, তার হাতে ফলমুল,খাবার দাবার। আরশাদ জামানকে দরজা খুলতে দেখে দ্বীপ ও শ্বশুরের মতো নাক কুচকালো। কই ভেবেছিলো বউ এসে দরজা খুলবে,, উড়না দিয়ে ওর ভেজা শরীরটা মুছে দিবে সেই ফাকে দ্বীপ একটু তার বউকে জড়িয়ে ধরবে। নাহ!! তা আর হওয়ার নয়। এমন শ্বশুর থাকলে কোনো জামাই শান্তিতে শ্বশুরের মেয়েকে নিয়ে সংসার পরতে পারবে না। দ্বীপ ঠোঁট নাড়িয়ে বিরবিরালো– কাবাপ-মে হাড্ডি।

,,, আরশাদ জামান সাথে সাথে বললেন– হুম!! একটু আগে আমিও এটাই বলছিলাম।
,,, কি বলছিলেন?
,,, কি আবার? তুমি আমার আর আমার প্রিন্সেসের জীবনে কাবাব-মে হাড্ডি।
,,, দ্বীপ চোখ বাকা করে বললো– পাগলের সুখ মনে মনে।
,,, রেগে গেলেন আরশাদ জামান। হাতে থাকা খুন্তিটা তাক করে বললেন– শুনো ছেলে!! আমি কিন্তু তোমাকে এখনো জামাই বলে মেনে নেই নি।
,,, দ্বীপ কপাল কুচকে বললো– কে যাচ্ছে আপনার জামাই হতে? খারুস শ্বশুর।
,,, আরশাদ জামান আবারও খুন্তি তুলে কিছু বলতে নিবেন তখনি রান্নাঘর থেকে অর্পনার ডাক এলো– পাপ্পা!! গোস্ত পুড়ে কালা ভূনা হয়ে যাচ্ছে তো,, তারাতাড়ি আসো।

,,, আরশাদ জামান চোখ বাকা করে রান্নাঘরে যেতে যেতে বললো — দরজাটা ভালো মতো আটকে এসো।
,,, দ্বীপের মনটা হিংসেয় জ্বলে পুড়ে ছাই হচ্ছে। অর্পনা জানে সে এসেছে অথচ তাকে না ডেকে পাপ্পাকে ডেকে নিলো। এই মেয়ের সাথে আর কথা টথা বলবে না দ্বীপ। যেই বউ স্বামী আসার সাথে সাথে তার বুকে ঝাপিয়ে পরেনা ঐ বউ দ্বীপের চাইনা। সে দরজা লক করে পিজ্জা,বার্গার, ফলমুল সোফায় রেখে হন হন করে অর্পনার রুমের দিকে চলে গেলো। একবার রান্নাঘরে থাকা শ্বশুর আর বউটার দিকে তাকিয়েও দেখলো না। গেলো তো গেলো সাথে রুমে গিয়ে ঠাস করে দরজাটাও লাগিয়ে দিলো। আচমকা শব্দে কেপে উঠলো দুই বাবা মেয়ে,, আরশাদ জামান সেদিকে তাকিয়ে বিরক্তিকর কন্ঠে বললেন — এমন ভাব করলো যেনো আমরা তার বাড়ির ভারাটিয়া আর সাত-আট মাস ধরে তাকে বাড়ি ভারা দেই না। বেয়ারা জামাই!!
,,, অর্পনা খিলখিল করে হেসে উঠলো,, এদের ঝগড়া দেখতে যেমন বিরক্ত লাগে তেমনি তার হাসিও পায়। সে ক্যাবিনেট থেকে লাফিয়ে নেমে বললো — পাপ্পা!! তুমি পোলাওয়ের চালটা দাও,, আমি দেখি গিয়ে ট্যাম্পারেচর কতোটা হাই হয়েছে। বাই!!

,,, আরশাদ জামান মেয়েকে হাত নাড়িয়ে টাটা দিলেন। অর্পনা ছুটে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিলো। নাহ!! সজোরে দরজা ধাক্কা দিলেও সিটকিনি আটকায়নি। অর্পনা ইঁদুরের ন্যায় মুখ ঢুকিয়ে ভিতরের অবস্থা বুঝতে চাইলো। লোকটা বিছানায় বসে রাগে ফোঁস ফোঁস করছে। অর্পনা আস্তে করে দরজা খুলে ধীরে ধীরে ভিতর ঢুকলো। নিজেদের সেফ্টির জন্য দরজাটা আটকে দিয়ে দ্বীপের কাছে এগিয়ে গেলো। ঢিপ স্কাই শার্টটার কাধের অংশ ভিজা। অর্পনা দ্বীপের সামনে এসে দ্বীপের শার্টের বোতামে হাত রাখতেই দ্বীপ হেচকা টানে অর্পনাকে বিছানায় ফেলে দিলো। পরপর ওর উপরে জায়গা দখল করে নিয়ে ইশারা করলো শার্ট খুলে দিতে। অর্পনা শার্টের বোতাম খুলে দিতেই দ্বীপ সেটা খুলে রেখে অর্পনার গলায় মুখ গুজে দিলো। দ্বীপের উন্মাদনায় কেপে উঠলো অর্পনা,, কাপা কন্ঠে সতর্ক বানী ছাড়লো — আ’ম সিক!!

,,,দ্বীপ মুখ তুলে তাকালো– তাতে কি? একটু আদর ও করা যাবেনা?
,,, অর্পনা লজ্জা পেলো,, সে কি না করেছে নাকি? দ্বীপ অর্পনার লজ্জা রাঙা গালে চুমু খেয়ে বললো — পাপ্পার লাইফটা বোধহয় বোরিং ভাবে কাটছে,, এবার একটা ইউনিক কিছুর প্রয়োজন।
,,, যেমন?
,,,, উপরে আসো বলছি।
,, বলেই অর্পনার উপর থেকে সরে বিছানায় গা হেলিয়ে দিলো,, অর্পনা দ্বীপের কথা মতো ওর উপর উঠে বুকে দুহাতের কনুই রেখে কব্জিতে গাল ঠেকিয়ে বললো — এবার বলুন।
,,, পাপ্পাকে একটা বিয়ে দিলে কেমন হয়?
,,, হোয়াট? আর ইউ কিডিং উইথ মি?
,,, নো!! আ’ম নট কিডিং,, আমি শুধু বলতে চাচ্ছি তুমি যেমন আমার সাথে লাইফটা গুছিয়ে নিয়েছো তেমনি পাপ্পার ও কারোর সাথে লাইফটা গুছিয়ে নেওয়া উচিৎ। আফটার অল!! তুমি তো সবসময় পাপ্পার কাছে থাকতে পারবে না,, এমনকি বৃদ্ধ বয়সেও না। যদি পাপ্পাকে আমাদের কাছে নিয়ে রাখতে চাই তাতেও উনি রাজি হবেন না। তোমার বাবা যেই,, কথার আগে ব্যাক্তিত্ব ঝরে।
,,,অর্পনার মুখটা কেমন মলিন হয়ে গেলো,, বুকের বামপাশে চাপা আর্তনাদ। দ্বীপ এখনো উত্তরের আশায় তার দিকে তাকিয়ে। অর্পনা তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো– আমার মাম্মার প্রতি আমার এক আকাশ পরিমান অভিমান দ্বীপ,, কিন্তু তাকে আমি আজো ঘৃণা করতে পারিনি। নিজের মায়ের জায়গায় অন্য কাউকে আমি মানতে পারবো না। এটা অসম্ভব!!

,,, অর্পনার কথাটা পছন্দ হলো না দ্বীপের। অত্যন্ত ব্যাঙ্গাক্তক স্বরে বললো — তুমি কি তোমার ঐ মাম্মার কথা বলছো যে এখন তিন সন্তান আর স্বামী নিয়ে সুখে সংসার করছে? তোমার মাম্মা মেবি বর্তমানে মদিনায় আছে,, স্বামীকে নিয়ে হজ্জ করছে। তার কথাই বলছো কি?
,,, দ্বীপের ব্যাঙ্গাক্তক কথাগুলো অর্পনা বুকে এসে আঘাত হানলো,, ভাঙা কন্ঠে আওড়ালো — মাম্মা খুব হেপি আছে তাইনা?
,,, দ্বীপ অর্পনার ছলছল চোখটা আলতো হাতে মুছে দিলো,, মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো– তুমি চাইলে বেশিক্ষণ থাকবে না। তুমি একবার চাইলে তোমার মাম্মা তিন সন্তানকে ফেলে তোমাদের কাছে চলে আসবে,, বলো চাও? একবার চেয়ে দেখো পূরন করার দায়িত্ব আমার। তুমি যদি মুখ ফুটে আকাশের চাঁদ ও চাও,, সেটা হয়তো আমি তোমায় এনে দিতে পারবো না কিন্তু তোমায় চাঁদের দেশে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে আমার। তুমি মুখ ফুটে যা চাইবে তাই তোমার পায়ের কাছে এনে হাজির করবো আমি।
,,, স্বামির আদরে পুলকিত হলো অর্পনা, চোখ ছাপিয়ে পানি গড়ালো। বুকে পাথর চেপে তিক্ত কন্ঠে বললো– অসম্ভব!! উনাকে আমি কখনোই আমার পাপ্পার জীবনে ফিরতে দিবোনা। উনি আমার পাপ্পাকে জাস্ট ইউজ করেছে,, আমার পাপ্পার বিশ্বাস ভেঙেছে,, নিশ্পাপ ভালোবাসাটা পায়ে মাড়িয়েছো। আই হেইট হার,,

,,, বলেই ফুপিয়ে উঠলো। দ্বীপ অর্পনার মুখ উচু করে চোখ মুছে দিয়ে বললো — লুক ভেলোরা!! আগে তুমি আর পাপ্পা একসাথে থাকতে,, তোমাদের আলাদা একটা দুনিয়া ছিলো। পাপ্পা তোমাকে ঘিরে বাচতো বাট এখন তুমি আমার কাছে। এই সময়টাতে একজন তো প্রয়োজন,, বলো? বর্তমানে পাপ্পা ছন্নছাড়া,, খুব একটা বাড়ি ফিরেনা,, খোজ নিলে দেখবে তিন বেলা খায় ও না। এন্ড মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট ,, রাত্রির আম্মু মানুষটা খুব ভালো। লয়্যাল!! যে অন্যের সন্তানের জন্য এতোটা লয়্যাল হতে পারে,, সে পাপ্পাকে খারাপ রাখবে না। আমি মনে করি সি ডিসার্ভ ব্যাটার দেন মেহমাদ এন্ড পাপ্পা ডিসার্ভ ব্যাটার দ্যান সুস্মিতা কাইসার। উনারা একে অপরের সোলম্যাট হতে পারেন,, আমাদের উচিৎ উনাদের একটা সুযোগ করে দেওয়া।
,,, দ্বীপের কথায় অবাক হলো অর্পনা,, এটা সে কল্পনাতেও আনেনি — আপনি কি কোনোভাবে সুহাসিনী আন্টির জন্য আমার পাপ্পাকে?
,,, হুম!! পাপ্পাই একমাত্র মানুষ যে নির্দ্বিধায় রাতকে মেয়ে বলে মেনে নিবে আর কখনো রাতের আম্মুকে অসম্মান করবে না।

,,, অর্পনা এবার ভাবুক হলো,, দ্বীপের কথাটা ফেলে দিতে পারছে না আবার মন শায় ও দিচ্ছে না। পাপ্পার জীবনে মাম্মা ছাড়া অন্য কেউ ভাবতে গেলেই তার বুক কাপে অথচ মাম্মা ঠিকি সুখে আছে। আজ বাড়ি ফিরে বাড়ির যেই অবস্থা দেখলো তাতে পাপ্পার ছন্নছাড়া জীবন সম্পর্কে ধারনা হয়ে গিয়েছে অর্পনার। এভাবে চলতে দেওয়া ঠিক না। আবার গুছিয়ে দিতে গেলেও যে তার বুকে যন্ত্রনা হবে। অর্পনা কনফিউস্ড,, কি করবে বুঝে পাচ্ছেনা। অর্পনার চোখ মুখ দেখে ওর চুলের ভাজে হাত বুলিয়ে দিলো দ্বীপ,, ঠোঁটে চুমু খেয়ে বললো — এতো প্রেসার নিতে হবেনা,, সময় আছে,, ভাবতে থাকো। ধীরে ধীরে ভেবে তারপর জাননিও।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৭

,,, অর্পনা দ্বীপের গলায় মুখ গুজে দিলো — আপনি আমায় এতোটা বুঝেন কেনো?
,,, আমি না বুঝলে কে বুঝবে? আমার মতো আপন আর কে আছে তর? একটা কথা মাথায় ঢুকিয়ে রাখ অর্পন!” তর আগে পিছে,, ডানে বামে শুধু আমি। আমার আগেও কেউ না আমার পরেও কেউ না। তুই শুধু আমাতেই আবদ্ধ,

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here