৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৭
রুপান্জলি
ঈদের পর আজ পাঁচ দিন কেটে গিয়েছে,, সকাল আটটার ট্রেনে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে ইরাদ,, এখন বাজে বিকাল সারে চারটা। মাত্রই ট্রেন থেকে নামলো। অন্যান্য সময় তাকে বড়ো ভাইজান নিতে এলেও আজ কেউ আসেনি। সেই শাতাস রোজার পর থেকে আজ ৮ দিন যাবত বাড়ির কারোর সাথে কথা হয়নি তার,, ঈদের আগের দিন অবশ্য মায়ের সাথে কথা হয়েছিলো এরপর আর কথা হয়নি। ২৭ রোজার দিন আব্বু নাকি আম্মুর সাথে তার ঢাকা থাকা নিয়ে তীব্র রাগারাগি করছেন,, কেনো সে মুসলিমদের সাথে ঈদ পালন করবে? মুসলিম রা তো তাদের কোনো অনুষ্ঠানে অংসগ্রহন করেনা?
তাহলে সে খ্রিস্টান হয়ে কেনো করবে? ইরাদের আব্বু বেশ ধর্ম ভীরু মানুষ হওয়ায় গতো চার বছর যাবতই ঈদের সময়টাতে বাড়িতে এরকম ঝামেলা হয়ে থাকে,, ইরার বাবা তাকে বার বার বাড়ি ফিরে যেতে বলে,, কিন্তু ইরাদ যায় না। তার কাছে বাবা মা যেমন ইম্পর্ট্যান্ট তেমনি বন্ধু বান্ধব ও ইম্পর্ট্যান্ট,, বন্ধুরা তাকে ঈদের সময়টাতে পাশে চায়,, সে কিভাবে তাদের উপেক্ষা করবে? আর এমনিতেও মুসলিমরা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের অনুষ্ঠানে এটেন্ড করেনা,, এতে তাদের ধর্মকে অপমান করা হয়,, খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে ও তাই কিন্তু ইরার কিছু করার নেই। সে বন্ধু বান্ধবের সাথে সময় কাটানোর লোভটা সামলাতে পারেনা। আর কতোদিন ই বা তারা একসাথে আছে? এই তো সামনের বছর সেমিস্টার ফাইনাল,, তারপর আর বছর দুইয়ের পড়া এরপর তো তারা ঠিকি আলাদা হয়ে যাবে। হয়তো যোগাযোগ থাকবে,, মাসে কিংবা ছয়মাসে একবার দেখা হবে কিন্তু এভাবে একসাথে আড্ডা দেওয়া হবে না,, পথ চলা হবেনা,, একে অপরকে দেখা হবেনা। মুলত,, সময় থাকতে বন্ধু বান্ধবের মূল্য দেওয়া উচিৎ,,, সময় পেরিয়ে গেলে সব থাকবে শুধু বন্ধুরা ছাড়া।
,,, ইরা একটা গরু গাড়ি ডেকে উঠে পরলো,, ইরাদের বাড়ি এখান থেকে চার কিলোমিটার দূরে,, পুরোটাই উচু নিচু মাটির রাস্তা,, অন্যান্য জানবাহন চলাচল করা কঠিন। আঞ্চলিক বিবাদের কারনে কেউ রাস্তা ঠিক করতে রাজি নয়। বহু আগে একবার সওদাগররা রাস্তা ঠিক করেছিলো কিন্তু পরদিন সকাল হওয়ার আগেই তালুকদার-রা রাস্তা ভেঙে বালি, সিমেন্ট, কনা লোপাট করে রাস্তার যা তা অবস্থা করে রেখেছিলো। সে নিয়ে সওদাগর আর তালুকদারদের মাঝে তীব্র মারামারি বাধে,, তার কিছুদিন পর তালুকদাররা রাস্তা ঠিক করলে সওদাগর রাও একই কাজ করে। একজন দেশ সেবা করে মানুষের কাছে ভালো হতে চাইলে অন্যজনের তা সহ্য হয়না। সবসময় কে কিভাবে কাকে নিচে ফেলে উপরে উঠা যায় সেই কল্পনা করে। মোট কথা ইরাদদের অঞ্চলে দুটো কথাই চলে,, হয় মারামারি আর নয়তো কোপাকোপি।অগত্যা দু-দলের যাতাকলে পরে এই রাস্তা আর কোনো কালেই ঠিক হয়নি তাই আপাতত গরুর গাড়ি ই ভরসা। উত্তরে আবার একটা রাস্তা রয়েছে,, সেদিক হতে সোজা সিলেট শহরে ঢুকা যায় কিন্তু সময় লাগে ভীষণ,, সাথে যেহেতু বাড়ির গাড়ি নেই সেহেতু গরুর গাড়ির পথ ই বেছে নিলো ইরাদ। পথিমধ্যে হঠাৎ করেই গাড়ি থামালেন গাড়োয়ান,, তালুকদারদের বড়ো ছেলেকে সামনে দেখে সালাম দিলেন,, ইরাদ তাকালো না সেদিকে। তালুকদারদের ছেলে বহুদিন তার পিছু পিছু ঘুরঘুর করেছিলো,, ধর্ম আলাদা হওয়া সত্তেও পিছন ছাড়েনি,, ইরাদ অবশ্য আবুর কাছে বিচার দিয়েছিলো। সে নিয়ে আবার তুমুল মারামারি, কাটাকাটি হয়েছিল। এখন লোকটা বিয়ে করে এক বাচ্চার বাপ,, তারপরেও তাকে দেখলে কেমন করে যেনো তাকিয়ে থাকে। ইরাদ বুঝে না ছেলেরা তার এই কালো চামড়ায় কি পায়? এতো ঘুরঘুর করে কেনো?
টানা ৩০ মিনিটের মাথায় সওদাগর বাড়ির সামনে এসে গরুর গাড়ি থামলো। ইরাদদের বিশাল বড়ো অট্টালিকা,, ইট রঙা দু তলা বাড়ি যার ধৈর্ঘ প্রস্থ বিশাল,, ইরাদ সঠিক জানেনা এটার পরিমাপ কতটুকু শুধু জানে এটা তার বড়ো আব্বু তৈরি করেছিলেন। গেইটে গরুর গাড়ি থামতেই দাড়োয়ান ইরার দিকে কেমন করে যেনো তাকিয়ে রইলো,, চোখে কিছুটা বিষ্ময়, ভয় আর কাতরতা। তিনি কন্ঠে তীব্র মলিনতা ঢেলে বললেন–
,,, জাহিন মামনি আপনি এখানে? ফিরে যান,, আপনার বাড়ির ভিতরে যাওয়া উচিৎ হবে না। দাদা সাহেব রেগে আছেন। যেদিন দাদা সাহেব আপনাকে ফোন করে বাড়িতে আসতে বলবে সেদিন আসবেন।
,,, ইরাদ তপ্ত শ্বাস ফেলে কাধ বেগ থেকে গাড়োয়ানকে টাকা দিয়ে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো — আপনার দাদা সাহেব সবসময় ই রেগে থাকেন। ঈদ আসলে তো তার রাগ আকাশ ছোয়া হয়,, এসব আমাকে কখনো আমলে নিতে দেখেছেন? আপনার দাদাসাহেব সওদাগরের বংশধর হলে আমিও সওদাগর বংশের মেয়ে। আমার সাথে রাগারাগি করা এতো সহজ নয়,, চিনেন তো আমি কেমন? নাকি?
,,, বলতে বলতে ভিতরে ঢুকে গেলো মেয়েটা,, দাড়োয়ানকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলো না। এতো ঘন্টা ট্রেন জার্নির পর বড্ড ক্লান্ত লাগছে। এখন ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আবার আব্বুকে মানাতে হবে। গেইট পেরুতেই সারি সারি সাদা পোশাক ধারী গার্ডদের দেখতে পেলো, নাহ!” এগুলো গার্ড না,, এদেরকে মার্ডার মেশিন বললেও ভুল হবে না,, একেকটার চেহারা পুরো ডাকাতের মতো। তার বাপ ভাইয়ের ইশারা পেলে খুন করতেও দুবার ভাবে না। ইরাদের দিকে গার্ডরা কিছুটা অস্বাভাবিক ভাবেই তাকিয়ে আছে,, চোখ রাঙালো ইরাদ,, সাথে সাথে গার্ডগুলো মাথা নত করে নিলো। এটা বরাবরই হয়,, ইরা তার বাবা ভাইয়ের এই উদ্বড আচরন সহ্য করতে পারেনা। আর এই বিষয়ে গার্ডরা অবগত এবং বহুবার ইরার রাগের শিকার হয়েছে তারা। যার ফলে চোখ নত করার জন্য ইরার চোখ রাঙানি ই যথেষ্ট। ইরাদ কাধ বেগটা কাধ থেকে সরিয়ে পিঠে রেখে হেলতে দুলতে বাড়ির ভিতর যেতে নিলো,, ঢাকা শহরে বন্ধু বান্ধবের সাথে সে যেমনি হোক,, বাড়িতে বেশ চঞ্চল আর রগচটা। চলতি পথে হুট করেই ইরার পদ যুগল থেমে গেলো। তার কানে বাজছে বাইবেল পাঠের শব্দ,, খুব একটা ভরকালো না ইরাদ। আব্বু প্রায়শই বাড়িতে শান্তি সভা বসান,, তখন ফাদার বাইবেল পাঠ করেন।
অগত্যা আবারও সামনে পা বাড়ালো,, বাড়ির কাছাকাছি আসতেই বাড়ির এক পাশে একটা সমাধি দেখতে পেলো। ইরাদের ভিতরটা কেপে উঠলো । এটা কার সমাধি? কি হয়েছে বাড়িতে? কেউ কি মারা গিয়েছে ? আর ভাবতে পারলো না মেয়েটা,, ছুটে গেলো সদর দরজার দিকে,, ইশ্বরের কাছে তীব্র প্রার্থনা করলো যেনো তার অনুপস্থিতিতে কোনো অঘটন না ঘটে। তবে বাড়ির ভিতরে ঢুকে হল রুমে পা রাখতেই ইরাদের পা যুগল দ্বিতীয় বারের মতো থমকে গেলো। ফাদার এক ধ্যানে বাইবেল পাঠ করছে,, একপাশে বসে আছে ইরাদের বড়ো ভাই,, আরেকপাশে বাবা,, মা নেই,, চাচিরাও নেই,, চাচাতো বোনেরাও নেই তবে তার নিজের দুই ভাই, চাচাতো তিন ভাই আর দুই চাচা বসে আছেন। তারা মনোযোগ দিয়ে বাইবেল পাঠ শুনছে,, সামনে বড়ো করে রাখা ছবিটির দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো ইরাদ। তার জন্য বাড়িতে শোক সভা পালন করা হচ্ছে আর সেই কিনা জানেনা? তার পরিবার তার ছবিতে মালা ঝুলিয়ে রেখেছে অথচ সে এখনো দিব্যি বেচে আছে। ইরাদের মাথা কাজ করা বন্ধ,, সাথে মনের মাঝে প্রশ্ন জাগলো। তাহলে বাড়ির বাহিরে ঐ সমাধিটা কার? ইরাদ আর এক পল দাড়ালো না,, উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে গেলো বাহিরের দিকে। একদম সমাধির কাছে গিয়ে ইরাদের পদযুগল থামলো,, সে অবাক লোচনে সমাধির নেইম প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইলো।
মৃতঃ রুমজাহিন সওদাগর ইরাদ।
পিতা: ইমানুয়েল সওদাগর
মৃত্যুর তারিখঃ ২২-৩-২০২৬
,, রাগ, বিস্ময়, কষ্ট, অভিমানের মিশেলে সমাধির নেমপ্লেটের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মেয়েটা। আবারও উল্টো ঘুরে বাড়ির ভিতর গেলো,, এমনটা কেনো করা হচ্ছে তার সাথে? সে জীবিত থাকা সত্ত্বেও তার ছবিতে কেনো মালা উঠানো হলো? আর সমাধির ভিতরেই বা কে? লাশ ছাড়া সমাধি দেওয়া যায় বুঝি? কই এর আগে তো এমন নিয়ম কোনো বইতে পায়নি ইরাদ।
,,, পরশীর ডাকাডাকিতে নিচে নেমে এলো অর্পনা,, এতোক্ষণ তীব্র মাথা ব্যাথা নিয়ে শুয়ে ছিলো,, দ্বীপ সকালে অফিসে গিয়েছে এখনো পর্যন্ত একটা কল করেনি,, যাওয়ার সময় ই বলে গিয়েছিলো আজ চারটা ক্লায়েন্ট মিট রয়েছে,, সাথে বড়ো চাচ্চুর দলীয় অফিসে রাজনীতিক আলাপ চারিতাও রয়েছে। তাই খুব বিজি থাকবে, কল দিতে পারবে না। অর্পনার অবশ্য তখন প্রবলেম ছিলো না কিন্তু যখন দুপুরেের পর শরীরের তাপমাত্রাটা টুকু বাড়লো আর মাথায় ব্যাথা শুরু হলো তখন থেকেই দ্বীপের জন্য মন পুড়ছে। লোকটার আদর ভালোবাসা পেতে পেতে অর্পনার বেশ বদ অভ্যেস হয়ে গিয়েছে,, এখন শরীরটা একটু খারাপ হলেই মনটা লোকটার বুকে মুখ গুজার বায়না ধরে। লোকটার খরখরা হাতের কোমল স্পর্শ পেতে মাতোয়ারা হয়ে উঠে। অর্পনার খুব কাদতে মন চাচ্ছে,, একটাবার পাপ্পার কাছে যেতে পারলেও ভালো লাগতো। সে শিউর কিছুক্ষণের মাঝেই তীব্র জ্বরে কাতর হয়ে পরবে সে। অর্পনার জ্বর তো বেশ মারাত্মক,, হুসে থাকে না ,, উল্টো পাল্টা বকে,, পেটের কথা সব মুখে চলে আসে,, এই সময়টাতে পাপ্পা কিংবা দ্বীপ ছাড়া অন্য কারোর কাছে থাকাটাও বেশ ভয়ানক ব্যাপার সেপার৷ সে কি থেকে কি বলে ফেলবে তখন আবার আরেক ঝামেলা। আর ভাবতে পারলো না অর্পনা,, মাথাটা দু আঙ্গুলে চেপে ধরে সোফায় বসলো। ভাবিকে আসতে দেখেই পরশী ছুটে রান্নাঘরে গেলো,, হাতে করে দুটো প্লেট নিয়ে অর্পনার কাছে হাজির হলো,, একটা প্লেট এগিয়ে দিয়ে বললো —
,,, নাও ভাবি!! আমি নিজ হাতে বানিয়েছি।
,,, অর্পনা মাথা থেকে হাত সরিয়ে প্লেটের দিকে তাকালো,, চাওমিং বানিয়েছে পরশী,, বেশ সুন্দর হয়েছে কিন্তু তার খেতে ইচ্ছা করছে না। অর্পনা প্লেট টা নিয়ে টি টেবিলের উপর রেখে বললো — আমার খুব মাথা ব্যাথা করছে পরশ,, পরে খাবোনে ঠিক আছে?
,,, পরশীর কিছুটা মন খারাপ হলো,, বড়ো ভাবি,, মেঝো ভাবি পছন্দ করে বলে সে ইউটিউব দেখে দেখে বানালো আর ভাবিরা কেউ খাবেনা? মেঝো ভাবি ঘ্রান নিতে পারেনা সেটা নাহয় মানা যায় তাই বলে বড়ো ভাবিও প্রত্যাক্ষান করে দিলো? পরশীর মন খারাপ দেখে প্লেটটা তুলে নিলো অর্পনা,, ননদের মন রাখতে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বললো — মন খারাপ করতে হবেনা,, খাচ্ছি।
,,, সাথে সাথে পারশীর মন ভালো হয়ে গেলো। সেও ভাবির পাশে বসে টিভিতে গোপাল ভার প্লে করে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। অর্পনা রয়েসয়ে এক চামচ মুখে দিতেই মুখটা কেমন তেতো হয়ে উঠলো,, ভেতর থেকে টকটক অনুভত হচ্ছে। তবুও বহু কষ্টে তিন, চার চামচ খেয়ে পরশীর দিকে তাকালো,, মেয়েটার মন খারাপ হবে ভেবে আরও এক চামচ মুখে নিলো। রোমানা বেগম ওদের সামনেই খাবার টেবিল গোছাচ্চিলেন,, দুপুরে সবার খাওয়া দাওয়া শেষে মেইডরা সব ধুয়ে রেখেছিলো এখন সেগুলোই জায়গা মতো রাখছেন। অর্পনা নিচে নামতেই ওর দিকে তাকিয়েছিলো একবার,, চোখ মুখ শুকনো,, দেখেই মনে হচ্ছে তীব্র অসুস্থ। রোমানা বেগম কাজ ফেলে এগিয়ে এলেন,, অর্পনার কপালে গালে হাত রাখতেই বুঝলেন মেয়ের জ্বর উঠেছে,, শরীরের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বারন্তের পথে,, এক কথায় সেকেন্ডের গতিতে তাপমাত্রা বাড়ছে,, চোখ দুটো কেমন ঘোলাটে হয়ে উঠছে। হঠাৎ গালে গলায় নরম আর শীতল হাতের স্পর্শ পেয়ে কেপে উঠলো অর্পনা,, চোখ উচিয়ে শ্বাশুড়িকে দেখে মুচকি হেসে বললো — কি হয়েছে শাশুমা? কিছু বলবেন?
,,, রোমানা বেগম কিছু বললেন না,, অর্পনার হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে টি টেবিলে রেখে পারশীর উদ্দেশ্যে বললেন — পরশ,, যাও,, এক গ্লাস পানি নিয়ে আসো, সাথে বাটিতে করেও পানি আনবে। তারপর আমার ঘরে গিয়ে তেলের বোতল সাথে প্যারাসিটামলের পাতাটাও নিয়ে এসো।
,,, অর্পনা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে শ্বাশুড়ির দিকে তাকিয়ে। পরশী বিরক্ত হলো,, মা কি দেখতে পাচ্ছে না সে যে খাচ্ছে? তাও তাকে দিয়ে কাজ করাবে। কিন্তু মায়ের ভয়ে কিছু বলতে পারলো না,, প্লেটটা রেখে ছুটে গিয়ে খাওয়ার টেবিল থেকে গ্লাস এবং বাটি দুটোতে করেই পানি নিয়ে এলো। রোমানা বেগম অর্পনার পাশে বসে এলোমেলো চুল গুলোতে হাত বুলালেন। পরশী পানি এগিয়ে দিতেই তিনি পানিটা অর্পনার মুখের সামনে ধরলেন। অর্পনা বোকার মতো তাকিয়ে রইলো,, হুস হাড়াচ্ছে সে,, রোমানা বেগম হালকা ধমকের স্বরে বললেন — খাচ্ছো না কেনো? পরশী দাড়িয়ে আছো কেনো? রুম থেকে কি আনতে বললাম? পিঠে দু ঘা দিলে কথা শুনবে?
,,,, মায়ের মুখে দু ঘা দেওয়ার কথা শুনে বাতাসের গতিতে হাওয়া হয়ে গেলো মেয়েটা,, পরশীটা তার মাকে খুব ভয় পায় আর মায়ের এই দু-ঘা কে তো চরম ভয় পায়। রোমানা বেগম শাড়ির আচল খানা বাটিতে ডুবিয়ে, তারপর চিপে নিলেন। অর্ধ ভেজা কাপরটা অর্পনার কপালে, গালে ঠেকাতেই অর্পনা একটা শক্ত পোক্ত ঢোক গিললো,,কাপা স্বরে বললো — আপনি আমার সাথে এমন করছেন কেনো শাশুমা?
,,,, রোমানা বেগম ভেজা আচল দিয়ে অর্পনার মুখ, গলা, হাত মুছে দিতে দিতে গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন — কি করেছি শুনি? তোমাকে মেরেছি আমি?
,,, অর্পনা রোমানা বেগমের হাতটা ধরে ফেললো,, উঠে যাওয়ার চেষ্টা করলে আটকে দিলেন রোমানা বেগম। অর্পনা নিষেধাজ্ঞা ঝারি করে বললো– আমার এসব লাগবে না,, আ’ম ওকে।
,,, দেখতে পাচ্ছি মা!! আপনি যে কতো ওকে আছেন,, সেটা চোখ মুখ দেখলেই বুঝা যায়। আপাতত চুপ করে বসে থাকেন আর শ্বাশুরিকে একটু মান্য করুন। কাল থেকে নাহয় আবার অবাধ্যতা করবেন। আপনার আবির্ভাব ই তো হয়েছে অবাধ্যতা করার জন্য।
,,, অর্পনা বিরক্ত,, চরম বিরক্ত। এসব মা মা অনুভূতি তার ভালো লাগেনা। তার তো মা চাই না,, যা পেয়েছে অনেক পেয়েছে। মায়েরা ভালো হয়না,, আগে আদর দেয় তারপর ছেড়ে চলে যায়। পরশী এক হাতে তেল অন্য হাতে ঔষধের পাতা আর চিরুনি নিয়ে হাজির হলো। সবকিছু টি টেবিলের উপর রেখে আবারও নুডলস এর প্লেট নিয়ে সোফায় বসলো। রোমানা বেগম আচলটা বাটিতে ভিজিয়ে ঔষধের পাতা থেকে একটা ট্যাবলেট এগিয়ে দিলেন। অর্পনা ততোক্ষণে পুরোপুরি হুস হাড়িয়েছে,, সে অচেতন প্রায় মানুষের মতো আওড়ালো — একটায় কাজ হবে না,, চার- পাঁচটা দিন।
,,, হঠাৎ করে অর্পনার কন্ঠের পরিবর্তন শুনে অবাক হলেন রোমানা বেগম — কেনো? সবাই তো একটাই খায়,, কাজ ও হয় তাহলে তোমার কেনো হবে না?
,,, অর্পনা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে খানিক হাসলো,, মুহুর্তেই কেদে দিলো,, আবার দুহাতে চোখের পানি মুছে লম্বা শ্বাস টেনে সোফার পিছনে মাথা হেলিয়ে দিলো,, শরীর তীব্র হাড়ে কাপছে। — আমিতো মাঝে এক বছর পাগল ছিলাম,, তখন অনেক ঔষধ খেতে হতো। এত্তো এত্তো ডিপ্রেসনের ঔষধ খেতাম,, এখনো খেতে হয়। আমার তো তখন ঘুম হতো না,, বাজে দৃশ্যগুলো চোখে ভাসতো। তাই ঘুমানোর জন্য ইচ্ছা করেই অনেক গুলো ঘুমের ঔষধ খেতাম। ঐ ঔষধ খেতে খেতে এখন আর অল্প ঔষধে কাজ হয়না,, বেশি খেতে হয়।
,,, অর্পনার কথায় যেনো বিশ্ময়ের চুড়ায় পৌছালেন রোমানা বেগম,, উনাকে দ্বীপ একবার বলেছিলো অর্পনা কলেজ লাইফে ট্রমাটাইস্ড ছিলো বাট পাগল ছিলো? এটা কিভাবে সম্ভব? রোমানা বেগম সন্দেহি কন্ঠে সুধালেন– তুমি আগে পাগল ছিলে? কি হয়েছিলো তোমার? কেনো পাগল হয়েছিলে?
,,, অর্পনা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো– আমি বলবো না,, অর্পনা কাউকে এসব বলেনা,, শুধু মাম্মাকে বলবে,, যখন মাম্মা অর্পনার কাছে আসবে তখন।
,,, বলতে বলতে কেদে দিলো অর্পনা,, রোমানা বেগমের মন নরম হয়ে এলো,, বুঝলেন অর্পনার সাথে হয়তো ভালো কিছু হয়নি। অগত্যা টিভি দেখতে থাকা পরশীকে ধমকে ধামকে রুমে পাঠিয়ে দিলেন পরপর অর্পনার কথা মতো তিনটে প্যারাসিটামল খাইয়ে দিলো ওকে। অর্পনা তখনো কাদছে,, রোমানা বেগম অর্পনার চোখ মুছে দিয়ে কন্ঠে আদর ঢেলে বললেন– আমিও তো তোমার মা,,আমাকে বলো,, কি হয়েছিলো? কেনো আমার অভদ্র বউমাটা পাগল হয়ে গিয়েছিলো? কোন দৃশ্যগুলো আমার মাকে এতো জ্বালাতন করতো? বলো।
,,, অর্পনা শব্দ করে ফুপিয়ে উঠলো,, মনের কথা গুলো মুখে চলে আসে বলে যেই জ্বরকে মেয়েটা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। সেই জ্বরের তোপেই শ্বাশুড়িকে সব বলে দিলো। সেই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটা প্রকাশ করলে আজ। অর্পনা মলেস্ট হওয়ার পর ওর শরীর এতোটাই ক্ষতবিক্ষত ছিলো যে পুরো ১ মাস তাকে হসপিটালে রাখতে হয়েছিলো। এর মধ্যে আটদিন তার হুস ছিলো না। সেদিন রাতে সেই তিন জনের মধ্যে একজন সেডিস্ট ছিলো,,( যে ব্যাক্তি অন্যকে আঘাত করার মাঝে আনন্দ খুজে পায় তাকে সেডিস্ট বলে) সেই লোকটা নিজের খায়েস মিটাতে অর্পনার শরীরে ব্লেড দিয়ে একটার পর একটা আ*চর কেটেছিলো,, অর্পনা যখন তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলো তখন তাদের ঠোঁটে ছিলো তৃপ্তির হাসি। একপর্যায়ে মনের আনন্দ বাড়ানোর খাতিরে অর্পনার শরীরের চামড়া কাটতেও দ্বিধা বোধ করেনি পশুগুলো ,, পা দিয়ে পিষে দিয়েছিলো অর্পনার সংবেদনশীল স্থান । সময়টা কয়েক মিনিটের ছিলো না,,
ঘন্টাখানিকেরো বেশি সময় ধরে অর্পনার শরীরটা ক্ষত বিক্ষত করা হয়েছিলো। হাত আর পায়ের পাতা ব্যাতিত এমন কোনো স্থান বাকি ছিলো না যেখানে ব্লেটের আচর পরেনি,, সেই বৃষ্টি মুখর রাতে এক নিশ্পাপ কিশোরির রক্ত বয়ে গিয়েছিলো বৃষ্টির পানিতে,, যার জায়গা হয়েছে ঢাকার রাস্তার এক পাশে বয়ে চলা নর্দমার ড্রেনে। অর্পনা নিজের চোখে নিজেকে শেষ হতে দেখে এই শকটা নিতে পারেনি,, প্রথম দিকে নির্জিব পাথরের ন্যায় তাকিয়ে থাকতো। এর মধ্যে রেগুলার চেক আপ,, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে অর্পনা ধীরে ধীরে পাগলামি শুরু করে দেয়।
মা মা বলে চিৎকার করা ব্যাতিত আর কোনো কথাই মুখ দিয়ে বের হতো না,, আরশাদ জামানকে দেখলে হসপিটালের জিনিস পত্র ছুড়ে মারতো। টানা একমাস হসপিটালে থাকার পর যখন তাকে হসপিটাল থেকে এসাইলামে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়,, এবং জানানো হয় অর্পনা বর্তমানে ম্যাসোকিস্ট এ পরিনত হয়েছে। ( যে ব্যাক্তি নিজেকে কষ্ট দিয়ে,, আঘাত করে আনন্দ পায় তাকে ম্যাসোকিস্ট বলে) তখন এরুপ কথা শুনে আরশাদ জামানের মাথা কাজ করা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়,, কি থেকে কি করবেন ভেবে পান না। উনার হাসি খুশি মেয়েটার নিয়তি,, এতোটাও খারাপ হওয়ার কথা ছিলো না। এরপর অর্পনাকে প্রাইভেট অ্যাসাইলোমে ভর্তি করানো হয় সেখানে আরও বেশি পাগলামি করে অর্পনা। যে কাছে যায় তাকেই আঘাত করে,, কাউকে কাছে না পেলে নিজেই নিজেকে আঘাত করতো,, হাত পায়ে কা*মড়াতো আর মা মা বলে চেচাতো,, কামরের পরিমান এতোটাই প্রখর ছিলো যে চামড়া কেটে মাংসল অংশ পর্যন্ত দেবে যেতো। মেয়েকে মা মা করতে দেখে আরশাদ জামান বার বার সুস্মিতা কাইসারকে অনুরোধ করেছিলো একবার মেয়ের কাছে আসতে।
একবার এসেছিলেন তিনি,, তখন অর্পনাকে দেখতে খুব ভয়ানক লাগতো,, বারবি কাট করা চুলগুলো তখন পিঠ ছুয়েছে,, সেই চুল এলোমেলো হয়ে চোখ মুখ ঢেকে রাখতো। চুলের ফাকে এক জোড়া চোখ দেখা যেতো যা কান্না আর পাগলামির ফলে লাল হয়ে থাকতো। পুরো শরীরে কাটা ছেড়ার দাগ,, শরীরের বস্ত্র টুকু ও ঠিক ছিলো না। সুস্মিতা কাইসার ভয়ে আর মেয়ের কাছে যায়নি,, অর্পনা বহুবার মাম্মা মাম্মা বলে ডেকেছেন কিন্তু যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি মহিলা। এরপর থেকে অর্পনার অবস্থা আরও খারাপ হয়,,এক পর্যায়ে তাকে শিকল দিয়ে বেধে রাখা হয়,, এমন ভাবে বাধা হয় যেনো মুখের কাছে শরীরের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ না পৌছাতে পারে। পিছন থেকে চুল বেনি করে দেওয়ালের সাথে আটকে রাখা হতো যেনো অর্পনা মাথা নামাতে নিলে চুলে টান পরে, আর নিজেকে আঘাত করতে না পারে। এসাইলামের ডক্টরদের এরকম পাষানতা দেখে আরশাদ জামানেরও পাগল প্রায় অবস্থা। উনি মানতেই পারছিলেন না উনার মেয়ে একটা ম্যাসোকিস্ট। আরশাদ জামান এমন একজন বাবা,, যে মেয়েকে সুস্থ করতে নিজেকে সেচ্ছায় মেয়ের কাছে ছেড়ে দিয়েছিলেন। অর্পনা অগনিতবার আরশাদ জামানকে রে*পিস্ট ভেবে আঘাত করেছে,, উনি সহ্য করেছেন। চোখের সামনে মেয়েকে নিজের শরীর আঘাত করতে দেখেও আটকাননি বরং মেয়েকে শান্ত করতে আরও প্রশ্রয় দিয়েছেন। অর্পনা নিজের শরীরের রক্ত দেখলে খুশি হতো,, রক্ত ঝড়ার সময় শরীরে যেই যন্ত্রণা হয়,, এই যন্ত্রণায় তার মাথার যন্ত্রণা কমে আসতো,, শান্ত হয়ে যেতো। অর্পনাকে সুস্থ রাখার একটাই উপায় তাকে নিজেকে আঘাত করতে দেওয়া,, আর তার বিপরীতে কোনো কথা না বলা। এরপর থেকে এটাই হলো অর্পনার রেগুলার অভ্যাস,, যেই অভ্যাসটা আজ চার বছরের মাথায় এসেও কমেনি। অর্পনার অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে সে হাত পা কেটেও ঠান্ডা মাথায় ঘুরে বেড়াতে পারে,, শরীরে ব্যাথা অনুভব হয়না। যতটা অনুভব হয় সেই ব্যাথা তাকে শান্তি দেয়।
(যারা দ্বিতীয় পর্ব পড়েছেন,,খেয়াল করুন,, দ্বিতীয় পর্বে যখন অর্পনা হাত কেটেছিলো বিষয়টা আদি আর আরশাদ জামান স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছিলো। এর কারন অর্পনা একজন ম্যাসোকিস্ট)
,,, বর্তমানে অর্পনার শরীর এতোটাই ক্ষত বিক্ষত যে,, যেদিন অর্পনা আর দ্বীপ গভীর ভাবে মিলিত হয়েছিলো সেদিন অর্পনার উন্মুক্ত বুকে মুখ গুজে ফুপিয়ে কেদেছিলো দ্বীপ,, প্রতিটি ক্ষতের দাগ এখনো স্পষ্ট,, কিছু দাগ তরতাজা,, কিছুটা দু-তিনদিন আগে করা। অর্পনা দ্বীপের কান্না দেখে প্রথমে ভেবেছিলো দ্বীপ বোধহয় তার ক্ষত বিক্ষত শরীরটা নিয়ে অসন্তুষ্ট,, কিন্তু অর্পনাকে অবাক করে দিয়ে দ্বীপ যখন ফোঁপাতে ফোপাঁতে ওর শরীরের প্রতিটি ক্ষততে উষ্ঠ ছুইয়েছিলো তখন মেয়েটাও ডুকরে কেদে উঠেছিলো। সেদিন তাদের মাঝে কোনো কথা হয়নি,, কেউ কাউকে থামতে বলেনি,, কেউ কাউকে শান্তনাও দেয়নি শুধু মন খুলে কেদেছিলো। অর্পনা জানে সে একটা ম্যাসোকিস্ট,, বুঝে এগুলো করা ঠিক না কিন্তু কিছু করার নেই। নিজের রক্ত দেখার ক্রেবিংস উঠলে সে নিজেকে সামলাতে পারেনা।
,,, বলতে বলতে থেমে গেলো অর্পনা। কাদতে কাদতে চোখ মুখ লাল হয়ে গিয়েছে,, সে আবছা চোখে সুস্মিতা কাইসারকে দেখতে পেলো,, যাকে দেখে না আজ বহুদিন। অর্পনা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো,, রোমানা বেগমের কাধে কপাল ঠেকিয়ে অভিযোগ করলো—
মাম্মা!! ঐ লোকটা যখন আমার শরীরে ব্লেট দিয়ে আচর কেটেছিলো আর এই খানে (কলার বোনের নিচে গর্ত হয়ে থাকা জায়গাটা) কা*মর দিয়ে মাংস তুলে নিয়েছিলো আমার মনে হচ্ছিলো আমার আত্মাটা বেড়িয়ে যাচ্ছে। আমি ছুটার অনেক চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পারিনি। একজন লোক আমার দু হাত পা দিয়ে চেপে ধরে দাড়িয়ে ছিলো আর অন্যজন আমার পা,,,
,,, আর বলতে পারলো না অর্পনা, কথা জড়িয়ে আসছে। রোমানা বেগম দুহাতে আগলে নিলেন ওকে। অর্পনার কাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে ফুপিয়ে উঠলেন। তিনি একজন মেয়ে হয়ে তীব্র ভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন অর্পনার ঠিক কতোটা কষ্ট হয়েছিলো।
জ্বরে চেতনা হাড়ানো অর্পনা জানতে পারলো না তার শাশুমা তার যন্ত্রণার শাক্ষি হয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে হাওমাও করে কাদছে,, যেই কানাটা তার মায়ের করার কথা ছিলো। তখনো শুনা যাচ্ছে জ্বর-আক্রান্ত রমনীর ভাঙা স্বর — আমার কাছে তুমি কেনো এলে না মাম্মা? আমি খুব কষ্ট পেয়েছি,,অর্পনা কষ্ট পেয়েছে। তুমি অনেক খারাপ মাম্মা। আই নিড ই মাম্মা,, তুমি আমাকে ছেড়ে যেওনা। মাম,, মাআআ!!
,,, দ্বীপ-বিহান যখন বাবা চাচার সাথে বাড়ি ফিরলো ততোক্ষণে রাত ৯ টা। হলরুমে ঢুকতেই দেখলো পরিবেশ শান্ত একটা শব্দ ও নেই অথচ এই সময়টাতে বসার ঘরে আরিবকে পড়তে বসায় ছোট আম্মু,, ছেলেটা পড়বেনা পড়বেনা বলে কেদে কুটে একশা করে ফেলে। পরশী খাওয়ার বাহানা দিয়ে ভাত নিয়ে টিভির সামনে বসে থাকে। মেধা বমি করে এসে সোফায় গা হেলিয়ে বসে থাকে। আজ হঠাৎ কি হলো? ৯ টার সময় বসার ঘরের লাইট অফ,, সোফায় ওইদিকে শুধু একটা ল্যাম্প সেড জ্বলছে আর সেখানে বসে আছেন রোমানা বেগম। উনার কোলে মাথা রেখে পেটে মুখ গুজে শুয়ে আছে অর্পনা। রোমানা বেগম এক হাতে অর্পনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আর অন্য হাতে বই নিয়ে মনোযোগ সহকারে বই পড়ছেন। মির্জা বাড়ির গেস্ট রুমের পাশে নামাজের জায়গার পাশাপাশি একটা লাইব্রেরি ও রয়েছে,, এটা দ্বীপের মায়ের,, রাহিতা বেগম বই পড়তে ভালোবাসেন বলে বিয়ের দিন দেনমোহর স্বরুপ লাইব্রেরিটা উপহার দিয়েছিলেন মাহিদ মির্জা। তবে সেই লাইব্রেরির মালিক এখন আর পৃথিবীতে নেই,, আপাতত সেখানে আধিপত্য ছড়ান রোমানা বেগম,, তিনিও বই পড়তে ভালোবাসেন,, মেধাটাও বেশিভাগ সময় বই নিয়ে পরে থাকে। সদর দরজা খোলার শব্দ কানে পৌঁছাতেই বই থেকে মুখ তুলে চাইলেন রোমানা বেগম,, দ্বীপ তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এলো,, শাহিন মির্জা কিছু বলতে নিলে ঠোঁটে আঙুল চেপে ইশারায় চুপ থাকতে বললেন রোমানা বেগম,, ঘুমন্ত অর্পনাকে দেখিয়ে নিচু স্বরে বললেন — যান, ফ্রেস হয়ে আসুন আমি খাবার বাড়ছি। মাহিন, বিহান তোমরাও যাও।
,,, মায়ের আদেশ পেয়ে বিহান চলে গেলো,, শাহিন মির্জা, মাহিন মির্জাও যে যার ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। দ্বীপ রোমানা বেগমের কাছে এসে মেঝেতে হাটু মুড়ে বসে পরলো,, অর্পনার দিকে নজর বুলিয়ে প্রশ্ন করলো — কি হয়েছে আম্মু? ভেলোরা এখানে ঘুমিয়েছে কেনো ? ওর কি শরীর খারাপ?
,,, বলতে বলতে গালে গলায় হাত রাখলো,, রোমানা বেগম নিচু স্বরে বললেন– জ্বর এসেছিলো,, ঔষধ খেয়েছে,, এখন আপাতত জ্বর নেই। ওকে রুমে নিয়ে যাও,, শুইয়ে দিয়ে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিচে আসো,, আমি খাবার বাড়ছি।
,,, জ্বর এসেছিলো শুনে কিছুটা চিন্তিত হলো দ্বীপ,, অর্পনাকে আলতো করে কোলে তুলে নিলো,, সামনে পা বাড়িয়েও কি ভেবে যেনো রোমানা বেগমের দিকে ফিরে তাকালো,,
,,, আম্মু!! অর্পনা তোমাকে কিছু বলেছে?
,,, রোমানা বেগম সৎ উত্তর দিলো– বলেছে,, অনেক কিছুই।
,,, উপরের ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে ধরলো দ্বীপ। নতুন স্থান পেয়ে অর্পনা নড়াচড়া করে দ্বীপের বুকে আড়াম খোজার চেষ্টা চালাচ্ছে।দ্বীপ এক নজরে মেয়েটার বাচ্চামি দেখে তপ্ত শ্বাস ফেললো– কি বলেছে? কতোটা জানো তুমি?
,,, রোমানা বেগম নিজেও অর্পনার দিকে তাকিয়ে ছিলো,, কঠিন স্বরে প্রশ্ন করলেন — অর্পনা ম্যাসোকিস্ট? মানসিক বিকারগস্তের শেষ প্রান্তে?
,,, দ্বীপ মিথ্যা বললো না — হুম! হতেই পারে। সমস্যা কোথায়? যা জানো ভুলে যাও।
,,, তেতে উঠলেন রোমানা বেগম — ভুলে যাবো মানে? তুমি একটা ম্যাসোকিস্টকে নিয়ে সংসার করবে আর আমি মেনে নিবো? যার নিজের প্রতি কোনো মায়া নেই সে তোমার প্রতি কতোদিন মায়া দেখাবে? তোমাদের ভবিষ্যৎ কি? বাচ্চা কাচ্চা নিবে না? বাবা ডাক শুনার ইচ্ছা নেই? আর যদি ও মা হয় ও। তোমার বাচ্চা একটা ম্যাসোকিস্ট এর কাছে কতোটা সুরক্ষিত? ধীরে ধীরে বাচ্চাটা বড়ো হওয়ার পর যখন দেখবে তার মা এমন,, নিজের শরীর নিজে কাটাকাটি করে,, তাহলে তার ব্রেইনে কি পরিমান প্রভাব পরবে ভাবতে পারছো? তোমাদের বাচ্চা এসব দেখতে দেখতে নিজেও একটা ম্যাসোকিস্ট এ পরিনত হবে। ধরো,, কখনো যদি অর্পনা নিজেকে আঘাত করতে করতে মরে যায়? তখন কি করবে? তোমার আর তোমার বাচ্চার কি হবে? আমি কিছু ভাবতে পারছি না জোহান,, একটা সহজ সরল জীবন কেমন ভয়ানক ঠেকছে। আমার ছেলের বউ একটা ম্যাসোকিস্ট? হাও ফানি!! আমরা এরকম ভয়ানক একটা মেয়ের সাথে সারাজীবন পার করবো? আমরা কেউ কি ওর কাছে আসলেই নিরাপদ? আজ নিজেকে আঘাত করছে কাল আমাদের করবেনা, তার গ্যারান্টি কি?
,,,, রোমানা বেগমের রাগের বিপরীতে দ্বীপ সম্পূর্ণ শান্ত,, যেনো এটা কোনো সমস্যাই না — কিছু করার নেই আম্মু,, আমি এই ম্যাসোকিস্টকেই ভালোবাসি। তোমাদের যদি ভেলোরাকে নিয়ে কোনো প্রবলেম হয় আমি ওকে নিয়ে গোলসান চলে যাবো,, আলাদা থাকবো। বাচ্চা কাচ্চা, ভবিষ্যৎ আমার কিছু চাইনা। এসব দিয়ে কি হবে? আর যদি হয় ও,, আমি আরশাদ জামানের মতো বাবা হবো। সন্তানকে একা মানুষ করবো। দয়া করে কখনো ওর মরার কথা বলবে না,, আমার বুক কাপে। বুঝার চেষ্টা করো আম্মু,, আমি ওকে ভালোবাসি। ভালোবাসায় কখনো ঠিক ভুল, সুস্থ , অসুস্থ,, মানুষ, অমানুষ বিচার করা যায়না। ভালোবাসা শুধু ভালোবাসা দিয়েই পরিমাপ করা যায়,, যেটা আমরা একে অপরকে ঘিরে করে নিয়েছি।
,,, বলেই উপরের দিকে হাটা দিলো, রোমানা বেগম তপ্ত শ্বাস ফেলে সোফায় গা হেলিয়ে দিলেন। আগে বিভিন্ন লেখকের বইয়ে ম্যাসোকিস্ট সম্পর্কে পড়তেন,, তখন অবিশ্বাস ঠেকতো,, মনে হতো পৃথিবীতে এমন মানুষ সত্যি ই কি আছে যারা নিজেদের আঘাত করে আনন্দ পায়? নাহ!! এটা কিভাবে সত্যি হতে পারে? অথচ আজ জানতে পারলেন গত দশ মাস যাবত তিনি একটা ম্যাসোকিস্ট, সাইকোপ্যাথ, মানসিক বিকারগস্তের সাথে বসবাস করছেন আর সেই মেয়েটা তারই বড়ো ছেলের বউ।
,,, অর্পনার যখন ঘুম ভাঙলো ততোক্ষণে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে,, চারদিকে পাখির কিচিরমিচির ডাক,, শেষ রাতের দিকে বৃষ্টি হয়েছে বোধহয়। বৃষ্টির তোপে প্রকৃতি বেশ স্নিগ্ধ রুপ ধারন করেছে। অর্পনা বিছানা ছেড়ে বারান্দার পর্দাটা মেলে দিলো,, দ্বীপ রুমে নেই,, আব্বু চাচ্চুদের সাথে নামাজে গিয়েছে বোধহয়। অর্পনার আজ নামাজ নেই,, আল্লাহ প্রদত্ত ছুটি পেয়েছে সে। এজন্যই হয়তো গতকাল জ্বরটা হুট করেই জেকে বসেছিলো। জ্বর এসেছিলো কথাটা মাথায় আসতেই ভয়ে কুকরে গেলো অর্পনা,, সে তো নিচে গিয়েছিলো তারপর ওর কাছে ওর শ্বাশুড়ি এসেছিলো। অর্পনা কি অবচেতন মনে কিছু বলে দিয়েছে? উনি কি সবটা জানেন? অর্পনার মনটা বেশ খারাপ হলো,, সে চায়না কেউ জানুক তার অভদ্রতার পিছনে আরও একটা রুপ আছে,, সে একটা ম্যাসোকিস্ট সাথে একটা অপবিত্র সত্তা। বারান্দার লম্বা কাচের দেওয়ালটা মেলে দিলো অর্পনা,, ধীর কদমে বারান্দায় পা বাড়ালো। সুইমিং পুলের পাশে যেই দোলনাটি রাখা আছে সেটার দিকে একবার তাকালো,, তাদের বাড়িতেও খুব ছোট বেলায় এরকম দোলনা ছিলো। সেখানে সুস্মিতা কাইসার বসতেন আর অর্পনা বসতো তার মাম্মার কোলে। তপ্ত শ্বাস ফেলে বারান্দার রেলিং ধরে দাড়ালো,, দৃষ্টি স্থির করলো মির্জা বাড়ির গেইটে,, সেখানে একটা বিড়াল তার বাচ্চাকে নিয়ে বসে আছে,, বিড়ালটাকে বেশ ক্ষতিগ্রস্থ মনে হলো। শেষ রাতের ঝরের কবলে পরেছে বোধয়,, তবে বাচ্চাটার কোনো ক্ষতি হয়নি,, যতটা ভিজেছে ততোটুকু পানি মা বিড়ালটি জ্বিব দ্বারা লেহন করে শুষে নিচ্ছে। দৃশ্যটা খুব জঘন্য ঠেকলো,, অর্পনার মনে হলো এরকম বাজে দৃশ্য পৃথিবীতে দুটো হতে পারেনা। অর্পনার কেনো যেনো রাগ হলো,, তর্জনি আঙুলের বড়ো নখটা চেপে ধরলো পেটের কাছে। এবার শান্তি লাগছে,, মাথায় উঠা যন্ত্রণা টুকু শরীরের যন্ত্রণার কাছে হাড় মেনেছে। হঠাৎ রেলিং এ কফির কাপ রাখার শব্দ হতেই ধ্যানচ্যুত্ত হলো অর্পনা,, নখ ততোক্ষণে পেটে দেবে গিয়েছে,, দ্বীপের উপস্থিতি টের পেয়ে তাড়াহুড়ো করে হাত সরিয়ে আনলো। ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বললো — নামাজ পড়ে কখন ফিরলেন?
,,, দ্বীপ উত্তর করলো না,, তার দৃষ্টি গেইটের সামনের ঐ বিড়াল আর বাচ্চাটার দিকে। সেদিকে নজর স্থির করে জিজ্ঞেস করল — কোথায় আঘাত করেছো?
,,, অর্পনার কৃত্রিম হাসি টুকু মিলিয়ে গেলো,, দ্বীপের প্রশ্নকে উপেক্ষা করে চলে যেতে নিলে দ্বীপ ওর হাত টেনে ধরলো। বাধা পেয়ে অর্পনার চোখে পানিরা ভীর করলো, বার কয়েক নাক টেনে নিজেকে ঠিক করার প্রয়াস চালালো। দ্বীপ ধীরো গতিতে অর্পনাকে টেনে সামনাসামনি দাড় করাতেই ফুপিয়ে উঠলো অর্পনা,, দ্বীপের চোখে চোখ রেখে ভাঙা কন্ঠে আওড়ালো —
,,, আমায় নিয়ে আপনার বড্ড অভিযোগ তাইনা?
,,, তপ্ত শ্বাস ফেললো দ্বীপ সাথে সাথে তার চোখ থেকেও এক ফোটা পানি গড়ালো। অর্পনাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে অর্পনার প্রশ্নের বিপরীতে প্রতিত্তোর করলো — ভালোবাসি ভেলোরা,, প্রচন্ড এবং তীব্র হাড়ে তোমাকে আমি ভালোবাসি।
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৬
,,, দ্বীপের শক্ত বুকে মাথা ঠেকিয়ে শব্দ করে ফুপিয়ে উঠলো মেয়েটা,, এই লোকটা সব জেনেও তাকে জীবনে রেখে দিয়েছে। অর্পনার মাঝে মাঝে মনে হয় সে দ্বীপের সাথে অন্যায় করেছে। তার বোধহয় দ্বীপের প্রতি আশক্ত হওয়া উচিৎ হয়নি। আর না এতো ছলনা করে ভালোবাসতে বাধ্য করাটা উচিৎ হয়েছে।
