Home ডিজায়ার আনলিশড ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৪

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৪

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৪
সাবিলা সাবি

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। শহরের আকাশে ম্লান আলো ছড়িয়ে পড়েছে, ঠিক সেই সময়েই মেইলস্ট্রোম খবর পেলো—রিকার্দোকে যে খু/ন করেছে, সে আসলে নাইট রেভেন–এর লোক। খবরটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার চোখ রক্তাভ হয়ে উঠলো। এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজেই গাড়িতে উঠলো। ইঞ্জিনের গর্জনে চারপাশ কেঁপে উঠলো, আর মেইলস্ট্রোম ছুটে বেরিয়ে গেলো রাস্তায়।

কিন্তু অচিরেই অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলো। হঠাৎ এক বিশাল ট্রাক তার গাড়ির সামনে এসে পড়লো। যেন ইচ্ছে করেই ট্রাকটা তাকে ধাক্কা মারতে চাইলো। প্রচণ্ড শব্দে ধাক্কা লাগলো, গাড়িটা কেঁপে উঠলো।
মেইলস্ট্রোমের গাড়ি আর ট্রাকের সংঘর্ষে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মতো শব্দ হলো। স্টিয়ারিং চেপে ধরলেও ধাক্কা সামলাতে পারলো না। গাড়িটা কয়েক পাক ঘুরে রাস্তার একপাশে আছড়ে পড়লো। কাঁচ ভেঙে ছিটকে গেলো চারদিকে, লোহার টুকরো ছড়িয়ে পড়লো রক্তের সঙ্গে মিশে।
পেছনের গাড়ি থেকে নামা তার গ্যাংস্টাররা ছুটে এলো। চোখে মুখে আতঙ্ক। মেইলস্ট্রোম তখন অচেতন, শরীর রক্তে ভিজে যাচ্ছে। গ্যাংস্টাররা চিৎকার করে উঠলো—
“বস! বস চোখ খুলুন!”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

অবস্থা গুরুতর বুঝে তারা দ্রুত তাকে তুলে নিলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সাইরেন বাজাতে বাজাতে অ্যাম্বুলেন্স এগিয়ে এলো। তড়িঘড়ি করে মেইলস্ট্রোমকে স্ট্রেচারে তুলে নিয়ে গেলো হসপিটালের পথে।
হসপিটালের আইসিইউতে নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তাররা দ্রুত চারপাশে জড়ো হলো। রক্তচাপ প্রায় নেই বললেই চলে। সারা শরীরে কাটা-ছেঁড়া, ভাঙা হাড়, আর ভেতরের আঘাত এতটাই ভয়ঙ্কর যে মুহূর্তে বোঝা গেলো— মেইলস্ট্রোমের জীবন এখন সূক্ষ্ম সুতোয় ঝুলছে।
গ্লাসের ওপাশে তার গ্যাংস্টাররা দাঁড়িয়ে। মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। তাদের মনে শুধু একটাই প্রশ্ন—যদি বস না বাঁচে, তাহলে নাইট রেভেনের খেলা কে সামলাবে?

মেইলস্ট্রোমকে আইসিইউতে আছে খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই ইসাবেলার মুখের রঙ উবে গেল। দ্রুতই তিনি হাসপাতালে পৌঁছে গেলেন—চোখে লাল অগ্নি, গলার স্বরে তীব্র কষ্টের আটচল। লম্বা কালোন কোটটা ঝোলানো তার গায়ে,উচ্চকণ্ঠতে ইসাবেলা এক নজরেই পুরো হসপিটালের বাতাবরণ বদলে দিলেন।
গ্যাংস্টাররা ঘরভর্তি দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানালেন, কিন্তু ইসাবেলার দিকে তাদের কণ্ঠে ভয় পরিলক্ষিত—কারণ তিনি কেবল মা নন, মাফিয়া কুইন; মর্মে থাকলে প্রতিশোধ যেন তার জন্মস্বরূপ। পুরোনো দিনের মতই তিনি ঠাণ্ডা চোখে সবাইকে এক এক করে বললেন—
—“বলো, কে আমার ছেলেকে মারার চেষ্টা করল? ওদের আনো—আমার সামনে হাজির করো। আমি এক এক করে তাদের জবাব নেব।”

চেয়ারগুলোতে একেবারে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। এক সিনিয়র লোক ধীর করে মাথা নামিয়ে আতংকে ঢেউ খেলানো কণ্ঠে বলল——“ম্যাম, সেই ট্রাকচালক মারা গেছে—রাস্তায় ধ্বংসাবশেষে পাওয়া গেছে। ঠিকমতো প্রমাণ নেই। তবে অনুমান করা হচ্ছে, এটা নাইট রেভেনের কোনো লোকের কাজ।”
ইসাবেলার চোখ তখন আরও ধিক্কারে জ্বলে উঠল। মুখে কড়া, ধোঁয়াশাহীন কণ্ঠে বললেন——“নাইট রেভেন? কে এই নাইট রেভেন? ওকে আমার সামনে আনো—আমি তার সঙ্গে দেখা করব।”
লোকটি ধীর গলায় জানাল——“ম্যাডাম, আজ পর্যন্ত কাউকেই ওনার মুখ দেখায়নি। ওনার একান্ত পরিচিতরা ছাড়া কেউ তাকে চিনতে পারবেনা।”
ইসাবেলা হাঁটতে শুরু করলেন, মন্দ্রগর্জনে বললেন—

—“আমি মাফিয়া কুইন ইসাবেলা। আমারও দেখার অধিকার আছে। যদি আমি চাই, পুরো মেক্সিকোই আমি ভেঙে দিতে পারি—আরও বড় কিছু করার দরকার পড়লে করব। আমার ছেলের ওপর যে আঘাত এসেছে, তার হিসাব সবাইকে দিতে হবে। এখনি ব্যবস্থা নাও।”
তার কথায় ঘরটা কেঁপে উঠল—তার লোকেরা বুঝে গেল যে আজ রাতটায় আর কোনো আলাপ-আলোচনা নয়; সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়। ইসাবেলার চোখে প্রতিশোধের অদমনীয় আগুন—সে কাউকে আর ছাড়বে না।
খবর ছড়াল মুহূর্তেই শহরটা কাঁপতে লাগল। টিভির লাইভ ব্যানার লাল-সাদা করে ঝলমল করতে লাগল — “বড় ধাক্কা: মেইলস্ট্রোম অপারেশনের রুমে মৃত্যু সজ্জায়”।

ক্যামেরার লাইভফিডে হাসপাতালের মূল গেট, গভীর রাতে আলোর চিকচিক, এবং জানালা দিয়ে ভেসে ওঠা আইসিইউ-র লাইট—সব মিলিয়ে যেন এক ধাক্কার মত ছড়িয়ে পড়ল। নিউজঅ্যাংকররা চট করে বিক্ষিপ্ত তথ্য যোগাড় করতে লাগল; সোশ্যাল মিডিয়ায় #MailstromTrending হয়ে গেলো।
রাস্তাঘাটে মানুষ টালি-টিপসির মত গুঞ্জন তুলল—একদিকে সহানুভূতি, অন্যদিকে কৌতূহল। ব্রেকিং নোটিফিকেশন ঘরে ঘরে পৌঁছাল; পত্রিকার হেডলাইন বড় বড় করে টেনে দিলো—“মাফিয়া বসের জীবনে অনিশ্চয়তা”। টিভি-স্টুডিওগুলোতে বিশেষ বিশ্লেষণ শুরু হলো—শত্রুদের কৌশল, ক্ষমতার শূন্যতা, ভবিষ্যৎ ভ্যাকুম—সব আলোচনা চলে একসাথেই।

অন্যদিকে হাসপাতালের করিডরে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। অপারেশন থিয়েটারের দরজা থেকে ডাক্তার বেরিয়ে এসে গম্ভীর কণ্ঠে জানালেন—
—“অপারেশন শেষ হয়েছে। রোগী এখনো অচেতন অবস্থায় ঘুমাচ্ছে। আঘাত গুরুতর, হাত–পা ভেঙে গেছে। সুস্থ হতে সময় লাগবে।”
খবরটা শোনার পর থেকেই সাইফ চৌধুরী অস্থির হয়ে পায়চারী করছেন। বাকিরা নিস্তব্ধ মুখে বসে আছে। জাভিয়ান আর তান্বীও সেখানে উপস্থিত।
তান্বী কাঁচের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল মার্কোকে—শয্যায় শুয়ে আছে, সারা শরীরে ব্যান্ডেজ, হাত–পা প্লাস্টারে মোড়ানো। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন হালকা কেঁপে উঠল। সে অচেতনভাবে জানালার দিকে আরও একটু ঝুঁকতেই জাভিয়ান এসে তার হাত টেনে ধরল।

—“চলো, বাড়িতে যাবো।”
তান্বী অবাক হয়ে তাকাল।—“কি বললেন? সবাই বসে আছে, আপনার ভাইয়ের অবস্থা এত খারাপ… আর এখন আমি বাড়ি যাবো?”
জাভিয়ানের কণ্ঠ শক্ত হলো।—“ও আমার ভাই, তোমার নয়। তোমার এত দরদ কেনো উথলে পড়ছে?”
তান্বীর চোখ চকচক করে উঠল।—“কারণ উনি আপনার চেয়ে ভালো। আচরণে, ব্যবহারে—সবকিছুতে আপনার থেকে অনেক বেটার।”
জাভিয়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল—“লাস্টবার বলছি, বাড়ি চলো।”

ঠিক তখনই এগিয়ে এলেন জাভিয়ানের মা।—“কি হয়েছে, জাভি? ওকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছো কেনো?”
জাভিয়ান গম্ভীর মুখে উত্তর দিল——“মম, আমি বাসায় ফিরতে চাই। আমার খুব ক্লান্ত লাগছে।”
মা অবাক হয়ে তাকালেন।—“মার্কো হাসপাতালে জীবন–মৃত্যুর লড়াই করছে, আর তুমি ভাইকে ফেলে বাড়ি যাবে?”
জাভিয়ান গলা নামিয়ে বলল——“মা, আমি খুব টায়ার্ড। মার্কো এখন সেফ।বাট আমাকে রেস্ট নিতে হবে।”
মা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন——“ঠিক আছে, তুমি যেতে চাইলে যাও। কিন্তু তান্বী এখানে থাকুক। ওকে কেন টানছো?”
জাভিয়ান রাগী চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আঙুল তুলল।—“আমার ওয়াইফ সেখানেই থাকবে, যেখানে আমি থাকব। আমি ওকে ছাড়া ঘুমোতে পারি না, ওকে জড়িয়ে না ধরলে আমার ঘুম আসেইনা।”
এই কথা শুনে জাভিয়ানের মায়ের মুখ লাল হয়ে গেল লজ্জায়। তিনি আর কোনো কথা বললেন না, ধীরে পাশে সরে গেলেন।

তান্বীর চোখে ক্ষোভ জমে উঠল।—“ছিঃ! আপনি কি করে এমন অসভ্য কথা আপনার মায়ের সামনে বলতে পারেন? আপনার এই আচরণে এখন ওনার চোখের দিকে তাকাতেও আমার লজ্জা লাগবে।”
কক্ষজুড়ে নীরবতা নেমে এলো। তান্বীর কণ্ঠে ক্ষোভ, জাভিয়ানের ঠোঁটে তীব্র বিদ্রূপের হাসি—সব মিলিয়ে চারপাশে অদ্ভুত চাপা উত্তেজনা ভর করল।
তান্বী জোরে চেঁচিয়ে বলল, “আপনি গেলে যান — আমি যাবো না!”
জাভিয়ান আর কোনো উত্তর দিল না। হঠাৎ সে তান্বীর দিকে এগিয়ে এসে এক ঝটকায় তাকে কাঁধে তুলে নিল। হাসপাতালের করিডর জুড়ে থাকা সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল—সাইফ চৌধুরী, জাভিয়ানের মা, চাচা আর লুসিয়া; লুসিয়ার চেহারা একেবারে লাল হয়ে উঠল রাগে।

তান্বী অটলভাবে ছটফট করতে থাকলো, “প্লিজ—আমাকে নামান! আমি স্বইচ্ছায় যাবো!”
জাভিয়ান কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর না দিয়ে তান্বীকে নরম করে নামিয়ে দিল। তান্বী গর্জনে ফুঁসতে ফুঁসতে বেরিয়ে এসে হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে পড়লো। তার বুক ধুকপুক করছিল—রাগ, লজ্জা আর অভিমান মিশে একরকম অস্থিরতা।
কিছুক্ষণ পর পার্কিং লট থেকে জাভিয়ানের গাড়ি চলে এলো। সে দরজা খুলে তান্বীকে ডাকলো। তান্বী গাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ল। দু’জনের চোখে চোখ পড়তেই তান্বী ঠোঁট বেঁধে বলল,—“আপনার মুখ থেকে এতো নোংরা, বাজে অসভ্য কথা বের হয় কিভাবে?”
জাভিয়ান সে সরাসরি স্বীকার করে বলল, হালকা কণ্ঠে, “কারন আমার লিবিডো সবসময় হাই লেভেলে থাকে, তাই কন্ট্রোল করতে না পেরে মুখ চালাই।”
তান্বী এক মুহূর্ত থেমে রেগে উঠল, তীব্র তীব্র ভঙ্গিতে বলল,—“মানুষের বিপি হাই হয় শুনেছিলাম, এখন অদ্ভুত তথ্য জানলাম !”
জাভিয়ান হঠাৎ তান্বীর দিকে ঝুঁকে এসে বললো

—“দ্যান—কল মি ‘টিচার’ আই উইল টিচ ইউ এভরিথিং প্র্যাকটিক্যালি ।”
তান্বীর চোখ রাগে ঝলসে উঠল। জাভিয়ান যখন মুখটা কাছে আনল, সে হঠাৎ দু’হাত দিয়ে তাকে জোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
—“গেট লস্ট!” তান্বীর গলা কাঁপছিল রাগ আর অপমানে।
গাড়ির ভেতর মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো। জাভিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল—চোখে রাগ নয়, বরং এক অদ্ভুত চ্যালেঞ্জের দৃষ্টি।
তান্বী ঠোঁট কামড়ে জানালার বাইরে তাকাল, যেন তাকে আর দেখতে চাইছে না। কিন্তু বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছিল—রাগে, ভয়ে, নাকি অজানা টানে, সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছিল না।
গাড়ি তখনো হাসপাতালের গেট পেরিয়ে অন্ধকার রাস্তায় এগিয়ে চলেছে।

হাসপাতাল থেকে ফিরতেই তান্বী ক্লান্ত শরীর নিয়ে সোফায় বসে পড়ল। জাভিয়ান সরাসরি রুমে ঢুকে শাওয়ারের দিকে গেল। তান্বী ভেবেছিল, হয়তো দ্রুত বের হবে। কিন্তু মিনিট দশ… পনেরো… কেটে গেল, তারপরও কোনো সাড়া নেই।
ঘাম আর ধুলো মেখে সারাদিন হাসপাতালের দৌড়ঝাঁপে তান্বীর নিজেরও ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল। শরীরটাও যেন কেমন ভারী হয়ে উঠছিল। শেষমেশ বিরক্তি আর অস্বস্তিতে সে উঠে বাথরুমের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
“আপনার… আর কতক্ষণ লাগবে?!”—তান্বী প্রথমে ধীরে ডাকল। কোনো উত্তর নেই।

সে বিরক্ত হয়ে দরজায় ধাক্কা দিল, তারপর আরো জোরে—ধপ… ধপ…
হঠাৎ দরজা খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে জাভিয়ান। শরীর ভরা সাদা সাবানের ফেনা, কোমরে শুধু একটা টাওয়েল, আর ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি নিয়ে সে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
—“কি হয়েছে? এত জোরে দরজা ধাক্কা দিচ্ছো কেনো?”
তান্বী ভ্রু কুঁচকে বলল,—“আমি শাওয়ার নিতে চাই। খুব অস্বস্তি হচ্ছে আমার। আপনি প্লিজ তাড়াতাড়ি বের হোন।”
কথা শেষ হতে না হতেই জাভিয়ান খপ করে তার হাত চেপে ধরল। ঠোঁটে একরাশ দুষ্টু হাসি খেলে গেল।
—“ওকে… তাহলে ভেতরে আসো। একসাথে শাওয়ার নেই। এতে পানির অপচয় হবে না, সময়ও বাঁচবে।”
তান্বী আঁতকে উঠে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল।—“ছাড়ুন! লাগবে না আমার শাওয়ার।আপনার যতক্ষণ ইচ্ছা ভেতরে থাকুন। দরকার হলে বারথরুমেই ঘুমান!”
সে হাত টেনে নিলো জোরে, চোখে রাগ আর লজ্জার ঝিলিক।
জাভিয়ান তখনো দাঁড়িয়ে রইল ভেজা শরীর নিয়ে, হাসি মুছে না গিয়ে আরও গভীর হলো তার ঠোঁটে।

অনেকক্ষণ পরে জাভিয়ান শাওয়ার সেরে বের হলো। ভেজা চুল থেকে এখনো পানি পড়ছে, আর শরীর থেকে গরম বাষ্প বেরোচ্ছে। সে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছছিল, এমন সময় সোফায় বসা তান্বী আস্তে করে মুখ তুলল।
গলায় চাপা কম্পন নিয়ে বলল,—“আমার বাবা-মা আর এলিনা আপাকে দেখতে ইচ্ছে করছে… প্লিজ একটা ব্যবস্থা করে দিন দেখার। আমি ওদের খুব মিস করছি।”
জাভিয়ান তোয়ালে ফেলে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের কণ্ঠে দৃঢ়তা রেখে বলল,—“হ্যাঁ, দেখা হবে। কিন্তু এখন না… দু’দিন পর।”
কথাটা যেন ঠাণ্ডা পানির মতো গিয়ে বিঁধল তান্বীর বুকে। সে কিছুই বলল না, শুধু চোখ নামিয়ে নিল। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, যেন আর কোনো তর্কে যেতে চায় না।
সোজা হাঁটতে হাঁটতে শাওয়ারের ভেতরে ঢুকে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার মুহূর্তে তার ঠোঁট থেকে ভেসে এলো ক্ষীণ একটা দীর্ঘশ্বাস।
রুমে একা দাঁড়িয়ে রইল জাভিয়ান। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে দেখতে ভেতরে অদ্ভুত এক অস্বস্তি খেলে গেল তার চোখে।

রাতের ডিনার শেষে হঠাৎ জাভিয়ান গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,—“এই মেয়ে… যাও, আমার জন্য এক গ্লাস ম্যাংগো জুস নিয়ে আসো। একদম ফ্রেশ আম দিয়ে বানাবে, আর চিনি কম দেবে।”
তান্বীর ভুরু কুঁচকে গেল। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল—“আমি পারব না”—কিন্তু হঠাৎ থেমে গেল। চোখে এক অদ্ভুত ঝিলিক ফুটে উঠল। কোনো কথা না বলে চুপচাপ উঠে কিচেনের দিকে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর হাতে ট্রে নিয়ে ফিরে এলো। গ্লাস ভর্তি সোনালি ম্যাংগো জুসটা বাড়িয়ে দিল জাভিয়ানের দিকে।
জাভিয়ান গ্লাস হাতে নিয়ে হালকা হাসল, কিন্তু তার চোখে সন্দেহের ছায়া ভেসে উঠল। ধীরে ধীরে বলল,
—“হুম… আবার পয়জন-টয়জন মিশিয়ে দিয়েছ নাকি?”
তান্বী ঠোঁটে ঠাণ্ডা হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিল,—“হ্যাঁ, মিশিয়েছি। কী করবেন?ফেলে দিবেন?আপনার ইচ্ছা হলে খান নাহলে ফেলে দিন।”

জাভিয়ান এক মুহূর্ত তার চোখের দিকে তাকিয়ে গ্লাসটা ঠোঁটে নিল। এক চুমুক দিতেই তার মুখ পাল্টে গেল। ঠোঁট, চোখ, নাক মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। আসলে তান্বী জুসে মরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে দিয়েছে।
তান্বীর বুক ধকধক করতে লাগল।জাভিয়ান এতোক্ষণে বুঝে ফেলেছে এবার কি করবে কে জানে!
কিন্তু জাভিয়ান গ্লাস নামাল না। বরং চোখ রক্তিম হয়ে উঠলেও এক নিঃশ্বাসে পুরো জুস গিলে ফেলল।
গ্লাসটা টেবিলে ঠাস করে রেখে হেসে উঠল, যদিও তার হাসিটা অন্যরকম ছিলো।—“আমি তো জানতাম তুমি অন্যরকম… কিন্তু এভাবে সারপ্রাইজ দেবে, সেটা আশা করিনি।”

তান্বী স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে ভয়, বাইরে অবাধ্যতা—দুটোই মিলেমিশে তার চোখ চকচক করছিল।
গ্লাস ফেলে রেখে জাভিয়ান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ, নাক ঠোট তখনও লাল, ঠোঁটের কোণ থেকে হালকা ঘাম আর ঝালের রেখা ফুটে উঠছে। ধীরে ধীরে সে তান্বীর দিকে এগোতে লাগল।
তান্বীর বুক ধুকপুক শুরু হলো। সে আতঙ্কিত গলায় বলল,—“আপনি… এভাবে কাছে আসছেন কেনো?”
জাভিয়ানের ঠোঁটে তির্যক হাসি খেলে গেল। কণ্ঠস্বর নিচু, কিন্তু ভয়ংকর দৃঢ়,—“এতো স্পেশাল সারপ্রাইজ দিলে… তুমিও তো একটা স্পেশাল গিফট ডিজার্ভ করো।”
তান্বী পিছু হটতে হটতে দেয়ালে ঠেকে গেল। আর এক মুহূর্তও সময় দিল না জাভিয়ান—ঠাস করে তার ঠোঁট তান্বীর ঠোঁটে বসিয়ে দিল।

তান্বী আতঙ্কে জাভিয়ানের শার্টের কাঁধের কাছে খামচে ধরল, বারবার চেষ্টা করল নিজেকে ছাড়ানোর। কিন্তু জাভিয়ান তার দুই হাত একসাথে টেনে নিয়ে নিজের এক হাতের মুঠোয় আটকে ফেলল। আরেক হাত দিয়ে শক্ত করে তার চোয়াল চেপে ধরে রাখল।
চুম্বনটা ক্রমশ গভীর হতে লাগল, যেন প্রতিটি ঝাল, প্রতিটি কষ্ট, প্রতিটি রাগ তান্বীর ভেতর ঢেলে দিচ্ছে সে।
তান্বীর চোখ বুঁজে এলো, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল… অথচ জাভিয়ান থামল না। থামবে কেবল তখনই, যখন নিজের ভেতরের আগুন নিভে আসবে, মরিচের ঝাল ধীরে ধীরে প্রশমিত হবে।
কিছুক্ষন পর জাভিয়ান ধীরে ধীরে ঠোঁট সরিয়ে নিল, আর কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ালো কিন্তু চোখে তখনও দহন, ঠোঁটে নির্মম হাসি——“এবার বুঝলে, আমার আগুন নিয়ে খেলা করলে কেমন হয়?”

তান্বী হঠাৎ কেঁদে উঠলো আর তান্বীর বুকফাটা কান্না রুমজুড়ে ছড়িয়ে পড়তেই জাভিয়ান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো —“এই মেয়ে, এত কান্না করছো কেনো? আমি কি তোমাকে মেরেছি? সামান্য চুমুতে কেউ কাঁদে।”
তান্বী কাঁপতে কাঁপতে, কান্নাজড়ানো কণ্ঠে জবাব দিলো,—“আপনার কাছে এটা সামান্য হতে পারে… হ্যাঁ, সামান্যই… কারণ আপনার জীবনে তো এরকম হাজারটা মুহূর্ত এসেছে, অজস্র মেয়েকে চুমু দিয়েছেন আপনি। কিন্তু…”
সে হঠাৎ থেমে গেল, বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হলো। চোখের পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। _“কিন্তু এটা আমার প্রথম… আমার প্রথম চুম্বন… ছিলো”

শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই তার গলা ভেঙে গেল, সে আর নিজের কান্না আটকে রাখতে পারল না। বুকের ভেতরের সব ভাঙা টুকরো যেন একসাথে চিৎকার করে উঠল, আর তান্বী হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল।
জাভিয়ান মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার চোখে একরকম অবাক দৃষ্টি ফুটে উঠল। ঠোঁটের কোণে থাকা খুনসুটে হাসিটা মিলিয়ে গেল, আর তার চাহনিতে এক অজানা অস্বস্তি ভেসে উঠল—যেন সে বুঝতেই পারেনি, তার এক মুহূর্তের ‘সামান্য’ কাজ কারো জন্য কতটা গভীর আঘাত হতে পারে।
রুমের বাতাস যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল।
তান্বী চোখে অশ্রু নিয়ে দেয়ালের সাথে হেলে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎই জাভিয়ান পুনরায় তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রেগে গিয়ে শক্ত করে দেয়ালে চেপে ধরল।

—“কান্না কি করে থামাতে হয় তা আমার ভালো করেই জানা আছে।”
কথা শেষ না হতেই জাভিয়ান তার ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট বসিয়ে দিলো। তান্বী মরিয়া হয়ে উঠলো চুম্বন প্রতিরোধ করতে তার ঠোঁট সে শক্ত করে বন্ধ করে রাখল,আর বন্ধ চোখে অশ্রু ঝরতে লাগলো।
কিন্তু জাভিয়ানের হাত হঠাৎই তার গলায় চাপ দিলো, জোরে, এতটাই যে তান্বীর শ্বাসরোধ হয়ে এল। আতঙ্কে তার ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেলো, আর সেই মুহূর্তেই জাভিয়ান আরও গভীরভাবে ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে চুম্বনে ডুবে গেল।
তান্বীর বুক ধকধক করে উঠছে, তার শরীর অসহায়ভাবে কাঁপছে, কিন্তু জাভিয়ান নির্দয়ভাবে চেপে ধরে রেখেছে। এক অদ্ভুত আগ্রাসন, এক ধরনের উন্মত্ততা ভর করেছে তার ভেতর।
মাঝেমাঝে ঠোঁট টেনে কামড় বসাচ্ছিল, এতটাই জোরে যে তান্বীর নিঃশ্বাস কেঁপে উঠছিল। প্রতিটি কামড়ে তার চোখে জল ভরে উঠছিল, তবুও জাভিয়ান থামল না। বরং আরো গভীর, আরো তীব্রভাবে ঠোঁট খুঁজে নিল, যেন তাকে শ্বাস নিতে দেবে না।

তান্বীর হাত দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়ে কাঁপছিল, চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে গালে পড়ছিল, অথচ জাভিয়ানের রাফ চুম্বনের দমন থামছিল না—সেটা হয়ে উঠছিল শাসন, শাস্তি আর অদম্য অধিকার প্রকাশের এক নির্মম ছাপ।
জাভিয়ান একেবারে রাফলি তান্বীর ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে রেখেছে। তার শক্ত হাতগুলো এখনো তান্বীর কব্জি আর চোয়াল আঁকড়ে ধরে রেখেছে। তান্বী সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করতে চাইছিল, কিন্তু ঝাল, যন্ত্রণা আর শ্বাসরুদ্ধ চুম্বনের চাপ মিলিয়ে শরীর ক্রমে নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎই তান্বীর শরীর ঢলে পড়ে। ঠোঁট খোলা অবস্থায়ই একেবারে অজ্ঞান হয়ে জাভিয়ানের বুকের উপর ভর দিয়ে ঢলে পড়ে সে।
জাভিয়ান প্রথমে অবাক হয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। এক মুহূর্ত পরে নিচু চোখে তাকাল—তান্বীর মাথা তার বুকে হেলান দিয়ে নিস্তব্ধ। নিঃশ্বাস চলছে ক্ষীণভাবে, মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
জাভিয়ান তান্বীর গালে হালকা চাপড় দিলো।

—“এই তান্বী…এই শুনছো?”
কোনো সাড়া নেই। তার শরীর একেবারে ঢলে পড়ে আছে।
জাভিয়ান এক মুহূর্ত স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল, তারপর ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলল—“মাফিয়ার কবলে আটকা পড়েও ভাঙোনি তুমি… নিজের চোখের সামনে বাবাকে গু/লিবিদ্ধ হতে দেখেছো, তবুও অজ্ঞান হওনি। মা–বাবাকে ছেড়ে একেবারে অপরিচিত শহরে চলে এসেছো… সেখানেও ভাঙোনি। অথচ আমার সামান্য একটা চুমুতেই গুটিশুটি মেরে ঢলে পড়লে?”

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৩

তার চোখে কেমন এক অন্ধকার খেলা করছিল। হাসিটা ছিল তাচ্ছিল্যের, অথচ গভীরে যেন লুকিয়ে ছিল অন্যরকম কৌতূহল।
সে নিচু হয়ে তান্বীর মুখটা ভালো করে দেখল। নিঃশ্বাস চলছে, তবে ক্ষীণ। এক হাতে আবারও গালে আলতো চাপ দিল, এবারও কোনো সাড়া নেই।
—“তুমি আসলেই অদ্ভুত মেয়ে তান্বী। কিন্তু দেখতে একবারে জিন্নীয়া।”

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৪ (২)