তবু গল্পটা ভালোবাসারই পর্ব ১০
নাজনীন নেছা নাবিলা
মোহনা রাইফের জন্য খাবার বাড়ছে।তার মা তাকে মূলত এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন। এবং তিনি ছাদে গিয়েছেন শুকনো মরিচ, মরিচের গুঁড়া, হলুদের গুঁড়ো রোদে দিতে।রাইফ খাবার টেবিলের উপর বাম হাত রেখে হাতের উপর চিবুক ঠেকিয়ে মোহনা কে দেখতে ব্যস্ত। নজর সরাতেই পারছে না।কি অদ্ভুত কোনো এক সময় এই মেয়ে তার আশেপাশে ঘুরঘুর করতো তখন এত খেয়াল করেনি মেয়েটিকে।আর এখন মেয়েটিকে একবার দেখার জন্য ছটফট করে তার ব্যাকুল হৃদয়।
মোহনা খাবার বাড়াতে এতটাই ব্যস্ত যে কেউ তার দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে সেই দিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই।আসলে সে অনেক নার্ভাস।আজ পাঁচ বছর পর আবার রাইফ কে নিজ হাতে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। পাঁচ বছর আগেও এই কাজটি সে করতো। কিন্তু পার্থক্য এতটুকুই যে তখন সে তার মায়ের কাছ থেকে জোর করে এই দায়িত্ব নিত।আর এখন উড়ে উড়েই তার উপর দায়িত্ব আসে।
মোহনা কাঁপা কাঁপা হাতে ভাত বাড়লো। ভাতের এক পাশে আলু ভাজি এবং অন্য পাশে ডিম ভুনা।আর একটি ছোট্ট বাটিতে রুই মাছের তরকারি যা রাইফের অনেক প্রিয়।জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে গ্লাস এগিয়ে দিল সে রাইফের দিকে। গ্লাসের শব্দে রাইফের ঘোর কাটে। নিজেকে সামলিয়ে খাবারের প্লেট নিজের কাছে এনে মোহনা কে ছোট্ট করে বলে___
ধন্যবাদ।
মোহনা সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বলে___
আপনি খান আমি সোফায় বসে থাকব । কিছু লাগলে আওয়াজ দিবেন কেমন?
রাইফ কিছুটা অবাক হলো। কারণ আগে যখন সে খেতে বসতো তখন মোহনা তার পাশের টেবিলেই বসে থাকতো।বলতে গেলে সে মোহনার প্রিয় ছিল।আর এখন কিনা বলছে সোফায় বসে থাকবে।রাইফের এই দূরত্ব সহ্য হলো না।সে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া মোহনার উদ্দেশ্যে অভিযোগ করে বলল____
এখন কি আমি পুরোনো হয়ে গিয়েছি? আগে তো আমার পাশেই কেউ বসে থাকতো যখন আমি খাবার খেতাম। অথচ এখন দূরে সরে থাকা হচ্ছে। পাঁচ বছরে কি এত বেশি দূরত্ব বেড়ে গিয়েছে?
মোহনার পা জোড়া যেন পাথর হয়ে গেল।রাইফের কথার স্বরে অভিযোগ ছিল কিনা তার বোধগম্য হলো না। কিন্তু তার মনের ভেতর থেকে ঠিকই লুকিয়ে থাকা অভিযোগ বের হয়ে আসতে লাগলো। কিন্তু চাইলেই কি অভিযোগ করা যায় কারোর কাছে।যেই যায়গায় যার কাছে অভিযোগ করবে সে নিজের হয়তো কিছু দিনের মাঝে অন্য কারোর একান্ত মানুষ হয়ে যাবে।মোহনা চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল _____
দূরত্ব আমি বাড়াতে চাই না কিন্তু হয়তো আমাদের ভাগ্যে কাছে আসা লেখা নেই।তাই তো আপনার থেকে দূরে সরে থাকি।এই ক্ষণিকের জন্য নিকটবর্তী হওয়া যে কিছুদিন পর আমার কাছে গলার কাঁটার ন্যায় ঠেকবে।যেই কাঁটা না পারবো গিলতে আর না পারবো ফেলতে।
মোহনা চোখ খুলে নিঃশব্দে রাইফের সমানের চেয়ারে গিয়ে বসল।মোহনার মুখ সামনে ভেসে উঠতেই রাইফের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।সে মুখ ভরা হাসি নিয়ে খাবার খেতে শুরু করল।আজ খুব আনন্দের সাথে সে খাবার খাবে। প্রিয় মানুষটি নিজ হাতে খাবার বেড়ে দিয়েছে। এখন রাইফ প্রিয় খাবার প্রিয় মানুষটিকে পাশে রেখে খাওয়ার মূহুর্ত অনুভব করছে।আগেও এমন হতো কিন্তু সে তা অনুভব করতে পারতো না। কিন্তু এখন আর রাইফ কোনো সুন্দর জিনিস অনুভব করা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে রাজি নয়।
মোহনা বসে বসে রাইফে খাওয়া দেখছে।বলতে গেলে এইটা ছিল তার প্রিয় দৃশ্য।ছিল বললে ভুল হবে, এত বছর পর এই দৃশ্য দেখতে পেয়ে তার মনে হচ্ছে আসলেই এই পাঁচ বছরে কিছুই পরিবর্তন হয়নি। শুধু তার মনে রাইফের জন্য লুকায়িত ভালোবাসা গভীর হয়েছে।রাইফের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চলে গেল অতীতের ভাবনায়____
সেদিন আর মোহনার পড়া হয়নি।ডায়েরি লিখে বিছানায় গিয়ে ঘুম দিয়েছিল সে। ঘন্টা খানিক ঘুমানোর পর ঘুম থেকে উঠেই মনে পরলো তার বড় ভাই এক কাহিনী বলবে বলে ছিল।তাই বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে দৌড় লাগালো মাহিনের রুমে।তার রুমের ঠিক বাম পাশে মাহিনের রুম এবং ডান পাশে মাহিমের রুম।
মোহনা ভাইয়ের রুমের সামনে গিয়ে দরজায় টোকা দিল।মাহিন ফোনে কথা বলছিল। দরজায় টোকার শব্দ শুনে কাঙ্খিত ব্যক্তিকে ভেতরে আসার অনুমতি দিল। মোহনা অনুমতি পাওয়া মাত্রই দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল।ভাইকে দেখলো খাটের হার্ডবোর্ডে হেলান দিয়ে বিছানায় বসে কারোর সাথে কথা বলছে।
ছোট বোন কে দেখে মুচকি হাসি দিয়ে ফোন কানে ধরে থাকা অবস্থায় বলে উঠলো ___
আরে প্রিন্সেস দরজা নক করার কি প্রয়োজন ছিল? তোকে না বলেছিলাম যখন ইচ্ছে ভাইয়ের রুমে চলে আসবি। অনুমতি নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
মোহনা স্মিত হেসে বলল ___
ভাইয়া এটাকে বেসিক ম্যানার্স বলে।
বলতে বলতেই খাটে এসে বসে পরলো।
মোহনার বলা কথা শুনে ফোনের অপর পাশে থাকা ব্যক্তির ঠোঁটেও হাসি ফুটে উঠল।এই মেয়েলি কন্ঠ স্বর তার কাছে খুব মায়াবী ঠেকল। মনে বাসনা জাগলো এই মায়াবী কন্ঠের অধিকারী ব্যক্তিকে দেখার।
মাহিন বোনের কথা শুনে শব্দ করে হেসে উঠলো এবং বলল____
আসছে আমার পাকা বুড়ি।
তারপর ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি কিছু বলল যা মোহনা শুনতে না পেলেও এর প্রতি উত্তরে ভাইয়ের বলা কথা ঠিকই শুনতে পেলো। মাহিন বলল____
আরে এইটা আমার ছোট বোন। হ্যাঁ হ্যাঁ তুই যার জন্মদিনে একবার ডায়েরি দিয়েছিলি সেই। আচ্ছা তোর সাথে পরে কথা বলছি রাইফ। এখন রাখছি।
বলেই ফোন কেটে দিল। মোহনা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।ডায়েরি শব্দটা শুনেই সে বুঝে গিয়েছিলো তার ভাই রাইফ নামক ব্যক্তিটির সাথে কথা বলছে এবং নাম শুনে তো এখন পুরো কনফার্ম হয়ে গেল।
মাহিন বোনের দিকে তাকিয়ে বলল___
তো তোর পড়াশোনার কি অবস্থা?
মোহনা যেন হুঁশ ফিরে পেলো।সে সাবলীল ভাবে বলল ____
আমার পড়াশোনা একদম ঠিকঠাক। কিন্তু এখন তুমি আমাকে বলো তখন তুমি আমাকে যার গল্পটা বলতে নিয়েছিলে।
মাহিন কিছুক্ষণ ভাবলো সে তখন কি বলতে চেয়েছিল। মনে পরতেই হেসে দিল। তারপর বলল____
আরে তোকে রাইফের কাহিনী শোনাতাম। শুধু তোকে একা না মাহিম কেউ শোনাতাম কিন্তু সে কোথায়।তার শোনা বেশি প্রয়োজন তাকে আসতে দে।
মোহনা অধৈর্য হয়ে বলল_____
উফ্ ভাইয়া জানোই তো মাহিম ভাইয়ার এসব কাহিনী শুনতে কোন আগ্রহ নেই। সেতো শুধু তোমার নিয়ে আসা উপহার নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমার আগ্রহ আছে তাই আমাকে গল্প বলো আমি শুনবো।
মাহিন স্মিত হেসে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল___
তোর হয়তো মনে নেই যখন তুই ক্লাস ফাইভে পড়তি তখন তোর জন্মদিনের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না আমার এই বন্ধুর কারণে। আসলে সে খুব অসুস্থ হয়ে পরেছিল আর তার মা বাবা কেউই নেই তাই আমি তার কাছে ছিলাম। সেদিন রাতে হাসপাতালেই ছিলাম। তাকে একদম ডিসচার্জ করিয়ে তারপর তার বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলাম। যখন রাইফ জানতে পারলো তোর জন্মদিনে আমি উপস্থিত না থাকার কারণে তুই আমার উপর অভিমান করেছিস। তখন সে নিজের দুর্বল শরীর নিয়ে নিকটবর্তী একটি লাইব্রেরী থেকে তোর জন্য ডায়েরি কিনে দিয়ে বলল এইটা তার তরফ থেকে জন্মদিনের এবং ক্ষমা চাওয়ার জন্য একটি ছোট্ট উপহার।
মোহনা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে অবুঝের মত জিজ্ঞেস করল___
উনার মা বাবা কোথায়?
বোনেথ প্রশ্নে মাহিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রশ্নটি হয়তো খুব একটা কঠিন না কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরের ওজন অনেক ভারী। অন্তত রাইফেই কাছে তো আকাশ পরিমাণ ভারী।
মা বাবা মারা গেলে খুব সহজেই বলা যায় যে আমার মা বাবা নেই মারা গিয়েছেন। কিন্তু থেকেও না থাকলে এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া যায় না।তখন কষ্ট বেশি হয় যা কাউকে বলে বোঝানো যায় না।
কথা গুলো মাহিন জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি রেখে বলল। মোহনার বোধগম্য হলো না কিছুই।সে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ভাইয়ের দিকে এই আশায় যে তার ভাই তাকে সবটা বুঝিয়ে বলবে।
মাহিন হয়তো বুঝলো সে তার বলা কথাগুলো তার ছোট বোনের মাথার উপর দিয়ে গিয়েছে।তাই বোনকে বুঝানোর জন্য সহজ ভাবে বলতে লাগলো_____
রাইফের মা বাবা বেঁচে আছে কিন্তু রাইফ জানে না তারা কোথায়।
মোহনা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বলল____
এইটা কি করে সম্ভব ভাইয়া? মানে মা-বাবা জীবিত আছে কিন্তু উনি এইটা জানেন না যে উনার মা বাবা কোথায়? এমনটা কেন?
মাহিন বলল___
এইটা অনেক লম্বা কাহিনী যা রাইফ কখনোই নিজ থেকে আমাকে বলেনি।আমি তো কৌতুহল বসত তার দাদীর কাছ থেকে সবটা জেনেছি। ঘটনা অনেক বছর আগের।রাইফের বাবার নাম রফিক চৌধুরী এবং রেশমা আক্তার। রাইফের দাদার নাম রিয়াদ চৌধুরী এবং রাইফের একটি চাচা আছে উনার নাম রিফাত চৌধুরী।রাইফের দাদা রাইফের বাবার বিয়ে ঠিক করেছিলেন তার এক বন্ধুর মেয়ের সাথে। যখন রফিক চৌধুরী রাজি হন না তখন তাকে চাপ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু রফিক চৌধুরী কোনভাবেই রাজি হয় না কারণ তিনি তারই ক্লাসমেট কে ভালোবাসতেন।
রেশমা আক্তার ছিলেন মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি মেয়ে।আর রফিক চৌধুরীর যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল সে ছিল বড়লোক ঘরের মেয়ে। শেষ মেশ উপায় না পেয়ে রফিক চৌধুরী রেশমা আক্তারের বাড়ি গিয়ে তার পরিবারের সামনে তাকে বিয়ে করে ফেলেন। এবং রেশমা আক্তারের পরিবার বলতে ছিল শুধু এক বড় ভাই যে নিজেও বোন কে বিয়ে দিয়ে মাথা থেকে বোঝা নামাতে উতলা হয়ে উঠে ছিল।তাই বড়লোক বাড়ির ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু মূল সমস্যা হলো যখন রাইফ চৌধুরী স্ত্রী নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।উনার বাবা এই অপমান সহ্য করতে পারেনি কারণ উনি নিজের বন্ধুকে কথা দিয়েছিলেন। তাই কথা রাখার জন্য ছোট ছেলে রিফাত চৌধুরীর সাথে বিয়ে ঠিক করেন। অবশ্য বাড়িতে অনেক ঝামেলা হয়েছিল এই তবুও ধীরে ধীরে সবকিছু ঠিক হয়ে যায়।
কিন্তু আসল বিপত্তি ঘটে তখন যখন রিফাত চৌধুরীর সাথে সেই মেয়ের বিয়ে ঠিক হয় যে মেয়ের সাথে রফিক চৌধুরীর বিয়ে হবার কথা ছিল। উনার নাম সীমা।
উনি মূলত এই পরিবারে বিয়ে করে আসেন প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। কারণ এই বাড়ির বড় ছেলেও উনাকে রিজেক্ট করে অন্য একটি মধ্যবিত্ত মেয়েকে বিয়ে করে নিয়েছেন। বিয়ের পর থেকে উনি শুধু আড়ালে আবডালে রেশমা আক্তার কে অপমান করে গিয়েছেন, যেভাবেই হোক সবার সামনে ছোট করার চেষ্টা করেছেন। অনেকবার উনি বিজয়ী হয়েছেন। রেশমা আক্তার সবটা বুঝেও মুখ বুজে সহ্য করে নিয়েছিলেন শুধুমাত্র পরিবারে কোনো ঝামেলা না হয় এজন্য। এবং এই সবের মাঝেই রাইফের জন্ম হয়। কিন্তু তবুও সীমা রেশমা আক্তার কে মেন্টালি টর্চার করা বন্ধ করেননি। উনি খুব নিখুত ভাবে ম্যানুপুলেট করতে পারতেন যার মাধ্যমে খুব তাড়াতাড়ি বাড়ির সবার প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। অবশ্য ধীরে ধীরে সবাই রেশমা আক্তার কেউ পছন্দ করা শুরু করেছিল এবং রাইফ হবার পর তো সব কিছু একদিন ঠিকঠাক হয়ে যায়।
কিন্তু সীমা নামক মহিলাটি কাল হয়ে দাঁড়ায়।উনার তখনও কোন বাচ্চা হচ্ছিল না।তাই সবাই রাইফ কে এবং রেশমা আক্তার কে ভালোবাসাতো বলে উনি হিংসা করতেন।রাইফের বয়স যখন তিন বছর হয় তখন সীমা নামক মহিলা এমন কিছু করেন যার যাতে করে সবাই উনাকে ভুল বুঝে। এবং উনার প্ল্যান সাকসেসফুল হয়।সবাই রাইফের মা কে ভুল বুঝতে শুরু করে এমনকি রাইফের বাবাও। তারপর ওই মহিলা রাইফের মা কে এমন ভাবে ম্যানুপুলেট করেন যে রাইফের মা নিজ থেকে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু উনি রাইফ কে রেখে যায় যাতে এই বাড়িতে বড় হয় এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ হয়। কারণ উনি জানেন উনার যাওয়ার কোন জায়গা নেই। এই পৃথিবীতে একা পেটের ভাত জোটাতেই হিমশিম খেতে হয় সেই জায়গায় নিজের ছোট্ট শিশু কে কি করে পালতেন? এবং ছেলের পড়াশোনার খরচ আছে তাই সব কিছু ভেবে ছেলেকে রেখেই চলে যায় বাধ্য হয়ে। কিন্তু উনার যাওয়ার মতোন যায়গা ছিলনা। উনার ভাইও আর যাই হোক কখনোই উনাকে যায়গা দিতেন না।
ওই নিকৃষ্ট মহিলা ঘটনার কে এমন ভাবে উপস্থাপন করে যে বোঝানো যায় রেশমা আক্তার পালিয়ে গিয়েছেন কারো সাথে। তারপর রাইফের বাবা রাইফ কে আকরে ধরেই জীবন কাটাতে থাকে। কিন্তু পাপ কখনো লুকানো যায় না। তেমনি একদিন সীমার করা সকল সত্যি প্রকাশ পায় তখন রাইফের চার বছর বয়স। রফিক চৌধুরী সব সত্যি জেনে তিনি পাগলের মত কাজ করতে শুরু করেন। নিজেকে দোষারোপ করে যান কি করে তিনি নিজের ভালোবাসার মানুষকে ভুল বুঝেছিলেন। নিজের স্ত্রীকে খোঁজার জন্য এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ান। বাসার দাদির কাছে থাকতো ছোট্ট রাইফ। তিন বছর বয়সেই মা কে হারায় এবং চার বছর বয়সে বাবা থাকতেও বাবাকে কাছে পায় না সে। রফিক চৌধুরী স্ত্রী কে যখন খুঁজে পেলেন না তখন উনিও সিদ্ধান্ত নিলেন বাবার এই রাজত্ব ছেড়ে চলে যাবেন। কিন্তু ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে যাননি শুধুমাত্র ছেলের ভবিষ্যতের জন্য। এখানে থাকলে ছেলে সব কিছু ভাবে ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারবে তার জন্যই ছেলেকে দাদীর কাছে রেখে চলে গেলেন।
কথা গুলো বলেই মাহিন থামলো। প্রাণ প্রিয় বন্ধু ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করতে যে তার চোখ ভেজে উঠল। এতটুকু বয়সেই মা বাবা হারা হয়েছে। হয়তো তার মা বাবা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য তাকে এখানে রেখে গিয়েছিলেন কিন্তু কখনোই এটা ভাবেননি যে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সবথেকে বেশি প্রয়োজন মা-বাবার আদর স্নেহ যা থেকে তারা নিজেদের সন্তানকে বঞ্চিত করেছেন।
আর মোহনা তো কিংকর্তববিমূঢ় হয়ে আছে। ঘটনা গুলো তার কাছে কেমন কাল্পনিক লাগছে।তারা মা যদি এখনো তাকে ছাড়া তার নানু বাড়ি চলে যায় তখন সে বাড়ি মাথায় উঠিয়ে নেয়। মা বাবা ছাড়া সে থাকতেই পারে না।আর রাইফ কিনা চার বছর বয়স হতেই মা বাবা কে হারিয়েছে। মোহনার খুব রাগ হলো রাইফের মা বাবার উপর।তার খুব ইচ্ছে জাগলো রাইফ কে নিজ চোখে সামনা সামনি দেখার জন্য। একটু কথা বলার জন্য। লোকটা কে একটু শান্তনা দেওয়ার জন্য।তার মন বলছে লোকটি ভালোবাসার কাঙাল।
রাইফের ডাকে অতীতের ভাবনা থেকে বর্তমান ফিরে এলো।রাইফের খাওয়া প্রায় শেষ। শুধু পাতে মাছ আছে।রাইফ খুব যত্ন সহকারে মাছ থেকে কাটা বেছে মোহনার দিকে এগিয়ে দিল। মোহনা নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে নিচু স্বরে বলল____
আপনি খান আমি তো খেয়েছি।
রাইফ মুচকি হেসে বলল ___
ভুলে গেলে নাকি? আগে কিন্তু সব সময় আমার খাওয়া শেষ হওয়া আগে কিছু অবশিষ্ট থাকলে তুমি খেতে জেদ করতে। বিশেষ করে মাছ, মাংস আর ডিম হলে।তাই তো তোমার জন্য ডিম আর মাছ রেখে দিয়েছি।
মোহনা একবার রাইফের প্লেটের দিকে তাকালো।আসলেই মাছ কাঁটা বাছিয়ে রাখা এর অর্ধেক ডিম।মোহনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ____
আপনার এখনো মনে আছে?
রাইফের ঠোঁটে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল।সে মোহনার চোখে চোখ রেখে বলল____
তোমাকে আর তোমার সম্পর্কের কিছু আমি কখনোই ভুলতে পারবো না মোহনা। এখন বেশি কথা না বলে খাও তো।
মোহনা আর কথা না বাড়িয়ে হা করল।রাইফ সুন্দর করে মোহনা কে খাওয়ে দিতে লাগল। মোহনার চোখের কোণে পানি জমে আছে কিন্তু অনেক কষ্টে সে নিজের পানি গড়িয়ে পরতে দিল না। মনে মনে বলল___
আমার যত্ন তো আপনি আগেও নিতেন এখনোও নিচ্ছেন। হয়তো আজীবন নিবেন।আমি জানি আপনি আমাকে কখনোই ভুলবেন না। কিন্তু ভালোবাসা? কখনোই কি পারবেন আমাকে একটু ভালো বাসতে? বেশি ভালবাসা চাইছি না তো সামান্য একটু ভালোবাসা দিন।আমি আপনাকে যতটা ভালোবাসি ততটাই যথেষ্ট হবে আমার দুজনের জন্য। আপনি শুধু একবার আমার হয়ে যান। হ্যাঁ আমি জানি খুবই স্বার্থপরের মতোন কথা বলছি। আপনার বিয়ে ঠিক হয়েছে তবুও আপনাকে চেয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কি আর করার ভালোবাসি তো তাই একটু স্বার্থপর হতে হয়। আপনাকে এত বছর ভালোবেসে দোয়া চেয়ে পাবো না আর কেউ একজন না চাইতেই পেয়ে যাবে এটাতো ভারী অন্যায়। আপনাকে অনেক ভালোবাসি। এটাই তো ভালোবাসা তাই না। আমার মত ভালবাসলে এমন ভাবে বাসো যাতে দ্বিতীয়বার ভালোবাসার সাহস না পাওয়া যায়।
মাহিন রুমে পায়চারি করছে।তার আর ধৈর্য্য সইছে না কখন রাইফের সাথে তার বাড়ি যাবে এবং নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে দেখতে পাবে।সে কবে ফিনল্যান্ড যাওয়ার আগে দেখেছিল এরপর আর দেখেনি।মন ভীষণ ছটফট করছে।
তবু গল্পটা ভালোবাসারই পর্ব ৯
অন্যদিকে মাহিম নিজের রুমে বসে বসে ভাবছে সেদিন সিঁড়িতে ধাক্কা খাওয়ার মেয়েটির কথা। মেয়েটির কথা বারবার মনে করার কারণে তার রাতে ঘুম হয় না ঠিক মতন। মেয়েটির মুখশ্রী চোখের সামনে হাসলেই অটোমেটিকলি সে হাসতে থাকে। তার জানা নেই ওই অনুভূতি সম্পর্কে কিন্তু বেশ ভালো লাগছে এই অনুভূতিকে অনুভব করতে। যেভাবেই হোক মোহনার সাথে ভালো ব্যবহার করে এই মেয়েটির সম্পর্কে জানতে হবে আর ফোন নাম্বার নিতে হবে।
