তবু গল্পটা ভালোবাসারই পর্ব ৯
নাজনীন নেছা নাবিলা
মোহনার হাত থেকে ঝাঝরি পরে গেল।টিনের থাকায় পাকা মাটিতে পরে ঝনঝন করে শব্দ হলো। কিন্তু সে শব্দে রাইফ কিংবা মোহনা কারোরই ধ্যান ভাঙলো না।রাইফ ধীর পায়ে মোহনার দিকে এগোতে লাগলো। তাদের দুজনের দূরত্ব যত কমছে হৃৎস্পন্দনের গতি তত বাড়ছে।মোহনা শক্ত করে জামার কোণা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেকে বার বার বলছে সে যেন দুর্বল না হয়ে পরে রাইফের সামনে। যত যাই হোক লোকটিকে সে পাঁচ বছর পর দেখতে চলেছে।তার চোখ যদি তাকে ধোঁকা দিয়ে কান্না করে? তখন সে কি করবে? এমনিতেই তো মন তার অভ্যন্তরে থেকে অন্য কাউকে ভালোবেসে মরছে।এত বোঝানো পরেও মন মানে না। শুধু ধোঁকা দেয়।এখন কি চোখও তার হয়ে অন্য কারোর জন্য অশ্রু বিসর্জন দেবে? যেটা সব সময় করে।এই ধোঁকা কি করে মেনে নিবে সে।
পাঁচটি দীর্ঘ বছর। হাজারো নির্ঘুম রাত আর প্রতীক্ষার প্রহর শেষে আজ সে দাঁড়িয়ে আছে তার পৃথিবীর ঠিক সমান্তরালে। বাতাসটা আজ বড় অদ্ভুত এবং শীতল,তাতে পরিচিত সেই চেনা সুবাস, যা একসময় তার ভালো এবং আনন্দে থাকার রসদ ছিল।
সামনে মোহনা দাঁড়িয়ে আছে একদম নাগালের মধ্যে। কিন্তু এক চিলতে পাতলা কাপড়ের ঘোমটা আজ এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের মাঝে। মেয়েটি সামনের দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে, যেন এক জীবন্ত প্রতিমা। রাইফের বুকের ভেতরটা এখন কোনো শান্ত সমুদ্র নয়, বরং প্রলয়ঙ্করী এক ঝড়ের পূর্বাভাসে কাঁপছে। ধুকপুকানিটা এতোটাই স্পষ্ট যে, সে নিজেই নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ শুনতে পাচ্ছে।
চোখের কোণে এক ফোঁটা তপ্ত জল টলমল করছে। এই সেই মানুষ, যার মুখচ্ছবি সে প্রতি রাতে বন্ধ চোখের পর্দায় এঁকেছে। অথচ আজ সামনে পেয়েও সে যেন এক মুহূর্তের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ঘোমটাটা সরিয়ে মুখটা দেখার এক তীব্র আকুলতা যেমন আছে, তেমনি আছে এক অজানা ভয়,যদি এই স্বপ্নটা ভেঙে যায়? যদি চোখের পলক ফেলতেই এই দৃশ্যটা মিলিয়ে যায় শূন্যে?
তার হাত দুটো কাঁপছে। নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। এক পা এগিয়ে গিয়েও সে থমকে দাঁড়াল। অনুভূতির এই চরম মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে ভালোবাসার মানুষকে ফিরে পাওয়ার এই অবর্ণনীয় যন্ত্রণাময় আনন্দ বোধহয় পৃথিবীর সবথেকে বড় বিস্ময়। সে শুধু অপলক চেয়ে রইল সেই অবনত মস্তক আর ঘোমটার আড়ালের রহস্যময়ী ছায়ার দিকে, যে কি না তার সমগ্র অস্তিত্বের মালিক।
স্তব্ধতা ভেঙে রাইফ কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকল, “ডোরামি?” কণ্ঠস্বরটা যেন নিজের অজান্তেই বুজে আসছিল, তাতে মিশে ছিল পাঁচ বছরের জমানো সব হাহাকার আর আকুতি। সেই চেনা ডাক শুনে মোহনার অত্যন্ত ধীরগতিতে মস্তক ঘোরাল। সময় যেন থমকে দাঁড়াল সেই এক পলকে। আজ কতদিন পর এই আদুরে ডাক শুনে। ডোরামি!
মোহনা ধীরে ধীরে রাইফের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো।ঘোমটার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল সেই চিরচেনা মুখশ্রী। মোহনার গায়ের রঙ যেন শরতের গোধূলি—একদম ধবধবে ফর্সা নয়, বরং শ্যামলা আর ফর্সার এক মায়াবী সংমিশ্রণ, যাকে মাটির কাছাকাছি থাকা এক উজ্জ্বল আভা বলা যায়। সেই রঙের মাঝে এক ধরণের স্নিগ্ধতা আছে, যা কৃত্রিম প্রসাধনীকে হার মানায়।
তার চোখ দুটি যেন গভীর কোনো দিঘি, যাতে কাজল দেওয়া না থাকলেও এক অদ্ভুত মায়া খেলা করছে। কোনো এক লুকায়িত ক্লান্তি আর অভিমান সেই চোখের পাতায় ভিড় করে আছে, তবুও তা উজ্জ্বল। ওড়না দিয়ে মাথাটা ঢাকা থাকলেও অবাধ্য কিছু ছোট ছোট বেবি চুল কপালে এসে লুটিয়ে পড়েছে, যা তাকে এক অদ্ভুত সারল্য দান করেছে। তার ঠোঁট দুটো পাতলা, সামান্য কম্পমান; যেন কিছু বলতে চেয়েও না বলা এক অব্যক্ত যন্ত্রণার ছাপ সেখানে লেগে আছে। সেই অধরের কোণে কোনো হাসি নেই, আছে কেবল এক বিষাদময় তৃপ্তি।
মোহনা যখন পূর্ণদৃষ্টিতে রাইফের দিকে তাকাল, রাইফের মনে হলো সে যেন এক দীর্ঘ মরুভূমি পাড়ি দিয়ে শীতল কোনো ছায়ার নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। তার শরীরের প্রতিটি লোমকূপ শিহরিত হয়ে উঠল। এই সেই দৃষ্টি, যার জন্য সে সহস্রবার মরতে পারে। তার মহীনির সেই সজল চোখের চাহনি রাইফের হৃদপিণ্ডে হাতুড়ির মতো ঘা দিচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে পৃথিবী রসাতলে গেলেও তার কোনো আক্ষেপ নেই; কারণ সে তার হারিয়ে যাওয়া স্বর্গকে ফিরে পেয়েছে। এক ধরণের তীব্র দহন আর একই সাথে পরম প্রশান্তি তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
দীর্ঘ সাতটি বছর—যার মধ্যে পাঁচটি বছর কেটেছে কোনো এক অদৃশ্য নির্বাসনে। মোহনার চোখের সামনে এখন যে মানুষটি দাঁড়িয়ে, সে তার কৈশোর আর তারুণ্যের সন্ধিক্ষণে দেখা সেই ধ্রুবতারা। একতরফা ভালোবাসার যে আগুন সে বুকের বাম পাশে সযত্নে লালন করে এসেছে, আজ তা যেন এক পূর্ণিমার প্লাবনে ধুয়ে যাচ্ছে।
মোহনা দেখল রাইফ আগে থেকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন অনেক সুদর্শন লাগছে অবশ্য তার চোখে আগেও সুদর্শন লাগতো কিন্তু এখনের রূপ যেন চোখ কেড়ে নেওয়ার মতো।রাইফের মাঝে সেই ছটফটে কিশোর সুলভ চপলতা এখন আর নেই; তার বদলে এসেছে এক দৃঢ় পৌরুষ। পাঁচ বছরের ব্যবধানে তার কাঁধ দুটো যেন আরও চওড়া হয়েছে, চোয়ালের হাড়গুলো এখন অনেক বেশি স্পষ্ট—যেন কোনো দক্ষ ভাস্করের নিপুণ ছোঁয়ায় খোদাই করা। তার গায়ের রঙ রোদে পুড়ে কিছুটা তামাটে ভাব ধারণ করেছে, যা তাকে এক ধরণের রুক্ষ কিন্তু আকর্ষণীয় সৌন্দর্য দিয়েছে। ধারালো চোয়ালের হাড় (Jawline) এবং সুগঠিত গ্রীবায় এক ধরণের রুক্ষ পৌরুষ খেলা করছে, যা তাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। তার ঠোঁট দুটো এখন আর হাসিতে ভরে ওঠে না, বরং এক ধরণের স্থিরতা সেখানে স্থায়ী বসত গেড়েছে।সবচেয়ে মায়াবী তার চোখ দুটি। সেই গভীর কৃষ্ণচূড়া চোখের মণি এখন যেন এক শান্ত আগ্নেয়গিরি।তার চোখের পাতায় লেগে থাকা সামান্য আর্দ্রতা তার কঠোর ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোমলতাকে প্রকাশ করে দিচ্ছে। মাথার সিল্কি কালো চুলগুলো কিছুটা দীর্ঘ হয়ে অবাধ্যভাবে কপালে এসে পড়েছে, যা সে বারবার সরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে।
মোহনার বুকের ভেতর তখন যেন এক অকাল বসন্তের হাহাকার। তার মনে হচ্ছিল, এই পাছ বছরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তের প্রতীক্ষা সার্থক। তার একতরফা ভালোবাসার মানুষটি আজ তার এত কাছে, যে সে চাইলে তার নিশ্বাসের তপ্ত হাওয়া অনুভব করতে পারছে। পাঁচ বছর পর প্রিয় মুখটি দর্শনে তার মনে এক অদ্ভুত হাহাকার জেগে উঠল—কেন এই দীর্ঘ বিচ্ছেদ? কেন এই অযাচিত দূরত্ব?
সে অপলক চেয়ে রাইফের সেই বিষাদমাখা চোখের দিকে। তার ইচ্ছা করছিল চিৎকার করে বলতে, “আপনি কি জানেন,আমার প্রতিটা দোয়ায় শুধু তোমার আপনার ছিল?” কিন্তু তার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এল। এক ধরণের অবশ অনুভূতি তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। সে না পারছিল হাসতে, না পারছিল কাঁদতে। কেবল তার কম্পিত দৃষ্টি দিয়ে সে রাইফের চেহারার প্রতিটি রেখা নিজের মনের মণিকোঠায় নতুন করে এঁকে নিচ্ছিল। এই মুহূর্তে তার কাছে পৃথিবী মানে কেবল এই একটি মানুষ—যার জন্য সে নিঃস্বার্থভাবে সাতটি বছর কাটিয়ে দিতে পেরেছে।
মোহনা নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে কন্ঠে চঞ্চলতা আনার চেষ্টা করে রাইফকে জিজ্ঞেস করল___
কেমন আছেন?
রাইফ তপ্ত শ্বাস ফেলল।দুই হাত কোমরে রেখে মোহনার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল____
তুমি কি সত্যিই জানতে চাও আমি কেমন আছি? তাহলে এই চাওয়া পাঁচ বছরে কেন প্রকাশ হয়নি? পাঁচ বছরের মধ্যে এক দিনও জানতে ইচ্ছে করেনি আমি কেমন আছি।
মোহনা নীরব হয়ে গেল।কি বলবে সে? আসলেই তো এই পাঁচ বছরে এসে একবারও রাইফের কোনো খোঁজ নেয়নি। অবশ্য খোঁজ নেয়নি বললে ভুল হবে, সে মূলত রাইফের যোগাযোগ রাখেনি কিন্তু বড় ভাইয়ের কাছ থেকে কিংবা মা-বাবার কাছ থেকে সব খবর নিয়েছে সে। যোগাযোগ রাখলে সে আরো ভেঙে পড়তো, হয়তো ডাক্তার খাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারত না তার জন্যই তো নীরবে গোপনে ভালোবেসে গেছে।
ভালবাসলেই যে ভালোবাসার মানুষটির সাথে কথা বলতে হবে এমনটি নয়।
মোহনা জবাব না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করে উঠলো রাইফকে_____
আমি না হয় নিজ থেকে যোগাযোগ করিনি কিন্তু আপনিও তো কখনো আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেননি।
রাইফ এইবার দমে গেল। মোহনার করা অভিযোগ তো মিথ্যে নয়। আসলেই তো সেও নিজেও কখনো নিজ থেকে যোগাযোগ করেনি। আসলে বিদেশে গিয়ে যখন মোহনার ডায়েরি পেয়েছিল তখন খুব ইতস্তত বোধ করছিল ডায়েরিটি নিয়ে। একবার ভেবেছিল মোহনাকে কল করে জানাবে যে তার ডায়রিটি তার কাছে। এবং পরবর্তীতে এখান থেকে বাংলাদেশে সেন্ড করে দেবে। কিন্তু আরেকবার মন বললো ডায়েরিটি যেন একটু হলেও খুলে পড়ে দেখা উচিত।রাইফ তাই নিজের মনের কথা শুনেছিল সেদিন। এবং যখন মোহনার ডায়েরি পড়তে শুরু করল প্রথমবার তো এক সপ্তার ভেতরেই পুরো ডায়েরী পড়ে শেষ করে ফেলেছিল। এবং এই এক সপ্তাহে মোহনার সাথে তার যোগাযোগ করা হয়নি কারণ সে তার লেখা ডায়েরি পড়তে ব্যস্ত ছিল। মোহনা সব সময় তাকে হাসিখুশি রাখত কিন্তু মোহনার ডাইরি পড়ে সে বুঝতে পারল মোহনা কাউকে ভালবেসে নিজে সবসময় দুঃখী থেকেছে। রাইফের বরাবরই মোহনার প্রতি সফট কর্নার ছিল। সে কখনোই মোহনাকে দুঃখী দেখতে পারত না। তার ওপর মোহনা তার জন্য যা যা করেছে মোহনা কে কষ্টে দেখাতো বলতে গেলে অসম্ভব তার জন্য। আর সেই জায়গায় সে মোহনার কষ্টে, অশ্রুবিসর্জন দিতে দিতে লেখা ডায়েরি পড়ে নিজেই অনেকটা ডিপ্রেসড হয়ে গিয়েছিল। তারপর কখন যে সে মোহনাকে ভালোবেসে ফেলেছে সে নিজেও ভাবতে পারেনি। এবং যখন ডায়েরি পড়ে বুঝতে পারলাম মোহনা যাকে একতরফা ভালোবাসে তাকে না দেখে ভালোবেসে ফেলেছিল তাই সেও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে মোহনাকে এখন না দেখে ভালোবেসে যাবে। আর মোহনা কখনো নিজ থেকে তার সাথে কথা বলেনি বলে সেও আর কথা বলেনি।
কিন্তু এর জন্য এখন আফসোস হয়। এই পাঁচ বছরের মোহনার কণ্ঠস্বর হলেও তো অন্তত সে শুনতে পারতো কিন্তু নিজের বোকামির কারণে এই সুন্দর অনুভূতি থেকে নিজেকে ধরে রেখেছে। তাই আজ মোহনার প্রশ্নের জবাব নেই তার কাছে। অবশ্য বরাবরই এই মেয়ের কাছে প্রশ্নের উত্তর দেবার ক্ষেত্রে সে হেরে যায়। আজও সে হেরে গেল।
মোহনা খানিকক্ষণ রাইফের দিকে তাকিয়ে থেকে স্মিত হাসলো এবং বলল____
সব সময়ের মতো আজকেও আপনার কাছে আমার প্রশ্নের জবাব নেই।
রাইফ মাথা নিচু করে ফেলল। মোহনার নজর গেল রাইফের পাতলা সিল্কি চুলের দিকে। খুব ইচ্ছে হলো এই চুলগুলো একটু ছুঁয়ে দিতে। আজ কত বছর হয়েছে সেই চুলগুলো ছুঁয়ে দেখেনা। আগে যখন রাইফ তাদের বাসায় আসতো তখন সে আর আড়ালে আবডালে রাইফের চুল গুলো ছুঁয়ে দিত। বিশেষ করে যখন রাইফ এসে মাহিনের ঘরে ঘুমাতো তখন সেই এই কাজটি করতো। সে রাইফের চুল খুব বেশি পছন্দ করে। তাই তো রাইফের চুল ধরা থেকে নিজেকে সংযত করতে পারত না সে।
নিজের সাথে যুদ্ধে বরাবরই মোহনা হেরে যেত। কিন্তু অবাক করার বিষয় হল আজ সে যেতে গিয়েছে। রাইফের চুল ছোঁয়ার জন্য তার হাত ছটফট করছে, মন পারছে না বের হয়ে আসতে। তবু সে নিজের হাত নড়ালো না। এইটা কেমন গল্প ঠিক সে বুঝলো না। তার ভালোবাসার গল্পটা যদি সেদিন হাতে লিখতে পারতো তাহলে অবশ্যই গল্পটায় নিজেকে খুশি রাখতো। যেখানে তাকে তার একতরফা ভালোবাসার মানুষটিও ভালোবাসতো। যাকে বলে #তবুও_গল্পটা_ভালোবাসারই
মোহনা রাইফের দিকে তাকিয়ে বলল____
হয়েছে এখন ভেতরে চলুন। মামনি এবং বাবাই বাড়ি চলে গিয়েছে। ভেতরে গিয়ে আগে খাবার খেয়ে নিন তারপর আপনাকে আবার বাড়ি ফিরতে হবে।
রাইফ মাথা উঁচু করে অভিমান করার ভঙ্গি ধরে বলল____
আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছো?
মোহনা এবার না চাইতেও হেসে উঠল। এই একটি মাত্র ব্যক্তি পারে তাকে শত দুঃখের মাঝেও হাসাতে। মন থেকে কালো মেঘ সরিয়ে সূর্যের আলো ফুটিয়ে তুলতে। সে হাসতে হাসতে সামনের দিকে এগোতে লাগলো এবং বলল____
আপনাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলে কি আপনার মনে হয় আমার মা বাবা আমাকে আস্ত রাখবে? নিজের জান প্রিয় আমার কাছে।
রাইফ মাথা চুলকে হেসে উঠলো। আসলেই এই বাড়ির প্রত্যেকটি সদস্য তাকে খুব ভালবাসে মোহনাও তাকে ভালবাসে এই কথাটি সে জানে। কিন্তু সে যেই ভালোবাসা এক্সপ্যাক্ট করছে মোহনার কাছ থেকে সে ভালোবাসা কি আদৌও সে পাবে? ভাবতে ভাবতে সে মোহনার কাছে চলে এলো। এখন দুজন মিলে পাশাপাশি হাঁটছে।
আজ অনেকগুলো বছর পর আবার তারা দুজন পাশাপাশি হাঁটছে। আগে কতইনা এভাবে পাশাপাশি হেঁটে এখান থেকে সেখানে যেত। এমনকি এভাবেই পাশাপাশি হেঁটে মোহনার সাহায্যে সে নিজের মা-বাবাকে ফিরে পেয়েছিল। যে মা বাবার চেহারা ছোট থাকতে শুধু একবার ছবিতে দেখেছিল এবং পরবর্তীতে অভিমানে সেই ছবি পর্যন্ত দেখেনি। শুধুমাত্র মোহনার জন্য এভাবে হাটতে হাঁটতে সেই মা-বাবাকে সামনাসামনি দেখতে পেয়েছিল সে।
তবু গল্পটা ভালোবাসারই পর্ব ৮
পুরনো দিনগুলো মনে পড়লে আজও তার চোখে পানি চলে আসে। এই মেয়েটি নিঃস্বার্থভাবে সবার জন্য সবকিছু করতে পারে। আর তার জন্য যা করেছিল তা কখনোই ভুলে যাবার মত না। এই মেয়েটিও কারোর ভালোবাসার জন্য ছটফট করে। ভাবতেই রাইফের বুক থেকে তপ্ত শেষ বের হয়ে আসে। সে যদি পারতো তাহলে এই পুরো পৃথিবী এই মেয়েটিকে দিয়ে দিবে। পুরো পৃথিবীর ভালোবাসা একাই এই মেয়েটিকে দিত। কিন্তু আসল প্রশ্ন হচ্ছে তার ভালোবাসা কি গ্রহণযোগ্য হবে?
