তবু গল্পটা ভালোবাসারই পর্ব ৮
নাজনীন নেছা নাবিলা
ঢাকা শহরের সকাল মানেই যেন এক অদ্ভুত কোলাহল আর প্রকৃতির খেয়ালি রূপের মিশ্রণ। ভোরের প্রথম আলোয় ব্যস্ততার শুরু, যেখানে আংশিক মেঘলা আকাশ আর কিছুটা গুমোট বাতাসের মাঝে নগরজীবন জেগে ওঠে। আকাশ কখনো ঘোলাটে, কখনো রোদ্দুর, আর মাঝে মাঝে বাতাসের মৃদু দোলায় ধূলিকণা ও আদ্রতার এক অদ্ভুত অস্বস্তিকর আবহ তৈরি হয়।
মোহনার ঘুম ভাঙতেই সে নড়ে চড়ে উঠলো। ধীরে চোখ মেলে তাকাতেই নিজকে মেঝেতে শোয়া অবস্থায় পেল। গত রাতে যখন সে রাইফের কাছ থেকে ফুল নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দরজার পাশে বসে পড়েছিল, এরপর কিছুক্ষণ এভাবেই বসে থেকে ছিল সে। ঘরে হলুদ রঙের নিভু আলো ছিল। তার এক হাতে ছিল গোলাপ ফুলের তোড়া এবং অন্য হাত ছিল আঘাতে ভরা।হাতের তালুতে ছোট ছোট গর্ত হয়ে গিয়েছে ফুলের কাঁটায়। রক্ত জমাট বেঁধে আছে। কিন্তু মোহনার নিজের ব্যথার দিকে কোন ধ্যান ছিল না, সে তো এক ধ্যানে রাইফের দেওয়া ফুল দেখছিল। চোখে ছিল অশ্রু।এই অনুভূতির কথা না সে আগে কখনো বুঝিয়ে বলতে পেরেছে আর না সে এখন পারছে। এবং তার মনে হয় তার এই ভালোবাসা এই অনুভূতির কথা সেই কখনোই বুঝিয়ে বলতেও পারবেনা।কখন যে মোহনা রাইফের দেওয়া ফুলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পরেছিল নিজেরও খেয়াল নেই ।তাই তো ঘুম থেকে উঠে আগে নিজেকে মেঝেতে আবিষ্কার করল।মনটা আজ ফুরফুরে লাগছে।রাইফের কন্ঠই যথেষ্ট তার মন ভালো করার জন্য।আর সেই যায়গায় তো আজ অনেকদিন পর রাইফের কন্ঠে গান শুনলো।মন খারাপ থাকার প্রশ্নই উঠে না।
মোহনা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল ফুলের তোড়া গুলো এভাবেই আছে তার হাত।গত রাতে তো সব কিছু তার কাছে স্বপ্নের মতো লাগছিল।অথচ যা ঘটেছে তা স্বপ্ন না বরং সত্যি ভাবতেই মোহনার পশম দাঁড়িয়ে পরছে। শরীরে এক ঝাঁকুনি লাগছে।মনে হয় আল্লাহ তাকে তার ভালোবাসার মানুষটির দেওয়া কোনো ইশারা দিচ্ছেন।মোহনা আর এভাবে বসে থেকে সময় নষ্ট করলো না।উঠে আয়নার সামনে গেল।জানাল খোলা থাকায় বাহির থেকে সূর্যের আলোর কারণে রুম আলোকিত হয়ে আছে।
আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজের প্রতিবিম্ব দেখে শিউরে উঠল মোহনা। এই কয়দিনে সে নিজেকে একবারও আয়নায় দেখার প্রয়োজন বোধ করলো না। গত দুই-তিন দিন একনাগাড়ে কামনার দহন, না খেয়ে থাকা আর বিনিদ্র রজনী তার লাবণ্যকে এক নিমেষে শুষে নিয়েছে। আয়নায় ফুটে ওঠা ওই পাণ্ডুর মুখটি যেন তার চেনা সেই সতেজ যুবতীর প্রতিচ্ছবি নয়, বরং কোনো এক ক্লান্ত বিদেহী আত্মার ছায়া।
অনিদ্রার নীলচে কালশিটে চোখের নিচে গভীর গর্তের মতো বসে গেছে; মণি দুটো এখন আর চঞ্চল নয়, বরং তপ্ত তুষারের মতো ধিকিধিকি জ্বলছে। মোহনার গাল দুটো তুবড়ে গিয়ে চোয়ালের হাড়গুলো অসংলগ্নভাবে উঁকি দিচ্ছে। একসময়ের রক্তিম ঠোঁট দুটো এখন পান্ডুর, তৃষ্ণার্ত মরুভূমির মতো ফেটে চৌচির হয়ে আছে। বিশৃঙ্খল রুক্ষ চুলগুলো কপালের ওপর লেপ্টে থেকে তার এই বিধ্বস্ত রূপকে যেন আরও প্রকট করে তুলেছে। সে নিজের চোখের দিকে তাকাতে পারল না; মনে হলো, আয়নার ওপাশ থেকে কেউ একজন তার ভেতরের হাহাকার আর অতৃপ্তির নগ্ন রূপটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
নিজের কপালে নিজেই হাত রেখে বললো____
হায় মোহনা তোর রাইফ এসেছে আর তুই করছিস ছলনা?
নিজের বলার কথা নিজের কানে যেতেই হেসে উঠলো। আজ তিনদিন পর সে এরকমভাবে হাসলো। অবশ্য গত রাতেও রাইফের কথা শুনে হেসেছিল। এখন রাইফের বলা কথা পুনরাবৃত্তি করতেই হেসে উঠলো।
আয়নার সামনে নিজের বিধ্বস্ত রূপ দেখে সে স্থির করল, এই মলিনতা নিয়ে আর যাই হোক রাইফের সামনে যাওয়া চলে না। কৃত্রিম প্রসাধন বা কেমিক্যালযুক্ত প্রসাধনী বরাবরই তার অপছন্দের, কিন্তু নিজের যত্ন নেওয়াটা তার স্বভাবজাত। সে কখনোই স্কিন কেয়ার করেনি, প্রোডাক্ট ব্যবহার করে। তো তাই বলে একেবারেই স্কিন কেয়ার ছাড়া থাকে নি। মেয়ে মানুষ অবশ্যই ত্বকের যত্ন নেয়া উচিত। তার মতে মেয়ে এবং ছেলে উভয়েরই ত্বকের যত্ন নেওয়া উচিত। সেটা ঘরোয়া ভাবে হোক না কেন। আর বাহিরের প্রোডাক্ট ব্যবহার করা থেকে ঘরোয়া জিনিস ব্যবহার করা উত্তম মনে করে। মোহনার স্কিন কেয়ারের জিনিস বলতে চালের গুঁড়ো, কিংবা বেসনের গুঁড়ো, কাঁচা দুধ, মধু,লেবু, কফি, হলুদের গুঁড়ো, গোলাপজলএবং বরফ এসবই, কটন। তাই তার ঘরে সব সময় এগুলো থাকে।
সে ধীর পায়ে ঘরের কোণে থাকা ছোট ফ্রিজটি খুলল। ভেতর থেকে বের করে আনল এক বাটি ঠান্ডা কাঁচা দুধ। ড্রয়ার থেকে একে একে বের করে নিল খাঁটি মধু, গোলাপ জল, যে বক্সের চালের গুঁড়ো ছিল সেই বক্স, হলুদের গুঁড়োর বক্স আর কফির কৌটো।
সে যেন এক মগ্ন সাধিকার মতো নিজের রূপচর্চার আয়োজন শুরু করল। প্রথমে ওয়াশরুম থেকে গিয়ে আগে ব্রাশ করে ভালো করে সাবান দিয়ে মুখ ধুয়ে নিল এবং হাত পরিষ্কার করে নিল। কারণ স্কিন কেয়ার করার আগে হাত পরিষ্কার থাকা একটি মেইন পয়েন্ট।
তারপর রুমে এসে মুখ মুছে প্রথমে সামান্য তুলা দুধে ভিজিয়ে আলতো করে পুরো মুখটা মুছে নিল; নিমিষেই কয়েক দিনের জমে থাকা ক্লান্তি আর ধুলোবালি ধুয়ে গিয়ে ত্বক কিছুটা প্রাণ ফিরে পেল। এরপর কফির দানা আর মধুর এক মিশ্রণ তৈরি করে সযত্নে মুখে মেখে নিল—যাতে বিনিদ্র রাতের ওই ফোলা ভাব আর রুক্ষতাটুকু দূর হয়ে যায়। কফির ঘ্রাণে ঘরের গুমোট ভাবটাও যেন খানিকটা হালকা হলো।
সবশেষে, চালের গুড়োতে এক চিমটি কাঁচা হলুদ আর কয়েক ফোঁটা গোলাপ জল এবং অল্প একটু গরুর দুধ ও সামান্য পরিমাণ মধুর ফোটা মিশিয়ে তৈরি করল এক প্রলেপ। ঠান্ডা দুধের ছোঁয়ায় আর গোলাপ জলের স্নিগ্ধতায় তার জ্বালাপোড়া করা ত্বকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এল। কিছুক্ষণ পর যখন সে মুখ ধুয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল, তখন আর সেই পাণ্ডুর চেহারাটা নেই। পাণ্ডুর ভাব কেটে গিয়ে ত্বকে এক স্নিগ্ধ, স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ফুটে উঠেছে। সে নিজেকে প্রস্তুত অনুভব করল—এবার সে তার প্রিয় মানুষটির চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারবে।
মোহনার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠতেই হঠাৎ তার মনে পড়ল যে মানুষটির জন্য এত সাজসজ্জা করছে সেই মানুষটির অন্য কারো সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু মোহনা নিজেরও ফুরফুরে হওয়া মনকে আর বিষন্নতায় মাখাতে চায় না। তাই আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের চোখে চোখ রেখে বলতে শুরু করল____
দেখ মোহনা রাইফের বিয়ে ঠিক হয়েছে কিন্তু এখনো তো বিয়ে হয়নি তাই না? আর আগে যখন তুই তার সাথে চলাফেরা করতি তখন তুই ছোট ছিলি। আর এখন তুই কত বড় হয়ে গিয়েছিস। তাছাড়াও তো উনি আগে থেকেই তোর কেয়ার করতো হতে পারে এখন তোর সাথে একটু সময় কাটালে এই কেয়ার ভালোবাসায় পরিণত হতে পারে। হতে পারে তোর ভালোবাসার মানুষটি তোর হয়ে যাবে। তাহলে হার মেনে কেন তুই ঘরে ঘাপটি মেরে বসে থাকবি এবং নিজের ক্ষতি করবি? এইসব কারণে তুই যে সাবজেক্টে সবসময় হাইস্ট মার্ক পেয়ে এসেছিলি এতদিন সেই সাবজেক্টে ফেল করেছিস। যদি তোর ভালোবাসার মানুষ দিয়ে কথা জানতে পারে তাহলে সে কতটা কষ্ট পাবে বুঝতে পারছিস? কেন শুধু শুধু নিজেকে এবং নিজের ভালবাসার মানুষকে কষ্ট দিবি? সাত বছরে কম প্রার্থনা করিস নি তো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সাথে তাহাজ্জুদের দোয়াতে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে চেয়ে এসেছিস। তার অসুখ-বিসুখে এবং তার প্রত্যেক পরীক্ষায় মানত রোজা রেখে দোয়া করতি।এমনকি সেই মানুষটির বিয়ে ঠিক হয়েছে তবুও তাকে চাওয়া বন্ধ করতে পারিস নি আল্লাহর দরবারে। যেহেতু সে এখনো তোকে মনে রেখেছে তাহলে আরেকটা চান্স নিয়ে দেখ। যেহেতু এই ইচ্ছাটা আল্লাহ তোর মন থেকে উঠিয়ে নিচ্ছেন না তার মানে অবশ্যই তোর জন্য উনি উত্তম পরিকল্পনা করে রেখেছেন। তাই মন খারাপ করে ছ্যাকা খোরদের মত ঘরে বসে না থেকে নিজের হক নিজের ভালোবাসা পাওয়ার বিরুদ্ধে নাম। নিজের সাথে নিজে ঘরে বসে লড়াই না করে নিজের ভালোবাসার মানুষকে পাবার যুদ্ধ বিপক্ষে সাথে লড়াই কর। দেখবি আল্লাহ খুশি হয়ে তোকে তোর ভালোবাসা দিয়ে দিবে।”
নিজেকে অনেকক্ষণ জ্ঞান দেয়ার পর কিছুটা শান্ত হলো মোহনা। হঠাৎ মনে পড়ল কাল থেকে তাদের বাসায় রাইফের মা বাবা এসেছে অথচ সে ভালো করে তাদের সামনে যায়নি এবং কথাও বলেনি জিনিসটা একেবারেই নিচু মন মানসিকতার কাজ। তার দ্বারা এইসব কাজকর্ম হওয়া ঠিক না তাই সুন্দর করে মাথায় ঘোমটা দিয়ে রুমের বাইরে চলে এলো। কিন্তু তবুও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে আর যাই হোক এত সহজে রাইফের সামনে সে পরবে না।সেও তো যখন রাইফের কথা নিজের ভাইয়ের কাছ থেকে প্রথমবার শুনেছিল তখন এক নজর দেখার জন্য কতটা ছটফট করেছিল। অবশ্য সে তখন ভালবাসতে শুরু করেছিল রাইফকে না দেখেই। কিন্তু এখনকার জিনিসটা একদম ভিন্ন। রাইফ তো আর তাকে ভালবাসেনা। তবুও যেহেতু তাকে দেখার জন্য ছটফট করছে তাই এত সহজে সে ধরা দিবে না বরং আরেকটু ছটফট করাবে।
বেলা গড়িয়ে দুপুর হতে চললো অথচ এখনো রাইফের দেখা নেই। এইদিকে তার মা বাবা প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে তাদের বাড়িতে ফিরে যাবার জন্য। ওখানে তাদের বাড়ির মানুষগুলোও রাইফ কে দেখার জন্য উসখুস করছে। কিন্তু যখন মাহিন কে রাইফের কথা জিজ্ঞেস করা হলো তখন সে খুব সহজেই মিথ্যা বলে দিল যে যে রাইফ রাতে এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিল বলে অনেক দেরি করে ফেলেছে তাই এখনও ঘুম থেকে উঠতে পারেনি। মোহনা তো অবাক চোখে তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ সে নিজেই রাইফের সাথে কথা বলেছিল যখন সে পাশের বাড়িতে ছিল। মোহনার বোধগম্য হচ্ছে না কেন তার ভাই মিথ্যে বলেছে। আর কেনই বা রাইফ এ বাড়ি ছেড়ে আরেক বাড়িতে গিয়ে থেকেছেন। অনেক কনফিউশনে ভুগছে মোহনা।
এই দিকে রফিক চৌধুরী এবং রেশমা আক্তারের বাড়ি যাওয়ার তাড়া আছে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিল এখন তারা চলে যাবে এবং পরে রাইফ, মাহিন,মাহিম এবং মোহনা সবাই আসবে। কিন্তু মোহনা তো এখন ভয়ে আছে। কারণ এখন যদি সবার সাথে সে ওই বাড়িতে যায় তাহলে অবশ্যই রাইফের সাথে মুখোমুখি হতে হবে তার। কথায় আছে যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়। মোহনার হয়েছে সেই দশা।
রাইফের ঘুম ভাঙল বেলা এগারোটার ত্রিশের দিকে। চোখ কচলাতে কচলাতে বিছানায় উঠে বসলো। গতরাতে বারান্দায় কিছুক্ষণ নাচানাচি করার পর নিজের রুমে চলে এসেছিল। মোহনা মধুর কণ্ঠস্বর শোনার পর তার মনে হচ্ছে সে যেন স্বর্গে ছিল এতক্ষণ যাবৎ। ইচ্ছে করছে মোহনাকে নিজের সামনে বসিয়ে রেখে সারাক্ষণ তার কথা শুনতে। এখন আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া আদায় করছি যে তাকে এত সুন্দর একটি মূহুর্তে উপহার দেওয়ার জন্য।
গত রাতের কথা মনে পড়তেই তার ঠোঁটে সকাল সকাল হাসি ফুটে উঠলো। বিছানায় বালিশের কাছেই তার ফোন ছিল ফোন হাতে নিয়ে সময় দেখতেই তার চোখ বের হয়ে আসার উপক্রম। অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছি সে। তাই আর দেরি না করেই বিছানা সেরে চটপট উঠে ওয়াশরুমে চলে গেল।
ভিজে শরীর নিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো রাইফ। তার অবিন্যস্ত চুল থেকে তখনও টপটপ করে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে চওড়া কাঁধ বেয়ে। সুঠাম দেহের প্রতিটি পেশি যেন কোনো দক্ষ ভাস্করের নিপুণ হাতের কারুকাজ—বুকের প্রশস্ত খাঁচায় বিন্দু বিন্দু জলকণা হিরের মতো ঝিলিক দিচ্ছে। পেটের সুগঠিত পেশি বা ‘সিক্স প্যাক’-এর ভাঁজে জলরেখাগুলো এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করেছে।
সে লাগেজ খুলে বের করে নিল তার পছন্দের ধবধবে সাদা লিনেন শার্ট এবং গাঢ় নীল ডেনিম। ইস্ত্রি করা শার্টটি গায়ে জড়াতেই ভিজে শরীরের ছোঁয়ায় তা কিছুটা লেপ্টে রইল, যা তার পেশিবহুল অবয়বকে আরও স্পষ্ট করে তুলল। শার্টের ওপরের দুটো বোতাম সে খোলা রাখল অবহেলায়। ডেনিমটা কোমরে এঁটে নিতেই ফুটে উঠল তার দীর্ঘদেহী গড়ন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দুহাতে চুলগুলো একবার পেছনের দিকে ঠেলে দিতেই ছিটিয়ে পড়ল জলকণা—পুরো অবয়বে মিশে থাকল এক সতেজ আর উদাসীন আভিজাত্য।
ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি এবং চোখ প্রিয় মানুষটিকে দেখার আকাঙ্ক্ষা।রাইফ আর দেরি না করে ফোন হাতে নিল।দেখলো অলরেডি মাহিন তাকে মেসেজে সকালের ঘটনা বলে রেখেছে। সবকিছু পড়ে সে ফোন পকেটে ভরে বেরিয়ে গেল মোহনাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। এই বাড়ি থেকে ওই বাড়ি যেতে সর্বোচ্চ ২ মিনিট লাগবে।
রুম থেকে বের হতেই রাইফের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি দিল। কে চটপট পকেট থেকে ফোন বের করে মোহনার ডায়েরিতে যেই গান লেখা ছিল সেই গান চালু করল। কারণ মাহিন মেসেজে বলেছিল যে মোহনা ড্রয়িং রুমে আছে। তাই যখন রাইফ ওই বাড়িতে ঢুকবে তখন এই গানটি তার ফোনে চলতে থাকবে এবং তখন মোহনাও সেখানে থাকবে বিষয়টি অনেকটা ফিল্মি হয়ে যাবে। এই কথা ভেবেই সেই গান চালু করে আবার মোহনার বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল।
মোহনা রাইফের মা বাবা কে বিদায় দিয়ে বাড়ির উঠানে থাকা গাছগুলোতে পানি দিতে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু তার মন ছিল গতরাতের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মাঝে। মন থেকে একেবারে সরে গিয়েছিল যে মানুষের কথা সে ভাবছে সে মানুষটির বিয়ে ঠিক হয়েছে। সে তো শুধু ছটফট করছে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে একবার নজরে দেখাবেন না। সে নিজের দেখা না দিক কিন্তু নিজে তো দেখতেই পারবে। তাই তো ভালো করে মাথায় ঘোমটা দিয়ে উঠানে এসে গাছ গুলোতে পানি দিচ্ছে। যখন রাইফ বাড়ির ভেতর ঢুকবে তখন তাকে না দেখলেও সে ঠিকই নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে দেখতে পাবে।
অন্যদিকে রাইফ চলে এসেছে মোহনাদের বাড়িতে। মেন গেট খুলে ভেতরে প্রবেশ করব। মোহনার হাত এতক্ষণ ব্যস্ত ছিল গাছে পানি দেওয়া আছে কিন্তু কানে চেনা পরিচিত গানের লাইন ভেসে আসতেই তার হাত থেমে গেল। ভেতরে কম্পন ধরে গেল। রাইফ ভিতরে ঢুকতেই হঠাৎ দেখল কেউ একজন মাথায় ঘোমটা দিয়ে গাছে পানি দিচ্ছে।রাইফ প্রথমে পাত্তা না দিয়ে ভেতরে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেও হঠাৎ তার মস্তিষ্ককে কারেন্টের শক লাগলো। মনে হল যখন সে গাছে পানি দেওয়া ব্যক্তিটির দিকে তাকিয়ে ছিল তখন তার দৃষ্টি ন্যানো সেকেন্ডের জন্য গিয়েছিল ব্যক্তিটির হাতে। ব্যক্তিটির হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে আংটি ছিল যেই আংটি টা রাইফের খুব পরিচিত।তাই রাইফ আবার দুই কদম পিছিয়ে এলো এবং গাছের পানি দিতে থাকা মেয়েটির দিকে আরেকবার মাথা কাত করে তাকালো।
অন্যদিকে মোহনা অবস্থা একদম কাহিল। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। হৃদপিণ্ড অনেক জোরে জোরে শব্দ করছে। মনে হচ্ছে কেউ তার বক্ষঃস্থলে হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি দিচ্ছে। গেট দিয়ে প্রবেশ করা ব্যক্তিটি কে এটি সে এখনো দেখেনি কিন্তু তার বুকের ভেতর যে উথাল-পাথাল শুরু হয়ে গিয়েছে এতে সে বুঝতে পেরেছে এই ব্যক্তিটি আর কেউ নয় বরং তার ভালোবাসার মানুষ। তার জন্যই সেই দিকে তাকানো সাহস পাচ্ছে না। ঘোমটার কারণে তার মুখ এমন ভাবে ডাকা যে সে চোখ বাঁকিয়েও দেখতে পারছে না।
অন্যদিকে রাইফের দৃষ্টি আটকে রইল মেয়েটির হাতের কোন নিষ্ঠুর আঙ্গুলে থাকা আংটির দিকে।রাইফের চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না যে এই আংটিটি সে দিয়েছিল মোহনাকে যখন সে দেশ ছেড়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে তার ঠোঁটের ফোনে হাসি ফুটে উঠলো। এই মেয়েটি তার মোহনা। ঘনঘন নিঃশ্বাস নিয়ে নিজের আনন্দকে চেপে রাখার প্রচেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু নিজের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শব্দ করে ডাক দিয়ে উঠলো।
“মহীনি”
মোহনার যেন পুরো পৃথিবী থমকে গেল। রাইফ কখনোই তাকে এই নামে ডাকে নি। সব সময় চাইত রাইফ একবার হলেও যেন তাকে মোহনা বলে ডাকে যখন তাকে ডোরামি বলে ডাকত তখন সে সব সময় চাইতো যে তার ভালোবাসার মানুষটি তাকে একবার হলেওমোহিনী বলে ডাকে। আর আজ সেটি ঘটল। মোহনা দম আটকে আসার উপক্রম হাত কাঁপতে লাগলো। চোখে নোনা জল এসে জমাট বাঁধলো।
আর লাইফের পকেটে থাকা মোবাইলে গানের লাইন বেশে আসছে দুজনের কানে____
তবু গল্পটা ভালোবাসারই পর্ব ৭
শুনেছি,কত শুনেছি
আমি তোমার কাহিনী
শুনেছি,কত শুনেছি
আমি তোমার কাহিনী
তাই শুনে,মনে মনে
হো..তাই শুনে,মনে মনে
হয়েছি তোমার..মোহিনী
