তবু গল্পটা ভালোবাসারই পর্ব ৭
নাজনীন নেছা নাবিলা
মোহনার বুক ধুকপুক করছে।চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। কত বছর পর আজ মোহনা নিজের ভালোবাসার মানুষটির কন্ঠস্বর শুনতে পেলো।চোখ বন্ধে করে মনে করতে লাগলো রাইফের বলা শেষ কথা।২০২০ সালের ১১:২৫ এ রাইফ যখন এয়ার পোর্টে মোহনার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিল তখন মোহনা কে বলেছিল___
ডোরামি আসছি আমি। নিজের খেয়াল রাখবে কেমন?আর আমাকে ভুলে যেও না ওকে?আর পড়াশোনা ভালো করে করো ডাক্তার হতে হবে তো তাইনা? নিজের স্বপ্নের পাশাপাশি আমার স্বপ্নও তোমাকে পূরণ করতে হবে তোমাকে।আর আমার জন্য যা করলে তার জন্য আমি চির কৃতজ্ঞ থাকবো মোহনা।
কথাগুলো বলেই রাইফ পকেট থেকে একটা ছোট আংটি বের করে মোহনার কনিষ্ঠ আঙুলে পরিয়ে দিল।মোহনা শুধু চোখ বন্ধ করে এই মুহুর্তটা উপভোগ করেছিল।রাইফ মোহনার হাতে আংটি পরিয়ে দিয়ে বলল___
আসছি আল্লাহ হাফেজ। ফিরে এসে যেনো এমনই গুলুমুলু দেখি। এবং সবসময়ই হাসি খুশি থাকবি কেমন?আসছি।
এই ছিল লাস্ট কথা মোহনা আর রাইফের। তারপর যখন মোহনা বাড়ি নিজের ডায়েরি খুঁজে পায়নি তখন শোক পালন করতে গিয়ে আর রাইফের সাথে কথা হয়নি তার। এবং পরবর্তীতে রাইফের সাথে কথা বললে যদি আরো দুর্বল হয়ে পরে এবং পুরোনো স্মৃতি মনে এই ভেবে আর কথা বলেওনি সে।তার জন্যই রাইফের কন্ঠও শুনেনি এই পাঁচ বছরে।আর আজ পাঁচ বছর পর রাইফের কন্ঠে গান শুনল।সেই আগের মতই তার মন নিমিষেই ভালো হয়ে গেল।চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পরলেও ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। মন থেকে জেন পাথর সড়ে গেল। একতরফা ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশ করা যায় না।যে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে সেই জানে এই অনুভূতিটা কেমন।মোহনা ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিয়ে নিজের স্বাভাবিক করছে।জানালা দিয়ে বাতাস এসে তার চুল গুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। জানালার ফাঁক দিয়ে চুল গুলো বাহিরে উড়ছে।রাইফ চাঁদের আলোয় মোহনার উড়তে থাকা চুল গুলো স্পষ্ট ভাবে দেখতে পেলো।তার মনে হচ্ছে সে যেন পাগল হয়ে যাবে এই মেয়েটিকে পাওয়া জন্য।পাগল হয়ে যাচ্ছে কেবল মেয়েটিকে একটি নজর দেখার জন্য।রাইফের কান যেন উসখুস করছে মোহনার কন্ঠ শোনার জন্য।রাইফ আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। কন্ঠে দুষ্টুমির ঝলক এনে ছন্দে ছন্দে বলতে লাগলো ____
মোহনা ও মোহনা,
কেন করো ছলনা?
একটু দেখা দেও না।
আচ্ছা দেখা না দিলেও সই,
চলো না একটু কথা কোই।
এই পূর্ণিমা রাতে চাঁদের আলোয়,
কথা বলতে কিন্তু লাগবে ভালোই।
একটু মুখ খানি দেখালে কিইবা হবে?
আকাশে এবং জমিতে আজ দুটি চাঁদ দেখা যাবে।
মোহনা ও মোহনা
তুমি তো অনেক ভালো তাই না?
একটু দেখা দেও না,
একটু কথা বলো না।
ঘরে বসে না থেকে
একটু বারান্দায় আসো না।
রাইফের বলা ছন্দ শুনে মোহনা কান্নার মাঝে হেসে উঠলো।এই একটা মানুষই পারে তাকে কান্না করার মাঝেও হাসাতে। কিন্তু এই মানুষটি কি জানে সে যার কান্না সহ্য করতে পারে না তার কান্না পিছনে সে নিজেই দায়ী। হয়তো জানে না তাই কাঁদায়। জানলে হয়তো কাঁদতে দিত না অথবা আরো বেশি কাঁদাতো।
মোহনার এখন আর এই সব নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই।সে তো এই মানুষটির জন্য সব করতে পারে।তাই চোখ মুখ মাথায় ঘোমটা দিল ভালো করে। বারান্দার দরজা খুলে বারান্দায় চলে গেলো। চারপাশ একদম অন্ধকার। শুধু চাঁদের আলো আছে। কিন্তু মাঝে মাঝে কালো মেঘ সেই আলো ঢেকে দিচ্ছে। দুটো বিল্ডিংয়ের মাঝে বেশ কিছুটা দুরত্ব আছে।রাইফের কফি ঠান্ডা হয়ে জল হয়ে গেছে সেদিন তার খেয়াল নেই।সে শুধু উঁকি ঝুঁকি মারছে মোহনা কে দেখার জন্য। কিন্তু অন্ধকারে মোহনার মুগ স্পষ্ট হচ্ছে না তার চোখে। কারণ মোহনার রুমের লাইট নিভিয়ে রাখা ছিল।
আর মোহনা তো মাথায় ঘোমটা দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। ভেতর ভেতর নিজের সাথে লড়াই করছিল।সে তো ভুলেই গিয়েছিল এই মানুষটির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।সে তো এখন রাইফ কে নিজের একান্ত ভালোবাসার মানুষ ভাবছে।সে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালবাসে যাবে।
রাইফ নীরবে কেবল মোহনার ছায়া দেগে যাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে সে এই মেয়েটির ছায়া কেও ভালোবেসে ফেলেছে।তার ইচ্ছে করছে মোহন ছায়ার ছায়া হয়ে থাকতে।এই ছায়া কেই নিজের সাথে জড়িয়ে রাখতে।
রাইফ ছন্নছাড়া হয়ে উঠেছে খনে খনে এই মেয়েটির জন্য।মাতাল করা কন্ঠে আবদার করল___
মোহনা একটু কথা বলো না।
মোহনার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল।রাইফের এমন কন্ঠ আগে কখনো শুনেনি। এমন ভাবে যদি রাইফ তাকে বলে জান দিয়ে দিতে তাহলে সে তাও করতে পারবে।আর রাইফ তো কেবল কথা বলার জন্য আবদার করেছে। এতটুকু তো সে করতেই পারে।তাই আর নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে অপেক্ষা না করিয়ে বলল____
ঘুমিয়ে পড়ুন রাত হয়ে গিয়েছে তো।আর অনেক জার্নি করে এসেছেন। আপনার রেস্টের প্রয়োজন।
রাইফের নিজের অজান্তেই বুকের বা পাশে হাত চলে গেলো। মনে হলো হৃৎপিণ্ড এক্ষুনি বাইরে চলে আসবে। গায়ের পশম দাঁড়িয়ে পরলো।চোখ খুশি অশ্রু চিকচিক করছে। ঠোঁট কামড়ে নিজের আনন্দ দমিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে রাইফ।এমন অনুভূতির সম্মুখীন হতে হবে তা সে কখনো কল্পনা করেনি।তার জন্য এই অনুভূতি একেবারেই নতুন। তবুও কেন জানি এই অনুভূতি অনুভব করতে সে বেশ আনন্দ পাচ্ছে।এই বিষাক্ত অনুভূতি তার কাছে মধুর ন্যায় মিষ্টি লাগছে।
কিছুক্ষণ সময় এভাবেই অতিবাহিত হয়ে গেলো। দুজনে কেউই কথা বললো না।রাইফ নিজেকে সামলিয়ে বলল____
এত যেহেতু চিন্তা তাহলে একবার দেখা দিলেই পারতে।
মোহনা জবাব না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করলো____
আপনি এই বাড়িতে কি করছেন? আমাদের বাড়িতে থাকেন নি মানা যায়।তাই বলে নিজের বাড়ি যাবেন না?
রাইফ বুকে হাত রেখেই বলল____
আমার পৃথিবী এখানে তাহলে আমি বাড়ি গিয়ে কি করবো?
মোহনা ঠিক বুঝতে পারলো না রাইফেল কথার মানে।এই রাইফ কে চিনতে তার একটু বেগ পেতে হচ্ছে।রাইফ এবং আগে সরাসরি কথা বলতো অথচ এখন কেমন প্রত্যেক কথায় জিলাপির প্যাঁচ দেয়। কথাটি নিয়ে গবেষণা করতে হবে তাকে তাহলেই বুঝতে পাবরে কথাটির মানে কি।এই চিন্তায় কপাল ভাঁজ পরলো।রাইফ কে বলল ___
রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ুন। আমিও ঘুমাবো, আসছি।
কথাটি বলেই মোহনা পেছনে ফিরে রুমে আসার জন্য পা বাড়াল।অমনি রাইফ বাঁধা দিয়ে বলল____
দাঁড়াও।
মোহনার পা জোড়া সেখানেই থেমে গেল।শরীর ভারী হয়ে উঠল যেন এখন থেকে এক পা লড়া তার জন্য কষ্টসাধ্য।সে যেন নিজের সাথে নিজেই লড়াই করছে।স্বযুদ্ধে নেমেছে সে।
রাইফ শীতল কন্ঠে বলল___
এদিকে আসো।
মোহনা চোখ বন্ধ করে করে ফেলল।শরীর তার আপনা আপনি আবার পেছনে ফিরল।ধীর পায়ে বারান্দার রেলিংয়ের কাছে গিয়ে থামলো সে।রাইফ মোহনা ছায়া নিকটে আসতে দেখে মুচকি হেসে বলল ____
এখানেও দাঁড়াও আমি আসছি।
বলেই রুমের ভিতর ভেতর চলে গেলো। বাংলাদেশ এসে মোহনাকে দেওয়ার জন্য গোলাপি রঙের গোলাপ ফুলের তোড়া এনেছিল। সেখানে গুটি কয়েকটি গোলাপ ফুল। বিকালে ফুল গুলো ফুটন্ত এবং সতেজ থাকলেও এখন মুড়ছে গেছে। রাইফ সেই ফুল গুলো নিয়ে বারান্দায় চলে এলো। তারপর বারান্দার রেলিং গেসে হাত বাড়িয়ে দিল মোহনার বিল্ডিং এর দিকে। মোহনা দেখল চাঁদের ঝাপসা আলোতে।রাইফ কিছু একটা এগিয়ে দিচ্ছে তার দিকে।তার মনে হলো এই না রাইফ পরে যায়। মনে আতঙ্ক তৈরি হলো। চিন্তিত কন্ঠে বলে উঠলো ___
কি করছেন? পরে যাবেন আপনি প্লিজ এমন করবে না।
রাইফ স্বাভাবিক কন্ঠেই বলল ____
আরে পাগলী ভয় পেয়ো না আমি পারবো না। তোমার জন্য ফুল এনেছিলাম নেও এগুলো। বেশি এগিয়ে এসো না তাহলে পরে যাওয়া ভয় থাকবে।
লাইফ সবসময় মোহনার জন্য উপহার আনতো এইটা মোহনার জন্য নতুন কিছু না।তাই এই ফুল আনা মোহনার কাছে অবিশ্বাস্য লাগলো না।সে নিজেও রেলিংয়ের কাছে ঘেঁষে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল। অন্যদিকে রাইফ আরো এগিয়ে এসেছে সম্ভবের চেয়েও বেশি।যেন তার লক্ষ্যই এখন মোহনার কাছে এই ফুল পৌঁছে দেওয়া।
আর মোহনাও তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে যাতে রাইফের বেশি কষ্ট পেতে না হয়। অবশেষে দুজনের কষ্ট এবং পরিশ্রম সফল হলো এবং মোহনা ফুলের নাগাল পেতেই ফুল ধরে ফেলল।
রাইফ ফুলে লম্বা ডাটা ধরে রাখায় তার হাতে কাঁটা না লাগলেও মোহনা ফুলের কাঁটার অংশ শক্ত করে ধরতেই তার হাতে কাঁটা ঢুকে গেল। তবুও মুখ থেকে আহ্ শব্দ বের করলো না। বরং চোখ বুজে সহ্য করে নিল। হাত দিয়ে রক্ত পরছে তার তবুও শক্ত করে ফুলের তোড়া ধরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
রাইফও যেন এইবার শান্তি পেলো নিজের ভালোবাসার মানুষটির কাছে তার জন্য আনা কাঙ্খিত জিনিসটি দিতে পেরে। কিন্তু হঠাৎ কিছু একটা মনে পরতেই বলল____
তোমার হাতে কি কাঁটা লেগেছে? ব্যাথা পেয়েছো তুমি?
মোহনা যেন থমকে গেলো।রাইফ কি করে বুঝতে পারলো তার হাতে কাঁটা গেঁথেছে।আর সত্যি সে বেশ ব্যাথা পেয়েছে।হাত থেকে অনবরত রক্ত পরছে। তবুও নিজের কষ্ট, ব্যাথা আড়াল করে বলল ____
না না আমি ফুলের পাপড়ি যে ধরেছিলাম তাই ব্যথা পাইনি।
রাইফ যেন চিন্তামুক্ত হলো। মোহনা পিছন ফিরে রাইফের দেওয়া ফুলে চুমু খেলো।রাইফ তা দেখলো না।দেখলে হয়তো খুশিতে বারান্দা থেকে লাফ দিয়ে নিচে পরে যেত।
রাইফ নিচু কন্ঠে বলল ____
ঘুমিয়ে পরো এবং কালকে আর কোনো লুকোচুরি খেলা খেলবে না। খেলার বয়স চলে গিয়েছে আমার বুঝো না?
মোহনার হাসি পেলো এমন কথায়।তার মন থেকে সকল বিষন্নতা হাওয়া হয়ে গেল।সে মুচকি হেসে বলল ____
দেখা যাবে।
তবু গল্পটা ভালোবাসারই পর্ব ৬
বলেই নিজের রুমে দৌড় দিয়ে চলে গেল এবং দরজা লাগিয়ে দরজার সাথে মিশে দাঁড়িয়ে রইল। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো সে। লজ্জা, ভয়, আবেগ, কষ্ট সকল অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরেছে।
আর রাইফ তো খুশিতে নাচতে এবং লাফাতে লাগলো।আর গাইতে লাগলো ধীরে ধীরে
লে পাগলু ডান্স ডান্স ডান্স
না থুক্কু লে রাইফ ডান্স ডান্স ডান্স ডান্স ডান্স।
