তবু গল্পটা ভালোবাসারই পর্ব ৬
নাজনীন নেছা নাবিলা
রাইফ মা কে শান্ত করিয়ে বাবার কাছে এলো। মাহিনও তাই করল।বাবা কে সালাম দিয়ে দুজনই বাবাকে জড়িয়ে ধরল।মামুন খান নিজেকে ধরে রাখতে পারলেও রফিক চৌধুরী পারলেন না। ছেলে কে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কেঁদে উঠলেন।রাইফের চোখের কোণেও জল। আসলে ছেলেকে কখনোই ছোট বেলায় ভালোবাসা দিতে পারেননি রফিক চৌধুরী।বলতে গেলে ছেলের কাছেই ছিলেন না।ছেলে কে সুখে রাখতে গিয়ে যে ছেলে কে কষ্ট দিয়ে ফেলেছিলেন তা অনেক পরে উপলব্ধি করতে পারলেন।তাও কেবল ছোট্ট মোহনার জন্য।আর সেই ছোট্ট মোহনার জন্যই আজ ছেলে কে বুকে জড়িয়ে নিতে পারছেন। উপস্থিত সবার চোখেই পানি। কিন্তু আজকে খুশির পানি ঝিকঝিক করছে সবার চোখ।রাইফ নিজেকে সামলিয়ে বাবাকে ছাড়লো তারপর বাবার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল____
আহ্ বাবা কাঁদছো কেন? দেখো তোমার ছেলে তোমার কাছেই আছে।আর দূরে থাকবে না তোমার কাছ থেকে।তাই এখন কান্নাকাটি বাদ দাও তো।
রফিক চৌধুরী ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বললেন___
বাবা আমার। মানিক আমার।তুই তো আমার হিরার ছেলে।
তখন মাহিম রাইফ এবং তার বাবার কাছে এগিয়ে এসে বলল____
কাকু তাহলে কি আমি তোমার আদরের ছেলে না?
সবাই মাহিমের কথা শুনে হেসে উঠলো। এক মাত্র এই ছেলে আর মোহনাই পারে সবাই কে কষ্টের মাঝেও হাসাতে। রফিক চৌধুরী হেসে বললেন___
আরে না তুই তো আমার আরেক হিরার ছেলে।
মাহিম মুচকি হেসে বলল ____
তাহলে এই কান্নাকাটির সিন রেখে বসো তো। ভাইয়ারা কতদূর থেকে এসেছে। ওদের কে জিরিয়ে নিতে দাও।
সবাই মাহিমের করায় সায় মেলালো।রাইফ এবং মাহিন দুজনেই সোফায় বসল। তাদের পাশে তাদে মা বসেছে।সাবিনা ইসলাম এবং রেশমা আক্তার দুজনেই পরনের ওড়না দিয়ে ছেলেদের কপালের ঘাম মুছে দিচ্ছেন। মামুন খান গেলেন রান্নাঘরে এবং রফিক চৌধুরী ড্রয়িংরুমে থাকা বড় ফ্রিজ থেকে জুস বের করলেন। মামুন খান দুটি গ্লাস এনে ধরতেই রফিক চৌধুরী জুসের বোতল থেকে গ্লাসে জুস ঢেলে ছেলেদের কে দিলেন।মাহিম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু এগুলো দেখছে।রাইফ মুচকি হাসি নিয়ে জুসের গ্লাস হাতে নিলেও খাচ্ছে না বরং এদিক সেদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজছে।যার জন্য এত তাড়াহুড়া করে দেশে আসলো তারই দেখা পাচ্ছে না।এই যন্ত্রণা রাইফের মোটেও সহ্য হচ্ছে না।বার বার চোখ সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে একবার, তো আরেকবার দোতালার মাঝখানের রুমের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু যখন সে কাঙ্খিত মানুষটির দেখা পেল না তখন তার ধৈর্যের সীমা ভেঙে যায় এবং সে মনে মনে আওড়ালো ____
নিজে তো একজন কে একতরফা ভালোবেসে যন্ত্রণায় ভুগছো।অথচ আমি সবকিছু ছেড়ে তোমার জন্য এসেছি তোমার যন্ত্রণা কমিয়ে দেওয়ার জন্য। এখন অদৃশ্য থেকে তুমি আমার যন্ত্রণা বাড়িয়ে দিচ্ছো। একবার পেয়ে নেই তোমাকে ধারের কাছে তারপর তোমার একতরফা ভালোবাসা ছুটিয়ে দিব।যেই শা*লাকেই ভালোবাসোই না কেন তার চৌদ্দো গুষ্টি ও যেন তোমার আশেপাশে না আসে। আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করো।মোহনাকে শুধু আমার করো আমিন।
রাইফ নিজের চিন্তায় মগ্ন ছিল এমন সময় তার মা তাকে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠলেন___
কি হলো বাবা জুস খাচ্ছিস না যে?খারাপ লাগছে কি?
সবাই রাইফের দিকে তাকালো।মাহিনের জুস ইতিমধ্যে খাওয়া শেষ। সে জুসের গ্লাস সোফার সামনে থাকা কাচের টেবিলের উপরে রেখে নিজের বন্ধুর দিকে তাকালো। অবশ্য সে কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে রাইফের অবস্থা।রাইফ আমতা আমতা করে বলল___
না মানে কিছু হয়নি তো।আমি একদম ঠিক আছি।এইতো খাচ্ছি।
বলেই এই ঢোকে সম্পূর্ণ গ্লাসের জুস শেষ করে দিল।সবাই বড় বড় চোখে রাইফের দিকে তাকিয়ে আছে।মাহিন তো মুখ চেপে হাসছে। ভাগ্যিস তার ভালোবাসার মানুষটি এখানে উপস্থিত নেই নয়তো এখন তারও একই অবস্থা হতো। কিন্তু এখন আপাতত আগে বন্ধুকে বাঁচানোর প্রয়োজন। তাই সবার মনোযোগ পাবার জন্য গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে শুরু করলেন___
আচ্ছা মা মোহনা কে যে দেখছি না?সে কোথায়? নিশ্চয়ই তোমার বলো নি যে আমরা আসছি তার জন্যই তো এখানে নেই।নয়তো আমি আসবো শুনলে সে দরজা কাছ থেকেই সরতো না।
সাবিনা ইসলাম বসা থেকে উঠে রান্না ঘরের দিকে যেতে যেতে ছেলের প্রশ্নের জবাবে বললেন___
আর বলিস না বাবা। জানি না কি হয়েছে মেয়েটার। দুদিন ধরে তো খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করছে না। রুম থেকে বের হচ্ছে না বললেই চলে। গিয়ে দেখ হয়তো পড়ার টেবিলে বসে আছে।আগেই ভালো ছিল অল্প পড়তো আর সারাক্ষণ বাঁদরামি করতো।রাইফ বাবা যে কি জ্ঞান দিয়েছিল এর পর থেকেই মেয়েটা পড়াশোনায় এত মনোযোগী হয়ে গেল। অবশ্যই বাঁদরামি ছাড়েনি তখন কিন্তু জানি না দুইদিন ধরে কি হয়েছে।
কথাগুলো বলতে বলতেই তিনি আবার রান্না ঘরে চলে গেলেন।উনার বলার শেষের কথাগুলো ড্রয়িং রুমে স্পষ্টভাবে শোনা গেল না। রেশমা আক্তারও রান্না ঘরের দিকে যেতে যেতে বললেন___
তোরা আসবি এই কথা তো সে জানে। আমরা তো জানতাম তোদের ফ্লাইট রাতে ল্যান্ড করবে। তাই ভেবেছিলাম সন্ধ্যায় যাবো। যখন ওকে জিজ্ঞেস করলাম ও আমাদের সাথে যাবে কিনা এয়ারপোর্টে সে প্রতিউত্তরে বলল “এয়ারপোর্ট একটি অশুভ জায়গা। সেখানে গিয়ে নাকি আমি আমার প্রাণপ্রিয় জিনিস হারিয়েছি। আমি আর কখনো এয়ারপোর্টে যাবনা কখনোই।” তার কথা রাগ আমার মাথা আমরা কেউই বুঝলাম না।
রেশমা আক্তারও করা গুলো বলতে বলতে রান্নাঘরে চলে গেলেন।
মায়ের বলা একটি কথাতেই রাইফ খনিকের জন্য থমকে গেল। অথবা সে বাদে তার আশে পাশের সব কিছু থমকে গেলো।তার কানে বাজছে একটি কথা–“এয়ারপোর্ট একটি অশুভ জায়গা। সেখানে গিয়ে নাকি আমি আমার প্রাণপ্রিয় জিনিস হারিয়েছি। আমি আর কখনো এয়ারপোর্টে যাবনা কখনোই।”
রাইফের উপলব্ধি করতে দেরি হলো না মোহনা ঠিক কোন জিনিসটা হারিয়ে।তার ডায়েরি হারিয়েছিল যা এখন রাইফের কাছে আছে অতি যত্নে।রাইফ বেশ মনোক্ষুণ্ন হলো মোহনার অন্য কারোর প্রতি এত গভীর ভালোবাসা দেখে।তার তো এখন মোহনার চেহারাটাও মনে নেই তবুও তো সে মোহনা কে ভালোবেসে এখানে এসে পরেছে। অথচ মোহনা অন্য কাউকে ভালোবাসে ঘরের কোণে বসে আছে।রাইফের সেই ব্যক্তির উপর ভীষণ হিংসে হলো।সাথে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে না দেখতে পেয়ে ভীষণ কষ্টও পেলো।রাগে, দুঃখে এবং হিংসায় মনে মনে বলল ____
ওই অসভ্য বেডার মাথায় বাঁশ পড়ুক।বেডা যাতে হাঁটতে গেলে মুখ থুবড়ে পড়ে মান ইজ্জতের ফালুদা বানায়। কত বড় সাহস আমার মোহনা কে কষ্ট দেয়।বেডার কপালে নাই আমার মোহনার মতোন এত ভালো মেয়ে।মোহনা কে শুধু আমি ডিজার্ভ করি।
হঠাৎ রফিক চৌধুরী বলে উঠলেন___
বাবা রাইফ এবং মাহিন তোরা দুজন মিলে উপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নে।
রাইফ কথাটি শোনা মাত্রই উঠে পরলো।সেও উপরে যাওয়ার জন্য ছটফট করছিল।যদি মোহনার রুমের দরজা খোলা থাকে তাহলে অন্তত চোখের দেখা তো দেখতে পাবে।মন না ভরুক আপাতত তার মোহনা এখন দেখতে কেমন এইটা নিজ চোখে দেখলেই তার শাস্তি।তাই আর দেরি না করে লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ির দিকে যেতে লাগলো।রাইফের লাফিয়ে লাফিয়ে যাওয়া দেখে তার বাবা এবং মাহিনের বাবা ও তার ছোট ভাই হা করে তাকিয়ে রইল।
মামুন খান তো রফিক কে জিজ্ঞেসই করে ফেললেন___
ভাই আপনার ছেলে এমন ভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে কেন?
রফিক চৌধুরী কিছু বলতে যাবেন তার আগেই মাহিম বলে উঠলো ____
হয়তো রাইফ ভাইয়ার ছোট মিয়া পেয়েছে। ওহ্ না ছোট মিয়া পেলে এভাবে লাফিয়ে যেত না তার মানে বড় মিয়া পেয়েছে তাই এমন ভাবে লাফিয়ে যাচ্ছে যাতে দ্রুত বাথরুমে গিয়ে ইয়ে করতে পারে।
মাহিমের কথা শুনে রফিক চৌধুরী এবং মামুন খান শব্দ করে হেসে উঠলেন।মাহিন কপাল চাপড়ে সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হলো। রাইফ প্রথম যেভাবে লাফিয়ে যাওয়া শুরু করেছিল ততক্ষনে তার এখন মোহনার রুমের সামনে থাকার কথা। কিন্তু না সে এখনো শেষ সিঁড়িতে পা রাখে নি।মাহিন রাইফের কাছে গিয়ে দেখল রাইফ চোখ বন্ধ করে বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছে।মাহিন রাইফের অবস্থা বুঝতে পারলো।তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।তার বোনকে ভালোবেসে রাইফ উম্মাদ হয়ে উঠেছে প্রতিনিয়ত।এত গুলো বছরে মাহিন অনেক বার রাইফ কে বলেছিল মোহনার ছবি আছে যেন সে দেখে। কিন্তু রাইফের একটাই কথা আগে যা দেখেছে তা দেখেছে। কিন্তু এখন মোহনা কে না দেখেই ভালোবেসে যাবে সে।রাইফের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে মাহিন আর রাইফ কে জোর করল না।
রাইফের কানের কাছে এসে বলল___
তুই আমার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হো আমি মাহিমের রুমে যাচ্ছি।
রাইফ চোখ খুলে তাকালো।আসলে আর এক সিঁড়ি পেরিয়ে অল্প হাঁটলেই মোহনার রুমের জানালা।যেটা আগে খোলা থাকলেও আজ বন্ধ।তাই চোখ বন্ধ করে পুরোনো স্মৃতিচারণ করছিল সে।আগে যখন আসতো তখন মাহিনের রুমে যাওয়ার জন্য মোহনার রুম পেরিয়ে যেতে হতো।আর তখন মোহনা জানালা খোলা থাকত সবসময় এবং সেও জানলা দিয়ে মোহনার সাথে কথা বলতো।আজ সেই পুরনো দিনের কথাগুলো খুব মনে পরছে।দেরি না করে হাঁটতে লাগলো আবার।মাহিন ততক্ষণে চলে গেছে মাহিমের রুমে।রাইফ ধীর পায়ে মোহনার রুমের সামনে গেল খুব আশা নিয়ে। কিন্তু সে এবারও মনোক্ষুণ্ন হলো।মোহনার দরজা বন্ধ। অজান্তেই রাইফের চোখের কোণে পানি ফোটা এসে জমাত বাঁধলো।যদি সে শক্ত না থাকতো তাহলে হয়তো চোখের পানি বাঁধ ভেঙে গড়িয়ে পড়তো। কিন্তু সে তার চোখের পানি চোখেই রাখলো।এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অসহায় দৃষ্টিতে আরেকবার তাকালো মোহনার বন্ধ থাকা দরজার দিকে। মুখ থেকে একটা কথাই বের হলো____
“একতরফা ভালোবাসা সত্যিই খুব পোড়ায় রে মোহনা। সত্যি খুব যন্ত্রণা দেয়। তোমাকে তোমার একতরফা ভালোবাসার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে এসে নিজেই এখন তোমার দহনে জ্বলে পুড়ে ছারখার হচ্ছি।”
মোহনা নামাজের পাটিতে শুয়ে শুয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। ছোট বেলায় যখন টিভিতে কোনো মেয়েকে কাঁদতে দেখতো তখন তার কাছে বিষয়টা খুব বিরক্তিকর লাগতো।সে ভেবেই কুল পেতো না এত কান্না আসে কোথা থেকে। অথচ এখন নিজেই কাঁদতে কাঁদতে সাগর ভাসিয়েছে ফেলছে। সারাদিন স্ট্রং থাকলে যখন নামাজের দাঁড়ায় তখন যেন তার সব অশ্রু চোখে চলে আসে। আল্লাহর কাছে সব কিছুর অভিযোগ করে। অনেক সময় তো এমনও হয়েছে কান্নার কারণে মোনাজাতে কিছু বলতে পারে নি। শুধু নিরবে কেঁদেছে। কারণ সে জানে,তার বিশ্বাস আছে তার রব তার মনের কথা এমনিতেই শুনে ফেলবে তাকে মুখ ফুটে কিছু বলতেও হবে না। অথচ এত কান্না,এত কষ্ট পাবার পরেও কখনো কোনো অভিযোগ করেনি।এইযে রাইফের বিয়ে ঠিক হয়েছে শুনে অভিমান করে ঠিকই তাদের কে আনতে যাবে না প্রতিজ্ঞা করেছে। কিন্তু যখনই ভেতরটা দুঃখে, যন্ত্রণায় বিষাক্ত হয়ে আসে তখনই নিজেকে শান্তনা দিয়ে বলে—“নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। তিনি কখনোই তার কোনো বান্দা কে এতটা কষ্ট দিবে না যতটা সে সহ্য করতে পারবে না। হয়তো আল্লাহ আমার ভালোর জন্যই এখন আমাকে এই পরিস্থিতিতে রেখেছেন।আমিও এমন অবস্থায় থেকে আলহামদুলিল্লাহ বলে যাবো।ইন শা আল্লাহ আমার সত্যিকারের ভালোবাসার একদিন জয় হবে।
মোহনা মাগরিবের আজানের ধ্বনি শুনেই নামাজে দাঁড়িয়ে ছিল।নামাজ পড়ে মোনাজাত শেষ করে কিছুক্ষণ এভাবেই জায়নামাজে শুয়ে থেকে কান্না করল। হঠাৎ মনে পরলো সকাল থেকে কিছুই খায় নি।মা খাবার দিয়ে গেলে তা নিজের রুমে থাকা ছোট্ট ফ্রিজে রেখে দিয়েছিল।এখন পেট গুড়গুড় করছে। অন্তত হালকা কিছু খেতেই হবে নয়তো আবার অসুস্থ হয়ে পরবে।তাই দেরি না করে জায়নামাজ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। জায়নামাজ জায়গায় মতো রেখে চোখ মুখ মুছে রুম থেকে বের হলো।তার জানা মতে সবাই এখন এয়ার পোর্টে গেছে।তার সবাই আসার আগেই সে খেয়ে দিয়ে নিজের রুমে এসে লাইট অফ করে শুয়ে থাকবে। তাহলে আর রাইফের মুখোমুখি হতে হবে না।মোহনা জানে এভাবে বেশিদিন লুকোচুরি করতে পারবে না সে। কিন্তু আপাতত সে এখন ভীষণ দূর্বল।আর এখন রাইফের সামনে পরলে সে আরো দূর্বল হয়ে পরবে তাই আপাতত এমন লুকিয়ে থাকতে চাচ্ছে।
কিন্তু সে তো জানে না তার আল্লাহ অন্য কোনো পরিকল্পনা করে রেখেছেন। মোহনা ধীরে সুস্থে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো। কাউকেই দেখলো না। আসলে রান্নাবান্না করে রেশমা আক্তার এবং সাবিনা ইসলাম রুমে গিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন।আর রফিক চৌধুরী এবং মামুন খান ও মাহিম নামাজের জন্য মসজিদে গিয়েছিল কেউই আসেনি হয়তো বাইরে হাঁটছে।
মোহনা দেখলো সোফায় একজন বসে আছে।সে পেছন থেকে দেখে ভাবলো মাহিম বসে আসে তাই সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করল ____
ভাইয়া তুমি বড় ভাইয়া এবং তার ফ্রেন্ড কে আনতে যাওনি এয়ারপোর্টে?
তখনই মাহিন পেছনে ফিরে তাকালো। মাহিমের জায়গায় মাহিন কে দেখে মোহনা অবাক হলো বেশ সঙ্গে খুশিও হলো।মাহিন বোনের কন্ঠ শুনে পেছনে তাকাতেই ঝটকা খেলো। কিছুদিন আগেও বোনের সাথে কথা হয়েছিল তখনও বোনকে বেশ ভালোই দেখেছিল। আসলে মোহনার গাল গুলো ফুলো ফুলো। অথচ এখন মাহিন মোহনাকে চিনতেই পারছে না। মুখটা শুকিয়ে অল্প একটু হয়ে গেছে।মাহিন ব্যস্ত কন্ঠে বোনের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল___
প্রিন্সেস কি হয়েছে তোর বোন?এই অবস্থা কেন তোর।কেউ কিছু বলেছে?চোখ গুলো ফুলে লাল হয়ে গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কান্না করছিলি।কেন কান্না করছিলি তোর ভাইকে বল আমি এসে পরেছি আমি তোর সব কষ্ট দূর করে দিব।বল আমায় বোন।
বড় ভাইয়ের এমন আদুরে কণ্ঠে মোহনা গলে গেল। কান্না দলা পাকিয়ে বের হতে লাগলো।চোখ মুখ কুঁচকে কান্না করেই দিল মেয়েটি।মোহনা কে এভাবে কাঁদতে দেখে মাহিন আর দেরি না করে বোনকে বুকের মাঝে আগলে নিল। মোহনাও ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে লাগলো।মাহিন বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো আর বার বার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে দেখছে রাইফ আসছে কিনা। কারণ আগে মোহনার মন খারাপ হলে কিংবা কান্না করলে একমাত্র রাইফই পারতো মোহনা কে সামলাতে তাই তো রাইফের জন্য অপেক্ষা করছে।
অন্যদিকে মোহনা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মাহিনের যেমন বোনের কান্না দেখে কষ্ট লাগছে তেমনি কান্নার কারণ না জানায় চিন্তা হচ্ছে। মোহনা আরো কিছুক্ষণ কান্না করে নিজেকে সামলিয়ে নিল। ভাইয়ের বুক থেকে মুখ তুলে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
মাহিন বোনের চোখের পানি পরম যত্নে মুছে দিয়ে নরম সুরে জিজ্ঞেস করল ____
কি হয়েছে বনু?
মোহনা ঠোঁট কামড়ে নিজের দূর্বলতা প্রকাশ না করে ভাঙা গলায় বলল___
কিছু না ভাইয়া আসলে তোমাকে অনেক মিস করছিলাম তো তাই তোমাকে দেখে ইমোশনাল হয়ে গিয়েছি। জানোই তো মাহিম ভাইয়া আমাকে জ্বালিয়ে ভাঁজা ভাঁজা করে।এখন তুমি এসে পরেছো এখন আর কেউ আমাকে কিছু বলতে পারবে না।
কথাটি বলেই মোহনা হাসার চেষ্টা করল।মাহিন বুঝতে পারল তার ছোট্ট বোন অনেক বড় হয়ে গিয়েছে।যে আগে অল্পতেই কান্না করতে করতে বিচার দিতো এখন কত সুন্দর কষ্ট গিলে ফেলছে।মাহিন আরো কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই মোহনা বলে উঠলো ___
ভাইয়া ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে।
মাহিনের টনক নড়ল।সে মোহনা কে খাবার টেবিলে নিয়ে বসিয়ে নিজে খাবার নিয়ে বোনকে খাইয়ে দিতে লাগলো।মোহনাও ভাইয়ের হাতে লক্ষী মেয়ের মতো খেতে লাগল। খাবার খাওয়া শেষে মোহনা ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলল___
ভাইয়া আমি রুমে যাচ্ছি।
তখনই মাহিন বাঁধা দিয়ে বলে উঠলো ___
রাইফের সাথে দেখা করে যা। ছেলেটা তোকে দেখার জন্য অপেক্ষা করেছিল।
যেই ভয়টা পেয়েছিল মোহনা তাই হলো। কিন্তু সে তো এখন রাইফের সামনে পরতে চায়না। ভাইয়ের সামনেই যেভাবে কেঁদে দিল রাইফেল সামনে আসলে তো শেষ।তাই এখান থেকে সরে পরার জন্য বলল ___
আসলে ভাইয়া কতদিন যাবৎ পরীক্ষা চলছিল তাই একদম ঘুম হয়নি। দেখছো না আমার চোখ মুখের কি অবস্থা।এখন ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।আমি এখন গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নেই।
মাহিন আর কিছু বলতে পারলো না।ইশারা করতেই মোহনা এক দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেলো।
মোহনা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই রাইফ নিচে এলো। অবশ্য মোহনার বন্ধ করে রাখা দরজার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল আসার সময়।মাহিন রাইফ কে মোহনার কান্নার কথা বলবে তার আগেই মাহিনের মা বাবা এসে তাদের কে খাবার টেবিলে নিয়ে গেল।
সবাই মিলে যখন খেতে বসলো তখন রফিক চৌধুরী জিজ্ঞেস করল___
সবাই আছে কিন্তু মোহনা মা কোথায়?
তবু গল্পটা ভালোবাসারই পর্ব ৫
রাইফও একটু নড়ে চড়ে উঠলো। মন বলল হয়তো এখন নিজের ভালোবাসা মানুষটির দেখা মিলবে। কিন্তু তার আশায় পানি ঢেলে সাবিনা ইসলাম বলে উঠলেন ___
মাহিন বললো মোহনা খাবার খেয়েই ঘুমাতে চলে গিয়েছে ওর নাকি ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।
কেউ আর কিছুই বলল না। মেয়েটি খেয়েছে এতেই তারা সন্তুষ্ট।রাইফ ভ্রু কুঁচকে মাহিনের দিকে তাকাতেই মাহিন ইশারা দিয়ে বোঝালো পরে সবটা বলবে।
