তাকদিরে তুমি পর্ব ১১
মোনালিসা মেহরোজ
সন্ধ্যা নেমে এসেছে মির্জা বাড়িতে। সারাদিনের কোলাহল, হাসি-আড্ডা আর অতিথিদের আনাগোনার পর বাড়িটা ধীরে ধীরে আবার আগের মতো শান্ত হয়ে উঠছে। একে একে সবাই বিদায় নিয়েছে বাড়ি থেকে। ড্রয়িংরুমে ছড়িয়ে থাকা কুশনগুলো গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ডাইনিং টেবিলও প্রায় খালি।
রান্নাঘরের সিঙ্কে শেষ কয়েকটা বাসন ধুয়ে রাখছিলো ফাতিহা। তখনই ভেতরে প্রবেশ করলেন সায়না মির্জা। তার মুখে আজ অদ্ভুত এক ক্লান্তি। তবে সেই ক্লান্তির মাঝেও ছিলো স্বস্তির ছাপ। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—-
—সব দেখেছিলে, তাই না মা?
হাতে থাকা প্লেটটা নামিয়ে রাখলো ফাতিহা।
প্রশ্নটার অর্থ বুঝতে তার একটুও কষ্ট হলো না।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে আস্তে করে মাথা নাড়ালো।
—জ্বি, আম্মু।
সায়না মির্জা চোখ বন্ধ করে ফেললেন।
তার বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠলো।
নিজের ছেলের এমন আচরণ ভাবলেই লজ্জা লাগছে তার। আজ যদি অতিথিদের সামনে খাবার নষ্ট হয়ে যেতো, তাহলে শুধু ফাতিহাই নয়—পুরো পরিবারেরই সম্মানহানি হতো।
তখন ফাতিহাকে নতুন করে ঝোল রান্না করতে দেখে সন্দেহ হয়েছিলো তার। পরে ফাতিহাকে কোন সমস্যা হয়েছে কি-না তা জিজ্ঞেস করলে ফাতিহা চুপ থাকে। আর তাতেই তিনি বুঝে নেন অনেক কিছু৷
সায়না মির্জা অনেকক্ষন চুপ করে রইলেন। তারপর ভারী কণ্ঠে বললেন—-
—আসিফ করেছে, তাই না?
ফাতিহা এবারও মিথ্যা বললো না।শুধু আস্তে করে বললো—
—জ্বি।
সায়না মির্জা হতাশ হয়ে কাছের চেয়ারে বসে পড়লেন।
—আমি মাঝে মাঝে বুঝতেই পারি না ছেলেটা এমন কেন হয়ে গেলো।
কথাটা বলতে গিয়েও গলাটা কেঁপে উঠলো সায়না মির্জার। ছলছলে চোখে চেয়ে ফের বললেন—-
—ছোটবেলায় তো এমন ছিলো না।
ফাতিহা কিছু বললো না। সে জানে, একজন মায়ের কাছে নিজের সন্তানের ভুল স্বীকার করা কতটা কষ্টের। সায়না মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
—আজ তুমি না থাকলে কী হতো জানি না।
ফাতিহা শান্ত গলায় বললো—-
—আল্লাহ সহজ করে দিয়েছেন আম্মু।
—না মা, শুধু আল্লাহ সহজ করেননি। তুমিও বুদ্ধিমানের মতো সামলে নিয়েছো।
সায়না মির্জা এবার ফাতিহার দিকে তাকালেন।
চোখ দুটো ভিজে উঠেছে তার। কথা বলতেও খানিক লজ্জা কাজ করছে ভেতরে। কারণ নিজের ছেলের জন্য’ই তো আজ এরকম একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হলো ফাতিহাকে।সায়না মির্জা মাথা নিচু করে নিলেন। ফের বললেন—-
—তুমি আগেই বুঝতে পেরেছিলে?
ফাতিহা মৃদু হেঁসে বললো—-
—রান্নাঘরের কাঁচে ওনার প্রতিচ্ছবি দেখেছিলাম।
—তারপর?
—কোরমা চেখে দেখলাম লবণ অনেক বেশি। তাই নতুন করে ঝোল রান্না করলাম। আর কিছু আলু দিয়ে লবণটাও টেনে নিলাম।
কথাগুলো শুনে বিস্মিত হয়ে গেলেন সায়না মির্জা। তারপর মৃদু হাসলেন।
—মাশাআল্লাহ।
কয়েক মুহূর্ত পর তিনি উঠে এসে ফাতিহার মাথায় হাত রাখলেন।
—সাবাস মা।
ফাতিহা অবাক হয়ে তাকালো শাশুড়ীর পানে। সায়না মির্জা স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন—
—আজ তুমি শুধু রান্না সামলাওনি। আমাদের সম্মানও রক্ষা করেছো।
ফাতিহা মাথা নিচু করে ফেললো।
—আমি তো শুধু আমার দায়িত্ব পালন করেছি আম্মু।
—সবাই দায়িত্ব পালন করতে পারে না মা।
কথাটা বলেই সায়না মির্জা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। ফাতিহার বুকটাও কেমন ভারী হয়ে উঠলো। বিয়ের পর এই বাড়িতে অনেক কিছুই পেয়েছে সে। কিন্তু এই নারীর নিঃস্বার্থ স্নেহটা তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। শাশুড়ী নামক আর একজন মা’কে পেয়ে তার পৃথিবীটা যেনো আরোও রঙিন হয়ে উঠেছে।
রাত বেশ হয়ে গেছে।
বাড়ির সব কাজ শেষ করে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে লাগলো ফাতিহা। করিডোরজুড়ে তখন নীরবতা বিরাজ করছে। পুরো বাড়ি থমথমে হয়ে উঠেছে যেনো। ফাতিহা ধীরে ধীরে দরজা খুলে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখলো আসিফ বিছানার পাশে বসে আছে। হাতে তার ফোন।তবে আজকে সে ফোন দেখছে না।
কী যেন ভাবছে। দরজা খোলার শব্দে মাথা তুলে তাকালো আসিফ। দুজনের চোখ কয়েক সেকেন্ডের জন্য এক হলো। অদ্ভুতভাবে কেউ কোনো কথা বললো না। ফাতিহা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আলমারির দিকে এগিয়ে গেলো।
ওড়নাটা ভাঁজ করে রাখলো। তারপর প্রয়োজনীয় কিছু কাপড় বের করলো।
আসিফ নীরবে তাকিয়ে রইলো সেদিকপানে।
আজ সারাদিন ধরে তার মাথার ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা কাজ করছে।কিন্তু সেই অস্থিরতার কারণটা সে নিজেও বুঝতে পারছে না।ফাতিহা যেন কিছুই হয়নি এমন স্বাভাবিক আচরণ করছে। না কোনো অভিযোগ করছে না কোনো প্রশ্ন। অথচ মনটা খঁচখঁচ করছে আসিফের। কি করে কি হলে তা বুঝে উঠতে পারছে না।
এটাই যেন সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি দিচ্ছে আসিফকে।ফাতিহা আলমারি বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াতেই আসিফ চোখ সরিয়ে নিলো। যেন ধরা পড়ে গেছে। মেয়েটাও কিছু বললো না।
শুধু শান্তভাবে জায়নামাজটা বিছিয়ে দিলো ঘরের এক কোণে।
ঘরজুড়ে আবারও নেমে এলো নীরবতা। আসিফ চিন্তিত মুখশ্রী নিয়ে ধীর পায়ে বেড়িয়ে গেলো ঘর ছেড়ে। স্টাডি রূমে এসে সোফায় মাথা এলিয়ে দিতেই অনেক প্রশ্নের উদয় হলো মনে। খাবারে তো সে লবন দিয়েছিলো, তাহলে কাজ হলো না কেনো এ ধরনেই বহু প্রশ্ন তার মাথায় গিজগিজ করতে লাগলো। আসিফ চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো। ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো—-
—এই মেয়েটা এমন কেনো?
—কোথায় যাচ্ছেন?
সকাল সকাল রেডি হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো নিচে আসিফ। হাতে বাইকের চাবি৷ ফাতিহার প্রশ্নে থেমে গেলো সে। কপালে সৃষ্টি হলো ভাজ। আশ্চর্য হলো ভিষন। সোফায় তখন আযান মির্জা বসে আছেন। তিনি অফিসে যাবেন বলে তৈরি হয়ে কাগজপত্র ঘাটছেন। সায়না মির্জা স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ফাতিহার প্রশ্নে তারাও সেদিকপানে ফিরলেন।
আসিফ সামনের দিকে একপলক তাকিয়ে নিজেকে সামলে নিলো। ফাতিহার প্রশ্নের পাছে শক্ত গলায় কিছু বলতে চেয়েও পারলো না বাবার উপস্থিতির কারণে। বরং নিজেকে কঠিন হতে আটকে নিচু গলায় দাঁতে দাঁত চেপে বললো—-
—বন্ধুদের সাথে দেখা করতে।
—যাবেন না।
ফাতিহার ঠান্ডা স্বরে খানিক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো আসিফ। কপালের ভাজ আরো গাঢ় হয়ে উঠলো। আশ্চর্য নয়নে চেয়ে প্রশ্ন করলো—–
—হোয়াট? যাবো না কেনো? আর আমি কোথায় যাবো না যাবো সেটা কি তুমি ডিসাইট করবে?
ফাতিহা সোফায় বসে থাকা আযান মির্জার পানে একপলক তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললো—-
—নাহ্, আপনার স্বাধীনতা অনুযায়ী আপনি ঘুরতেই পারেন। বন্ধুদের সাথে দেখা করতেই পারেন। তবে আপনার দ্বায়িত্ব শেষে।
—হোয়াট? কি বোঝাতে চাইছো তুমি?
—বোঝাতে চাইছি এই যে আজ আপনি বাহিরে যাবেন, তবে সেটা বন্ধুদের কাছে নয়। বরং আব্বাজানের সাথে অফিসে৷
আসিফের কানে যেনো বেশ বড়সড় একটা বিস্ফোরণ ঘটলো বলে মনে হলো। তার চোখজোড়া বড়বড় হয়ে এলো এ মেয়ের সাহস দেখে। হা হয়ে গেলো মুখমণ্ডল। সাথে তীব্র রাগে আপনাআপনি শক্ত হয়ে এলো হাতের মুঠোই। আযান মির্জা কাগজগুলো সাইডে রেখে দেখতে লাগলেন পুত্রবধূর কান্ড। সায়না মির্জা শুকনো ঢোক গিললেন। কারণ তিনি জানেন এখন নিশ্চয়ই তার অবাধ্য বেয়াদব ছেলেটা রেগে যাবে।
আসিফ দু’পা এগিয়ে এলো ফাতিহার অভিমুখে। তাকালো ধূসর গভীর সেই আঁখিপল্লবে। কয়েক মুহূর্ত সেদিকপানে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কড়া গলায় দাঁতে দাঁত চেপে বললো—-
—হুকুম করছো আমায়? সাহস কি করে হয় তোমার? যাবো না? কি করবে হুহ্? কি করবে?
ফাতিহা শান্ত চোখে তাকিয়ে দেখলো আসিফের উগ্র আচরণ। মৃদু হাসলো সে। ফাতিহার চোখজোড়াও হাসলো সেই তালে। আসিফ আশ্চর্য হলো, ভিষন অবাক হলো।
—অফিসে যাবেন না?
—নাহ্।
কড়া গলায় ফের উত্তর করলো আসিফ। ফাতিহা শান্ত গলায় বললো—-
—আব্বাজানের বয়স হচ্ছে।
—তো?
—তার কর্মচারিরা’ই তাকে ঠকাচ্ছে।
আচমকা আসিফের দৃষ্টি ঘুরে গেলো বাবার পানে। আযান মির্জা চুপ করে বসে ছিলেন। এখন শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ছেলের চাহুনিতে।
আসিফের ভ্রু যুগল কুঁচকে গেলো। শান্ত গলায় বললো—–
—কি বলতে চাইছো তুমি?
—ওনার বয়স হচ্ছে, মির্জা বাড়ির ব্যাবসা আপনারা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন অনেক আগেই। এখন বড় আব্বাজানরা তাদের ভাগ দেখাশোনা করছেন, আর আব্বা আমাদেরটা। সব দিকে নজর দিতে পারছেন না তিনি। আপনি তো সম্পত্তির আশায় বসে আছেন। টাকা ছাড়া এক মিনিট চলতে পারেন না। এভাবে ব্যবসা চলতে থাকলে আপনার টাকার ফুটানিটা কোথায় যাবে ভাবতে পারছেন?
—এই মেয়ে চুপ করো।
আসিফের ধমকেও এক চুলও নড়লো না ফাতিহা। বরং অটল থাকলো পাহাড়ের ন্যায়। আসিফ তা দেখে বিরক্ত হয়ে বাবার পানে এগিয়ে এলো। পাশে ধপ করে বসে তাকালো আযান মির্জার পানে। কপালে ভাজ ফেলে বললো—-
—ও কি বলছে এসব?
আযান মির্জা কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর টেবিলের উপর রাখা ফাইলটা বন্ধ করে ছেলের দিকে তাকালেন। চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
—যা বলছে ঠিক’ই বলছে, ভুল কিছু বলছে না।
আসিফ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো।
—মানে?
আযান মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—মানে, আমি আর আগের মতো পারছি না। বয়স হচ্ছে আসিফ। শরীরও আগের মতো সাড়া দেয় না। একসময় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কারখানায় পড়ে থাকতাম। এক গুদাম থেকে আরেক গুদাম, এক শোরুম থেকে আরেক শোরুম—সব নিজে গিয়ে দেখতাম। এখন সেই শক্তিটাই আর নেই।
আযান মির্জার কথায় ঘরজুড়ে নেমে এলো নীরবতা। সায়না মির্জা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। আর ফাতিহা স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো শ্বশুরের দিকে। আযান মির্জা ধীরে ধীরে সোফায় হেলান দিলেন। ছেলের পানে চেয়ে আবারো বললেন—-
—তোরা আজ যে বাড়িতে থাকিস, যে গাড়িতে ঘুরিস, যে বিলাসিতায় জীবন কাটাস—এসব আকাশ থেকে পড়েনি। তোর দাদাজান একটা ছোট কাপড়ের দোকান দিয়ে শুরু করেছিলেন। তখন এই মির্জা গ্রুপ বলে কিছু ছিলো না। ছিলো শুধু একটা স্বপ্ন।
আসিফ চুপ করে শুনতে লাগলো বাবার কথায়। আযান মির্জা এক মুহূর্ত থেকে আবারো বললেন—
—সেই ছোট দোকান থেকে শুরু করে আমরা আজ দেশের অন্যতম বড় টেক্সটাইল ব্যবসার মালিক। আমাদের নিজস্ব মসলিন, জামদানি আর প্রিমিয়াম কটন কাপড়ের ইউনিট আছে। তিনটা বড় কারখানা আছে। ঢাকায় চারটা শোরুম, চট্টগ্রামে দুটো, সিলেটে একটা। বিদেশেও মাল যাচ্ছে এখন। কিন্তু ব্যবসা শুধু টাকা দিয়ে চলে না। নজরদারি লাগে। সততা লাগে। সময় দিতে হয়।
কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার বললেন—
—গত ছয় মাসে হিসাবপত্রে অদ্ভুত কিছু অসঙ্গতি পেয়েছি। মাল বের হচ্ছে এক হিসাবে, বিক্রি দেখানো হচ্ছে আরেক হিসাবে। কিছু কর্মচারী সুযোগ নিচ্ছে।
আসিফ এবার একটু সোজা হয়ে বসল। মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলো বাবার কথা। ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বললো—
—আগে বলোনি কেন?
আযান মির্জা তিক্ত হাসলেন।
—কতবার বলেছি?
আসিফের মাথা নিচু হয়ে গেলো। সত্যিই তো, সে-কি কোনোদিন বাবাকে সময় দিয়েছে? বাবা বলতে চাইলেও সে-কি শুনতে চেয়েছে বাবার কথা? সবসময় তো নিজেকে নিয়ে ভেবেছে। নিজেকে সময় দিয়েছে। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে থেকেছে। বাবা ডাকলেও সময় নেই বলে কাটিয়ে দিয়েছে। তাহলে বাবার দোষ কোথায়? আসিফের বুকটা কেঁপে উঠলো। নিজেকে হুট করেই নিচু মনে হতে লাগলো। তখনি বাবার কন্ঠ তার কানে ভেসে এলো—-
—কতবার বলেছি অফিসে আসতে? ব্যবসাটা বুঝতে? আমার সঙ্গে থাকতে?
আসিফ কোনো উত্তর দিতে পারলো না বাবার কথার বিপরীতে। আযান মির্জা আবার বললেন—
—কিন্তু তোর তখন সময় ছিলো বন্ধুদের জন্য, পার্টির জন্য, রাত জাগার জন্য। বাবার কথা শোনার জন্য নয়।
কথাটা শুনে ঘরের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠলো।সায়না মির্জা অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে নিলেন।অন্যদিকে ফাতিহা নিশ্চুপ। সে জানে, এখন কথা বলার সময় নয়।
আযান মির্জা ছেলের চোখে চোখ রেখে বললেন—
—আমি তোকে সম্পত্তি দিয়ে যেতে চাই, ঠিকই। কিন্তু তার আগে চাই তুই তার মূল্য বুঝিস।
কথাটা বলতে বলতে টেবিলের উপর রাখা ফাইলটা এগিয়ে দিলেন তিনি।
—এখানে গত তিন মাসের হিসাব আছে। আমি চাই আজ তুই আমার সঙ্গে অফিসে চল।
—কিন্তু বাব…
—দয়া করে কোন অজুহাত দেখাবেন না।
আসিফের কথার মাঝখানে হুট করেই কথাটা বলে বসে ফাতিহা। আসিফ দৃষ্টি ঘুরিয়ে সেদিকে একপলক তাকালো। তবে বলার মতো কোন ভাষা পেলো না। আযান মির্জা ফাতিহার পানে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। ছেলের হাতে হাত রেখে বললেন—
—আজ কোনো অজুহাত শুনবো না। একদিনের জন্য হলেও অফিসে বসবি। দেখবি কীভাবে ব্যবসা চলে। কত মানুষের রুটি-রুজি জড়িয়ে আছে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।
আসিফ ফাইলটার দিকে তাকিয়ে রইলো।
জীবনে প্রথমবারের মতো বিষয়টা তার কাছে শুধু “বাবার ব্যবসা” বলে মনে হলো না।
এটা একটা বিশাল দায়িত্ব। একটা উত্তরাধিকার।যেটা থেকে সে এতদিন দূরে পালিয়ে বেড়িয়েছে। ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফাতিহা আবারো শান্ত গলায় বললো—
—যে সম্পদ মানুষকে সম্মান দেয়, সেই সম্পদের হকও আদায় করা উচিত।
আসিফ মাথা ঘুরিয়ে তাকালো তার দিকে। আজ আশ্চর্যজনকভাবে তার কথাগুলো আর বিরক্ত লাগছে না। বরং কোথাও যেন বিঁধে যাচ্ছে। আর সেই বিঁধে যাওয়াটাই তাকে ভাবতে বাধ্য করছে। ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো। কয়েক মুহূর্ত পর আসিফ ফাইলটা হাতে তুলে নিলো। আযান মির্জার চোখে এক ঝলক আশা ফুটে উঠলো। ফাতিহা মৃদু হাসলো মাত্র।
প্রায় দশ মিনিট পর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো আসিফ।এবার আর আগের মতো এলোমেলো টি-শার্ট আর জিন্স পরা ছিলো না তার পরণে। বরং নিজেকে বেশ পরিপাটি করে তৈরি করেছে সে।পরণে কালো রঙের ফরমাল প্যান্ট, তার সঙ্গে মানানসই সাদা শার্ট। উপরে কালো ব্লেজার। হাতে দামি ঘড়ি, চুলগুলোও সুন্দর করে আঁচড়ে নিয়েছে। কপালের ব্যান্ডেজটা এখনো রয়েছে, তবে সেটাও তার ব্যক্তিত্বকে ম্লান করতে পারেনি।
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে মুখটা গম্ভীরই ছিলো আসিফের। তবে সেই গম্ভীরতার আড়ালে আজ যেন এক ধরনের দায়িত্ববোধের ছাপ ফুটে উঠেছে। সায়না মির্জা ছেলেকে দেখে কিছুক্ষণের জন্য অবাক হয়ে গেলেন।
—মাশাআল্লাহ!
অজান্তেই কথাটা বেরিয়ে এলো তার মুখ থেকে। আযান মির্জাও কাগজপত্র থেকে মুখ তুলে তাকালেন। ছেলেকে এমনভাবে তৈরি হতে বহুদিন দেখেননি তিনি। চোখের কোণে অদৃশ্য এক তৃপ্তি ফুটে উঠলো।
—এসেছিস?
শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন আযান মির্জা।আসিফ কোনো উত্তর দিলো না। শুধু হালকা মাথা নাড়লো। ঠিক তখনই তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো ফাতিহার উপর। সকালের নরম আলো জানালা পেরিয়ে এসে পড়েছে মেয়েটার চোখে। হাতে নাশতার ট্রে। শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে সবার দিকে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য দু’জনের চোখ এক হলো। অতঃপর ফাতিহা খুব স্বাভাবিকভাবে বললো—-
—আব্বাজানের ওষুধটা সঙ্গে নিতে ভুলবেন না।
কথাটা আযান মির্জাকে উদ্দেশ্য করে বলা হলেও কেন জানি আসিফের বুকের ভেতরটা হালকা নড়ে উঠলো। সে এক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ফাতিহার দিকে। তারপর ধীরে চোখ ফিরিয়ে নিলো।
তাকদিরে তুমি পর্ব ১০
—চলো, বাবা।
গম্ভীর কণ্ঠে বললো আসিফ। আযান মির্জা উঠে দাঁড়ালেন। চোখেমুখে স্পষ্ট সন্তুষ্টির ছাপ।
বাবা-ছেলে একসঙ্গে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। দরজার কাছে পৌঁছে আযান মির্জা একবার পেছনে তাকালেন। সায়না মির্জার ঠোঁটে হাসি। আর ফাতিহা দাঁড়িয়ে আছে আগের মতোই শান্ত মুখে। আসিফও অজান্তেই আরেকবার চোখ ঘুরিয়ে তাকালো তার দিকে।তারপর আর কিছু না বলে বাবার সঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো সে। ফাতিহা লম্বা শ্বাস টেনে চোখজোড়া মেলে তাকালো দরজার পানে। মৃদু হাসলো সে। অন্যদিকে সায়না মির্জা তাকিয়ে রইলো ফাতিহার পানে।
