Home তাকদিরে তুমি তাকদিরে তুমি পর্ব ১০

তাকদিরে তুমি পর্ব ১০

তাকদিরে তুমি পর্ব ১০
মোনালিসা মেহরোজ

সন্ধ্যা নেমেছে মির্জা বাড়িতে। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে রাতের খাবার গুছিয়ে নিচ্ছিলো ফাতিহা। একে একে তরকারির বাটিগুলো ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রাখছে সে। বাড়ির পরিবেশ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। আগের রাতের ঘটনাটা সবার মনে বেশ ভালোই ছাপ ফেলে গেছে।
ফাতিহার ভাবনার মাঝেই রান্নাঘরে প্রবেশ করলেন সায়না মির্জা। ফাতিহাকে ব্যস্ত দেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। তারপর নরম গলায় বললেন–

—মা! একটা কথা ছিলো।
ফাতিহা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ালো। মৃদু হেঁসে শাশুড়ীকে বললো—-
—জ্বি আম্মু?
—কালকে দুপুরে আমাদের বাড়িতে কিছু অতিথি আসবে।
—আচ্ছা।
—তোমার বড়’বাবা, চাচা-শ্বশুরের পরিবার, আর সঙ্গে আরও দু-একজন আত্মীয়। অনেকদিন পর সবাই একসাথে হবে। আমি ভাবছিলাম রান্নাবান্না আর অতিথিদের দেখাশোনার দায়িত্বটা তুমি নিলে কেমন হয়?
ফাতিহার মুখে বিনীত হাসি ফুটে উঠলো। মৃদু হেঁসে বললো—-
—ইনশাআল্লাহ আম্মু। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।
সায়না মির্জা যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
—জানি মা, তুমি পারবে।

ঠিক সেই মুহূর্তে ডাইনিংয়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো আসিফ।কথাগুলো তার কানে গেলেও সে কোনো মন্তব্য করলো না। শুধু একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো।
রাতের খাবার শেষে সবাই নিজ নিজ ঘরে চলে গেলো। ফাতিহাও ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করলো।
ঘরে ঢুকতেই দেখলো আসিফ বিছানার একপাশে বসে ফোন স্ক্রল করছে। কপালের ব্যান্ডেজটা এখনো খোলা হয়নি। ফাতিহা কোনো কথা না বলে আলমারি খুলে নিজের বালিশ আর পাতলা চাদর বের করলো। তারপর ঘরের এক কোণে বারান্দার দরজার কাছে বিছানা পেতে নিলো। আসিফ একবার তাকালো সেদিকে। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো। কেউ কোনো কথা বললো না। একই ঘরে দুজন মানুষ কিন্তু তাদের মাঝে যেন কয়েক আলোকবর্ষ দূরত্ব।

ফাতিহা জায়নামাজে বসে কিছুক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত করলো। এরপর দোয়া পড়ে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়লো। অন্যদিকে আসিফও বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। ঘরের বাতি নিভে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ জেগে রইলো দুজনেই। কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বললো না। কাল রাতে ফাতিহা এ ঘরেই ছিলো। আসিফ অসুস্থ বলে সে বা আসিফ নিজেও অন্য ঘরে যায়নি। বরং রাতে যদি স্বামীর কিছু দরকার হয় তাই এখানেই রইলো ফাতিহা। যেনো আসিফের বিরক্তি এড়িয়ে নিঃশব্দে তার প্রয়োজন মেটাতে পারে।

পরদিন সকাল।
ফজরের নামাজের পর থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়লো ফাতিহা। অতিথিরা আসবে বলে রান্নাঘরে কাজের চাপও বেশি। সকাল গড়িয়ে দুপুর হওয়ার আগেই পুরো বাড়িতে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়ে গেলো। একের পর এক গাড়ি এসে থামতে লাগলো মির্জা বাড়ির সামনে।
অতিথিদের কোলাহলে জমে উঠলো পুরো বাড়ি।
বড় চাচা-শ্বশুর, চাচি, তাদের ছেলেমেয়েরা, আরও কয়েকজন আত্মীয়—সব মিলিয়ে বাড়ি ভরে গেলো মানুষে। সায়না মির্জা সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
আর ফাতিহা? সে তখন রান্নাঘরে। চুলার উপর কয়েকটি বড় হাঁড়ি বসানো। একটাতে কোরমা, আরেকটাতে রেজালা। পাশে পোলাওয়ের বিশাল বড় ডেকচি। কাজের মেয়েরা সাহায্য করলেও পুরো আয়োজনের মূল দায়িত্ব তার কাঁধেই। ঠিক তখনি রান্নাঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন সায়না মির্জা। মেয়েটার ব্যস্ততা দেখে মুগ্ধ হয়ে বললেন—-

—আম্মা! তোমায় বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলছি না তো?
ফাতিহা মৃদু হাসলো।
—না আম্মু। আলহামদুলিল্লাহ, সব ঠিক আছে। বাড়িতে অতিথি এলে সানন্দে গ্রহণ করতে হয়। অতিথিদের জন্য এটুকু খাটুনি কিছুই না। আপনি গিয়ে বসুন।
সায়না মির্জার চোখদুটো স্নেহে ভরে উঠলো। তার পছন্দ করা মেয়েটা যে এতো তারাতাড়ি সংসার গুছিয়ে নিতে শুরু করেছে, এতো এতো দ্বায়িত্ব নিজ কাঁধে নিতে আরম্ভ করেছে ভাবতেই চোখজোড়া ছলছল করে উঠলো। সাথে মনে হলো, আসিফ যদি এই নরম মেয়েটার ছোঁয়ায় একটু বদলে যেতো! যদি মেয়েটাকে আপন করতো!
সায়না মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তিনি জানেন ফাতিহা ছেলের মন জয় করতে পারবে। তবে তাতে যে বাঁধা কম নয়। আর এখানেই তো তার ভয়। ছেলেটা যে বড্ড জেদি।
সায়না মির্জা ছলছলে চোখে ফাতিহাকে নরম গলায় বললেন—-

—আল্লাহ তোমাকে সুখে রাখুক মা।
ফাতিহা শুধু মুচকি হাসলো। এরই মধ্যে কয়েকজন আত্মীয় রান্নাঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একজন মধ্যবয়সী খালা হেসে বললেন—-
—সায়না, তোমার বউমাকে দেখে তো চোখ জুড়িয়ে যায়। সকাল থেকে দেখছি একা হাতে সব সামলাচ্ছে।
আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন—
—শুধু কাজ করলেই তো হয় না, ব্যবহারেরও তো একটা ব্যাপার আছে। মেয়েটা এত ভদ্র যে কথা বললেই মন ভালো হয়ে যায়।
—একদম ঠিক বলেছেন। আজকাল এমন মেয়ে খুব কম দেখা যায়।
সকলের এতো এতো প্রশংসাগুলো শুনে ফাতিহা অস্বস্তিতে মাথা নিচু করে ফেললো। লজ্জায় কেমন লাল হয়ে উঠলো তার পেলবখানা।
—আপনারা বেশি বলছেন।
—না মা, সত্যি বলছি।
মহিলাদের একজন স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন—
—তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে এই বাড়ির জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমত তুমি। মাশাল্লাহ।
কথাগুলো শুনে সায়না মির্জার বুকটা গর্বে ভরে উঠলো। অন্যদিকে রান্নাঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আসিফের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। কেন জানি এসব তার ভালো লাগছে না। যেদিকে তাকায়, সেদিকেই ফাতিহার প্রশংসা।

মা-বাবা তাকে নিয়ে খুশি।আত্মীয়রা তাকে নিয়ে খুশি৷ এমনকি বাড়ির কাজের লোকেরাও তাকে সম্মান করে। ব্যাপারটা অদ্ভুতভাবে বিরক্ত করতে লাগলো আসিফকে। ঠিক তখনই তার চোখ পড়লো চুলার উপর রাখা বড় কোরমার হাঁড়ির দিকে। মুহূর্তেই মাথায় একটা চিন্তা খেলে গেলো তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কে। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠলো বাঁকা হাসি।
কিছুক্ষণ পর রান্নাঘর খালি পেয়ে ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলো আসিফ। ফাতিহা তখন পাশের স্টোররুমে কিছু আনতে গেছে। কাজের মেয়েরাও অন্য কাজে ব্যস্ত। সুযোগটা হাতছাড়া করলো না আসিফ। চারপাশে একবার তাকিয়ে নিশ্চিত হলো কেউ তাকে দেখছে না। তারপর ধীরে ধীরে কোরমার হাঁড়ির ঢাকনা সরালো। গরম ধোঁয়া বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে।
টেবিলের উপর রাখা লবণের বয়াম হাতে তুলে নিলো আসিফ। পরের মুহূর্তেই বেশ খানিকটা লবণ ঢেলে দিলো তরকারির মধ্যে। একবার নয়, দু’বার, মোট তিনবার। যতক্ষণ না তার মনে হলো খাবারের স্বাদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো পরিমাণ হয়েছে। এরপর হাতের খুন্তি দিয়ে ভালোভাবে নেড়ে দিলো পুরো তরকারি। ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হয়ে উঠলো তার।

—এবার দেখা যাবে তোমার প্রশংসা কতদূর যায়।
বিড়বিড় করে বলে উঠলো আসিফ।অতঃপর স্বাভাবিক মুখ করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
অন্যদিকে,
রান্নাঘরে ফিরে আসার সময় দরজার কাঁচে আসিফের প্রতিফলনটা স্পষ্ট দেখেছিলো ফাতিহা। আর সেই প্রতিফলনে লবণের বয়াম হাতে আসিফকে চিনতে তার একটুও কষ্ট হয়নি।
ফাতিহা কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
অতঃপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে কোরমা থেকে এক চামচ ঝোল তুলে মুখে দিলো। পরক্ষণেই ভ্রু কুঁচকে গেলো তার।লবণ সত্যিই অনেক বেশি। অতিথিদের সামনে পরিবেশন করার মতো আর নেই এটা।
ফাতিহা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মনে মনে ব্যথিত হলো তার কোমল হৃদয়। সে মোটেও এটা আশা করেনি আসিফের থেকে। তাকে ফাঁদে ফেলতে আসিফ যে বাড়ির অতিথিদের খাবার নিয়ে এটা করবে ফাতিহা তার ভাবতেও পারে নি। হুট করেই আসিফের প্রতি এক চিমটি ঘৃণা জন্মালো ফাতিহার কোমল হৃদয়ে। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলো মেয়েটা। স্বামী শব্দটার পাশ হতে ঘৃণা নামক শব্দটা মুহূর্তেই সরিয়ে ফেললো। চোখজোড়া বন্ধ করে নিজ মনেই বিড়বিড় করে বললো—-
—সে খারাপ নয়, শুধু পথভুলো এক পথিক। তার জন্য আমার হৃদয়ে ঘৃণা জন্ম দিয়েন না খোদা। বরং ধৈর্য দিন৷

লম্বা খাবার টেবিল তখন অতিথিতে ভরে উঠলো। সকলে সারি বদ্ধ ভাবে বসে পরলো নতুন বউয়ের হাতের তৈরি খাবারের সাধ গ্রহনে। সায়না মির্জাসহ ফাতিহা নিজ হাতেই সকলকে খাবার পরিবেশন করতে লাগলো। একে একে সব খাবারগুলো সকলের পাতে দিতে লাগলো মন দিয়ে।
অন্যদিকে আসিফ অপেক্ষা করতে লাগলো কখন ফাতিহার তৈরি কোরমা কেউ মুখে তোলে। আসিফের বড়’বাবা বেশ খুঁতখুঁতে মানুষ। লম্বা টেবিলের মাথায় বসে নতুন বউয়ের খাবার পরিবেশন দেখছেন তিনি। বাড়িতে বাহিরের কাজের লোকসহ বেশ কিছু পরপুরুষ থাকায় ওড়না দিয়ে মাথাসহ মুখখানা আড়াল করে রেখেছে ফাতিহা। যদিও বাড়ির সকল লোক’জনই তার মুখ দেখেছে আসিফ বাদে। এই ব্যপারাখানা অবশ্য অবাক করেছে আসিফকে। তবুও কথা বলার মতো সুযোগ পায়নি।
ফাতিহা সকলকে খাবার বেড়ে দিয়ে এসে দাঁড়ালো শাশুড়ীর পাশে। আসিফের বড়’বাবাসহ সকলে বিসমিল্লাহ বলে খাবারে হাত রাখলেন। অন্যদিকে আসিফের হৃদয়টা লাফাতে লাগলো পরবর্তী প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষায়।

সকলে একে একে সকল খাবারের পাশাপাশি কোরমাও মুখে তুললো। তবে আশ্চর্যের বিষয় কেউ মুখ কুঁচকে নিলো না। কেউ বললো না বাজে হয়েছে খেতে। কেউ কোনরূপ অভিযোগ জানালো না। আসিফের বড়’বাবা আবির মির্জা খাওয়ার মাঝখানেই মৃদু হেঁসে ফাতিহার পানে তাকালেন। হাসিমুখে বললেন—-

তাকদিরে তুমি পর্ব ৯

—মাশাল্লাহ , আমার বউমার রান্নার হাত দেখছি সোনায় মোড়ানো।
ফাতিহা তার কথায় মৃদু হাসলো। অতঃপর তাকালো অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে থাকা আসিফের পানে। যে আবির মির্জার কথায় আকাশ থেকে পরেছে এমন ভাব ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ফাতিহা তা দেখে মৃদু হাসলো।

তাকদিরে তুমি পর্ব ১১