রুহ এ ইশক পর্ব ২৪
আনান রোজ
—”দেখুন তো? এখন পর্যন্ত জ্বলছে! রিভেঞ্জ কেউ এভাবে নেয় প্রফেসর সাহেব? আমি এভাবে বাইট করেছি কখনো আপনাকে? আর আপনি?”
ইনশিরা উযাইনের তীব্র পজেসিভনেস মাখানো “শিকলবন্দী করা” র মোক্ষম হুমকি শুনে, প্রসঙ্গ পালটাতে উযাইনের শার্টের কলারটা নিজের চিকন আঙুল দিয়ে খামচে ধরে,অভিমানী স্বরে বলল কথা গুলো। উযাইন তার পিচ্চি বউয়ের অভিযোগ শুনে মুচকি হেসে ইনশিরার গাল গুলো দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে আদুরে গলায় বলে—
—”সরি! লিটল বার্ড, নেক্সট টাইম খেয়াল রাখব।”
উযাইনের কথায় ইনশিরা কিছুটা অবাক হলো, তার ধারণা মতে উযাইন-ই তার দেখা প্রথম পুরুষ যে কিনা নিজের স্ত্রীর সামনে কোনো অহংকার রাখে না। নিজের ভুল গুলো এক্সেপ্ট করে এবং এপলোজি ও করে। ওই দিন তো নির্দ্বিধায় সরি বলছিল বার বার করে। আর আজকেও। ইনশিরা উযাইনের হালকা ভেজা চুল গুলো তে হাত বুলিয়ে, একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে বলে—
—”আপনি এভাবে ক্ষমা চাইতে থাকেন! আপনার ইগোতে লাগে না? একজন সুনামধন্য প্রফেসর আর বিজনেস ম্যান হয়ে, একটা উনিশ বছরের মেয়ের কাছে বার বার ক্ষমা চান?”
উযাইন ইনশিরার প্রশ্নের উত্তর দিলনা। বউয়ের পায়ে ধরতেও তার লজ্জা করে না! কেন ই বা করবে? সে কি, নিজের ব্যক্তিত্ব ভুলে রাস্তায় যার তার পায়ে পড়ে যাচ্ছে? নাকি ক্ষমা চাইছে? নিজের অর্ধংগীনির কাছে নিজের সর্বস্ব দিয়ে দিতে পারে সে।
এই কথা গুলো ভাবতে ভাবতে উযাইন ইনশিরার গায়ের পশমি সোয়েটারের সামনের জীপার টা কিছু টা নিচের দিকে নিয়ে। কাধ থেকে সোয়েটার টা সরিয়ে দিল! আচমকা এমন কিছু হওয়ায় ইনশিরার শ্বাস যেন থেমে যাওয়ার উপক্রম। উযাইন তখনও চুপ, সে আলতো করে ইনশিরার গলায় কাম*রের দাগ গুলো স্পর্শ করলো, ইনশিরার শুষ্ক ঢোক গিলল, উযাইন ওর গলায় আংগুল গুলো স্লাইড করতে করতে মায়াবী আর নেশালো স্বরে—
—”তু যেহ মেরি রা’ব নে মিলা’য়া! মেনে তু যেহ আপ’না বানা’য়া….! আব না বিছার না খুদা’য়া….!
মহব্বত রূহ কি হ্যায় লাজিম গিজা হাত রা’খ দে তু দিল পে যারা….
তালাব হ্যায় তু, তু হ্যায় নেশা…গুলাম হ্যায় দিল ইয়ে তে’রা! খুলকে যারা জী লুঁ তু’যেহ, আজা মেরি সাঁ’সো মেঁ আ…..
এই অব্দি বলেই উন্মাদ প্রফেসর সাহেব ইনশিরাকে আর কোনো প্রশ্ন বা যুক্তি মেলানোর সুযোগই দিল না। সে এক ঝটকায় নিজের মুখটা নামিয়ে ইনশিরার মায়াবী নরম ঠোঁট জোড়া নিজের ঠোঁটে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরে!
রাতের সেই শেষ গভীর ও পরম শান্তির চুম্ব*নের আবেশে হারিয়ে গেল ! ইনশিরা এই রহস্যময় কথার লজিক বা গভীর মানে নিজের মাথায় কিছুই মেলাতে পারল না, সে উযাইনের ওই তীব্র স্পর্শের মাদকতায় চোখ দুটো বন্ধ করে পরম সুখে হারিয়ে গেল। ৩ দিনের একাকীত্বের শেষ নিঝুম রাতটা ওদের জীবনে এক অপার্থিব ও চিরন্তন পূর্ণতা দিয়ে শেষ হলো।
ভোর ৬টা বাজে।
উযাইনের ফোন টা অনবরত রিং হচ্ছে। সে চোখ পিটপিট করে, অত্যন্ত বিরক্ত মুখে সোফা থেকে হাত বাড়িয়ে টেবিলের ফোনটা তুলে নিজের চোখের সামনে আনল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ওর চোখ চড়কগাছ! স্ক্রিন জুড়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা উঠছে—
“জাহির”!
উযাই, নিজের বুকে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে থাকা ঘুমন্ত ইনশিরার দিকে একবার আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে ধকধক করতে থাকা বুকে কলটা রিসিভ করে কানের কাছে নিল।জাহির ফোন রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে এক্কেবারে চেঁচিয়ে উঠল—
—”উযাইন! তোকে আমি কাল রাত থেকে অনবরত মেসেজ আর ইমেইল পাঠাচ্ছি, তুই কোথায় আছিস রে? কোনো রেসপন্স নেই কেন তোর?! আমরা এখন তোদের মেইন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, জলদি দরজাটা খোল ভাই!”
এসব শুনে উযাইনের গলার নালীটা এক সেকেন্ডে ভয়ে আর আতঙ্কে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে তোতলামির স্বরে আমতা আমতা করে কাঁপানো গলায় বলল—
—”এখানে মানে…? তোরা দরজার সামনে মানে কী? আমি ঠিক বুঝলাম না জাহির…”
জাহির ব্যস্ত গলায়—
—”আরেহ চলে এসেছি। রাত ৩টায় লন্ডনে ল্যান্ড করেছি। এখন তোদের বেল বাজাচ্ছি, খুল না?
উযাইন কোনো কথা না বলে ফোনটা কেটে দিল। সে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নিজের কপালে হাত দিয়ে মনে মনে এক গভীর আক্ষেপ আর হাহাকার নিয়ে বলল—
“উফফ!আমার কপালে সুখ কেন যে এত ক্ষণস্থায়ী হয়, আল্লাহ ই জানেন! মাত্র কয়েকটা ঘণ্টার জন্য এই মেয়েটার মায়া নিজের বুকে জড়িয়ে শান্তিতে ঘুমালাম… আর এর মাঝেই আমার শ্বশুর-শাশুড়ি এয়ারপোর্ট থেকে সোজা দরজার সামনে এসে হাজির হয়ে গেল!”
উযাইন নিজের ক্ষোভ সামলে নিয়ে খুব আলতো করে ইনশিরার দিকে ঝুঁকে এলো। সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করতে চাইল না, ইনশিরার কপালে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে গভীর ও ওম ছড়ানো একটা চুমু খেল তারপর খুব নিচু, মায়াবী ও কাঁপানো গলায় আস্তে করে ডাকল—
—”এই পিচ্চি… ওঠো? লিটল বার্ড… জলদি চোখ মেলো!”
কিন্তু ইনশিরা ঘুমে কাদা হয়ে উযাইনের চওড়া বুকে আরও একটু বেশি লেপ্টে গেল, তার চোখের পাতা বিন্দুমাত্র নড়ল না। উযাইন এবার নিজের সোজা-সাপটা রূপ ধারণ করল। সে ইনশিরার মুখের ওপর ছড়িয়ে থাকা রেশমি চুলগুলো একহাতে আলতো করে সরিয়ে দিয়ে ওর ঠোঁট জোড়ায় নিজের ঠোঁট জোড়া ডুবিয়ে দিয়ে অনবরত কয়েকটা তপ্ত চুমু বসাতে লাগল।
ঠোঁটের সেই কাঁপানো ও নেশাতুর ছোঁয়া লাগামাত্রই ইনশিরা ঘুমের ঘোরেই হালকা একটা আদুরে আওয়াজ করে উঠল। উযাইন ওর কানের লতির কাছে নিজের মুখ এনে চড়া ও সতর্ক গলায় বলল—
—”ইনশিরা, জলদি ওঠো! জাহির আর ইরা এন্ট্রেন্সে দাঁড়িয়ে আছে! ওরা চলে এসেছে!”
বাবা আর মায়ের চলে আসার কথা থেকে শোনামাত্রই ইনশিরার মগজে যেন এক বিশাল ৪৪০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক কারেন্ট আছড়ে পড়ল! সে এক সেকেন্ডে নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে মেলে, উযাইনের বুক থেকে ছিটকে বের হয়ে সোফার ওপর এক প্রকাণ্ড লাফ দিয়ে উঠে বসল। তার ফর্সা মুখটা ভয়ে, লজ্জায় আর আকস্মিক আতঙ্কে এক নিমেষে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে নিজের এলোমেলো ড্রেস টা তাড়াহুড়ো করে ঠিক করতে করতে উযাইনের দিকে অসহায় চোখে তাকাল।
জাহির কলিং বেলের অনবরত আওয়াজে লিভিং রুমের বাতাস তখন একদম থমথম করছে। ইনশিরা সোফা থেকে এক লাফে নেমে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, উযাইনও নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে মেইন দরজার গেল। সে ধীর পায়ে গিয়ে লকটা খুলে দরজাটা এক টানে খুলে দিল। দরজা খুলতেই বাইরে থেকে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন জাহির আর ইরা। ইনশিরা এক দৌড়ে গিয়ে নিজের বাবা আর মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ইরা উযাইনের দিকে তাকিয়ে, বেশ অবাক হয়ে বললেন—
—” উযাইন? রাত থেকে কতবার কল করছি, তুমি ফোন তুলছিলে না কেন? আমরা তো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একদম জমে যাচ্ছিলাম!”
জাহির ড্রয়িংরুমের জানলা দিয়ে নিজেদের পাশাপাশি বাড়ির দিকে তাকিয়ে কপালে হাত দিয়ে বললেন—
—”আরেহ উযাইন, ওসব কথা ছাড়! আগে এটা বল, আমাদের বাসায় কি হয়ে ছিল”
—”আসলে আব্বু, ওই সন্ধ্যায় আমি যখন বাসায় গিয়েছিলাম, হুট করেই কিচেনের মেইন লাইনে একটা বড় শর্টসার্কিট হয়েছিল ! পুরো লাইনে আগুন ধরে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল!”
উযাইন ইনশিরার কথায় সায় দিয়ে মাথা নেড়ে গম্ভীর গলায় বলল—
—”হ্যাঁ জাহির। আর, কাল বিকেলে প্রফেশনাল ইলেকট্রিশিয়ান ডেকেছিলাম। সে সব চেক করে বলেছে মেইন পাওয়ার গ্রিডের সব পুড়ে গেছে। সবকিছু চেঞ্জ করতে হবে। কাজটা কমপ্লিট হতে এক মাসের কমবেশি সময় লেগেই যেতে পারে!”
—”ওহ গড! এক মাস লাগবে?! তাহলে তো এখন আমাদের, একটা ভালো হোটেল দেখে সাময়িকভাবে গিয়ে উঠতে হবে!”
জাহির এক বুক চিন্তা নিয়ে, পকেটে হাত দিয়ে,কথা গুলো বললেন। হোটেলের কথা শুনে ইনশিরার মুখটা একদম শুকিয়ে আমসি হয়ে গেল! সে উযাইনের থেকে এক মাসের জন্য আবার দূরে চলে যাবে, এটা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারছে না। সে এক নিমেষে নিজের সব মায়া ভুলে উযাইনের দিকে এক তীব্র, জ্বলন্ত ও রাগী বাঘিনীর মতো চাউনি ছুড়ে দিল—যার অর্থ ছিল, আপনি যদি এখন আমার বাবা-মাকে এখানে থাকার জন্য জোর না করেন, তবে আপনার কপালে আজ চরম শনি আছে!
উযাইন ইনশিরার ওই ভয়ংকর রাগী চাউনি দেখা মাত্রই ভয়ে কুঁকড়ে গেল সে তাড়াতাড়ি নিজের হাত দুটো নাড়িয়ে জাহিরের দিকে এগিয়ে গেল।
উযাইন আমতা আমতা করে, তাড়াহুড়ো করে বলল—
—”আরেহ জাহির! তুই হোটেল ওঠার কথা কীসের জন্য ভাবছিস? তোরা… তোরা সবাই এই এক মাস এখানে… মানে আমার এই বাসাতেই থাকবি! আমার যা কিছু আছে তো তোরেই! তোরা কোথাও যাবি না!”
জাহির একটু ইতস্তত করে উযাইনের কাঁধ চাপড়ে বললেন—
—”থ্যাংক ইউ রে দোস্ত। কিন্তু তাই বলে একটানা এক মাস আমরা তোর বাসায় পড়ে থাকব? তোরও তো একটা নিজস্ব লাইফ, একটা পার্সোনাল প্রাইভেসি বলতে কিছু আছে?”
ইরা জাহিরের কথায় সায় দিয়ে—
—”হ্যাঁ উযাইন, জাহির একদম ঠিক বলেছে। তুমার প্রাইভেসি নষ্ট করা আমাদের ঠিক হবে না।”
সায় দিতে চাইল। সে মুখে “হ্যাঁ, তা অবশ্য…” বলতে যাবে, ঠিক তখনই তার চোখ গেল ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইনশিরার দিকে। ইনশিরা নিজের দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে, নিজের হাত দুটো মুঠো করে উযাইনকে আক্ষরিক অর্থেই চোখে চোখ রেখে জবাই করার মতো একটা লুক দিল! উযাইনের পিঠ বেয়ে এক তীব্র ঠান্ডার স্রোত বয়ে গেল। সে নিজের সব ইগো এক সেকেন্ডে বিসর্জন দিয়ে এক লাফে গিয়ে জাহিরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল!
উযাইন চরম তোতলামির স্বরে, জোরে চেঁচিয়ে বলল—
—”প্রাইভেসি?! কীসের প্রাইভেসি… তোরা এই বাসাতেই থাকছিস, ব্যস!”
বলে, উযাইন জাহির কে জরিয়ে ধরে, আর সেও রাজি হয়ে যায়। এরপর সিদ্ধান্ত হলো ওরা এখানেই থাকবে।
ইরা ক্লান্ত শরীরে ড্রয়িংরুমের সেই সুদৃশ্য বিশাল সোফাটার দিকে এগিয়ে গেলেন বসার জন্য। কিন্তু সোফার একদম কাছাকাছি গিয়েই ইরা হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার তীক্ষ্ণ চোখ গেল সোফার সুদৃশ্য কুশন আর এলোমেলো হয়ে থাকা চাদরটার ওপর।
ইরা ভ্রু কুঁচকে, সোফার কুশনগুলো হাত দিয়ে সোজা করতে করতে সন্দিহান গলায় বলল—
—”সোফাটার এমন বিধ্বস্ত আর এলোমেলো অবস্থা? সব ওমন কুঁচকে আছে কেন? রাতে এখানে কেউ ঘুমিয়ে ছিল নাকি?”
পাশে থাকা ইনশিরার বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দন এক লাফে একশোতে পৌঁছে গেল! দুজনে চরম প্যানিকড হয়ে, তারা কোনো রকম বুদ্ধি খাটানোর আগেই এক সাথে, এক সুরে চড়া গলায় লিভিং রুম কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল—
—”আমি…!!”
উযাইন আর ইনশিরার এই হুট করে একসাথে একই জবাব দেওয়া এবং ওদের এই ভড়কে যাওয়া ফেস দেখে জাহির আর ইরা দুজনেই হাত থামিয়ে চরম কৌতূহল ও সন্দেহ নিয়ে হাঁ করে ওদের দিকে তাকালেন। পুরো লিভিং রুমে এক সেকেন্ডে এক চরম অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো।
উযাইন চরম থতমত খেয়ে, লজ্জায় আর অপ্রস্তুত ভাবনায় নিজের কানের লতি চুলকাতে চুলকাতে তোতলামির চরম সীমানায় পৌঁছে গেল—
—”না… না মানে ভাবি, আমি! আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে… আমি আসলে…
ইনশিরা দেখল উযাইনের তোতলামির কারণে এক্ষুনি হয়তো সব মায়ের সামনে ফাঁস হয়ে যাবে ! সে আর এক সেকেন্ড নষ্ট না করে উযাইনের কথা মাঝপথেই কেটে দিয়ে নিজের পাকা মাথা খাটিয়ে এক মোক্ষম মিথ্যা দলিল পেশ করল।
ইনশিরা খুব স্বাভাবিক আর বিনয়ী হওয়ার ভান করে এক গাল হেসে বলল—
—”আরেহ না আম্মু! আসলে হয়েছিল কী… কাল রাতে আমি আর উমায়ের… আমরা দুজনে মিলে উযাইন সাহেবের বেডরুমে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম!”
—”হ্যাঁ! হ্যাঁ ভাবি, ওরা দুজনে ওপরে আমার রুমে ঘুমাচ্ছিল…আর আমরা… না মানে, আমি এখানে।
উযাইন আর ইনশিরার তোতলামির গল্প শুনে জাহির আর ইরা শেষপর্যন্ত মুচকি হেসে সায় দিলেন। তবে টেবিলের আড়ালে দাঁড়িয়ে ইনশিরা উযাইনের দিকে তাকিয়ে আলতো করে ফ্লাইয়িং কিস দিল। যা দেখে প্রফেসরের কানের দুপাশ দিয়ে আবার গরম লাভা ছুটতে শুরু করল!
সময় পেরিয়ে বাজল, সকাল ৯টা।
উযাইনের গাড়িটা এখন লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে চলছে । প্রতিদিনের মতো উমায়েরকে স্কুলের সামনে ড্রপ করে দিল, উযাইন গাড়িটা ইউনিভার্সিটির দিকে না নিয়ে হুট করেই স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে সম্পূর্ণ অন্য একটা অচেনা রাস্তার দিকে হাইওয়েতে তুলে নিল। ইনশিরা গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসে কোলে বই নিয়ে পড়া রিভিশন দেওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু সকালের সেই উযাইনের ভয়ংকর কথা গুলো মনে পড়ে ওর মাথা পুরো ফেটে যাচ্ছিল !
হুট করেই জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ইনশিরা খেয়াল করল চারপাশের রাস্তাঘাট চেনা ক্যাম্পাসের মতো নয়। সে বইটা বন্ধ করে চোখ বড় বড় করে উযাইনের দিকে তাকাল। ইনশিরা একটু চড়া গলায়—
—”এই যে মিস্টার প্রফেসর! গাড়িটা ওদিকে কোন দিকে ঘুরালেন? আপনি ইউনিভার্সিটিতে যাবেন না? ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে তো!”
উযাইন সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে ড্রাইভ করতে করতে, ঠোঁটের কোণে মায়াবী হাসি ফুটিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল—
“আজ ইউনিভার্সিটিতে কোনো ক্লাস নেই, ইনশিরা। আমি আজকের জন্য লিভ নিয়েছি।”
উযাইনের এই আকস্মিক ছুটির কথা শুনে ইনশিরার ভেতরের সব রাগ এক সেকেন্ডে চাড়া দিয়ে উঠল। সে সিটের ওপর ঘুরে বসে উযাইনের দিকে তাকিয়ে রেগে গিয়ে বলল—
—”আপনি একটা আস্ত দুষ্টু আর বেহায়া লোক ! আমি এদিকে পরীক্ষার টেনশনে একদম জমে বরফ হয়ে যাচ্ছি, আর আপনি কিনা আয়েশ করে ছুটি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন!
উযাইন গাড়ির স্পিড একটু কমিয়ে, মুচকি হেসে বলল—
—”আমার খুব ক্লোজ ফ্রেন্ডস থাকে। আজ ওদের সাথেই দেখা করতে যাচ্ছি।”
—”আপনার ফ্রেন্ডদের সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন? কিন্তু আমি কেন যাব? আমাকে সাথে নেওয়ার কী দরকার?”
ইনশিরা বেশ অবাক হয়ে, ভ্রু কুঁচকে বলল। উযাইন কিছু বলল না। এক রেস্টুরেন্টের এনে গাড়িটা পার্কিং লটে থামাল। সে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে এক ঝটকায় ইনশিরার দিকে পুরো শরীরটা ঘুরিয়ে বসল। সে ইনশিরার সেই রাগী, কিউট ফেসটার দিকে নিজের মায়াবী আইস ব্লু চোখ দুটো নিবদ্ধ করে অত্যন্ত গভীর ও পুরুষালী গলায় বলল—
—”তুমি কেন যাবে মানে কী, ইনশিরা? নিজের বউকে পরিচয় করাতেই তো আমি তোমাকে সাথে করে নিয়ে এসেছি ”
উযাইনের মুখ থেকে নিজেকে “বউ” হিসেবে পরিচয় দেওয়ার কথা শুনে খুশিতে এক নিমেষে তোলপাড় হয়ে গেল! তবে সে চরম লজ্জায়, শিহরণে আর এক অদ্ভুত সুখে একদম লাল টমেটো হয়ে জানলার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
উযাইন গাড়ি থেকে নামল। সে ঘুরে এসে ইনশিরার পাশের দরজাটা খুলে দিল। ইনশিরা গাড়ি থেকে নামতেই, উযাইন কোনো সামাজিক ভয় না রেখে এক ঝটকায় ইনশিরার সেই নরম ফরসা হাতটা নিজের শক্ত বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় জড়িয়ে ধরল। সে পরম মায়ায় ইনশিরার হাতটা ধরে লম্বা লম্বা পা ফেলে রেস্টুরেন্টের ভেতরের দিকে নিয়ে গেল। এতদিনের সেই দূরত্বের দেয়াল ভেঙে আজ উযাইন নিজের বন্ধুদের সামনে ইনশিরাকে নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দিতে চলেছে।
রেস্টুরেন্টে ভেতর গেল ওখানে একপাশের টেবিলে দুজন বসেছিল উযাইন ইনশিরার হাত ধরে নিয়ে ওখানে থামলো, ইনশিরার কেমন যেন অসস্তি লাগছে। ওখানে বসা দুজনেই উঠে দাঁড়ায় আর, একজন বলে—
—”কিরে উযাইন কেমন আছিস এন্ড হো ইজ শি?”
—”ভালো আলহামদুলিল্লাহ। যামির।”
উযাইন হাত বাড়িয়ে বলে। উযাইন ইনশিরার দিকে চেয়ার টেনে বসতে তাকে বলে। এবং পাশে বসা আসিফ ফোন টা রেখে বলে—
—”আসসালামু আলাইকুম ভাবি ভালো আছেন?”
ইনশিরা থতমত খেয়ে গেলো। সে বুঝতে পারলো না কি হলো। সে একটা ঢুক গিলে উত্তর দেয়, যামির চমকে তাকিয়ে রইল সবার দিকে, সে বুঝতে পারছে না হয়তো কি হচ্ছে। আসিফ মুচকি হেসে বলে,
—”ডোন্ট ওরি, ভাবি আমি সব জানি। আপনার এই পাগল প্রেমিক, সরি হাজবেন্ড সব বলছে তিন বছর আগেই।
কথা গুলো শুনে যামির বার বার করে তাকাচ্ছিল। সে কিছু বুঝতে পারছে না। আসিফ ওর ভাব দেখে মুচকি হাসল সাথে উযাইনও, আর ওদের ভাব দেখে ইনশিরা বোকা বনে গেল।
যামির হলো উযাইনের কলেজ ফ্রেন্ড। আসিফ বাঙালি হলেও, সে পুরোপুরি ব্রিটিশ। যামির চেয়ারে সোজা হয়ে বসল। আর ইনশিরার দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করে বলল—
—”হাই!”
জবাবে ইনশিরা মুচকি হাসল। কিন্তু সে টেবিলের নিচ দিয়ে উযাইনের হাত টা খামছে ধরে রেখেছে, যেন নক গুলো বসিয়ে দেওয়ার উপক্রম। এই এমন একটা পরিস্থিতি এনে এখন দাত কেলিয়ে হাসছে। যামির বলল—
—”আমি কিন্তু বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে? উযাইন মেরিড? কবে কি হলো?”
—”শি ইজ মাই ওয়াইফ! মিসেস উযাইন আবরার।”
উযাইন ওর দিকে তাকিয়ে বলল। যামির অবাক হলো, সে ইনশিরার দিকে তাকাল, সে হয়তো তাদের এইজ গেপ টা কিছু টা আন্দাজ করতে পারল। কিন্তু সে ইনশিরার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল—
—”ভাবি এটা ঠিক না। আমি দাওয়াত পেলাম না, আসিফ ঠিক ই জানে। বাই দ্যা ওয়ে আপনার নাম?”
—”ইনশিরা! ইনশিরা কায়নাত।”
রুহ এ ইশক পর্ব ২৩
যামির আরও একদফা চমকে উঠে। মনে মনে নাম টা আওড়াল, কিছু মনে করার চেষ্টা করল। উযাইন আর আসিফ বুঝতে পারছে এখন বোম ব্লাস্ট হবে। আর এদিকে হন্তদন্ত হয়ে আসছিল আরিয়ান, যে কি না এই রেস্টুরেন্টের ওনার। আসার সময় আরিয়ান ইনশিরা নাম টা শুনতে পেয়েছিল হয়তো।
—”ইনশিরা? জাহির ভাইয়ের মেয়ে না? ইউনিভার্সিটির সিনিয়র, জাহির ভাই উনার মেয়ে না? পিচ্চি কত বড় হয়ে গেছে! কেমন আছ মামুনি?”
