Home তাকদিরে তুমি তাকদিরে তুমি পর্ব ৯

তাকদিরে তুমি পর্ব ৯

তাকদিরে তুমি পর্ব ৯
মোনালিসা মেহরোজ

মির্জা বাড়ির ড্রয়িংরুম জুড়ে তখনও থমথমে পরিবেশ। কয়েক মিনিট আগের সেই আতঙ্কের রেশ এখনো কাটেনি কারো। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সায়না মির্জার মুখ থেকে “র*ক্ত” শব্দটা বের হওয়ার পর সবাই প্রায় ছুটে গিয়েছিলো বাইরে।
তবে আল্লাহর অশেষ রহমতে পরিস্থিতি যতটা ভয়ংকর ভেবেছিলো, ততটা ছিলো না।পারিবারিক ডাক্তার এসে আসিফকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখলেন।ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ব্যাগ গুছাতে গুছাতে ডাক্তার বললেন—

—চিন্তার তেমন কোনো কারণ নেই। কপালে সামান্য আঘাত লেগেছে। শরীরে কিছু ছোটখাটো কাটা-ছেঁড়া আছে, তবে বিপজ্জনক কিছু নয়।
সায়না মির্জা যেন তখনও পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছিলেন না। কান্নারত অবস্থায় বারবার বললেন—
—ডাক্তার সাহেব, ওর জ্ঞান ফিরবে তো? কখন উঠবে আমার ছেলেটা?
ডাক্তার আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন—-
—অবশ্যই ফিরবে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণে ছোটখাটো একটা এক্সিডেন্ট করেছে। মাথায় আঘাত পাওয়ার পর জ্ঞান হারিয়েছে। বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।
কথাটা শেষ হতেই আযান মির্জার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা স্বাধীন নিঃশব্দে ছাড়লো মির্জা বাড়ি। তখন নেশা করে রাগের বশে গাড়ি চালাতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করে বসে আসিফ৷ ব্যাকসিটে স্বাধীন থাকায় তার তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। বারবার আসিফকে বারণ করেছিলো গাড়ি ড্রাইভ না করতে। তবে জেদি আসিফ তা শুনতে নারাজ ছিলো। তখন তার মাথায় নেশা আর ফাতিহা নামক বিরক্তিকর মেয়ের প্রতিচ্ছবি ভাসছিলো। তাই তো নিজের কন্টোল হারিয়ে ঘটিয়ে ফেললো এরূপ একটা কান্ড।
অন্যদিকে, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর ফলে এমনটা হয়েছে। শব্দগুলো বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো আযান মির্জার কানে।

ডাক্তার প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন। তিনি চলে যেতেই ঘরে নেমে এলো ভারী নীরবতা।
সায়না মির্জা চোখ মুছতে মুছতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আর আযান মির্জা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন বিছানায় অচেতন হয়ে পড়ে থাকা আসিফের দিকে। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলেন তিনি।তারপর হঠাৎ করেই গর্জে উঠে বললেন—-
—নিজের জীবনটা ধ্বংস করে ক্ষান্ত হয়নি! এখন আমাদেরও শান্তি নষ্ট করে ছাড়বে! কি করবো আমি এই ছেলেটাকে? কি করলে সে শান্ত হবে?
সায়না মির্জা কেঁপে উঠলেন সে শব্দে। কাঁপা গলায় স্বামীকে বললেন—-
—আপনি এখন রাগ করবেন না…
—রাগ করবো না?
কর্কশ গলায় বলে উঠলেন আযান মির্জা।

—রাত দুইটায় ফোন বন্ধ করে নেশা করে গাড়ি চালায়! আজকে বেঁচে গেছে, কাল যদি লা*শ হয়ে ফিরতো?
কথার শেষাংশে কণ্ঠস্বর খানিকটা ভেঙে গেলো তার। এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়ালেন না তিনি। রাগে, কষ্টে আর অপমানে চোয়াল শক্ত করে নিজের ঘরের দিকে হাঁটলেন। সায়না মির্জাও কিছুক্ষণ ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে ধীর পায়ে চলে গেলেন।
ঘরে রয়ে গেলো শুধু ফাতিহা। দেয়াল ঘড়িতে তখন রাত তিনটা বাজতে চলেছে। চারপাশ নিস্তব্ধতায় মোড়ানো। ফাতিহা চুপচাপ আসিফের শিয়রের পাশে বসে রইলো। সাদা ব্যান্ডেজের নিচে কপালের ক্ষতটা দেখা যাচ্ছে। অচেতন মুখটা আজ অদ্ভুত শান্ত। মেয়েটার বুকটা হালকা মোচড় দিয়ে উঠলো স্বামীর এহেন নিস্তব্ধতা দেখে। সন্ধ্যা থেকে কত ভয়ই না পেয়েছে সে? আর এখন সে ফিরলো, তাও ক্ষত নিয়ে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আস্তে করে উঠে দাঁড়ালো ফাতিহা। অতঃপর ওযু করে নিজের জায়নামাজ বিছিয়ে দিলো ঘরের এক কোণে। চারপাশে তখন গভীর রাতের নীরবতা। সেই নীরবতার মাঝেই দাঁড়িয়ে গেলো সে তার রবের সামনে। দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ আদায় করলো।
প্রতিটি সিজদায় যেন বুকের ভেতরে জমে থাকা কথাগুলো উজাড় করে দিতে লাগলো ফাতিহা। নামাজ শেষ করে দু’হাত তুলে ফেললো নিজ মালিকের দরবারে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রু।

—হে আল্লাহ… আপনি আমার স্বামীকে হেদায়েত দান করুন।
কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বললো ফাতিহা। বুকটা তার জ্বলছে। পথ ভুলো মানুষটার জন্য বুকে ব্যথা করছে। ভিষন যন্ত্রণা হচ্ছে হৃদয়ে। ফাতিহার চোখ বেয়ে কয়েক ফোটা পানি ঝরলো। ঠোঁট কেঁপে উঠল মৃদু তালে। সে কম্পনরত ওষ্ঠদ্বয় কামড়ে ফের বললো—-
—তার অন্তরকে শান্ত করে দিন খোদা। তাকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনুন। তার রাগ, অহংকার আর অবাধ্যতা দূর করে দিন।
কথাগুলো বলতে গিয়ে আরেক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে। ঠোঁটে কামড়ে
আবারো আওড়ালো—–
—আমি তার জন্য দুনিয়ার কোনো সুখ চাই না, ইয়া রব। শুধু চাই সে আপনার পথে ফিরে আসুক। আপনার প্রিয় বান্দাদের একজন হয়ে উঠুক।
কথাগুলো বলেই চোখ বন্ধ করলো ফাতিহা।
তার বিশ্বাস—মানুষকে মানুষ বদলাতে পারে না।
কিন্তু আল্লাহ চাইলে সবচেয়ে কঠিন হৃদয়ও এক মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। মানুষ তো কারণ হয় মাত্র। হয়তো সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার একটা ছোট হাতিয়ার!
দোয়া শেষে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো ফাতিহা।অতঃপর আবার এসে বসলো আসিফের শিয়রের পাশে। নীরবে তাকিয়ে রইলো অচেতন মানুষটার দিকে। আর ঠিক তখনই আসিফের হাতের আঙুলগুলো সামান্য নড়ে উঠলো। ফাতিহার চোখ স্থির হলো সেথায়। চোখ বন্ধ করে শুধুমাত্র আল্লাহকে ডেকে পাড় করলো পুরো রাত।

পরদিন সকালটা শুরু হলো এক অদ্ভুত নীরবতায়। মির্জা বাড়ির সবাই যেন আগের রাতের ঘটনার ধাক্কা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আযান মির্জা ঘর ছেড়ে বের হননি এখনো। সায়না মির্জা বসার ঘরে বিরস মুখে বসে।
অন্যদিকে, রান্নাঘরের জানালা দিয়ে সকালের রোদ এসে পড়েছে মেঝেতে। সেই রান্নাঘরেই দাঁড়িয়ে আছে ফাতিহা। চুলার উপর ছোট একটি পাতিলে ধীরে ধীরে ফুটছে চিকেন স্যুপ।
ডাক্তার বলেছিলেন, জ্ঞান ফিরলে আসিফকে হালকা খাবার খাওয়াতে। সেই কারণেই সকাল সকাল উঠে রান্নাঘরে চলে এসেছে ফাতিহা।
চামচ দিয়ে ধীরে ধীরে স্যুপ নেড়ে দিতে দিতে একবার মনে মনে বিসমিল্লাহ পড়লো সে।
তারপর স্বাদ পরীক্ষা করে চুলা বন্ধ করে দিলো।
কিছুক্ষণ পর সুন্দর একটি সাদা বাটিতে স্যুপ ঢেলে ট্রেতে সাজিয়ে নিলো। অন্যদিকে নিজের ঘরে বিছানার সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে আছে আসিফ।
জ্ঞান ফিরেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। কপালে ব্যান্ডেজ বাঁধা। মাথায় এখনো হালকা ব্যথা করছে, আর সেই ব্যথার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে বিরক্তি। ঠিক তখনই দরজায় মৃদু শব্দ হলো।
ফাতিহা ভেতরে প্রবেশ করলো। একহাতে হাতে ধরা ট্রে, অন্যহাত ওড়নার একাংশ, যা দিয়ে আড়াল করেছে নিজের মুখশ্রী।
ফাতিহা ঘরে ঢুকে শান্ত কণ্ঠে বললো—-

—ডাক্তার বলেছিলেন হালকা কিছু খেতে। আমি স্যুপ বানিয়েছি।
আসিফ একবার বাটির দিকে তাকালো। তারপর চোখ সরিয়ে নিলো।
—নিয়ে যাও।
ফাতিহা থমকালো আসিফের কথায়। এই পুরুষটা কেনো এতোটা জেদি তা সে বুঝে উঠতে পারলো না। ফাতিহা না দমে শান্ত গলায় বললো—-
—একটু খেয়ে নিন। শরীরের জন্য ভালো হবে।
—আমি কি বলেছি শুনতে পাওনি?
কণ্ঠটা আগের চেয়ে খানিকটা কঠোর শোনালো আসিফের। দাঁতে দাঁত চাপলো সে। ফাতিহা কেঁপে উঠলো সে শব্দে। আসিফ তা খেয়াল করে চোখ ফিরিয়ে নিলো ফাতিহার পান হতে। শান্ত গলায় বললো—-
—নিয়ে যাও।
ফাতিহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
তারপর ধীরে ধীরে ট্রে’টা টেবিলের উপর রাখতে গেলো।

—আপনি এখন কিছু না খেলে—
কথা শেষ হওয়ার আগেই আচমকা ট্রেটার দিকে হাত বাড়ালো আসিফ। পরের মুহূর্তেই ঝনঝন করে আওয়াজ হলো। বাটিটা মেঝেতে আছড়ে পড়লো। গরম স্যুপ ছিটকে ছড়িয়ে গেলো চারদিকে। সাদা বাটিটা ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে গেলো।
ঘরজুড়ে নেমে এলো নিস্তব্ধতা। ফাতিহা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো পাথরের ন্যায়।কয়েক ফোঁটা স্যুপ এসে পড়েছে তার কাপড়েও। আসিফ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো—-
—আমি কারো দয়া চাই না।
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ফের বললো—-
—বিশেষ করে তোমার।
কথাগুলো বলেই মুখ ফিরিয়ে নিলো আসিফ।
অন্যদিকে ফাতিহা নিচে ছড়িয়ে থাকা স্যুপের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো এক দৃষ্টিতে। তারপর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসলো।
এক টুকরো, দুই টুকরো করে ভাঙা বাটির সব টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিতে লাগলো সে। মুখে কোনো অভিযোগ নেই ফাতিহার।কোনো রাগও নেই তার সুশ্রী মুখে।শুধু একবার খুব আস্তে করে বললো—-

—আমি দয়া করতে আসিনি।
আসিফ ভ্রু কুঁচকালো। ফাতিহা নিচের দিকেই তাকিয়ে রইলো।
—আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করছিলাম। আপনি আমার স্বামী, আর আপনার খেয়াল রাখা যত্ন করা আমার দ্বায়িত্ব।
কথাটা বলে ভাঙা টুকরোগুলো হাতে তুলে নিলো ফাতিহা। কিন্তু কেন জানি এবার আসিফ আর কোনো উত্তর দিতে পারলো না। কারণ মেয়েটার কণ্ঠে কোন অভিযোগ ছিল না। ছিল না কোনো তিরস্কারও। শুধু ছিল নিঃশব্দ এক সত্য।
আর সেই সত্যটাই অদ্ভুতভাবে তার ভেতরে কোথাও গিয়ে বিঁধলো। আসিফ থমকালো ভেতরে ভেতরে। ফাতিহা চুপচাপ ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেলো। অন্যদিকে আসিফের বুকের কোথাও একটা বাজতে লাগলো একটা শব্দ ‘আপনি আমার স্বামী’

আসিফ চোখ বন্ধ করে নিলো। মাথা এলিয়ে দিলো বালিশে।
অন্যদিকে ফাতিহা কাচের টুকরোগুলো ফেলে এসে দাঁড়ালো ছাদে। আকাশটা সকাল থেকেই বড্ড মেঘলা। ঠিক ফাতিহার মনের মতো। ফাতিহা রেলিং ধরে আকাশের পানে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পরলো কয়েক ফোঁটা পানির কণা। আসিফের সামনে যতই নিজেকে শক্ত রাখুক না কেনো, দিন শেষে সেও তো একজন নরম মনের নারী৷ আর যখন ফাতিহার মতো একজন নারী নিজের স্বামীর কাছে অপমানিত হয়—তখন চোখে পানি না এলেও হৃদয়ের র*ক্তক্ষরণ ঠিকই হয়।

তাকদিরে তুমি পর্ব ৮

এই যেমন এখন হচ্ছে ফাতিহার কোমল হৃদয়ে। আসিফের কথা তার ব্যবহারে ফাতিহা চুপ থাকে, সহ্য করে। ধৈর্য ধরে বিশ্বাস রাখে খোদার উপর৷ তাই বলে কি তার কষ্ট হয়না? দুঃখ হয়না? হয় তো, খুব হয়। এই যেমন এখন ফাতিহার হচ্ছে।
সবকিছু ভেবে শুকনো ঢোক গিলে ফাতিহা। সেই সাথে গিলে নেয় কান্নাগুলো। চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে আওড়ায়—–
—ধৈর্য দিন মাবুদ। সহ্য করার ক্ষমতা দিন।

তাকদিরে তুমি পর্ব ১০