Home তাকদিরে তুমি তাকদিরে তুমি পর্ব ৮

তাকদিরে তুমি পর্ব ৮

তাকদিরে তুমি পর্ব ৮
মোনালিসা মেহরোজ

বিকেলের নরম আলো জানালা পেরিয়ে ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। আসিফ মির্জা বাড়িতে ফিরে আসার পর থেকেই ফুরফুরে মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাড়িতে থাকছে খুব কম সময়’ই। এই তো, আজকে সকালে বেড়িয়েছিলো বাড়ি থেকে। আর এখন এই বিকেলে বাড়ি ফিরলো।
ফাতিহা নিজের ঘরে দাঁড়িয়ে আলমারি খুলে কাপড়চোপড় গুছিয়ে রাখছিলো। একের পর এক কাপড় ভাঁজ করে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখছে সে। মুখে কোনো বিরক্তি নেই, নেই কোনো অভিযোগও। একদম শান্ত নদীর মতো বহমান সে।

অন্যদিকে বিছানার উপর হেলান দিয়ে বসে আছে আসিফ। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই সে ফাতিহার কাজকর্ম লক্ষ্য করছিলো। কেন জানি মেয়েটার এই শান্ত স্বভাবটা তার সহ্য হচ্ছিলো না।
মানুষকে বিরক্ত করলে, কষ্ট দিলে বা অপমান করলে সাধারণত একটা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। অথচ ফাতিহার মধ্যে সে তেমন কিছুই খুঁজে পায় না।
ব্যাপারটা অদ্ভুতভাবে বিরক্ত করে তাকে।
কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ কিছু একটা ভাবলো। অতঃপর ঠোঁট বাঁকালো আসিফ। মনে মনে একটা ফন্দি আঁটলো। ঠোঁট বাকিয়ে হেঁসে ডেকে উঠলো ফাতিহাকে—-
—এই যে!
আসিফের হঠাৎ ডাকে খানিক চমকে গেলো ফাতিহা। তবুও নিজেকে সামলে কাপড় গুছানোর মাঝেই ঘুরে তাকালো।
—জ্বী?
—এক কাপ কফি বানিয়ে আনো।
—আচ্ছা।

কোনো প্রশ্ন না করেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো ফাতিহা। অন্যদিকে আসিফ বাঁকা হাসলো।ফোনের দিকে নজর দিলো পুনরায়।
প্রায় দশ মিনিট পর ধোঁয়া ওঠা এক মগ কফি নিয়ে ফিরে এলো ফাতিহা। মেরুন রঙের থ্রি-পিস পরণে তার। ওড়নার আড়ালে রেখেছে সুশ্রী মুখখানা।
আসিফ ফাতিহার চোখের দিকে একপলক তাকালো। অতঃপর ধীরেসুস্থে মগটা হাতে নিলো। এক চুমুক দিতেই মুখ বিকৃত করে ফেললো নাটকীয় ভঙ্গিতে। দাঁতে দাঁত চেপে বললো—-
—এটা কফি বানিয়েছো? নাকি বি*ষ?
অবাক হলো ফাতিহা। বি*ষ মানে? আসিফ এমন কথা বলছে কেনো?
তবুও ফাতিহা গলা চড়াও করলো না বা উত্তেজিত হলো না। বরং শান্ত গলায় বললো—-
— কফিতে কী সমস্যা হয়েছে?
ফাতিহার শান্ত কথার বিপরীতে ভেসে এলো চরম উগ্র কন্ঠস্বর—
—সমস্যা হয়েছে মানে? এটা খাওয়া যায়?
কথা শেষ করেই মগটা টেবিলে রাখার বদলে ইচ্ছাকৃতভাবে কাত করে দিলো আসিফ। আর মুহূর্তেই তা ছলকে মেঝেতে ছড়িয়ে গেলো। কফি নিচে পরলেও আসিফ তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। বরং তাচ্ছিল্যতা সমেত চোখ ফিরিয়ে নিলো সেদিক হতে।
ফাতিহা কয়েক সেকেন্ড পরে যাওয়া কফির দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে বললো—-

—আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি।
—আগে আরেক কাপ কফি বানিয়ে আনো।
আসিফের কড়া আদেশে মাথা নাড়িয়ে আবার বেরিয়ে গেলো ফাতিহা।দ্বিতীয়বার কফি এনে দিলে আসিফ আরো মনোযোগ দিয়ে চুমুক দিলো। এরপর কপাল কুঁচকে বললো—
—চিনি বেশি।
—ওহ।
—যাও, আবার বানাও।
ফাতিহা খানিকসময় ফ্যাল ফ্যাল করে আসিফের পানে তাকিয়ে রইলো। তবে কিছু না বলে খানিকবাদে মগটা নিয়ে চলে গেলো নিচে। এভাবেই তৃতীয়বার,চতুর্থবার,পঞ্চমবার। মোট সাতবার তাকে কফি বানাতে হলো।
প্রতিবারই নতুন কোনো না কোনো অজুহাত খুঁজে বের করছিলো আসিফ। কখনো চিনি কম, কখনো বেশি। কখনো কফি বেশি গাঢ়, কখনো আবার পাতলা। একসময় রান্নাঘরের কাজের মেয়েও অবাক হয়ে তাকাতে লাগলো। এত কফি কেউ খেতে পারে?
কিন্তু আসিফের উদ্দেশ্য কফি খাওয়া নয়।

সে শুধু দেখতে চাইছিলো ফাতিহা কখন বিরক্ত হয়। কখন রেগে যাবে আর কখন তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে।
কিন্তু ঘণ্টাখানেক পেরিয়ে যাওয়ার পরও সেই সুযোগ পেলো না সে। ফাতিহা প্রতিবারই একই শান্ত মুখে কফি বানিয়ে এনে দিচ্ছে। না কোনো অভিযোগ না কোনো তর্ক না কোনো বিরক্তি।
শেষবার কফির মগটা হাতে নিয়ে আসিফ নিজেই অস্বস্তি বোধ করলো।
কারণ এতক্ষণে তার বিরক্ত হওয়ার কথা ছিলো না। বিরক্ত হওয়ার কথা ছিলো ফাতিহার। কিন্তু অদ্ভুতভাবে উল্টোটা হয়ে যাচ্ছে। আর সেটাই আসিফের মেজাজকে আরও খারাপ করে তুললো। শেষবার কফি আনলে আসিফ তা নিয়ে বারান্দায় চলে গেলো। অন্যদিকে ফাতিহা ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। হুট করেই ঠোঁটের কোণায় এক চিমটি হাসি ফুটিয়ে বিড়বিড় করে আওড়ালো—-
—আপনি আমার প্রতিক্রিয়া দেখতে চেয়েছিলেন, এখন উল্টো আপনি নিজেই প্রতিক্রিয়া দেখাতে ভুলে গেলেন। দেখেছেন, আল্লাহর উপর ভরসা রাখলে ঠিক কতটা ধৈর্যশীল হওয়ায় যায়?

রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
শহরের এক অভিজাত বারের কোণার টেবিলে বসে আছে আসিফ। সামনে রাখা গ্লাসে বরফের টুকরোগুলো ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। চারপাশে মৃদু আলো, উচ্চস্বরে বাজছে গান। টেবিলের অপর পাশে বসে আছে স্বাধীন, রাফি আর ছায়া।
আসিফ একের পর এক গ্লাস খালি করে চলেছে। মুখের বিরক্তি যেন কিছুতেই কমছে না।স্বাধীন ভ্রু কুঁচকে নিলো তা দেখে। অনেক্ক্ষণ থেকেই লক্ষ করছিলো আসিফকে। তার অস্বাভাবিকতা দেখে কপাল কুঁচকে বললো—–
—আজকে আবার কী হয়েছে তোর? এরকম লাগছে কেনো?
আসিফ তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো স্বাধীনের কথায়। গ্লাস নাড়াতে নাড়াতে বললো—–
—কিছু হয়নি।
—মিথ্যা কথা বলিস না। তোর চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে কিছু একটা হয়েছে।
আসিফ গ্লাসটা নামিয়ে রাখলো। কয়েক সেকেন্ড চুপ রইলো সে। অতঃপর বিরক্ত গলায় বললো—
—আমার জীবনে সবচেয়ে বড় ঝামেলার নাম ফাতিহা নূর। আর সে’ই আমার মুখের হাসি কেড়ে নেওয়ার কারণ।
কথাটা শুনে টেবিলে হালকা নীরবতা নেমে এলো। ছায়া বাঁকা হাসলো ফাতিহার প্রতি আসিফের বিরক্তি দেখে। অন্যদিকে রাফি হেসে বললো—-

—ভাবি আবার কী করলো?
—সেটাই তো সমস্যা। কিছুই করে না।
ভ্রু কুঁচকে বললো আসিফ। গ্লাসে চুমুক দিয়ে ফের বললো—-
—মানুষের রাগ লাগে, ঝগড়া করে, তর্ক করে। কিন্তু এই মেয়ে যেন অন্য জগতের মানুষ। আজ বিকেল থেকে ওকে ইচ্ছা করে হয়রানি করলাম। সাত’বার কফি বানাতে বলেছি।
—তারপর?
স্বাধীন জানতে চাইলো চট করে। আসিফ তাচ্ছিল্য হেঁসে বললো—-
—তারপর কিছু না। প্রতিবার নতুন করে বানিয়ে এনে দিয়েছে।
কথাটা বলেই বিরক্তিতে গ্লাসের বরফ নাড়ালো আসিফ।
—একবারও রাগলো না? একবারও না?
রাফির কথায় মাথা ঝাকালো আসিফ। ছায়া মনে মনে হাসলো। অতঃপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো—-

—তুমি ব্যাপারটা ভুল দিক থেকে দেখছো, বেবি।
আসিফ তাকালো ছায়ার দিকে। কপাল কুঁচকে বললো—-
—মানে?
—মানে মেয়েটা অনেক চালাকও হতে পারে।
স্বাধীন সঙ্গে সঙ্গে বললো—-
—আবার শুরু করলি তুই?
স্বাধীনের কথায় বিরক্ত হলো ছায়া। তবে সে থামলো না। আসিফের গা ঘেঁসে বসে আওড়ালো—–
—না, আমি সিরিয়াস। সবাই রাগ দেখিয়ে যুদ্ধ করে না। কেউ কেউ শান্ত থেকে মানুষকে নিজের দিকে টেনে আনে। ফাতিহাও তাই, সে ঠিক শান্ত থেকে আসিফকে বশে আনতে চায়।
আসিফ কিছু বললো না। ছায়া আবার বললো—
—মেয়েটাকে এত সহজ ভেবো। শান্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়। কারণ তারা কী ভাবছে, সেটা কেউ বুঝতে পারে না।
আসিফ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো।ছায়ার কথাগুলো শুনতে চাইছিলো না সে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে কথাগুলো তার মাথার ভেতর গেঁথে যেতে লাগলো। আর ঠিক সেই কারণেই তার মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেলো। ছায়া আসিফের কাঁধে হাত রেখে ফের বললো—-

—সে তোমাকে ডিজার্ভ করে না, তার কোন যোগ্যতা নেই তোমাকে পাওয়ার। অথচ মেয়েটা এমন ভাব করে যে সে কি-না কি! তার উপর আর কেউ নেই। তুমি দেখেছো সেদিন ও আমাকে কতটা হেনস্তা করেছে বোরখা পড়া নিয়ে? নিজের ক্ষমতা জাহিদ করছে এভাবে সে।
আসিফ ভাবতে লাগলো ছায়ার কথাগুলো। আসলেই তো, মেয়েটা এতোটা শান্ত কেনো থাকে? আর সে শান্ত থাকে বলেই তো আসিফ কিছু করতে পারে না। না-তো তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনতে পারে মা-বাবার সামনে। তাহলে মেয়েটা কি সত্যিই বেশি চালাক? সে কি নিরবে তাকে নিজের দিকে টানছে?
কথাগুলো ভাবতে গিয়ে আবারো আসিফের চোয়ালদ্বয় শক্ত হয়ে এলো। হাতে থাকা গ্লাসে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চাপ প্রয়োগ করলো, আর মুহূর্তেই তা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। আসিফের হাত থেকে গড়িয়ে পরলো লাল রঙা তরল পদার্থ। তবে সে সেদিকে তাকালো না৷ বরং হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো শূন্যে…..

—হে আল্লাহ! উনি আসছেন না কেনো? রাত দু’টো বাজতে চললো। কোনো বিপদ হলো না তো?
বিড়বিড় করে কথাটা বলেই চোখ বুজে ফেললো ফাতিহা। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক অস্থিরতায় কাঁপছে। বারবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, আসিফ নিশ্চয়ই বন্ধুদের সঙ্গে আছে। হয়তো ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেছে। হয়তো কোনো কাজে আটকে গেছে।
কিন্তু মন তো আর যুক্তির কথা শুনতে চায় না।
সন্ধ্যার পর থেকে কতবার যে ফোন করেছে, তার হিসাব নেই। প্রতিবারই একই উত্তর—
—The number you are trying to call is switched off.
শুনতে শুনতে বাক্যটাও যেন মুখস্থ হয়ে গেছে তার। সিঁড়ির এক কোণে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সায়না মির্জা। মুখে স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। মাঝেমধ্যে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাচ্ছেন, আবার হতাশ হয়ে ফিরে আসছেন।
আর ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছেন আযান মির্জা। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে তার। চোখেমুখে রাগ আর উদ্বেগের মিশ্র ছাপ।
রাত বারোটার পর থেকেই তিনি ক্রমাগত পায়চারি করছিলেন। কখনো ছেলেকে ফোন দিচ্ছিলেন, কখনো বিরক্ত হয়ে ফোন ছুঁড়ে রাখছিলেন। এমনকি কিছুক্ষণ আগে রাগের মাথায় স্ত্রীকেও বেশ কয়েক কথা শুনিয়ে দিয়েছেন। এরমধ্যেই আবার স্ত্রীকে কড়া গলায় বললেন—–

—তোমার ছেলেকে বেশি আদর করতে গিয়েই আজ এই অবস্থা হয়েছে!
কথাটা বলার সময় কণ্ঠে ছিলো তীব্র ক্ষোভ।
কিন্তু এখন সেই ক্ষোভের জায়গায় অন্য এক অনুভূতি জায়গা নিচ্ছে। উদ্বেগ। যতই রাগ থাকুক, আসিফ তার একমাত্র ছেলে।
আযান মির্জা গম্ভীর মুখে বসে থাকলেও বারবার দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। সময় যেন আজ ইচ্ছে করেই ধীরে চলছে। ফাতিহা সাবধানে শ্বশুরের দিকে তাকালো। লোকটার রাগ সে বুঝতে পারছে। কিন্তু সেই রাগের আড়ালে যে দুশ্চিন্তা লুকিয়ে আছে, সেটাও স্পষ্ট।
ফাতিহা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বললো—

—আব্বু, আপনি চিন্তা করবেন না। ইনশাআল্লাহ উনি ঠিক আছেন। হয়তো কোনো কারণে ফোন বন্ধ হয়ে গেছে।
আযান মির্জা কোনো উত্তর দিলেন না। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
ফাতিহা নিজের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরলো। আল্লাহর কাছে বারবার একই দোয়া করছে সে।
—উনাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনুন।
আজ বিকেলে আসিফ তার সঙ্গে যেমনি আচরণ করুক না কেন, এই মুহূর্তে সেসব কিছুই মনে নেই তার। শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছে—মানুষটা যেন ভালো থাকে।

তাকদিরে তুমি পর্ব ৭

আর এই গম্ভীর পরিবেশের মধ্যেই মির্জা বাড়ির দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ হলো। সায়না মির্জা চমকে সেদিকে তাকালেন। ফাতিহার বুকটাও মৃদু তালে কেঁপে উঠল। সায়না মির্জা গম্ভীর মুখে বসে থাকা স্বামীর পানে একপলক তাকিয়ে দ্রুত পায়ে দরজায় পানে ছুটলেন। আর দরজা খুলে স্তব্ধ
হয়ে গেলেন তিনি। ফাতিহার বুকটা কেঁপে উঠল। আযান মির্জা চট করে দাঁড়িয়ে পরলেন।
সায়না মির্জা মুখে হাত চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
—র*ক্ত……।

তাকদিরে তুমি পর্ব ৯