তাকদিরে তুমি পর্ব ৭
মোনালিসা মেহরোজ
না চাইতেও টানা তিনদিন আসিফকে ফাতিহাদের বাড়িতে থাকতে হলো। এরমধ্যে সে অবশ্য তেমন কোন ফন্দি আঁটেনি এখান থেকে বের হবার জন্য। বরং অদ্ভুত শান্ত থেকেছে পুরোটা সময়। কথা খুব কম বলেছে, সারাক্ষণ ঘরে বসেই সময় পাড় করেছে সে৷ এই তিনদিনে অবশ্য ফাতিহাও আসিফকে তেমন জোড় করেনি কোন বিষয় নিয়ে। কখনো এটাও বলেনি আযান দিচ্ছে সালাত আদায় করে আসুন। বরং আসিফকে নিজের মতো করে ছেড়ে দিয়েছে।
আর আজই তাদের মির্জা বাড়ি ফেরার দিন। আযান মির্জা ফোন করেছিলেন এবাড়ি। নমনীয়ভাবে বলেছেন যেনো পুত্রবধূ ও ছেলেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফাতিহার পরিবারের লোকজনও তাতে বাঁধ সাধেন নি।
ঘরের মাঝখানে বসে ব্যাগ গুছাচ্ছিলো ফাতিহা। পরিপাটি করে ভাঁজ করা কাপড় একে একে ব্যাগে তুলে রাখছে সে। পাশে রাখা ছোট্ট ব্যাগটার চেইন লাগিয়ে আবারও খুলে দেখলো সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। অন্যদিকে আসিফ বিছানার উপর আধশোয়া হয়ে ফোনে কথা বলছে বন্ধুদের সাথে।
—আরে ভাই, আমি যেখানেই থাকি না কেনো এখনও বেঁচে আছি। এতো সহজে মরছি না।
ওপাশে কী বললো তা জানা নেই। তবে আসিফ হেঁসে উঠলো মৃদু তালে। ফাতিহা সব শুনলেও কথা বললো না। সে জানে আসিফ কিসের কথা বলছে। আর জানে বলেই বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কোনকিছুই করতে পারলো না। এরমধ্যেই আসিফ ফের বলে উঠলো—-
—হ্যাঁ, ফিরছি আজ। আর না, তিনদিন থেকেছি এটাই সাত পুরুষের ভাগ্য এদের।
কথাটা বলেই আড়চোখে তাকালো ফাতিহার দিকে। ফাতিহা যেন কিছুই শোনেনি এমন ভাব করে কাপড় গুছিয়ে যেতে লাগলো। কথা বাড়তে ইচ্ছে হলো না তার।
—যাই হোক, সন্ধ্যার মধ্যেই বাসায় পৌঁছে যাবো। তখন দেখা হবে।
কথা শেষ করে ফোন কেটে দিলো আসিফ। গম্ভীর গলায় ফাতিহাকে বললো—-
—হয়েছে?
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললো ফাতিহা। অতঃপর কয়েক মুহূর্ত বাদে একেবারে তৈরি হয়ে ঘর ছাড়লো দু’জনে। ফাতিহা ঘর থেকে বের হতেই বাবাকে বসার ঘরে দেখতে পেলো৷ ভদ্রলোক মেয়েকে দেখেই মৃদু হাসলেন। হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন ফাতিহাকে। ছোট্ট নাবা তখন বাবার পাশে বসে। বোন চলে যাবে বলে ভাড় হয়ে এসেছে সুশ্রী মুখখানা। ফাতিহা তা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পায়ে পায়ে বাবার পানে এগিয়ে এলো। পাশে বসতেই ভদ্রলোক মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। অতন্ত্য নরম গলায় বললেন—
—বিরক্ত হবে না, আম্মাজান।। ধৈর্য ধরো আর আল্লাহর উপর ভরসা রাখো।
মাথা নাড়ে ফাতিহা।
—জ্বী, আব্বা।
তখনি ছোট্ট নাবা বোনকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে। বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠলো ফাতিহার। বোনকে দু’হাতে আগলে রান্নাঘরের পানে তাকাতেই নজরে পরলো মায়ের চোখে জল। মুখে কাপড় চেপে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। বিয়ের দিনও ঠিক এভাবেই তার মা কেঁদেছিলো, আজ আবার পুনরায় সেই দৃশ্য দেখে বুকটা ভাড় হয়ে আসে ফাতিহার। বোনকে সামলে মায়ের পানে এগিয়ে যায় সে। ফাতিহা এগিয়ে যেতেই মা জুলেখা হামলে পরে মেয়ের উপরে৷ ফাতিহা মা’কে আগলে শান্ত করতে চায়।
—শান্ত হও আম্মা, বাচ্চাদের মত করছো কেনো?
—ভয় হচ্ছে, আম্মাজান।
ফাতিহা থমকে গেলো মায়ের কথায়। কপালে সুক্ষ্ম ভাজ পরলো তার। তার মা ভয় পাচ্ছে! কিন্তু কিসের? জুলেখা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন—-
—জানিনা আসিফ আব্বা পরিবর্তন হবে কি-না। তবে তোমায় বিশ্বাস করি আম্মাজান। নিজের খেয়াল রেখো। আর কোন সমস্যা হলে তোমার আব্বাকে জানিয়ো কোন দ্বিধা ছাড়া।
ফাতিহার বুকটা শীতল হয়ে আসে। সাথে বুঝতে পারে মায়ের ভয় কোথায়। মাথা নাড়ে সে। অতঃপর মাকে দ্বিতীয়বারের মতো জড়িয়ে ধরে বসার ঘরে পা রাখতেই ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে আসে আসিফ, প্রথমবার এলেও ফোন রেখে এসেছিলো বলে পুনরায় ঘরে ফিরে গেছিলো সে। আসিফকে বের হতে দেখে ফাতিহা সেদিকে একপলক তাকায়।
অতঃপর সকলকে শেষ বারের মতো সালাম দিয়ে গাড়িতে চড়ে বসে আসিফ। তার আগে অবশ্য মুখোমুখি দাঁড়ায় শশুরের। ভদ্রলোক জামাইকে তেমন কিছু বললেন না। শুধু মৃদু হেঁসে বললেন—-
—আল্লাহ তোমাকে সুবুদ্ধি দান করুক। ফিরে এসো সেই পথে—যেই পথের জন্য তোমার জন্ম।
আসিফ স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখেছে সবকিছু। কথা আর বাড়ায়নি। বরং মনে মনে তারাহুরো করছিলো এখান থেকে বের হওয়ার।
আসিফ গাড়িতে উঠলে ফাতিহাও পিছুপিছু গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। বাবাকে শেষ বারের মতো সালাম দিয়ে ভেতরে চড়ে বসতেই দরজার পান হতে ভেসে আসে নাবার চঞ্চল কন্ঠস্বর। আসিফকে উদ্দেশ্য করে চিকন স্বরে ডেকে বলে—-
—আবার আসবেন, ভাইজান! অপেক্ষায় থাকবো।
আসিফ কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো সেদিকপানে। এতো এতো বিরক্তির মাঝেও নাবা নামক ছোট্ট মেয়েটা অদ্ভুতভাবে আকর্ষন করেছে তাকে। সবসময় কতটা নমনীয় ভাবে ভাইজান বলে ডাকে। সাড়া দিতে না চাইলেও দিতে হয়। হুট করেই বুকটা শীতল হয়ে আসে সে ডাকে।
আসিফ খানিকসময় সেদিকে তাকিয়ে রইলো। নাবার উজ্জ্বল মুখের আড়ালে হালকা বিষন্নতাও খেয়াল করলো আসিফ৷ নিজেকে সামলে মৃদু গলায় বলে উঠলো—-
—হুম।
ফাতিহা অবাক হলো আসিফের কথায়। কারণ এই প্রথমবার সে দেখলো আসিফ নাবাকে উত্তর দিলো তাও বিরক্ত না হয়ে। আসার পর থেকে যতবার’ই কথা বলেছে কপালে বিরক্তিকর ছাপ সুস্পষ্ট দেখেছে ফাতিহা। অথচ এখন কেনো যেনো তা নজরে পরলো না।
ফাতিহার ভাবনার মাঝেই গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগলো সামনের দিকে। অতঃপর একসময় দূরে মিলিয়ে গেলো তা।
পরেরদিন সকালবেলা।
শহরের ব্যস্ত রেলস্টেশন। চারদিকে মানুষের ভিড়। কেউ ট্রেনে উঠছে, কেউ নামছে, কেউ আবার বিদায় জানাচ্ছে প্রিয়জনকে। আর এই ভিড়ের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে আসিফ।
কালো শার্ট, ডেনিম জিন্স আর চোখে কালো সানগ্লাস।
তবে তার চেহারায় আজ অন্যরকম এক অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রতি কয়েক সেকেন্ড পরপর সে ঘড়ি দেখছে। তারপর আবার প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকাচ্ছে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধুকপুক করছে তার। এরমধ্যেই সেখানে ছুটতে ছুটতে আসে তার এক বন্ধু স্বাধীন। আসিফকে দেখেই থেমে যায় সে। অন্যদিকে স্বাধীনকে দেখে আসিফের হৃদয় কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। কন্ঠ হতে কথা বের হতে চায় না। তবুও স্বাধীনের কাঁধে হাত দিয়ে ঝাঁকিয়ে বলে—-
—কোথায় সে?পেয়েছিস?
—জানিনা ভাই, এটাই কি-না দেখে নে। তোর বর্ণনা অনুযায়ী মনে হচ্ছে এটাই হবে৷ চল।
স্বাধীন কথাখানা বলেই সামনের দিকে পা বাড়ায়৷ আসিফ নিজেও কাঁপা পায়ে এগিয়ে যায়।
আসিফ আর স্বাধীন দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো প্ল্যাটফর্মের শেষপ্রান্তের দিকে। মানুষের ভিড় ঠেলে সামনে যেতেই একটি মেয়েকে চোখে পড়লো তাদের। মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে হাতে ছোট্ট একটি ট্রলি ব্যাগ নিয়ে। ঠোঁটের ডানপাশে ছোট্ট একটি তিলও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সাদা বোরখা পরণে তার।
মুহূর্তের জন্য আসিফের বুক ধক করে উঠলো তা দেখে। সে প্রায় দৌড়ে এগিয়ে গেলো সামনে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার মুখের ভাব বদলে গেলো।
মেয়েটির মাথায় হিজাব বাঁধা নেই, পোশাকও সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে পড়া। বোরখা পড়া থাকলে সেই বোরখায় নেই সেই বিশেষত্ব, যা একজন দ্বীনদার নারী পরিধান করে। পাতলা ওড়না মাথায়। চুলের অর্ধেকাংশ নজরে পরছে। মুখ পুরোপুরি খোলা। চেহারার গড়নে কিছুটা মিল থাকলেও সে মোটেও সেই মেয়ে নয়, যাকে খুঁজছে আসিফ।
মেয়েটিকে দেখেই আসিফের চোয়ালদ্বয় শক্ত হয়ে আসে। স্বাধীনের পানে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে—-
—এই জন্য আমাকে এখানে ডেকেছিস?
আসিফের বিরক্ত কণ্ঠে স্বাধীন হতভম্ব হয়ে গেলো।
—আরে ভাই, তুই যেই বর্ণনা দিয়েছিলি, তার সাথে অনেকটাই মিল ছিলো। ঠোঁটের পাশে তিল, ইনফ্যাক্ট তুই যেই আবছা মুখের বর্ণনা আর আঁকাবাকা গাড়ির চাকা ঠোঁট এঁকে দিয়েছিলে এটার মতোই, দেখ ভালো করে।
আসিফ সামনের দিকে তাকায়। মেয়েটা বোধহয় তাদের খেয়াল করেনি। তাই স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই ফোনে কথা বলছে কারো সাথে। আসিফ নজর ঘুড়িয়ে নেই।
—আমি কি শুধু তিল আর ঠোঁটের কথা বলেছিলাম? তার বিশেষত্ব বলিনি?
আসিফের কণ্ঠস্বর এবার আরও কঠিন হয়ে উঠলো। স্বাধীন ভরকে গিয়ে চুপ মেরে গেলো। কয়েকদিন আগে কাঁচা হাতে একটা ঠোঁট ও মুখের সামান্য অংশ এঁকেছিলো আসিফ৷ যা দেখে মেয়েটাকে চেনা বড়ই দায়। তাই বন্ধুদের বলেছিলো মেয়েটির গড়ন। কিভাবে চলাফেরা করে তার সবকিছু। আর আজ সকালে বন্ধুদের ডাকে তারাহুরো করে বেড়িয়েছিলো বাড়ি থেকে। স্বাধীনের ভাষ্যমতে আসিফের বর্ণনাকৃত নারীটি এটায়। আর তাই ছুটে এসেছিলো আসিফ। তবে এটা কি হলো?
আসিফ রাগান্বিত স্বরে ফের বললো—
—আমি বলেছিলাম মেয়েটা পর্দাশীল। সবসময় পর্দার মধ্যে থাকে। তুই সেটা ভুলে গেলি?
স্বাধীন অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকালো।
—দূর থেকে দেখেছিলাম। ভাবছিলাম হয়তো এটায় হবে। আর সে যদি পর্দাশীল হয় তাহলে খুঁজে লাভ নাই ভাই। কেননা সে সামনে দিয়ে গেলেও তাকে চিনতে পারবি না পর্দার কারণে। আর তুইও তো মেয়েটার যথাযথ বর্ণনা দিতে পারছিস না, তাহলে কেমনে পাবো?
বিরক্তিতে দীর্ঘশ্বাস ফেললো আসিফ। তার মনে হচ্ছিলো আবারও একটা আশার দরজা খুলে সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেলো তা। মেয়েটাকে এই প্ল্যাটফর্মেই প্রথম দেখেছিলো সে। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে শুধুমাত্র তার মুখের একাংশ তার নজরে পরেছিলো। আবেগ আর ভেতরের ধুকপুকানি সামলাতে না পেরে সেদিন মেয়েটার মুখ দেখার জন্য জোড়াজুড়ি করছিলো। তখনি ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনা। রাগের বশে মেয়টি থাপ্পড় মেরে বসে আসিফকে। হতভম্ব আসিফ সেদিন রাগ করে নি, বরং আরো উতলা হয়ে পরেছিলো মেয়েটিকে দেখার জন্য। আর তাই জন্যই তো আবছা অবয়ব নিজ হাতে অংকন করেছিল মেয়েটার। যাতে খুঁজে পেতে সুবিধা হয়। তবে আসিফ ভুলে গেছিলো যে, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সাক্ষাৎ হওয়া নারীটি সাধারণ কেউ নয়। তাকে খুঁজে পাওয়া মোটেও সুবিধের নয়।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আশেপাশে হতাশ নয়নে তাকালো আসিফ। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই। চোখ দুটো আবারও ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মের দিকে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। যেন হাজার মানুষের মাঝেও কাউকে খুঁজছে সে।
স্বাধীন তা দেখে খুব সাবধানে বললো—-
—ভাই, এতদিন হয়ে গেছে। হয়তো তুই ভুল কাউকে খুঁজছিস। চল ফিরে যাই। মেয়েটার মুখটা স্পষ্ট হলে না-হয় খুঁজে দেখতাম। কিন্তু তুই তো তার ঠিকমতো বর্ণনাও দিতে পারছিস না।
আসিফ সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকালো।
দৃষ্টিটা এতটাই তীক্ষ্ণ ছিলো যে স্বাধীন ভরকে গিয়ে শুকনো ঢোক গিললো।
—আমি তাকে দেখেছিলাম সেদিন। একবার দেখেছি। আর একবার দেখলেই চিনতে পারবো।
স্বাধীন আর কথা বাড়ালো না। অন্যদিকে আসিফ আবারও চারপাশে তাকালো। ভিড়ের পর ভিড়। অগণিত মুখ। অথচ সেই মুখটা কোথাও নেই।
বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে। কেন একটা অচেনা মেয়েকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, তার নিজের কাছেও সেই প্রশ্নের উত্তর নেই। তবে খুঁজে যাচ্ছে, যাচ্ছে আর যাচ্ছেই।
—দোস্ত,
স্বাধীনের শান্ত স্বরে কপাল কুঁচকে তাকায় আসিফ। স্বাধীন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আসিফের পানে প্রশ্ন ছোঁড়ে—-
—শুনেছি ভাবিও পর্দা করে, আর তুই যাকে খুঁজছিস সেও পর্দা করে। তাহলে….!
—তাহলে?
স্বাধীন মাথা নিচু করে নিলো। আসিফ কপাল কুঁচকে তার পানে তাকিয়ে।
—তাহলে এই মেয়েকে কেনো তুই উতলা হয়ে দেখতে চাইছিস? আর কেনো ভাবিকে ঘৃণা করিস? তুই বলেছিলিস পর্দাশীল নারী, অতি ধার্মিক মেয়ে তোর পছন্দ নয়। তাই তুই ভাবিকে বিয়ে করতে চাসনি। তোর পছন্দ ছায়া’দের মতো স্টাইলিশ মেয়েদের। তাহলে তুই অচেনা এক মেয়েকে খোঁজার জন্য এতোটা প্রেশার কেনো নিচ্ছিস? সেও তো ভাবির মতোই। তাহলে দু’জনকে দু’নজরে দেখছিস কেনো? একজনকে ঘৃণা করছিস অথচ অন্যজনকে……!
কথাটা শেষ করতে পারলো না স্বাধীন। আচমকা স্বাধীনের কলার চেপে ধরে আসিফ৷ শক্ত হয়ে আসে চোয়াল, দাঁত কিড়মিড় করতে থাকে তীব্র রাগে। অন্যদিকে আসিফের আতর্কিত হামলায় ভরকে যায় ছেলেটা। তবুও দৃষ্টি স্থির রাখে৷ আসিফ রাগান্বিত স্বরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো—-
—ওই মেয়েটার কথা একদম আমার সামনে বলবি না। আর আমার দেখা সেই নারীর সাথে তো তুলনা করবিই না। নইলে…
—নইলে কি?
—ভুলে যাবো তুই আমার বন্ধু।
স্বাধীন চুপ করে যায়। আসিফ স্বাধীনকে ছেড়ে গটগট পায়ে স্টেশন হতে বেড়িয়ে আসে।
—এই কে ওখানে? কে আছে?
আচমকা করো কর্কশ গলায় তড়িঘড়ি করে ওড়নার আড়ালে মুখ ঢাকে ফাতিহা। হুট করেই বুকটা ধক করে ওঠে কেমন। কাঁপা কাঁপা আঁখিপল্লব মেলে সামনে তাকাতেই আবিষ্কার করে তার স্বামী আসিফকে। ফাতিহা শুকনো ঢোক গিলে।
বিকেলের মৃদু হাওয়ায় বাগানে এসেছিলো, শীতল বাতাসে গা ভাসাচ্ছিলো রমনী। থ্রি-পিসের সাথে মাথায় ওড়না থাকলেও মুখ পুরোপুরি খোলা ছিলো৷ বাগানের চারিদিকটা ঘেরা, দরজায় দারোয়ান আছে, তবে সে যেখানে দাঁড়িয়েছে সেখান হতে দারোয়ানের নজরও তার উপর পড়বার নয়৷ তেমন কোন পরপুরুষ ছিলো না বিধায় স্বাধীনচিত্তে ঘুরছিলো সে। এরমধ্যেই মির্জা বাড়ির মেইন গেট দিয়ে প্রবেশ করে আসিফ। গাড়ি পার্ক করে ভেতরে যাবে এরমধ্যেই বাগানের অন্যপাশে সবুজরঙা পোশাকে আবৃত এক রমনীকে দেখে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন ছোড়ে আসিফ।
ফাতিহা পায়ে পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে আসে। আসিফ এখনো কপাল কুঁচকে আছে। তবে ফাতিহা সামনে আসতেই সে বেশ আন্দাজ করতে পারলো এই রমনী কে হতে পারে। আর তা বুঝতে পেরেই বিরক্তিকর শ্বাস ফেললো৷ গলা চড়াও করে বললো—-
—এই মেয়ে, এই বিকেল বেলা এখানে কি করছো তুমি? কাজ নেই?
পুরুষটির কড়া কথায় মুখ ঢেকে চোখ তুলে সামনে আসিফের চোখপানে তাকায় ফাতিহা।
চোখাচোখি হয় দু’জনের। আর ফাতিহার সেই শান্ত চাহুনিতে হুট করেই থমকে যায় আসিফ৷ এই প্রথম এতোটা ভালো করে সে ফাতিহার আঁখিপল্লব দেখলো, আর আজ’ই তার মনে হলো—এই চোখজোড়া কি সে চেনে? দেখেছে কোথাও? এতোটা চেনা লাগছে কেনো?
আসিফ নিশ্বাস খিঁচে নিলো সেই ধূসররঙা টানা টানা আঁখিপল্লবের পানে চেয়ে। সাগরের ন্যায় গভীর চোখজোড়া অদ্ভুত ঠান্ডা, শান্ত আর স্থির। আসিফের দম আঁটকে এলো। হৃৎস্পন্দন বুঝি গতি হারালো সেই কোমল দৃষ্টিতে। আসিফ বুকের বাম পাশটা চেপে ধরলো৷ এলোমেলো লাগলো সবকিছু।
—আমি…আমি আসলে…
ফাতিহাকে কথাটা সম্পুর্ন করতে না দিয়ে আচমকা গটগট পায়ে ভেতরের দিকে চলে গেলো আসিফ। কপাল কুঁচকে নিলো ফাতিহা। ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে গিয়েও আর পুরোপুরি গেলো না। বরং কাঁধ ঝাঁকিয়ে আওড়ালো—-
তাকদিরে তুমি পর্ব ৬
—হলোটা কি ওনার?
অন্যদিকে আসিফ গটগট পায়ে নিজের ঘরে গিয়ে সপাটে দরজা আঁটকে দিলো। বিছানায় বসে দু’হাতে মাথার চুল খামচে ধরলো। চোখজোড়া শক্ত করে বন্ধ করে বিড়বিড় করলো—-
—কি হচ্ছে এটা? ওই চোখ দু’টো, এমন লাগলো কেনো?
