Home তাকদিরে তুমি তাকদিরে তুমি পর্ব ১

তাকদিরে তুমি পর্ব ১

তাকদিরে তুমি পর্ব ১
মোনালিসা মেহরোজ

হবু বউ পর্দা করে বলেই প্রথমে বিয়েতে রাজি হয়নি আসিফ। তার ধারণা ছিল— অতিরিক্ত ধার্মিক মেয়েরা হয় ভীষণ সেকেলে, নয়তো বিরক্তিকর। অথচ আজ তাকে সেই মেয়ের পাশে বসে কবুল বলতে হয়েছে।
কয়েক ঘণ্টা আগেই কাজী তাদের বিয়ে পড়িয়েছেন। পুরোটা সময় জুড়ে গম্ভীর মুখে বসেছিলো আসিফ মির্জা। চোখেমুখে ছিল বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ। ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসছিল সে। কিন্তু বাবার কঠিন হুমকির সামনে শেষমেশ হার মানতেই হলো।
বাবা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন—

এই বিয়ে না করলে তাকে মির্জা পরিবারের সমস্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হবে। আর তাই না চাইতেও বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছিল আসিফকে।
বিয়ে শেষ হতেই কারও কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করে নিজের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায় মির্জা মহল থেকে। যেন এই বাড়িতে এক মুহূর্তও দম নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।
এদিকে ফাতিহা তখন বাসরঘরে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। সাদা ধবধবে বোরখার আড়ালে লুকিয়ে আছে তার শান্ত মুখখানি। নতুন জীবনের অজানা অনুভূতি আর চাপা ভয় মিশে বুকটা কেমন কাঁপছে তার।
এশার নামাজ অনেক আগেই আদায় করে নিয়েছে সে। তারপর থেকেই অপেক্ষা করছে নিজের সদ্য বিয়ে করা স্বামীর জন্য। ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে রাত বারোটাকে ছুঁলো। তবুও আসিফ ফিরলো না। চারপাশে নিস্তব্ধতা।শুধু দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার টিকটিক শব্দ কানে লাগছে।

ফাতিহা দরজার পানে তাকালো। শান্ত মুখখানিতে বিষন্নতা ভির করেছে৷ শরীরটাও নুইয়ে পরেছে সারাদিনের ক্লান্তিতে৷ ফাতিহা আর পারলো না। খানিকবাদে ঘুমে ঢলে পরলো বালিশে। আর ঘুম ভাঙলো ফজরের আযান কানে আসতে। মেয়েটি তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে কাউকে না পেয়ে কপাল কুঁচকে গেলো তার। তবুও মনকে শান্ত করে অযু করে নামাজ আদায় করলো। কুরআন তেলওয়াত করলো বেশ খানিকটা সময়। আবহাওয়া বেশ শীতল তখন, ফাতিহা কুরআন তেলওয়াত শেষে উঠে এগিয়ে গেলো বারান্দার পানে৷ বাগানে সদ্য ফোঁটা শিউলি ফুলগুলো দেখে মনটা ভালো হয়ে গেলো। শিউলির গায়ে ভোরের শিশির বিন্দু কি সুন্দর চক চক করছে। মৃদু হাসলো ফাতিহা। অতঃপর লম্বা শ্বাস ফেলে গুটিগুটি পায়ে নিচে নেমে এলো। নিচে তেমন কাউকে না পেয়ে সকালের নাস্তা বানাতে লেগে পরলো মেয়েটা। এরমধ্যেই সেখানে উপস্থিত হলেন সায়না মির্জা, আসিফের মা।

শাশুড়ীকে দেখেই মৃদু হাসলো ফাতিহা। মহিলার সাথে তার পরিচয় বিয়ের কয়েকদিন আগে। রাস্তায় যখন সায়না মির্জা এক্সিডেন করেছিলেন আর ফাতিহা তাকে সাহায্য করেছিলো তখনি নিজের ছেলের জন্য ফাতিহাকে পছন্দ করেন সায়না মির্জা। পরে যখন জানলেন মেয়েটা ধার্মিক আর পর্দাশীল তখন তিনি আরো খুশি হয়ে যান। প্রথম দেখাতেও ফাতিহার মুখ তিনি দেখতে পাননি পর্দার কারণে। তবু তার ব্যাবহারে মুগ্ধ হন সায়না মির্জা। এ যুগে এমন মেয়ে পাওয়া ভাগ্যের ব্যপার বলে মনে করেন তিনি। আর তাই স্বামীকে বলে ফাতিহাকে বাড়িতে তোলার ব্যাবস্থা করেন তাদের অহংকারী ছেলের জন্য। ফাতিহা আসিফের ব্যাপারে সব জানে। জেনেশুনেই বিয়েটাতে রাজি হয়েছে সে। তাই কাল রাতে আসিফ না ফিরায় খুব একটা অবাক সে হয়নি।
সায়না মির্জা এসে দাঁড়ান ফাতিহার পাশে। ফাতিহা মাথা নুইয়ে মৃদু কন্ঠে সালাম জানালো শাশুড়ীকে। সায়না মির্জা মুগ্ধ নয়নে মেয়েটির পানে তাকালেন। ফাতিহার মুখটা তখন বের করা, ওড়না দিয়ে হিজাব বেঁধে আড়ালে রেখেছে চুলগুলো। যেহেতু বাড়িতে শশুড় আর স্বামী ছাড়া পুরুষ মানুষ নেই, তারওপর শশুড় এখনো জাগেন নি সেহেতু মুখ খোলায় রেখেছে মেয়েটা।
সায়না মির্জা ফাতিহার মাথায় হাত বুলিয়ে নূরের আলোর ন্যায় সুন্দর মুখশ্রী মুখপানে তাকালেন। বললেন—

—নামাজ পড়েছো?
ফাতিহা মৃদু হেঁসে মাথা নাড়ালো—
—জ্বী, আম্মা।
সায়না মির্জার বুকটা শীতল হয়ে আসে মা ডাক শুনে। তিনি ফাতিহার কপালে চুম্বন করলেন। অতঃপর বললেন—-
—কাজের লোক আছে, আম্মাজান। তুমি যাও। রেস্ট করো।
ফাতিহা হাসে কেবল। মাথা নাড়িয়ে বলে—-
—নিজের কাজ নিজে করা সুন্নত, আম্মা।
আবারো একবার মুগ্ধ হন সায়না মির্জা। ফাতিহার মাথায় হাত বুলিয়ে তিনিও কাজে হাত লাগালেন।
—ছেলেটা ফিরে নি, তাইনা?
মলিন মুখে প্রশ্ন করলেন সায়না মির্জা। আবারো হাসে ফাতিহা। ধীর কন্ঠে ভরসা দিয়ে বলে—-
—চিন্তা করবেন না। ফিরে আসবে।

সকাল তখন দশটার কাছাকাছি। ফাতিহা সকালের ব্রেকফাস্ট করে নিজ ঘরেই বসে ছিলো। হাতে একটা বই ধরা। এরমধ্যেই দরজা নক না করেই কেউ ভেতরে প্রবেশ করে। ফাতিহা চমকে আড়াল করে নিজেকে। আসিফ নিজের ঘরে সাদা বোরখা পরিহিতা মেয়েকে দেখে কপাল কুঁচকে নিলো। ফাতিহা অন্যদিকে ফিরে থাকায় দেখতে পারলো না মুখটা।
বিরক্তিকর চাহুনি নিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই বুঝতে পারলো এটা তার সদ্য বিবাহিতা বউ। ফাতিহা না ফিরেই শীতল কন্ঠে সালাম দিলো আসিফকে। আসিফ তা গ্রহণ করলো না। চোয়ালদ্বয় শক্ত হয়ে আসে তার। গায়ের শার্ট খুলে বিছানায় আছড়ে ফেলে কর্কশ গলায় সুধায়—-

—হেই ইউ, ড্রামা বন্ধ করে বেড়িয়ে যাও ঘর থেকে। আমি ঘুমাবো।
ফাতিহা তাকালো না। বরং অদ্ভুত শীতল গলায় বললো—-
—ঘরে প্রবেশ করে আগে সালাম দিতে হয়, সালাম নিতে হয়। এটুকু ভদ্রতা কি নেই আপনার মধ্যে?
আসিফ রাগে ফুঁসে ওঠে। দু’পা এগিয়ে এসে দাঁতে দাঁত চেপে বলে—-
—এখন তুমি আমাকে ভদ্রতা শেখাবে?
—দরকার হলে অবশ্যই শেখাবো।
আসিফ কিছু বলতে যাবে তার আগেই ফাতিহা ফের বললো—-

—সে যাই হোক, আজকে প্রথম দিন ছিলো তাই কিছু বললাম না। এর পরের দিন থেকে বাহিরে রাত কাটানোর আগে দশবার ভেবে নিবেন।
ফাতিহা গটগট করে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পরলো। হতভম্ব আসিফ হা করে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। মেয়েটা তাকে থ্রেট করলো? এতো সাহস তার? আসিফ মির্জাকে শাসাচ্ছে সে?
আসিফের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে ধপ করে ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকে গেলো। কল ছেড়ে দেওয়ালে আঘাত করে বিড়বিড় করে বললো—-
—ড্যাম ইট।

তাকদিরে তুমি পর্ব ২