তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৫
রাফিয়া জান্নাত রিফা
নিধির কানে কানে ফিসফিস করে বিথী বলে গেছে,,
__ বিড়াল মরার সাথে সাথে তোকেও মারবে আর্দ্র ভাই সাবধানে থাকিস।
কি ভয়ংকর কথা এ কথা শোনার পর থেকেই বেচারি খাটের উপর জড়োসড়ো হয়ে বসে তার সামনে থাকা বিড়ালের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। আর্দ্র নিধির এমন ভীতু চেহারা দেখে নিধির পাশে বসে, তার হাত টা ধরে বলে,,
__ আর ইউ ওকে?
আর্দ্রের দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না নিধি লজ্জায় মেয়ে লাল হয়ে যাচ্ছে বারবার, আর্দ্র নিধির ঘোমটা তুলে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তা দেখলো, আর্দ্রের মনে হলো, এই মেয়েকে একটু টাচ করা মানেই লজ্জাবতীর মতো নিজেকে নুইয়ে নেওয়া। আর্দ্র নিজের মুখটা নিধির ঘোমটার ভিতরে ঢুকিয়ে নিলো,নিধি বরফের ন্যায় জমে গেলো যেন, আর্দ্রের নিঃশ্বাস চোখে মুখে উপছে পড়ছে,নিধির বুকের ভিতরটা দ্রিমদ্রিম করে বাজছে,নিধি চোখ বন্ধ করে নিলো,তা দেখে আর্দ্র বলে,,
__ চোখ বন্ধ করে শায় দিচ্ছো।
লজ্জায় চোখ খিচে বন্ধ করলো নিধি, আর্দ্র ফের বলে,,
__ ১৮ প্লাস কাজ কর্মে নিয়োজিত হতে বলছো। তোমার বয়স কিন্তু ১৮ আপ সো…
__ আ আমি ইতি, বিথীর কাছে যাবো।
নিধির এমন কথার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না আর্দ্র,মুখে অসহায়ত্ব নেমে এলো আর্দ্রের,,
__ তাদের কাছে কেন যাবে তুমি।
__ ওদেরকে ছাড়া আমি ঘুমাতে পারবো না।
__ আমি কিভাবে ঘুমাবো তবে।
__ আ আমি জানি না।
__ ইতি, বিথী ঘুমিয়ে পড়েছে চলো আমরাও ঘুমিয়ে পরি,কসম কিছু করবো না।
কিছু একটা মনে হতেই আর্দ্র ফের বলে,,
__ এক মিনিট।
এই বলে পাঞ্জাবির পকেট থেকে চকচকে বক্স বের করে নিধির হাতে দিতে বলে,,
__ তোমার জন্য এটা, নিজের টাকায় কেনা।
নিধি হাতে নিয়ে খুলে দেখলো ডায়মন্ডের রিং, আর্দ্র সেটি নিধির হাতে অনামিকা আঙ্গুলে পরিয়ে দিয়ে বলে,,
__ বিয়ের প্রমাণ এটা,খুলবে না কিন্তু।
নিধি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললো। আর্দ্র ফের নিজের পকেট থেকে পেপারে মোড়ানো টাকা বের করে নিধির হাতে দিয়ে বলে,,
__ এই নেও তোমার দেনমোহর পাঁচ লক্ষ এক টাকা।
আর্দ্র নিজের সামর্থ্য মতো দেনমোহর বেঁধেছে,এতে কেউ তাকে বাঁধা ও দেয় নি,সে দেনমোহর পরিশোধ করেই বউয়ের কাছে যাবে,এটা তার বহু আগে থেকে ভেবে রেখেছিল।
__ আমি এত টাকা দিয়ে কি করবো?
__ তোমার ইচ্ছে,যা খুশি করতে পারো?
__ আচ্ছা,আমি এখন যাই তাহলে।
__ যাবে মানে, কোথায় যাবে?
__ বিথী,ইতির কাছে।
__ ইতি ও আলবানের রুমে।
__ ও আসবে ফের,তাই আমি ও যাই।
এবার আর্দ্রের বেশ রাগ হতে লাগলো,,
__ এসব কি বলছো নিধি।
প্রসঙ্গ পাল্টে নিধি বলে,,
__ বিড়ালটাকে মারবেন না হ্যাঁ,খুব কিউট দেখতে বিড়ালটা।
__ তুমি না থাকলে বিড়াল মেরে করবো টা কি?
নিধি কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,,
__ যখন আর্দ্র ভাই ছিলেন তখনি ভালো ছিলেন,বিয়ে না করাই ভালো ছিলো,তখন প্রেম প্রেম পেতো খুব,এখন আমার ভয় করছে, শরীর কাঁপছে,বুক ধুকপুক করছে,খুব অস্বস্তি লাগছে,আমি এখানে থাকবো না,আমি ইতি, বিথীর কাছে যাবো, এসব ভয়ংকর বাসর, ভয়ংকর রাত,আমি নাই এসবে।
আর্দ্রের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো,,
__ নিধি আমি তোমার হাজব্যান্ড, ভুলে গেলে।
__ ও জন্যই ভয় লাগছে,আমায় যেতে দিন।
__ ওয়াট রাবিশ,বিয়ে কি জন্য করলাম তবে,বউ কে ধরে ঘুমাবো বলো নাকি।কি সমস্যা হচ্ছে বলো তোমার,আমার ছোঁয়া খারাপ লাগছে তোমার।
নিধি মাথা নাড়িয়ে না বলে,
আর্দ্র নিধির থেকে দূরে সরে গিয়ে বলে,,,
__ এই দেখো দুরে সরে আসছি,কি হয়েছে বলো,কি সমস্যা।
নিধি কান্না করতে করতে বলতে লাগলো,,
__ আমি ইতি, বিথীকে ছাড়া ঘুমাতে পাবো না,তাদের মিস করছি আমি, ওদের কাছে যাবো আমি।
আর্দ্র হতবাক হা হয়ে নিধির পানে চেয়ে রইল, পাঁচ মিনিট ও হয় নি বিথী ইতি চলে গেছে,তাতেই তাদের মিস করার ব্যাপারটা বুঝলো না আর্দ্র, আর্দ্রের ইচ্ছা হলো নিজের মাথায় নিজেই মেরে জ্ঞান হাড়াতে,বউ তার অবুঝ না,ওই যা একটু বাচ্চামো স্বভাব,তাও সেটা আর্দ্র কাছেই। কিন্তু এখন এটা আর্দ্র কি বলে আখ্যা করবে,মাথায় আসলো না,মাথা আপাতত হ্যাং হয়ে রইল।
আর্দ্র জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,,
__ মজা করছো?
__ না আমি ইতি, বিথীর কাছে যাবো।
আর্দ্র মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে অভিমান একটু রাগালো সুরে বলে,,
__ তো আমায় বিয়ে করলে কেন?
__ ভালোবাসি তাই?
__ আমি ও তো ভালোবাসি?
__ তাই তো দুজন দুজনকে বিয়ে করলাম, আপনাকে আমার করে নিলাম,এখন বিয়ে শেষ তাই আমি ইতি বিথীর কাছে যাই,আপনি থাকেন।
এই বলে নিধি বিছানা ছেড়ে নামলো, আর্দ্র তড়িৎ বেগে বিছানা থেকে নেমে নিধির হাত ধরে পিছোন দিক থেকে জড়িয়ে ধরে বলে,,
__ ভিতরে আগুন জ্বালিয়ে না নিভিয়ে চলে গেলে ভালো হবে না কিন্তু।
বেচারি নিধি এসব থেকে কোন রকমে পালাতে চাইছে কিন্তু মোটেও পাচ্ছে না সেটা ,এটা সত্য যে সে ইতি, বিথীকে ছাড়া ঘুমোতে পারবে না। এদিকে আর্দ্রের মনোভাব নিধিকে ভিতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে,নিধির এমন নার্ভাস হওয়ার কারণ কি সেটার তার কাছেও ক্লিয়ার না,তাকে যে এই রুম থেকে চলে যেতে হবে এইটুকুই শুধু জানা আছে নিধির,তার পক্ষে এত কাপাকাপি আর অসস্থি নিয়ে এখানে থাকা সম্ভব নয়। আর্দ্র এমন শক্ত করে জড়িয়ে রাখাতে নিধি বরফের ন্যায় জমে গেল। আর্দ্র অসহায় কন্ঠে ফের বলেই,,
__ এমন করছো কেন বউ?
নিধি ঢোঁকের পর ঢোঁক গিলতে লাগলো,এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে অন্য পাশে গেলো, আর্দ্র ও দৌড়ে নিধিকে ধরতে গেলো,নিধি আর্দ্রকে ধরা না দিয়ে দৌড় বিছানায় উঠলো, আর্দ্র ও দৌড়ে বিছানায় উঠলো,নিধি আবার অন্য দিকে দৌড় দিলো।
পাঁচ মিনিটের মতো তাদের এমন দৌড়াদৌড়ি চলতে লাগলো, আর্দ্র নিধিকে বারবার থামতে বলছে কিন্তু সে কিছুতেই থামছে না। আর্দ্র বিছানার উপরের দাঁড়িয়ে নিধি কে বললো,,
__ নিধি থামো বলছি,আর দৌড়াতে পারছি না।
নিধি বলে,,
__ আমাকে ইতি বিথীর কাছে যেতে দিন তাহলে।
আর্দ্র এবার সত্যিই ক্ষেপে গেলো,রাগের রোষে পা দাপাতে লাগলো বিছানার উপরে,এতো জোরে পা দাপালো যে খাটের তিন দিকের তিন স্ক্রু ছিটকে পড়লো, সেগুলো টিলে ভাবে লাগানোই ছিলো,ব্যাস খাট ভেঙ্গে ধপাস করে পড়ে লেগো আর্দ্র, অনেক জোরে বিকট শব্দ হলো, আর্দ্র চিত হয়ে পড়লো মাথায় একটি কাঠ বেশ জোরেই লাগলো, আর্দ্র এক হাত মাথার পিছনে দিয়ে দেখলো রক্ত,নিধির দিকে তাকালো আর্দ্র, কিছুক্ষণ তাকিয়েই জ্ঞান হাড়ালো সেখানেই।
তাদের ঘরের দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে কান পেতে আছে, বিথী, নিঝুম,পিকি, মুহিন,এতো জোরে শব্দ হওয়াতে পিকি বলে,,
__ এতো জোরে শব্দ হলো কেন?
বিথী বলে,,
__ সাব্বাশ আর্দ্র ভাই, সাব্বাশ নিধি,এই না হলে আমার বোন।
মুহিন বলে,,
__ কেন?
__ কারণ তারা বিড়াল মেরেছে।
__ ওহহ
নিধি তার সামনে এমন ভাঙ্গা খাট ও আর্দ্রের এভাবে জ্ঞান হারানো দেখে হকচকিয়ে উঠলো, দৌড়ে আর্দ্রের কাছে গেলো, আর্দ্রের মাথায় রক্ত দেখে নিধি কান্না করতে লাগলো, জোরে জোরে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো,,
__ ওরে আল্লাহ,ওরে মায়য়,ওরে বাবা, বিথী,ইতি,মুহিন, নিঝুম কোথায় তোরা দেখে যা কি হয়ে গেলো রেড়ড়ড়।
দরজার ওপাশে কান পেতে থাকা কোবরা রা হকচকিয়ে উঠলো, বিথী হকচকিয়ে বলতে লাগলো,,
__ নিধি কি হয়েছে তোর,কি হয়েছে।
নিধি আর্দ্রকে নিজের উরুতে নিয়ে আরো জোরে চিৎকার করে বলতে লাগলো,,
__ আমার সব শেষ হয়ে গেল বিথী।
বিথী অধৈর্য হয়ে কিছু একটা ভেবে বলে,,,
__ বিড়ালকে তোরা মারছিস,নাকি বিড়াল তোদের মারছে কোনটা।
নিধি ফের কাঁদতে কাঁদতে বলে,,
__ ওরে সব গেলো রেয়য়য়য়, আল্লাহ।
নিধি গাল বেয়ে টপটপ করে পানি পরছে।
এবার বিথী রাগ দেখিয়ে বলে,,
__ প্যানপ্যানানি বন্ধ করে দরজা খোল।
নিধি তখনি হুঁশ আসলো যে আসলেই তো দরজা বন্ধ, সেখানে থাকা ভাঙ্গা কাঠটাকে সড়িয়ে দিয়ে আর্দ্র কে সুয়ে দিয়ে,দরজা খুলে দিলো নিধি, হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ করলো সবাই।তাদের সামনে ভাঙ্গা খাট দেখে হা হয়ে চেয়ে রইলো সেদিকে,মুহিন আবাক হয়ে বলে,,
__ বিড়াল মারতে গিয়ে খাট ও ভেঙ্গে ফেললি নিধি আপু।
নিধি কাঁদতে কাঁদতে বলে,,
__ ওরে মাথা মোটার দল আমার স্বামী আর্দ্র খাট ভেঙ্গে পড়ে গেছে,কেউ ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা কর,সবাইকে ডাক।
নিধির এ কথা শুনে সবাই চারজনই একসাথে বলে,,
__ কিইইই।
অবশ্যই এটা সিরিয়াস কিছু,এতে মোটেও হাসির কিছু নেই, কিন্তু তাও বিথী প্রচুর হাঁসি পাচ্ছে, নিজেকে বোঝালো এখন হাসা যাবে না, সে অনুযায়ী ওড়না দিয়ে মুখ চেপে ধরলো,নিধি আর্দ্রের কাছে গিয়ে আহাজারি করে বলতে লাগলো,,
__ স্বামী গো ওঠে পড়ো গো,আমি আর দৌড়াবো না।
এই বলে কাঁদতে লাগলো নিধি।
নিধির এমন চিৎকারে এক এক করে বাড়ির সবাই এলেন,আলিফা বেগম ছেলের এমন অবস্থা দেখে ছেলের পাশে বসে কান্না করতে লাগলেন, সেখানে উপস্থিত থাকা সকলেই এমন খাট ভাঙ্গা দেখে বেশ অস্বস্তি পড়লো অনেকে অনেক কিছুই ভাবতে লাগলো,এখন তাদের কে বোঝাবে যে তেমন কিছু নয় খাট ভেঙ্গেছে অন্যকারনে।
নাজিম তালুকদার গলা খাঁকারি দিয়ে বলেন,,
__ আ আমি ডাক্তারকে কল করছি?
আলিফা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলে,,
__ হ্যাঁ তাড়াতাড়ি।
রাত বাজে তখন ১ টা। নাইম তালুকদার কিছু না বুঝে অবুঝের মতো বলেন,,
__ খাট ভাঙ্গলো কিরে?
নাঈম তালুকদারের এমন কথা শুনে সিদ্দিকী বেগম হকচকিয়ে তার বাহুতে চিমটি কাটলো,নাঈম তালুকদার গম্ভীর কন্ঠে সিদ্দিকী বেগম কে বলেন,,
__ চিমটি দিচ্ছো কেন সিদ্দিকী।
সিদ্দিকী বেগম তাজ্জব বনে চলে গেলেন,সবার দিকে একবার তাকিয়ে বলে,,
__ ভেঙ্গেছে হয়তো কোনভাবে।
নাঈম তালুকদার আবার বলে,,
__ এতো দামী আর বড় খাট ভাঙ্গে কি করে?
সিদ্দিকী বেগম কটমট চোখে তাকিয়ে নাঈম তালুকদারের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,,,
__ কথাটা কোন লাইনে যাচ্ছে বুঝতে পারছেন,মেয়ে ছেলেরা আছে।
নাঈম তালুকদার হা হয়ে ভাবতে লাগলো সে কি এমন ভুল কথা বললো, ঠিকই তো বলল।
এবার নিধি হুট করে কান্না করতে করতে বললো,,
__ আমাকে জরিয়ে ধরে শরীরের আগুন নিভাতে চেয়েছিল স্বামীজান,কিন্তু আমি ইতি, বিথীর কাছে যাবো বলে বায়না করছিলাম,এ নিয়ে দৌড়াদৌড়ি হলো বিছানার উপর দিয়ে,ফালতু বিছানাটা তখনি ভেঙ্গে গেল।
এই বলে জোরে জোরে কান্না করতে লাগলো নিধি, উপস্থিত থাকা সকলেই থমথমে খেয়ে গেল নিধির এমন কথা শুনে,নিধির মা তো লজ্জায় মরিমরি অবস্থা,ভাসুরের সামনে এমন কথা অবশ্যই লজ্জাজনক কিন্তু তার এই মেয়ে বুঝবে কি করে।আলিফা বেগম কিছুক্ষণ নিধির দিকে হা হয়ে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবলো। নাজিম তালুকদার ও নাঈম তালুকদার মুখ আমুট চুমুট করলেন।
নিধির এমন কথা শুনে সবার লজ্জা লাগলেও, বিথীর একদমই লজ্জা লাগলো না,নিধির এমন কথা শুনে সে হো হো হাসতে লাগলো,নিধি এমন অট্টহাসি রুমে দ্রিমদ্রিম করে বাজতে লাগলো, বিথীর এমন হাসি দেখে,মুহিন ও নিঝুম ও জোরে জোরে হাসতে লাগলো, তিনজনের হাসিতে ফেটে পড়লো।মানে সিরিয়াস টাইমে হাসাটা কি খুব প্রয়োজন ছিল, কিন্তু কি আর করার হাঁসি তো আটকে রাখার জিনিস না, বেচারি অনেক ক্ষন যাবৎ ধরে যথাসম্ভব নিজের হাঁসি চেপে রাখছিলো কিন্তু এখন আর কিছুতেই তা চেপে রাখতে পেলো না।
বিথীর হাঁসি থেমে গেল তার মায়ের বড় বড় চোখ জোড়া দেখে।
ঘুমে টুলতে থাকা ডাক্তারকে ধরে নিয়ে এলো মোজাম্মেল চাচা,ঘুমের তোড়ে চোখ দুটো লাল হয়ে আছে ডাক্তারের। বিথী ডাক্তার কে দেখেই চিনতে পেলো,এ হলো সেই ডাক্তার যাকে জোর করে তুলে এনে ছাগলে প্রসব করিয়েছিল কোবরা কুইনরা,একটু আবাক হলো বিথী,পরে তা মিলিয়ে গেল। ডাক্তার ও ঘুম ঘুম চোখে বিথীকে দেখলো “সপ্ন মনে করে ওতটা পাত্তা দিলো না”কিন্তু আবার দেখলো যে লেহেঙ্গা পড়ে খুব সুন্দর একটি মেয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে যাকে সে প্রায়ই স্বপ্ন দেখে, হ্যাঁ সেটি বিথীই। ডাক্তার নিজের গায়ে নিজেই জোরে চিমটি কেঁটে নিলো,চোখ জোড়া বড় হলো,ঘুমের রেশ থেকে বেড়িয়ে এলো, এবং চোখ কচলে বললো,,
__ আরে সুন্দরি রাগি চন্ডি।
বিথী একটু বিরক্ত হয়ে বললো,,
__ আরে ডাক্তার বাবু।
__ এটা তোমার বাড়ি।
__ রোগি দেখেন আগে।
__ ও হ্যাঁ হ্যাঁ।
ডাক্তার চেয়ারে বসলো, আর্দ্রকে সোফায় সোয়ানো হলো,তিনি আর্দ্রকে দেখে বলে,,
__ “বেশি একটা লাগে নি ব্যান্ডেজ করে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।
ডাক্তার নিধিকে দেখলো,তার সাজ ও কান্না দেখে বুঝলো যে এদের বিয়ে হয়েছে তাতে আবার বাড়িটাও বেশ সাজানো, ডাক্তার ঢাকায় আসার পর থেকে বিথী নামক রাগি চন্ডিকে অনেক খুঁজেছে কিন্তু পায় নি। ডাক্তার নিধির হাতে টিস্যু দেখে বললো,,
__ আমাকে একটু টিস্যু টা দেবেন।
নিধি দিয়ে দিলো, হাতে নিতেই টিস্যু খানা ভেজা অনুভব করলো,বুঝলো যে এই মেয়ে কান্না করে সর্দি তাতে মুসছে ডাক্তার নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারলো। এই কনকনে শীতে আসায় ডাক্তারের সর্দি অনুভব হলো তাই টিস্যু খানা চাওয়া কিন্তু কে জানতো যে তাতে নিধি আগেই সর্দি মুছেচে,এখন টিস্যু খানা ফেলতেও পারবে না ডাক্তার জোর জুলুম করে নাক মুখ কুঁচকে ওই টিস্যু দিয়েই নিজের নাক পরিষ্কার করলো।
আর্দ্রের মাথায় ব্যান্ডেজ করে দিলো ডাক্তার, ডাক্তার বারবার ভাঙ্গা বিছানার দিকে আড়চোখে দেখছে তার এভাবে তাকানো দেখে ফট করে বিথী বলে,,
__ হ্যাঁ, হ্যাঁ যেটা ভাবছেন ওটাই।
ডাক্তার হতবাক হয়ে গেল, ডাক্তার বলে,,
__ উনি এখন ঠিক আছে,কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি তা খাওয়াবেন ও রেস্টে রাখবেন, অল্পের জন্য গভীর আঘাত থেকে বেঁচে গেছেন তিনি।
এই বলে ডাক্তার উঠে দাঁড়ালো তখনি জোরে জোরে চিৎকার শোনা গেল,,
__ মায়য় বাঁচাও মায়য় ও মায়।
আলবানের এমন কন্ঠ শুনে আলিফা বেগম চোখের পানি মুছে হকচকিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,,
__ ওটা আলবানের কন্ঠ না।
বিথী বলে,,
__ হ্যাঁ বড় মা।
আলবান দৌড়ে এলো আর্দ্র ঘরে,এসেই আলিফা বেগমের পিছোনে লুকিয়ে পড়লো এবং ভয়ার্ত কন্ঠে বলতে লাগলো,,
__ বাঁচাও মা বাঁচাও।
আলবান মুখের অবস্থা দেখে বিথী, নিঝুম, মুহিন,পিকি বিকট অট্রহাসিতে ফেটে পড়লো, বিথী হাঁসির সাউন্ডটা বেশি ছিলো,এক পর্যায়ে হাসতে হাসতে বিথী মেঝেতে বসে পড়লো,সাথে নিঝুম ও মুহিন ও।
হাসার কারণটা হলো আলবানের মুখ ও গলায় লিপস্টিকের লাল লাল ঠোঁটের অঙ্কন গুলোর জন্য,কেউ লিপস্টিক পড়া ঠোঁটে সমানে আলবানকে ওভাবে চুমু খেয়ে গেছে।আলবানের এমন অবস্থা দেখে নাজিম তালুকদার ও নাঈম তালুকদার মাথা নিচু করে চলে গেলেন।
তারা যেতেই সেখানে টুলতে টুলতে উপস্থিত হলো দাদিমা অর্থাৎ আছিয়া বেগম,হাতে লাল লিপস্টিক ঠোঁট দিচ্ছে আর রেম্প ওর্য়াকের মতো হেঁটে আলবানের কাছে আসছে,আছিয়া বেগমের পিছনে ইতি ও আসছে,ইতি বারবার দাদিমাকে বলছে,,
__ ও দাদি কি খাইছো,এমন করছো কেন,থামো।
এবার হাসতে হাসতেই ইতি বলে,,
__ সে তোমার নাতি হয় এবার তো থামো।
দাদিমা ভারী কন্ঠে টুলতে টুলতে বলে,,
__ একটু হালকা মেরেছি ভাই.লাল পানি
একটু হালকা মেরেছি ভাই.লাল পানি
ইতি বুঝলো সেদিন হরলিক্সে খাওয়ানো মদ দাদিও খেয়েছে, কারণ সেই মদের বোতল নিধি দাদির ঘরেই লুকিয়ে রেখেছিল।
দাদিমা আলবানের চোখে মুখে চুমু খেয়ে এই অবস্থা করেছে,দাদিমা আলবানের দিকে এগোতে গিয়ে ডাক্তারকে দেখে থেমে গেলো, ডাক্তারের উপর নিচ পরখ করে মুচকি হেসে বললো,,
__ এই চিকনা শুধু আমার,আয় কাছে আয়।
ওয়েট ওয়েট শুধু একজন যে মদ খেয়েছে সেটা না সুহানার দাদি ও মদ খেয়েছে, সুহানার দাদিও আলবানকে এলোপাথাড়ি চুমু দিয়েছে, সুহানার দাদির কথা মনে পড়তেই ইতি মাথা ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো।একই ভাবে তিনি ও টুলতে টুলতে হাজির।আলিফা বেগম ও সিদ্দিকী বেগমের একদমই ভালো লাগলো না এই পাগলা গারদে থাকতে তাই তারা রেগে মেগে চলে গেলেন সেখান থেকে।
সুহানার দাদি ও এলো ডাক্তারের কাছে এসে বললো,,
__ এই মালটা কেডা সুন্দর তো।
সুন্দর বলাতে ডাক্তার বাবু নিজেকে নিয়ে বেশ গর্ব অনুভব হলো, বিথীর দিকে একবার তাকালো ডাক্তার কিন্তু সে তো হেসেই যাচ্ছে, ডাক্তার বাবু কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনি,আছিয়া বেগম ডাক্তার গালে একটা গাঢ় চুমু এঁকে বলে,,
__ আমারের পরাণেন স্বামীটা।
সুহানা দাদি বেশ ক্ষেপে বলে,,
__ তোরে দিমু আমার জামাই রে ,ভালো কইরা,যায়য় দুরে যায়য়।
__ ওই ছেড়ি ওই মুখ সামলায় কথা ক,ও আমার পরাণের স্বামীটা।
__ হ দিমু তরে কচু দিমু,আইচে,ইহহহ।
আছিয়া বেগম চুমু দেওয়ায় ডাক্তার জমে গেছে,কি বলবে,কি করবে বুঝতে পারছে না তার মধ্যেই আবার ডাক্তারের দুহাত নিয়ে দুপাশে দুইজন টানাটানি করছে,নিজ স্বামী, স্বামী বলছে,এর মাঝে অসহায় ডাক্তার বুঝতে পারলো তার মতো সিঙ্গেল মানুষ টারে নিয়ে কি শুধু করলো, ডাক্তার অসহায় কন্ঠে বলতে লাগলো,,,
__ “বিথী তুমি বলে দাও আমি কার,
দুটো মানুষের একটি মনের দাবিদার।
সুহানার দাদি বলে,,
__ আমি পৃথিবীর এই বুকে
আগুন জ্বালিয়ে দেবো
তুমি যদি আমারি না হও
আছিয়া বেগম বলেন,,
__ তুমি বিশ্বাসঘাতকতা করো না প্রিয়া,
আমি ছাড়া তুমি কারো নও।
বিথী সাথে সাথে এবার ইতি ও হাসিতে মেতে উঠলো আলবান ইতি পিছোনে লুকিয়ে আছে তার এই মাতাল দাদি তাকে দেখলেই সমস্যা,রাগ হচ্ছে আলবানে প্রচুর।
ওদিকে নিধির মোটেও হাসি পাচ্ছে না,সে এক ধেয়ে তাকিয়ে আছে তার ঘুমান্ত স্বামীর মুখের দিকে,চোখে পানি টলমল হয়ে আছে,এর জন্য নিজেকেই দোষারোপ করছে নিধি,নিধি এখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে।পরম আবেশে আর্দ্রের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সে।
পরিশেষে আছিয়া বেগম,ও সাহিদা বেগম ডাক্তার বাবুর অবস্থা নাজেহাল করে দিলো চুমু খেতে খেতে,আছিয়া বেগম তো বারবার লিপস্টিক ঠোঁটে দিচ্ছে আর ডাক্তার কে চুমু দিচ্ছে। ডাক্তার বাবুর চশমা চোখ থেকে ঠোঁটে এসেছে পড়েছে,তার সাথে হওয়া এমন নিপীড়িত নির্যাতনের জন্য বাকরুদ্ধ সে,আছিয়া বেগম ও সাহিদা বেগম এবার ডাক্তারকে ছেড়ে দিয়ে খপ করে পিকি কে ধরলো,পিকি একের পর এর এক ঢোঁক গিলতে লাগলো,কি আর করার দু’জনে মিলি পিকির ও সেম অবস্থা করলো, পরপরই মুহিনের ও সেম অবস্থা করলো চুমু দিয়ে।
ইতি, বিথী নীধি ও নিঝুমের হাঁসি কিছুতেই থামছে না।
ডাক্তার হতভম্ব হয়ে মেঝেতে বসে পড়েছে, পানের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লাল লাল অংশ গুলো সারা মুখে ছড়িয়ে আছে লিপস্টিকে তো মুখ ভর্তি,একই অবস্থা পিকি ও মুহিনে ও।
আছিয়া বেগম ও সাহিদা বেগমের এবার চোখ গেলো সোফায় শুয়ে থাকা আর্দ্রের দিকে এবং বলতে লাগলো,,
__ এই তো আমার হাঁফ সোওমি টা।
এই বলে দুজনেই এগোতে লাগলো,নিধি এবার চরম রেগে গিয়ে আর্দ্রকে নিজের ওড়না দিয়ে ডেকে রেখে চিল্লিয়ে বলতে লাগলো,,
__ দাদিমা আমার স্বামীকে একটা টাচ করলে কিন্তু ভালো হবে না বলে দিলাম,যাও এখান থেকে।
তাও এগোতে লাগলো,দাদিমা দের এবার থামানো দরকার,তাই ইতি আলবানকে বললো,,
__ আলবান ভাই দাদিমা কে কোলে নিয়ে তার ঘরে দিয়ে আসেন।
আলবান গালের লিপস্টিক মুছতে মুছতে বলে,,
__ পাগল নাকি আমি পাবো না, ইম্পসিবল।
__ তো চুম্মা খান আমার কি?
__ আমার জীবনের সব থেকে ভুল তোকে চুমু দেওয়া।
__ দরজা খোলা রেখে ওসব ইটিস পিটিস করলে ওমনই হবে।
আলবান গটগট পায়ে এগিয়ে গিয়ে আছিয়া বেগমকে কোলে তুলে নিলো, বিথী হাসতে হাসতেই ডাক্তারকে বললো,,
__ ডাক্তার বাবু এই দাদিমা কে আপনি কোলে করে তার ঘরে রেখে দিয়ে আসুন,নাহলে আজ সারারাত এভাবে চুমু খাবে।
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৪
বিথী কিছু করতে বলছে মানে সে কথা শুনতেই হবে সেভাবেই সুহানার দাদিকে কোলে তুলতে গেলো ডাক্তার,তাকে দেখে ডাক্তারের চুক্ষু চড়াক গাছে, সুহানার দাদি অনেক মোটা,তাও কিছু করার নেই,মুখে টেনেটুনে হাঁসি এনে সুহানার দাদিকে কোলে তুলে যেতে লাগলো এর মাঝেই নিম্ন পক্ষে পাঁচট চুমু দিলো ডাক্তারকে সাহিদা
বেগম।
