তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৬
রাফিয়া জান্নাত রিফা
সকাল ছ’টার ম্লান আলোয় আর্দ্র পিটপিট করে চোখ খুলতেই তীব্র এক টনটনে ব্যথা মাথার ভেতর ছড়িয়ে পড়ল। ককিয়ে উঠল সে। আধখোলা চোখেই সামনে দেখা গেল নিধির ঘুম ভাঙা, ফোলা ফোলা দু’টি চোখ। ধীরে ধীরে গত রাতের সবকিছু সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ফিরে এল নিধির সাথে সেই দৌড়াদৌড়ি, অকারণ উচ্ছ্বাস, খাট ভেঙে পড়ার শব্দ, আর ঠিক তখনই মাথায় সেই কাঠের আঘাত… তারপর কেবল অন্ধকার।
আর্দ্র কষ্ট সামলে উঠে বসতেই নিধি তৎপর হাতে তাকে ধরে বালিশে ভর দিয়ে আধশোয়া করে দিল। আর্দ্র কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠোঁট নড়লো মাত্র,
ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ দরজায় তড়াক করে ঢুকে পড়ল ইতি। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,,,
__ আর্দ্র ভাই থুক্কু পাদরো ভাই খাট ভাঙ্গলো কি করে।
পরপর মুহিন বলে,,
__ বিড়াল কে কত জোরে মেরেছো,যে খাট টাই গেল।
নিঝুম বলে,,
__ একটু লজ্জা হওয়া উচিত ছিল আর্দ্র ভাই।
আর্দ্র হা হয়ে চেয়ে রইলো তাদের দিকে,কাল তার জন্য কত সুন্দর একটা রাত ছিলো,কোমল পরশে রাত,খাট ভেঙ্গে মাথা ফাটিয়ে রাত শেষ কি হলো বিয়ে করে,বউ তো বাসর বোঝে তাহলে ভয়টা কোথায়, আর্দ্র কি তাকে মারতো।নিধির চোখভরা অস্বস্তি আর ভয়ের আভাস দেখে আর্দ্র অজান্তেই একটু দূরে সরে গিয়েছিল। অথচ তার ইচ্ছে ছিল নিধিকে বুকের ভেতর গুটিয়ে নিয়ে শান্তভাবে ঘুমিয়ে পড়বে এই প্রথম রাতে, প্রথম স্পর্শে।
কিন্তু যেহেতু পরিস্থিতি বিগড়ে গেছে, রাগ দেখিয়ে তো আর কিছুই হবে না। নিজেকেই সামলাতে হবে। কারণ এই সম্পর্কের জায়গায় আর্দ্রর ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় কথা। বাসর কতটা সুন্দর হলো না হলো, সেটা মুখ্য নয় নিধি পাশে থাকলেই তার সবকিছু পূর্ণ।
একবার চোখ ফেরাতেই দেখল, নিধি এখনো ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছে, যেন ভয় আর লজ্জার মাঝখানে গুটিয়ে থাকা এক শিশুপাখি।
আর্দ্র ধীরে নিধির হাতটা ধরে তাকে নিজের পাশে বসিয়ে নরম কণ্ঠে বলল,,
__ চোখ দুটো গোল গোল আলুর রুপ নিয়েছে।
নিধি মাথা নিচু করে নিলো কিছু বললো না,সেই কাল রাত থেকে এসবে জন্য নিজেকেই দোষারোপ করে যাচ্ছে সে, আর্দ্র মাথায় ব্যান্ডেজ দেখলেই নিধির ভিতরটা হু হু করে উঠছে, ওদের ঘরের খাট ভাঙ্গার পর নিধি ও আর্দ্র এখন গেস্ট রুমে। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইতি, নিঝুম, মুহিন ভেবলার মতো তাদের আই কন্টাক্ট দেখছে। তাদের একা থাকতে দেওয়া উচিত তাই ইতি চলে যেতে যেতে বিরবির করতে লাগলো,,
__ ওদের ঘরের খাট ভেঙ্গে শান্তি হয় নি এখন এই খাট ভাঙ্গতে আইছে,হু,আমি ও একদিন আলবান ভাইকে খাটে আচার মেরে খাট ভাঙ্গবো,হিহি।
ইতির পেছনে পেছনে মুহিন আর নিঝুমও ধীরে ধীরে করিডোর পেরিয়ে নিচে নেমে গেল।
ইতির অস্থিরতা বেড়ে গেল আজ।আজকাল ইতির মনটা কিছুতেই স্থির থাকে না। মিনিটে, সেকেন্ডেই সেই চুমুর ঘটনা মনে পড়ে যায় এমন এক স্মৃতি যা না চাইলে-ও জিদ ধরে মনের উঠোনে এসে দাঁড়ায়।
ইতির বেশি হাসি তখন, যখন তার মনে পড়ে সেদিন ঠোঁটে ওটা কালো লিপস্টিক ছিলো না বরং পাতিলের কালি, সেগুলো খেয়ে ফেলেছে আলবান ভাই, যদিও এর জন্য কেলানি খেয়েছে পরে।এমন হুটহাট চুমুর কথা মনে পড়ায় এবার বড্ডো বিরক্ত ইতি, যেখানে তার লজ্জা পাওয়ার কথা সেখানে লজ্জার ছিটেফোঁটাও নেই, তবে কি ইতির লজ্জা নেই, নিজের ঘরে বিছানায় বসে এসব ভাবতে লাগলো।
আলবানের কথা হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল ইতির। অদ্ভুত এক টান তাকে টেনে নিয়ে গেল করিডোরের দিকে। পা টিপে টিপে নিঃশব্দে আলবানের ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে। ভোরের ম্লান আলোয় ঘরটা নিস্তব্ধ শুধু আলবানের শান্ত নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে।
আলবান উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে আছে, চুলগুলো এলোমেলো। ইতি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দেখল তাকে মনে হলো ছেলেটা কতটা নিরস্ত্র, কতটা সহজ এই ঘুমের মধ্যে।
হঠাৎ ইতির ভেতর দুষ্টুমির ঝিলিক খেলে গেল,চোখ দুটো চকচক করে উঠল।
__এত শান্তিতে ঘুমাচ্ছে? একটু সাজালে মন্দ হয় না!
এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই ইতি দম ধরে হাসি চেপে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
নিজের ঘরে ঢুকে তড়িঘড়ি করে মেকআপ ব্যাগ, ব্রাশ, লিপস্টিক, আইশ্যাডো যা পেল সব গুছিয়ে কোলে নিয়ে আবার দৌড়ে চলে এল।তার চোখে তখন একটাই ঝিলিক
আলবানের ঘুম নষ্ট না করেই তাকে একখানা ‘আর্টপিস’ বানানো!
এক এক করে লিপস্টিক, কাজল, আইলাইনার, আইশ্যাডো যা ছিল সবই ব্যবহার করে ইতি বড় যত্ন করে সাজিয়ে তুলল আলবানকে। গোলাপি লিপস্টিক, চোখের কোণে ঘন কাজলের টান, গালে হালকা ব্লাশ সব মিলিয়ে আলবানকে যেন এক অভিনব শিল্পকর্মে পরিণত করল সে।
অদ্ভুত ব্যাপার, সাজানোর পুরো সময়টাতে আলবান একবারও নড়ল না। সেই দেখে ইতির মনে দুষ্টুমির ঢেউ খেলল ঝুঁকে আলবানকে একটা ফ্লাই কিস ছুড়ে দিল সে, যেন নিজের পরিশ্রমের প্রতি নিজেই পুরস্কার দিল।
সব সাজসজ্জা শেষ হলে ইতি একপা পিছিয়ে দাঁড়িয়ে আলবানকে দেখে হো হো করে হেসে উঠল। হাসির দমক সামলাতে পারছিল না চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে আসার উপক্রম।ফটাফট ফোন বের করে কয়েকটা ছবি তুলল মনে হলো এই স্মৃতি একেবারে সিন্দুকে ভরে রাখার মতো।
ইতি এখনো তাকিয়ে আছে আলবানের দিকে আর হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাচ্ছে তার। সেই হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়তেই,
ঠিক তখনই
আলবানের দু’ভুরু ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল।ঘুমের ভেতর কুণ্ঠিত এক বিরক্তি মুখে ফুটে উঠল।পরক্ষণেই আলবানের চোখদুটো সামান্য কেঁপে খুলে যেতে লাগল।চোখ পিটপিট করে ইতিকে দেখে একটু বিরক্ত হয়ে ঘুম ঘুম কন্ঠে বলে,,
__ সমস্যা কি ,জালাচ্ছিস কেন?
ইতি হাসতেই লাগলো,আলবান ফের বিরক্ত হয়ে বলে,,
__ স্টপ লাফিং,দুর হ সামন থেকে, ঘুমোতে দে।
ইতি আর কোন কথা না বলে হাসতে হাসতে নেচে কুদে চলে গেল,আলবানের সন্দেহ হলো ইতি এমন হাঁসি দেখে, এমনি সময় তো এই মেয়ে এ ভাবে হাসে না।ঘুম আর হলো কই আলবানের বিরক্ত নিয়ে বিছানা ছেড়ে ওয়াসরুমে গেল।ওয়াসরুমের মিরর গ্লাসে চোখ পড়তেই আলবান জোরে চিৎকার করলো,পুরো তালুকদার বাড়ি কেঁপে উঠল, চিৎকার থামিয়ে আয়নায় ভালো করে নিজেকে দেখল,বুঝলো এটা সেই,এই অবস্থা তার ইতি করছে এটা বুঝতেও দেরি হলো না।রাগ নিয়ে হনহনিয়ে ইতির কাছে যেতে লাগলো আলবান,আজ ইতির অবস্থা খারাপ করবেই সে।
কুয়াশায় আচ্ছন্ন চারিদিক,বাগান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল দির্শক তাকে পিছোন থেকে বিথী ডাকলো,,,
__ দুষ্শমন স্যার কোথায় যান।
কালো হুডিতে মাথা পর্যন্ত আবৃত দির্শকের, বিথীর দিকে ফিরে ফেচেল হেসে দির্শক বলে,,
__ শশুর পটাতে।
বিথী অবাক হয়ে তড়াৎ করে দির্শকের দিকে এগিয়ে এসে বলে,,
__ মানে।
দির্শক ফের বলে,,
__ শশুর পটাতে।
বিথী কিছু একটা ভেবে বলে,,
__ আমিও যাবো।
দির্শক কিছুক্ষণ ভেবে বলে,,
__ ওকে চলো।
বিথী দির্শকের তীক্ষ্ণ চোখ গুলো দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলে,,
__ ওভাবে দেখবেন না,ওই সমুদ্র নীল চোখ দেখলে কেমন কেমন ফিল হয়।
দির্শক স্পষ্ট ভাবেই শুনতে পেলো এবং বলল,,
__ ওজন্যই এই তীক্ষ দৃষ্টির সৃষ্টি, উজ্জ্বল নারী।°°
,লেটস গো।
দুজনেই হাঁটতে লাগলো, দির্শক একবার বিথীর চাদরের দিকে তাকিয়ে বলে,,
__ চাদরটা ভালো করে মুড়িয়ে নাও শরীরে।
বিথী কিছু না বলে নিঃশব্দে চাদরটা ভালো করে নিজের শরীরের সাথে পেঁচিয়ে নিলো।
হাঁটতে হাঁটতে বটতলা কাছে আসলো বিথী ও দির্শক রোদ উঠেছে হালকা পাতলা। বিথী দির্শক কে ফের বলে,,
__ কোথায় যাচ্ছেন।
__ বললাম তো শশুর পটাতে।
বিথীর এবার রাগ হলো তাই আর এক পা ও না এগিয়ে বলতে লাগলো,,,
__ এই দাঁড়ান তো দাঁড়ান,কয়টি বিয়ে করছেন যে শশুর শশুর করছেন।
দির্শক মুচকি হেঁসে বলে,,
__ ফলো মি।
__ কোথায় যাবেন সেটা বলেন।
__ শশুরের উপকার করে পটাতে।
__ কি আজব কথা,বিয়ে করেছেন আপনি?
__ করার ইচ্ছা ও নেই।
__ তাহলে যে শশুর শশুর করছেন।
__ ইচ্ছা হলো তাই।
__ বিয়ে করার ইচ্ছা নেই আবার শশুর বলার ইচ্ছে হলো,আজব মানুষ তো আপনি।
__ ইয়েস আইম অড ম্যান,লেটস গোঁ।
বিথী আর কিছু না বলে চলতে লাগলো,যেতে যেতে দির্শক আবার থেমে গেল, বিথী দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,,,
__ একটা কথা।
বিথী ভ্রু কুঁচকে বলে,,
__ কি?
__ কিছু বাজে অনুভূতি প্রকাশ করতে চাই।
__ কি?
দীর্ঘ শ্বাস ফেলে দির্শক বলে,,,
__ খোদার বানানো এত বড় দুনিয়ায়,আমার একটা মানুষ কেই পেতে ইচ্ছে করে কেন?
ভ্রু ক্রুটিত করে বিথী বলে,,
__ প্রশ্ন করলেন??
__ হ্যাঁ।
বিথী নির্বিকার ভঙ্গিতে উওর দেয়,,,
__ আপনি প্রেমে পড়েছেন,তাই।
বিথীর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে দির্শক বলে,,,
__ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন।
এই বলে দির্শক চলতে লাগলো, বিথী ও দির্শকে সাথে হনহনিয়ে হেঁটে আবাক সুরে বলে,,,
__ কেন কেন?
দির্শক যেতে যেতেই হেসে বলতে লাগলো,,,
__ আমি মুরাক্কাব না হওয়া সাত হরফের মতো,যার সাথে মিল হয় না কারো।মনের মিল হলেও যন্ত্রণা অবধারিত।
__ মদ খেয়ে যেমন মাতাল হওয়া যায়, তেমনি প্রেমে পড়লে মদ না খেয়েও মাতাল হওয়া যায়, বুঝলেন স্যার।
দির্শকের পায়ে গতি থেমে গেল,চোখ জোড়া জ্বলজ্বল করতে লাগলো, বিথীর দিকে ঝুঁকে দির্শক বলে,,
__ ক্ষনিকের এ জীবন,
এত প্রেম মায়া করলে চলবে না,
সব থেকে প্রিয় জিনিসটাকেও ছুড়ে ফেলার সৎ সাহস থাকতে হবে।
__ তাহলে আপনার সে সাহস নেই।
এই বলে বিথী মুচকি হাসতে লাগলো, কিন্তু সে হাসি নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষণ করলো দির্শক পরক্ষণেই মাথা ঝাড়া দিয়ে চোখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে বলে,,
__ তা ঠিক, কারণ ওটা আমার কাছে মৃত্যুর সমমান হবে।
এই বলে চলতে লাগলো দির্শক ফের কিছু একটা ভেবে বিথী কে বলে সে,,,
__ ক্ষনিকের জন্য যদি বলি “ভালোবাসি” তো।
বিথী থমকে গেলো, এবং বলল,,,
__ বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করতেই পারেন, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সেই ক্ষনিকের ভালোবাসা আসলে কুকুর তাড়ানোর মতো করে বলবো,
” দুর,দুর,ছৈই ছৈই,ছৈই কুত্তা ছৈই,হুস।
এই বলে বিথী হাসতে লাগলো,দির্শক দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,,,
__ সবই নিয়তি উজ্জ্বল নারী।
দির্শক ফের বলে,,,
__ আজ একটা ভালো কাজ করবো,মনজয় করা কাজ।
বিথী আবাক হয়ে বলে,,,
__ কি কাজ।
__ বললাম তো মনজয় কাজ।
__ সেটা আবার কি কাজ।
__ দেখতে থাকো শুধু।
দির্শক কান থাকা ইয়ার বাট কানেক্ট করে নিথেক্সকে বলল,,,
__ লোকেশন দিয়েছে, কুইক ফাস্ট।
__ওকে ভাই।
দির্শক বিথীকে বলে,,
__ হেঁটে যাবে নাকি রিস্কা ডাকবো।
__ কোথায় নিয়ে যাবেন।
__ আমি তো নিয়ে যাচ্ছি না, তুমিই তো এলে আমার সাথে।
মুখ আমুট চুমুট করে বিথী বলে,,
__ রিশকা ডাকেন।
দির্শক রিশকা দার করালো, বিথী উঠে বসলো, দির্শক ও উঠে বসলো বিথীর পাশে।
রিকশা এসে থামলো পার্কের সামনে ছোট বাজারে মোড়ে,দির্শক রিকশা চালকে টাকা মিটিয়ে, পার্কে গেল বিথীকে নিয়ে। পার্কের সারি সারি থাকা ব্রেন্চে বিথীকে বসতে বললো, বিথী বসলো, অতঃপর দির্শক বিথী পাশে বসে বলল,,,
__ একটা অফার করবো তোমায়?
__ কি?
কিছুক্ষণ চুপ রইল দির্শক,সময় নিয়ে বলল,,
__ তিনদিন প্রেম করতে পারবে আমার সাথে।
বিথীর চক্ষু চড়কগাছে,গোল গোল চোখ করে দির্শকের পানে তাকিয়ে বলে,,,
__ মানে।
__ আমার মনে বাজে অনুভূতি গুলো তোমায় নিয়ে, সেগুলোই রপ্ত করতে চাই।সময় ও হাতে নেই বেশি।
__ সময় হাতে নেই কেন?
__ কারণ আমি লক্ষ্য ভ্রষ্ট পথিক।
__ কি বলছেন এসব,যে কথার মানেই বুঝতে পারছি না।
__ তিনদিনের জন্য প্রেম করতে রাজি কি না।
বিথী সেখানে বসেই অসস্থিতে নড়াচড়া করতে লাগলো,মূলত দির্শকের এমন কথা তার কোন ভাবেই বোধগম্য হচ্ছে না।দির্শক ফের বলে,,,
__ অভিনয় হলেও চলবে।
বিথী চিবুক শক্ত করে বলে,,,
__ কিন্তু কেন?
__ কল্পনার বাজে অনুভূতি গুলোকে একটু বাস্তবে রূপ দিয়ে দেখবো, রপ্ত হয় নাকি তপ্ত হয়ে ওঠে।
বিথী আবার চুপ সে কি বলবে তাই বুঝতে পারছে সব কেমন যেনো মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
__ নিরবতা সম্মতির লক্ষণ তাহলে কি ভেবে নিবো।
ভ্রু কুঁচকে দির্শকের দিকে তাকালো বিথী কিন্তু ওই চোখে চোখ রাখতে পারলো না বিথী,কি জানি কি হয়?এখন দির্শকের চোখে চোখ পড়লেই বিথীর বুকটা ছ্যাত ছ্যাত করে ওঠে।
দির্শক বিথীর মুখের পানে তাকালো তার মতামত শোনার জন্য কিন্তু বিথী নিশ্চুপ,দির্শক ফের বলে,,
__ ওকে, তুমি রাজি, তাহলে কাল থেকে প্রেম স্টাট করি?
বিথী এবার হা হয়ে দির্শককে দেখতে লাগলো, সন্দিহান কন্ঠে বলল,,,
__ আপনি তো আমার স্যার হোন।
__ সো হোয়াট।
বিথী আর কিছু না বলে নিশ্চুপ রইল,দির্শক বলে,,
__ আজ থেকে ৭২ ঘন্টা ৪,৩২০ মিনিট ২,৫৯,২০০ সেকেন্ড পর নতুন কিছু আসছে নতুন রুপে,তার আগেই আমি আমার অনুভূতিকে বাস্তবে সাজাতে চাই, ডোন্ট ওয়ারি আমি তোমার প্রেমিক হবো না,বা তুমি ও আমার প্রেমিকা হবে না। শুধু আমি বুঝতে চাই “হোয়াট ইজ লাভ, হোয়াট ইজ লাভ ফিলিং”। তুমি যদি সত্যি সত্যি প্রেমে টেমে পড়ো তাহলে তাতে আমার কোন দ্বায়বধ্যতা থাকবে না।আমি থাকলে হয়তো দ্বায়বধ্যতা ও নিতাম।আমি কি বললাম তুমি কি বুঝলে,বলো বিথী, বুঝলে?
বিথী হা হয়ে কথা গুলো শুনলো শুধু,এসব কথায় কি বলবে সে,সে কি বুঝলো তাই তো বুঝলো না।আজ এ কেমন দির্শক প্রাধান কে দেখছে বিথী। বিথী কাছে দির্শকের কথা গুলো আকুল লাগলো যেন বিথী কে অনুরোধ করলো দির্শক কিন্তু কেন এভাবে বললো দির্শক। বিথীর মাথায় অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খেলো, কিন্তু কিছুতেই তা বলতে পারছে না, দির্শকের পানে তাকিয়ে দুবারের মতো চোখ ঝাপ্টে নিলো বিথী। বিথী বললো,,
__ আমিই,,
বিথীর কথার মাঝে দির্শক বলে,,,
__ আমি যেটা বলছি সেটাই,চলো ওদিকে।
বিথী কি বলবে কি করবে বুঝতে পেলো না,তাই দির্শকের সাথে হাঁটতে লাগলো, রোডের সামনে এসেই দির্শক তার কানে থাকা ইয়ার বাটে চাপ দিলো, এবং ঠোঁটে এক চিলতি বাঁকা হাসি খেলতে লাগলো।
নাইম তালুকদার ও নাজিম তালুকদার সেই রাস্তা দিয়েই হেঁটে আসছিলেন। বিথীর চোখ গেলো সেদিকে, তৎক্ষণাৎ বিথী দেখতে পেলো তার বাবা ও বড় বাবাদের দিকে একটা বড়ো ট্রাক গাড়ি ধেয়ে আসছে। বিথী হকচকিয়ে চিৎকার করে বলল,,,
__ বাবায়য়য়য়য়।
এই বলে দৌড়াতে লাগলো, মোটেও দির্শকের এটা প্লান ছিলো না, বিথীকে এভাবে দৌড়াতে দেখে দির্শক ঢোঁক গিলতে লাগলো,চোখ মুখের রং পরিবর্তন হলো,বুকে দ্রিমদ্রিম শব্দ হতে লাগলো।
বিথী এমন চিৎকার নাজিম তালুকদার ও নাঈম তালুকদারের কানে পৌঁছালো, নাজিম তালুকদার পিছনে ফিরে তাকাতে, হকচকিয়ে গেল, কি করবে বুঝতে পেলো না।নাঈম তালুকদার হকচকিয়ে নাজিম তালুকদারকে অন্য দিকে ধাক্কা দিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা তার হলো কই। ট্রাক গাড়িটির সামনে দিকটায় জোরে আঘাত লাগলো নাঈম তালুকদারের মাথায়,তিনি ছিটকে পড়ার আগেই দির্শক বাতাসের গতিতে সাঁই করে এসে হাত ধরে টেনে আনলো নাঈম তালুকদারকে, ট্রাক গাড়িটি সেখান থেকে চলে গে।দির্শক ও নাঈম তালুকদার উপুড় হয়ে ছিটকে পড়লো, নাঈম তালুকদারকে যদি ছিটকে পড়তেন তাহলে বড়ো সড়ো ক্ষতি হয়ে যেত, মুহূর্তেই লোকজন সেখানে জড়ো সড়ো হলো। মাটিতে ছিটকে পড়ায় নাঈম তালুকদার সেখানে জ্ঞান হাড়ালেন।দির্শক মাটিতে উপুড় হয়েই মুষ্টিবদ্ধ হাত মাটিতে দাপিয়ে বললো,,
__ সিট…সিট।
নাজিম তালুকদারের তেমন কিছুই হয়নি, বিথী বাবা বলে চিৎকার করে নাঈম তালুকদারের কাছে এসে কান্না করতে লাগলো, তৎক্ষণাৎ দির্শক আবার তার কানে থাকা ইয়ার বাটে চাপ দিয়ে বললো,,,
__ এখুনি গাড়ি নিয়ে আয় কুইক।
বিথী নাঈম তালুকদারকে নিজের উরুতে শুইয়ে দিয়ে , মাথায় রক্ত দেখে আঁতকে উঠলো বিথী ও কান্না করতে করতে বলতে লাগলো,,
__ বাবা ওঠো,বাবা ও বাবা।
নাজিম তালুকদার বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, চোখে পানি টলমল করছে তার।তার চোখে পানি দেখে দির্শক নিঃশব্দে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো।
দুমিনিটের মধ্যে সেখানে নিথেক্স গাড়ি নিয়ে পৌঁছালো।দির্শকের কাছে বিথীর এমন কান্না চরম বিরক্তি ঠেকলো।মোটেও বিথীকে কাঁদানোর তার কোন ইচ্ছা ছিলো না।পুরো প্লানটাই ছিলো দির্শকের কিন্তু সে চেয়েছিল অন্য কিছু, দির্শক তার রক্ত ঝড়াতে চাই নি।
দির্শক ও নিথেক্স নাঈম তালুকদারকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো বিথী ও উঠলো কিন্তু নাজিম তালুকদার উঠলেন না,তিনি এক ধেয়ে কি যেনো ভেবেই যাচ্ছেন,তা দেখে দির্শক বলে,,,
__ কিই স্মৃতিচারণ হচ্ছে নাকি।
নাজিম তালুকদারের নিজের ভ্রম থেকে বেড়িয়ে এলেন, হকচকিয়ে বলতে লাগলেন,,,
__ নায়য়,আমার ভাইয়ের কিছু হবে না, কিছু না।
কথায় স্পষ্ট ভয় ছিলো। নাজিম তালুকদার গাড়িতে উঠে বসলেন,গাড়ি ছুটতে লাগলো হাসপাতালের নিকটে। বিথীর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে কিন্তু ওই চোখের পানি অসহ্য লাগছে দির্শকের কাছে, কিন্তু কেন?এই মানেটাই তার কাছে স্পষ্ট না।
নাজিম তালুকদারের শুকনো মুখ পানে তাকিয়ে শান্তি লাগলো দির্শকের, পরক্ষণে নাঈম তালুকদারকে দেখে মনে মনে বলতে লাগলো,,,
__ ক্ষমা করবেন আমায়,আমি আপনার কোন ক্ষতি করতে চাই নি,আপনাকে বাচিয়ে পটাতে চেয়েছিলাম মাএ কিন্তু আপনিই নাজিম তালুকদারকে ধাক্কা দিয়ে নিজের বিপদ ডাকলেন, এবং আমার সাজানো গেইম টা উল্টে দিলেন, এটা ঠিক করেন নি,তবে আপনিও সমান দোষী।
দির্শক ফের বিথীর মুখ পানে তাকলো, বিথী ওমন কান্নারত মুখ খানা দেখে ভিতরে এক আবাদ যন্ত্রণা তাড়া দিতে লাগলো, অজান্তেই কোন এক ভয়ে ঢোঁকের পর ঢোঁক গিলতে লাগলো দির্শক, বিথীর মুখ পানেই চেয়ে রইল সে।
হাসপাতালে আনা হলো নাঈম তালুকদারকে, ডাক্তার ওনার চিকিৎসা করছেন। কিছুক্ষণ পর একটি ডাক্তার এসে দির্শক, বিথী, নাজিম তালুকদার এদের বলল,,
__ ইমার্জেন্সি রক্তে প্রয়োজন।
ফট করে দির্শক বললো,,
__ আমি রক্ত দিবো,আমার বি পজেটিভ।
ওয়ান সেকেন্ড ডাক্তার কিন্তু একবারও “কি রক্তের গ্রুপ লাগবে”এটা বলে নি, তবে দির্শক জানলো কি করে,এই প্রশ্ন জাগলো বিথী মনে, কিন্তু সেটা নিয়ে বেশি ভাবলো না বিথী,এখন সে তার বাবার চিন্তায় মগ্ন সে।
দির্শক গেলো নাঈম তালুকদারকে রক্ত প্রদান করতে। ব
নাজিম তালুকদার কে জড়িয়ে ধরে বিথী সমানেই কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলো,,,
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৫
__ বাবার কিছু হবে না তো বড় বাবা।
শুকনো ঢোঁক গিলে নাজিম তালুকদার বলে,,,
__ না মামনি কিছু হবে,তুমি চিন্তা করো না।
