Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৮

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৮

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৮
রাফিয়া জান্নাত রিফা

দির্শকের অবস্থান তখন পাহাড়ের চূড়ায়,পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃসঙ্গ প্রত্যয়। এক হাতে ঝুলে থাকা গিটার, অন্য হাতটি প্যান্টের পকেটে গুঁজে সে যেন নিজের ভেতরেই নিজেকে আগলে রেখেছে। হাড়-কাঁপানো শীতে শিরশির করে বয়ে চলেছে বাতাস, সেই বাতাসের বেগে তার চুল এলোমেলো, শার্টের কাপড় ছিন্ন মেঘের মতো উড়ছে, চোখের পাপড়িগুলোও বেপরোয়া ঢেউয়ের মতো কাঁপছে। এত শীতেও তার গায়ে কেবল একটি পাতলা শার্ট অথচ বিস্ময়করভাবে ঠান্ডা তাকে স্পর্শ করতেই পারছে না।
সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘ পাহাড়শ্রেণির দিকে। নিচে সাদা মেঘের স্তর, তাদের ফাঁকে ফাঁকে হালকা শীতের আনাগোনা। এই উন্মত্ত হাওয়া, এই শূন্যতার ডাক, দির্শকের ভেতরে এক অদ্ভুত শান্তি ঢেলে দিচ্ছে। কোনো শব্দ নেই, কোনো অভিযোগ নেই শুধু গভীর, নির্বাক এক অনুভব।
ঠিক সেই মুহূর্তে নিথেক্স ধীরে এগিয়ে আসে দির্শকের দিকে। তার হাতে ধরা ডেনিম জ্যাকেটটি বাতাসে দুলছে। সে দির্শকের দিকে জ্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে নরম কণ্ঠে বলে

__ ভাই ঠান্ডা বাতাস বইছে, জ্যাকেটটা পড়ে নিও।
দির্শক একপলক নিথেক্সের দিকে তাকিয়ে ফের পাহাড়ের চুড়াটিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলে,,
__ ঠান্ডা লাগলে কি হয় নিথেক্স।
দির্শকের এমন কথায় নিথেক্স অবাক হলো প্রচুর, ঠোঁট উল্টে নিথেক্স বললো,,
__ জ্বর, সর্দি,কাশি এসব হয়।
__ ওহহ বাহ্যিক রোগ।
__ জ্বি ভাই।
লম্বা শ্বাস টেনে দির্শক বলে,,,
__ কিন্তু আমার তো অভ্যন্তরীণ রোগ হয়েছে নিথেক্স।
__ কি রোগ ভাই।
__ জানি না।
দির্শক ফের বলে,,
__ জানিস, আমার অনুভূতির রাজ্যে আমাকে সুখি মনে হয়, কিন্তু সে কাল্পনিক অনুভূতির আদৌও কোন অস্তিত্ব আছে কি?
নিথেক্স উদ্বেগ গলায় বলে,,

__ কি হয়েছে তোমার বলো তো ভাই, ইদানিং আমি তোমায় চিনতে পাচ্ছি না।
__ আমিও আমিটাকে চিনতে পাচ্ছি না,আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি?
__ কি সিদ্ধান্ত।
__ কাজ সফল করে ধরা দিবো?
চমকে উঠলো নিথেক্স, চেঁচিয়ে বলল,,
__ মানে, কি বলছো? তোমার মাথা ঠিক আছে তো।
__ হ্যাঁ।
__ ভাই আমাদের পাসপোর্ট রেডি?
__ তুই যাস,আমি যাবো না।
নিথেক্স এবার প্রচুর গর্জে বলে,,

__ আমি এতটাও স্বার্থপর নই যে তোমাকে রেখে চলে যাবো, কি হয়েছে তোমার ভাই, বলো আমাকে শুনতে চাই আমি,তুমি কি তালুকদার বাড়ির মেয়ে বিথীকে ভালোবাসো?
দির্শক ফেচেল হেসে বলে,,
__ যদি হ্যাঁ বলি।
__ তাহলে তুমি খুব ভুল করেছো ভাই,খুব বড় ভুল, আমাদের এই জটলা প্রতিশোধ তাদেরকেই ঘিরে,তবে এটাই একমাত্র মাধ্যম হবে তোমার হারের।
দির্শক নিথেক্সের কথার কোন জবাব না দিয়ে আস্তে ধীরে গিটারটা বুকে গুজে নিল, টুংটাং শব্দে করুন সুরে প্রথমে আস্তে সুর তুলে গান বলল,,
__ এ মনে কি আছে, পারো যদি খুঁজে নাও।
দির্শক থমকে গেল। আঙুলের ডগায় লেগে থাকা গিটারের তারগুলোকে আঙুলের ডগায়ই রেখে সে চোখ বন্ধ করল। মুহূর্তেই তার চেতনার পর্দায় একে একে ভেসে উঠল বিথীর সঙ্গে কাটানো সেই প্রথম সাক্ষাৎ বিথীর নিষ্পাপ হাসি, অভিমানী রাগ, সিঁড়ি থেকে পড়ে যেতে যেতে যেদিন দির্শকের দৃঢ় হাতে সে থমকে গিয়েছিল; সেই আকস্মিক প্রথম ছোঁয়া, চোখে চোখ রেখে নীরব স্বীকৃতি, প্রথমবারের মতো হাত ধরা। মনে পড়ল হাতে বকুল ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়ার সেই বিকেল, চুপিচুপি চুরি কিনে দেওয়ার শিশুসুলভ আনন্দ সবকিছুই যেন অমোঘ স্পষ্টতায় চোখের সামনে ভেসে উঠল।
এই স্মৃতিগুলো তাকে শান্তি দেওয়ার বদলে দ্বিগুণ নিষ্ঠুর যন্ত্রণায় বিদ্ধ করল। মিষ্টি অতীতের ভার আর বহন করতে পারল না দির্শকের মন। হঠাৎ করেই সে চোখ খুলে ফেলল গিটারের তারে জোরালো আঘাত পড়ল, গলা উজাড় করে সুরে সুরে গানের পরের পঙ্‌ক্তি ছুঁড়ে দিল সে…

__ “আমি যে কে তোমার তুমি তা বুঝে নাও।”
গলা ছেড়ে আরো জোরে বললো দির্শক,,
__ আমি যে কে তোমার তুমি তা বুঝে নাও।
গানের পরের পঙক্তিটি আর গাওয়া সম্ভব হলো না দির্শকের , উপস্থিত থাকা উঁচু পাহাড়টিতে ভয় ভীতি ছাড়া অসহায় ভাবে গিটার সহ ধুপ করে হাঁটু গেড়ে বসে দুহাত দুদিকে মেলে দিয়ে বলে জোরে চিৎকার করে বলতে লাগলো,,
__ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ আমি হেড়ে গেছি,আমি আমার অনুভূতির কাছে হেরে গেছি, আমার মনের কাছে হেড়ে গেছি।
আমার আমিটাই আমার সাথে এত বড় বেইমানি করতে পারে না,না না।
দির্শককে এমন অবস্থা এতক্ষণ যাবৎ ভ্রু কুঁচকে দেখছিলো নিথেক্স কিন্তু এখন দির্শকের এমন করুন দশা দেখে ভ্রু শীতল হয়ে গেছে, দির্শকের কাছে যেতে চাইলো কিন্তু কিছু একটা ভেবে গেল না।
দির্শকের চোখে পানি চিকচিক করছে, ফের চিৎকার করে বলে,,

__ প্রথমে মা হাড়িয়ে হেরে গেলাম, শৈশব হাড়িয়ে ফেললাম তাতেও হেড়ে গেলাম,, পরিবার হারালাম,এখন যৌবনে একজনকে ঠাঁই দিতে চাইলো মন,তাও আবার নিষিদ্ধ, তাঁকে না পেয়ে চতুর্থবার আবার হেড়ে গেলাম,আর কত হাড়বো আমি,কত,কত?
মা তুমি কি দেখছো কি আমায়,আমার কষ্ট গুলো ফিল করছো।আমার কষ্ট হচ্ছে মা,আমি আমার ভাগ্য পরিবর্তন করতে চাই মা,এমন ভাগ্য আমি চাই না, আমি নিষ্ঠুর হতে পারি নি,সেই তুমি মারা যাওয়ার সময় কেঁদেছিলাম তারপর প্রতিজ্ঞা করলাম আমি আর কাঁদবো না,এখন এই পর্যায়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কাঁদবো না।
রাগে দুঃখে গগন কাঁপানো চিৎকার করলো দির্শক, এতে ভিতর থেকে কেঁপে উঠল নিথেক্সে, টলমল চোখের পানি মুছে এগিয়ে গেল দির্শকের কাছে, কাঁধে হাত রাখলো দির্শক নিথেক্সের দিকে তাকিয়ে বলে,,

__ ভালোবাসা কি বুঝি নি আমি, কিন্তু এখন বুঝছি নিথেক্স?
__ ভালোবাসা কি?
__ এই যে অকারণে উদাসীন,বুকের ভিতর চিন চিন ব্যথা,রাতে নিয়ম করে তাকে নিয়ে সপ্নে ছোট সংসার গড়ে তোলা,মন মস্তিষ্ক উতলা পাতাল হওয়া, লক্ষ্য থেকে সড়ে আসা, রাতে ঘুম না হওয়া, অস্থিরতা,বুক ধুকপুক করা,আরো কত কি। তুই ওসব বুঝবি না নিথেক্স?
__ আমি বুঝতেও চাই না ভাই, তুমি এসব থেকে সরে আসো ভাই?
দির্শক অসহায় ভাবে বলল,,
__ পারবো না।
“গভীর অতলে অক্সিজেন ছাড়া তলিয়ে যাওয়া এক ডুবুরি আমি,সেই গহবর থেকে বেড়িয়ে আসা কঠিন থেকে কঠিনতর কাজ।তা জেনেও তলিয়েছি আমি গভীর অতলে।

__ পাগলামি করছো ভাই।
__ প্রেমে পড়লে মানুষ পাগলই হয় নিথেক্স,আই নো আই অ্যাম মেড।
দির্শক চোখ জোড়া দুই হাত দিয়ে মুছে নিল, উঠে দাড়ালো,নিথেক্সের হাত থেকে জ্যাকেটটা পড়ে নিলো, এবং বলল,,,
__ সামনে বড় কিছু আসছে নিথেক্স,বি প্রিপারেট।
এই বলে গিটার নিয়ে চললো সামনে থাকা তার বাইকের দিকে,নিথেক্স আর কোন কথা না বলে দির্শকের পিছনে বসে পরলো,বাইক চললো তার গতি সমেত।

বিথীর আচরণে ইতি আর নিধির বিস্ময়ের শেষ নেই। কাজকর্মে এমন অন্যমনস্কতা তারা আগে কখনো দেখেনি। সারাক্ষণ যেন বিথী নিজের ভেতরেই হারিয়ে থাকে। যে মেয়েটা একসময় ঘনঘন আয়নায় নিজের মুখ দেখাকে নিছক অহেতুক বিলাসিতা মনে করত, আজ সে-ই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আয়না হাতে বেলকনিতে বসে থাকে, ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত মুচকি হাসি নিয়ে।
আগে যার চুল থাকত এলোমেলো, মুখে কোনো বাড়তি যত্নের ছোঁয়া ছিল না, রঙচঙে পোশাককে যে মেয়েটা দূর থেকেই এড়িয়ে চলত আজ তাকেই সবসময় পরিপাটি, যত্নে গুছানো, সৌন্দর্যে মোড়া এক মানুষ বলে মনে হয়। খাওয়ার সময়েও অকারণেই হেসে ওঠে সে, যেন মনে মনে কারো সঙ্গে কথা বলে চলেছে। পেছন থেকে ডাকলেও সাড়া মেলে না বাস্তব আর কল্পনার মাঝখানে কোথায় যেন সে আটকে থাকে।
এই তো একটু আগে ইতি কলা আনতে বলেছিল, অথচ বিথী নির্বিকার মুখে তালা এনে তার হাতে ধরিয়ে দিল। ইতির বিরক্তি আর নিধির কৌতূহল তখন একই বিন্দুতে এসে ঠেকল।
গতকাল রাতে নিধি বিথীকে বলছিল,,

__ দাদিমাকে খাওয়ার জন্য ড্রয়িং রুমে আসতে বল।
এদিকে বেখেয়ালি বিথী শুনলো তাকে দির্শকের ঘরে যেতে বললো,ব্যাস দৌড়ে দৌড়ে গেল দির্শকের ঘরে, বিথীর এমন সব কান্ড বাড়ির প্রত্যেকে লক্ষ্য করছে, কিন্তু ইতি নিধি কাছে এটি বেশ অবাক জনিত লাগছে।তাই ইতি ও নিধি আজ বিথীকে চেপে ধরবে,কি হয়েছে বিথীর তা জেনেই ছাড়বে, বিথী বেলকনির মেঝেতে বসে হাতে মেহেদি পড়ছে, ওপর পাশে ফোনে গান বাজছে সেই গানের তালে গুনগুন করে গান গাইছে আর মেহেদি দিচ্ছে, বিথী মেহেদির ডিজাইনে ওতটা এক্সপ্রার্ট না,যখনি মেহেদি দেওয়ার প্রয়োজন হয়েছে তখনি নিধি তাকে মেহেদী দিয়ে দিয়েছে,তবে আজ খুব শখ করে মেহেদী দিতে বসা,তার মেহেদির রঙ কতটা গাঢ় হয় তা দির্শক স্যারকে দেখাবে, চুপিসারে ইতি,ও নিধি বিথীর কাছে এসে বসলো, বিথী তাদের উপস্থিতি বুঝতে পেরে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল,,

__ স্বামী ছেঁড়ে আমার কাছে এলি যে,যা তোদের স্বামীর কাছে, স্ত্রী ধর্ম পালন কর।
নিধি সে কথা উপেক্ষা করে বলে,,
__ এই অসময়ে মেহেদি দিচ্ছিস?
__ হ্যাঁ,তুই তো ব্যস্ত স্বামী সংসার নিয়ে তাই তোকে ডাকি নি,আজ ইচ্ছা হলো তাই দিচ্ছি।
ইতি বলে,,
__ তুই পাল্টে যাচ্ছিস বিথী?
বিথী ফেচেল হেসে বলে,,
__ হ্যাঁ এটা আমার ও মনে হয়।
নিধি বলে ,,,
__ হেঁয়ালি না করে বল,কি হয়েছে তোর?
কল্পনার জগতে ডুব দিলো বিথী এবং বললো,,
__ তিনদিন আমি গভীর প্রেমে আচ্ছন্ন থাকবো,যদিও একদিন চলে গেছে।
নিধি ও ইতি জোরালো ভাবে চিৎকার করে বলে,,
__ মানে।
__ ওতো মানে বোঝা লাগবে না,সময় হলে সব বুঝতে পাবি।
তখনি আলবানের জোরে ডাক আসে,,,

__ কালনাগিনীইইইইইইইই
মুহুর্তেই ইতি রাগে ফোঁস ফোঁস করে চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলো, বিথী হেঁসে বলল,,
__ আমাকে নিয়ে চিন্তা বাদ দিয়ে যা গিয়ে ঝগড়া কর ‌।
এই বলে বিথী হাসতে লাগলো, ইদানিং ইতি, বিথী, নীধি এদের বেশ দুরুত্ব বেড়েছে,তাতে বিথী তেমন কোন জায় আসে না তবে ইতির তা একদমই ভালো লাগে না।আলবানের আবার ডাক আসে,,,
__ কালনাগিনী গেলি কই?
ইতি রাগে দুঃখে কষ্টে কেঁদেই বলে,,
__ এই লোকটার আজ একটা ব্যবস্থা করেই ছাড়বো।
হনহনিয়ে চলে গেল আলবানের ঘরে ইতি,দরজাটা ধপাস করে খুলে কোমড়ে হাত দিয়ে আলবান কে বলে,,
__ কি সমস্যা তোর, গন্ডারের মতো ভেবাচ্ছিস কেন?
আলবান ও রাগ দেখিয়ে বলে,,

__ তোর এতো বড় সাহস তুই আমাকে তুই করে বললি,আমি গন্ডার?
__ তুই বলতে পারিস আর আমি বললেই দোষ।যখনি কারো সাথে প্রয়োজনীয় কথা বলতে যাই তখনি আপনার ডাক পড়ে কেন, হ্যাঁ,আর আপনি গন্ডার নন তো কি, অসহ্য এখন কি হয়েছে বলুন তাড়াতাড়ি?
আলবান প্রচুর গর্জে ইতির দিকে ধেয়ে এসে তার মুখ টিপে ধরে বলে,,
__ মুখে খুব কথা ফুটেছে তাই না, বেয়াদব স্বামী মুখের উপর কথা বলিস?
মুখ চেপে রাখায় কিছু বলতে পেল না ইতি,আলবান ফের বলে,,
__ কাল রাতে রুমে এলি না কেন,বল?
ইতি কাইকুই শব্দ করে আলবানের হাত ছাড়াতে চাইলো আলবান ফের বলে,,,
__ কথা বলা?
ইতি মনে মনে বলল,,
__ ওরে গন্ডার মুখটা থেকে হাত টা তো সরাবি নাকি,না হলে কথা বলবো কেমনে?
আলবান মনে হয় ইতির মনের কথা বুঝতে পারলো তাই মুখ ছেড়ে দিয়ে দেওয়ালের সাথে ইতির হাত দুটো চেপে বলে,,

__ এখন বল।
রাগে বিরক্তি নিয়ে ইতি বলে,,
__ এসেছিলাম,এসে দেখি আপনি ঘুমাচ্ছেন।
__ কত রাতে এসেছিস।
__ রাত তিনটার সময়।
__ ওতো রাতে এলি কেন?
__ ওতো রাতেই বাসর করা হয়?
আলবান দাত কটমট করে বলে,,
__ তাহলে এই সময় ও বাসর করা যায়।
চোখ মুখ কুঁচকে ইতি বলে,,
__ এখন না, ছাড়ুন।
__ জালাচ্ছিস আমায়।
__ আজব আমি কি করলাম?
__ আমার কথা শুনছিস না?
__ কাল থেকে শুনবো,এখন ছাড়ুন।
__ এখন শাস্তি দিবো তোকে?
কিছু বলার আগেই ইতি ওষ্ঠ দখলে নিল আলবান। এখন আকস্মিক ঘটনায় কেঁপে উঠল ইতি, মোটেও প্রস্তুত ছিলো না।

বিথীর ডান হাতে নিধি সুন্দর করে আলপনা আকারে মেহেদী পড়িয়ে দিয়ে অনেক গল্প ও হাসাহাসি করে নিধি গেল আর্দ্রের ঘরে, এতক্ষণ যাবৎ আর্দ্র নিধির জন্যই অপেক্ষা করে ছিল,সাদা শার্ট ও প্যান্ট ইন করেছে কিন্তু কোর্ট পড়েনি, এজন্য নিধির অপেক্ষায় ছিল আর্দ্র,নিধি ঘরে আসতেই নিধির হাত টেনে আদ্রের বুকের সাথে নিধি পিঠ চেপে ধরলো,মুখ গুঁজে দিলো নিধির সুগন্ধি চুলে, দীর্ঘ শ্বাস টেনে বলল,,
__ কতক্ষণ ধরে অপেক্ষায় ছিলাম জানো।
নিধি এখনো আর্দ্রের কাছে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারছে না,ভয় তাকে এখনো গ্রাস করে রেখেছে, শরীর ধুকপুক করছে,তা বুঝলো আর্দ্র এবং বললো,,
__ কাল মধুময় রাত কাটানোর পর ও নিধি কি ভয় পাচ্ছে?
কাল রাতে কথা মনে উঠতেই নিধির কলিজা লাফিয়ে উঠলো, লজ্জায় সংকুচিত হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিলো, আর্দ্র নিধির হাতের অনামিকা আঙ্গুলের তেলে পোড়া ক্ষত দেখে বলে,,

__ জ্বালা কমেছে?
নিধি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে, আর্দ্র বেড সাইডের ড্রয়ার থেকে মলম নিয়ে নিধির আঙ্গুলে যত্ন সহকারে লাগিয়ে দিয়ে বলে,,
__ যেটা পারো না সেটা আর করতে যাবে না, ঠিক আছে।
__ আচ্ছা।
__ এখন কোর্টটা পড়িয়ে দাও, তোমার স্বামী এখন কাজে যাবে, গোসল করে তোমার থেকে মাথা মুছিয়ে নেওয়া জন্য অনেক খন যাবৎ এই ঠান্ডায় তোমার আসার অপেক্ষায় ছিলাম, কিন্তু আফসোস তুমি আসলে না,যাই হোক এখন কোর্টটি পড়িয়ে দাও।
নিধি আর্দ্রের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হেসে, আলমারি থেকে নীল রঙের কোর্টটি এনে আর্দ্রকে পড়িয়ে দিলো, আর্দ্রের মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নিধি বলে,,

__ পারফেক্ট।
তার স্বামীকে আজ অনেক বেশি সুন্দর লাগছে এত বেশি সুন্দর লাগছে যে নিধিরই তার পানে অপলক চেয়ে থাকতে মন চাচ্ছে,তখনি নিধির মনে হলো পাড়ার ও আর্দ্রের অফিসে অনেক মেয়ে আছে যারা নিধির মতো করেই আদ্রকে দেখবে, নজর দিবে, প্রেম নিবেদন করবে, আর্দ্র ও তা প্রাধান্য করতে পারে, হয়তো তারা নিধির থেকে অনেক সুন্দর তাই।
এসব ভেবে অসহায় মুখ করে তাকিয়ে রইল আর্দ্রের মুখ পানে,তা দেখে আর্দ্র টুক করে নিধি কপালে চুমু একে বলে,,
__ কি হলো জান?
নিধির মাথায় তখনি একখানা আইডিয়া এলো “তার মা ছোট বেলায় তাকে নজর কাঁটানোর জন্য কপালে বড় করে কালো টিপ দিয়ে দিতো,যেই ভাবা আর সেই কাজ, আর্দ্রের হাত টেনে ড্রেসিং টেবিলের টুলে বসিয়ে,নিধির মাথায় দেওয়া সুগন্ধি তেল জবজবে করে হাতে মেখে আর্দ্রের মাথায় জুবুথুব করে মেখে দিলো, আর্দ্র অবাক হয়ে বলে,,
__ কি করলে এটা?
নিধি কিছু না বলে একটা রাবার দিয়ে আর্দ্র মাঝখানের চুল গুলো একএিত করে জুটি পাকিয়ে দিলো, আর্দ্র হা হয়ে চেয়ে রইলো নিধির পানে, আর্দ্র কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিধি ফের নিজের কাজল খানা নিয়ে আর্দ্রের ডান সাইড কপালে বড় করে একটা কালো গোল টিপ একে দিলো,তারপর সুক্ষ্ম ভাবে আর্দ্রকে দেখে দুই হাত দিয়ে নজর কাটালো, আর্দ্র ছলছল নয়নে নিধি দিকে একবার ও আয়নার দিকে তাকাতে লাগল,নিধি এখানেই থামলো না এবার মাথায় আসলো আর এক বুদ্ধি,তখনি তড়িৎ বেগে টেবিল থেকে মোটা কাগজ নিয়ে কলম দিয়ে বড় বড় করে লিখলো,,

__ আমি বিবাহিত আমার বউয়ের নাম,নিধি,তাকে খুব ভালোবাসি,তাই দয়া করে আমার দিকে কেউ নজর দিবেন না।
এবার সেই কাগজটা গামের সহিত আর্দ্রের পিঠে লাগিয়ে দিলো, অতঃপর পা উঁচিয়ে আর্দ্রের কপাল,ও গালে চুমু দিয়ে বলে,,
__ এবার চলুন, এগিয়ে দিয়ে আসি,আর খবরদার এসব মুছবেন না বা খুলবেন না।
নিধি তাকে চুমু দিলো এসময় আর্দ্রের খুশিতে নাচার কথা ছিল, কিন্তু এখন তার নিজের এমন শোচনীয় অবস্থা দেখে কাঁদতে ইচ্ছে করছে,তাও নিধিকে বললো সে,,
__ এসব কি নিধি, এভাবে আমি অফিসে যাবো?
__ হ্যাঁ,বেশি সুন্দর লাগছিল আপনাকে তাই ছোট খাটো প্রোটেকশন আর কি? চিন্তা করবেন না,এর পর থেকে আরো ভালো করে প্রোটেকশন দিবো।
আর্দ্র হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পেলো না,নিধিকে সে কি বলবে তাও বুঝলো না, নিধি এবার আর্দ্রকে তাড়া দিয়ে ঘর নিয়ে গেল, ড্রয়িং রুমে উপস্থিত ছিল মুহিন ও পিকি আর্দ্রের এমন অবস্থা দেখে প্রথমে ভড়কে গেলেও এখন জোরে জোরে হাসছে তারা, আর্দ্র তাদের দিকে কটমট চোখে তাকাতেই হাঁসি থামালো তারা। নিধি আর্দ্রকে নিয়ে গ্যারেজের দিকে চলতে লাগলো, পিছন থেকে মুহিন জোরে জোরে গাইতে লাগলো,,,

__ ছলছল নয়নে হাঁসি মাথা বদনে
ছলছল নয়নে হাঁসি মাথা বদনে
আনন্দ কাননে মন,
আনন্দ কাননে মন
আবার একে অপরের গায়ে ঢলাঢলি করে হাসতে লাগলো মুহিন ও পিকি।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৭

আর্দ্র ভোঁতা মুখ করে গ্যারেজ থেকে বাইক বের করলো, বাইকে বসে আর্দ্র ছলছল নয়নে নিধির পানে তাকালো,নিধি ফ্লাই কিস দিয়ে আর্দ্রকে বাই জানালো, আর্দ্র অসহায় ভেবলা মুখ করে বাইক স্টাট দিয়ে চললো, ভাবতে লাগলো মানুষ তাকে দেখে কি কি ভাবছে,কি কি বলছে? রাস্তার অনেক মানুষজন আর্দ্রকে দেখছে,তা দেখে আর্দ্র বাইকের গতি বাড়িয়ে দিয়ে চললো।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৯