তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ১৫
জান্নাতি আক্তার জারা
আইরা দু’হাতে দুইটা টিফিন বাটি নিয়ে তালুকদার বাড়িতে প্রবেশ করে সোজা কিচেন রুমে গিয়ে একটা বাটি আদিবা তালুকদার কে দিয়ে আরেকটা বাটি সুন্দর করে ফ্রিজে রেখে দিলো। আনাস আফিস থেকে বাড়িতে ফিরলে পায়েসের সূচনায় আইরা আনাস সের সঙ্গে কথা বলবে। বাটি-তা ফ্রিজে রেখে একটা বড়ো করে নিঃশ্বাস নিয়ে আদিবা তালুকদারের উদ্দেশ্য বলে,
“মামনী আরাত কই ?
আদিবা তালুকদার আইরা দেওয়া পায়েস ছোট্ট ছোট্ট বাটিতে রাখতে রাখতে মুচকি হেঁসে উওর করলেন,
” তোমার বোন এক জায়গায় থাকার মেয়ে নাকি হুম। এতদিন রশ্মি কে জ্বালাতো এখন মেয়েটা নেই, তাই মেয়ের মাকে জ্বালাতে গিয়েছে।
“মামনী আমিও রশ্মি দের বাড়িতে গেলাম, তোমার ছেলে আসলে আমাকে ডাক দিও কেমন!
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
কথাটা বলে আইরা রশ্মি দের বাড়িতে চলে গেলো, আদিবা তালুকদার আইরা চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বাটি গুলো ঢেকে রেখে নিজের সঙ্গে একটা বাটি নিয়ে নিজের রুমে চলে গেলেন, আইরা হাতের পায়েস অনেক মজা হয়। আইরা পায়েস রান্না করে নিয়ে এলে আদিবা তালুকদার মিস করেন না কখনো। আনাস ও মায়ের মতো পায়েস পচ্ছন্দ করে। কথাটা যখন আইরা প্রথম জানতে পেড়েছিলো আনাস সের পায়েস খুব পছন্দ। আইরা কথাটা জানতে পেয়ে সেই প্রথম বার ইউটুব দেখে একা একা পায়েস রান্না করছিলো। পায়েস টা ডেকোরেশন সুন্দর ছিলো। শুধু চিনির জায়গায় লবণ দেওয়ার কারণে মুখে দেওয়ার মতো ছিলো না এই যা। কোনটা লবণের ডিব্বা কোনটা চিনির ডিব্বা এটা জানতো না। জানবে কী করে যে মেয়ে কোনোদিন আগুনের ধারেকাচেও যায়নাই, মাঝেমধ্যে টুকিটাকি আনহা শেখের সঙ্গে রান্নায় হেল্প করছে, তাও শাকসবজি কাটাকাটি এতটুকু মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। শুধুমাএ আনাস সের পায়েস পছন্দ বলে ইউটুব দেখে রান্না করছিলো। রান্না শেষ করে নিজের বাবা’কে প্রথম টেস্ট করতে দিয়েছিলো।আতিফ শেখ পায়েস টা মুখে তুলতেই ভিতর থেকে সব গুলিয়ে আসতে লাগছিলো, তারপর তিনি মেয়ের হাতে প্রথম রান্না নষ্ট করে নাই। বাটির পুরোটা খেয়ে শেষ করছেন। আতিফ শেখ মেয়ে কে কাছে ডেকে নিজের পাশে বসে বলছিলো,
” মাশাল্লাহ আম্মু তোমার হাতের রান্না তো খুব সুন্দর….
আতিফ শেখের পুরো কথা শেষ করার আগেই আইরা চোখমুখে হাসি টেনে বলে উঠছিলো,
“ধন্যবাদ আব্বু, একদম আম্মু হাতের রান্না মতো খুব সুস্বাদু হইছে তাইনা ?
” পায়েস ডেকোরেশন টা তোমার আম্মুর চেয়ারার মতো হইলেও। মজা তোমার আম্মুর রাগটা চিনির জায়গায় লবণ যেমন সুস্বাদু, মানে দেখতে সুন্দর রাগটা রগচটা
আইরা বাবা-র কথায় অবাক হয়ে বাটি থেকে এক চামুচ পায়েস মুখে তুলতেই, মুখে হাত চেপে কিচেন রুমে দিকে দৌড়ে চলে গেলো, আতিফ শেখ মেয়ের কান্ড দেখে শব্দ করে হেসে উঠলেন, আইরা দু-তিনমিনিট পড়ে কিচেন রুম থেকে বের হয়ে আতিফ শেখের উদ্দেশ্য বলছিলো,
“আব্বু তুমি এই সুস্বাদু হজম করো কিভাবে?
” অভ্যাস হয়ে গিয়েছে আম্মু।
আতিফ শেখ হাসতে হাসতে বললেন, আরাত বাবার কথায় হেঁসে দিয়েছিলো,তারপর আইরা আনহা শেখের কাছে অনেক বাহানা ধরে শিখে নিয়েছিলো। পায়েস রান্না শিখতে মা’য়ের কতশত বকা শুনতে হয়েছে এগুলো ভাবতে ভাবতে হাসি মুখে আইরা রশ্মি দের বাড়িতে চলে এলো।
“কী-রে বিচ্ছু-বাহিনি কি করছিস তোরা?
আইরা কথায় ড্রয়িং রুমের মেঝেতে বসে লুডু খেলা আবস্থাতে আহিন আলভী আরাত তিনজন পিছনে তাকালো, আলভী আরাত কে জায়গায় করে দিতে দিতে বলল,
” ও আইরা আপু বসো বসো, আমরা লুডু খেলতেছি,
আইরা বসতে বসতে বলল,
“নতুন করে খেলা শুরু কর, আমিও খেলবো।
না আপু আর মাএ ছয়-সাত মিনিট ওয়েট করো প্লিজ, দেখো আমি জিতে গিয়েছি,
আরাত নতুন করে খেলতে নারাজ, আহিন আর আরাতের মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি চলছে, দুজনের একটা করে গুটি রয়েছে, আলভী কে তো আরাত অনেক আগে বুঝিয়ে সুঝিয়ে গুঁতি গুলো খেয়ে নিয়েছে। রানিং চাল নিয়ে চারবার খেলা হয়ে গেছে।তিনবারের মধ্যে আরাত একবার জিতছে আর বাকি দুইবার আহিন জিতছে। এটাই শেষ খেলা। আরাত আহিন দুজন লুডু খেলতাছে আলভী ওদের দুজনের খেলা দেখছে। আইরা বসা থেকে উঠে পুরো রুমটা দেখতে লাগলো, হটাৎ আলভী আরাতের উদ্দেশ্য বলে,
” আচ্ছা মায়াবতী, তোমার কী বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে?
আরাত গুঁতি চাল দিতে দিতে,
” হটাৎ এই কথা কেনো?
“না তোমার সঙ্গে বৃষ্টিবিলাস করতাম এজন্য!
আলভী কথায় আরাত রাগী লুকে তাকিয়ে হাত দিয়ে ইশায়া করে বলে,
” এক্কেরে এক থাপ্পড়ে তোর মাথা থেকে আমার ভূত ছাড়া’বো! কতবড় সাহস আমার ভূত তোর মাথা টা কেমন করে চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলছে। আমার ভূত তোর মাথা খাবে কেন?
আরাতের কথায় আইরা আহিন বিরক্তি হইলো, আর আলভী অবুঝের মতো দুই হাত দিয়ে মাথা বুলিয়ে বলল,
“কই কই আমি তো দেখতে পারছি না তোমার ভূত কই?
আহিন বিরক্ত হয়ে একবার রাহিমা সুলতানা এদিকে আরছে কিনা দেখে নিয়ে বলল,
” খোদার কসম করে বলছি আলভী, তুই যদি বর্তমান তালুকদার বাড়িতে থাকতিস তাহলে আমার হাতের কয়টা থাপ্পড় তোর গালে নাচানাচি করতো। এ এমন গাদা কেনো আইরা আপু?
আহিন আলভী কে কথাটা বলে আইরার দিকে তাকালো,আরাত তো চুপিচুপি দুষ্টু হাসতে’ছে আহিনের কথা আইরা একি সুরে বলল,
“আরে বাদ দে তো ওদের কথা, তুই তোর খেলার দিকে ফোকাস কর, আরাত কে চিনিস না তোর মনোযোগ নষ্ট করার জন্য আজেবাজে বকছে।
আইরা কথায় আরাতের হাসি মুখটা আরো গভীর দেখা গেলো। আহিন খেলার দিকে মনোযোগ নিতেই দেখে আরাতের গুঁতি লুডুর পাকা ঘরে, আর আহিনের টা আহিরের কাঁচা ঘরে থেকে কিছুটা সামনে এগুছে, আহিনের কেনো যেনো সন্দেহ হইতাছে ওর গুঁতি ওনেক আগের দিকে ছিলো আর আরাতের গুঁতি পাকা ঘর থেকে বাহিরে ছিলো। আহিন আরাতের দিকে তাকিয়ে মুখ ভুলিয়ে বলল,
” আপু তুমি চিটিং করছো?
আরাত অবাকের ন্যায়,
“কবে কখন কিভাবে?
আহিন মুখ ভুলিয়ে বলল,
“এই মাএ আমি তোমার গুঁতি বাহিরে দেখেছি, এত তাড়াতাড়ি পাকা ঘরে কিভাবে যাবে?
” কোথায় দেখেছিস?
“এটা মনে নেই! তবে আমার গুঁতি তুমি পিছে দিকে দিয়েছো।
” দেখ ভাই, তুই তোর গুঁতি কোন ঘরে ছিলো এটাই যানিস না তুই কিভাবে পারোস আমার গুঁতির উপর মিথ্যাচার করতে?
“তুমি একদম ফাপর দিবে না, আমি তোমার গুঁতি কে মিথ্যা বলছি না, তোমাকে বলছি।
আইরা দুজনের কথা কাটাকাটি’ দেখে বিরক্তি মুখে একটু রাগ নিয়ে বলে,
“এই চুপ করবি তোরা, আরাত তুই মিথ্যা বলছিস কেনো?
“আরে আপু ওদের সঙ্গে মিথ্যা বললে, পাপ পূর্নি কিছুই হবে না।
আরাতের কথায় আহিন গাল ফুলিয়ে লুডুর গুঁতি গুলো এলোমেলো করতে করতে, আলভী দিকে তাকিয়ে রাগী গলায় বলল,
” তোর জন্য হইছে সব, হুদাই এক সময় এক গাধার মতো একটা কথা বলে, তুই তোর মায়াবতী কে জিতাতে চাইছিলিস তাই না। দাঁড়া আন্টির কাছে তোর নামে বিচার দিবো।
কথাটা বলে আহিন মেঝে থেকে উঠতে যাবে, আহিনের হাত টেনে ধরে আরাত পুনরায় মেঝেতে বসাতে বসাতে বলল,
“তুই তো দেখি সিরিয়াসলি রেগে গেয়েছিস,যা আমি দুধভাত তুই জিতছিস বস আন্টিকে বিচার দিতে হবে না, বস।
আহিন গাল ফুলিয়ে বসে পরলো আলভী আগের কথা নিয়ে পুনরায় আরাত কে বলল,
” বলো না মায়াবতী তোমার বৃষ্টি তে ভিজতে ভালো লাগে?
“হ্যাঁ লাগে তো, এখন কী করবি?
আরাতের কথায় আইরা দুষ্টু হেসে বলে,
“হ্যাঁ তোর মায়াবতীর বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে। আর আমার ভালো লাগে, তোর মায়াবতীর বিদ্যুৎ চমকানো দেখে ভয় পেয়ে বাড়ির ভিতরে দৌড় দিতে, দেখতে ভালো লাগে।
আইরা কথায় আলভী আবাকের ন্যায় বলল,
“মায়াবতী তুমি বিদ্যুৎ চমকানো দেখে ভয় পাও! তুমি তো একদম ভীতু ডিম।
আরাত আলভী কথায় মুখ বাকিয়ে আলভী কে বলল,
“ও তাই বুঝি তো,কে জানি ভূতে ভয় পায়?
আরাতের কথায় আলভী কাচুমাচু করছে, আলভী রিয়েকশন দেখে তিনজন এক সঙ্গে হেসে উঠলো, এভাবে হাসিমজা মধ্যে দিয়ে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত হয়ে গেলো, যেমন সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না তেমনই মানুষও মানুষের অনুপস্থিতি মনে রাখে না, আজকে আমি মা-রা গেলে হয়তো সবার এক সপ্তাহ মনে রাখবে আমাকে, আমার জন্য তাদের মন খারাপ হবে, এর বেশি কিছু না। হ্যাঁ মনে রাখবে আমার অতি আপন জন, আমার অনুপস্থিতিতে তাকে পুরাবে, দিন শেষে তারাও আমাকে সেভাবে মনে রাখবে না। এইতো রশ্মি কানাডা যাওয়া দেখতে দেখতে প্রায় মাস হতে চললো। অথচ রশ্মির অনুপস্থিত কারো মনে সাড়া দিচ্ছে না, হয়তো প্রথম প্রথম সবার আড্ডা দিতে গিয়ে মন খারাপ লাগছে। কিন্তু এখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রশ্মির অনুপস্থিত অভ্যাসে পরিনতি হচ্ছে। হ্যাঁ রশ্মিরাতের নিত্যদিন কথা হয়, দুজনের পুরো দিন কিভাবে কাটালো কার সঙ্গে কাটলো সবকিছু দুজন দুজনের সঙ্গে শেয়ার করে। তবে আগের মতো আর রশ্মির অনুপস্থিত প্রভাব ফেলে না আরাতের উপর, এটাই হয়তো বাস্তপনা ভেবে কাটিয়ে উঠছে। এভাবেই চলছে তাদের হাসিখুশি জীবন।
আনাস আর তাকবীর রাতের খাবার খেয়ে দু’ভাই একসঙ্গে নিজেদের রুমে যেতে যেতে আনাস তাকবীর কে বলে উঠলো,
“ভাইয়া কালকে দুপুরে আশিক হাবিব আসবে!
” হোয়াট ফর? ( কিসের জন্য )
তাকবীরের কথায় আনাস মুচকি হাসলো,বন্ধুবান্ধব বাড়িতে আসার জন্য কী কোনো কারণ লাগে, তাদের মন চাইবে আসবে। হ্যাঁ আর চারটা ফ্রেন্ড সার্কেলের মতো আশিক হাবিব দের ইচ্ছা হইলেই চলে আসে তালুকদার বাড়িতে। বন্ধুবান্ধব বাড়িতে ঘুরতে আসবে স্বাভাবিক বিষয়। তবে আজকে কথা টা বলার একটা কারণ ছিলো আনাস সের। আনাস মুচকি হেসে তাকবীর কে পুনরায় বলল,
“ভাইয়া হাবিবের সঙ্গে হানিয়া আসবে!
” তো?
” বড়মা হানিয়া কে দুপুরে ডিনার জন্য ইনভাইট করেছে,আর আমাদের’কে দুপুরে খাবার বাসায় এসে খেতে বলছে।
তাকবীর আনাস সের কথায় উত্তর না করে নিজের রুমের দিকে চলে গেলো, আনাস তাকবীরের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে নিজের রুমে এলো, দরজা আধা খুলা রেখে রুমের লাইট’টা জ্বালিয়ে দিয়ে বিছানায় বসলো। কিছুক্ষণ ফোনটা নিয়ে ফেসবুকে স্কল করে, বিছানায় থেকে ওঠে এসে দরজা লাগাতে যাবে ঠিক তখনই পায়েসের বাটি হাতে নিয়ে আইরা হাজির। আনাস আইরা কে এক পলক দেখে বিরক্তি ফুটে উঠলো পুরো মুখময়।
আইরা আনাস সের বাড়িতে ফিরে আসার অপেক্ষা করতে করতে আরাতের রুমে ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। আরাত আজকে কলেজে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো ফোনে রশ্মিকে বলছিলো,কথা বলতে বলতে নিজের রুম বরাবর সিড়ি হওয়ার তাকবীর আর আনাসের কন্ঠ শুনতে পেয়ে। তাড়াহুড়ায় আইরা কে ঘুম থেকে ডেকে দেয়। আইরা কাঁচা ঘুম থেকে ওঠে আনাস বাড়িতে ফিরার খবর শুনে দৌড়ে ওয়াশরুমে গিয়ে কোনোমত মুখমন্ডলে একটু পানির ছিটানি দিয়ে, দৌড়ে নিচে নিমে এসে এসে দেখে। পুরো ড্রয়িং রুম অন্ধকারের ঘেরা। হয়তো বা দুইতিন মিনিট আগে মামনিরা ড্রয়িং রুমের লাইট বন্ধ করে নিজেদের ঘরে গিয়েছেন, তবে দুতলা রুমগুলোর দরজা খুলা থাকায় ড্রয়িং রুমে আধো আধো রোশনী দেখা যাচ্ছে। আইরা অন্ধকারের মধ্যে ফ্রিজ খুলে পায়েসের বাটি নিয়ে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই আনাস কে রুমের দরজা লক করতে দেখে, এক দৌড়ে আনাস সের রুমে সামনে এসে দাড়ালো। আনাস বিরক্তি মুখ করে একবার এলোমেলো আইরা কে দেখে নিয়ে বলল,
” কী চাই?
আইরা পায়েস সের বাটি টা ইশারায় আনাস কে দেখিয়ে বলে,
“পায়েস!
” মানে?
“মানে আজকে আমি তোমার পছন্দের পায়েস রান্না করেছি।
” এতো রাতে আমার রুমে কেনো?
” উফফ আনাস ভাই বললাম তো পায়েস দিতে আরছি।
আইরা কথায় আনাস দাঁতে দাঁত চেপে বিরক্তি নিয়ে বলে,
” এতো কষ্ট করে আপনাকে আনাস ভাই বলতে হবে না, আপনি বরং আনাস বলে ডাক দিয়েন।
“ওকে।
আনাস সের বিরক্তি রেশ যেন বেড়ে গেলো, অন্য দিকে তাকিয়ে বিরবির করল,
” ইডিয়েট একটা ম্যানাজ টুকু নেই বড়ো ভাইকে নাম ধরে ডাকে।
আইরা আনাস সের কথা শুনতে পেয়ে আনাস কে পাশ কেটে রুমের ভিতর ঢুকতে ঢুকতে মুখে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
“আপনি আমার কাজিন ভাই লাগেন মায়ের পেটের ভাই না।
” তুই এতো রাতে আমার রুমের ভিতরে ঢুকেছিস কেনো?
“আপনাকে কলঙ্ক করতে।
” জাস্ট সেটআপ স্টুপিড!
“আইরা মুখ ফুলিয়ে পায়েসের বাটি টা আনাস কে দিতে দিতে ___আপনার পায়েস।
আনাস আইরা কে একবার দেখে নিয়ে আইরা হাত থেকে বাটি টা নিয়ে নিলো। এদিকে আরাত রশ্মি ফোন কেটে দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আনাস সের রুমের দরজায় কোমরটা বাঁকা করে রুমের ভিতরে উঁকি দিচ্ছে। আনাস আইরা কে এতো রাতে নিজের রুমে দেখে কেমন রিয়েকশন করে,এটা দেখার জন্য। উঁকি দেওয়ার মধ্যেই কারো পায়ের শব্দ পেয়ে সোজা হয়ে সামনে তাকালো। আরাত সামনে তাকাতেই আনাস সের রুমের দরজার আরেকপাশে তাকবীর কে হাতে হাত ভাজ করে। দেওয়ালে সঙ্গে হেলান দিয়ে ভ্রু কুঁচকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হকচকিয়ে গেলো । আরাত সঙ্গে সঙ্গে অন্য দিকে তাকিয়ে কাচুমাচু করতে লাগলো।
তাকবীর আরাতের কাচুমাচু করা মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আরাত নিজের দিকে তাকবীর কে তাকিয়ে থাকতে দেখে তাড়াহুড়ায় নিজের রুমের যাওয়ার উদ্দেশ্য পিছন ঘুরতেই দেওয়ালের সঙ্গে খাইলো এক ধাক্কা। ব্যথা পেয়ে কপালে হাত রেখে পিছন ঘুরে তাকবীরের দিকে তাকালো। তাকবীর কে আগের ন্যায় তাকিয়ে থাকতে দেখে লজ্জায় নিজের রুমে দৌড়ে চলে গেলো। আরাত কে লজ্জা পেয়ে দৌড়ে চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই এক চিমটি হাসি খেলে গেলো তাকবীরের মুখে। তাকবীর আনাস সের রুমে দিকে একবার তাকিয়ে পুনরায় নিজের রুমের দিকে চলে গেলো।
আনাস আইরা কে তাড়া দিতে লাগলো নিজের রুমে যাওয়ার জন্য। রাত সাড়ে এগারো’টার লাগাত একটা প্রাপ্ত যুবকের ঘরে একটা প্রাপ্ত যুবতী ব্যাপার টা সমাজের চোখে কলঙ্কের। আনাস চায়না নিজের সঙ্গে আইরা নাম টা জড়াতে, আনাস বিরক্তি হয়ে আইরা বলল,
” তোর পায়েস দেওয়া শেষ! এখন আমার রুম থেকে বিদায় হ।
আইরা আনাস সের কথা পাওা না দিয়ে পুনরায় বলে উঠলো,
” আরেকটা কথা ছিলো।
আনাস যেন রেগে গেলো এবার, রেগে গিয়ে আইরা হাত চেপে ধরে রুমের বাহিরে বের করতে করতে রাগী গলায়,
” ফাজলামো করছিস আমার সঙ্গে , আমি তোকে কখনো আমার জন্য পায়েস রান্না করে আনতে বলছিলাম হ্যাঁ?
আইরা আনাস সের হটাৎ রেগে যাওয়াও ভয় পেলো, চোখ দুটো নিমেষেই পানিতে ভরে উঠলো, আনাস আইরা চোখের পানি দেখে যেনো রাগটা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো, আইরা চোখ ভরা পানি নিয়ে ভয় ভয় নয়নে আনাস সের দিকে তাকিয়ে নরম সুরে আনাস কে ডাকলো,
” আনাস ভাই?
আনাস আইরা’কে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে রুম থেকে বের করে দিয়ে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলো, আইরা টলমলে চোখের পানি গাল বেয়ে পড়লো। আইরা নিজেকে সামলে নিয়ে নিজের রুমে যেতে যেতে মলিন মুখে বিরবির করলো,
” মিলিয়ে নিয়েন! একদিন আমার থেকে
ভালোবাসা পাওয়ার তীব্র লোভ
আপনার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটাবে!
সকাল ৪:৪৫ মিনিট, আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার আফিসের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেছেন অনেক আগেই, আইরা খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে নামাজ আদায় করে রাবেয়া কে বলে নিজেদের বাড়িতে চলে গেছে। তাকবীর খাবার শেষ করে ডাইনিং টেবিল থেকে উঠে এসে ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে একবার সিড়ির দিকে তাকালো, ঠিক সেসময় রাবেয়া তালুকদার তাকবীর কে ডাকলেন, তাকবীর মায়ের ডাকে সিড়ি থেকে চোখ নামিয়ে রাবেয়া তালুকদারের দিকে প্রশ্নবোধক চাউনি নিয়ে তাকালো,
“তাকাবী আজকে দুপুরের ডিনার বাড়িতে এসে করবে, আজকে হানিয়া কে ইনভাইট করেছি!
” চেষ্টা করবো!
তাকবীর মায়ের কথায় উওর করে আরেকবার সিড়ির দিকে নজর বুলিয়ে নিয়ে চলল নিজ গন্তব্য। তাকবীরের যাওয়ার দিকে রাবেয়া তালুকদার শুধু তাকিয়ে থাকলেন। তাকবীর বাড়ি থেকে বের হওয়ার দুই মিনিট পড়ে নিচে নামলো আরাত। আরাত নিজের ঘরে বসে তাকবীরের বাড়ি থেকে বের হওয়ার অপেক্ষায় ছিলো। গতকাল রাতে’র ব্যাপারটা’য় লজ্জায় তাকবীরের সামনে পড়তে চায় না আরাত। এজন্য এতক্ষণ নিজের ঘরে ঘাপটি মেরে বসে ছিলো। অবশ্য দুজনের খুব একটা দেখাও হয় না। শুধু আরাত কেনো তাকবীরের সঙ্গে পুরো কাজিনমহলের খুব একটা কথা হয় না।
আরাত নিচে নেমে এসে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে আনাস সের পাশে বসতে বসতে আবদার করে বলে।
” ভাইয়া আরিশা আপুর বিয়ে তে গায়ে হলুদ, মেহেদী এগুলো চাই কিন্তু?
আনাস বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে না সূচক মাথা নাড়িয়ে বলল,
“বাবা বড়আব্বু এগুলো পছন্দ করবে না, আর কী সব গায়ে হলুদ মেহেদি। এত টাকা খরচ করার তো প্রয়োজন দেখছি না!
আরাত মুখ বাকিয়ে আনাস সের কথায় উত্তর করলো,
” ভাইয়া তুমি এত কিপ্টামি করো কেনো সবসময়? সামান্য গায়ে হলুদ আর মেহেদি জন্য কত টাকা আর খরচ হবে হ্যাঁ?
“যত টাকা খরচ হবে ওই টাকা দিয়ে তোর ভবিষ্যৎ হাসবেন্ড কে একটা বাইক গিফট করা যাবে।
আরাত ভাইয়ের কথায় মুখ বাকিয়ে বলল,
আমার হাসবেন্ড তোমার মতো এত কিপ্পন হবে না দেইখো। শশুর বাড়ি থেকে শুরু এই রাজকন্যা কে উঠিয়ে নিবে।
আনাস আরাতের কথায় দুষ্টু হেঁসে আরাত কে রাগাতে বলল,
” কে কে কে রাজকন্যা?
আরাত নিজের মুখে হাত রেখে একটু নাটকীয় ভঙ্গীমায় বলল,
“এই তো, তালুকদার বাড়ির একমাত্র রাজকন্যা।
” কই আমি তো দেখতে পারছি না, আমি তো শুনছিলাম তালুকদার বাড়িতে আরিবা তালুকদার আরাত নামে একটা পেত্নী ছিলো।
” সামান্য পূজা হয়ে এই মহল্লার রাজকন্যা কে ডেকবে কিভাবে, এই যোগ্যতা তোমার আছে?
আনাস এবার বোনের কথায় শব্দ করে হেঁসে বলল,
“আজ যদি যোগ্যতা থাকতো তাহলে তোর মতো পেত্নীকে সহ্য করতে হতো না আর,
আরাত আনাসের কথার সঙ্গে না পেয়ে আদিবা তালুকদার কে ডেকে বললো ,
মা?মা? আমার খাবার কই, তাড়াতাড়ি দেও তো, আমার খিদা লাগছে। যেভাবে দিনকে দিন স্বর্ণের দাম বেড়ে যাচ্ছে মনে তো হয় না তোমার কিপ্পন ছেলের বিয়ে এ’জীবনে আর খেতে পারবো। তুমি বরং আমাকে ভাত দেও। ভাত খেয়ে বিয়ের ফিল নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
” আমার বিয়ে নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না, মা-র স্বর্ণ গুলো আমার বউ কে দিয়ে দেবে। তুই তোর বেচারা ভবিষ্যৎ হাসবেন্ড কে নিয়ে ভাব।
“বেচারা বললে কেনো?
” কারণ তোর মতো এক তারছিড়া কে বিয়ে করবে তাই।
আনাস সের কথায় আরাত মুখ বাকিয়ে বলল,
“প্রথমত তোমার এই কথার জন্য আজকে থেকে মা’র সব স্বর্ণ তোমার ভবিষ্যৎ বউয়ের থেকে আমার হয়ে গেলো। আর দ্বিতীয়ত আমার হাসবেন্ড খুব ভাগ্যবান এটা কিন্তু তোমাকে মানতেই হবে। তুমিই দেখো, আমার মতো এত কিউট গুণবতী মেয়ে তার ঘরের আলো হয়ে যাবে __শুধু একবার ইমাজিন করো ব্যাপারটা!
“দেখ বনু এক নিঃশ্বাসে অনেক বকে ফেলছিস,সবগুলো আমার মাথার উপর দিয়ে গেলো, অতএব চুপ যা।
আরাত হাত পা নেড়ে নেড়ে কথা গুলো বলছিলো, আরাতের কথার মধ্যে আনাস কে বলতে দেখে আরাত মুখ বাকিয়ে নিজেই কিচেন রুমে দিকে যেতে লাগলো, আনাস স্বাভাবিকভাবে আরাত কে পিছন ডেকে বলে,
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ১৪
” বনু তুই তাকবীর ভাইয়া কে ম্যানেজ করতে পারলে তোর প্রবলেম সলভ হয়ে যাবে!
আরাত তাকবীর নামটা শুনতেই দাড়িয়ে পারলো, পিছন ঘুরে ভাইকে একবার দেখে নিয়ে পুনরায় কিচেন রুমে দিকে যেতে যেতে বলল,
“তাহলে মনে করতে হবে গায়ে হলুদ আর মেহেদি আর হচ্ছে না আমি সিওর! দুরু চৌদ্দগুষ্টির মধ্যে প্রথম বার একটা বিয়ে চোখে দেখতাছি, তাও পানসে দেথথ ভালো লাগে না আর।
আরাত একা একা বকতে বকতে কিচেন রুমে চলে গেলো, আরাতের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আনাস মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
“তার কাছে তোর হাজারো আবদার কবুল , সেই আবদারে যতই থাকুক না তার হতাশা।
ওই আঙ্কেল আমার শশুর বাড়িটা কোন দিকে গো?
