Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২১

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২১

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২১
আরোবা চৌধুরী আরু

সবাই যে যার রুমে চলে গেছে। রাত গভীর হয়ে এলে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে পড়লো।
রুশনার রুমে দেখা গেলো, আরিব ওর কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। মিষ্টি ঘুমিয়ে পড়েছে, রুশনা ছোট ভাইয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে আরিব আস্তে বলল,
— “আপি, আমার ওই মেয়েটা অনেক পছন্দ হয়েছে।”
রুশনা ভ্রু কুঁচকে তাকালো,

— “কি? বড় বোনের সামনে সরাসরি বলছিস একটা মেয়েকে পছন্দ হয়েছে! লজ্জা-শরম কিছু নাই?”
বলে মজা করে চুলগুলো টেনে দিল।
আরিব লাজুকভাবে হেসে গাল লাল করে ফেলল।
রুশনা এবার ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “বল তো, কে মেয়েটা?”
আরিব কুণ্ঠাভরা কণ্ঠে বলল,
— “ওই যে নাফিসা নামে যে মেয়েটা… ওকে আমার অনেক ভালো লেগেছে।”
তার গাল দুটো এবার আরও লাল হয়ে উঠলো।
রুশনা চোখ ছোট ছোট করে ওর দিকে তাকালো। তারপর হঠাৎ হেসে দিলো।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

— “যাক, এতদিন ভেবেছিলাম তোর রুচি একদমই খারাপ। আজ বুঝলাম, তুই হীরা চিনতে জানিস! আমিও ওকে পছন্দ করি।”
আরিব উঠে বসে আগ্রহ ভরে রুশনার হাত ধরে বলল,
— “আপি, প্লিজ যেভাবেই হোক ওই মেয়েটাকে আমার চাই।”
রুশনা হেসে বলল,
— “যেন ও জিনিস, চাই বললেই দিয়ে দিব। ”
— “আপি, প্লিজ প্লিজ! আমি মজা করছি না। আমি সিরিয়াস। ওই মেয়েটাকে পেতে হলে যা যা করতে হবে আমি রাজি। প্লিজ আপি…”
রুশনা এবার একটু গম্ভীর হল।

— “দেখা যাবে।”
— “আপি না! দেখা যাবে না, তুমি প্রমিস করো। যেভাবেই হোক ওই মেয়েটাকে আমার করে দিবে।”
রুশনা ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
— “শোন, মেয়েটা অনেক কিছু সহ্য করেছে। ওর ব্যাপারে যতটুকু শুনেছি, বুঝেছি ওকে সামলানো সহজ না। আর তুই এখন অনেক ছোট। এসব ভাবার জন্য অনেক সময় পড়ে আছে। আপাতত নিজের ক্যারিয়ারের দিকে মন দে।”
আরিব ভীষণ অনুরোধের ভঙ্গিতে বলল,
— “আপি, আমি সব করব। তুমি যা বলবে তাই করব। ক্যারিয়ারেও ফোকাস করব, কিন্তু ওই মেয়েটাকে আমার জন্য রাখো। প্লিজ আপি…”
রুশনা ছোট ভাইয়ের মাথায় স্নেহভরে হাত বুলিয়ে দিলো।
— “আমার ভাইয়ের জন্য এটুকু তো করতেই পারি। হ্যাঁ, কথা দিচ্ছি। সময় হলে ওকে তোর সঙ্গে বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করব।”
খুশিতে আরিব বড় বোনকে জড়িয়ে ধরল।

সারাদিনের ভ্যাপসা গরমে যেন চারপাশ ভারী হয়ে ছিল। বাতাস যেন আটকে ছিল, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, গাছপালা পর্যন্ত হাঁপিয়ে উঠেছিল। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে আবহাওয়ার ভেতর হালকা বদল আসতে শুরু করল। দূর আকাশে সোনালি-লাল আভা মিশে গিয়ে আস্তে আস্তে ঠান্ডা হাওয়া বইতে লাগল। সেই হাওয়া শরীরে লাগতেই যেন সারাদিনের ক্লান্তি খানিকটা মিলিয়ে গেল।
বাড়ির আশেপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু শিমুলগাছের পাতা দুলে দুলে সাঁই সাঁই শব্দ করছে। মাঝে মাঝে কোথাও একটা দমকা বাতাস এসে পর্দা উড়িয়ে দিচ্ছে, আর গায়ের ওপর ঠান্ডা শিহরণ বইয়ে যাচ্ছে।
এমন শান্ত আবহাওয়ার মাঝেই হঠাৎ আকাশ ভারী হতে শুরু করল। মেঘ জমে কালো হয়ে এলো চারদিক। মুহূর্তেই বিদ্যুতের ঝলকানি আকাশকে আলোকিত করে দিল। আর তার পরপরই নামল ঝুম বৃষ্টি।
বৃষ্টির শব্দে যেন চারপাশ ভরে গেল— টুপটাপ শব্দ, গাছের পাতায় ঝিরঝির আঘাত, পুকুরের জলে গোল গোল ঢেউ ছড়িয়ে পড়া—সব মিলে এক অপূর্ব সুরেলা শব্দে ভরে উঠলো রাত।

বাতাসে মাটির সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল, সেই গন্ধের সাথে ভিজে মাটির ঠান্ডা স্পর্শ যেন মনকেও ভিজিয়ে দিল। সারাদিনের গরমে ঘর যেন অগ্নিকুণ্ডের মতো ছিল, কিন্তু এই বৃষ্টির পর একেবারে শীতল, আরামদায়ক হয়ে গেল।
চারপাশে এখন কেবল বৃষ্টির শব্দ, বাতাসের দোলা আর মাটির মিষ্টি গন্ধ। দূরে কোনো কোনো গাছের ডালে ভিজে পাখি ডাকছে মৃদু স্বরে।
এই রাতটা যেন পুরো বাড়িকে নতুন করে সাজিয়ে দিল—ক্লান্তি, গরম, অস্বস্তি সব ধুয়ে নিয়ে গিয়ে এনে দিল এক ঠান্ডা প্রশান্তি।
নাফিসার ঘুম ভেঙে গেল। উঠে বসে পাশে তাকাতেই দেখল রাহিল আর রুহি দু’জনেই ঘুমে বিভোর। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব,
নীরবে উঠে দাঁড়িয়ে আলতো করে ওদের গায়ে কাঁথা চাপিয়ে দিল। ছোট্ট রাহিলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো স্নেহভরে।

তারপর ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে জানালাগুলো বন্ধ করল। বাইরে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, বাতাসের সাথে গায়ের গন্ধ মিশে আসছে ঘরে।
সবকিছু ঠিক করে নাফিসা আস্তে করে দরজা খুলে বাইরে বের হলো। করিডরে হালকা আলো জ্বলছে, চারপাশে নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও বৃষ্টির শব্দ, গাছের পাতায় বৃষ্টির টুপটাপ আঘাত, আর মাঝে মাঝে হালকা বাতাস বইছে।
হঠাৎ নাফিসার বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে হলো। কিছু না ভেবেই করিডোর পেরিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। একটুখানি আঘাতেই ছাদের দরজার তালা খুলে গেল। নীরব ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে উপরে উঠল সে। চারপাশ নিস্তব্ধ, কেবল বৃষ্টির শব্দ আর বাতাসের হাহাকার শোনা যাচ্ছে।
অন্যদিকে সায়মান নিজের ভেতরের বিরক্তি কিছুতেই সামলাতে পারছিল না। মনের অস্থিরতা দূর করতে ভাবল—আজই লং ড্রাইভে বের হবে, এই বৃষ্টির ভিতরেই । সেই সিদ্ধান্ত নিয়েই রুম থেকে বের হলো।
ঠিক তখনই চোখে পড়ল—নাফিসা দিকে এতো রাতে কোথায় যাচ্ছে ভাবতেই, ভ্রু কুঁচকে থেমে গেল ও । এক মুহূর্ত দ্বিধা করে তারপর নিঃশব্দে ওর পেছন পেছন গেল ।

চারপাশ নিস্তব্ধ। শুধু বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে রাতটা যেন এক অন্যরকম আবেশে ডুবে আছে। করিডোর পেরিয়ে নাফিসা আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে উঠল। চারপাশ অন্ধকার, কেবল ছাদের এক কোণে লাগানো বাতিটা বৃষ্টির পানিতে ঝাপসা হয়ে জ্বলছে—সেই আলোতেই ভিজে ভিজে উঠছে চারদিক।
দরজার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে গায়ে লাগতেই শিহরণ জাগল নাফিসার শরীরে। চোখ বন্ধ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো। সাদা-হলুদের মিশ্রণে পাতলা জামাটা ভিজে একেবারে শরীরের সাথে লেগে গেছে বৃষ্টি পানিতে । প্রতিটি নিঃশ্বাসে বুক ওঠানামা করছে—বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে গিয়ে সেই বুকে মিলিয়ে যাচ্ছে। মুখে, চোখে, ঠোঁটে বৃষ্টি জমে ঝরছে বারবার। যেন অদ্ভুত এক জন্মের মত দীপ্তি ছড়াচ্ছে ওর গায়ে।
ঠিক তখনই সায়মান ছাদের দরজায় এসে দাঁড়াল, ভ্রু কুঁচকে গেল।

সামনের ছাদের বাতিটা ভিজে ভিজে কাঁপছিল। চারপাশে শুধু বৃষ্টির শব্দ আলোতে দাঁড়ানো ভেজা নাফিসা—
সায়মানের বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন যেন ঝড় বইতে শুরু করল। ওর চোখে পড়তেই বুকের ভেতর দমকা হাওয়ার মতো কিছু আছড়ে পড়ল। মাথা উঁচু করে বৃষ্টিতে চোখ বন্ধ করে দাঁড়ানো নাফিসাকে দেখে মনে হচ্ছিল, এই বৃষ্টির রাতটা কেবল তাকে ঘিরেই সাজানো।

সে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। কাছে যেতেই নাফিসার কাঁধে তার গরম নিঃশ্বাস পড়ল। হঠাৎ চমকে উঠে নাফিসা পিছনে তাকাল। দু’জনের মুখ একেবারে কাছাকাছি—বৃষ্টির ফোঁটা দু’জনের গায়েই ঝরছে, নিঃশ্বাস মিশে যাচ্ছে একে অপরের সাথে। নাফিসার ভেতরে কাঁপা কাঁপা অনুভূতি জমতে লাগল। বুকটা যেন ধড়ফড় করতে লাগল অকারণে, বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গায়ে এসে পড়ছে, ঠান্ডা শিহরণ জাগছে।
এক মুহূর্তে সায়মান হাত বাড়িয়ে নাফিসার কোমর টেনে নিল নিজের কাছে। ভেজা শরীর জড়িয়ে ধরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওর গোলাপি ঠোঁটের দিকে। পানিতে ভিজে ঠোঁটটা যেন আরও উজ্জ্বল, আরও লোভনীয়। সায়মান কাঁপা আঙুল বাড়িয়ে ঠোঁটে ছুঁয়ে দিল।

নাফিসা অবাক হয়ে গেল, প্রতিরোধ করার মতো শক্তি খুঁজে পেল না । শুধু অনুভব করলো, বৃষ্টির ফোঁটায় ভেজা ওর ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে আছে সায়মান ।
বিদ্যুতের মত ঝটকা নাফিসার গায়ে খেলে গেল। চোখ বন্ধ হয়ে এল। শরীরটা কেঁপে উঠল অনিয়ন্ত্রিতভাবে। সেই মুহূর্তে সায়মান যেন ঘোরের মধ্যে চলে গেল।
পরের মুহূর্তে নাফিসা টের পেল—তার ঠোঁট অন্য কারো আয়ত্তে। চোখ মেলে তাকাতে চাইল, কিন্তু বৃষ্টির ঝাপটা এত তীব্র যে সব ঝাপসা হয়ে গেল। শুধু বুঝতে পারল—সায়মান ওর ঠোঁটে পাগলের মত ডুবে গেছে। নড়তে পারছে না, শরীর ফ্রিজ হয়ে গেল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, হাঁসফাঁস করতে লাগল। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে মনে হয় এবার হাঁসফাঁস করতে লাগলো, তবু শরীর নড়ল না। যেন কেউ সব ইন্দ্রিয় আটকে দিয়েছে। কেবল বুকের ভেতর কাঁপা কাঁপা অনুভূতি জমনিল।

অবশেষে সায়মান বিরক্তির সাথে ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে ওর গলার কাছে মুখ নামাল। ছোট ছোট ভেজা চুমুতে ভরে দিল সেই কচি গলা। তখনও অবাক হয়ে শ্বাস নিতে পারছে না, বুঝতে পারছে না, এ কেমন অনুভূতি—ভয়, না কি এক অজানা আকর্ষণ!নাফিসা অস্থির হয়ে উঠল, সরে আসতে চাইলো।
কিন্তু সায়মান আবার ওকে শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে উঠল,
— “পিচ্চি… প্লিজ বিরক্ত কোরো না। তুমি কিভাবে এইকয় দিনে আমাকে এভাবে টেনে নিলে, বলো তো? তোমার ভেতর কী আছে? কালো জাদু করেছ নাকি?”

বলতে বলতেই ওর বিউটি বন্ডের ওপর থাকা ছোট্ট কালো তিলে দাঁত বসিয়ে দিল। নাফিসা ঘুমড়ে উঠল ব্যথায়। সায়মান সাথে সাথে ওখানে ঠোঁট ছুঁইয়ে আস্তে আস্তে চুমু দিয়ে ব্যথা সাঁঝাতে লাগল।
ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ কাঁপিয়ে বিদ্যুতের শব্দে থমকে গেল সায়মান। সে এতক্ষণ কি করছিল মাথায় আসতেই, আচমকা চমকে উঠল, আর এক ঝটকায় নাফিসাকে দূরে সরিয়ে দিল।
ধাক্কা খেয়ে নাফিসা মাটিতে পড়ে গেল। বুকের ভেতর দ্রুত নিঃশ্বাস চলছতে লাগলো, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল সায়মানের দিকে।
ওদিকে সায়মান দু’হাতে নিজের চুল মুঠো করে ধরে মাথা নিচু করে গলা ফেটে আসলো রাগে, ঘৃণায়।

— “আমি কী করলাম… আমি কী করলাম!”যে পিচ্চিটা আমার ভরসা করে , তার চোখে আজ আমি আর আলাদা কোনো মানুষ নই। আজ একটা দানব, যে অন্য পুরুষদের মতো যারা নারী অসহায়ের সুযোগ নেই। নিজের ফকিং** অনুভূতি কন্ট্রোল করতে পারেনা।
পাশের ফুলের টবগুলো একের পর এক ভেঙে ফেলতে লাগল। উন্মাদ পাগলের মত আচরণ করতে শুরু করল, মাটির সাথে মিশে যেতে লাগল ভাঙা টুকরো । একটা টপের ভাঙ্গা অংশে, হাত কেটে রক্ত ঝরছে টুপটাপ করে। বৃষ্টির ভেতর হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে নিজেকে গালি দিতে লাগল—

— “ফাকিং ইডিয়েট আমি! নিজেরে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিস না… তুই একটা জন্তু… একটা শয়তান…”
নাফিসা শ্বাস নিতে নিতে ধীরে ধীরে উঠল। শরীরে এখনও সেই স্পর্শের ঝড় বইছে, অদ্ভুত এক অনুভূতি জমে আছে ভেতরে। ব্যথা, কাঁপুনি, অজানা আনন্দ, ভয়—সব মিশে একাকার।
সে এগোতে চাইলে সায়মান হঠাৎ হাত তুলে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। গর্জে উঠল—
— “দূরে থাক, পিচ্চি! আমার কাছে আর আসিস না…”
চারপাশে তখন কেবল বৃষ্টির গর্জন, ভাঙা ফুলের টবের টুকরো, আর এক অসহায়, ভাঙা হৃদয়ের চিৎকার।
সায়মান হঠাৎ এক ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বুক ধড়ফড় করছে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। মাথার ভেতর ঝড় বইছে—সে কী করল, কেন করল, কিছুই যেন বোঝার বাইরে চলে গেছে। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে দ্রুত পায়ে ছাদের সিঁড়ি ধরে নেমে গেল।

পিছনে রয়ে গেল ভিজে ছাদ, ঝুম বৃষ্টির ধারা, আর নিস্তব্ধ রাতের বুকে জমে থাকা অস্থিরতা।
নাফিসা এক জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে রইল। চোখ মেলে অনেকক্ষণ ধরে সায়মানের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল। মনে হলো, এখনো যেন ওর উষ্ণ নিঃশ্বাস গায়ের ওপর ভাসছে, ওর শক্ত হাত কোমরের কাছে চেপে আছে। শরীরটা শিহরে উঠছিল বারবার।
মাথার ভেতর এতকিছু ঘুরপাক খাচ্ছে যে, নিজের ছোট মস্তিষ্কে কিছুই ধরতে পারছে না।
এটা কী হলো? কেন হলো? আমি কেন কিছুই প্রতিরোধ করতে পারলাম না?
এই প্রশ্নগুলো বুকের ভেতর গুঞ্জন তুলতেই চোখ ভিজে এল। হঠাৎ বুকের ভারে আর আটকে রাখা গেল না—ফুপিয়ে কেঁদে উঠল ও।

বৃষ্টির ফোঁটার সাথে মিশে গেল তার কান্নার স্রোত।
ঝুম বৃষ্টি যেন তার কান্নাকে দ্বিগুণ করে তুলল। আকাশও কি কাঁদছিল তার সাথে?
মনে হলো, যত ফোঁটা আকাশ থেকে ঝরছে, প্রতিটা যেন তার বুকের অজানা যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি।
ভেজা চুল কপালে আটকে গেছে, চোখের পানি আর বৃষ্টির পানি মিলেমিশে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। ঠোঁট কাঁপছে, বুকের ভেতর হাহাকার জমছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল—কাঁপতে থাকা গলাটা কেবল ফিসফিস করছিল নিজের সাথেই,
“আমি কী করব… আমি কী করব এখন…”
চারপাশে কেবল বৃষ্টির গর্জন, বাতাসের হাহাকার, আর এক অসহায় মেয়ের কান্না মিলেমিশে এক অদ্ভুত সুরে ভরে গেল রাতটা।

“রাশিদ ভিলা” আজ অন্যদিনের মতো নেই। সকাল থেকেই চারপাশে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা, হালকা উচ্ছ্বাস আর চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে আছে।
বাড়ির বিশাল ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে—ঝকঝকে আলোয় সেজে উঠেছে প্রতিটি কোণ। ড্রইংরুম থেকে বারান্দা, ডাইনিং টেবিল থেকে সিঁড়ির ধাপ—সবখানেই যেন প্রস্তুতির আমেজ।
আজ বাড়ির বড় কন্যাকে দেখতে আসবে ছেলে পক্ষ। তাই সকাল থেকেই বাড়ির স্টাফরা এক মুহূর্ত বসতে পারছে না। কেউ গ্লাস-মগ পরিষ্কার করছে, কেউ ফুল সাজাচ্ছে, কেউবা বারবার খাবারের তালিকা মিলিয়ে নিচ্ছে।
বাড়ির মহিলারাও কম যান না।
আফিয়া বেগম শাড়ির স্টাফদের ভালো করে সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছে আর ঘরের এক কোণ থেকে অন্য কোণে ছুটে বেড়াচ্ছেন।

ইমা বেগম ও চারিদিক সাজাচ্ছেন নিখুঁতভাবে।
অন্যদিকে বিলকিস আরা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে বাকি আয়োজন তদারকি করছেন।
চারিদিকে যেন উৎসবের মতো পরিবেশ, কিন্তু তার মাঝেই চাপা এক টানটান উত্তেজনা ভাসছে।
রুহি বিছানায় বসে আছে—হাতে ফোন। পর্দার আলো বারবার চোখে পড়ছে, কিন্তু কলের ওপাশে কেউ ফোন ধরছে না। মুখে বিরক্তি, চোখে জল জমে আছে। বারবার ডায়াল করছে, কিন্তু কোন সাড়া নেই।
এক সময় রাগে ফুসে উঠে হঠাৎ ফোনটা মেঝেতে আছড়ে ফেলল।
“চ্যাং করে” শব্দে চারপাশে নীরবতা কেঁপে উঠল। ফোনটা ভেঙে চারদিকে টুকরো ছড়িয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল রিশা আর নাফিসা।
দরজার ভেতরে পা রাখতেই প্রথমে চোখে পড়ল মেঝেতে পড়ে থাকা ভাঙা মোবাইল। দু’জনেই এক মুহূর্তে আঁতকে উঠল।

— “আপি!”
দু’জন একসাথে ছুটে গেল রুহির দিকে।
রুহি তখন ঠোঁট কামড়ে চোখের জল চেপে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারল না। নাফিসার বুকের ভেতর হুট করেই নিজেকে সঁপে দিল—চোখের জলে ভিজে গেল ওর কাঁধ।
বড় বোনকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে রিশার চোখও ভিজে উঠল। সে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
— “আপু, কী হয়েছে? তুমি কাঁদছো কেন?”
নাফিসা রুহির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল, শান্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু রুহির কান্না যেন আরও বেড়ে যাচ্ছে।
রিশা এবার বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পাশে বসে পড়ল, কণ্ঠে প্রশ্ন আর বেদনা মিশে বলল,

— “তোমাকে তো আজ ছেলে পক্ষ দেখতে আসবে… এই জন্যেই কাঁদছো আপু? তুমি কি কাউকে পছন্দ করো? করলে সেটা সবাইকে বলে দিলেই তো হয়…”
রুমের ভেতর তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। পর্দা দোল খাচ্ছে হালকা বাতাসের ঝাপটায়। দূরে সাজসজ্জার আলো ঝাপসা হয়ে দেখা যাচ্ছে জানালা দিয়ে।
আমাদের দুলাভাইকে , যার জন্য কেঁদে কেটে সমুদ্র বানিয়ে ফেলছো নীরবতার মাঝে রিশা বলে উঠলো।
রুহি কিছুক্ষণ চুপ থেকে, জোরে ফুপিয়ে উঠলো কান্নার মাঝেই মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল—
— “রায়হান ভাই…”
শুনেই রিশা আর নাফিসা দু’জনেই স্তব্ধ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর রিশা বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল,

— “কি? রায়হান ভাই! কি বল?
বলে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বিছানার ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল,
তোমরা দুইজন তো হেব্বি তলে তলে টেম্পু চালাচ্ছো… কবে থেকে এসব হচ্ছে, আমরা কিছুই জানতে পারলাম না!”
রুহি চোখ ভেজা অবস্থায় কিছু বলতে চাইলে রিশা এবার ওর হাত ধরে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
— “শোনো, যদি সত্যিই তোমার কোনো সমস্যা থাকে তবে আমার কাছে বলো। আমি গিয়ে সবার সামনে বলে দেবো তোমাদের ব্যাপারে। এতে টেনশনের কী আছে? সবাইকে বললেই তো হয়ে যায়!”
রুহি মুখ তুলল, চোখ লাল হয়ে আছে কান্নায়, কণ্ঠ কাঁপছে—

— “না রিশু, ব্যাপারটা এত সহজ না। রায়হান ভাই বলেছেন, বড় আব্বুর মুখের উপর কিছু বলতে পারবেন না। বড় আব্বু তার বন্ধুকে কথা দিয়ে ফেলেছেন। তিনি যদি এখন মত পাল্টান, তবে সেটা হবে কথার খেলাফ…”
রিশা এবার ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল, বিরক্তিতে মুখ শিটকে উঠল—
— “এই ভয়ে কি? যার সাথে বলবে, তার সাথেই বিয়ে করতে হবে নাকি? এটা তো একেবারে বাজে কথা! না চাইলে না বলাই যায়। আমি এখনই রায়হান ভাইয়ের সাথে কথা বলছি।”
রুহি আবার ভেঙে পড়ল। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। থেমে থেমে বলল—
— “ফোন করছি কতক্ষণ ধরে, রিসিভ করছে না। অনেকবার ট্রাই করেছি। চট্টগ্রাম চলে গেছে…
ঘরটা মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু কান্নার শব্দ আর বাইরে হালকা বাতাসে দুলতে থাকা জানালার শব্দ ভেসে আসছে।
নাফিসা এবার শান্ত করার ভঙ্গিতে বলল—

— “আপি, প্লিজ শান্ত হও। চুপচাপ বসে একবার ডিসকাস করো। তুমি সবার কাছে খোলাখুলি বলো, দেখবে সবাই বুঝবে।”
রুহি ঠোঁট কামড়ে তাকাল নাফিসার দিকে, কণ্ঠে হতাশার আভাস—
— “নাফু, তুই কি সবাইকে তোর মতো সরল মনে করিস? এত সহজে কেউ মানবে ভেবেছিস?”
নাফিসা চুপ করে গেল। রিশা এবার এসে দু’জনের মাঝখানে বসে পড়ল। চোখে দৃঢ়তা, কণ্ঠে জেদ—
— “শোনো, কান্না করে কিছু হবে না। এখন আমাদের তিনজনকে মিলেই ভাবতে হবে। এই বিয়ে যেভাবেই হোক ক্যান্সেল করতে হবে। আর রায়হান ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করতেই হবে।”
রুহি কিছু না বলে মাথা নিচু করে বসে রইল। চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু পড়ছে।
নাফিসা আস্তে করে তার হাত চেপে ধরল, আর রিশা দৃঢ় ভঙ্গিতে বলল—
— “আমরা তিনজন একসাথে আছি। কিছু একটা উপায় বের হবেই। কাউকে না কাউকে তো মুখ খুলতেই হবে।”
রিশা একটু রাগী সুরেই বললো,

— “রায়হান ভাই এত ভয় নিয়ে কি করতে প্রেম করতে এসছিল, তুমি এক কাজ করো, ক্যানসেল করে দাও। আর বড় আব্বুর বন্ধুর ছেলের একবার দেখো কেমন ভালো হইলে বিয়ে করে ফেলো। যে নিজের ভালোবাসার মানুষকে আগলে রাখতে জানে না, তার জন্য কান্নার কোন মানে হয় না।”
নাফিসা সঙ্গে সঙ্গে চোখ চকচক করে বললো,
— “আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে আপি, এটা ট্রাই করতে পারো।” মেয়েটা আগের থেকে এখন অনেক ফ্রি হয়ে গেছে ওদের সবার সাথে।
রিশা হেসে উঠে ওর কাছে গিয়ে এক হাত দিয়ে নাফিসাকে জড়িয়ে ধরলো।

— “আমাদের নাফুর মাথায় যদি বুদ্ধি আসে মানে বুঝে নিতে হবে ভালো কিছু বলবে তাড়াতাড়িই।”
রুহি উৎসাহ নিয়ে তাকিয়ে আছে নাফিসার দিকে।
নাফিসা এবার সিরিয়াস হয়ে বললো,
— “রিশা আপুর কথা অনুযায়ী তুমি বিয়েতে রাজি হয়ে যাও।”
এবার রুহির মুখ ছোট হয়ে আসলো, চোখে অজানা দুশ্চিন্তা।
নাফিসা গলা নিচু করে বললো,
— “রায়হান ভাইয়া যদি সত্যিই তোমাকে ভালোবেসে থাকে তাহলে তুমি অন্য কারো সাথে বিয়ে করছো—এটা সে সহ্য করতে পারবে না। এদিকে আমাকে আলাদা কিছু করতেও হবে না, ওই দিকেও কিছু করতেও হবে না। যা করআর রাইহান ভাইয়া নিজেই করে নিবে। ”
রিশা আর রুহি দুজনেই অবাক হয়ে একসাথে বলে উঠলো,

— “আমাদের নাফুর মাথায় এত বুদ্ধি!”
নাফিসা একটু অ্যাটিটিউড নিয়ে হেসে বললো,
— “আমার সাথে থেকে থেকে মাথা খুলে গেছে, না হলে আমি এমন বুদ্ধি পাবো কই!”
আর রায়হান ভাইয়া শেষ পর্যন্ত যদি না আসে, তাহলে অপশন বি এপ্লাই করব ভাইয়াকে তুলে নিয়ে তোমার সাথে জোর করে বিয়ে দেব সিনেমা সিনেমাটির ব্যাপার হবে তাই না! নিজের বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে নিজের প্রেমিককে জোর করে তুলে কাজী অফিসে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করল প্রেমিকা জোস হবে। আমি অনেক এক্সাইটেড নিউ একটা অ্যাডভেঞ্চার হবে আমাদের জন্য রিশা ঢং করে বলে উঠলো।
তিনজনে হাসাহাসি করছে, এমন সময় ইমা বেগম দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। ভেতরে ঢুকেই কপাল কুঁচকে তিনজনের দিকে তাকালেন।

— “তোরা তিনজন এভাবে বসে আছিস কেন? এখনই তো মেহমান আসার সময় হয়ে যাবে, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে।”
তারপর চোখ ঘুরিয়ে রুহির দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “এই রুহি, তোর জন্য আমি নতুন একটা শাড়ি বের করছি। শাড়ি পরে ঠিক মতো সাজবি।”
কথা শেষ করে ওয়ারড্রোব থেকে গাঢ় নীল-সোনালি বর্ডারওয়ালা একটা শাড়ি বের করলেন।
— “এই নে, এটা পরিস। হালকা গয়না দেখিয়ে বললো। রিসা, নাফিসা—তোরা দুজন মিলে রুহিকে সাজিয়ে দে, ঠিক আছে?”
রিশা শাড়িটা হাতে নিয়ে বললো,

— “আচ্ছা আম্মু , তুমি টেনশন কইরো না। আমরাই সব করে দিচ্ছি।”
ইমা বেগম গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেলে,
রিশা শাড়িটা রুহির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,
— “চলো, তোমাকে সাজাই, দেখি আমাদের রুহিকে কে না বলে!”

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২০

রুহি, কপাল গুটিয়ে রিশার দিকে তাকিয়ে বলল, খুব বেশি কথা বলিস তুই চুপচাপ থাক।
নাফিসা রিশার কথা বলার ভঙ্গিমা দেখে, এই এসে দিল।
চারদিকে সাজসজ্জা আর ব্যস্ততার ভিড়ে যেন উৎসবের আমেজ। ড্রইংরুমে ফুলের গন্ধ, রান্নাঘরে সুগন্ধি খাবারের সুবাস—সব মিলিয়ে পুরো ভিলা যেন বিয়ে বাড়ির আবেশে ভরে আছে। বাইরে সন্ধ্যার আলো-আঁধারি, হালকা বাতাসে পর্দা দুলছে, আর ভেতরে পরিবারের প্রতিটি সদস্য ব্যস্ত অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতিতে………

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২২