Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২০

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২০

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২০
জান্নাতি আক্তার জারা

আজকে আরিশা আমানের মেহেন্দি অনুষ্ঠান লাইটস,রিবোর্ন, ফুল দিয়ে গার্ডন এরিয়াটা যেনো ঝকঝকে হইহুল্লার পরিবেশ টা মাতিয়ে তুলছে। বাদবাকি যতটুকু ডেকোরেশন বাকি ছিলো, আজকে সকালে দিকে সমাপ্ত করে দিয়ে গেছে। গার্ডনের এক পাশে একটা বড়ো করে ষ্টেজ করা হইছে।ষ্টেজের সামনে কিছুটা জায়গায় খালি রেখে প্রথম সাড়িতে, নতুন বর বউয়ের বসার আয়োজন করা হয়েছে। আর তার পাশে এবং পিছনের সাড়িতে বাকি গেষ্টদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাতে ষ্টেজে পার্ফরমেন্স করলে গেষ্টরা সুন্দর মতো এনজয় করতে পারে।
আরাত আইরা মায়া সন্ধ্যা মিম হানিয়া, ছয়জন মিলে সুন্দর করে মেহেন্দির ডালা সাজিয়ে রাখলো। দুইটা ডালার মধ্যে হলুদ এবং লাল গাধা ফুলে সংমিশ্রণে মধ্যে ছয়টা করে বারোটা স্মার্ট মেহেদী রাখা। আরেকটা ডালা স্পেশালি নতুন বউয়ের জন্য সাজানো। একদম লাভ শেপের পুরো ডালা লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে ডেকারেশন করা, মাঝখানে একটা স্মার্ট মেহেদী। ছয়জন মিলে ডালা সাজিয়ে নিজেরা অনুষ্ঠানের জন্য এডি হতে চলে গেলো। এদিকে আনাস আশিক হাবিব এবং আহিন আলভী অর্থাৎ ছেলেরা সবুজ রঙের পাঞ্জাবি পড়ে নিজেদের পরিপাটি করে, যে যার মতো ছুটাছুটি করছে।

আরিশা লেহেঙ্গা পড়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আয়নার সামনে এসে বসলো। রুমে শুধু সন্ধ্যা আইরা আরিশা তিনজন। আইরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বোনের জন্য মেহেন্দির ড্রেসাপ এর গয়না গুলো নেড়েচেড়ে দেখছিলো। আরিশা কে আয়নার সামনে বসতে দেখে আইরা বোন কে সাজিয়ে দিতে লাগলো। গহনা পড়ানোর মধ্যে মিম বাহিরে থেকে রুমে এসে পাশে দাঁড়ালো। মিম আরিশার লেহেঙ্গার ওড়না টা হাতে নিলো আরিশা কে পড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। সাজিয়ে দিতে দিতে টুকিটাকি কথা বলার মধ্যে আরিশা-র ফোন বেজে উঠলো। আরিশার ফোনে ইংরেজিতে আমান নামটা ভেসে উঠতেই মিম আরিশার হাত থেকে ফোনটা কেরে নিয়ে রিসিভ করে দুষ্টুমির ছলে গেয়ে উঠলো।
সজন সজন সজন মেরে সজন মেরে সজন তৈরে দূলহান সাজাওগিহহহহ______তৈরে দূলহান সাজাজজজজজজজজ……

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

মিম দুষ্টু হেসে ফোনটা নিয়ে গান গেয়ে উঠতেই। ফোনের ওপাশে আমানের পাশে আরো কয়েক জোড়া চোখ উৎসাহ চাহনিতে চেয়ে থাকতে দেখে। ফোনটা পুনরায় আরিশার হাতে গুঁজে দিয়ে, এক দৌড়ে বিছানায় গিয়ে বসলো। মিমের হটাৎ কান্ডে সন্ধ্যা আইরা আরিশা তিনজন অবাক চোখে তাকালো মিমের দিকে। আরিশা হাত থেকে ফোনটা সামনে রাখতেই দেখতে পেলো। ফোনের ওপাশে গাড়ির মধ্যে, আমান রাফি আরশ ফোনের দিকে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে। তিনজন তিনজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে এবার হটাৎটি তিনজন মিমের কান্ডে ফোনের ওপাশ থেকে শব্দ করে হেসে উঠলো। মিম ছেলেদের হাসির শব্দ পেতেই লজ্জায় হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নিলো। মিম শুধু আমানের সঙ্গে দুষ্টুমি করতে চায়েছিলো কিন্তু ফোনের ওপারে এতএত ছেলেকে নিজের দিকে উচ্ছাস চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেলো। মূলত মেহেন্দি আনুষ্ঠানের জন্য আমান রা তালুকদার বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছে। আমান রা মেহেন্দি আনুষ্ঠানে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে পুনরায় নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাবে।

আমান রা তালুকদার বাড়িতে এসে পড়েছে। গাড়ি থেকে নেমে গেইট দিয়ে গার্ডেনের প্রবেশ করতে আহিন আলভী দূর থেকে দেখতে পেয়ে চিল্লাতে চিল্লাতে সেদিকে এগিয়ে গেলো।
“আপুরা তোমরা কই? নতুন দুলাভাই এসে পড়েছে!
” কী বিচ্ছু বাহিনী কেমন আছো?
“আলহামদুলিল্লাহ দুলাভাই,

কথাটা বলেই আহিন আলভী আমানের দুপাশে দুইহাত ধরলো। এদিকে আহিন আলভী চিল্লানোতে আতিফ শেখ এগিয়ে এলেন। আমান শশুর মশাই কে এগিয়ে আসতে দেখে সালাম দিলো। আতিফ শেখ হাসি মুখে সালাম নিতেই, রাফি পুনরায় সালাম দিলো। আতিফ শেখ আবারো সালাম নিতে নিতে সবাই কে ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসতে বলে ওনি বাড়ির ভেতর চলে গেলেন। আমান রা বসে থাকার মধ্যে দিয়ে আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার দু’ভাইয়ের সঙ্গে সন্ধ্যা কে হাতে শরবতের ট্রে নিয়ে আসতে দেখা গেলো। আমান মামা-শশুরকে দেখে দাঁড়াতে যাবে সঙ্গে সঙ্গে আদনান তালুকদার হাতের ইশারায় বসতে বলল। দু-ভাই মিলে আমানদের সঙ্গে কৌশল বিনিময় করতে করতে সন্ধ্যা কে শরবত দিতে বললেন। সন্ধ্যা হাসি মুখে শরবতের গ্লাসটা এগিয়ে দিতেই সামনে আরশ কে সবার সঙ্গে বসে হেসে কথা বলতে দেখে প্রথমে অবাক হয়ে তাকালো, যখন মনে পড়লো আরশ রাফি ফ্রেন্ড তখন স্বাভাবিক ভাবেই হাসি মুখে শরবতের গ্লাসটা এগিয়ে দিলো। সন্ধ্যা শরবত দিওয়া শেষ করে বাড়ির ভিতরে যাওয়ার উদ্দেশ্য পা ঘুরাইতে। আরশ এক হাতে ফোন কানে তুলে আরেক হাত দিয়ে গেটের দিকে হাত উঁচিয়ে ডাকলো,

” মাহিরররর!
সন্ধ্যা আরশের কথায় সেদিকে তাকাতেই মাহির আর মিরা কে গেইট দিয়ে ঢুকতে দেখতে পেলো। শ্যাম বর্ণ মাহির সাদা পেন্টের সঙ্গে সাদা রঙের পাঞ্জাবি পড়া। চোখে কালো সানগ্লাস। একদম সবার থেকে ডিফারেন্ট লুক তার। মিরা কুচি করা সবুজ রঙের শাড়িতে নিজেকে সাজিয়ে তুলছে। মিরা এক হাত দিয়ে শাড়ি সামলাতে সামলাতে এদিক ওদিক তাকিয়ে সন্ধ্যা কে চোখে পড়তেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
“হাইইইই?
” হ্যালো!

মিরা হাসি মুখে হাত উঁচিয়ে সন্ধ্যা কে হাই বলতেই মাহির চোখ থেকে সানগ্লাস টা খুলে ভ্রু কুঁচকে মিরা’র দিকে তাকালো। সন্ধ্যা হাসি মুখে মিরা কে হ্যালো বলল। মাহির আমান দের কাছে আসতেই দুই মুরুব্বি কে দেখে সালাম দিলো। আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার সালাম নিয়ে মাহির কে দেখতে লাগলো। আমান মাহিরের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দিতে বলে উঠলো ।
“মামা ও হইলো আমার ছোট্ট ভাই রাফির ফ্রেন্ড, মেহরাব ইসলাম মাহির। আর পাশে মেয়েটা মাহিরের বোন মিরা।
আমানের পরিচয় করে দেওয়ার মধ্যে মিরা মাহির কে বলে উঠলো,

” ভাইয়া আমি সন্ধ্যা’র সঙ্গে নতুন ভাবির কাছে যা-ই?
“কেনো না মামনী! সন্ধ্যা মামনী তুমি মিরা মামনী কে তোমার সঙ্গে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যাও।
আহাদ তালুকদারের হাসি মুখে কথায়, মাহির প্রথমে বোন কে এত মানুষের মধ্যে একা ছাড়তে আমতা আমতা করলো। মাহির একবার সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে পুনরায় বোন কে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে বলল,
” ওকে যা, বাট নতুন ভাবির কাছে কাছে থাকবি সবসময়।
“থ্যাঙ্ককিও ভাইয়া_______চলো সন্ধ্যা।

মাহির যাওয়ার কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মিরা সন্ধ্যার হাত টেনে তালুকদার বাড়ির গেটের দিকে সন্ধ্যা কে নিয়ে গেলো। মাহির বোনের যাওয়ার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে, আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদারের সঙ্গে পরিচিত হতে লাগলো। মিরা তালুকদার বাড়ির সদর দরজায় এসে সন্ধ্যার হাত ছেড়ে নিয়ে সন্ধ্যা কে আগে আগে যেতে বলল।সন্ধ্যা তালুকদার বাড়ির সদর দরজায় প্রবেশ করতেই। কোথায় থেকে একজোরা হাত, হাওয়ায় গতিতে সন্ধ্যা কে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল।

” এখান থেকে সোজা সিড়ি দিয়ে ওঠে প্রথমে যে রুমটা পরবে, ওই রুমে সবাই কে পেয়ে যাবেন।
মিরা হতভম্ব চোখে অবাক হয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে সন্ধ্যা কে খুঁজলো। কেই-বা হটাৎ সন্ধ্যা কে উধাও করলো। আর কেই বা আরাতের রুমের ঠিকানা বলে দিলো। পরক্ষণে ব্যাপারটা বেশি না ঘাঁটিয়ে ছেলেটার কথা অনুযায়ী সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। মিরা সিড়িতে পা দিতেই সামনে থেকে একটা চিকনচাকন পাঞ্জাবি পরিহিত ইয়া লম্বা একটা ছেলেকে তাড়াহুড়া করে নামতে দেখে মিরার পা থেমে গেলো জায়গায়। আশিক বারংবার ফোন করছে আদিল কে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য। আজকে আনুষ্ঠানে আশিক আর আদিল মিলে পারফরম্যান্স করবে। মূলত এই কারণে আশিকের ফোন আসাতে আদিল আনাস-সের ওয়াশরুম থেকে শাওয়ার নিয়ে। পাঞ্জাবিটা তাড়াহুড়ো করে পড়ে রুম থেকে সিড়ি বেয়ে মিরা কে পাশ কেটে নেমে চলে গেলো। মিরা পিছন ঘুরে আরেকবার আদিলের তাড়াহুড়ায় চলে যাওয়া দিকে তাকিয়ে পুনরায় আরাতের রুমে দিকে হাঁটা দিলো ।

” প্রবলেম কী আপনার, এতো গুন্ডাগিরি করেন কেনো?
হাবীবের রাগী চোখটা নিমিষেই সন্ধ্যা’র দিকে মুগ্ধ চোখে পরক করতে লাগলো। সবুজ কাজকরা স্কার্ট থ্রি পিসে পুরো মুখে স্নিগ্ধতা ছড়িয়েছে। হাবীব সন্ধ্যার কথায় উত্তর করলো না। সন্ধ্যা হাবীব কে নিজের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে পুনরায় বলে উঠলো,
“কী হইলো ভদ্রগুন্ডা, আজকে আবার কী কারণে আপনার গুন্ডাগিরি শুরু করে দিলেন ?
সন্ধ্যার কথায় হাবীবের নিবে যাওয়া রাগটা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো, দাঁতে দাঁত চেপে সন্ধ্যা’র থুতনি চেপে ধরে শাসিয়ে উঠলো

” তোকে আমি লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম, ওই ছেলের থেকে সবসময় দূরে দূরে থাকবি।
হাবীবের শক্ত হাতের সন্ধ্যা’র থুঁতনি ভেঙ্গে যাওয়ার অতিক্রম হলো। সন্ধ্যা থুঁতনির ব্যাথায় হাবীবের হাতে নিজের বড়ো বড়ো নক দিয়ে চিমটি কেটে দিলো। হাবীব সঙ্গে সঙ্গে সন্ধ্যা’র থুঁতনি ছেড়ে দিয়ে নিজের হাত ঝাড়া দিতে দিতে বিরক্তি চোখে সন্ধ্যা’র দিকে তাকিয়ে বলল।
“বিয়ের আগেই এমন বিড়ালের মতো আঁচড় দেওয়া বন্ধ কর সন্ধ্যা। বিয়ের আগে তোর নকের আঁচড় কারো চোখে পড়লে প্রবলেম ফেস করতে হবে।
সন্ধ্যা রাগী চোখে হাবীবের দিকে তাকালো, এভাবে ধরে নিয়ে আসার মানে কী। হুটহাট পাতার বস্তায় মতো ঘাড়ে তুলে তো কখনো কোমর চেপে ধরে। শুধু এই চিপায় তো ওই চিপায় নিয়ে যাবে। সবার সঙ্গে কতো ভদ্র ভালো সেজে থাকে। শুধু তার বেলায় এই গুন্ডার যত গুন্ডগিরি, ভদ্রগুন্ডা একটা।

” আপনি কোন ছেলের কথা বলছেন, আর কেনোই বা তার থেকে দূরে দূরে থাকতে হবে আমার?
” আমাকে ছাড়া সব ছেলের থেকে সবসময় দূরে দূরে থাকবি। স্পেশালি মাহির নামে ছেলেটার থেকে।
“আপনার কথা আমি শুনতে যাবো কেনো?
” কারণ আমি তোকে ভালোবাসি। আমি তোকে ভালোবসি মানে জগতের সব পুরুষ তোর জন্য নিষিদ্ধ।
সন্ধ্যা’র মনে মধ্যে অনুভূতি গুলো উরাধুরা ডান্স করতে লাগলো। হাবীব কে বুঝতে না দিয়ে মুখে বিরক্তি ফুটে তুলে সন্ধ্যা, হাবীব কে জ্বালাতে পুনরায় বলে উঠলো,
” বিয়াই সাব কিন্তু কঠিন সুন্দর আছে, আমি তো প্রথম দেখায় ক্রাশ খেয়ে……..!

সন্ধ্যা পুরো কথা মুখ থেকে বের হওয়ার আগেই হাবীবের শক্তপোক্ত হাতের থাপ্পড় পড়লো গালে। সন্ধ্যা চোখ ভরা পানি নিয়ে গালে হাত দিয়ে হাবীবের দিকে তাকালো। হাবীবের রাগে চোখগুলো লাল-বরণ ধারণ করেছে। সন্ধ্যা বুঝতে পাড়ে ছেলেদের নিয়ে হাবীবের সামনে মজা করা ঠিক হয়নাই। সন্ধ্যা কিছু বলতে যাবে, তখনই হাবীব পুনরায় দাঁতে দাঁত চেপে সন্ধ্যা’র ব্যাথাতূর গালটা চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
“তুই অনেক বের বেড়ে গেছিস, তোর ডানা কিভাবে বেধে দিতে হয় এই হাবীবের জানা আছে। আরিশার বিয়েটা হতে দে, তোর বয়স মা’ই ফুট। ছেলেদের পিছনে না ঘুরে নিজের বিয়ের প্রিপারেশন নিতে থাক।
কথাটা বলেই হাবীব সন্ধার গাল সেড়ে দিয়ে রুম থেকে বের হওয়ার উদ্দেশ্য পা বাড়ালো। সন্ধ্যা হিচকি তুলতে তুলতে হাবীবের দিকে তাকিয়ে হাবীব কে বলে উঠলো,

” প্লিজ হাবীব ভাইয়া, বাড়িতে এখনই বিয়ের কথা তুলবেন না। আমি তো শুধু আপনাকে জেলাস ফিল করানোর জন্য মজা করে বলছিলাম কথাগুলো। আর আরাতের ক্রাশ মাহির ভাইয়া, আমার না। আরাত মাহির ভাইয়া’কে লাইক করে আমি না।
সন্ধ্যার শেষের কথায় হাবীবের পা থেমে গেলো। অবশ্য চোখে সন্ধ্যার দিকে তাকালো।
“আরাত মাহির কে পছন্দ করে মানে?
” হ্যাঁ আরাত প্রথম দিন থেকে মাহির ভাইয়াকে লাইক করে। জানি না ওর মনে মাহির ভাইয়ার জন্য ভালোবাসা আছে কী না। তবে যতদূর বুঝতে পাড়ি মাহির ভাইয়ার প্রতি আরাতের মনে সফট কণার তৈরি হইছে।
“তুই সিওর?
” হুম!

“ওকে, নিজের বিয়ের প্রিপারেশন নিতে ভুলিস না। চিন্তা নেই আজকেই আমাদের বিয়ের কথা তুলবো না। কিন্তু তোকে অতি দ্রুত আমার ঘরের সন্ধ্যা থেকে আলো হওয়ার ব্যবস্থা করবো।
আর হ্যাঁ
” আমাকে জেলাস ফিল করাতে হবে না, আমি প্রথম থেকে তোর আশেপাশে কাউকে সহ্য করতে পারি না। অতএব তুই আমার মানে তোর চোখে অন্য কারো প্রতি না শুধু এই হাবীবের প্রতি মুগ্ধতা থাকতে হবে। কথাটা সবসময় মাথায় রেখে দিবি।
কথাটা বলেই হাবীব একমুহূর্ত দেরি না করে রুম থেকে বড়ো বড়ো পা ফেলে চলে গেলো। হাবীবের যাওয়ার দিকে সন্ধ্যা চোখভরা পানি নিয়েও মুখে হাসি ফুটে উঠলো।

“ওইতো নতুন বউ এসে পড়েছে!
আহিনের চিৎকারে সবাই তালুকদার বাড়ির সদর দরজায় দিকে তাকালো। তাকিয়ে এক প্রকৃতিক সুখ চোখে পড়লো যেন, চারদিকে অন্ধকারে মধ্যে ঝাড়বাতির মিটিমিটি আলোর মধ্যে সবুজ রঙের পাঁচটা রূপবতীকে চোখে পড়লো। রূপবতী গুলো ধীর পায়ে যত এগিয়ে আরছে ততই অন্ধকার থেকে লাইটিংগের মিটিমিটি ঝাড়বাতির আলোয় মুখগুলোর মায়াবী হয়ে ধরা দিচ্ছে।

আরিশার একপাশে মায়া হানিয়া আর অন্যপাশে আরাত মিম। আরাতে হাতে আর আরেকপাশে মায়ার হাতে দুজনের হাতে দুটো মেহেন্দির ডালা। চারজন মিলে আরিশার সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে আসতে। আদিবা তালুকদার আর রাহিমা সুলতানা হাসি মুখে আরিশা দের দিকে এগিয়ে এলেন। তাকবীর কে এক নজর দেখার আশায় হানিয়া এদিক ওদিক তাকিয়ে তাকবীর কে খুঁজতে লাগলো। যারজন্যা নিজেকে এতটা সাজিয়ে এসেছে তাকে খুঁজে না পেয়ে ব্যর্থ চোখে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো হানিয়া।

মাহির চেয়ারে বসে থেকে গম্ভীর মুখে ফোন ঘাটাঘাটি করছিলো। আহিনের কথায় ফোন থেকে চোখ উঠিয়ে সেদিকে তাকাতেই। সবার মতো মুগ্ধ চোখে তাকালো এক হাস্যজ্জল চঞ্চল অদ্ভুত মেয়ের দিকে। পরক্ষণে সবার মধ্যে নিজের বোনকে দেখতে না পেয়ে রাফিকে কিছু বলতে যাবে। রাফির দিকে তাকিয়ে দেখলো রাফিও উশখুশ নয়নে তালুকদার বাড়ির সদর দরজায় দিকে কাউকে দেখার আশায় চেয়ে আছে। মাহির জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রাফি’র হাতে হাত রেখে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো,

“প্রবলেম কী?
রাফি চোখ ঘুরে মাহিরের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“বেইয়ানসাব কে দেখতে পাড়ছি না, এখনো বের হচ্ছে না কেনো, কেনো প্রবলেম হইলো না’তো!
মাহির বন্ধুর আকুলতা বুঝতে পেয়ে, হাসি মুখে তালুকদার বাড়ির দিকে চোখের ইশারায় তাকাতে বলল। রাফি মাহিরের ইশারায় সেদিকে তাকাতেই দেখলো, আইরা কে একটা মেহেন্দি ডালা নিয়ে হাসতে হাসতে মিরা’র সঙ্গে কথা বলতে বলতে ষ্টেজের দিকে আসতে। রাফির আকুলতা চোখ নিমেষেই শীতল হয়ে মুখে হাসি ফুটে উঠলো। ষ্টেজ বরাবর একটা ছোট করে মেঝেতে মেহেন্দি দেওয়া জন্য। ফুলের একটা ষ্টেজ বানানো হয়েছে। এতক্ষণে রাহিমা সুলতানা আর আদিবা তালুকদার আরিশার কাছে গিয়ে আদুরে শহীদ আরিশা কে মেঝের ছোট্ট ষ্টেজটাতে বসালো মেহেন্দি দেওয়া জন্য। আরিশা বসে থেকে একবার নিজের সামনে বরাবর চেয়ারে বসে থাকা আমানের দিকে তাকালো , আমান পূর্ব থেকে আরিশার দিকে তাকিয়ে ছিলো।আরিশা তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেলো। আরিশার আজকে কেমন যেনো আমান কে দেখতে লজ্জা লাগছে। নিজেকে নতুন বউ ভাবতেই লজ্জাটা যেনো মাথামুড়ে ধরলো, আরিশা আমানের দিকে তাকিয়ে লজ্জামিশ্রিত হেসে অন্যদিকে তাকালো। মেহেন্দি আনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে একে একে সবাই মিলে পার্লারের মেহেদি আর্টিস্ট দিয়ে নিজেদের হাতে মেহেদী দিয়ে নিচ্ছে। আর সামনে ষ্টেজে ছোটদের পারফরম্যান্স এনজয় করতে লাগলো।

আইরা দুহাত ভরা মেহেদি দিয়ে বাড়ির ভিতরে,গেস্ট রুমে এদিক থেকে ওদিক হাঁটাহাঁটি করে মিমের ওয়াশ রুম থেকে বের হওয়ার অপেক্ষা করছিলো। অনুষ্ঠান চলাকালীন মিম ওয়াশরুমে যাবে বলে আরাতে কাছে বাহানা ধরে। আরাত অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সামনে চেয়ারে মাহির কে চুপিচুপি দেখার লোভে মিম কে আইরা সঙ্গে যেতে বলল। মিম পুনরায় আইরা কে বলাতে অগত্যাই মিমের সঙ্গে বাড়ির ভিতরে গেলো আইরা____আরাতের মনে নানাররূপের ঢেউ খেলে যাচ্ছে, অনুষ্ঠানের ফাকে ফাঁকে মাহিরের দিকে তাকাতেই মনে হচ্ছে, মাহির হয়তো ওর দিকে তাকিয়ে ছিলো এতক্ষণ। পুনরায় আরাত সন্দেহের বসে চুপিসাড়ে মাহিরের দিকে তাকাতেই মাহিরের চোখে চোখ পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আরাত চোখ বড় বড় করে অন্যদিকে তাকালো। আরাতের মনে সন্দেহ ঠিক ভেবে মনের অনুভূতি গুলো চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে লজ্জামিশ্রিত হেঁসে উঠিয়ে দিয়ে পুনরায় অনুষ্ঠানে মনোযোগ দেয়। চোখদুটো অনুষ্ঠানের দিকে থাকলেও মনোযোগ মাহিরের দিকে। মাহির আরাতের চঞ্চল মনের অনুভূতি গুলো ধরতে পেয়ে আরাতের চুপিসারে নিজেকে দেখার বাহানাগুলো এনজয় করতে লাগলো।

আইরা গেস্ট রুমে হাঁটাহাঁটি মধ্যেই বারান্দায় আনাস সের ফোনে কারো সঙ্গে কথা বলতে বলতে নিজের রুমের দিকে যেতে দেখে, তাড়াহুড়ায় আইরা রুম থেকে আনাস সের সামনে দাড়ালো। আনাস ফোনে কথা বলতে বলতে বারান্দায় দিয়ে নিজের রুমে যেতেই হুটকরে আইরা কে নিজের সামনে দেখে প্রথমে ঘাবড়ে যায়। আনাস বিরক্তি চোখে আইরা কে ধমক দিয়ে বলে উঠলো,
” মারবো একটা ঠাটিয়ে থাপ্পড়, এভাবে ভূতের মতো সামনে দাড়ানোর মানেটা কী?
“আমার হাতের মেহেন্দি কেমন হইছে আনাস ভাইয়া?
আইরা নিজের দুহাত মেলে আনাস সের সামনে মেলিয়ে দিতে দিতে বলল,আনাস আরচোখে আইরা হাত দেখে বলে উঠলো,

” গুড, এখন সামনে থেকে সর! আমাকে রুমে যেতে দে।
“ভালো করে খেয়াল করে দেখে, বলো না আনাস ভাই প্লিজ?
আইরা-র আবদার করে বলায় আনাস ভ্রুকুচকে আইরার মুখের দিকে তাকালো। আইরা আনাস সের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখার জন্য পুনরায় মুখ দিয়ে ইশারা করে দেখতে বলল। আনাস বার্ধ্যতামূলক আইরা হাতের দিকে তাকালো।হাত ভর্তি মেহেদীর মধ্যে দু’হাত এক করে হাতের তালুতে লাভ রাখা। লাভের মধ্যে, দু’হাতে দুইটা A লেখা। আনাস অক্ষর টা একপলক দেখে আইরা কে দেখলো। পরোক্ষনে পাশ কাটিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো। আইরা থায় জায়গায় দাঁড়িয়ে আনাস কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
” জিজ্ঞেস করলে না, দুইটা A কেনো?
“তোর হাত, তুই যা ইচ্ছা লেখতে পারিস, দুইটা A লেখবি না পুরো হাত A লেখবি, এটা তোর প্রবলেম আমার না!
কথাটা বলে আনাস নিজের রুমের দিকে চলে গেলো, আইরা আনাস সের যাওয়ার দিকে আশাহত চাওনি তে চেয়ে রইলো।

লেডিস এন্ড জেন্টলম্যান অ্যাটেনশন প্লিজ, আমাদের মধ্যে এবার পারফরম্যান্স করতে এন্ট্রি নেবে দুটো পথচারী। আমাদের ষ্টেজে আসার জন্য আহবান জানাচ্ছি। আমার দুই সন্মানিত বড়ো ভাই প্লিজ ওয়েলকাম আশিক এবং আদিল ভাইয়া কে, একটা তালি হয়ে যাক দু’জনের জন্য প্লিজ!
আহিন ষ্টেজে মাইক হাতে নিয়ে বকবক করার মধ্যে আশিক স্বাভাবিক ভাবে একটু ভাব নিয়ে ষ্টেজে ওঠলো। সবাই হাতের তালি দিতে দিতে উৎসহ দৃষ্টিতে ষ্টেজের দিকে তাকিয়ে রইলো, কয় সেকেন্ডের মাথায়, একজন কে ধীরে পায়ে ষ্টেজে উঠতে দেখা গেলো। মাথার চুলগুলো উসখুস, পড়নে সবুজ পাঞ্জাবির সঙ্গে একটা লঙ্গি পড়া, বড়োরা সবাই অবাক হয়ে আগ্রহ নিয়ে চেয়ে রইলো। আর ছোটরা আদিলকে ষ্টেজে উঠতে দেখে চিল্লিয়ে উঠলো।
আদিল ষ্টেজে ওঠে আশিকের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে মুখচোখ আসহায় সেজে বলে উঠলো,

” ভাইয়া দুইদিন ধরে কিছু খাইনা আমাকে পাঁচ-দশ টাকা দান করেন,
আশিক আদিলের মাথা থেকে পা অবধি পরক করতে করতে বলে উঠলো,
“পাঁচদশ টাকা দিবো হাত-পা তো ঠিকঠাক দেখতাছি, শরম লাগে না মানুষের থেকে টাকা চাইতে?
“না!
আদিলের কথায় সবাই শব্দ করে হেসে উঠলো, আশিক অবাক হওয়ার ভান করে পুনরায় আদিল কে বলে উঠলো,
” ভাই পাঁচ-দশ টাকা দিয়ে কী হবে তোর?
“তাহলে পাঁচ-দশ হাজার দিয়ে দেন!
আশিক চোখবড় বড়ো করে, হাতটা আদিলের দিকে দিয়ে বলে উঠলো,
” পাগল নাকি, যা ভাই যা নেই আমার কাছে এত টাকা!
“ভাই দেন ভাই দেন, আল্লাহ রহমতে আপনার সরকারি চাকরি হয়ে যাবে।

” সরকারি চাকরি, কিন্ত আমার তো আগে থেকেই চাকরি আছে ?
“ও আচ্ছা, তাহলে আপনাকে সুন্দর একটা বউ দিবে!
আদিলের কথায় আশিক কান্নার নাটকীয় ভঙ্গীমায় চোখে হাত দিয়ে বলে উঠলো,
” দিয়েছিলো ভেগে গেছে।
পুনরায় সবাই শব্দ করে হেসে উঠলো, আদিল মাথায় হাত দিয়ে নাটক করে বলতে শুরু করলো,
হায় হায়, আপনার কপাল তো আমার থেকেও খারাপ, তাহলে আপনার বাবা মাকে আল্লাহ তাআলা সুস্থতা দান করবে! ভাইয়া দেন না কয়েক টা টাকা?

“আমার বাবা-মা বেঁচে নেই।
আদিলের কথায় আশিক ষ্টেজে বসে কান্না করতে করতে বলল কথাটা। আর আদিল আশিকের পাশে, ষ্টেজে বসতে বসতে নিজের পড়নের লঙ্গি হালকা উপরে তুলে আশিকের চোখের পানি মুছে দিতে দিতে পুনরায় বলল,
” আল্লাহ তাহলে আপনার বোনের বিয়ে ধুমধামে দিওয়ার রহমত দিবে!
“আমার বোন তো নেই ভাই?
“হায় রে কষ্ট রে, তাহলে অন্তত আপনার ভাইতো থাকবে তার করে দিবে?
” ছিলো, কিন্তু ওই হারামখোর তো আমার বউটাকে নিয়ে ভেগে গেছে।
আশিক আদিল কে জরিয়ে ধরে হাওমাও করে কান্না করতে করতে বলল কথাটা। আদিলও আশিক কে জরিয়ে ধরে কান্না করে শান্তনা দিতে দিতে ব’লে উঠলো,

“থাক ভাই আপনাকে আর টাকা দিতে হবে না, আপনার কষ্টের কথা শুনে আমার খিদে পালিয়ে গেছে।
সঙ্গে সঙ্গে সবাই হাসতে হাসতে হাত তালি দিয়ে উঠলো, আর মেয়েরা চিল্লিয়ে উঠলো। হানিয়া মেহেদী হাতে ছোট্ট করে A+H, লেখে নিয়ে পারফরম্যান্স এনজয় করছে আর মাঝেমধ্যে তাকবীর কে এক নজর দেখার আশায় এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে। তাকবীর কে দেখতে না পেয়ে এবার নিজেই ওঠে দাঁড়ালো। তাকবীরের কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্য তালুকদার বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। হানিয়া ধীরপায়ে তালুকদার বাড়িতে প্রবেশ করে সিড়ি দিয়ে ওঠে তাকবীরের রুমের দরজায় নক করতেই একা একা দরজা খুলে গেলো। হানিয়া তকবীর কে রুমে না পেয়ে বেলকনির উদ্দেশ্য পা বাড়াতেই নিজের ভাই আর তাকবীরের কথা শুনে পা দুটো থেমে গেলো।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ১৯

” ব্রো এভাবে জীবন চলে না, তুমি আমার কথাটা একটু ভেবে দেখো প্লিজ?
“আমি একদম ঠিক আছি,আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। তোর বোনকে বোঝা তাকবীর কে ভুলে যেতে।
আর শোন,
“সে আমার হোক বা না হোক সারাজীবন তাকবীরের মনে শুধু তার রাজক্ত চলবে।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২১