তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২১
জান্নাতি আক্তার জারা
তালুকদার বাড়ির গার্ডনে আরিশার জমজমাট মেহেন্দি অনুষ্ঠানে হইহুল্ল চলছে। হাবীব অনুষ্ঠান থেকে ধীরপায়ে তালুকদার বাড়িতে ধুঁকে তাকবীরের রুমের বেলকনির দিকে এগিয়ে আসলো। তাকবীর কে গম্ভীর মুখে দুতালায় নিজের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে নিচে গার্ডনের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাবীব গলা খাঁকারি দিয়ে তাকবীরের পাশে এসে দাঁড়ালো।
“ব্রো তোমার কাছে আমি একটা আবদার নিয়ে এসেছি, প্লিজ কথা দেও ফিরিয়ে দিবে না?
” তোর আবদার আমার সাদ্যর বাহিরে, সরি।
তাকবীরের উত্তরে হাবীব চমকে তাকবীরের দিকে তাকালো। হাবীব কী আবদার নিয়ে তাকবীরের সামনে এসেছে তাকবীর আগে থেকেই জানে। এটাও হয়তো জানা ছিলো হাবীব বোনের হয়ে তাকবীর কে চাইতে আসবে। এজন্য তো কেনো প্রশ্ন না করে খুব স্বাভাবিক ভাবে হাবীবের কথায় উত্তর দিচ্ছে, আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলো হয়তো হাবীবের কথায় উত্তর দিওয়ার জন্য। তাকবীর গার্ডনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি রেখে হাবীবের দিকে তাকালো। নিমেষেই হাবীবের চোখে মুখে হতাশা খেলা করলো। বন্ধুত্ব রাখতে গিয়ে নিজের বোনকে কথা দিয়ে কথা না রাখার হতাশা। হাবীব ঠান্ডা গলায় পুনরায় বলে উঠলো,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“আমার বোনটা খুব সরলসোজা, ওকে আমি কথা দিয়েছিলাম ওর মনের আশা আমি নিজ দায়িত্বে পালন করবো। আমি চাইছিলাম সুযোগ করে আমার বোনের জন্য তোমাকে চাইবো। কিন্তু ওইদিন তোমার চোখে আরাতের জন্য দুর্বলতা দেখতে পেয়ে!
“হ্যাঁ শুধু সে আমার দুর্বলতা না। মনে হয় সে আমার ভিতরের প্রান। ওকে ছাড়া অন্য কাউকে নিজের সঙ্গে কল্পনা করতেও পাড়বো না সরি।
তাকবীরের কথায় হাবীবের মনে হতাশা সঙ্গে মন খারাপ গুলো ঝেঁকে ধরলো।নিজের বোনের কথা না রাখতে পাড়ার হতাশার সঙ্গে, বন্ধুর এক তরফা ভালোবাসা যোগ হয়ে গেলো। হাবীব এখন কিভাবে বলবে। তার বন্ধু যে আরাত কে নিজের প্রায় দাবী করে, হানিয়া কে প্রত্যাখান করতেছে। সেই আরাতের মনে অন্য কে ভালোবাসা হয়ে এসেছে। হাবীব কথা গুলো ভেবে ছোট্ট একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে তাকবীর কে বলে উঠলো।
” তোমার থেকে পারমিশন না নিয়ে, তোমার আর হানিয়ার বিয়ের সম্বন্ধন রেখেছি আঙ্কেল আন্টি কাছে। উনারা হানিয়া কে নিজের পুত্রবধূ হিসাবে পছন্দ করেছেন।
তাকবীর কে এখনো খুব স্বাভাবিক দেখা গেল। এই কথাটাও হয়তো তাকবীরের পূর্ব থেকে জানা ছিলো। শুধু তাকবীরের মুখ টা গম্ভীর হয়ে এলো, গম্ভীর মুখে হাবীবের চোখে চোখ রেখে শান্ত মেজাজে বলে উঠলো তাকবীর,
“তুই হয়তো নিজের বোনের কথা রাখতে গিয়ে ভুলে গিয়েছিস, বিয়ে টা নির্ধারিত হয় একটা ছেলেমেয়ের মনের উপর, এখানে ফ্যামিলির শুধু মন্তব্য থাকে।
” ব্রো, তুমি মেবি আরাতের মনের ভাষা বুঝতে পেরে গেছো এ-ই কয়েক দিনে। আরাতের মনে অন্য কেউ রয়েছে।
“তো?
তাকবীরের গা ছাড়া ভাব দেখে হাবীবের মুখে বিরক্তি ফুটে উঠলো ,
” তো মানে কী ব্রো, তুমি কী আরাত কে জোর করে নিজের করে নিতে চাইছো এখন?
“নো!
হাবীব তাকবীরের কাছে নির্ধারিত উত্তর না পেয়ে নিজের বোনের কথা রাখতে পুনরায় একটু হতাশা মুখ নিয়ে আবদার করে বলে উঠলো,
” ব্রো এভাবে জীবন চলে না, তুমি আমার কথাটা একটু ভেবে দেখো প্লিজ?
“আমি একদম ঠিক আছি,আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। তোর বোনকে বোঝা তাকবীর কে ভুলে যেতে।
আর শোন,
“সে আমার হোক বা না হোক সারাজীবন তাকবীরের মনে শুধু তার রাজক্ত চলবে।
তাকবীরের কথায় হাবীর নিজের বোনের হয়ে জোর করতে পারলো না, সত্যি তো কারো প্রতি ভালোবাসা মন থেকে আসে। ভালোবাসার প্রতি কারো জোর থাকে না। যেমন হানিয়া তাকবীর কে পুরোটা না জেনে, চিনে নিজের মনে জায়গা দিয়েছে। ঠিক তেমনি গম্ভীর তাকবীর নিজের অজান্তে আরাত কে নিজের মনে জায়গা দিয়েছে। অথচ আরাতের মনে মাহির ছেলেটার প্রতি দুর্বলতা কাজ করে। হাবীব কিভাবে সামাল দেবে নিজের আদরের বোন কে, কথা গুলো মনে মনে ভেবে হতাশা মুখ নিয়ে পুনরায় বলে উঠলো,
” যে মেয়ের কারণে আমার বোন কে ফিরিয়ে দিচ্ছো, সে তো তোমাকে কখনো ভালোবাসার নজরে দেখে না। তাহলে কেনো ফিরিয়ে দিচ্ছো আমার বোনটাকে?
“তুই পারবি সন্ধ্যার জায়গায় অন্য কাউকে বসাতে?
হাবীব তাকবীরের কথায় উওর করতে পারলো না। নিশ্চুপ হয়ে তাকবীরের দিকে চেয়ে রইলো। তাকবীরের এই একটি বাক্যয় হাবীবের মুখ বন্ধ করার জন্য যেন যথেষ্ট ছিলো। সত্যি তো হাবীব শুধু নিজের বোনের কথা ভেবে এসেছে। একবার তাকবীর কে নিজের জায়গায় দাড় করালে হয়তো হাবীব তাকবীরের কাছে নিজের আত্মসম্মন নষ্ট করতে আসতো না। তাকবীর যেমন সবসময় চুপচাপ গম্ভীর স্বভাবের ছেলে ঠিক হাবীবও, সবসময় সিরিয়াস। এইতো নিজের বোনের জীবনটাকে হাবীর অগ্রিম পড়ে ফেলছে। তার বোনটা অতি সহজ-সরল, তাকবীর কে সেই প্রথম দেখার পর থেকে ধীরে ধীরে নিজের ভালোবাসা ভেবে এসেছে। আর সেই ভালোবাসার সাক্ষী হিসাবে হাবীব তার বোনকে উৎসহ দিয়ে এসেছে, আজ সেই বোনকেই নিজের মুখে কিভাবে বলবে। তাকবীর কে ভুলে যা বোন। কিভাবে চোখের সামনে দেখবে বোনের ভালোবাসা বিসর্জন দিতে। তাকবীরের কথায় উত্তর না দিয়ে হাবীব কে নিচের দিকে মাথা ঝুকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাকবীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে উঠলো,
“আমি ফিরিয়ে দিচ্ছি না তোর বোন কে। আমি যাকে নিজের সঙ্গে কল্পনা করতে পারছি না, তাকে সুখে রাখবো কিভাবে বল। অতএব তোর বোন কে ভুলে যেতে বল এই…..
“কেনো ভুলে যাবো আমি, কেনো কেনো কেনো। কেনো ভুলে যাবো তুমি বলতে পারো হ্যাঁ। তোমাকে কি আমি ভালোবাসতে পারি না, নিজের করে চাইতে পারি না বলো। এটাইতো সুযোগ তোমাকে নিজের করে পাওয়ার। আমাদের ইসলামে তো সাতজনম নেই। তাহলে কেনো ভুলে যেতে বলছো আমাকে। তোমাকে আমি এজনমে হারিয়ে ফেললে পরপারেও পাওয়া হবে না যে আমার!
হাবীব নিজের বোনের কন্ঠ শুনে মাথাটা উপরে তুলতেই চোখে পড়লো। হানিয়া বিভ্রস্ত চোখমুখ নিয়ে দু-হাত দিয়ে তাকবীরের টি-শার্টের কলার চেপে ধরে কান্না করতে করতে প্রশ্ন করছে তাকবীর কে। তাকবীর এতক্ষণ শান্ত থাকলেও এবার যেন হানিয়া টির্শাটের কলার চেপে ধরায় শান্ত থাকতে পারলো না। নিমিষেই চোখমুখ লালবর্ণ ধারণ করলো তাকবীরের। দাঁতে দাঁত চেপে হাবীবের দিকে তাকিয়ে রইলো। হাবীব তাকবীরের দিকে তাকিয়ে অবস্থা বিগতি দিকে যাচ্ছে ভেবে নিজের বোন কে তাকবীরের থেকে ছাড়াতে এগিয়ে এলো। এতক্ষণ হানিয়া-র জায়গায় একটা ছেলে থাকলে তাকে হয়তো তাকবীরের কলার ধরার অপরাধে অজ্ঞাত আবস্থাতে পাওয়া যেতে না। তাকবীর গম্ভীর থাকলেও নিধারিত ভদ্র স্বভাবের। কেউ থাপ্পড় মারবে তবুও চুপচাপ মেনে নিবে বাট কেউ কালার ধরবে তো তাকে বিছানায় পড়ে থাকতে হবে। মেয়ে দেখে হয়তো বেঁচে গেলো এই যাত্রায় হানিয়া। হানিয়া তাকবীরের রুমে দাঁড়িয়ে হাবীব এবং তাকবীরের নিজ কথকথন শুনছিলো। তাকবীরের প্রত্যাখানে নিজেকে দমিয়ে রাখতে না পেয়ে রুম থেকে কান্না করতে করতে বেলকনিতে দৌড়ে গিয়ে তাকবীরের কলার চেপে ধরে প্রশ্ন করতে লাগলো।
তাকবীর কে হাবীবের দিকে দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। পুনরায় হানিয়া তাকবীরের একহাত নিজের দু’হাতে মধ্যে নিয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলে উঠলো,
“ওই তাকবীর আমার দিকে চেয়ে দেখো না, দেখো! দেখো, আমি আরাতের থেকেও বেশি রুপবতী, একবার চেয়ে দেখো প্লিজ! দেখো আমার দিকে, ওই তাকবীর আমাকে একবার ভালোবেসে দেখো আমি আমার ভালোবাসার কমতি রাখবো না। আরাত তো তোমাকে ভালোবাসে না। আরাত যদি তোমাকে ভালো না বেসে তোমার ভালোবাসার মানুষ হতে পারে। তাহলে আমি কী অপরাধ করলাম কেনো তোমাকে ভালোবেসেও তোমার ভালোবাসা পাবো না বলো, কেনো?
হাবীব তাকবীরের কাছে থেকে হানিয়া কে ছড়িয়ে নিলো নিজের বুকের সঙ্গে জরিয়ে ধরে সান্ত করতে লাগলো। তাকবীর খুব বড়ো করে নিঃশ্বাস নিয়ে হাবীবের থেকে চোখ উঠিয়ে পুনরায় গার্ডনের চোখ রাখলো। যেখানে বক্সের তালে তালে ডান্স দিয়ে মাটিয়ে তুলছে আশিক আদিল আর আরশ সঙ্গে আহিন আলভী। আর গেস্টরা নিজেদের চেয়ারে বসে সেই ডান্স গুলো এনজয় করছে। তাকবীর দূর থেকে আরাত কে লক্ষ করে বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠলো। নিজের চোখের সামনে খুব গোপনীয় ভালোবাসার মানুষটার মনে অন্য কারো জন্য ভালো লাগা দেখে । তাকবীর সেদিকে তাকিয়ে হানিয়া-র উদ্দেশ্য বলে উঠলো,
” অবশ্যই তুমি আমার থেকে ভালো কাউকে পাবে,
” কিন্তু আপনাকে না!
হানিয়া-র কথায় তাকবীর গার্ডনের দিকে তাকিয়েই নিজের উপর ক্ষিণ তাচ্ছিল্য হাসলো। হানিয়া হাবীবের বুক থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কথাটা বলল,হাবীব নিজের বোনের কথায় বুঝতে পারলো বোনের অভিমান জমে গেছে।তাকবীর কে কিছুক্ষণ আগে তুমি করে সম্বোধন করা হানিয়া এখন আপনি করে সম্বোধন করছে। কিন্তু যার উপর অভিমান করছে সে তো অভিমান করা মায়াবী মুখটায় একবারও ফিরে চাইলো না। হাবীবের নিজেকে নিজের বোনের অপরাধী মনে হতে লাগলো। কেনো বা এতদিন বোনকে বন্ধুর প্রতি দূর্বল হতে দেখে আরছে। তাকবীর ঠান্ডা গলায় হানিয়া কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
“তুমি অভিমান করে আপনি বলতে শিখে গেছো, অতএব সময় নেও আমাকেও ভুলে যেতে শিখে যাবে।
” আপনার কথাটা আল্লাহ হয়তো একদিন কবুল করবে, কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি চাইনা কবুল হোক। আমি চাই আপনি আমার মনের এককোণে সারাজীবন এক চিমটি সুখ হয়ে থেকে যায়।
সময়টা যেন থমকে গেলো বেলকনিতে তিনজন মানুষ যেন অন্য দুনিয়া রয়েছে হাবীব চুপচাপ নিজের বোনের দিকে চেয়ে রইলো। হানিয়া দু সেকেন্ড চুপ থেকে পুনরায় ব্যাথাতূর হৃদয় নিয়ে বলতে শুরু করলো,
“প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে এই দেয়াটা করবো। আমি আপনাকে না পেলাম,আপনি আপনার ভালোবাসাকে নিজের করে পান। আর আমি যেনো আপনাকে ছাড়া ভালো থাকতে পাড়ি। আমার সুখের দিনেও যেন হটাৎ করে আপনার কথা আমার মনে পড়ে। আপনার কথা মনে পড়তেই যেন আমি আপনার হাসিখুশি জীবনটাকে মনে করে নিজের সুখের দিনটা আরো সুখময় হয়ে উঠে।
তাকবীরের হয়তো কথাটা বুকে গিয়ে লাগলো, তাকবীর গার্ডেন থেকে চোখ তুলে অবাক চোখে হানিয়া-র দিকে তাক করলো, হানিয়া দু-হাত দিয়ে দু-চোখের পানি মুছে পুনরায় বলে উঠলো,
” একটা আবদার রাখবো শুনবেন?
তাকবীর নিশ্চুপ, হাবীব বোনের কথায় তাচ্ছিল্য হাসলো। তার বোন আবদার করছে তাও আবার অবুঝ ব্যাক্তির কাছে। যে কি-না সহজে পাওয়া ভালোবাসা কে নিজের করে রাখতে চায় না। যে কিনা নিজের ভালোবাসার মানুষ কে চোখের সামনে অন্য কাউকে ভালোবাসতে দিচ্ছে। তার কাছে, হানিয়া তাকবীর কে উওর করতে না দেখে মলিন হাসলো,
“আমার মতো চোখের সামনে নিজের ভালোবাসার মানুষ টাকে অন্য কারো হতে দিয়েন না। আপনি আপনার ভালোবাসা না পেয়ে কষ্ট পাবেন, বিশ্বাস করুন আমি আপনার সেই কষ্ট সহ্য করতে পাবো না!
কথাটা বলে হানিয়া নিজের চোখের পানি পুনরায় মুছতে মুছতে বেলকনি থেকে রুম দিয়ে নিচে নেমে চলে গেলো। হাবীব নিজের বোনের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
“শুনছিলাম যে ভাগ্যে থাকে না তার প্রতি ভালবাসা টা খুব ভয়ংকর হয়!
হাবীব তাকবীরের দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে পুনরায় বলে উঠলো,
“লাইটটা হয়তো আমার বোনের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে। ভালোবাসার প্রতি কারো জোর নেই। তবে তাকে পাওয়ার জন্য নিজের মধ্যে অধিকার সৃষ্টি করতে হবে,যেইটা তোমার মধ্যে আমি দেখতে পাই না। আর আমি আমার সমস্তদিয়ে চেষ্টা করবো তোমাকে ছাড়া আমার বোনকে সুখে রাখার।
হাবীব চলে গেলো, তাকবীর হাবীবের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে পুনরায় ঘুরে গার্ডেনে আরাতের উপর চোখ রেখে বিরবির করলো।
” আমি আমার রবের উপর নির্ভরশীল। তার উপর আমার এখনো কেনো অধিকার নেই। আমি আমার রবের কাছে তাকে নিজের করে পাওয়ার আর্জি জানায় প্রতিনিয়ত। ইনশাআল্লাহ আমার রব আমার ইচ্ছা গুলো খুব যন্তসহ কারে কবুল করবে।
আনাস ধীরপায়ে তাকবীরের পাশে এসে দাড়ালো, তাকবীরের বিরবির কথা কানে এসে ধরা দিলো যন্তসহকারী অনূভুতি এক রূপ। তাকবীর আনাস সের উপস্থিত বুঝতে পেয়ে হাতে হাত ভাজ করে মাথাটা অন্ধকারময় আকাশের দিকে তাক করলো। আনাস তাকবীরের দিকে চেয়ে মুচকি হেসে বলে উঠলো,
” আমার চঞ্চল বোনটাকে কবে থেকে এতটা ভালোবাসো ভাইয়া?
“জানি না!
” তুমি তো চাইলে পরিবার কে মানিয়ে আরাত কে নিজের করতে পারো?
“এখানে যদি অন্য কেউ তোর বোন কে চাইতো! তাহলে আমি তোর বোনকে আমার করে নিতাম। বাট এখানে তো তোর বোন অন্য কাউকে চায়। তাহলে বল আমি কী করবো?
সময়টা দুপুর ১২:৪৩ ঘরে হবে, আরাত আইরা মিলে তালুকদার বাড়ি থেকে শেখ বাড়িতে যাচ্ছে ফুল বাগানে ফুল তুলতে। তালুকদার বাড়ির ফুলবাগানে গোলাপ ফুল বেলি ফুল পাওয়া গেলেও গাধা ফুল নেই। আইরা আরাত কে বলে তাদের ফুলবাগানে হয়তো দুটো গাছে পাওয়া যাবে গাধা ফুল। মায়া সন্ধ্যা কে বেলি ফুলের মালা গাঁথাতে দিয়ে আরাত আইরা দুজন মিলে চললো শেখ বাড়ির দিকে। শেখ বাড়িতে এসে আরাত আইরা ফুল বাগানের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখে দুটো গাছের মধ্যে একটাতে কয়েকটা গাধা ফুল ফুটেছে। এই কয়েকটা ফুল দিয়ে হবে না বিধায় দুজন চিন্তিত হয়ে ফুল বাগানে বসে থেকে ঠোঁট উল্টিয়ে ভাবতে লাগলো, কি করা যায়। আনাস কে বললে বাজার থেকে এনে দিতে দিতে সন্ধ্যার দিকে দিবে। ফুল তো লাগবে দুপুর পর। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আইরা হটাৎ চিৎকার দিয়ে দাঁড়িয়ে পরলো।
” ইয়াহু আইডিয়া পেয়ে গেছি!
“মানে, কী আইডিয়া পেয়ে গেলো আপু?
আইরা হাসিমুখে আরাতের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
” তুই কখনো আমাদের বাড়ির পিছনের রাস্তায় দিকে গেয়েছিস?
আরাত মাথা নাড়ে না বুঝালো, আইরা পুনরায় খুশি হয়ে উৎফুল্লতা মুখে বলে উঠলো,
“চল, কয়েকটা বাড়ির পিছনে একটা পুকুর রয়েছে, এবং পুকুরের পিছনে একটা ফুলের বড়ো বাগান আছে!
” আমরা তো নিজেদের সঙ্গে করে টাকা নিয়ে আসিনাই আপু, দাঁড়াও আমি বরং আনাস ভাইয়া কে ফোন করে বলে দেয় এদিকে আসতে!
কথাটা বলতে বলতে আরাত ফোন বের করে আনাস কে ফোন করতে যাবে, আইরা আরাতের হাত থেকে ফোনটা কেরে নিয়ে বলে উঠলো,
” একদম না,আজকে আমরা ফুল চুরি করবো!
“কীহহহহহহ?
” হ্যাঁ চল আমার সঙ্গে!
কথাটা বলেই আইরা আরাতের হাত ধরে শেখ বাড়ির পিছনে রাস্তা দিয়ে হাটা ধরলো। আইরা কথায় আরাত তব্দা খেয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষণ। আরাতের চোখমুখে ভয় ফুটে উঠেছে। আরাত নিজের হাত আইরার হাত থেকে সাড়াতে সাড়াতে বলে উঠলো,
“আপু প্লিজ আনাস ভাইয়া কে ফুলের কথা বললে আমাদের ফুলের সাগরে ডুবিয়ে রাখবে। এই বয়সে ফুল চুরি করতে গিয়ে মান সম্মান হাড়িয়ে ফেলো না আপু, আমার ভবিষ্যৎ বরের বউ কে তুমি চুন্নির তাগ লাগিয়ে দেও না। একবার যদি ধরা পড়ে যায় তাহলে আমার মান আর তোমার সম্মান দুটোই উগান্ডায় চলে যাবে!
” আরে চুপ করবি তুই, তোর এত অতিরিক্ত বকার জন্য ধরা পড়ে যাবো। চুপচাপ চলতো ফুলবাগানে কেউ নেই এখন, ফুলের মালি মেবি নামাজের জন্য মসজিদে গিয়েছে।
“তারপরও ভরদুপুরে চুরি করা ঠিক হবে না আপু, চলো না ফুল কিনে নিয়ে যায় ?
” আরে চুরি করা জিনিসের মজায় অন্য রকম, চল কিছু হবে না!
দুজন চুপিচুপি বাগানের সামনে এসে আসেপাশে তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই, পুনরায় এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে ফুল বাগানে ঢুকে গেলো দুজন, আইরা গাধা ফুল কয়েকটা ছিড়ে নিজের ওড়নাতে রাখলো। আরাত আশেপাশে তাকাতে তাকাতে একটা গোলাপ গাছে লাল গোলাপ চোখে পড়লো। আরাত গোলাপ টা ছিড়ে হাতের মুঠোয় নিয়ে চোখ বন্ধ করলো। নিজের ভাবনায় মাহিরের মুখটা ভেসে উঠলো আরাতের। আরাত চোখ খুলে মুচকি হাসি দিয়ে গোলাপের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো
“আমার জীবনে ফুল হয়ে এসো, মানুষ যেমন শুকিয়ে যাওয়া পাপড়ি ডায়েরির ভাঁজে যত্ন করে রেখে দেয়, ঠিক সেভাবে নিজের মনে খুব যত্ন করে রেখে দিবো তোমাকে!
” যদি ফুলটা ছিড়ে হাতে নেওয়ার আগেই কাঁটার আঘাত হানে, তখন কী করবি!যত্ন করে রেখে দিতে পারবি তো কাঁটা ওয়া ফুল কে?
“ফুল প্রেমী মানুষ কাঁটার পরোয়া করে না আপু
তারা সকল কাঁটা অপেক্ষা করে ফুল নিতে চায়।
” কারো প্রেমে পড়েছিস?
“প্রথম দেখাতেই!
আইরা এবার বেশ অবাক চোখে তাকালো আরাতের দিকে। আজ কেমন যেন আরাতের মধ্যে প্রেম প্রেম গন্ধ পাচ্ছে। পরক্ষণে আরাত কে বেশি না ঘাটে তাড়াহুড়ায় ফুল ছিড়তে লাগলো আইরা। আরাত দুএকটা ফুল ছিঁড়ে নিজের কানে গুঁজে দিতে দিতে গুনগুন করে উঠলো,
“বাড়ির পাশে ফুলবাগানে নানার রঙ্গের ফুল,
হেই__বাড়ির পাশে ফুলবাগানে নানার রঙ্গের ফুল ,
ফুলের গন্ধে হায় হায়, ফুলের গন্ধে আসলাম সইগো। ফুলের গন্ধে আসলাম সইগো __চুরির নাই কূল রে, বসন্ত বাতাসে হাই রে বসন্ত বাতাসে।
” গানটা কে গলা চেপে মাদার না করলে কী বেশি ক্ষতি হয়ে যেতো অদ্ভুত মেয়ে?
আরাত বাগানের মালি এসেছে ভেবে দৌড়ে আইরার পিছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়লো৷ আর আইরা ধরা পড়ে গেলো ভেবে চমকে ওঠে সামনে দিকে তাকালো। আইরা সামনে দিকে তাকাতেই মাহির আর রাফি কে বাগানের পাশ ঘেঁষে ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। কনুই দিয়ে আরাত কে ঘুঁটা দিতে লাগলো, আরাত কে পিছনে থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য। আরাত আইরার পিছনে থেকে উঁকি দিয়ে রাফি আর মাহির কে দেখতে পেয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে গলা খাঁকারি দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো,
“ও বিয়াই সাব আপনি! আমি তো ভেবেছি__হুহুহুহু কেমন আছেন বিয়াই সাব?
” কী হইলো অদ্ভুত মেয়ে তুমি কথা ঘুরালে কেনো?
মুখ ফসকে নিজেদের চমকে উঠার কারণ টা বলে ফেলতেই পুনরায় আইরা, আরাত কে কনুই ঘুঁটা দিয়ে বলতে বারণ করলো। আরাত কথা ঘুরাইতে মাহিরের প্রশ্নর মুখে পড়তে হলো। আরাত এবার বেশ লজ্জা পেলো, কিভাবে বলবে ওরা ফুল চুরি করতে এসেছে । আর বললে মাহির আরাত কে বাজে মেয়ে যদি মনে করে তাহলে। রাফি আইরার ওড়নার দিকে খেয়াল করতেই, ওড়নায় মধ্যে অনেক গুলো গাধা ফুল দেখতে পেলো। রাফি এবার আইরা কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
” বিয়াইন আপনারা কী আমাদের মতো ফুল চুরি করতে সরি সরি মাই মিস্টেক কিনতে এসেছেন?
মাহির রাফির পায়ে পা দিয়ে ঘুঁটা দিতেই সত্যিটা চেপে গেলো রাফি। চতুর আরাত রাফির কথা ধরে ফেলে বলে উঠলো,
“চুরি করতে মানে? আপনার এখানে ফুল চুরি করতে এসেছেন?
মাহির রাফির কথায় নিজের ফোনটা বের করে ফোন ঘাটাঘাটি করতে করতে একটু ভাব নিয়ে বলে উঠলো,
” আমাদের কাছে কী টাকার কমতি রয়েছে নাকি, যে ফুল চুরি করতে আসবো?
মালি__”কে ওখানে? কে কথা বলছে?
“আইরা আপু বাঁচতে চাইলে পালাও!
মালির কন্ঠ শুনতে পেয়ে আরাত এলোপাতাড়ি দৌড়াতে শুরু করলো, আরাতের পিছনে আইরা, আইরার পিছনে রাফি মাহির। চারজন এলোপাতাড়ি দৌড়াতে দৌড়াতে ফুল বাগান ছেড়ে পুকুর পাড়ে বিপরীত সীমান্ত এসে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলো, আরাত কোমরে হাত রেখে হাঁপাতে হাঁপাতে রাফি মাহির কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২০
” আপনার দুজন দৌড়ে এলেন কেনো?
” মেয়েরা একা একা দৌড় দিচ্ছে ব্যাপারটা কেমন বেমানান দেখাচ্ছে। তাই আপনাদের সঙ্গে দৌড় দিয়ে এনজয় করলাম একটু ।
রাফি আইরা কে রাগাতে বলে উঠলো কথাটা, আইরা রাফির কথায় বিরক্তি নিয়ে বলে উঠলো,
“মিথ্যা না বলে বললেই তো হয় ফুল চুরি করতে এসেছেন!
মাহির মাথা চুলকে মুচকি হেসে বলে উঠলো,
” সেম সেম বাট কিছুটা ডিফারেন্ট, ফুল চুরি করতে এসে এভাবে সারপ্রাইজ হতে হবে কল্পনার বাহিরে ছিলো।
