Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩০

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩০

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩০
অনামিকা তাহসিন রোজা

অনেক সময় ভাগ্য সহায় হয়ে যায়। এ পৃথিবীতে অনেক সময় মনে হয়, ভাগ্য আর প্রকৃতি যেন হাত ধরে কাজ করে। অদৃশ্য এক স্রোত আমাদের পরিকল্পনার সাথে মিলে যায়, ঠিক সময়ে সবকিছু গুছিয়ে দেয়। হঠাৎ করে আকাশে জমে থাকা মেঘ যেমন অপ্রত্যাশিতভাবে বৃষ্টি নামিয়ে জমিনকে সজীব করে তোলে, তেমনি কোনো এক অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তে বাতাস দিক বদলে দেয়, কাকতালীয়ভাবে সঠিক সুযোগটুকু এনে দেয় আমাদের দরজায়। কখনো যে বাস মিস করেছে বলে মানুষ আফসোস করছিল, সেই আফসোসই হয়তো অনেক বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়। অথবা এক অজানা বিলম্ব হঠাৎ করে আমাদের সঠিক মানুষের সাথে দেখা করিয়ে দেয়। মনে হয়, প্রকৃতির অদৃশ্য হাতে লেখা কোনো নকশা আছে, যা নিঃশব্দে ভাগ্যকে সাথে নিয়ে আমাদের পথ মসৃণ করে। এই রহস্যময় সহায়তা বুঝিয়ে দেয়, সবকিছু সবসময় আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও, কখনো কখনো পৃথিবী নিজেই আমাদের পক্ষ নেয়, ঠিক তখনই যখন আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার। ঠিক এমনটাই ঘটলো আজ ধারার সাথে।

ধারা যখন আকাশীরঙা শাড়িটা নিয়ে ছুটে গেলো এক অদৃশ্য অস্ত্রে শেখ বাড়ির শ্রাবণ শেখকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে, তখনি সালমা বেগমের এক বান্ধবী অসুস্থ হয়ে গেলেন। সহসাই রূপ বদল হলো। সালমা বেগম ধারাকে জানিয়ে দ্রুতই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। অনেক ছোটবেলার বান্ধবী হুট করে অসুস্থ হয়ে পড়ায় বিষয়টা অনেক গুরুতর সালমা বেগমের কাছে। যতই হোক, তার বান্ধবীর তো বয়স হয়েছে। সৃষ্টিকর্তা না করুক, যদি খারাপ কিছু হয়ে যায়? তাই আগেভাগে দেখা করে আসা উচিত। তাই সালমা বেগম ফিরে আসবে কখন তার কোনো ঠিক ঠিকানা না দিয়েই চলে গেলেন। সামিউল শেখও রওয়ানা দিয়েছিলেন শাহেদ শেখের অফিসের উদ্দেশ্যে। আর এসব কারবার হা হয়ে দেখছিল ধারা। সে বুঝতেই পারছিল না হুট করে চোখের পলকে পুরো বাড়ি ফাঁকা হলো কেনো? কেনো হলো এমন? আজই কেন? ধারা তো এমন কিছু আশাই করেনি। সে তো শুধু শখ করে শাড়িটা পড়তে চেয়েছিল আর শিখতে চেয়েছিল কীভাবে শাড়ি পড়ে চলাফেরা করতে হয়। অথচ তার সাথে এমন অদ্ভুত কিছু হলো কেনো? হুট করে পুরো বাড়ি ফাঁকা করে দিয়ে সবাই চলে গেলো। বেচারি ধারা শাড়িটা পড়ে বসে রইলো সোফায়।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

অনেকক্ষণ থ মেরে বসে থাকার পর ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখলো সন্ধ্যা সাতটা পার হয়ে আটটার কাছে ঘড়ির কাঁটা চলে যাচ্ছে। তা দেখে রীতিমতো ঢোক গিলল মেয়েটা। এসব আবার কী? রাত হয়ে যাচ্ছে? তারমানে তো শ্রাবণ শেখ একটু পরেই ফিরে আসবে। কিন্তু উনি যদি ভুল বুঝে? যদি ভাবে যে ধারা ইচ্ছে করে শ্রাবণকে দেখাতেই শাড়ি পড়েছে? লজ্জা পেলো ধারা। ইচ্ছে করল শাড়িটা খুলে ফেলতে। তবে মনে মনে চাওয়া ইচ্ছে টাকেও মাটিচাপা দিতে পারল না। একটু ভাবলো মেয়েটা। লোকটা এসে কী ভাববে? আর তারই বা এখন কী করা উচিত?

ধারার বুকের ভেতর যেন ঢাক বাজতে লাগলো। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ কানে বাজছে। ধূসর আলোয় ভরা বসার ঘরটাও যেন হঠাৎ অপরিচিত মনে হচ্ছে তার কাছে। হাঁটু জোড়া একসাথে গুটিয়ে শাড়ির আঁচলটা বারবার আঙুলে মুচড়ে ধরছে। এতক্ষণ যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে শাড়িটা পরেছিল, তা মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, প্রতিটা কাপড়ের ভাঁজ যেন তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। হায় খোদা! এ কি অবস্থা! এ কি সাংঘাতিক অনুভূতি! তার মাথার মধ্যে চিন্তার ঢেউ একটার পর একটা আছড়ে পড়ছে। শ্রাবণ শেখ যদি ভাবে বেচারি মেয়েটা এটা ইচ্ছে করেই করেছে? যদি ভাবে, সে তাকে দেখানোর জন্যই এত আয়োজন? ধারা গলা শুকিয়ে আসা টা অনুভব করল। চোখ দুটো অকারণে টলমল করছে। হাতের তালুতে হালকা ঘাম জমেছে। সে শাড়ির পাড় দিয়ে কপালের ঘাম মুছল, আবার আঁচলটা ঠিক করতে গিয়ে অস্থির হয়ে পড়ল।

মনে একদিকে একটা ক্ষুদ্র উত্তেজনা জেগে উঠল। হয়তো শ্রাবণ শেখ এক ঝলক দেখবে, চোখে কিছু বলবে। হয়তো প্রশংসা করবে! কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেরই ভাবনায় লজ্জায় লাল হয়ে গেল। না না, ওসব কিছু না ভাবাই ভালো। মনে মনে বারবার নিজেকে ধমকাল ধারা। বিধিবাম! লাভের লাভ কিছুই হলো না। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক টান ধরছে। জানালার বাইরে থেকে যে হাওয়া ঢুকছে, সেটাও যেন তাকে খোঁচাচ্ছে, শাড়ির আঁচল নাচিয়ে তার অনিশ্চয়তাকে আরও বড় করে তুলছে। ঘরের নীরবতা তাকে অসহায় করে দিচ্ছে। সে কয়েকবার উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু আবার বসে পড়ল। মনে হলো, শ্রাবণ শেখের সামনে এভাবে শাড়ি পরে দাঁড়াতে গেলে তার গাল লজ্জায় পুড়ে যাবে। তবুও কোথাও না কোথাও সে চুপিচুপি এই মুহূর্তটাকে অনুভব করতে চাইছিল, হয়তো এটুকুই তার নিজের কাছে ছোট্ট স্বীকারোক্তি, যা কাউকে জানানো যাবে না।

এভাবে অনেকটা সময় পর ধারার মনে পড়লো একটা মিষ্টি জিনিসের কথা। কী যে হয়েছে মেয়েটার! মনে মনে লজ্জা পেলেও মন চাইছে নিজেকে আরেকটু সাজিয়ে তুলতে। শ্রাবণ শেখ কে চমকে দিতে মনটা উথাল-পাথাল হয়ে গেলো। শেষে ধারা পৃথিবীর সমস্ত সাহসগুলো একত্রিত করে বড় করে শ্বাস নিল। সে মোটেই ভয় পাবে না। তার তো কোনো অন্য উদ্দেশ্য নেই। শুধু শাড়িটা পড়ে শ্রাবণ শেখের কাছে জানতে চাইবে যে কেমন লাগছে। ব্যস! এটুকুই! হুম, এবার ধারা ঠোঁট ভিজিয়ে উঠে দাঁড়ালো। ঘরে গিয়ে পা টিপেটিপে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো। নিজের প্রতিবিম্ব দেখে শ্বাস আটকে গেল মেয়েটার।

ধূসর আলোয় শাড়ির ভাঁজে তার কিশোরী মুখটা যেন অন্য রকম লাগছে। একটু পরিণত, একটু নরম, আর অনেকটা স্নিগ্ধ। হাতের আঙুলগুলো এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধায় থেমে রইল। না, এসব ঠিক হচ্ছে না। বারবার অসস্তিতে গুটিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। তবুও বুকের ভেতরের অস্থির টান তাকে থামতে দিল না। শান্তভাবে আয়নার ড্রয়ার খুলল ধারা। অনেক জিনিস দেখা গেলো। এসব সালমা বেগম প্রথম দিনই ধারাকে দিয়েছিল। তবে ধারা এসব দেখেওনি। আজ মনোযোগ দিয়ে দেখে ভিতর থেকে ছোট্ট লাল টকটকে লিপস্টিকটা তুলে নিল। হাত হালকা কাঁপছিল, তবুও সাহস সঞ্চয় করে ঠোঁটে হালকা রঙ ছড়িয়ে দিল। এসব কখনো আগে দেয়নি ধারা। কখনোই এসব প্রসাধনী ব্যবহার করেনি। তবে আজ করল। কার জন্য করলো? ধারা প্রশ্ন করে আবারো এড়িয়ে গেলো।

উঁহু, কারো জন্যই তো করেনি সে। মিথ্যে কথাটা আকাশের মেঘেরা ধরে ফেলতেই মৃদু হাসলো বোধহয়। ধারা লিপস্টিক টা ঠোঁটে দিয়ে নিজেকে দেখে আবারো লজ্জায় গাল গরম করে ফেলল। অকারণে এত সাজগোজ! তবে মনে হলো, লিপস্টিকের আঁচড়েই তার গোপন ভাবনা ধরা পড়ে যাবে। এরপর ছোট্ট কাজলের পেন্সিলটা নিল ধারা। চোখের পাতা হালকা কাঁপছিল, তবুও আলতো করে একটুখানি রেখা টেনে দিল। আয়নায় নিজের চোখের দৃষ্টি বদলে গেল। কেমন যেন উজ্জ্বল, জীবন্ত হয়ে উঠল। কাজলটা লাগানো মাত্রই ধারা মনে মনে মিষ্টি এক কাঁপুনি অনুভব করল। পরে তর সইলো না। কাজলটা গাঢ় করেই দিলো চোখে। এ কি রূপ! আয়হায়! ধারা নিজেকে দেখে নিজেই অভিভূত হলো। অবাক হলো। এমন রূপে নিজেকে কখনোই দেখা হয়নি তার। বিয়ের সময় একদম বাজেভাবে তাকে সাজিয়ে দেয়া হয়েছিল। ফাউন্ডেশন, হাইলাইটার, শ্যাডোসহ আরো হাবিজাবি দিয়েছিল তাকে, যা দেখতে খুবই জঘন্য লেগেছিল। শ্রাবণও তো বাসর রাতে ধারাকে দেখে মুখ কুঁচকে তাকিয়েছিল। তবে আজ ধারার মনে হলো সে সুন্দর। অত কিছু দরকার হয়না সুন্দর হতে। এইতো! একটুখানি কাজল দিলেই তো চোখদুটো ফুটে উঠছে। অদ্ভুত ভাবে সুন্দর লাগছে।

অভিভূত হয়েই ধারা যন্ত্রের মত ড্রেসারের কোণায় রাখা পারফিউমের ছোট বোতলটা তুলে নিল এবার। কর্ক খুলতেই মৃদু সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। ধারা চোখ বুজে শ্বাস নিল। নেশালো ঘ্রাণটা খুব সুন্দর। শ্রাবণকে এসব ব্যবহার করতে দেখেছে ধারা। সেভাবেই মনে করে কোনোমতে পারফিউম গলায় আর কব্জিতে ছিটিয়ে দিল সে। শেষমেশ চুলে হাত চালালো। এতক্ষণ খোঁপা করে রাখা ছিল চুল। ধীরে ধীরে খোঁপা খুলে দিল। কাঁধ থেকে ঝরে কোঁমড় পার করল কালো চকচকে চুলের জলপ্রপাত। আয়নায় তার রূপের পরিবর্তন চোখে পড়তেই ধারা যেন অস্থির হয়ে উঠল। ঠোঁট কামড়ে এক মিষ্টি হাসি চেপে রাখল। মনে হলো, শ্রাবণ শেখ এক ঝলক তাকালে হয়তো আজ সত্যিই অবাক হয়ে যাবে। অবাক হবে, নাকি খুন হবে?

ধারা হা করে আয়নায় নিজেকেই দেখছিল। ঘুরেফিরে সব দিক দিয়ে নিজেকে দেখে নিলো মেয়েটা। তখনি হুট করে মেঘ ফেটে পড়লো। বাজ পড়লো সজোরে। ধারা চমকে বারান্দার দিকে তাকালো। মুখে হাসি ফুটে উঠলো মেয়েটার। মেঘের গর্জন কেঁপে উঠলো চারদিক। এক নিমিষে প্রথম ফোঁটা জানালার কাচ ছুঁয়ে নেমে এলো, তার পরেই ঝমঝম করে শুরু হলো প্রবল বর্ষা। ঘরভর্তি বৃষ্টির মাটির গন্ধ আর শীতল হাওয়ার ছোঁয়ায় ধারা মুহূর্তেই সমস্ত লজ্জা ভুলে গেল। তার হৃদয়টা বৃষ্টির সুরে নেচে উঠল। আজ এতদিন পর বৃষ্টি দেখে মনটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলনা মেয়েটা। গ্রামে থাকাকালীন তো এই বৃষ্টিই তার সাথী ছিল। এটাই ছিল ভালোবাসা। ধারা এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়িয়ে কোনোকিছু না ভেবেই ছুট দিল। চুড়ির ঝনঝন শব্দটা বৃষ্টির তালেই মিলল। নুপুরের ছন্দে মেঝেতে ছোট ছোট রিনরিনে আওয়াজ উঠতে লাগল। শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়তে উড়তে তার পায়ের গতি আরেকটু বাড়িয়ে দিল। চুলগুলো, সদ্য খোলা সেই কালো ঝরনা, ছুটে চলার সাথে সাথে কাঁধের উপর নেচে উঠলো, কোমরের নিচে বৃষ্টির গন্ধের মতো মিশে গেল তার চলার স্রোতে।

ধারা চিলেকোঠার দরজার সামনে এসে মুহূর্তের জন্য থামল, ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। পর মুহূর্তেই পা চালিয়ে ছাদে ছুটে গেল সে। টুংটাং চুড়ি, রিনঝিন নুপুর, আর শাড়ির অগোছালো চলন, সবকিছু ধারাকে আজ কোনো এক রাজ্যের রাণীর মত করে দিল। ধারা ছাদে ছুটে এসে হাসিমুখে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে পড়লো। মাথা পেছনে হেলিয়ে চোখ বন্ধ করল। একগুচ্ছ চুল কপাল ছুঁয়ে গালে লেগে গেল, ঠোঁটের কোণে মিষ্টি শিহরণ খেলে গেল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ঝরে পড়তে লাগল তার শরীরের প্রতিটি কোণে। চোখের কোণে জমে থাকা কাজলের রেখা খানিক গলে নেমে এলেও ধারা তা খেয়াল করল না। তবে কাজল টা আরো সুন্দর লাগলো। তার নুপুরের ঝঙ্কার বৃষ্টির ছন্দে মিশে গিয়ে যেন এক অদ্ভুত সঙ্গীত বুনলো, আর সেই সঙ্গীতের মাঝে ধারা নিজেকে হারিয়ে ফেলল। একটি বৃষ্টিমুগ্ধ, প্রাণবন্ত রূপকথার মতো ধারা দুহাত মেলে দিয়ে বৃষ্টিবিলাস করতে শুরু করলো। খুশিতে গেয়ে উঠলো মিষ্টি সুরে,

—” এই বৃষ্টি ভেজা রাতে তুমি নেই বলে
সময় আমার কাটে না
চাঁদ কেনো আলো দেয় না
পাখি কেনো গান গায় না
তারা কেনো পথ দেখায় না
তুমি কেনো কাছে আসো না?”
গানের কথায় ধারার মনের আকাঙ্খা বুঝি মেঘ বুঝে ফেলল। প্রকৃতিও ডাক পাঠালো তাদের উড়োচিঠি প্রেরণকারী পাখিদের কাছে। তাই তো প্রকৃতি সায় দিলো মেয়েটার ডাকে। আরো বেশি অন্ধকার হয়ে এলো চারিদিক। আর এই বর্ষণের শব্দে, ভিড়ে ধারা শুনতেও পেলো না বাড়ির বাইরে থেকে সদ্য ভেসে আসা গাড়ির শব্দ। বুঝতেও পারল না কেও এসেছে। কেও আসছে। এই বর্ষণমুখর সময়ে প্রকৃতির ডাকে, আর মনের টানে কেও ঠিক সময়ে এলেও ভুল সময়ে বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। সে তো আর জানে না ছাদে এক রমণী আনন্দে সবকিছু ছাপিয়ে বৃষ্টি বিলাস করছে।

আজ শুধু শহরেই নয়। কাকতালীয় ভাবে বৃষ্টি হচ্ছে মোহনপুর গ্রামের দিকেও। বৃষ্টির ডাকে বিছানায় হতাশ হয়ে বসে থাকা কনিকা ছুটে আসলো বাইরে। উঠোনের খুঁটিটা ধরে চোখ তুলল আকাশের দিকে। চোখের মণি চকচক করতে থাকলো মেয়েটার। অজান্তেই কনিকার মন খারাপ হয়ে গেলো। মনে পড়ে গেলো সাদিকের কথা। সে অবাক হলো। এই লোকটাকে আজকাল এত অদ্ভুত লাগছে কেনো? কেনো বারবার তার কথাই মনে পড়ছে। কনিকা সহজ উত্তরটাই খুঁজে পেলো না। সে চোখে একরাশ ভালোলাগা আর হতাশা নিয়ে তাকিয়ে রইলো বৃষ্টিমুখর মেঘেদের দিকে। মনে মনে আবিষ্কার করে ফেলল সাদিক আর সে মোটই দূরে নেই। তারা তো এক আকাশের নিচেই আছে। শুকনো ঢোক গিলল কনিকা।
শুকনো কাপড়গুলো দ্রুত ছুটে গিয়ে তুলে কেবলই উঠোনে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এলো জরিনা খাতুন। তিনি এসেই কাপড় গুলো খাটে ফেলে রেখে তাকালো কনিকার দিকে। ভদ্রমহিলা ভীষণ আন্তরিক আর ভালো মনের মানুষ। কনিকার মনের অবস্থা টা বুঝতে পেরে মিষ্টি সুরে বলল,

—” এই ছেড়ি, আকাশে কী দেখোস হ্যাঁ? জামাইয়ের কথা মনে পড়ে? বৃষ্টি দেইখা প্রেম পাইতাছে নাকি হ্যাঁ?”
বলেই রসিকতার ঢংয়ে হাসতে থাকলেন জরিনা খাতুন। তবে কনিকা অসস্তিবোধ করল না। অবাকও হলো না। সে একইভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবতেই থাকলো। এরপর অদ্ভুত মিইয়ে যাওয়া স্বরে বলে উঠলো,
—” উনার কথা খুব মনে পড়তাছে চাচি। কেনো মনে পড়তাছে কও তো। আমি তো আগে উনার কথা ভাবতামও না! কেন যেন না চাইতেও উনার জন্য চিন্তা হয়!”
ভদ্রমহিলা আবারো পান খাওয়া দাঁত বের করে হাসলেন। তিনি তো সব ঘটনা জানেন। তাই বোঝেন কিশোরী মেয়েটার অবস্থা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়েই তিনি বললেন,

—” শুন ছেড়ি, আমরা মাইয়া মানুষরা খুব সহজেই ভালোবাইসা ফেলি বুঝছোস? অল্প একটু যত্ন, আদর পাইলেই আমরা গইলা যাই। আল্লাহ আমাগো এমনেই সৃষ্টি করছে। আর যখন আমরা কবুল পইড়া এক মাইনষের বউ হইয়া যাই, তখন আপনাআপনিই সব কেমন যেন হইয়া যায়! না চাইতেও ওই মানুষটার প্রতি আমাগো দরদ আইসা যায়। তখন মনে হয় ওই মাইনষের জন্য কলিজাটাও ছিঁইড়া দিতে পারুম! মইরাও যাইতে পারুম। সবে খোদার রহমত! আমাগো হাতে কিছুই নাই রে।”
কনিকার চোখের পাতা হালকা করে কাঁপল। বৃষ্টির ফোঁটার মতো বুকের ভেতর একে একে ঝরে পড়ছে সবকিছু। আকাশের দিকে তাকিয়েই সে বোকা বাচ্চার মতো ধীর স্বরে বলল,

—” তাহলে… চাচি, আমি কি…আমি কি উনারে ভালোবাইসা ফেলতাছি নাকি?”
নিস্তব্ধ এক স্বীকারোক্তি! উত্তরটা মন নিজেই জানে, শুধু মুখ থেকে বের করে আনতে পারছে না। বৃষ্টির ছলাৎছল শব্দের মাঝেই জরিনা খাতুন একটু থেমে গেলেন। তার মুখের হাসিটা ম্লান হয়ে এলো, কিন্তু চোখে ফুটে উঠলো কোমল মমতা। ভদ্রমহিলা শুকনো হাতের তালুতে পানের ডিব্বার ঢাকনা ঘোরাতে ঘোরাতে মৃদু কণ্ঠে বললেন,
—” তোরে আর কী কইতাম! নিজে বুঝবার পারোস না ছেমড়ি। তুই অনেক আগেই গইলা গেছোস। কইলাম না, কবুল শব্দের মধ্যে জাদু আছে। সাদিক একটা ভদ্র পোলা, শত সাধনা করেও মাইনষে এমন পোলা পায় না। হের মত পোলারে ভালো না বাইসা উপায় আছে?

আল্লাহ যে মেঘ বানাইছে বৃষ্টি নামাইতে, আকাশ বানাইছে মেঘের ওড়াউড়ি দেখতে, ঠিক তেমনি আমাগো হৃদয়ও বানাইছে কারো প্রতি দরদ ধরার জন্য। আকাশ যত বড়ই হোক না, মেঘ ছাড়া কি কখনো পূর্ণ লাগে? বৃষ্টি ছাড়া কি মাটির গন্ধ আসে? তোর বুকের ভিতরে যে টান ধরতাছে, তা অকারণ না। এই টানও খোদার এক রহমত।! ”
তিনি আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে একটু থামলেন, তারপর নরম গলায় বললেন,
—”দেখছোস না, এক আকাশের নিচে সবাই ধরা খাই। তোরও সেই রকম হইতাছে। তোরে কই শুন, সাদিক তোরে ভালোবাসে। ওর চোখে তোর লগে ভালোবাসা দেইখা ফেলছি। চুল তো বাতাসে পাকেনি! বুঝবার পাইতাছি। তুইও আর ভঙ ধরিস না। হেয় শহর থেকে আইলে তোরা সুখে সংসার কর, বাচ্চাকাচ্চা নে। ভালো থাক! সুখে থাক!”
বৃষ্টির ফোঁটা নুপুরের মতো শব্দ তুলে মাটিতে আছড়ে পড়ছিল, আর কনিকা নিঃশব্দে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখের মণি বৃষ্টির ফোঁটার মতো ঝিকমিক করে উঠলো, আর হৃদয়ের ভেতর নতুন এক উপলব্ধি নরমভাবে ভেসে উঠল। সে ভাবলো। মেঘের অন্ধকার আলোড়ন দেখে হুট করেই কেঁদে ফেলল। জরিনা খাতুন কে জড়িয়ে ধরল মেয়েটা। অস্ফুটস্বরে বলে উঠলো,

—” উনারে আইতে কও চাচি। আমি উনারে তাইলে ভালোবাসি। আমি থাকতে পারতাছিনা উনারে ছাড়া। আমার আর কিছু লাগতো না। ট্যাকাপয়সা লাগবো না। উনারে আইতে কও তাত্তাড়ি! আমি কমু উনারে!”
অবশেষে সস্তির শ্বাস ফেললেন জরিনা খাতুন। তিনি এবার বুক ফুলিয়ে চোখ বুঁজলেন। তার পরিকল্পনা সফল। শেষমেশ মেয়েটাকে বোঝাতে পেরেছেন। সাদিকের জন্য ভালোবাসা প্রকাশ করাতে পেরেছেন। নইলে কনিকা যদি শুনতো যে তার বাবা-মা সেদিনই গ্রামের মানুষের কথা পূর্ণ বিশ্বাস করে কনিকার মত একটা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে সেই মুহুর্তেই ত্যাজ্য কন্যা করেছে, তাহলে হয়তো কনিকা নিতেই পারত না। ভেঙে পড়ত মেয়েটা। এতদিন সব জানতে পেরেছিল সাদিক। কিন্তু বলেনি কনিকাকে। শুধু শুধু কষ্ট দিতে চায়নি। জরিনা খাতুন বুদ্ধি করে মেয়েটার একটা গতি ধরিয়ে দিলেন যেন ওসব পরে জানতে পারলেও বেঁচে থাকার পিছুটান খুঁজে পায়।

প্রচুর বৃষ্টি আর মেঘের গর্জন শুনে শ্রাবণ মনে করেছিল ধারা বোধহয় ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। বাচ্চা মেয়েটা ভয়ও পেতে পারে। এমনিতেই কেও নাকি বাড়িতে নেই। তাই শ্রাবণ রীতিমতো রকেটের স্পিডে গাড়ি চালিয়ে বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু এসেই যে এভাবে চারশো চল্লিশ ভোল্টেজের শক খেয়ে হসপিটালে যাওয়ার উপক্রম হবে তা মোটেই ভাবেনি বেচারা শ্রাবণ শেখ। ডুপ্লিকেট চাবি ছিল তার কাছে। তাই কলিং বেল না বাজিয়ে দ্রুত বাড়িতে ঢুকে ছুটে গেছিল ঘরে। তবে ঘরে কাওকে দেখতে না পেয়ে দ্রুত ছুট দিল রান্নাঘর সহ বাকিঘর গুলোতে। কিন্তু না, কোথাও কাঙ্ক্ষিত মানুষটার দেখা পেল না। শ্রাবণের বুকের ভেতর ঢাকের মতো ধুপধুপ শব্দ উঠছে। বৃষ্টির তীব্র শব্দ আর মেঘের গর্জনে তার উদ্বেগ যেন আরো বেড়ে গেল।

চারপাশে ফাঁকা বাড়িটা অদ্ভুত ভৌতিক লাগছিল। ঘর ঘর ঘুরে ধারাকে পেলো না। কোথাও নেই মেয়েটা। ড্রইংরুম, রান্নাঘর, করিডর সব ফাঁকা। এক মুহূর্তের জন্য ভয়ানক একটা আশঙ্কা বুকের ভেতর তীব্র ঝড় তুলল। শেষে শ্রাবণ কি যেন ভেবে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে ছুটল সিঁড়ির দিকে। সিঁড়িগুলোর ভেজা কংক্রিটে তার পায়ের আওয়াজ কানে ধাক্কা মারছে। এক লাফে প্রায় ছাদে পৌঁছে গেল শ্রাবণ। হাতের তালু ঘামে ভিজে গেছে। বৃষ্টির গন্ধ আর বিদ্যুতের ঝলকানি একসাথে তার চোখ ধাঁধিয়ে দিল।

কিন্তু এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক থাকলেও ছাদের দরজা ঠেলে পা রাখতেই সে থমকে দাঁড়াল। চোখের মণি স্তব্ধ তো হলোই, সাথে পুরো শরীর থমকে গেলো। মনে হলো পুরো দুনিয়াই স্থির হয়ে গেছে। ঠিক যেন সময় হঠাৎ থেমে গেছে। চোখের সামনে যা দেখল, তাতে বুকের মধ্যে একসাথে স্বস্তি, বিস্ময় আর কিছুটা শিহরণ জেগে উঠল। ধারাকে ঠিক আছে দেখে যতটা সস্থি পেলো, তার থেকে বেশি ধাক্কা খেলো ছাদের মাঝে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ধারাকে বৃষ্টিবিলাস করতে দেখে। চুল খোলা, শাড়ির আঁচল বৃষ্টির হাওয়ায় উড়ছে, হাতে রেশমি নুপুরের মৃদু ঝনঝনানি। বজ্রের শব্দে মুহূর্তের জন্য আকাশ আলোকিত হলো, আর সেই আলোর ঝলকানিতে শ্রাবণের চোখে ফুটে উঠল ধারার অপরূপ রূপ। ভেজা চুল থেকে গড়িয়ে পড়া জলের রেখা, ভেজা শাড়ির ভাঁজে লুকোনো কাঁপুনি, আর সেই নিস্পাপ উচ্ছ্বাস। তার বুকের সব উত্তেজনা এক মুহূর্তে গলে গিয়ে অদ্ভুত এক আবেগে ভরে উঠল। শ্রাবণ শুধু তাকিয়ে রইলো স্তব্ধ, মুগ্ধ, এবং সম্পূর্ণভাবে হার মানা এক মানুষ হয়ে।

ধারা বোধহয় পুরোপুরি পাগল হয়েছে। নইলে দরজায় দাঁড়ানো শ্রাবণ শেখ কে দেখলোই না। নিজের মত করে লাফাতে থাকলো বৃষ্টির মধ্যে। ইশ! সর্বনাশ টা তো এখানেই হলো, যখন উচ্ছাসে মত্ত ধারার অজান্তেই তার শাড়ির আঁচল অনেকটা সরে গিয়ে উন্মুক্ত ফর্সা কোমঁড় ভিজতে থাকলে। শেষ! এখানেই খতম হলো শ্রাবণ শেখের সুশীল দৃষ্টি। প্রাকৃতিকভাবেই চোখ আটকালো সেখানে। এবারে ধারার সাথে খেই হারালো শ্রাবণ। ভেজা শাড়িটা লেপ্টে রয়েছে ধারার শরীরে, তা দেখে এবার শুকনো ঢোক গিলল। তাকে বোধহয় ভূতে ভর করেছে। তাই তো যন্ত্রের মত এগিয়ে যেতে থাকলো বৃষ্টিবিলাসী মেয়েটার দিকে। নিজেও এতক্ষনে ভিজে একাকার হলো বটে৷ তবে তাতে কিছু যায় আসেনা৷ চোখে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে এক পা দু পা করে শ্রাবণ ঠিক দাঁড়ালো মেয়েটার পিছনে। ধারা মুখ উঁচু করে বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মাখতে মাখতে পা পেছালো। দূর্ঘটনা আবারো ঘুরলো। পেছনে থাকা শ্রাবণের সাথে সে সহসাই ধাক্কা খেলো। চমকালো মেয়েটা। থমকে তাকালো শ্রাবণের দিকে। বোকা মেয়ে বোধহয় এই সময় শ্রাবণকে আশা করেনি। তবে ভিজে যাওয়া শ্রাবণকে দেখেও সে এক মুহুর্তের জন্য আটকালো।

পরিবেশ টাই বেশ অনুকূলে। বৃষ্টি যেন ওই মুহূর্তে এক অদৃশ্য জাদুর জাল বুনে ফেলেছে চারপাশে। আকাশের প্রতিটি গর্জন, বজ্রের প্রতিটি ঝলকানি আর ঝরে পড়া ফোঁটার প্রতিটি শব্দ দুইটি হৃদয়ের মাঝখানের দূরত্ব মুছে দিতে চাইল। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু ছাদের কিনারে ঝরে পড়া জল আর তাদের দ্রুত শ্বাস নেওয়ার শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। ধারা এখনও শ্রাবণের বাহুর উষ্ণতা বুঝে উঠতে পারছে না। কিন্তু তার চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেল। মনে হলো, যেন এই মানুষটা অনেকদিন ধরেই এমন করে দাঁড়িয়ে ছিল তার জন্য।

শ্রাবণও অবাক। তার চোখের সামনে যে মেয়েটা এতদিন কেবল দায়িত্বের ছায়ায় আবদ্ধ এক অপরিচিত, সে আজ এই বৃষ্টির মধ্যে যেন এক রহস্যময় সুর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কি সুন্দর সেজেছে মেয়েটা। শ্রাবণের চোখ আটকালো ধারার কাজলকালো চোখের দিকে। এক সময় শ্রাবণ মনে মনেই ভেবেছিল যে ধারার চোখ এমনিতেই অনেক গভীর, কাজল পড়লে বোধহয় আকর্ষণীয় হবে আরো। তবে কাজল পড়ে থাকা ধারার চোখ যে তার ধারনার থেকেও তীক্ষ্ণ তা সে জানতো না। এই তো! চোখের তীক্ষ্ণতায় খুন হচ্ছে শ্রাবণ শেখ। চোখের দিক থেকে পলক ফেলতেই পারছে না মানুষটা। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তাদের মুখ ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়ছে, আর সেই ঠান্ডা স্পর্শের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অজানা উষ্ণতা। দুজনের চোখ আটকে গেল একে অপরের চোখে। কোনো কথা নেই, তবু মনে হলো হাজারো না বলা অনুভূতি ঝরে পড়ছে সেই দৃষ্টির বিনিময়ে।

শ্রাবণ অনুভব করল, এই মুহূর্তে পৃথিবীর সব শব্দ, সব তাড়াহুড়া, সব যুক্তি অর্থহীন হয়ে গেছে। ধারা বুঝল, সে যতই এড়িয়ে যাক না কেনো, তার মন কোনো এক অদৃশ্য টানে বারবার এই মানুষটার কাছে ফিরে আসে। বৃষ্টির ছন্দে, মেঘের গর্জনে, আর তাদের দ্রুত দম নেওয়ার ভেতরেই যেন জমে উঠল এক অব্যক্ত স্বীকারোক্তি, যেটা কেউ উচ্চারণ করেনি, তবু দুজনেই বুঝে ফেলল।
ধারার হুঁশ ফিরলো খানিকটা। জগতের সব লজ্জা এসে ঘিরে ধরল তাকে। মাথা নিচু করে শুকনো ঢোক গিলল মেয়েটা। কিন্তু তখনি চমকালো যখন শ্রাবণ ধারার কোঁমড়ে হাত রেখে একটানে মেয়েটাকে নিজের বুকের দিকে টেনে নিল। তাল সামলাতে না পেরে শ্রাবণের কাছেই এসে ঠেকলো মেয়েটা। দুম করে শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। ভেজা কোমল দুহাত মুঠো করে শ্রাবণের বুকের কাছটায় আটকালো।

শ্রাবণকে বোধহয় কেও জাদু করেছে। সে হুঁশে নেই। প্রকৃতিই তাকে হুঁশ হারাতে বাধ্য করেছে। তাইতো শ্রাবণ খেই হারিয়ে সবকিছু ভুলে অবলীলায় ধারার কোঁমড়খানা চেপে ধরে এক হাত উঠিয়ে ধারার থুতনি ধরে তুলে ধরলো আদুরে মুখটা। পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়েই রইলো বৃষ্টিভেজা মুখটার দিকে। ধারা এমন অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ পেয়ে চোখ খিঁচে বন্ধ করল। কিন্তু তা সহ্য হলো না শ্রাবণ শেখের। সে গম্ভীর আকুল স্বরে অনুরোধ করলো,
—” চোখজোড়া খুলে ফেলো হৃদয়হরিণী। দোহাই তোমার, কাজলকালো এই নেশায় ডুবতে দাও আমায়। বাঁধা দিও না মেয়ে। খুব বেশি অন্যায় হবে আমার সাথে। কষ্ট দিও না। মরে যাচ্ছি যে!”

এটা কি মন্ত্র ছিল? হবে হয়তো। নইলে কেনো সত্যি সত্যি ধপ করে চোখ খুলে সম্মোহনী দৃষ্টিতে চোখ মেলাবে ধারা। কেনোই বা তাকিয়ে থাকবে এভাবে? শ্রাবণের বুকের ভেতর কালবৈশাখির ঝড় শুরু হয়েছে। সবকিঝু এলোমেলো হয়ে গেছে মুহুর্তেই। বহুকষ্টে ধারার চোখ থেকে দৃষ্টি সরালো শ্রাবণ। কিন্তু লাভ হলো না। এবার যে অবাধ্য তৃষ্ণার্থ চোখজোড়া আটকালো তিড়তিড় করে কাঁপতে থাকা ভেজা কোমল ঠোঁটদুটোয়।

ধারা লিপস্টিক দিয়েছিল। ইশ! কেনো যে মেয়েটা মাতব্বরি করে লিপস্টিক পড়তে গিয়েছিল। এখন এই লাল লিপস্টিকই তার কাল হয়ে দাঁড়াবে? হলে তো হতেও পারে। কত কিছুই হয়ে গেলো শ্রাবণের সাথে। দুই মিনিটে পাগল হয়ে গেলো সে। নাহ, আর পারা গেলো না। ধারা শ্রাবণের দৃষ্টি দেখে ভয় পেলো। ঠোঁট কাঁমড়ে শুকনো ঢোক গিলল। শ্রাবণ যে নেশায় আছে তা কি কেও বুঝলো? এই বৃষ্টি, রাতের নরম আবেশ, ধারার অন্যরকম রূপ সবকিছু যে কতটা আকর্ষণ করছে শ্রাবণ শেখকে তা কি কেও আদৌও বুঝবে। হয়তো না। তবে ধারা একটুখানি বুঝলো। তাই তো, ঢোকের পর ঢোক গিলল। শ্রাবণের চোখ অনেকক্ষণ বিচরণ করল ধারার ঠোঁটজোড়ায়। তারপর আবারো গিয়ে ঠেকলো কাতর দৃষ্টি ফেলে রাখা চোখজোড়ায়। শ্রাবণ সেই চোখে চোখ রেখে খুব অসহায় মুখে অভিযোগ করে বসলো,

—” মেয়ে তুমি ভীষণ ছলনাময়ী। এভাবে খুন করলে আমায়? একটুও বুক কাঁপলো না? আমায় এতটা বাজে ভাবে মেরে ফেলার দোষে তোমায় যদি এখন অন্যরকম মিষ্টি একটা শাস্তি দিই, তবে কিন্তু আমার একটুও পাপ হবে না।”
ধারা আবারো ঢোক গিলল। বললো না কিছু। হাতপা কাঁপছে। বারবার টানাটানি করেও শাড়ি ঠিক করতে ব্যার্থ হচ্ছে বেচারি। এর মধ্যে শ্রাবণের দৃষ্টি আরেকটু তীক্ষ্ণ হলো। এগিয়ে এলো মেয়েটার দিকে। তাকে এগিয়ে আসতে দেখে ধারাও পূর্ণ দৃষ্টি ফেলল। ইশ! লোকটা তো কাছ থেকে দেখতে আরো সুন্দর। এত সুন্দর পুরুষও হয়?

ধারা অভিভূত হলো, সাথে জাদুমন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়েই বোধহয় চোখ বুঁজে ফেলল। শ্রাবণ সময় নষ্ট করলো না। চোখ বুঁজে নিজের ঠোঁটে চেপে ধরল কোমল ভেজা তিড়তিড় করে কাঁপা ঠোঁটদুটো। বেশ সময় নিয়ে ছোট্ট একটা চুমু খেয়ে পুরোপুরি ডুবে গেলো। ধারার ঠোঁটের ভাঁজে ঠোঁট গুঁজে দিয়ে আরেকটু টেনে নিল মেয়েটাকে। ধারা বোধহয় নিজেকে সামলাতে পারল না। প্রথম এমন স্পর্শে শেষ হলো। শরীর এলিয়ে পড়লো শ্রাবণের দিকে। তাতে কী? শ্রাবণ তো শক্ত করে ধরে রইলো মেয়েটাকে। ভাগ্যিস ধরেছে, নইলে পড়েই যেত মেয়েটা। এরপর কী থেকে কী হতে থাকলো কেওই জানে না। শ্রাবণ এমনভাবে প্রিয়তমার ঠোঁটে সুখ খুঁজতে থাকলো যের সে বহুদিনের তৃষ্ণায় ভুগছে। ধারার ঘাড়ে গলায় হাত বুলিয়ে আদর দিয়ে পুরোপুরি ভাবে জড়িয়ে ধরতেই ধারা শ্রাবণের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। এসব কি সহ্য করা যায় নাকি?

প্রথমবারের মত স্ত্রীর ঠোঁটদুটো আয়ত্তে পেয়ে মত্ত ছিল শ্রাবণ। তাই দীর্ঘ পনেরো মিনিট পরই এলোমেলো করে দিয়ে ধারার ঠোঁটদুটো ছাড়লো। দুজনেই কপালে কপাল ঠেকিয়ে বড় বড় শ্বাস নিতে থাকলো। হাঁপাতে শুরু করলো। বৃষ্টির পানিতে ভিজে অবস্থা আরো জুবুথুবু। ধারা লজ্জায় মরে গেলো। তার ইচ্ছে করলো মাটির নিচে ঢুকে পড়তে। ইশ! এসব কী? কীভাবে কী হলো এগুলো? এই প্রথম প্রিয় পুরুষের স্পর্শে ধারা এতটাই হারিয়ে গেলো যে নিজে থেকেই এবার চুমু খেলো শ্রাবণের ঠোঁটে। এরপর আবারো লজ্জায় পড়লো। বৃষ্টির তোপে ঠিকমতো তাকাতেও পারল না। শ্রাবণও প্রথমে ধারার এমন এলোমেলো অবস্থা দেখে হাসলো। শব্দ করেই হাসলো। বুঝলো মেয়েটার অবস্থা। তাই ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে সামলালো। আরেকটু এগিয়ে এসে ধারার মুখের কাছে থামলো। চোখে একরাশ নেশা নিয়ে হুমকি দিয়েই দিলো,

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৯

—” আমায় এভাবে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দেয়ার অপরাধে তোমায় এখন আমার প্রেমবর্ষণে ভেজাব। আর এতে কোনো অপরাধ নেই। দোষ তোমার। তাই আমার বর্ষনে সিক্ত হতে তৈরী হও।”
ধারা কি ভয় পেলো? নাকি সত্যি সত্যি তৈরী হয়ে নিল জানা নেই। তবে সে নেশালো চোখে তাকানো শ্রাবণ শেখের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে শুকনো ঢোক গিলল আর বড় করে শ্বাস নিয়ে নিল। আজ বোধহয় বৃষ্টিটা তার জন্য অন্যরকম স্মৃতি বুনে দিয়ে গেলো। ইশ! কি লজ্জা! এবার কী হবে? শ্রাবণ শেখের শাস্তির হাত থেকে বাঁচা কি খুব সহজ? এবার যে ধারা-ই ভুল করেছে! সে এমন ভয়ানক ভাবে পাগল না করলে কি শ্রাবণ শেখ ভদ্র থাকতো না? অবশ্যই থাকতো। আফটার অল, শ্রাবণ শেখ ইজ আ জেন্টলম্যান! আজকে জেন্টলম্যান থাকবে কিনা সেটার অবশ্য গ্যারান্টি নেই!

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩১