তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩৭ (২)
জান্নাতি আক্তার জারা
আদিবা তালুকদার রাবেয়া তালুকদার হাতে করে বিয়ের শাড়ি নিয়ে আরাতের রুমে প্রবেশ করলেন।
আরাত মেঝেতে বিছানায় পাশে বসে বিছানার চাদের মুখ গুঁজে আছে। কিছুক্ষণ পরপর শুধু আরাতের শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। আদিবা তালুকদার মেয়ের বেহাল অবস্থা দেখে দ্রুত পায়ে হাতের শাড়ি টা বিছানায় রেখে দিয়ে আরাত বলে চিৎকার দিয়ে আরাত কে জাপতে জরিয়ে ধরলেন। রাবেয়া তালুকদার তাঁদের পাশেই দাঁড়িয়ে রইলেন। আদিবা তালুকদারের চিৎকারে রশ্মি আরাতের রুমে এসে দরজার সামনে দাঁড়ালো। রাবেয়া তালুকদার রশ্মি কে দরজার সামনে দাঁড়াতে দেখে হাতের ইশারায় রুমের ভিতরে ঢুকতে বললেন। রশ্মি গুটিগুটি পায়ে মলিন মুখে আরাত কে দেখতে দেখতে রুমে প্রবেশ করলো।
আদিবা তালুকদার আরাত কে ডাকতে লাগলো। আরাত মায়ের কথায় কোনো উত্তর করলো না। আদিবা তালুকদার মুখ তুলে রশ্মি আর রাবেয়া তালুকদার কে দেখলেন একবার। দুজনেই আরাতের দিকে তাকিয়ে আছে। দু-তিন বার ডাকার পড়েও আরাত মায়ের কথায় উওর করলো না। শুধু কান্নার ফলে শরীর টা ধীকে ধীকে নড়ে উঠছে। রাবেয়া তালুকদার আরাতের পাশে বসলেন। আরাতের মাথায় হাত রেখে আদুরে গলায় ডেকে উঠলো,
___” মামনী তুমি কান্না করছো কেনো, বিয়ের দিন এভাবে কান্না করলে মানুষ কী ভাববে বলো, মানুষ ভাববে বিয়ের কনের বর পছন্দ হয়নাই।
রাবেয়া তালুকদারের দুষ্টুমি কথায় আরাত চমকে গেল। মুখ তুলে অদ্ভুত নয়নে রাবেয়া তালুকদারের দিকে তাকালো। আরাতের সঙ্গে রশ্মিও চমকে গেলো। দুজনের কারো জানা নেই আজকে আরাতের বিয়ে তাও তাকবীরের সঙ্গে। রশ্মি অবাক হয়ে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
___” বিয়ের কনে মানে?
আদিবা তালুকদার হাসি মুখে আরাতের মুখে হাত রেখে বললেন,
___” হ্যাঁ বিয়ের কনে, আজকে তোর আর তাকবীরের বিয়ে।
___” কীহ তোমরা কী পাগল, বীর ভাইয়া সঙ্গে আমার বিয়ে মানে, মা আমাকে রাগাবো না প্লিজ রুম থেকে চলে যাও আমাকে একা ছাড়ো প্লিজ?
আরাতের কথায় রাবেয়া তালুকদার বললেন,
___” হ্যাঁ মামনী তুমি আজকে থেকে আমার পুত্রবধু হবে ।
বলেই তিনি হেঁসে উঠলেন,রশ্মি কিছুই বুঝতে পারছে না।হটাৎ আরাত আর তাকবীরের বিয়ে। তাঁর উপর আরাতের মনমেজাজ ঠিক নেই। রশ্মি বোকার মতো চুপচাপ দেখছে শুধু। আরাত একটা ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই আরেকটা উপস্থিত। আরাত আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলো না, নিমেষেই রেগে গেলো। রেগে আদিবা তালুকদার কে চিৎকার দিয়ে বলল,
___” আমাকে তোমাদের কী মানুষ মনে হয় না। আমাকে কী তোমাদের পুতুল মনে হয়। সবাই সবার মতো আমাকে নাচাতে চাইছো। আমিও তো মানুষ মা আমারও তো কিছু চাওয়া পাওয়া আছে। বীর ভাইয়া কে আমি সবসময় ভাইয়ের নজরে দেখে এসেছি। আর তোমরা বলছো বীর ভাইয়ার সঙ্গে আমার বিয়ে।
___”আরাত তুমি এমন রিয়েক্ট করছো কেনো, আমরা তো তোমার সঙ্গে জুলুম করছিনা। তাকবীরের সঙ্গে তোমার বিয়ে আমাদের পরিবারের সবার ইচ্ছা। তাকবীর তো তোমার নিজের ভাই না, বিয়ের পর সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
রাবেয়া তালুকদারের কথায় আরাত মেঝে থেকে উঠে বিছানায় বসলো। মুখ দিয়ে কথা বের করলো না। আদিবা তালুকদার রাবেয়া তালুকদার মেয়ের দিকে অসন্তুষ্ট চোখে চেয়ে রইলেন। রশ্মি আরাতের পাশে বসে দুজনের উদ্দেশ্য বলে উঠলো,
___” বড়মা আরাত হটাৎ বিয়ের ধাক্কা টা মেনে নিতে পারছে না। ওকে একটু সময় দেন সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
রশ্মির কথায় আদিবা তালুকদার রুম থেকে বের হতে হতে বললেন,
___” ওকে বুঝাও, তাকবীর হাজারে না লাখে একটা। তাকবীর নিজে ওকে বিয়ে করতে চাইছে ওর কপাল এটা। ওর ছেলেমানুষীর কথা ওর বাবা বড়আব্বু জানতে পারলে রেগে যাবে, বুঝাও ওকে।
আদিবা তালুকদারের এভাবে চড়া কথায় রাবেয়া তালুকদার কিছু টা রেগে গেলেন, পুনরায় রশ্মিরাতের দিকে তাকিয়ে বললেন,
___” মামনী আমার ছেলে তোমাকে পছন্দ করে, একবার আমার ছেলের কথা ভেবে তারপর সিদ্ধান্ত নিও। তুমি যা চাইবে তাই হবে, আমরা তোমার সিদ্ধান্তর অপেক্ষায় রইলাম।
রাবেয়া তালুকদার রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। আরাতের মনের মধ্যে রাগ অভিমান অভিযোগ সবকিছু মিশ্রিত হয়ে সবকিছু এলোমেলো করে দিতে মন চাইলো। রাগের মাথায় বিছানা থেকে নেমে পুরো রুমের জিনিসপত্র চিৎকার দিয়ে তসনস করতে লাগলো।
___”সবাই স্বার্থপর, কেউ আমাকে ভালোবাসে না, কেউ না, কেউ না।
আরাতের হটাৎ জিনিসপত্র এলোমেলো করতে দেখে রশ্মি তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে আরাত কে আটকে নিজের সঙ্গে জরিয়ে নিতে নিতে বলল,
___” তুই কী পাগল হয়ে গেছিস, এসব কী করছিস বাড়িতে মেহমান, সবাই কী ভাববে প্লিজ শান্ত হয়ে যা।
আরাত নিজের থেকে রশ্মি কে ধাক্কা দিয়ে ছড়িয়ে কান্নারত কন্ঠে বলল,
___”হ্যাঁ হ্যাঁ পাগল হয়ে গেছি আমি, আমার কষ্ট হচ্ছে আমার বুকে ব্যাথা হচ্ছে। নিজের উপর নিজের বিরক্ত লাগছে। কেনো এই বেইমান কে ভালোবাসতে গেলাম। কী করবো আমি বল আমার নিজের উপর রাগ লাগছে আমি ওই বেইমান কে কেনো ভালোবাসতে গেলাম কেনো..কেনো..আহহহ
আরাত চিৎকার দিয়ে বলছে, রশ্মির চোখেও পানি রশ্মি ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলল,
___”যে তোর চিন্তায় করে না, তাঁকে এতটা ভালোবাসিস কেনো, ভুলে যা সবকিছু নতুন করে জীবন শুরু কর।
___” ভুলে যাবো,আমাকে পূনর্তার লোভ দেখিয়ে পূর্ণতা দেলো না, আমার হবে বলেও আমার হলো না। প্রতারণা করলো সে আমার সঙ্গে । আর আমি তাঁকে ভুলে যাবো, এম সহজে কী বেইমান দের ভুলে যাওয়া যায় বল?
রশ্মি আরাতের কথায় অন্যমনস্ক হয়ে বলল,
___” হুম চাইলেও ভুলে যাওয়া যায় না। হয়তো মানুষটাকে ভুলে যাওয়া যায় কিন্তু তাঁর সঙ্গে কাটানো সময় আর অনুভূতি গুলো ভুলে যাওয়া যায় না। মানুষ কিভাবে ভুলে যায় রে?
রশ্মি অন্যমনস্ক হয়ে বলা কথায় আরাত কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করলো। রেস্টুরেন্টে মাহিরের কথাগুলো মনে পরতেই নিজের উপর তাচ্ছিল্য হাসলো। মেঝেতে ধপ করে বসেই ফাঁকা চোখে চেয়ে থেকে বলল,
___”ওর চোখে আমাকে হারানোর ভয় ছিলা না, না ছিলো ওর মনে আমার জন্য ভালোবাসা, আমি হেরে গেলাম রশ্মি আমি হেরে গেলাম। ওকে নিয়ে জীবনের সব সিদ্ধান্তই ভুল ছিল আমার সব।
রশ্মি চোখে পানি নিয়ে আরাতের দিকে তাকিয়ে আছে। আরাত হটাৎই মেঝে থেকে উঠে রশ্মির সামনে দাঁড়ালো। রশ্মির দু-হাত নিজের দু’হাতের মধ্যে নিয়ে কান্নারত কন্ঠে বলল,
__”কথা দে তুই কখনো ওই বেইমান কে ভালোবাসবি না। তোর ভালোবাসার জন্য ছটফট করবে তবুও ওর দিকে ফিরে তাকাবি না। এটাই ওর শাস্তি আর আমার তৃপ্তি। ওই বেইমান তোর ভালোবাসার জন্য আমার মতো কান্না করবে হ্যাঁ এটাই ওর শাস্তি।
রশ্মি অসহায় চোখে আরাত কে দেখছে। ধাক্কার উপর ধাক্কা আরাত নিতে পারছে না। মনে যা আরছে তাই বলছে। ঠিক তখনই কারো গলা খাঁকারি দেওয়ার আওয়াজে রশ্মিরাত দরজার দিকে তাকালো। তাকবীর কে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রশ্মিরাত নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে পুনরায় তাকবীরের দিকে তাকালো। রশ্মি আরাত কে ছেড়ে দিয়ে মাথা নিচু করে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। আরাত আরচোখে একবার তাকবীর কে দেখে নিয়ে অন্য দিকে ফিরে চোখের পানি মুছলো। তাকবীর দু-এক পা করে আরাতের কাছে এসে দাঁড়ালো। পুনরায় পুরো রুম চোখ বুলিয়ে বেডসাইডের উপর থেকে টিস্যু প্যাকেট থেকে টিস্যু নিয়ে আরাতের সামনে ধরলো। আরাত মলিন মুখে তাকবীরের দিকে তাকালো, তাকবীর কে আগের ন্যায় গম্ভীর মুখে টিস্যু বাড়িয়ে দিতে দেখে মনের মধ্যে কান্নাগুলো দলাবেঁধে চোখ বয়ে বেরিয়ে এলো,
___” ডোন্ট ক্রাই মানুষ অতীত হারায় শ্রেষ্ঠ কিছু পাওয়ার জন্য।
তাকবীরের কথায় আরাতের চোখের পানি বাঁধ মানলো না। অভিযোগের সুরে কান্না করতে করতে বলল,
___” আমি বিয়ে করবো না।
তাকবীর গম্ভীর মুখে,
___” কারণ জানতে পারি ?
আরাত আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। একি ভুল বারবার করতে লাগলো, কান্না করতে করতে হাত দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে ভাঙ্গা গলায় বলল,
___” চাইনা, আমার কাউকে চাইনা। না ওই বেইমান কে না আপনাকে, আমার কাউকে চাইনা, কাউকে না বুঝতে পারছেন কাউকে না, কাউকে না। আমি মনে হয় এতটা শাস্তি পাওয়ার যগ্য ছিলাম না, যদি জানতাম ভালোবাসলে নিজেকে এতটা পুড়াইতে হবে। তাহলে কখনো ভালোবাসাকে ভালোই বাসতাম না।
আরাত কে হাইপার হতে দেখে তাকবীর হটাৎই আরাত কে নিজের বুকে টেনে নিলো। এক হাতে জরিয়ে নিয়ে আরেক হাত আরাতের মাথায় রেখে শান্ত করতে লাগলো। আরাত একটা বিশ্বস্ত বুক পেয়ে ফটফট করতে করতে ছটফটানি বন্ধ করে শান্ত হয়ে গেলো। তাকবীর আরাত কে শান্ত করতে এসে নিজের মনটা অশান্ত হয়ে উঠলো। পুনরায় নিজেকে সামলে নিয়ে বুক থেকে আরাতের মাথাটা তুলে দু-হাতে নিজের মুখোমুখি করে আদুরে গলায় বলল,
___” এই পাগল চাইলে কী সব পাওয়া যায়, যদি ভাগ্যই না থাকে। সর্বদায় নিজেকে সুখী ভাববে শিখো, প্রতিটি মূহুর্ত উপভোগ করো এবং সবর্দায় হাসো।
তাকবীরের কথায় আরাত তাকবীরের দিকে তাকিয়ে মলিন মুখে বলল,
___”আমার জায়গায় নিজেকে রেখে দেখেন, কতটা কষ্ট হয়, ভালোবাসার মানুষের চোখে অন্য কারো জন্য ভালোবাসা দেখতে?
তাকবীর আরাতের কথায় আরাত কে ছেড়ে দূরে সরে দাঁড়ালো, আরাতের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। যে তাকানো তে ছিলো,আমাকে শেখাচ্ছ ভালোবাসার মানুষের চোখে অন্য কারো জন্য ভালোবাসা দেখার কষ্ট, তুমি বোকা মেয়ে। তাকবীর আর দাঁড়ালো না হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নিয়েও দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গেলো। পেছন ফিরে ক্লান্তময় মুখে বলল,
___”আমি চাই তুমি আল্লাহর রহমত হয়ে আমার জীবনে আসো, আমি দু’হাতে যত্ন করে টেনে নিবো আমার আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার কে, অপেক্ষায় রইলাম।
তাকবীর চলে গেলো, আরাত দরজার দিকে এখনো তাকিয়ে আছে। মনের মধ্যে হাজারো প্রশ্ন বীর ভাইয়া কী আমাকে ভালোবেসে। না মিলছে না মিলছে না বীর ভাইয়া কেনো আমাকে ভালোবাসতে যাবে। বীর ভাইয়ার মতো গম্ভীর মানুষও কী কাউকে ভালোবাসতে পারো। পর মুহূর্তের তাকবীরের ফেসবুক ক্যাপশনের কথা মনে পড়ে গেলো। তবুও সবকিছু মিলছে না। আরাত তো ভেবে এসেছে ক্যাপশনটা হানিয়ার জন্য ছিলো। আরাত এক দিনে এতকিছু নিতে পারছে না। যাকে ভালোবেসে এসেছে তাঁর বেইমানি, অন্য দিকে যাঁর প্রতি কোনোদিন ভাই ব্যতীত কোনো ফিলিংস তৈরি হয়নি তাঁর সঙ্গে বিয়ে। হটাৎ বিয়ে মেনে নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। বিয়ে মানে তো তাঁর সঙ্গে সারাজীবনের বন্ধন। আরাত দরজা থেকে চোখ ফিরিয়ে বিছানায় বিয়ের শাড়ির উপরে রাখলো। গুটিগুটি পায়ে বিছানার কাছে এসে শাড়িটা হাতে তুলে নিলো। সাদা কাজকরা শাড়ি, সাদা দোপাট্টা সঙ্গে সাদা স্কাপ, আরাত বেশ অবাক হয়ে গেলো। বিয়েতে এগুলো পরবে নাকি সে। আরাত নিজের কষ্ট ভাবনা ভুলে শাড়ি হাতে নিয়ে চিৎকার দিতে লাগল,
___” মা, মা?
আরাতের চিৎকারে ছুটে এলেন রাবেয়া তালুকদার, সঙ্গে রশ্মি আর সন্ধ্যা,
___” কী হয়েছে মামনী তুমি চিৎকার করছো কেনো?
আরাত হাতের শাড়ি দেখিয়ে দিয়ে বলল,
___” বড়মা এগুলো কার জন্য?
___” তোমার বিয়ের শাড়ি, তাকবীর নিজে পছন্দ করেছে।
তাকবীর পছন্দ করেছে শুনে আরাত আর কথা বাড়ালো না। আগেই সন্দেহ হয়েছিল এমন পছন্দ শুধুমাত্র তাকবীরের দাঁড়াই সম্ভব। রাবেয়া তালুকদার আরাত আর কোনো কথা বলতে না দেখে সন্ধ্যা কে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন। আরাতের বাদবাকি কসমেটিকস আনার জন্য। রশ্মি আরাতের কাছে এসে দাঁড়ালো,
___” বিয়ে তে রাজি তাহলে?
___” জানি না।
আরাত মন ভার করে বলল কথাটা, রশ্মি আরাতের কথায় মুখ বাঁকা করে বিছানায় বসতে বসতে বলল,
___”ওকে, তাকবীর ভাইয়ার সঙ্গে কী কথা বললি?
রশ্মির কথায় আরাতের মনে পড়ে গেলো, তাকবীর জরিয়ে ধরেছিল আরাত কে। আরাত নিজেও এভাবে বেশ কিছুক্ষণ তাকবীরের বুকে চুপচাপ শান্ত হয়ে ছিলো। কথাগুলো ভাবনাতে আসতেই আরাত চোখ খিঁচে বন্ধ করে শব্দ করে কপালে হাত রাখলো। আরাতের হটাৎ কার্যকলাপে রশ্মি অবাক চোখে তাকালো,
___” কী হলো, কিছু বলছিস না কেনো?
___” আমাদের পার্সোনাল কথা তোকে বলবো কেনো?
রশ্মি ব্যঙ্গ করে বলল,
___” বাব্বা আমাদের তাও আবার পার্সোনাল, থাক শুনলাম না তোদের পার্সোনাল কথা,যা ওয়াশরুমে গিয়ে কাপড় চেঞ্জ কর?
আরাত কথা বাড়ালো না, মনের মধ্যে না ভালো লাগা, না আনন্দ সবকিছু মিলে একধরনের বিরক্তিকর অনূভুতি নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। তালুকদার বাড়িতে আইরার জন্য যে রুমটা ছিল। সে রুমে আরিশা আর মায়া মিলে আইরা কে রেডি করে দিচ্ছে। মিম তিশা গেস্ট রুমে নিজেরা রেডি হচ্ছে। কিছুক্ষণ পড়ে সন্ধ্যা আরাতের রুমে কিছু সিম্পল কসমেটিক নিয়ে প্রবেশ করলো, রশ্মি আরাত কে শাড়ি পড়ে দিচ্ছে। সবকিছু সাদা, মাথার স্কাপ থেকে দোপাট্টা, সবকিছুই সাদা, দু-হাতে কিছু সাদা পাথরের চুড়ি, মুখে হালকা মেকআপ। আইরা আনাস এর গিফট দেওয়া শাড়ি শরীরে জরিয়েছে, সঙ্গে দোপাট্টা।আনাস এর পরনে কালো কোট প্যান্ট। তাকবীর সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা হাতে ঘড়ি। ড্রয়িং রুম পুরোটা জুড়ে সাদা ঝাড়বাতি জ্বলছে। যদিও নতুন বউদের বসার জন্য গার্ডেনে ব্যবস্থা করা হয়েছে, বাড়ির ভেতরে শুধু আরাত আর তাকবীরের বিয়ে সম্পূর্ণ হবে। বাড়ির বাহিরে গেস্টদের খাওয়াদাওয়ার পর্ব চলছে। আর বাড়ির ভিতরে সোফাতে বসে তাকবীর আর আরাতের বিয়ের কাগজগুলো ঠিক করছেন কাজি।
তাকবীর বাপ চাচার সঙ্গে সোফাতে বসে অপেক্ষা করছে। ড্রয়িং রুমে প্রায় অতি নিকটের সবাই উপস্থিত। আদনান তালুকদার, আহাদ তালুকদারের সঙ্গে কথা বলে ওনার অর্ধাঙ্গিনী কে বললেন, আরাত কে নিচে নামানোর জন্য। রাবেয়া তালুকদার স্বামীর কথা মতো মিম পাঠালেন উপরে। মিম আর তিশা মিলে উপরে যাওয়ার কয়েক মিনিট পড়ে দেখা গেলো,আরাত কে ঘিরে ধরে সিড়ি বেয়ে নামতে সবাই কে। আরাতের দুপাশে আরিশা আর রশ্মি, তাঁর পেছনে মিম সন্ধ্যা আর তিশা নামছে,আরাতের সামনে আহিন আলভী নামছে। সবার মুখে খুশির ঝিলিক দেখা গেলেও নেই শুধু আরাত আর আলভীর মুখে।
সবার নজর সিঁড়ির দিকে, তাকবীর আরাতের দিকে মুগ্ধ চোখে চেয়ে বিরবির করল,
___” মাশাআল্লাহ।
আরাত কে নিয়ে ড্রয়িং রুমে সোফার কাছে এসে দাঁড়াতেই, আদিবা তালুকদার আরাতের কাছে এসে কাঁপালে ভালোবাসার পরশ রেখে দিলেন। পুনরায় মেয়ের গালে হাত রেখে বললেন,
___” মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ আমার মেয়েটা কবে এত বড় গেলো জানতেই পারলাম না, সবসময় দোয়া করি খুব সুখী হ মা।
আদিবা তালুকদারের কথায় আরাত এতক্ষণে মাথা তুলে তাকালো,রাবেয়া তালুকদার আরাতের আরেক পাশে এসে হাসি মুখে আরাত কে সঙ্গে নিয়ে এসে তাকবীরের পাশে বসালেন, তাকবীর আরাত কে নিজের যত পাশে অনুভব করছে ততই হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে। নিজেকে সামলাতে তাকবীর মাথা নিচু করে নিঃশ্বাস ফেললো। আরাত আশেপাশের চোখ বুলালো, পুরো বাড়ি এক দিনের মধ্যে সাদা ঝাড়বাতি আর পর্দা দিয়ে সুন্দর করে ডেকোরেশন করেছে। আরাত দুপুরে বাড়িতে প্রবেশ করার সময় এতকিছু খেয়াল করে নি। পুনরায় নিজের আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো, আশিক হাবীব আনাস আদিল আমান সোফার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সোফার বিপরীত পাশে, রশ্মি আরিশা মায়া সন্ধ্যা মিম তিশা দাঁড়িয়ে। আইরা নিজের রুমে। সন্ধ্যা বিয়ের বাড়িতে আসার পর থেকে হাবীব কে এড়িয়ে চলছে। মায়া আশিকের চোখাচোখি তে চলছে প্রেম কাহিনী।
আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার আতিফ শেখ সোফাতে বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। কাজি বর বউকে বিয়ের জন্য প্রস্তুত হতে বললে সবাই মনোযোগ দেয় কাজির দিকে। কাজির কথায় আরাতের মনের মধ্যে ধক ধক করে উঠলো, চোখেমুখে অজানা ভয়, আহাদ তালুকদার ওঠে এসে মেয়ের পাশে বসলেন,কাজি সাহেব রেজিস্টারের পেপার আরাতের সামনে রেখে পেপারে সাইন করতে বললেন। আরাত আহাদ তালুকদারের দিকে তাকালো। আহাদ তালুকদার চোখের ইশারায় সাইন করতে বললেন। আরাত বাবার থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে পেপারের দিকে অসহায় চোখে চেয়ে রইলো। আরাত কে সাইন করতে না দেখে সবাই সাইন করতে বলল। আরাতের হাত কাঁপছে হাত পেপারে রাখতে রাখতে চোখ বন্ধ করল, এক ঝলেকেই মনে পড়ে গেলো মাহিরের কথা, মাহিরের প্রেমময় কথা থেকে প্রতারণা। নিমেষেই মনটা পুনরায় এলোমেলো হয়ে গেলো, হাত কাঁপা বেড়ে গেলো।
হটাৎই হাতে কারো স্পর্শ পেয়ে চোখ মেলে গেলো।মাথা ঘুরে তাকবীরের দিকে তাকাতেই নিজের এক হাত তাকবীরের হাতে বদ্ধ দেখতে পেলো। তাকবীরের নজর ফোনে। আরাত কাঁপা কাঁপা হাতে রেজিস্টারের পেপারে নিজের নাম লেখে সারাজীবনের জন্য তাকবীরের নামে দলীল করে দিলো। তাকবীর যেন এতক্ষণ নিঃশ্বাস আটকে ছিলো। আরাত সাইন করার সঙ্গে সঙ্গে আটকে রাখা নিঃশ্বাস ছেড়ে দিলো। চোখ ফোনে থাকলেও পুরো ধ্যান আরাতের দিকে ছিলো। কাজি সাহেব রেজিস্টারের পেপার তাকবীর কে দিতেই তাকবীর ফোনটা পকেটে রেখে দিয়ে, কোনো কিছু না ভেবে নিশ্চিন্ত হয়ে সাইন করে দিলো। আরাতের হাত এখনো তাকবীরের হাতের মধ্যে। কাজি সাহেব পুনরায় বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন, আরাত তাকবীরের হাতে হাত রেখেই কবুল বলে দিলো,
বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেলো, আহাদ তালুকদারের কথায় আইরা কে আনতে মায়া সন্ধ্যা মিম আর তিশা, উপরে চলে গেলো। সন্ধ্যা দের যেতে দেখে আশিক আর হাবীব পিছু নিলো। তাকবীর আরাতের হাত ধরে দাঁড়িয়ে গেলো,আরাত তাকবীরের হাতে হাত রেখে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। আহাদ তালুকদার নিজের মেয়ে কে কাছে ডাকলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকবীর আরাতের হাত ছেড়ে দিলো। তাকবীর কে হাত ছেড়ে দিতে দেখে আরাত মাথা উঁচু করে তাকবীরের দিকে তাকালো। তাকবীর আরাত কে চোখের ইশারায় সামনে তাকাতে বলল,আরাত সামনে তাকাতেই আহাদ তালুকদার পুনরায় মেয়েকে ডাকলেন। আরাত পুনরায় তাকবীর কে একনজর দেখে নিয়ে বাবার কাছে এসে দাঁড়ালো। আহাদ তালুকদার তাঁর বড় ভাই অর্থাৎ আদনান তালুকদারের হাতে মেয়েকে তুলে দিলো। আদনান তালুকদার ছোট ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হেঁসে বললেন,
___” আমাকে না যে তোর মেয়েকে সারাজীবন আগলিয়ে রাখবে তাঁর হাতে তুলে দে।
আদনান তালুকদারের কথায় আহাদ তালুকদার হাসি মুখে তাকবীরের দিকে তাকালো, তাকবীর তাঁদের কাছে এসে দাঁড়াতেই তাকবীরের হাতে আরাত কে তুলে দিয়ে বললেন,
___” আমি যানি তুমি কতটা দায়িত্ববান, তোমার কাছে আমার মেয়ে সারাজীবন সুখী থাকবে। তবুও বাবা তো, মেয়েটা আমার দুর্বলতা, আমার কলিজা, আমার মেয়েটা অবুঝ, কখনো ভুল করলে মেনে নিয়ে যত্ন করে আগলিয়ে রেখো বাবা, কখনো আমার মেয়েটাকে কষ্ট পেতে দিও না।
আহাদ তালুকদারের কথায় আদিবা তালুকদার কেঁদে উঠলেন। আনহা শেখ ভাবি কে নিজের সঙ্গে জরিয়ে ধরে সামনে নিলেন। সবার চোখে পানি, কী আশ্চর্য না। মেয়ে বাড়িতেই থেকে যাবে তবুও মা বাবার চোখে পানি। আজকে থেকে মেয়েটা অন্যের অন্য দায়িত্বে থাকবে। থাক অন্যের দায়িত্বে তবু তো চোখের সামনে থাকবে। রাত পোহালেই আগের মতো মেয়ের মুখ দেখতে পাবে।তাকবীর আরাত আর আহাদ তালুকদারের হাতে হাত রেখে বিশ্বাস্ত করে বলল,
___” ছোট-বাবা,আমি আপনাকে কথা দিলাম,পাহাড় যেভাবে খুটি হয়ে এই পৃথিবী কে আগলে রেখেছে, ঠিক সেভাবেই আমি আপনার মেয়ের জীবনে খুটি হয়ে আপনার মেয়ে কে সারাজীবন আগলে রাখবো। আমার জ্ঞান থাকা অবস্থায় আপনার মেয়ের শরীরে কোনো আঁচ লাগতে দিবো না কথা দিলাম।
আইরা কে রুম থেকে বের করে বারান্দায় দাঁড়াতেই। আশিক হাবীব তাঁদের সামনে এসে দাঁড়ালো। সন্ধ্যা হাবীবের দিকে না তাকিয়ে আইরার দোপাট্টা ঠিক করে দিতে লাগলো। হাবীব বুঝতে পারছে সন্ধ্যা ইচ্ছা করে তাঁকে ইগনোর করছে। আশিক মিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” তোমরা আইরা কে নিয়ে যাও।
আশিকের কথা মতো চারজন মিলে আইরা কে নিয়ে যেতে নিলেই আশিক পুনরায় বলল,
___” আরে আরে, তোমরা তিনজন যাও, আমার বন্ধুর বউয়ের ফ্রেন্ড দুটা থাক।
আশিকের কথায় মায়া আর সন্ধ্যা ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইলো, মিম তিশা আইরা হাসতে হাসতে সামনে পা বাড়ালো। তাঁদের সঙ্গে সন্ধ্যা যেতে নিলেই হটাৎই হাবীব সন্ধ্যার হাত টেনে ধরে আরাতের রুমে ঢুকে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলো। মায়া সেদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,
___” আরে আরে হাবীব ভাইয়া সন্ধ্যা কে বেডরুমে নিয়ে যাচ্ছে কিছু করেন লুচ্চা বেডা?
___” আমি কী করবো, করবে তো হাবীব।
আশিক কথাটা বলে দু-হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলো।
মায়া হা হয়ে আশিকের দিকে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছে। আশিক অসহায় ফেস করে বলল,
___” সরি মাই মিসেস ওর সরি মাই মিসটেক।
আশিক কে ভুলভাল বকতে দেখে মায়া শব্দ করে হেঁসে উঠলো, আশিক চুপচাপ মুগ্ধ হয়ে দেখলো সেই হাসি, পরমুহূর্তে মায়ার হাত টেনে ধরে ছুটে চললো ছাঁদের দিকে। আইরা আর আরাত কে গার্ডেনে বেলি ফুলের তৈরি দুটো স্টেজে বসানো হয়েছে। ফুলের গন্ধে মম করছে চারপাশ। আত্মীয়সজন এসে এসে টুকটাক কথা বলছে, নতুন বউ দেখছে পুনরায় চলে যাচ্ছে। যদিও নতুন বউদের বিয়ের আগেই সবাই দেখেছে, তবুও আজকে নতুন ভাবে দেখছে সবাই। ভদ্রমহিলা-রা টুকিটাকি মজাও করছে। রশ্মি আরাতের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। আরাত কে মন ভার করে বসে থাকতে দেখে বলল,
___” কী রে মন খারাপ কেনো?
আরাত রশ্মির দিকে তাকিয়ে বিরক্ত মুখে বলল,
___” আমার খুব টায়ার্ড লাগছে প্লিজ আনাস ভাইয়া কে বলে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কর।
রশ্মি আরাতের কথায় দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” সত্যিই তো টায়ার্ড ফিল করছিস হুমউউ?
আরাত বিরক্ত হয়ে গেলো রশ্মির কথায়,
___” বাজে বকা বন্ধ কর,আর আনাস ভাইয়া কে ডেকে আন যা।
আইরা পাশে থেকে হুট করে আরাতের কথায় বলে উঠলো,
___” কেনো কেনো, তোর বর থাকতে আমার বর কে কেনো ডাকতে বলছিস?
রশ্মি আইরার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলল,
___” হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি যাই বরং দুলাভাই কে ডাক দেই।
রশ্মি যেতে নিয়েও পুনরায় পেছন ঘুরে আরাতের পাশে এসে দাঁড়ালো। রশ্মি কে ঘুরে এসে দাঁড়াতে দেখে আরাত ব্যঙ্গ করে বলল,
___” কী হলো যা, তোর দুলাভাই কে ডাক আমার তো খুব টায়ার্ড লাগছে। আমাকে ধরে ধরে রুমে নিয়ে যাবে, যা ডাক?
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩৭
___” চুপ কর, তুই জানিস তাকবীর ভাইয়া কেমন, তাকবীর ভাইয়ার সঙ্গে কী কথা বলবো, এটাই তো বুঝি না।
আরাত রশ্মির কথা শুনে হেঁসে উঠলো, আরাত জানে রশ্মি যাবে না, তাকবীর তো কারো সঙ্গে ফ্রি না বা কারো সঙ্গে ঠিক মতো কথা বলে না। সেখানে হটাৎ রশ্মি বা অন্য কেউ গম্ভীর তাকবীরের সামনে গেয়ে কী বলবে। তাঁদের খুনসুটির মধ্যেই রাফি কে আসতে দেখা গেলো, রাফির সঙ্গে আরশ কেউ আসতে দেখা গেলো। আইরা রাফি কে আসতে দেখে মাথা নিচু করে হাত কচলাতে লাগলো,
