প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৬
সাইদা মুন
—তার আগে বলুন আপনার এসব কি চলছিল? হ্যা..
মেহরীনের কণ্ঠে জমে থাকা রাগ-ক্ষোভ বেরিয়ে প্রকাশ্যে এল এবার তালহার উপর। চোখদুটো রাগে চকচক করছে। তালহা যেই মানুষ অফিসের সবাইকে একদৃষ্টিতে চুপ করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, সেই মানুষটাই কিনা এই মুহূর্তে বউয়ের এক কথায় থমকে গেছে। নিজের রাগী ভাবটা ধরে রাখতে পারল না৷ আর। বউয়ের চোখের আগুন দেখে সে কিছুটা হকচকিয়ে তাকাল,
—আমি আবার কি করলাম?
—কি করেছেন মানে? ওই মেয়ে আপনার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল। আপনিও মজা পাচ্ছিলেন?
ছোট বোনদের সামনে এমন কথা উঠতেই তালহা অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল। গলা খাঁকারি দিয়ে মেহরীনমে সামলানোর চেষ্টা করল,
—দ..দেখো মেহরীন, কিসব বলছ। তেমন কিছুই না।
ঠিক তখনই পেছন থেকে তাহিয়ারা দল বেঁধে সুযোগটা ছাড়ল না। একসঙ্গে বলে উঠল,
—আরে মেহরীন এমনই, এমনই হয়৷ বেডা মানুষ, বউ রেখে অন্য বেডি বেশি পছন্দ করে। দে উত্তম মাধ্যম!
তালহা যেন মুহূর্তে রেগে উঠল। গম্ভীরমুখে তাদের দিকে তাকিয়ে ঝারি মেরে বসল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—শাট আপ! কিসব বলছিস…
আর কিছু বলতে না দিয়েই মেহরীন সামনে এগিয়ে এসে পাল্টা ঝারি মেরে বসল,
—ইউ শাট আপ। মানুষকে শাট আপ শাট আপ না করে চুপ করে এখানে বসুন। এমন খাম্বার মতো মানুষের সঙ্গে ঘাড় উচিয়ে কথা বলতে ঘাড়ে ব্যথা করছে। নিচু হোন।
বউয়ের এক কথায় তালহা আর কোনো যুক্তি খুঁজে পেল না। বাধ্য ছেলের মতো চেয়ারে বসে পড়ল। তারপর শুরু হলো মেহরীনের একটানা ঝারি। ইচ্ছে মতো বকছে, থামার নাম নেই। নিজের রাগে নিজেই ভেসে গেছে মেয়েটা। এই মুহূর্তে সে কী বলছে, কী করছে, সজ্ঞানে ভাবলে হয়তো নিজেই অবাক হবে।
এদিকে বাকিরা বেশ উপভোগ করছে। সাজিদ এক কোণে দাঁড়িয়ে মুখে হাত চাপা দিয়ে মিটিমিটি হাসছে। জীবনে এই প্রথম সে স্যার-কে এভাবে জব্দ হতে দেখছে। যে মানুষটার উপস্থিতিতেই অফিসে পিনপতন নেমে আসে, সেই সিংহ আজ যেন বউয়ের সামনে একেবারে বিড়াল।
তাহিয়ারাও পাশের সোফায় গাদাগাদি করে বসে খিলখিলিয়ে হাসছে। আর তালহা? ঠোঁট শক্ত করে চেপে বসে আছে। ভাইয়ের এই নাজেহাল অবস্থা দেখে তাহিয়া তো হাসতে হাসতে শেষ। সবথেকে মজা যেন সে পাচ্ছে। মেহরীন একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। তালহা শান্ত স্বরে শুধু “হু”, “হ্যাঁ” করে যাচ্ছে।
মাঝে মাঝেই ঘাড় ঘুরিয়ে সাজিদ আর তাহিয়াদের দিকে তাকাচ্ছে। অস্বস্তি গলায় নিয়ে একসময় বলেই বসল,
—মেহরীন, সবাই দেখছে…
মেহরীন ধপ করে বলে উঠল,
—ধার ধারিনা কারো। আপনার সমস্যা?
তালহা তৎক্ষণাৎ নরম হয়ে গেল। মাথা দুপাশে ঝাঁকিয়ে বলল,
—না না, কোনো সমস্যা নেই।
মেহরীন এবার গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
—দেশে কি ছেলের অভাব? যে মেয়ে কর্মচারী রাখতে হবে?
—নাহ।
—তো এতো মেয়ে কেনো আপনার অফিসে?
—কাজ করতে…
—কাজ করতে কি ছেলে ছিল না?
—ছিল।
—তাহলে?
এই প্রশ্নে তালহা কিছু না ভেবেই পাশ ফিরে সাজিদের দিকে তাকাল। তালহার দৃষ্টি পড়তেই সাজিদের মুখের মিটিমিটি হাসি মিলিয়ে গেল। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তালহা গম্ভীর গলায় বলল,
—সাজিদ, বয়স্ক স্টাফ ছাড়া বাকি সব মেয়ে স্টাফ অফিস থেকে ছাটাই করবে আজকেই।
কথাটা শুনে যেন ঘরটা এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তাহিয়াদের হাসি থেমে গেছে, সকলের অবাক দৃষ্টি তাদের দিকে। মেহরীন নিজেও অবাক, তার এক বলাতে সব মেয়ে বাদ দিয়ে দিবে। সাজিদ তো বিস্ময়ে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে বলল,
—স্যার, হঠাৎ মাসের মাঝ সময়ে…
তালহা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মেহরীনের দিকে তাকায়। যেন মাথার ভেতর হাজারটা হিসাব কষছে। মেহরীনও তাকিয়ে আছে, একচুলও নড়ছে না। চোখ কুচকে ধীর কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
—আমাদের অন্য ব্রাঞ্চে মেয়ে রাখা যাবে, বউ?
মেহরীন কয়েকপলক তাকিয়ে থাকে। চোখে তখনও রাগের রেশ, কিন্তু আড়ালে ঠোঁটের কোণে একফোঁটা তৃপ্তির রেখা ভেসে উঠেছে। মাথা নেড়ে ছোট্ট করে বলে,
—হু…
মেহরীনের সম্মতি পেতেই তালহা আবার সাজিদের দিকে ফিরে নির্দেশ দিল,
—তাহলে শুনো, ওদের সবাইকে অন্য ব্রাঞ্চে শিফট করে দিও।
সাজিদ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নোয়ায়,
—আচ্ছা স্যার।
তালহা আবার ঘাড় ঘুরিয়ে নড়েচড়ে বসে মেহরীনের দিকে তাকায়। কণ্ঠে কিছুটা রসিকতা নিয়ে বলল,
—হ্যাঁ, আবার শুরু করো। পানি লাগবে? অনেকক্ষণ বকবক করছ গলা শুকিয়ে যায়নি?
এই কথা শুনে মেহরীনের চোখ ফের রাগী হয়ে ওঠে। সে তালহার দিকে সামান্য সামনে ঝুঁকে আসে,
—এই, আমি কি আপনার সঙ্গে মজা করছি?
তালহা সঙ্গে সঙ্গে ইনোসেন্ট মুখ করে আত্মসমর্পণ করে,
—না না, একদম না।
—তাহলে আমার কথা শুনতে ভালো লাগছে না? বকবক মনে হচ্ছে?
তালহা মাথা নিচু করে চুলে হাত বুলায়। কণ্ঠে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে বলে উঠে,
—দেখো, যদিও আমি মুখে মুখে তর্ক পছন্দ করি না। তবে যেহেতু তুমি করছ, তাই ভালোই লাগছে।
মেহরীন নাক ফুলিয়ে তাকায়। এই মানুষটার কথায় সে রাগবে না হাসবে। এরমধ্যে তনিমা হাততালি দিয়ে বলে ওঠে,
—মেহরীন এমন ভোলা বালা কথায় গলবি না, নো ছাড়াছাড়ি! আমরা আছি, চালিয়ে যা।
রাফি উচ্ছ্বাসে যোগ দেয়,
—বেস্ট অফ লাক মেহরীন। তুই আগামীর ঝগড়ুটে দলের সর্দার হবি!
ফারিন দুহাত তুলে চিয়ার্স করে,
—কাম অন মেহরীন, কাম অন!
তাহিয়া হঠাৎ সাজিদের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলে,
—সাজিদ ভাইয়া, এবার পপকর্নের ব্যবস্থা করলে মন্দ হয় না কিন্তু।
সাজিদ শব্দ করে হেসে উঠে। তালহা চোখ লাল করে বোনের দিকে তাকায়। তার চোখের ভাষায় কড়া শাসানি। কিন্তু তাহিয়া তো ছাড়বার পাত্রী নয়, সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
—দেখ দেখ মেহরীন, আমাকে কেমন শাসাচ্ছে! আরেকটু দে, মন খুলে দে। আমাদের প্রতিদিন গাট্টি গাট্টি পড়া দেয়, শোধবোধ নে!
কিছুক্ষন পর মেহরীনের ভোল্টেজ কমে আসতে দেখে। তালহা চোখে চোখে সাজিদকে কিছু ইশারা করে। সাজিদ সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গিয়ে বেরিয়ে যায়।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে ড্রিংকস আর কফি নিয়ে ফিরে আসে। একে একে সবার হাতে তুলে দেয়। শেষে তালহার দিকে বাড়িয়ে দিলে তালহা বোতলের মুখ খুলে উঠে দাঁড়ায়। মেহরীনের কথার মাঝেই আলতো করে তার মুখে বোতল চেপে ধরে,
—রিলাক্স। অনেকক্ষণ ধরে বকবক করছ, আগে গলা ভিজিয়ে নাও।
মেহরীন বিরক্ত মুখে এক ঢোক খেয়ে বোতলটা হাতে নেয়। তারপর চোখ কটমট করে বলে,
—আবার বলছেন আমি বকবক করছিলাম?
তালহা কপালে হাত দিয়ে লম্বা শ্বাস নেয়। সে মেহরীনকে নিজের চেয়ারে বসিয়ে দেয়, তারপর কফি হাতে সাজিদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। এক হাত তার কাঁধে রেখে হেলান দেয়।
হালকা আফসোস মেশানো কণ্ঠে বলে,
—এজন্যই বুঝি বাড়ি ফিরতে লেট করো?
সাজিদ অসহায় মুখে মাথা নেড়ে উত্তর দেয়,
—জি স্যার। এবার বুঝলেন তো বিবাহিতদের জ্বালা? বাসায় যতক্ষণ থাকি, কান ঝালাপালা করে ছাড়ে।
তালহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহরীনের দিকে তাকায়। তাকে নিজের দিকেই তাকিয়ে থাকতে দেখে মুচকি হেসে উঠে। পরপর কফিতে চুমুক দিয়ে বিরবিরিয়ে বলল,
—হারে হারে টের পাচ্ছি।
নিরবতার কয়েক মুহূর্ত কেটে যেতেই এবার সবাই একযোগে আবদার জুড়ে দিল, আজ তালহার থেকে ট্রিট চাই-ই চাই। কথাটা কানে যেতেই তালহা রাগী কণ্ঠে সবাইকে ঝারতে শুরু করে,
—তোদের সবকটাকে পেটানো উচিত! আবার ট্রিট? কোন সাহসে কলেজ ফাঁকি দিয়ে এসেছিস?
কিন্তু তার কথায় কেউ কানই দিল না। ওদের একটাই কথা ট্রিট দিতে হবে। এই নাছোড়বান্দাদের সামনে তালহা আর রাজি না হয়ে পারল না। তাছাড়া আজ সে নিজেও ফ্রি। শেষমেশ রাজি হয়ে গেল,রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাবে। এই শুনে সবাই বেরোতে উদ্যত হতেই, মেহরীন থেমে যায়। সে বলল একটু হাত-মুখে পানি দেবে। তাই সাজিদ তাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ওয়াশরুমটা দেখিয়ে দিতে।
মেহরীন বেরোতেই তালহা গিয়ে নিজের চেয়ারে বসে ফোনটা হাতে নিল। কাউকে কল দিতেই সেকেন্ড রিসিভ করে,
—হ্যালো, লিটন। চল্লিশ কেজি মিষ্টি আনানোর ব্যবস্থা করো। কেউ যেন বাদ না যায়, অফিসের সকলে যেন পায়। দরকার হলে আরও আনবে।
ওপাশ থেকে লিটনের কণ্ঠে স্পষ্ট দ্বিধা,
—কিন্তু স্যার, কী উপলক্ষে?
তালহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর শান্ত স্বরে বলল,
—আমার বউয়ের মুখ দেখা উপলক্ষে।
এইটুকু বলেই কল কেটে দিল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাহিয়ার বুকটা হঠাৎ ধক করে উঠল। চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। ভাইয়ের দিকে এগিয়ে আসে চিন্তিত মন নিয়ে,
—ভাইয়া সবাই তো জেনে গেল। চাচ্চুরাও তো জেনে যাবে..।
তালহা কিছু বলার আগেই দরজার কাছে একজন পিয়ন এসে দাঁড়াল।
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৫
—আসতে পারি স্যার?
—ইয়েস, কাম।
লোকটা এগিয়ে এসে মাথা নিচু করে জানাল,
—বড় স্যার ডাকছেন আপনাকে।
তাহিয়া চমকে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল। বুকের ভেতর দুশ্চিন্তা আরও গাঢ় হয়ে উঠল। তার মানে এতক্ষণে সব জেনে গেছে তার চাচারা। এখন কী হবে, সেই ভাবনাতেই অস্থির হয়ে উঠল তার ছোট্ট মনটা।
অথচ তালহার মুখে বিন্দুমাত্র অস্বস্তি নেই। যেন এই ডাকটা সে আগেই ধরে নিয়েছিল। নির্লিপ্ত গলায় বলল,
—আচ্ছা, যাও। আমি আসছি।
