Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৭

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৭

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৭
সাইদা মুন

প্রায় পনেরো মিনিট পেরিয়ে গেল, তবু মেহরীনের দেখা নেই। তালহার কপাল আপনাআপনি কুঁচকে যায়। অকারণ দেরি সে পছন্দ করে না। তবে মেহরীনের এই দেরি তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে। চিন্তিত হয়ে সাজিদের দিকে ফিরে সংক্ষেপে জিজ্ঞেস করে,
—মেহরীন আসছে না কেন?
সাজিদ একটু ইতস্তত করে বলে,
—স্যার, আমি গিয়ে দেখব?
তালহা হাতের ইশারায় তাকে থামায়। নিজেই উঠে দাঁড়ায় সে। টাইটা আলতো করে ঠিক করতে করতে কেবিন থেকে বেরিয়ে পড়ে। করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে তার পা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু দ্রুত। লেডিস ওয়াশরুমের সামনে পৌঁছে হালকা করে গলা খাঁকারি দেয়, যেন ভেতরে কেউ থাকলে চমকে না ওঠে। তারপর নিচু কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে ডেকে ওঠে,

—মেহরীন, আছো?
ভেতরে আরও মেয়ে থাকতে পারে, এই ভেবে প্রথমে প্রবেশ করে না সে। কিন্তু দুই-তিনবার ডাকার পরও কোনো সাড়া না পেয়ে হঠাৎ কাচ ভাঙার তীক্ষ্ণ শব্দ কানে আসতেই তালহার কপাল কুঁচকে যায়। বুকের ভেতরটা শঙ্কায় টান মারে, মেহরীনের কিছু হলো না তো? আর এক মুহূর্তও দেরি করে না সে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরীনকে। সামনে বড় আয়নাটা ভেঙে চূর্ণ হয়ে আছে, চারপাশে ছড়িয়ে কাচের টুকরো। কিন্তু সেদিকে একবারও তাকায়নি তালহা। সোজা এক ছুটে চলে যায় মেহরীনের দিকে।
ভয়ে কাঁপছে মেয়েটি। হিজাবটা আধখোলা, শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিক। ভেসিনের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরা, যেন না ধরলে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে। তালহা পেছন থেকে কাঁধে হাত রাখতেই মেহরীন দ্বিগুন চমকে পেছনে ফিরে তাকায়। সেই চমকে ওঠা চোখ দুটো দেখেই তালহার ভেতরের অস্থিরতা যেন আরও বেড়ে যায়। অস্বস্থির কন্ঠে একেরপর এক প্রশ্ন করতে লাগে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—কি হয়েছে, মেহরীন? কে করেছে এসব? এই মেহরীন বলো, কিভাবে হলো?
তালহাকে দেখামাত্রই মেয়েটা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ভেঙে পড়ে তার বুকে। ঝাপটে ধরে রাখে তালহাকে। ভয়ে হাত-পা কাঁপছে মেয়েটির। সেই কম্পন তালহাও স্পষ্ট টের পাচ্ছে। দু’হাতে শক্ত করে আগলে নেয় তাকে। মেহরীনের ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না তার বুক ভিজিয়ে দিচ্ছে। তা যেন তালহার ভেতরের রাগকে নিঃশব্দে জাগিয়ে তোলছে। মাথায় হাত বুলিয়্র শান্ত করার চেষ্টায় প্রশ্ন করে,

—বলো না মেহরীন কি হয়েছে? ভয় পেয়েছো? কে করেছে এই অবস্থা?
প্রশ্ন করতে করতেই তার হাত মুঠো হয়ে আসে, চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। চোখ দুটো ধীরে ধীরে লাল হয়ে ওঠে। মেহরীনের থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে, দ্রুত চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে, না আর কেউ নেই। তবু নিশ্চিত হতে মেহরীনকে বুকে জড়িয়ে রেখেই ভেতরের ওয়াশরুমগুলো খুঁজতে শুরু করে। একটার পর একটা দরজা খুলে দেখছে, না সব ফাঁকা। তাহলে কি ভেতরে কেউ ছিল না? না থাকলে মেহরীনের এই হালত করল কে? প্রতিটা ফাঁকা ওয়াশরুম তার রাগকে আরও গাঢ় করে তোলছে।
শেষের দরজায় হাত দিতে যাবে, এমন সময় মেহরীন হঠাৎ তার হাত ধরে থামিয়ে দেয়। তার আঙুলগুলো বরফের মতো ঠান্ডা। হিচকি তোলা ভাঙা গলায় বলে,

—এখান থেকে যাবো…
কণ্ঠের সেই অসহায় টানটা তালহার বুকের ভেতরের সব রাগকে মুহূর্তে অন্য রূপ দেয়। রাগ সরে গিয়ে জায়গা নেয় মায়া। তালহা থেমে যায়। সেই দরজাটা আর খোলা হয় না। মেহরীনের কান্নাভেজা মুখটার দিকে তাকাতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। দু’হাতে মেয়েটার গাল আগলে ধরে, কাঠ কাঠ গলায় প্রশ্ন করল,
—কার এত বড় সাহস? একবার শুধু নাম বলো জান। ওই কু*ত্তার বাচ্চাকে আমি একদম জানে মেরে ফেলব।
মেহরীনের চোখ আরও ভরে ওঠে। দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তেই তালহা নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে আলতো করে মুছে দেয়। গলার স্বরটা খানিক নামিয়ে আনে, ভাবে মেয়েটা হয়তো ভয় পাচ্ছে।
আদুরে গলায় ফের জিজ্ঞেস করল,

—ডোন্ট ক্রাই। বলো জান, কে করেছে তোমার এই অবস্থা? তাকে আমি জ্যান্ত পুঁতে ফেলব।
মেহরীন কোনোভাবে কান্না চেপে ধরে মাথা নেড়ে বলল,
—ক..কেউ না। কেউ না।
—বলতে ভয় পাচ্ছো? একদম ভয় পাবে না। আমি আছি না কারো বাপের সাহস ও হবেনা তোমার কিচ্ছু করা…
তালহার কথা শেষ হওয়ার আগেই মেহরীন তার হাত ধরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে,
—কেউ না.. কেউ কিছু ক..করেনি তো।
তালহা কড়া চোখে তাকায়। গম্ভীর গলায় ঝাঁঝালো কন্ঠে ধমকে উঠে,

—আমাকে বোকা পেয়েছো?
মেহরীন কিছুটা কেঁপে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে তালহা গভীর শ্বাস নেয়, কণ্ঠটা নরম করে আনে,
—বলো জান, কি হয়েছে? এই অবস্থা হলো কীভাবে?
মেহরীন চোখ সরিয়ে নেয়। এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে কাঁপতে কাঁপতে ধীরে বলে,
—আ..আসলে আমার হাত লেগে গ্লাসটা ভেঙে গেছে। তাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
এক মুহূর্তেই তালহার কপালে ভাঁজ পড়ে যায়। কথাটা একটুও বিশ্বাস হয়নি তার। মেহরীনের গাল ছেড়ে চারপাশে চোখ বুলায়। এত বড় আয়না, সামান্য হাতের ছোয়ায় ভেঙে যাবে? হজম হলোনা কথাটা।

—এত বড় গ্লাস তোমার সামান্য ছোঁয়ায় পড়ে যাবে?
মেহরীন থতমত খেয়ে দ্রুত কথা ঘুরায়,
—না না.. আ…আসলে আমি টাইলসে পিছলে পড়তে গিয়ে পুরো ভর গিয়ে আয়নায় পড়েছিল। তাই সাথে সাথে আয়নাটা খুলে পড়ে গেছে।
তালহা কিছুক্ষণ গম্ভীর মুখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকল। মেহরীন চোখে চোখ রাখছে না, নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে, কিছু একটা লোকাচ্ছে তার থেকে। ধীরে এগিয়ে এসে তালহা তার শরীর চেক করতে লাগে।
—দেখি কোথায় লেগেছে। কোথায় চোট পেয়েছো?
মেহরীন হকচকিয়ে বলে,

—আ…আমার লাগেনি তো।
তালহার সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। গলা ভারী হয়ে আসে,
—এত বড় কাচ ভেঙে গুড়িয়ে গেল তোমার শরীরের ধাক্কায়, আর তোমার শরীরেই একটাও আঘাত লাগেনি?
বলতে বলতে তালহার চোখ হঠাৎ থেমে যায় মেহরীনের ঘাড়ের দিকে। হিজাবটা সরে যাওয়ায় সেখানে নখের দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তালহা দাঁতে দাঁত চেপে সেই জায়গায় আঙুল ঘষতেই মেহরীন হঠাৎ করে “আহ্‌” করে ওঠে। বুঝতে আর বাকি থাকল না, জখমটা একেবারে তাজা। মুহূর্তেই তালহার কপালের রগ ফুলে ওঠে, নীল শিরাগুলো স্পষ্ট ভেসে উঠেছে।
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে তালহার হাত ছাড়িয়ে নেয়।তড়িঘড়ি করে হিজাব দিয়ে ঘাড় ঢাকার চেষ্টা করে। তালহা পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁত চিবিয়ে নিচু স্বরে বলল,

—এখন বলবে এটা আয়নায় ধাক্কা লাগায় হয়েছে? আয়নার বুঝি নখ আছে?
মেহরীন থতমত খেয়ে যায়। কি বলবে কি বলবে ভেবে মিনমিন করে বলে উঠে,
—এ..এটা আমার হাতের নখের দাগ। আসলে হিজাবটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল, ঠিক করতে গিয়ে লেগেছে।
তালহা ফুস করে শ্বাস ছাড়ে। মেয়েটা তার কাছ থেকে কি লুকাতে চাইছে? কেন এতটা এড়িয়ে যাচ্ছে?
—তাহলে তোমার এতো ভয় পাওয়ার কারণ?
মেহরীন মাথা নিচু করে নেয়,

—আপনার অফিসের এত বড় লোকসান করে ফেলেছি, তাই একটু।
তালহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বুঝে যায়, এই মুহূর্তে চাপ দিলে কিছুই বের করা যাবে না। চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ নিচু হয়ে বসে পড়ে। মেহরীনের পা চেক করতে লাগে। কোথাও কোনো চোট লেগেছে কি না। তবে ভাগ্য ভালো লাগেনি।
উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দেয়,
—ফাস্ট হিজাবটা ঠিক করো।

মেহরীন দ্রুত ঠিক করতে লাগে। কিন্তু তাড়াহুড়োয় না দেখে পিন ঠিকভাবে লাগাতে পারছে না। সেটা দেখে তালহা পকেট থেকে মোবাইল বের করে সামনের ক্যামেরা অন করে তার সামনে ধরে। মেহরীন পিটপিট করে একবার তালহার দিকে তাকায়। সে চোখের ইশারা করতেই, মেহরীন হিজাব ঠিক করতে লাগে।
হিজাব ঠিক হতেই তালহা হঠাৎ দু’পা এগিয়ে এসে মেহরীনের দু’গাল আগলে ধরে। কিছুক্ষন চেয়ে থেকে মেহরীনের কপালে গভীর ভালোবাসার পরশ একে দেয়। কপালেই ঠোঁট ছুয়িয়ে রেখে ফিসফিসিয়ে বলল,
—মেহরীন তোমাকে টাচ করার অধিকার শুধুই আমার, শুধু মাত্র এই তালহা সিকদারের…
মেহরীন চোখ বুজে অনুভব করছে তালহার স্পর্শ হঠাৎই বুক ভেঙে কান্না চলে আসে তবে নিজেকে সামলে নেয়। মনে মনে কয়েকবার বলে উঠে,
—সরি..সরি।
মেহরীনকে ছেড়ে কাউকে ফোন করতে করতে এক হাতে মেহরীনের হাত শক্ত করে ধরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে হাঁটতে লাগে। অন্য হাতের ফোন কানে। কল রিসিভ হতেই ঠান্ডা স্বরে আদেশ দেয়,
—লেডিস ওয়াশরুমটা এখনই পরিষ্কার করো। আর নতুন মিরর লাগানোর ব্যবস্থা করো।

বিল্লাল সিকদারের কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তালহা। এক মিনিট না যেতেই একজন স্টাফ হন্তদন্ত হয়ে এক প্যাকেট মিষ্টি নিয়ে হাজির হয়। তালহা মিষ্টিটা হাতে নিয়ে তাকে চলে যেতে ইশারা করলে লোকটা দ্রুত সরে পড়ে। এদিকে মেহরীন ভীত চোখে চারপাশে তাকাচ্ছে। ভেতরে ঢুকতে তার একদমই ইচ্ছে করছে না। কিন্তু তালহার কথার বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহসও পাচ্ছে না।
তালহা একবার মেহরীনের দিকে তাকিয়ে দরজায় টোকা দেয়। ভেতর থেকে অনুমতি মিলতেই সে শান্ত স্বরে বলল,
—ফলো মি।
দরজা খুলে সে ভেতরে ঢোকে। পেছন পেছন মেহরীন। সামনে গম্ভীর মুখে বসে আছেন বিল্লাল সাহেব আর আফতাব সাহেব। দুজনের মুখের ভাব দেখেই ভয় আরও বেড়ে যায় মেহরীনের। সে অজান্তেই তালহার পেছনে নিজেকে আড়াল করে নেয়, কোটের এক কোণা শক্ত করে চেপে ধরে। সেই দৃশ্য দেখে তালহার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক হাসি ফুটে ওঠে, হাসিটা এতটাই অস্পষ্ট যে কেউই দেখেইনি। তালহা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে চাচাদের সামনে দাঁড়ায়।

—এসব কী শুনছি, তালহা? যা শুনেছি, সেটা কি ঠিক?
তালহা মিষ্টির প্যাকেট খুলে সামনে বাড়িয়ে দিয়ে একদম স্বাভাবিক গলায় বলল,
—আগে মিষ্টি মুখ করো।
বিল্লাল সাহেব কিছুটা থমথমে মুখে বলেন,
—মজা করছো?
তালহা কপাল কুঁচকে জবাব দেয়,
—তুমি কি আমার শালা লাগো? যে মজা করব?
ছেলেটার সোজাসাপটা কথায় দুই ভাই খানিকটা চমকে একে অপরের দিকে তাকান। আফতাব সাহেব শুকনো গলায় প্রসঙ্গ বদলে জিজ্ঞেস করেন,
—তুমি নাকি বিয়ে করে ফেলেছো?
তালহা ভদ্র ছেলের মতো মাথা নেড়ে উত্তর দেয়,

—ঠিকই শুনেছো।
তার কথায় দুজনেই প্রায় একসাথে চেঁচিয়ে ওঠেন,
—কীইই! তুমি বিয়ে করে নিয়েছো? তাও আমাদের কিছু না জানিয়ে?
আফতাব সাহেব রাগ চেপে রাখতে না পেরে বলেন,
—বিয়ে কি তুমি ছেলে-খেলা মনে করেছো?
তালহা নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
—প্রথমে ছেলে-খেলা মনে হয়েছিল। এখন সিরিয়াসলি নিয়েছি তাই তোমরা জানতে পারলে।
এই সোজাসুজি উত্তরে দুই ভাই ফুস করে শ্বাস ছাড়েন। তারা অসন্তুষ্ট, বিল্লাল সাহেব চিন্তিত কণ্ঠে প্রশ্ন করেন,
—বউ কে? কাকে বিয়ে করেছো?
তালহা পেছনে ফিরে শান্ত স্বরে ডাকল,
—মেহরীন, সামনে আসো।
তার ডাকে মেহরীনের চোখ-মুখ আরও সঙ্কুচিত হয়ে যায়। লজ্জা আর ভয় একসাথে ভর করে। সে এগোয় না। তা দেখে তালহা নিজেই হাত ধরে আলতো টেনে তাকে সামনে এনে দাঁড় করায়। মেহরীন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। আর এদিকে বিল্লাল সাহেব ও আফতাব সাহেবের চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার জোগাড়, এই মেয়েই তালহার বউ?
তালহা মুচকি হেসে বলে,

—মেহরীন, সালাম দাও। তোমার চাচা শ্বশুরদের।
মেহরীন কিছুটা সময় নিয়ে মিনমিন করে বলে
—আ..আসসালামু আলাইকুম।
এবার তালহা চাচাদের দিকে তাকায়। তাদের বিস্ফারিত অবিশ্বাস্য চোখ দেখে হালকা ভর্ৎসনার সুরে বলে,
—কী হলো? ছেলের বউ সালাম করলো, আর তোমরা এখনো সালামি দিলে না? এত বড় কোম্পানির মালিক হয়ে আমার বউয়ের সাথে এমন কিপটেমি?
তালহার কথায় তারা যেন একের পর এক ধাক্কা খেতে থাকেন। মেহরীন তালহার বউ অথচ একই বাড়িতে থেকে কেউ বিন্দুমাত্র টেড় পায়নি? হচ্ছে টা কি? সব যেন তাদের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। তবে ছেলের বউয়ের সামনে নিজেদের সম্মান রক্ষার্থে আর কিছু না বলে দুজনেই পকেট থেকে পাঁচ হাজার করে টাকা বের করে এগিয়ে এসে মেহরীনের হাতে তুলে দেন।

মিনিটখানেক কেটে গেছে। তালহা সব খুলে বলতেই, পরিবেশ এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। সামনের দুটো চেয়ারে পাশাপাশি বসে আছে তালহা আর মেহরীন। তাদের মুখোমুখি বসে তালহার দুই চাচ্চু।
আফতাব সাহেব ভারী গলায় বললেন,
—ভাবতে পারছিস, তোর মা হঠাৎ জানলে কী হবে? তোর বিয়ে নিয়ে তার কত চিন্তা! দুই দিন পরপর মেয়ে দেখতে যাচ্ছে। আর এদিকে ছেলে কিনা বিয়ে করে বসে আছে।
তালহা মাথা চুলকে একটু নরম স্বরে বলল,

—তোমরা আপাতত আম্মুকে কিছু বলো না। আমি আস্তে আস্তে সব বলব।
আফতাব সাহেব মাথা নেড়ে আফসোসের সুরে বলে উঠলেন,
—একদম ঠিক কাজ করলি না। তুই আমাদের বংশের প্রথম ছেলে। তোর বিয়ে নিয়ে কত আশা ছিল! কতো কি করব ভেবে রেখেছি। তুই এমনটা করতে পারলি?
তালহা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল,
—তোমার ভাতিজা না? সবই হবে।
আফতাব সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন,
—মানে?
তালহা স্বাভাবিক গলায় বলল,

—মানে খুব সিম্পল। তুমিও তো কট খেয়ে বিয়ে করেছিলে, পরে সব অনুষ্ঠান করেই চাচিকে ঘরে তুললে। আমিও অনুষ্ঠান করেই বউকে ঘরে তুলব।
আফতাব সিকদার ভাতিজার কথায় এদিক সেদিক তাকাতে লাগেন লজ্জায়। বিল্লাল সাহেব হিসহিসিয়ে বলে উঠলেন,
—তোর বউকে আর ঘরে তুলবি কী? ঘরেই তো আছে!
তালহা শান্ত কণ্ঠে বলল,
—তো কী হয়েছে? তুমি যেমন চাচিকে বিয়ের পনেরো দিন আগে তুলে এনেছিলে, আর পনেরো দিন পর বাড়িতে রেখেই ধুমধাম করে বিয়ে করেছিলে। আমিও তাই-ই করব।
এক মুহূর্তে বিল্লাল সাহেবও লজ্জায় পড়ে যান। সঙ্গে আফতাব সাহেবও চুপ। ভাতিজাকে কী বলবে, ভেবে পান না আর। কিছু বললেই উল্টো কথার ফাঁদে পড়ে তারাই জব্দ হয়ে যাচ্ছে। ছেলের বউয়ের সামনে শশুড়দের এমন নাজেহাল অবস্থা মানায় না। তাও চুপ করে গেলেন।
তালহা উঠে দাঁড়ায়,

—আচ্ছা চাচ্চু, আমরা তাহলে আসছি। ওদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি। পরে কথা হবে।
তার সঙ্গে সঙ্গে মেহরীনও উঠে দাঁড়ায়। তালহা আগে আগে গিয়ে দরজাটা টেনে খুলে ধরে, তারপর ইশারা করে মেহরীনকে বের হতে বলে। মেহরীন বেরোতেই তালহাও সঙ্গে সঙ্গে বাইরে চলে যায়।
দরজাটা বন্ধ হতে হতে চোখে আসে মেহরীনের হাত তালহার নিজের হাতে আগলে নেওয়ার দৃশ্য। বিল্লাল সাহেব বিরবির করে বলে ওঠেন,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৬

—আর যাই বলিস, ছেলেটা একেবারে বউভক্ত হবে।
হালকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আফতাব সাহেব সহাস্যে বলে ওঠেন,
—ওর বাপ-চাচাই তো বউভক্ত। ও ব্যতিক্রম হবে, এমনটা ভাবলে কী করে…

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৮