Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৫ (২)

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৫ (২)

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৫ (২)
সাইদা মুন

মেয়েটির কথায় মেহরীনের চোখ মুহূর্তেই লালচে হয়ে উঠল। শুধু সে-ই নয়, দাঁড়িয়ে থাকা বাকিদের মুখেও জমে উঠল তীব্র বিরক্তি আর ক্ষোভ। রাগের মাথায় সবাই একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল তাহিয়ার ওপর। কেন সে নিজের পরিচয় দেয়নি, কেন তার ভাইয়ের অফিসে এসে তাকেই এমন অপমান সহ্য করতে হলো।
অথচ তাহিয়া বোকার মতো তাকিয়ে আছে। বিস্ফোরিত চোখে সবার দিকে চেয়ে, যেন কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। নিজের পরিচয় দিতে তার অদ্ভুত এক সংকোচ কাজ করে। নাম বললে হয়তো ভাব দেখানো হয়ে যাবে, এই ভেবে সে চুপ করে ছিল। কিন্তু তার সেই সরল, বেখাপ্পা যুক্তি শুনে বাকিদের রাগ আরও বেড়ে যায়।
মেয়েটি বেরিয়ে যেতেই একজন স্টাফ বিরক্ত চোখে তার চলে যাওয়ার দিকটা একবার দেখে নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। কণ্ঠে ভদ্রতা এনে নরম স্বরে বলল,

—সরি ম্যাম, উনার কথায় কিছু মনে করবেন না। আপনাদের কী প্রয়োজন, আমাকে বলুন।
তনিমা এক ধাপ সামনে এসে এবার সোজা তাহিয়ার দিকে আঙুল তুলে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—উনি তাহিয়া সিকদার, তালহা সিকদারের ছোট বোন। আমরা ওর বন্ধু। আর কিছু জানার বাকি আছে?
কথাটা শুনে স্টাফটি স্পষ্টভাবে চমকে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে সম্মান দেখিয়ে মাথা নত করে দ্রুত বলে,
—ওহ! সরি, সরি ম্যাম। আমরা আসলে জানতাম না। আমি নতুন জয়েন করেছি, তাই চিনতে পারিনি। প্লিজ কিছু মনে করবেন না। আসুন, ভেতরে আসুন।
লোকটার এমন ব্যবহারে তাহিয়া অপ্রস্তুত হয়ে এগিয়ে আসে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—আরে না না, প্লিজ আংকেল। এমন করে বলবেন না, প্লিজ। আমি কিছু মনে করিনি। ভুল আপনার না, আসলে আমারই তো এখানে খুব একটা আসা হয় না। চিনবেনই বা কীভাবে?
এর ফাঁকে মেহরীন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
—ওই মেয়েটা কে আংকেল?
স্টাফটি খানিকটা অস্বস্তি নিয়ে উত্তর দেয়,
—উনি ইনফরমাল ম্যানেজার। একটু… সবকিছুতেই বেশি বাড়াবাড়ি করেন। সিবার সাথেই এমন খারাপ ব্যবহার করে। উনার হয়ে আমি সরি। আশা করি কিছু মনে করবেন না।
মেহরীনের কণ্ঠে স্পষ্ট অসন্তোষ,

—কেন আপনি কেন বলবেন সরি? আপনি কিছুই করেননি শুধু শুধু নত হবেন না আংকেল। আর আপনাদের স্যার কি এসব কিছু জানেন? বলেন না কিছু?
লোকটি মাথা নাড়িয়ে বলে,
—আসলে উনি ম্যানেজারের মেয়ে। আবার স্যারের ফ্রেন্ড ও। তবে স্যারের সামনে এসব করেন না। আচ্ছা এসব বাদ দেই চলুন, আপনাদের সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। আসুন আসুন…
লোকটি খুশি হয়েই একে একে সবাইকে পরিচয় করাতে করাতে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। যাকেই পাচ্ছে তাকেই জানাচ্ছে। সবাই সৌজন্য বজায় রেখে সালাম দিচ্ছে, কুশল জিজ্ঞেস করছে। সকলেই সম্মান দিচ্ছে তালহার বোন হিসেবে। তবে মেহরীনদের মন অন্য জায়গায় আটকে আছে। ওই মেয়েটার সঙ্গে মুখোমুখি না হলে যেন শান্তি পাচ্ছে না। তাকে আচ্ছা মতো দিতে পারলে শান্তি লাগত। তালহার বান্ধবী, এই কথাটা মাথায় ঘুরছে। তালহা তো তাকে বলেনি তার বান্ধুবি আছে। নানান চিন্তা মাথায় নিয়ে মেহরীন এগোতে থাকে।
তালহার কেবিনে সবাইকে বসিয়ে দিয়ে স্টাফটি নাস্তা আনতে বেরোতে চাইল,

—স্যার আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আসবেন। আপনারা বসুন, আমি নাস্তার ব্যবস্থা করছি।
রাফি তাড়াতাড়ি থামিয়ে দেয়,
—না না, দরকার নেই। তালহা ভাইয়া আসলেই খাবো।
লোকটিও আর কথা বাড়ায় না, চুপচাপ বেরিয়ে যায়।
কেবিনের ভেতরে সবাই তখন কৌতূহলী চোখে চারপাশ দেখতে থাকে। ডেস্কের পাশেই বিশাল একটি মেডেল গ্যালারি। ঝকঝকে সারি সারি মেডেল সাজানো। তালহার সফলতা যেন নিঃশব্দে ঘোষণা দিচ্ছে এই দেয়ালটাই। প্রতি বছর দেশ-বিদেশে ব্যবসায়িক অর্জনের জন্য পাওয়া অসংখ্য সম্মান।
—ওরে বাবা, এত মেডেল! কিনে সাজাইছে নাকি?
রাফির হাসতে হাসতে বলা কথা শুনে তাহিয়া হেসে উত্তর দেয়,

—উহু। এগুলো আমার ভাইয়ের অর্জন। এমনি এমনি দেশের সেরা ব্যবসায়ীদের তালিকায় ওঠেনি। তার অগাধ পরিশ্রমের ফল এইগুলো। তার সফলতার সাক্ষ্য।
সে একে একে দেখাতে শুরু করে, কোনটা কোন পুরস্কার, কোনটা কোন বছরের। ভাইকে নিয়ে গল্প করতে করতে তার চোখেমুখে স্পষ্ট গর্ব।
এদিকে মেহরীন ধীরে ধীরে তালহার ডেস্কের সামনে এগিয়ে যায়। ল্যাপটপ, কয়েকটা ফাইল, ছোটখাটো নানা জিনিসপত্র রাখা ডেস্কে। পাশে রাখা দুটো ফটো ফ্রেমে তার চোখ আটকে যায়। একটি হাতে নিয়ে ভালো করে দেখতে গিয়ে কপাল কুঁচকে যায়। ছবিটায় তালহা, দাড়িহীন, শরীর এখনকার তুলনায় অনেকটাই ছিপছিপে। স্পষ্টই পুরোনো ছবি। তখন তার মুখে ছিল একধরনের নিষ্পাপ ভাব, এখনকার গম্ভীরতা তখনো এসে ভর করেনি।
মেহরীন ফ্রেমটা হাতে নিয়েই তাহিয়ার দিকে এগোয়,

—তাহিয়া, এই ছবিটা কবে তোলা?
তার প্রশ্নে সবার দৃষ্টি ফ্রেমটার দিকে যায়। তাহিয়া হেসে উত্তর দেয়,
—ওটা ভাইয়ার প্রথম অ্যাওয়ার্ডের ছবি। অনেক বছর আগের। আব্বু মারা যাওয়ার পর যখন কোম্পানিতে জয়েন করেছিল, তার এক বছরের মাথায় এই অ্যাওয়ার্ডটা পেয়েছিল।
সবাই আগ্রহ নিয়ে গল্প শুনছিল। ঠিক তখনই কয়েকজন কেবিনে ঢুকতেই সবাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তালহাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে সকলেই স্বস্থির নিশ্বাস ফেলে। তালহাকে দেখে মুখে হাসি ফুটলেও, তার পাশের সেই মেয়েটাকে দেখেই মেহরীনদের ভেতরে জমে থাকা বিরক্তি আবার মাথাচাড়া দেয়।
তালহা মিটিং রুম থেকে বের হয়ে সোজা নিজের কেবিনে ঢোকেছে। কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা নিজের চেয়ারটায় বসে চোখ বুজে কপালে হাত বোলাতে থাকে। রুমে যে আরও কয়েকজন আছে তা এখনো টের পায়নি।

—সাজিদ, দ্রুত একটা কফি পাঠাও। মাথাটা ধরেছে খুব।
ঠিক তখনই তার কথার মাঝে রাইসা ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে মেহরীনের দিকে এগিয়ে যায়। তার হাত থেকে ফটো ফ্রেমটা ছিনিয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
—এই মেয়ে! এত বড় সাহস। এই রুমে এসে তালহার জিনিসে হাত দিচ্ছ।
তার এহেন কান্ডে সকলেই চমকে তাকায়। এইবার মেহরীনও আরও রেগে উঠে। আর চুপ থাকেনি। সেও এক টানে ফ্রেমটা নিজের হাতে ফিরিয়ে নেয়।
—বেশ করেছি নিয়েছি। আরও নেব। তাতে আপনার কী? এটা কি আপনার বাপের সম্পত্তি?
তালহা ইতিমধ্যেই খেয়াল করে তার কেবিনে এত মানুষ। বিস্মিত চোখে সবাইকে দেখে। এই সময় এদের কলেজে থাকার কথা, এখানে কী করছে এরা। এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই রেগে যায়। তবে দুজনের তর্ক তার কানে আসতেই সেদিকে তাকায়।
রাইসা চিৎকার করে ওঠে,

—আমার বাপের না হলেও এটা কি তোমার বাপের? ছাড়ো!
দুজনের টানাটানির মাঝেই তনিমা এগিয়ে এসে এক ঝটকায় ফ্রেমটা টেনে নেয়। সেটা মেহরীনের হাতে গুঁজে দিয়ে নিজে তার সামনে দাঁড়িয়ে কোমড়ে হাত রেখে কঠিন দৃষ্টিতে তাকায়,
—এইটা ওর বাপের সম্পত্তি না, তবে ওর জামাইর সম্পত্তি।
কথাটা শুনে রাইসা যেন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে,
—এই জামাইর সম্পত্তি মানে কী? মুখ সামলে কথা বলো, বেয়াদব মেয়ে।
তনিমা মেহরীনের দিকে ফিরে বলে ওঠে,
—বুঝিয়ে দে ওকে। বেশি বাড়াবাড়ি করছে। ভাব দেখাচ্ছে যেন এখানকার মালিক সে-ই।
রাইসা ঠোঁট বাঁকিয়ে আত্মতৃপ্ত ভঙ্গিতে বলল,

—মালিক না হলেও তালহার খুব কাছের মানুষ। আমার কথা-ই তার কথা। তাই না তালহা বেইব?
তালহা বিরক্ত চোখে রাইসার দিকে তাকায়। হচ্ছে টা কি কিছুই মাথায় আসছে না। একে মাথা ব্যথা করছে তার উপর এদের চেচামেচি। দৃষ্টি ফিরিয়ে মেহরীনের দিকে তাকাতেই দুজনের চোখ মেলে। তার সেই কটমটে, দাবিদার চোখ দেখে তালহা খানিকটা অবাক হয়, এই চোখ তো তার দেওয়ার কথা ছিল, তবে মেহরীনের কেন?
সে চোখ ফিরিয়ে নেয় তাহিয়ার দিকে গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করল,
—তাহিয়া কার সঙ্গে এসেছিস?
ভাইয়ের কণ্ঠে তাহিয়া কেঁপে উঠলেও বাকিরা পাত্তা দেয় না। তনিমা এগিয়ে এসে বলে,

—দুলাভাই, এসব কী? দুলাভাইয়ের অফিসে এসে শালা-শালিদের এমন অপমান ছিঃ, মানায়?
“দুলাভাই” শব্দটা কানে যেতেই তালহা চমকে তাকায়,
—দুলাভাই কে?
রাফি পাশ থেকে দাঁত বের করে বলল,
—কেন, আপনি-ই তো দুলাভাই।
রাফিকে পাশ কাটিয়ে তনিমা ঠোঁটে তির্যক হাসি এনে বলে,
—ভাইয়া তলে তলে টেম্পু চালায়, আর আমরা দুলাভাই বললেই হরতাল?
তালহা থমথমে মুখে তাকিয়ে ধীরস্বরে প্রশ্ন করল,
—মানে তোমরা..?
তালহার ইঙ্গিত বুঝে তনিমা নিজেই হাল ধরল। ঠোঁটে এক চিলতে হাসি টেনে হালকা ব্যঙ্গ মিশিয়ে বলল,

—আল্লাহ আমাদের আর কোনো গুণ দিন আর না দিন, মানুষের নাড়িভুঁড়ি ঘেঁটে হলেও প্রেমঘটিত খবর বের করার গুন ভরে ভরে দিছে।
এই কথার মাঝেই রাইসা আবার মেহরীনের হাত থেকে ফটো ফ্রেমটা কেড়ে নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। টানাটানি শুরু হতেই তালহা এবার গম্ভীর কণ্ঠে ঝারি মেরে থামিয়ে দেয়,
—স্টপ, রাইসা। ওটা ওর কাছেই থাকবে।
তালহার নির্দেশে রাইসা থেমে যায়। কিন্তু রাগে মেহরীনের দিকে একবার বিষম দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কয়েকপলক। তবে পরমুহূর্তের মধ্যেই মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে ফেলে। হঠাৎই নরম, নিরীহ সেজে তালহার পাশে গিয়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ে।

—তুই ওদের চিনিস তালহা? দেখছিস কী বলছে? আমাকে অপমান করে কথা বলছে। জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে তোর বউ হওয়ার। এটার যোগ্যতা আছে নাকি? আর ওরাও কীসব উদ্ভট কথা বলছে, পুরো পাগলের দল!
রাইসার কথার স্রোত থামার নামই নিচ্ছে না। একের পর এক বাক্য ছুড়ে দিচ্ছে সে মেহরীনের দিকে। আর প্রতিটা শব্দে মেহরীনের ধৈর্যের দেয়ালে যেন চিড় ধরছে। মেয়েটি তালহার একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকাটা তার রাগকে যেন আরও উসকে দিচ্ছে। চোখ দুটো জ্বলে উঠেছে আগুনের মতো। চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরা, দু’হাতের মুঠো এমন শক্ত যে নখ বসে যাচ্ছে তালুতে।

আর তালহা? সে একেবারে বিপরীত। ডান হাতটা চেয়ারের হাতলে রেখে, থুতনিতে ভর দিয়ে বসে আছে। মুখে কোনো মন্তব্য নেই, চোখে শুধু গভীর মনোযোগ, মেহরীনের দিকে। বউয়ের এই রূপ তার ভালোই লাগছে। এই চোখ, এই টানটান মুখ, চোখে জমে থাকা ঈর্ষা, সবটাই তার কাছে অদ্ভুত রকমের আকর্ষণীয় লাগছে। সে যেন দেখতে চাইছে, মেহরীন কতদূর পর্যন্ত নিজেকে সংযত রাখতে পারে। সে কি এখানেই থেমে যাবে, নাকি নিজের অধিকার তুলে ধরবে?
অন্যদিকে তার পেছন থেকে তনিমা, রাফি আর ফারিন মিলে মেহরীনকে আরও উসকে দিতে থাকে।
তনিমার চাপা ফিসফিসে বলল,

—কিছু বল! তোর জামাইকে নিয়ে কী বলছে দেখছিস?
ফারিন যোগ করে,
—চুলে ধরে একটা টান দে, মন ভরে যাবে।
তনিমা আরও এক কাঠি বাড়িয়ে বলে,
—যা না, দু’গা বেশি মারলেও ভয় নেই। আমরা আছি পেছনে, সবাই মিলে দিবো উত্তম মাধ্যম।
তাহিয়াও আর সহ্য করতে পারছে না। ক্ষোভে মেহরীনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
—যা মেহরীন, তুই শুধু শুরু কর। বাকিটা আমরা দেখছি।
এই কথাগুলো যেন মেহরীনের ভেতরে জমে থাকা সাহসটাকে এক ধাক্কায় বের করে আনল। দৃঢ় পায়ে ধপধপ শব্দ তুলে সে তালহার সামনে এগিয়ে যায়। এক ঝটকায় ফ্রেমটা তালহার হাতে ধরিয়ে দেয়। তালহা ফ্রেমটা হাতে নিতেই মেহরীন আচমকা ঘুরে রাইসার টপসের কলার শক্ত করে চেপে ধরে।
হঠাৎ আক্রমণ আর গলায় চাপ পড়ার ব্যথায় রাইসা হকচকিয়ে ওঠে।

—এই! কী করছিস? এত সাহস কই থেকে আসে? তালহা দেখ! এই মেয়ে কী করছে!
মেহরীনের চোখে তখন কোনো দ্বিধা নেই। দাঁত চেপে, ফোঁস করে বলে ওঠে,
—উনি কী বলবে? যা বলার আমি বলব। জামাই আমার, ভাব তোমার? কুছ বি? অন্যের জামাইর দিকে চোখ দিলে চুল টেনে ছিঁড়ে টাকলা বানিয়ে দেব। এইটা আমার বাপের সম্পত্তি না হতে পারে, তবে আমার জামাইর সম্পত্তি। মাথায় ঢুকছে আমার কথা?
বলতে বলতেই সে রাইসার চুলের মুঠো চেপে ধরে। দস্তাদস্তির একসময় রাইসাও পাল্টা আক্রমণ করে বসল, মেহরীনের চুলে টান মারে। হঠাৎ ব্যথায় মেহরীনের মুখ থেকে “আহ্” শব্দ বেরিয়ে আসতেই তালহা আর বসে থাকতে পারে না। সে ঝট করে উঠে দাঁড়ায়।

—হেই স্টপ। ডোন্ট ডেয়ার টু হার্ট মাই ওয়াইফ!
তালহার তীব্র গর্জনে রাইসা ভয়ে হাত ছেড়ে দেয়। “ওয়াইফ” শব্দটা কানে যেতেই সে বিস্ফোরিত চোখে তাকায়। ঠিক তখনই পেছন থেকে তাহিয়া আর তনিমা ঝাঁপিয়ে পড়ে রাইসার দু’হাত শক্ত করে চেপে ধরে। তা অনুভব হতেই রাইসা ছটফট করতে থাকে, হাত ছাড়ানোর চেষ্টায়।
মেহরীন তখনও চুলের মুঠো ধরে আছে। একদম যেন লটকে আছে তার চুলে ধরে। ব্যথায় আর অপমানে কণ্ঠ ভেঙে আসে রাইসার,

—প্লিজ তালহা হেল্প মি। আমাকে মেরেই ফেলবে বাঁচা..
কিন্তু তালহা অবাক করার মতো শান্ত। যেন সামনে যা হচ্ছে সবই নরমাল। সে মৃদু হেসে টেবিলে রাখা পানির গ্লাসটা তুলে নেয়। ধীরে এক ঢোক পানি খেয়ে আরাম করে বসে পড়ে। তারপর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে,
—সাজিদ, দাঁড়িয়ে দেখছ কেন? ফাস্ট পপকর্ন আনো। বউ, আরও কিছু সময় কন্টিনিউ রাখো ভালোই লাগছে…
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাজিদ বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। সামনে তখন তুমুল চুলাচুলি, অথচ তার স্যার নির্বিকার ভঙ্গিতে পপকর্ন আনতে বলছেন। গলা শুকিয়ে এলো তার। স্যার কি ঠিক আছে? ভয়ে ভয়ে সে বলে উঠল,
—স্যা… স্যার, রাইসা ম্যাডামকে মারছে…
তালহা কোনা দৃষ্টিতে তাকিয়ে অনায়াসে বলল,
—সো হোয়াট? ভালো লাগছে না?
এহেন প্রশ্নে কিছুক্ষণ বসের মুখের দিকে চেয়ে থাকল সাজিদ। মনে মনে সে বেশ সন্তুষ্ট, এই উদ্ধত মেয়েটাকে অবশেষে কেউ উত্তম-মধ্যম দিচ্ছে। কিন্তু চাকরির ভয়টা সামনে চলে আসতেই সে মাথা নেড়ে বলল,
—ন… না স্যার।
তালহা হেসে উঠল,

—আরে ধুর! মিথ্যেবাদী। তোমার মুখের ওই চাপা হাসিটাই সব বলে দিচ্ছে।
তালহার আচমকা স্বরবদলে সাজিদ হকচকিয়ে উঠে। তার স্যার তো এমন রসিকতার মানুষ না হলোটা কি হঠাৎ। আঁতকে তাকিয়ে আছে একবার মেহরীনদের দিকে তো একবার তালহার দিকে। অফিস রুমের বাইরে কর্মচারীদের ভিড় জমে উঠেছে। দরজা খোলা থাকায় চেচামেচিতে সবাই এসে ঝগড়া দেখতে হাজির। বাঙালি বলে কথা মারামারি ঝগড়া দেখাতে সবার আগে থাকবেই। খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে সবাই উঁকি মারছে। কারও চোখে কৌতূহল, কারও মুখে চাপা আনন্দ, অনেকেরই মনে হচ্ছে, মেয়েটা অবশেষে তার প্রাপ্যটাই পাচ্ছে। এমনিতেই সবাইকে নাকাল করে ছাড়ত সে।

একসময় তালহা উঠে দাঁড়াল। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে মেহরীনকে টেনে নিল। মেহরীন চুল ছেড়ে দিতেই তাহিয়ারাও হাত ছেড়ে দাড়াল। রাইসা মেয়েটি হাঁপাতে হাঁপাতে শ্বাস নিচ্ছে। এলোমেলো মেকআপে মুখটা বিকৃত হয়ে আছে, চুল আওলে অবস্থা খারাপ।
মেহরীনের কোমর শক্ত করে ধরে আছে তালহা। এবার কড়া চোখে রাইসার দিকে তাকাল,
—সি ইজ মিসেস তালহা সিকদার, অনার অফ তালহা সিকদার্স হার্ট…
কথাটা শেষ হতেই যেন চারদিকে মুহুর্তের জন্য সব নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কিছুক্ষনের মধ্যেই ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সবার চোখ কোটর থেকে বের হওয়ার উপক্রম। সকলের মাঝে গুঞ্জন শুরুম তালহা যে বিবাহিত, এ কথা কেউ জানতই না। সাজিদ নিজেও হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার স্যার বিবাহিত? আশ্চর্য হয়ে তাকায় তালহার দিকে।
তালহা একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে আবার রাইসার দিকে ফিরল,

—এখনই বেরিয়ে যাবি, অফিসের ত্রিসীমা পেরিয়ে যেদিক মন চায় যেতে পারিস। তবে অফিসের আশেপাশে তোর ছায়াও যেন আর না দেখি। বন্ধু বলে এটুকু সম্মান দিলাম, না হলে এই মুহূর্তেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতাম।
লজ্জা, অপমান আর ক্ষোভে ভেঙে পড়ে রাইসা কান্নায় ভেঙে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। দরজার সামনে ভিড় দেখে তালহা একবার কড়া ধমক দিতেই সবাই তড়িঘড়ি করে যার যার কাজে ফিরে গেল। তবে তালহার বিয়ের খবর মুহুর্তেই পুরো অফিসে ছড়িয়ে গেছে।
মেহরীন ঝাঁকুনি দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল তালহার থেকে। রাগে তার চোখ মুখ জ্বলছে। তালহা পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৫

—এখানে কী করছ? কার সঙ্গে এসেছ?
মেহরীন নাক ফুলিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর আর নিজেকে সামলাতে না পেরে গর্জে উঠল—
—তার আগে বলুন, আপনার এইসব কী চলছিল? হ্যাঁ…

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৬