Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৫

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৫

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৫
সাইদা মুন

—এই মেয়ে এই সাহস কতো বড় আমাকে কি বললে তুমি, কিইইইই?
তনিমা চোখ পিটপিট করে রেলিঙের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। এপ্রোনের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলল,
—আমি কি কারো নাম উল্লেখ করেছি? জুতা ছুড়ে নিচে ফেলেছি এখন আপনি যদি তা স্বইচ্ছায় তুলে পড়ে নিন তাহলে আপনাকেই বললাম…
মেয়েটি রেগেমেগে তেড়ে আসে। তনিমার ঠিক সামনে এসে দাঁড়ায় রাগে ফুসছে। তাহিয়ারাও দ্রুত উপরে উঠে আসে। সবকটা তনিমার পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ে। বুঝতে পারছে বড়সড় ঝামেলা করবে তাই বান্ধুবিকে প্রটেক্ট করতে সবাই রেডি।

—এই বেয়াদব তুমি কি জানো আমি এখন তোমার কি অবস্থা করতে পারি?
—আর আমি কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আঙুল চুষব?
—চুরের মায়ের বড়গলা, বেয়াদব বড়দের সাথে এভাবে কথা বলছ, করব নালিশ?
—আরে করুন না, আমি কি না করেছি?
মেয়েটির পাশের মেয়েটা ফাঁকে বলে উঠে,
—দেখছিস কেমন মেয়ে মুখে মুখে কেমন চেটাং চেটাং কথা বলছে…
রাফি তার প্রতিউত্তরে বলে উঠল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—আরে আপা দুক্কু নিবেন না। আসলে হচ্ছে কি আমার বান্ধুবির জন্মের পর মধু দেওয়ার আগেই ওর বাপে স্ট্রেইট-ফরওয়ার্ড কথা বলে ফেলেছিল। সেই থেকে বান্ধুবিটার মুখ থেকে চেটাং চেটাং কথা বের হয়।
ফারিনও তাল মিলিয়ে খোঁচা মেরে বলল,
—তবে সব উচিত কথাই বের হয়। থাক আপা দুক্কু নিবেন না…
মেয়েটিতো আরও জ্বলে উঠেছে, সাথে তার গ্রুপের বাকি মেয়েরা। জুনিয়ররা নাকি তাদের অপমান করছে। মানা যায়? রাগে জিদে সিনথিয়া তনিমার দিকে এগিয়ে যেতে নিলে তার বান্ধুবিরা আটকে দেয়। একটা মেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

—বইন সাবধান সব জায়গায় পাওয়ার চলে না। শুনেছি এই মেয়ে আইনমন্ত্রীর মেয়ে। হেরফের করলে তোর পুরো গোষ্টি সহ জেলে ঢোকানোর ক্ষমতা আছে।
সিনথিয়া থেমে যায়। মনে মনে কিছুটা ভয় পেলেও হাত ঝারি মেরে ছাড়িয়ে বলল,
—এসব বাল ছাল ভয় পাই নাকি…
বলেই ফের চেচাতে থাকে। তবে এতে তনিমা সহ বাকিদের কিছু বলতে না দেখে মেয়েটি আরও রেগে যায়। তাকে যেন তারা অগ্রাহ্য করছে।
—এই এই বেয়াদবের দল কিছু বলছ না কেনো? আমি যে প্রশ্ন করছি উত্তর দিচ্ছ না কেনো? ভয় পেলে বুঝি?
তনিমা উঠে দাঁড়ায় সোজা হয়ে। তারপর ডিরেক্ট তার সামনে দাঁড়িয়ে নির্দ্বিদায় বলে উঠল,
—চিল্লিয়ে যদি বড় হওয়া যেতো, তাহলে সিংহের পজিশনে কুত্তা রাজা থাকত…
অপমানে মেয়েটির মুখ থমথমে কি বলবে খুজে পাচ্ছে না। শেষমেশ না পারতে তনিমাদের দিকে আঙুল তুলে গমগমে গলায় বলল,

—দেখে নিবো একেকটাকে…
মেহরীন মুখ বাকিয়ে বলল,
—এই সবাই পোজ দে আপু ভালো করে দেখে নিক।
বলতেই সাথে সাথে যে যার জায়গায় পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। এ যেন তাজা আগুনে ঘি ঢালা হলো। আর সহ্য করতে না পেরে মেয়েটা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ধুপধাপ পা ফেলে নিজের গ্রুপ নিয়ে চলে যায়। যেতে যেতে শাসিয়ে যায় “পরে দেখে নিবে”। তারা যেতেই করিডোর জুড়ে হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল। একেকজন হাসতে হাসতে কাহিল। জব্দ করতে পেরেছে, ভালোভাবেই। একজন আরেকজনের সাথে হাই-ফাইভ দিতে দিতে ক্লাসের দিকে এগোয়। হাসাহাসির মাঝেই সবাই ক্লাসে ঢুকে পরে। কিন্তু হাসির রেশ কাটে মেহরীন আর তাহিয়ার প্রশ্নে। দুজনেই চেপে ধরে বাকিদের।

—এই, বললি না তো, তনিমা এখানে কী করে? তাও আবার তোদের সঙ্গে?
রাফি মুখ কুঁচকে বিরক্তির সুরে বলল,
—প্রথম দিন এসেই এই ভূতনি আমাদের ভয় দেখিয়ে দিয়েছে…
তাহিয়া কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করল,
—কেমনে?
ফারিন বলতে শুরু করে,

—আরে কালকেই এসেছে কলেজে, ওর বাপসহ। হঠাৎ এত ভিআইপি লোক, এতো পুলিশের গাড়ি, দেখে সবাই এমন ভয় পেয়ে গিয়েছিল না, বলার বাহিরে। কলেজে যেন আলাদাই একটা গুঞ্জন পড়ে গেছিল। সকলের মনে একটাই প্রশ্ন কলেজে আবার কোনো কাণ্ড ঘটে গেছে নাকি। এসব ভাবতে ভাবতেই আতঙ্কে ক্লাসে মনই বসছিল না কারো। তার ওপর অর্ধেক ক্লাস চলার পথে দেখি এই তনিমা, ওর বাপ, প্রিন্সিপাল আর কয়েকজন পুলিশ কনস্টেবল একসাথে এসে হাজির আমাদের ক্লাসে। এতে সকলের কাঁপাকাঁপি আরও শুরু। আবার এই বেয়াদব মহিলা এসেই আমাদের নাম ধরে ডাক দিল! ভয়ে তো আমাদের দুজনের আত্মাই উড়ে যাওয়ার উপক্রম। মনে হচ্ছিল, কোনো ক্রাইম-ট্রাইম করে ফেলেছি নাকি।
ফারিন একটু থামতেই মেহরীন আর ধৈর্য রাখতে পারে না প্রশ্ন করতে লাগে,

—তারপর তারপর…?
তনিমা ব্রেঞ্চে হেলান দিয়ে বসে হালকা গলায় বলল,
—তারপর আমি বলছি…ওইদিন তোদের বাসায় থাকতে তোরা বলেছিলিস না, কলেজে তোদের আরও দুইটা ফ্রেন্ড রাফি-ফারিন আছে। আমিও তাদের নাম মনে রেখেছিলাম। আব্বুকে বলে তোদের কলেজে শিফট হয়েছি কালই। ক্লাসে এসে তোদের না দেখে ওদেরই আগে খুঁজে বের করলাম। একা একা কি ভালো লাগে নাকি। বাট ভীতুর দল এমন ভয় পেয়ে গিয়েছিল..
বলেই হাসতে লাগে তনিমা। রাফি সঙ্গে সঙ্গে ভাব নিয়ে বলল,
—এই! আমি মোটেও ভয় পাইনি। ভয় তো পেয়েছে এই ফারিনের বাচ্চা।
ফারিন চোখ কটমট করে তাকিয়ে বলল,
—হপ! আবার মিথ্যা বলিস। একটুর জন্য প্যান্ট ভিজাসনি, দেখিনি আমি?
রাফি থমথমে মুখে তাকিয়ে থাকে অসহায়ভাবে। এদের সামনে একটু ভাব নেওয়াও মুশকিল। তনিমা তখন হাসতে হাসতে বলে ওঠে,

—ছি ছি রাফি বেইবি! তুমি বান্ধুবির বাপকেই এত ভয় পাও? গফের বাপেরে দেখলে তো সত্যি সত্যি প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলবে…
তার কথায় মুহূর্তেই সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। রাফি তো মুখ আরও ভোঁতা করে বসে থাকে। রাগে মুখ ভেংচে অন্যদিকে ফিরে গিয়ে বিড়বিড় করতে লাগে,
—তিনটার অপমানে কিসের কমতি ছিল আল্লাহ, আরেকটা পাঠাই দিছেন…
এরপর প্রথম তিনটে ক্লাস ভালোয় ভালোয় কেটে যায়। কিন্তু শেষের ক্লাসে হঠাৎ তনিমা আর ফারিন বেঁকে বসে। এই ক্লাস তারা করবে না,এই ঘোষণায় তাদের সঙ্গে যোগ দেয় রাফিও।
মেহরীন সন্দেহভরা গলায় বলল,

—আজব! এখন ক্লাস না করে কোথায় যাবি? কেউ দেখলে তোদের ক্লাসেই পাঠিয়ে দেবে..
রাফি একেবারে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বলল,
—আরে না চল, আজকে কলেজ ফাঁকি দিব কেউ দেখবেই না।
কথাটা শুনতেই মেহরীন আর তাহিয়া একসাথে চেঁচিয়ে ওঠে,
—কিইইইইই!
তনিমা তাড়াতাড়ি দুজনের মুখ চেপে ধরে ফিসফিস করে,
—আরে আস্তে বইন! কেউ শুনলে বাঁশ খাবো…
তাহিয়া মুখের উপর থেকে হাত সরিয়ে আঁতকে উঠা মুখ নিয়ে বলল,
—তাই বলে কলেজ ফাঁকি? না না বাবা, আমি নাই। বাঁশ খাওয়ার কোনো শখ নাই আমার।
—আরে চল না! এসবই তো কলেজ লাইফের মজা। এগুলোই তো পরে মেমোরি হয়ে থাকবে। চল না আজকে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে একটু ঘুরে বেড়াই।
তাহিয়া দুই কানে হাত দিয়ে বেঞ্চে মাথা ফেলে দেয়,

—না বাবা, আমি কিছু শুনছি না। আমার ভাই এত সাহস নেই। আমার ভাইয়া শুনলে আমাকে উল্টো করে থাপড়াবে। তোরা গেলে যা…
তাহিয়াকে এমন এক কথায় বসে থাকতে দেখে ফারিন আর তনিমা এবার মেহরীনকে চেপে ধরে। বেশ কিছুক্ষণ বোঝানোর পর একটা সিদ্ধান্তে আসে, কলেজ ছুটির আগেই ফিরে আসবে। মেহরীন ভাবসাবে রাজি হলেও মুখে কিছু বলল না। সে এখনো তাহিয়ার দিকেই তাকিয়ে আছে।
তা বুঝে সবাই মিলে তাহিয়াকে মানাতে লেগে যায়। কিন্তু সে যাবেই না। একটার জন্য সব আটকে থাকবে নাকি। এই ভেবে রাফি উঠে দাঁড়িয়ে যায়,

—তাহলে তুই থাক। মেহরীনসহ আমরা সবাই যাচ্ছি। একা একা মশার সঙ্গে বসে পড়াশোনা কর।
তবুও তাহিয়াকে উঠতে না দেখে সবাই এবার চোখাচোখি করে উঠে দাঁড়ায়। তারা জানে, সবাই উঠে গেলে তাহিয়াও উঠতে বাধ্য। সেই ভেবেই একে একে সবাই ক্লাস থেকে বেরোতে থাকে।
আর তখনই তাহিয়া হরবরিয়ে উঠে বসে মেহরীনের হাত চেপে ধরে, মুখ ফসকে বলে ফেলে,
—খবরদার না! তোর জামাই কিন্তু তোরে তো বাজাবেই, সঙ্গে আমার ব্যান্ডও বাজাবে…
তাহিয়ার কথায় মেহরীন চোখ বড় বড় করে তাকায়। এই মেয়েটা দিল তো গন্ডগোল করে। মুহুর্তেই চোখমুখে রাগের ছাপ পড়ে যায়। এদিকে তাহিয়া নিজেই নিজের মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কথার জন্য আমতা-আমতা শুরু করে। কী বলবে, কীভাবে ঢাকবে কথাটা, কিছুই ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। এদিকে বাকিরা সবাই জহুরি চোখে তাকিয়ে আছে। ঘটনা কী সেটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা চলছে সবার মাথায়।

তবে আপাতত এসব বোঝার সময় নেই। এখন বের হওয়াটাই জরুরি। যে কোনো মুহূর্তে স্যার ঢুকে পড়বে। তাদের ঘটনা পরে বের করা যাবে। এই ভাবনাতেই সবাই তড়িঘড়ি করে ব্যাগ হাতে নেয়। পেছনের দরজা দিয়ে চুপচাপ সকলের আড়ালে বেরিয়ে পড়ল। প্রথমে গিয়ে দুতলার বাথরুমের করিডোরে গা ঢাকা দেয়। প্ল্যান পরিষ্কার, ম্যাথ টিচার ক্লাসে ঢুকলেই নিচে নামবে। নইলে সামনে পড়লে সরাসরি ক্লাসে টেনে নেবে, তখন আর রক্ষা নেই।
কয়েক মিনিট টানটান উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে থাকার পর দেখা মিলল। স্যার ক্লাসে ঢুকে পড়েছে। তা চোখে পড়তেই এবার সবাই সুরসুর করে সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করে। এক মুহূর্তও দেরি না করে স্কুলের পেছনের গেইটের দিকে রওনা দেয়। ওই দিক দিয়েই বেরোতে হবে। সামনের গেইটে গেলে যে কারো নজরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
কিছুদূর হেঁটে পেছনের গেইটে পৌঁছাতেই চোখে পড়ে মুবিন চাচাকে। কলেজের দারোয়ান। কিন্তু উনাকে অদ্ভুত লাগছে। তিনি একটা বড় গাছের সামনে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। আবার কার সঙ্গে যেন কথাও বলছেন। এই দৃশ্য দেখে সবার চোখেমুখে একসাথে সন্দেহ ভর করে।

—এই, মুবিন চাচা পাগল-টাগল হইলো নাকি? গাছের সাথে কথা বলতেছে।
ফারিনের কথায় রাফি ভয়ে ভয়ে বলে ওঠে,
—আমার মনে হয় ভূত ধরেছে, গাছ ভূত…
রাফির কথা শুনে তাহিয়া অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে প্রশ্ন করল,
—গাছ ভূত আবার কী?
রাফি রহস্যময় গলায় ফিসফিস করে তাহিয়াকে বোঝাতে থাকে,
—আরে গাছে যে ভূতগুলো থাকে, ওদেরই বলে গাছ ভূত। আমাদের গ্রামে অনেক ছিল…
তাহিয়া ভয় পেয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে,
—এই গাছেও ভূত আছে?

—আরে হে! শুনেছিলাম এক মেয়ে এই গাছে ফাঁস লেগেছিল। তারপর থেকেই নাকি ভূত হয়ে গেছে।
রাফির কথা শুনেই তাহিয়া ভয়ে মেহরীনের হাত শক্ত করে চেপে ধরে। বেচারি এমনিতেই এসব ব্যাপারে ভীষণ বিশ্বাসী। ভয়ে ভয়ে সেদিকে উঁকি দিতেই গাছের আড়াল থেকে কিছু একটা চোখে পড়ায় সে আরও কেঁপে ওঠে। কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
—আ…আমি দেখেছি.. ভ…ভূতকে…
তার কথায় সবাই বিরক্তি নিয়ে রাফির দিকে তাকায়। এ যে সুযোগ পেলেই নিজের আজাইরা বানোয়াট গল্প জুড়ে দেয় তা আর অজানা নেই। তবে বোকা তাহিয়া প্রতিবারই রাফির ফাঁদে পা দেয়।
মেহরীন বিরক্তিসুরে বলল,

—কি বলছিস? এই ফাঁপরবাজ রাফির কথায় বিশ্বাস করেছিস? এই শা*লা মিথ্যাবাদী, গাছভূত বলে কিছু নেই।
রাফি চোখ কটমট করে তাকায় মেহরীনের দিকে। কিছু বলার আগে তাহিয়া তাড়াতাড়ি বলে ওঠে,
—না না, ওই দেখ! গাছের আড়াল থেকে শাড়ির আঁচল দেখা যাচ্ছে।
তার কথায় রাফি সাথে সাথে চুল ঠিক করতে করতে ভাব নিয়ে মাথা নেড়ে বলে,
—দেখেছিস? বলেছিলাম না আমি, ভূত আছে! হাহ, বিশ্বাস করলি না তো। এবার নিজেরাই দেখ।
তার কথায় পাত্তা না দিয়ে। সবাই মনোযোগ দিয়ে মুবিন চাচার দিকে তাকাতেই যা দেখল, তাতে তাহিয়া আর রাফির মাথায় একসাথে দুটো চাপট পড়ল। ফারিন রাগী গলায় ঝারি মেরে ওঠে,
—আবালের দল! ওটা গাছ ভূত-টূত না। ওইটা আমাগো গরিবের লায়লা-মজনু।
তার কথার অর্থ না বুঝে সকলেই কপাল কুচকে তাকায়। তনিমা কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—মানে?
—মানে, চল সামনে গিয়ে দেখাচ্ছি।
বলেই সে এগিয়ে যায়। তার দেখাদেখি বাকিরাও এগোয়। কাছে যেতেই কানে যা আসল।
—তোমারে আইজকা হেব্বি সুন্দর লাগতাছে গো বাবুইপাখি…
আফসানা খালা শাড়ির আঁচল আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে লজ্জায় লাল হয়ে বলল,
—যান তো মুবিন ভাই, এমনে কইবেন না। আমার লইজ্জা লাগে…
মুবিন চাচা মুচকি হেসে বলে,
—লইজ্জা লাগলেও তোমারে মেলা সুন্দর লাগে।

তাদের কথা শুনে একেকজন বলদের মতো একে অন্যের দিকে তাকিয়ে। এখানে যে সত্যিই লায়লা-মজনুর কাহিনি চলছে, আর তারা কিনা ভূত ভেবেছিল। না এ নদীর জল আর গড়াতে দেওয়া যাবেনা। হঠাৎ সবাই একসাথে কেশে উঠতেই দুজনেই হকচকিয়ে যায়। আফসানা খালা গাছের আড়াল থেকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে চোরাচোখে তাকিয়ে তাদের দেখতেই কোনো কথা না বলেই তরতর করে চলে যান। আর মুবিন চাচা তো কেশে আমতা-আমতা করতে লাগেন। তবে পরক্ষণেই ফের বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। এই বিচ্ছুদের সামনে নিজের মানসম্মান বজায় রাখতে হবে।

—তো…তোমরা এখানে…?
মুবিন চাচার কথায় ফারিন এগিয়ে এসে পুলিশের মতো জেরা শুরু করে,
—তার আগে বলেন, আপনি এখানে কী করছিলেন?
মুবিন চাচা তোতলাতে শুরু করেন,
—আ.. আমি তো, আমি তো আমার দায়িত্ব পালন করছিলাম।
রাফি পিটপিটে চোখে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত পর্যবেক্ষন করে বলল,
—ওহ আচ্ছা। লজ্জালজ্জি খেলা আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বুঝি?
তার কথায় মুবিন চাচার মুখ থমথমে হয়ে যায়। এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে বলল,
—ক.. কী কইতাছো হপ বেডা!
বুঝে গেছেন এরা যে সব কৃর্তি দেখে নিয়েছে। নিজেকে সামলে তিনি গম্ভীর মুখে দাঁড়ান। নিজেরটা ঢাকতে প্রশ্ন করে বসল,

—হেই মিয়া, আমি যাই করি। তোমরা এইখানে কিতা করো ক্লাস রাইখা? কইতাম নি স্যারেরে? একেকটারে কান্নে ধইরা দার করামু।
তার হঠাৎ এমন হুমকি দেখে সবাই একে অন্যের দিকে তাকায়। উনি সবসময়ই এমন ভাব নেন, যেন কলেজের প্রিন্সিপাল তিনি নিজেই। ইচ্ছে তো করছে ধরে বাদাম দিতে। কিন্তু কিছু করারর নেই আপাতত। কিছুক্ষণ চোখাচোখির পর পরিস্থিতি সামলাতে তনিমা বলে ওঠে,
—আরে চাচা, আপনি এখানে? আপনাকে ওদিকে প্রিন্সিপাল স্যার ডাকতেছে।
তনিমার কথায় বাকিরাও সায় দেয়। কিন্তু মুবিন চাচা জহুরির চোখে একে একে সবাইকে দেখে নেন। সবার হাতে ব্যাগ দেখে তার নজর আরও কড়া হয়।

—তোমাগো হাতে ব্যাগ কেন? কই যাবা?
সবাই থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এ তো দেখছি কথাই শুনছে না। এভাবে ধরা খাবে নাকি! সেই টানটান মুহূর্তে এসে বুঝি প্ল্যান জলে যাবে। তা ভেবে মেহরীন মৃদু হেসে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
—আরে চাচা, আমরা তো ল্যাবে যাচ্ছি। শেষ ক্লাস তো, তাই ব্যাগ নিয়েই যাচ্ছি। আবার ছুটির সময় ক্লাসে গিয়ে ব্যাগ আনাটা ঝামেলা না? তাই একেবারে ব্যাগ নিয়েই ক্লাস করবো।
মেহরীনের কথায় তিনি কয়েক পলক ভালো করে তাকান তাদের দিকে। মুখভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে, বিশ্বাস ঠিক জমেনি। সেই সুযোগে রাফি তাড়াতাড়ি বলে ওঠে,
—আরে চাচা, জলদি যান। আসার সময় শুনছিলাম আপনার বকশিস নিয়া কথা বলতেছে। হয়তো বকশিস দিতেই ডেকেছে।
কথাটা শুনতেই উনার চোখ-মুখ চকচক করে ওঠে। উউৎসাহিত কন্ঠে প্রশ্ন করল,

—সত্যি কইতাছো?
এইবার তাহলে জায়গা মতো ধরতে পেরেছে। এই ভেবে৷ সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে কিছু ইশারা করেই একসাথে মাথা ঝাঁকায়।
—আরে হো হো! আমরা তো আরও আপনার শুনাম করে এসেছি। বকশিস আরও বাড়াই দিবে। দ্রুত যান।
এই কথা শুনে উনি তো খুশিতে গমগম করতে করতে অফিসরুমের দিকে এগিয়ে যেতে লাগেন। যেতে যেতে৷ আনন্দে দোয়া দিতে লাগেন,
—তোমাগোরে হেব্বি ধইন্নবাদ গো। যাও যাও, কেলাসে যাও, বালা কইরা পইড়ো। দোয়া করি বহুত বড় হও।
খুশিতে গদগদ করতে করতে তিনি চোখের আড়াল হতেই সবাই যেন প্রাণ ফিরে পায়। প্ল্যান সাকসেসফুল। খুশিতে নেচে ওঠে একজন আরেকজনের সঙ্গে হাই-ফাইভ দিতে দিতে গেইটের দিকে এগোয়। এবার আর কোনো বাধা নেই। তনিমা খালি গেইট খুলতে হাত বাড়িয়েছে, ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে আসে বাংলা স্যারের গলা।

—এখানে কি হচ্ছে?
এক বিপদ যেতেই আরেক বিপদ হাজির? স্যারের গলা শুনে সবাই হকচকিয়ে ওঠে। তনিমা সঙ্গে সঙ্গে গলায় পেঁচানো ওড়নার এক কোণা টেনে গেইটের হাতল ঘষতে লাগে। রাফি তো ব্যাগ দিয়ে গেইট মুছতে শুরু করে। ফারিন হরবরিয়ে সামনে পড়ে থাকা শুকনো পাতাগুলো পা দিয়ে সরাতে লাগে। তাহিয়া ভয়ে গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে, কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
মেহরীন দ্রুত হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলতে থাকে,
—আরে ভালো করে মুছ! ইশশ, মুবিন চাচাও না একটা কাজও ঠিকমতো করে না। সামান্য গেইটটাও পরিষ্কার করে রাখতে পারে না? গেইট টা হলো আমাদের কলেজেরই সম্পদ যা আমাদের সম্পদ। আমাদের সম্পদের এই অবস্থা করে রেখেছে ছে ছে। দুদিন পর ঝংকার ধরলে আবার স্কুলের কতোগুলো টাকা যাবে। নাহ নাহ এসব মানা যায় নায়া, সুন্দর করে মুছ…
বলতে বলতেই সে ভাব নিয়ে পেছন ফিরে তাকায়। বাংলা স্যারকে দেখে অবাক হওয়ার ভান করে এগিয়ে যায়,

—আরে স্যার, আপনি! আসসালামু আলাইকুম। আপনি এখানে যে, কিছু লাগবে স্যার?
স্যার বড় বড় পা ফেলে এসে দাঁড়ান গেটের সামনে। ততক্ষণে বাকিরা সবাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে।
—আমিও তো তাই বলছি। তোমরা এখানে?
মেহরীন মুখটা মিইয়ে বলে,
—আর বলবেন না স্যার। আমরা যাচ্ছিলাম ল্যাব ক্লাসে। পথে মুবিন ভাই থুক্ক চাচার সাথে দেখা। উনি কি পারল এটা করতে?
বলেই আফসোস করতে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে বাকিরাও সায় দেয়। তা দেখে স্যার কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করেন,

—কি করেছে ও?
—আমাদের দেখে গেইটে দাঁড় করিয়ে গেছে।
—কেন? ও কোথায় গেছে?
রাফি পাশ থেকে লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে বলে,
—স্যার, উন্নি ওই আফসানা খালার সাথে ইয়ে করতে গেছে।
স্যার কথাটা ঠিক বুঝতে না পেরে আবার প্রশ্ন করেন,
—ইয়ে মানে?
তনিমা তাড়াতাড়ি মাঝখানে ঢুকে বলে,
—আরে স্যার বুঝেন না, ওইযে ইয়ে ইয়ে…
—আরে ইয়ে টা কি?
—ইয়ে মানে ইটিশপিটিশ…
বলেই মুখ ঢেকে দাঁড়ায় তনিমা। সঙ্গে বাকিরাও। স্যারের চোখ-মুখ কুঁচকে যায়। খানিকটা লজ্জা, খানিকটা রাগ, দুটোই একসাথে ফুটে ওঠে।

—কিইই! তাই বলে তোমাদের গেইটে দাঁড় করিয়ে যাবে? এত বড় সাহস! দাঁড়াও, ওরে আমি দেখছি। আর তোমরা যাও, এক্ষুনি ক্লাসে যাও। ওর খবর আমি নিচ্ছি।
সবাই গুড স্টুডেন্টের মতো মাথা নাড়তেই স্যার রাগে ধপধপ করে পা ফেলে অফিসরুমের দিকে চলে যান। আজকে এই মুবিনের খবর নেবেনই। কলেজে আগেও অনেকের কাছ থেকে নালিশ এসেছে, মুবিন চাচা আর আফসানা খালার এই মেলামেশা নিয়ে। স্টুডেন্টদের ওপর এর খারাপ প্রভাব পড়বে। এই ভাবনাতেই তিনি ঠিক করেছেন, আজ কিছু একটা ব্যবস্থা নেবেনই।
এদিকে স্যার যেতেই সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত বেরিয়ে পড়ে। প্রায় দৌড়েই পেছনের রাস্তা ধরে মেইন রোডে উঠতেই হাফ ছেড়ে বাঁচে সবাই। তৎক্ষনাৎ সবার চোখেমুখে হাসি ফুটে ওঠে। একসঙ্গে চেচিয়ে উঠে সবাই,

—ইয়েএএএএএ
তবে আশেপাশের সকলের অবাক চাহনি দেখে তারা চুপসে যায়। বোকা বোকা হেসে হাটা ধরে। কিছুদূর যেতেই, এইবার সবাই মিলে চেপে ধরে তাহিয়াকে।
—এইবার চান্দু, তোর পালা। সত্যি করে বল, কাহিনি কী? তখন মেহরীনের জামাই বললি কাকে?
ফারিনের কথা শুনে তাহিয়া এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে।
—আরে এমনি ভুলে বলছি কেউ না তো কেউ না।
বলতে বলতেই ঢোক গিলে একবার মেহরীনের দিকেও তাকায়। মেহরীনও অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে। তনিমা কয়েকপলক তাকিয়ে থেকে বলে উঠল,

—না না ডাল মে কুছ তো কালা হে, সত্যি করে বল কাহিনি কি।
ঠিক তখনই রাফিও পাশ থেকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করতে লাগে,
—কি হলো বল? কী লুকাচ্ছিস আমাদের থেকে? ছি ছি! এই তোর বন্ধুত্ব? ছি আল্লাহ ছি ধরি ফালাও উঠে যাই। এই দিন দেখার জন্যই বন্ধু বানাইছি? এর থেকে সারাজীবন বন্ধু ছাড়াই থাকা ভালো ছিল।
তাদের এমন ঝেরা আর রাফির নাটক এসব দেখে তাহিয়া একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। বেচারির এমনিতেই মুখ পাতলা। আবার এদের সামনে তো কথা পেটে রাখতেই পারে না। ব্যস ফরফর করে সব বলে দেয়।
কথার মাঝেই সবাই আসে একটা পার্কে। কলেজ থেকে দশ মিনিট দূরত্বে। সকলে ব্রেঞ্চে বসে আছহে। মাঝখানে বসিয়ে রেখেছে মেহরীনএ, যেন সকলের বিচারসভায় একমাত্র আসামি সে-ই। কেন আগে বলেনি, কীভাবে এতোদিন লুকিয়েছে। এই নিয়ে একের পর এক শাসন। বেচারি মুখ মিইয়ে চুপচাপ বসে আছে। টু শব্দ ও করছে না।
একসময় রাফি হালকা গলায় সবাইকে থামিয়ে বলে,

—আচ্ছা, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এসব নিয়ে পরে আবার ধরা যাবে। আপাতত কোথায় যাবি, সেটা ঠিক কর। বেশি দূর যাবো না কিন্তু।
এই কথায় সবাই সেসব বাদ দিয়ে প্ল্যান করতে শুরু করে, কোথায় যাবে। একেকজন একেক জায়গার নাম বলছে। তাহিয়া হঠাৎ মিনমিনিয়ে বলে ওঠে,
—বাঁশ তো এমনিতেই খাচ্ছি। কল যাবেই ভাইয়ার কাছে। এক কাজ করি, চল আমাদের অফিসে যাই। ওখান থেকে ভাইয়াকে নিয়ে আমরা ঘুরতে যাবো?
তার কথা শুনে তনিমা সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁঝিয়ে ওঠে,
—এই ভাইভক্ত! এত ভাই ভাই করিস কেন? তোর ভাই আমাদের যেতে দেবে? উল্টো ধমক দিয়ে বাড়ি পাঠাবে, বলদ!
তাহিয়া ঠোঁট উল্টে বলে,

—না না, ভাইয়াকে ছাড়া কোথাও যেতে ভয় লাগে। চল না, আমি একটু রিকোয়েস্ট করলে মেনে যাবে। আমরা সেইফও থাকব। নইলে কিছু হলে ভাইয়ার কাছ থেকে অনেক বকুনি খাবো। টেনশন করবে।
মেহরীনও সায় দেয়। সে জানে এমনিতেই তালহার কানে খবর যাবেই, তারা যে কলেজ ফাঁকি দিয়েছে। যদি আরও শোনে একা একাই ঘুরেছে, তাহলে আরও রেগে যাবে। তাই দুজনেই শান্ত গলায় সবাইকে বোঝাতে লাগে। শেষমেশ বাকিরাও রাজি হয়। তবে শর্ত একটাই, সবাই হেঁটেই যাবে।
—তাহলে আজকে দুলাভাইকে ধরবো ট্রিটের জন্য।
—হ্যাঁ হ্যাঁ, আইডিয়া খারাপ না।
—হুঁ, পকেট ফাঁকা করতে হবে।

এমন নানান কথাবার্তাই চলতে থাকে। তারা ফুটপাত ধরে হাঁটছে, নানান গল্প, হাসিঠাট্টার ভেতর দিয়েই পথ এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দুষ্টুমির ছলে একজন আরেকজনকে মারছে, কেউ দৌড়ে পালাচ্ছে, কেউ পিছে ছুটছে, কেউ আবার হেসে উঠছে। ফুটপাতের আশেপাশে আইসক্রিম, ফুচকা, যখন যা পাচ্ছে, তাই এক প্লেট করে নিয়ে সবাই মিলে একটাতেই একটু একটু করে টেস্ট করে দেখছে।
এতক্ষণ ধরে যে ধরা খাওয়ার ভয়টা ছিল, সেটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে যাচ্ছে। ভুলের মাঝেও যেন একরকম নির্ভার অনুভূতি কাজ করছে। ভালো লাগছে বন্ধুদের সঙ্গে এমন এলোমেলো সময় কাটাতে। এটাই বোধহয় কলেজ লাইফ, বন্ধুবান্ধবদের সাথের লাইফ, যেখানে সব কিছু মেপে-মেপে করা হয় না, বরং একটু বেখেয়াল হওয়া, একটু নিয়মের বাহিরে গিয়ে উপভোগ করা।

কারোরই এবার আর আফসোস নেই। বরং নতুন এক অনুভূতির মুখোমুখি হলো সবাই। তৈরি হলো নতুন একটা মেমোরি। হয়তো অনেক বছর পরে, বয়স বেড়ে গেলে, তখন এই দিনগুলোর কথাই মনে পড়ে যাবে বারবার, স্মৃতির পাতায় থেকে যাবে। তখন বুঝবে, এই ভুল-ঠিকের মাঝেই লুকিয়ে ছিল কলেজ জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতিগুলো।
অর্ধেক পথ যেতেই হঠাৎ চোখে পড়ে চুড়ির দোকান। যেন অদৃশ্য কোনো সুতো টেনে ধরল, সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে পড়ে। মেয়েরা চুড়ির দোকান দেখবে আর তার পাশ কাটিয়ে চলে যাবে? তা কখনো হয়? তাদের বেলায় ও তা হয়নি। মুহুর্তেই সবকটা দোকানের ভেতর সুরসুরিয়ে ঢুকে পড়ে। বান্ধুবিদের চক্করে বেচারা রাফিও পিছু পিছু ঢুকে। ঢুকেই রঙিন কাঁচের চুড়িগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ে মেহরীনরা। আলোয় ঝিলমিল করা চুড়িগুলো হাতে নিয়ে ঘোরানো, পরখ করা, পরা-খোলা এসব করতে করতেই একসময় যে যার মতো কালার পছন্দ করে নেয়। তার একপর্যায়ে সবাই মিলে রাফিকে ঘিরে ধরে।

—ভালোই ভালোই বলছি কিনে দে…
মেহরীনের কথায় অবাক হয়ে তাকায় রাফি,
—আমি কেনো কিনে দিবো, তোরা দেখছিস তোরা কিন আমাকে টানছিস কেনো..
তনিমা তাকে থামিয়ে বলল,
—বান্ধুবিদের চুড়ি গিফট করলে সওয়াব হয়, আমরা তোর সওয়াব বাড়াতেই বলছি কিনে দে ফাস্ট..
রাফি হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তাদের কথায় দ্রুত উঠে দাঁড়ায়, বেরিয়ে যেতে অগ্রসর হতে হতে বলল,
—লাগবেনা আমার এতো সওয়াব।
সে বের হতে নিতেই ফারিন তাহিয়া তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে যায়। ফারিন কোমড়ে হাত দিয়ে তাড়াহুড়ো কন্ঠে বলল,

—কিপ্টামি না করে তাড়াতাড়ি কিনে দে চুড়ি। নয়তো তোর বোনকে বলে দিবো, তুই যে তার লিপস্টিক চুরি করে গফরে দিছস…
রাফি চোখ বড় বড় করে তাকায়,
—এহ, টাকা কি মামা বাড়ির আবদার নাকি? যা সর…
তার কথায় ফারিন মাথা ঘুরিয়ে দোকানদারের দিকে তাকায়।
—এই মামা, দেন তো আপনার মোবাইলটা।
রাফি সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে ওঠে,
—বললেই হলো! আমি ভয় পাই না। আমার বোনের নাম্বার পাবি কইত্তে?
ফারিন নির্বিকার গলায় বলল,
—তোর নাম্বার তো আছে?
—হু, তো?
—তোর মোবাইলটা জানি কই?
—বাসায়…
এইটুকু শুনেই ফারিনের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি খেলতে থাকে।

—ওখানেই কল দিলে কাজ হবে। তোর আপার কাছেই কল যাবে।
কথাটা শেষ হতে না হতেই রাফির মুখের রং পাল্টে যায়। যেন মুহূর্তেই সব সাহস গলে গেছে। আঁতকে উঠে বলতে লাগে,
—ইয়া গজব এ আকাম করিস না বইন মাফ কর, দিচ্ছি কিনে দিচ্ছি। শালা ফকির বানাই ছাড়বি আমাকে। কি করতে যে তোদের পাল্লায় পড়েছিলাম..
এমন বিভিন্ন আফসোস করতে করতেই সে পকেট হাতড়ে টাকা বের করে দোকানদারের হাতে গুঁজে দেয়। আর ওদিকে বাকিরা, অলরেডি চুড়ি হাতে পড়ে ঝনঝন শব্দ তুলছে। সকলেই মহাখুশি। তাদের হাসি দেখে রাফির যেন গা জ্বলে উঠছে।
—সময় আমারও আসুক দেখে নিবো একেকটাকে….

বিশাল বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সকলে। রাফি বিল্ডিংটা মনোযোগসহ খুঁটিয়ে দেখছে। তাকে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাহিয়া জিজ্ঞেস করে,
—কিরে, দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? আয়, চল।
রাফি কিছুক্ষণ ভাবার পর বলল,
—চিন্তা করছি, যদি কোনো ভূমিকম্প হয়, এই বিল্ডিংটি কোন দিকে ধসে পড়বে।
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে ঝাড়ি দিয়ে বলল,
—এই কোফার কোফা! কীসব বাজে কথা বলছিস? কেউ এমন কথা বলে?
—আরে না না, ভুল বুঝছিস। আমি বলতে চাচ্ছিলাম, যদি কোনো বিপদ ঘটে, এত উঁচু থেকে মানুষ নামবে কিভাবে, এটা রিস্কি না?
তাহিয়া বলল,

—এখানে হাজার হাজার মানুষ কাজ করে। নিরাপত্তার ব্যবস্থাও তেমন আছে। সব ধরনের জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। এবার এসব চিন্তা বাদ দে, চুপচাপ চল।
এরপর সবাই একে একে লিফটে উঠে সাততলায় পৌঁছায়। লিফট থেকে নামতেই এগোতে শুরু করে। রিসেপশনে এসে কোনো জিজ্ঞাসা না করেই তারা ডিরেক্ট ঢুকতে চাইলে হঠাৎ একটা মেয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।
—এই! থামো।
থেমে পাশে ফিরে তাকায় মেহরীনরা। চোখে পড়ে জিন্স ও টপ পড়া এক স্টাইলিশ মেয়ে। চুলগুলো কালার করা মুখে ভারি মেকাপ। সে সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তনিমা উত্তর দেয়,
—আমাদের বলছেন?
মেয়েটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সবাইকে একে একে দেখে বলে,
—ওদিকে কোথায় যাচ্ছো? কার খোঁজ নিচ্ছো?
তাহিয়া বলে উঠল,

—তালহা সিকদার আমার ভ…
বাকিটুকু বলার আগেই মেয়েটি বিরক্তি প্রকাশ করে থামিয়ে বলল,
—যাও যাও। এখন স্যার নেই, মিটিংয়ে গেছেন।
তার এমন আচরণে তাহিয়া চুপসে যায়। নেহাতই মেয়েটি বেশিই নরম প্রকৃতির নয়তো এর জায়গায় অন্য কেউ থাকলে সাথে সাথে পালটা জবাব দিত। তবে মেহরীনের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়। সে এক ধাপ এগিয়ে ভারী কন্ঠে বলল,
—ঠিক আছে, সমস্যা নেই। আমরা উনার কেবিনে অপেক্ষা করতে পারব।
সবাই এগোতে চাইলে মেয়েটি রেগে একপ্রকার চিৎকার করে ওঠে,
—এই, স্টপ! চেনা নেই, জানা নেই, তালহার রুমে যাবে? বেশি দরকার হলে এখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করো। ভেতরে যাবে না…
তালহার নাম ধরে ডাকতে দেখে মেহরীন জ্বলে ওঠে। কটমট চোখে তাকিয়ে। কে এই মেয়ে যে নাম ধরে ধরে ডাকছে। একবার তনিমার দিকে তাকাতেই তনিমা বলে উঠল,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৪

—এই, আপনি বলার কে? আর আপনার কথা শুনতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আছে?
মেয়েটি ঝাঝালো কণ্ঠে উত্তর দেয়,
—আমি কে তা তালহাকে জিজ্ঞেস করলেই পেয়ে যাবে। আর তার অবর্তমানে আমিই নির্ধারণ করব তার কেবিনে কে আসবে, কে যাবে। হোয়াটএভার…
সঙ্গে সঙ্গে পাশের একজন স্টাফকে ডেকে বলে,
—এরা যেন ভিতরে না আসে….

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৫ (২)