তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪৪
জান্নাতি আক্তার জারা
বীর রাত গ্রামে আসার পর থেকে মিম দের বাড়িতে প্রতিদিন নতুন নতুন আয়োজন থাকে, নতুন জামাই কে আপ্যায়ন করে তিন-চার প্রকার রান্না থাকছে, কিন্তু আজকে একটু বেশিই আয়োজন চলছে রান্না ঘরে, মিমের বাবা বাজার থেকে নানারকম ফুট নিয়ে এসেছে, সেগুলো বাড়ির পাশে এক মহিলা এসে কাটতে হেল্প করছে, মিমের মা কিচেন রুমে রান্না বসিয়ে দিয়েছে, তাকবীর রুমে বসে ভিডিও কলে আনাস কে অফিসের কাজ বুঝিয়ে দিতে ব্যস্ত, আরাত তাকবীর কে ফোনে ব্যস্ত থাকতে দেখে রুম থেকে বের হয়ে এলো, আশেপাশে মিম কে দেখতে না পেয়ে কিচেন রুমে এসে এতো আয়োজন দেখে বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
___” মামি বাড়িতে গেস্ট আসবে, এত আয়োজন চলছে যে?
রুপোলী বেগম রান্না করতে করতে একনজর আরাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে পুনরায় রান্নায় মনোযোগ দিয়ে বললেন,
___” হ্যাঁ শহর থেকে মানুষ আসবে।
আরাত অবাক হয়ে রুপোলী বেগমের কাছে এসে দাঁড়ালো, বাড়ির পাশের মহিলা আরাত কে অবাক হতে দেখে বলে উঠলেন,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
___” ওমা তুমি জানো না, মিম কে দেখতে আইবো শহর থেইকা, ভাবি আপনি এই মাইয়ারে কন নাই?
আরাত অবশ্য মুখে একবার রুপোলী বেগম তো মহিলা কে দেখতে লাগলো, রুপোলী বেগম হাসি মুখে বললেন,
___” না কহোন হয়নাই, আরাত মিম রে তৈরি কইরে দিও তো,ভালা করে মেকআপ করে দিও যেন সুন্দর লাগে, শহর থেইকা মেলা বড়লোক বাড়ি থেইকা মিম রে দেখতে আইবো।
___” কিন্তু মামি এত তাড়াতাড়ি মিম কে কেনো বিয়ে দিতে চাইছেন,মিমের স্বপ্ন পড়াশোনা শেষ করে জব করবে!
আরাতের কথা শেষ না হতেই মহিলা মুখ বেঁকে বলে উঠলো,
___” মাইয়া মানুষের এতো পড়ে কি হইবো, সেই তো স্বামীর বাড়ি যাইয়া কাম করা লাগবো।
মহিলার কথায় আরাত বিরক্ত মুখে বলে উঠলো,
___” হ্যাঁ আন্টি, মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে সংসারের কাজ করতে হয়, কিন্তু আন্টি তাই বলে কী নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হবে? মিম তো অনেক ছোট!
পুনরায় আরাতের কথা শেষ না হতেই ভদ্রমহিলা আরাতের কথায় বাঁধ সেজে বলে উঠলো,
___” এখনকার যুগে আইসা ছোট পোলাপান বেশি পাইকা যায়, মাইয়াদের ছোট থাকতেই বিয়ে দেওয়া লাগে, নয়তো কোনো আকাম করে বাপমায়ের মাথা নিচু করাইবো।
ভদ্রমহিলার কথা আরাতের পছন্দ হলো না, কিছু বলতে নিয়েও কিছু বললো না, আগে মিম কী চায় জানতে হবে,আরাত মন ভার করে রুপোলী বেগমের উদ্দেশ্য বলে উঠলো,
___” মামী মিম কই?
রুপোলী বেগম কাজ করতে করতে বলে উঠলো,
___” নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে আছে।
আরাত মিমের রুমের উদ্দেশ্য যেতে নিলে,রুপোলী বেগম আরাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” আরাত আলমারি মধ্যে শাড়ি আছে, যে শাড়ি মিম রে মানাবো ওই শাড়ি বের করে মিম রে বুঝায়া তৈরি করে দেও,মানুষ আইলো বলে।
আরাত কথা বললো না, চুপচাপ রুপোলী বেগম কথা শুনে মিমের রুমে চলে গেলো, ভদ্রমহিলা ফল কাটতে কাটতে রুপোলী বেগম কে বললেন,
___” ভাবি মাইয়াডা যদি মিম কে উল্টাপাল্টা বোঝায়, মিম তো আগে থেইকায় বিয়ে করতে চাইছে না?
রুপোলী বেগম কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেলো, পর মুহূর্ত কাজে ব্যস্ত হতে হতে ভদ্র মহিলার উদ্দেশ্য বলল,
___” না আরাত কিছু কইতো না, মোর মাইয়াডা বুঝে পাচ্ছে না, মেলা বড়লোক পোলা, বিয়ে হলে শহরে থাকতে পাবে, পড়াশোনা করাবে, কি কমু পোলাপান বড় হয়ে গেলে বাপমায়ের কথা মানতে চায়না।
রুপোলী বেগম বকবক করতে করতে কাজ করছেন, পাশের ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে মিমের রুমের দিকে যেতে যেতে বললেন,
___” ভাবি চিন্তা করা লাগতো না,আপনার মাইয়া পোলারে একবার দেখলে না করতে পারতো না, মিমের তো ভাগ্য ভালা গায়ের রং শ্যামলা হয়ে শহরের সুন্দর পোলা ওরে দেখতে আইবো, দেখেন না রানুর মাইয়া এত সুন্দরী হইয়াও কেবা ছেলের লগে বিয়ে হইছে,থাকেন মুই দেইখা আহি ওই মাইয়া মিম রে উল্টাপাল্টা বোঝাচ্ছে নাকি।
ভদ্র মহিলা মিমের রুমের দিকে হাঁটা ধরলো,রুপোলী বেগমের সঙ্গে ভদ্রমহিলার বেশ খাতির, কিছু ভালোমন্দ রান্না করলে দেওয়া থোওয়া করেন দুজন, বাড়িতে কী কাজ করছে, সংসারে কী হয়েছে বা সামনে করবে,সবকিছু দুজন শেয়ার না করলে চলবেই না। মিমের বিয়ে নিয়ে রুপোলী বেগমের যতটা না মাথা ব্যাথা, তাঁর থেকে ভদ্রমহিলার বেশি, মিম ভদ্রমহিলার সঙ্গে টুকিটাকি ভালো ব্যবহার করলেও তিশা ভদ্র মহিলাকে একদম সহ্য করে না। রুপোলী বেগম আর ভদ্র মহিলাকে একসঙ্গে দেখলেই মিম কে বলবে,
___” ওই দেখ মিম, সারা গ্রামের সিসি ক্যামেরা, সবকিছু রেকর্ড করে এসে কাকীমার কাছে ঢালছে।
তিশার কথায় মিম শুধু হাসতো,দুজনের জানা আছে, গ্রামে কার কী হয়েছে, কার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না, কার ছেলে মেয়ে কোথায় প্রেম করছে, সবকিছুর খবর এই মহিলার কাছে,স্বামী শহরে থাকায় বাড়িতে রান্নাবান্না শেষ করে পুরো দিন গ্রামে টইটই করে ঘুরে বেড়াবে আর এর কথা ওর কথা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করে বেড়াবে,ভদ্র মহিলা মিমের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনছে ভিতরে কী কথা বলছে মিম আরাত,
আরাত মিমের রুমে এসে দেখে মিম কম্বল পেঁচিয়ে বিছানায় ঘাপটি মেরে শুয়ে আছে, মুখে নেই কোনো হাসি নেই কোনো কথা, আরাত মিমের পাশে বসে বলল,
___” কী রে, ভরদুপুরে বিছানায় শুয়ে আছিস কেনো, রেডি হবি না, তোকে দেখতে আসবে নাকি?
মিম আরাতের কথায় মলিন মুখে উঠে বসতে বসতে ভার কন্ঠে বলে উঠলো,
___” আপু তুমি আম্মু কে বুঝাও প্লিজ, আমি এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবো না, আমি পড়াশোনা করতে চাই!
আরাত মিমের কথায় ঘাটের উপর দুপা তুলে বসতে বসতে বলল,
___” দেখতে আসলেই তো বিয়ে হয়ে গেলো না, মামা-মামী যেহেতু উনাদের আসতে বলছে, সবকিছুর আয়োজন করেছে আসতে দে, টেনশন করিস না বিয়ে ভাঙ্গার দায়িত্ব আমার।
___” ভাবি… এই মাইয়া কী কয় শুনে যান, এই মাইয়া মিমের বিয়ে ভাঙবো, ভাবি ও ভাবি!
ভদ্র মহিলার চিৎকারে আরাত মিম দু’জনেই চমকে ওঠে বিছানা থেকে নেমে পড়লো, হটাৎ চিৎকার শুনতে পেয়ে মিমের মা না বুঝে শুনে চামচ হাতে নিয়ে ড্রয়িং রুমে দৌড়ে বেরিয়ে এলেন, ভদ্রমহিলা রুপালী বেগম কে দেখে পুনরায় চিল্লাতে চিল্লাতে বলে উঠলো,
___” ভাবি মুই আপনারে কইছিলাম না, মাইয়াডা মিম রে উস্কাবো, মিলল তো কথা, শুনেন মাইয়াডা মিমের বিয়ে ভাঙ্গার কথা কইছে।
এতক্ষণে মিম আরাত ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়ালো, ভদ্র মহিলার কথা শুনতে পেয়ে মিম মুখ ভার করে বলল,
___” আম্মু উনারা কয়টাই আসবে?
রুপোলী বেগম মিমের কথার বললেন,
___” শুনে কী করবি, খবরদার বিয়ে ভাঙ্গনের চেষ্টা করছিস তো,তোরে…
___” আম্মু আমি রেডি হবো, এজন্য জানতে চাইলাম।
মিমের রাগী গলায় রুপোলী বেগম মিমের মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
___” তাই বল, অনেকক্ষণ আগে কইছিলো আধাঘন্টা মতো সময় লাগবো, এসেই গেলো হয়তো যা তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে।
রুপোলী বেগম কথাটা বলে কিচেন রুমে চলে গেলো, মিম আর আরাত ভদ্রমহিলার দিকে রাগী চোখে তাকালো,ভদ্রমহিলা, দুজনেন রাগী চোখ কে পরোয়া না করে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল,
___” তোমরা মিছে কথা কলে কে?
আরাত রাগী গলায় বলল,
___” আপনাকে বলার প্রয়োজন বোধ করছি না।
আরাতের কথায় ভদ্রমহিলা অপমান বোধ করলেও কিছু মনে না করে মিম কে বলে উঠলো,
___” যাক বুঝে পাইছো,, এবার ভালা করে সাজগোছ করো, মুখে মেকআপ বেশি করে দিবে, যাতে সুন্দরী দেখায়, পোলা খুব বড়লোক একবার বিয়ে হয়ে গেলেই তোমার চেয়ে সুখী এই গ্রামে আর কেউ হতে পারবো না।
মিম কিছু না বলে মন ভার করে আগে আগে নিজের রুমে চলে গেলো,আরাত মিমের যাওয়ার দিক থেকে চোখ ফিরে ভদ্রমহিলা কে পা থেকে মাথা অবধি পরক করতে লাগলো, আরাতের চাহনি বলে দিচ্ছে, ভদ্র মহিলার সঙ্গে আরাতের জনম জনমের শত্রুতা লেগে আছে, অথচ আরাত গ্রামে আসার পর এই মলিলা কে প্রথম দেখছে, দূর সম্পর্কের মামি হয়, আরাত মহিলার দিকে একটু ঝুঁকে মুখের উপরে বলে উঠলো,
___” আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, আপনাদের মতো কিছু প্রতিবেশীর জন্য আমাদের কখনো সিসি ক্যামেরার প্রয়োজন পড়ে না!
আরাত মুখে মেকি হাসি টেনে রাগী গলায় কথা গুলো বলে জায়গা ত্যাগ করল, ভদ্রমহিলা আরাতের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিরবির করে অভদ্র মাইয়া বলে কিচের রুমের দিকে পা বাড়ালো, আরাত মিমের রুমে না গিয়ে মুখ ভার করে নিজেদের রুমে চলে এলো, বিছানায় বসে গাল ফুলিয়ে তাকবীরের তাকালো,তাকবীর আরাত কে রুমে ঢুকতে দেখে ফোন থেকে চোখ ফিরিয়ে আরাত কে একনজর দেখে নিয়ে পুনরায় ফোনে চোখ নিবদ্ধ করল, পরমুহূর্তে আরাত কে মুখ ভার করে থাকতে দেখে কপালে সূক্ষ্মভাজ পরলো, আরাত তাকবীর কে নিজের দিকে তাকাতে দেখে বলল,
___” আচ্ছা আমি তো আপনার অনেক ছোট, আমাকে বিয়ে করলেন কেনো?
তাকবীরের কপালের ভাজ সোজা হয়ে এলো, আরাতের দিকে কিছু পলক চেয়ে থেকে ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলল,পুনরায় চোখ ফোনে নিবদ্ধ করে গম্ভীর গলায় বলল,
___” ঝগড়া লাগলে যেন বলতে পারি, যাক ছোট বাচ্চা দেখে ছেড়ে দিলাম।
তাকবীরের কথায় আরাত অবুঝের মতো চেয়ে রইলো তাকবীরের দিকে, ফোনের ওপাশে আনাস শব্দ করে হেঁসে উঠলো, আনাস এতক্ষণ লাইনে ছিলো, আরাত তাকবীর কে প্রশ্ন করাতে আনাস ভেবেছিল এমন অদ্ভুত প্রশ্নের বদলে তাকবীর হয়তো জোরে একটা ধমক দিবে আরাত কে, আনাস এই অপেক্ষায় ছিলো, পর মুহূর্তে তাকবীরের উওর শুনে আনাস শব্দ করে হেঁসে উঠলো, আনাস কে ফোনে হাসতে দেখে আরাতের রাগ উঠে গেলো, বিছানা থেকে নেমে তাকবীরের সামনে এসে তাকবীরের হাত থেকে ফোন নিয়ে রাগী গলায় বলল,
___” নেক্সট টাইম যদি আমাদের মধ্যে হা হা হু হু করতে এসেছো, তাহলে আমি তোমাকে তালাক দিয়ে দিবো মাইন্ডেড!
আরাতের কথায় তাকবীর আনাস দু’জনেই ভ্রু কুঁচকে তাকালো আরাতের দিকে,পরমুহূর্তে আনাস ব্যঙ্গ করে বলে উঠলো,
___” আরে গর্ধব, তালাক হাসবেন্ড ওয়াইফ এর
মধ্যে হয়, ভাইবোনের মধ্যে না।
আনাস এর কথায় আরাত চেতে উঠলো,
___” হ্যাঁ ওটাই আমি ভাই বোনের তালাক করবো, তুমি আমার ভাই না ওকে?
তাকবীর চুপচাপ গম্ভীর হয়ে ভাইবোনের ঝগড়া দেখছে, আনাস আরাত কে তোয়াক্কে না করে সয়তানি করে বলে বলে উঠলো,
___” তোর ভাই কে হতে যাবে, আমি তাকবীর ভাইয়ার ছোট ভাই,ভাবি আপনি এই মুহূর্ত আপনার দেওরের সঙ্গে কথা বলছেন, আসসালামু আলাইকুম ভাবি।
আরাত গাল ফুলে ফোন রেখে দিয়ে বিছানায় বসে পরলো, তাকবীর আরাতের মধ্যে আগের ন্যায় চঞ্চলতা লক্ষ করলো, নিজের সামনে আরাতের আস্তে আস্তে চঞ্চলতা ফিরে আসছে, তাকবীর হাত মেলে দিয়ে গম্ভীর গলায় ছোট করে বলল,
___” এদিকে আছো!
আরাত তাকবীর কে হাত বাড়িয়ে নিজের কাছে ডাকতে দেখে নিভে গেলো, পুনরায় আগের মতো শান্ত হয়ে তাকবীরের কাছে এসে বসলো,তাকবীর আরাতের হাত টেনে ধরে আরাত কে নিজের সঙ্গে মিশে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
___” মুড অফ কেনো?
আরাতের বুক ধুপবুক করছে ,তাকবীর নিজেদের মধ্যে গ্যাপ রাখে নি, তারউপর তাকবীর আরাতের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে, আরাত মনে মনে ভাবলো সামান্য এ কথা জানার জন্য এত কাছে নিয়ে আসার কী দরকার, দূর থেকে তো জিজ্ঞেস করা যেত, দূর থেকে বললে আমি কী উওর দিতাম না নাকি, আরাত মনে মনে কথাগুলো ভাবলেও মুখ খুলে বলতে পারলো না, বলার সাহস আছে কিন্তু বুকটা এতটা ধুকপুক শব্দ করছে মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে না, আরাত কাঁপা-কাঁপি গলায় ছোট করে বলে উঠলো,
___” মিমের জন্য ছেলে দেখা হচ্ছে, আজকে ছেলেপক্ষ আসবে দেখতে!
তাকবীর আগের ন্যায় আরাত কে নিজের সঙ্গে ধরে রেখে বলল,
___” ওকে, তারপর?
আরাত ওভাবেই তাকবীরের মুখের দিকে কিছু পলক তাকিয়ে রইলো, তাকবীর চোখের ইশারায় পুনরায় জানতে চাইলো, আরাত ঠোঁট ভিজে নিয়ে তাকবীরের মুখ থেকে চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল,
___” মিম পড়াশোনা করতে চায়, আর মামা-মামী বিয়ে দিতে চায়, তারউপর গ্রামের মেয়েদের একটু জলদি বিয়ে দিয়ে থাকে, কিন্তু মিম এতো জলদি বিয়ে করবে না পড়াশোনা শেষ করবে জব করবে তারপর বিয়ে করবে!
___” ওকে মিমের এজ?
আরাত তাকবীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” ষোলো বছর ছায় মাস!
আরাতের কথায় তাকবীর দু সেকেন্ড নীরবতা পালন করে পুনরায় বলল,
___” তোমার থেকে জাস্ট ছয় মাসের ছোট!
আরাত মাথা নাড়ালো, হ্যাঁ
তাকবীর স্বাভাবিকভাবে বলে উঠলো,
___” তুমি বিয়ে করছো, তোমার বোনের বিয়ে করার রাইট আছে নিশ্চয়ই?
___” হ্যাঁ আমি তো বলছি, ও বিয়ে করবে কিন্তু পড়াশোনা শেষ করার পর।
তাকবীর আরাত কে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসতে বসতে বলে উঠলো,
___” আমাদের রাইট নেই কারো হাসি কেরে নেওয়ার আঙ্কেল আন্টি তাঁদের কর্তব্য পালন করছে, বাঁধা দিও না।
___” কিন্তু..
___” কোনো কিন্তু না, ভাগ্যেই যা আছে তাই হবে ভাগ্য খন্ডানোর ক্ষমতা কারো নেই, সৃষ্টিকর্তা আমাদের সৃষ্টি করছেন তার নিজের হাতে লেখা ভাগ্য কখনো খারাপ হতে পারে না।
আরাত মাথা নিচু করে তাকবীরের কথার পৃষ্ঠে বলে উঠলো,
___” হাজার হাজার মানুষ কষ্টে থাকে, তাঁদের কী ভাগ্যে খারাপ, তাঁদের ভাগ্য কষ্ট লেখা থাকে কেনো?
তাকবীর আরাতের দিকে তাকালো,চোখমুখ গম্ভীর , আরাত তাকবীর কে নিজের দিকে তাকাতে দেখে মাথা নিচু করল, আরাতের ধারনা মুখে মুখে প্রশ্ন করাতে তাকবীর হয়তো রেগে গেছে, তাকবীর আরাত কে কিছু পলক দেখে নিয়ে মুচকি হেঁসে ঠান্ডা কন্ঠে বলে উঠলো,
___” ভাগ্য খারাপ হলে বিশ্ব নবীর উম্মত হতাম না!
আরাত অবাক হয়ে মাথা তুলে তাকবীরের দিকে তাকালো, তাকবীর মুখে মুচকি হাসি রেখেই বলল,
___” আমরা কত শত পরিকল্পনা করে রাখি, অথচ জীবন কত অনিশ্চিত, একবার কবরস্থানের দিকে তাকিয়ে দেখো, মনে হবে দুনিয়াতে সব আয়োজন বৃথা,বোকা মেয়ে তুমি জানোই না আল্লাহর পরিকল্পনা আমাদের স্বপ্নের চেয়েও উত্তম, তুমি কোনোকিছু নিয়ে কষ্ট পাচ্ছে, আল্লাহর কাছে হাত তুলে দেখবে কখনো খালি হাতে ফিরবে না,কখনো দুহাত তুলে চেয়েছিলে, যদি চেয়ে থাকো তাহলে আমাদের রব যেকোনো সূচনায় তোমাকে কবুল করেছেন। কিন্তু তুমি দেখতে পারছো না জানতে পারছো না, মহান রব্বুল আলামীন সূচনা বড্ড ভালোবাসে, দেখোনা আমরা কতশত সূচনা করে থাকি আল্লাহর কাছে, মহান রব্বুল আলামীন সবকিছু মেনে নিয়ে আমাদের পুনরায় সুযোগ করে দেয়। তুমি কষ্ট পাচ্ছো আফসোস করো না সামনে তোমার জন্য উত্তম কিছু অপেক্ষা করছে।
আরাত তাকবীরের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছে, তাকবীর মুচকি হেঁসে আরাতের দিকে ঝুঁকে হাতের আঙ্গুল দিয়ে আরাতের নাক ছুয়ে দিয়ে বলল,
___” ফ্রিতে অনেক জ্ঞান দিয়ে ফেললাম, উপহার হিসাবে বউয়ের চুমু পেতে পারি, কী বলেন ম্যাম ?
আরাত মুচকি হেঁসে তাকবীর কে নিজের সামনে থেকে সরাতে ধাক্কা দিয়ে রুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে যেতে যেতে বলল,
___” কোনোকিছু দিয়ে তাঁর বিনিময় চাইতে নেই, গুনাহ হয়।
তাকবীর আরাতের ধাক্কা সামলে নিয়ে আরাতের যাওয়ার দিকে তাকালো,মুখে মুচকি হাসি নিয়ে পুনরায় বলে উঠলো,
___” আমি এমন গুনাহ বারবার করতে চাই।
আরাত তাকবীরের কথাটা শুনতে পারলো না, তাকবীর পুনরায় বিছানায় বসে ফোনে নিয়ে মগ্ন হয়ে গেলো, আরাত মিমের রুমে এসে দেখলো মিম কে তিশা শাড়ি পড়িয়ে দিয়েছে, নীল শাড়ীর সঙ্গে মুখে হালকা মেকআপ, শ্যাম বর্ণ মায়াবী মুখে হালকা করে ঠোঁটে লিপস্টিক কপালে ছোট একটা কালো টিপ, হাতে কিছু কাঁচের চুড়ি ব্যাস এতেই যেন শ্যাম বর্ণ মেয়েটাকে মারাত্মক লাগছে,মাঝে মাঝে তিশার কথায় মুখে মলিন হাসি দিচ্ছে, আরাত মিমের কাছে এসে দাঁড়ালো, তখনই বাহিরে থেকে ভদ্রমহিলা এসে বলল,
___” কোনে মিম সাজগোজ করেছে, ছেলেপক্ষ আইসা গেছে, বাহ মিম কে তো মেলা সুন্দর লাগছে, এতটা কালো লাগছে না, কও তিশা?
ভদ্র মহিলার হাসি মুখে কথাটা কারো পছন্দ হলো না, তিশা মুখে মেকি হাসি এনে বলল,
___” হ সিসি ক্য সরি কাকি, মিম কে ভালো লাগছে , আর কালো লাগলে কী আর হইবো, বিয়ে ভাঙ্গে যাবো তো এতটুকুই, তখন তোমার সুন্দরী মাইয়াডার লগে বিয়ে দিয়ে দিয়ো।
মিমের কথায় ভদ্রমহিলা শব্দ করে হেঁসে উঠলো,
___” তোমরা আর ভালা হইবে না, সবসময় খালি মজা করো, মোর মাইয়ার বয়স হইলে কী আর এত বড়লোক পোলারে হাত সারন করতাম নি।
তিশা মিম বিরক্ত মুখে তাকালেও আরাত অবাক হয়ে দেখছে, এ কেমন জাতের মহিলা মাথায় ঢুকছে না তার, ভদ্রমহিলা রুম থেকে বের হয়ে যেতে নি পুনরায় ঘুরে তিশার উদ্দেশ্য বলল,
___” তিশা তুমি মিমের সাথে যেন আইয়ো না আচ্ছা , অবিবাহিত মাইয়া তুমি, দেখা যাইবো মিম রে রাইখা তোমারে পছন্দ কইরা লইছে!
ভদ্রমহিলা চলে গেলেন, তিন জনের চোখেই বিরক্ত, তিশা বিরক্ত মুখে বলে উঠলো, গ্রেমের সিসি ক্যামেরা, ভদ্র মহিলার যাওয়ার কিছুক্ষণের মাথায় বাহিরে থেকে ডাক এলো, মিম কে নিয়ে যাওয়ার , তিশা আর মিমের সঙ্গে এলো না, আরাত মিম কে সঙ্গে করে নিয়ে এলো, ড্রয়িং রুমে সোফাতে দুটো ছেলে আর আধা বয়স্ক কাঁপল দেখা গেলো, মিম আর চোখে সবাই ক পরক করে সালাম দিয়ে মাথা নিচু করে নিলো, মিমের পাশে আরাত ওড়না দিয়ে বড়ো করে ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে আছে, মিমের সালাম দেওয়াতে সবার নজর মিম আর আরাতের উপর, ছেলের মা বসা থেকে উঠে এসে হাসি মুখে মিমে কে নিজের সঙ্গে নিয়ে সোফাতে বসালেন, মিম কে টুকিটাকি প্রশ্ন করলেন, আরাত মিম আসার পর থেকে সোফায় বসা দুটো ছেলের মধ্যে একটা ছেলে আরাত কে বারবার দেখছে , দেখতে দেখতে একপর্যায়ে আরাত কে দেখিয়ে দিয়ে বলল,
___”আন্টি এই মেয়ে কে ?
___” ব্রাদার ভুল জায়গায় ফোকাস করছো, সি ইজ নট সিঙ্গেল, সি ইজ মাই ওয়াইফ!
ছেলেটার কথায় সবার মনযোগ ছেলেটার উপরে ছিলো, তাকবীরের উওরে পুনরায় সবার নজর তাকবীরের উপর পরল, তাকবীর পকেটে হাত গুঁজে দরজার সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মুখে তাঁর গম্ভীর্য লেগে আছে,
ছেলেটা তাকবীর কে তীক্ষ্ণচোখে দেখে বলল,
___”আপনি কে?
তাকবীরের গম্ভীর মুখে মুচকি হাসি ফুটে উঠলো, ছেলেটা কিছুটা ভরকে গেল এতে, তাকবীর প্রথম থেকেই এই ছেলেকে লক্ষ করছে, আরাত আসার পর থেকে কেমন যেন নড়াচড়া করছে আর বারংবার আরাতের দিকে তাকাচ্ছিল, তাকবীর এক হাত পকেটে গুঁজে গম্ভীর মুখে ধীর পায়ে আরাতের পাশে এসে দাঁড়ালো, আরাতের মুখে হাসি, মিমের বাবা হাসি মুখে বলে উঠলেন,
___” আপনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হইনি, এটা হলো আমার বোনের মেয়ে আর মেয়েজামাই, শহরে তাঁদের বাড়ি।
মিমের বাবার কথা শুনে ছেলেটা থতমত খেয়ে গেলো,পরমুহুর্তে মুখে হাসি টেনে তাকবীরের দিকে তাকিয়ে সরি বলল,তাকবীর সামনে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় আরাত কে ছোট করে বলল,
___” রুমে চলো!
তাকবীর কথাটা বলে রুমে চলে গেলো, আরাত একনজর সবাই কে দেখে চুপচাপ বাধ্য মেয়ের মত রুমে চলে গেলো, ছেলেপক্ষ-রা সবাই অবাক হয়ে দুজনের যাওয়া দেখলো, তাঁদের তো তাকবীরের স্বভাব সম্পর্কে অবগত না, যদিও তাকবীর আগের থেকে কিছুটা সবার সঙ্গে মেশে, উনারা তো আর তাকবীর কে চেনে না, রুপোলী বেগম পরিবেশ টা স্বাভাবিক করতে হাসি মুখে বললেন,
___” আমার মাইয়া শ্যাম বর্ণ এটা তো আপনারা দেখলেন, আপনাদের পোলা মাশাল্লাহ আমাদের পছন্দ হয়েছে আগেই বলেছি, আপনাদের যদি আমার মাইয়া রে আর কিছু জিজ্ঞেস করার থেকে থাকে, করতে পারেন!
রুপোলী বেগমের কথায় ছেলের বাবা হাসি মুখে বললেন,
___” না আফা, আপনার মেয়ে কে আমাদের পছন্দ হয়েছে, এজন্যই দেখতে আসা,ছেলেমেয়ে সামনাসামনি দেখে ওরা ঠিক করবে।
ছেলের বন্ধু বলে উঠলো,
___” আঙ্কেল, আপনাদের আপত্তি না থাকলে দুজন কে আলেদা কথা বলে দেওয়ার পারমিশন দিতেন?
ছেলেটার কথা সবাই মেনে নিলেও মেনে নিতে পারলো না মিম আর ( ছেলে ) হানিফ, হানিফ তাঁর বন্ধুর দিকে বিরক্ত মুখে তাকালো, মিম কাচুমাচু করছে না করে দেওয়ার জন্য, কিন্তু কী বলে না করবে ভেবে পেলো না, হানিফ কথা খুঁজলো, কিভাবে না করা যায়, কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে হুট করে এতক্ষণে কথা বলে উঠলো,
___” আরশ তো এখনো এলো না, আমরা বরং আরশের আসার অপেক্ষা করি!
আরশ নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মিম চোখ তুলে হানিফের দিকে তাকালো, ছেলেটা সুদর্শন কিন্তু দেখে বুঝা যাচ্ছে কথা কম বলে, আরশের কথা শুনার পর মিম মনে মনে ভাবলো,এক নামে অনেকেই থাকে এত ভেবে লাভ নেই তারউপর কে এই বিয়ে করবে, আরশ ফারশ যেইহোক না কেনো। মিমের ভাবনার মধ্যে রুপোলী বেগম বললেন,
___” আরশ কে ?
রুপোলী বেগমের কথায় হানিফের মা হাসি মুখে বললেন,
___” আমার ছোট ছেলে আরশ,কিছুক্ষণের মধ্যে আসে পড়বে তখন আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিবো, হানিফ যাও তোমরা আলেদা কথা বলো, আরশের অপেক্ষা করতে হবে না যাও।
___” কিন্তু আম্মু?
___” কোনো কিন্তু না যাও!
হানিফ তাঁর বাবার দিকে তাকালো, ভদ্রলোক চোখের ইশারায় যেতে বললেন,হানিফ বাধ্য হয়ে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো, রুপোলী বেগম মিম কে বললেন, হানিফ কে নিয়ে ছাঁদে যেতে, মিম কিছু না বলে আগে আগে হনহন করে ছাঁদে চলে গেলো, মিমের কান্ডে হানিফ অপমান বোধ করলো,রুপোলী বেগম মেয়ের আচরণে কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়লেন,পর মুহূর্তে হাসি মুখে হানিফ কে যেতে বললে, হানিফ মিমের পিছনে পিছনে ছাঁদের উদ্দেশ্য পা বাড়ালো, মিম হানিফ ছাঁদে যাওয়ার পরপর আরশ বাইক নিয়ে মিমদের বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ালো, আগে থেকেই বাড়ির লোকেশন নেওয়া ছিলো, আরশ বাইক থেকে নেমে প্রথমে এদিক ওদিক তাকালো, গ্রামের পরিবেশ আরশের নানুবাড়ি গ্রামে ছিলো, সেই ক্ষেত্রে গ্রামের পরিবেশের সম্পর্কে জানা আছে, আরশের প্রথম থেকে পছন্দ না গ্রামের বড় ভাইয়ের জন্য মেয়ে দেখার বিষয়টা, তারউপর এত দূর, কিন্তু মায়ের আবদার ছেলের বিয়ে তিনি গ্রামে করাবেন, মায়ের আবদার বাবা ফেলতে পারেন না বাবার আবদার দুই ছেলে ফেলতে পারে না, তাইতো দুই ভাইয়ের ইচ্ছা না থাকার শর্তে গ্রামে মেয়ে দেখতে আসা, বাবা-মা ফোনে মেয়ের ছবি দেখলেও দু’ভাই কেউ মেয়েকে দেখছিলো না, আরশ বাইকের সঙ্গে হেলান দিয়ে হানিফ কে ফোন লাগলো, এভাবে অচেনা একটা বাড়ির ভিতরে তো আর হুটহাট যাওয়া যায় না, আরশ হানিফের ফোনে ফোন লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে হানিফ ফোন রিসিভ করলো, হানিফ কে ফোন রিসিভ করতে দেখে আরশ বলে উঠলো,
___” হ্যাঁ ভাইয়া আমি বাড়ির বাহিরে দাঁড়িয়ে, তুমি সাব্বির ভাইয়া কে বাহিরে পাঠিয়ে দেও!
___” পিছনে ছাঁদের দিকে তাকিয়ে দেখ, আমি ছাঁদে তুই বাড়ির ভিতরে প্রবেশ কর!
হানিফের কথায় আরশ কপাল কুঁচকে পিছনে তাকাতে তাকাতে বলল,
___” তুমি মেয়ে দেখতে এসে ছাঁদে কী করছো?
আরশ ছাঁদের দিকে তাকাতেই হেচট খেলো,হানিফের পাশে মিম কে হাতে হাত ভাজ করে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে, আরশ ফোন করাতে হানিফ ছাঁদের রেলিংএর কাছে এসে নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে লাগলো, মিম রেলিং ঘেঁষে নিচের দিকে তাকাতেই আরশ কে কানে ফোন গুজে বাইকের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলো, হানিফের ভাই যে সেই আরশ এটা আর বুঝতে বাকি রইলো না, আরশ সন্দেহ গলায় মিমের দিকে তাকিয়ে ফোনে হানিফ কে বলল,
___” তোমার পাশে মেয়েটা কে?
হানিফ একবার আরচোখে মিমের দিকে তাকালো, পুনরায় গলা খাঁকারি দিয়ে আরশ কে বলল,
___” এটাই উনি!
আরশ অধৈর্য গলায় পুনরায় জানতে চাইলো,
___” উনি মানে কে ভাইয়া?
হানিফ আরশের কথায় খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল,
___” উনি মানে, যাকে আমার জন্য ঠিক করছে আমরা যাকে দেখতে এসেছি উনিই সে।
নিজের সন্দেহ ঠিক হতে দেখে আরশের মুখ গম্ভীর হয়ে এলো, হানিফ কে কিছু না বলে ফোন কেটে দিয়ে বাড়ির ভিতরে চলে গেলো, হানিফ ফোন থেকে চোখ তুলে মিমের দিকে রাখলো,মুখে মেকি হাসি টেনে বলল,
___” সরি আমার ভাই ছিলো।
মিম মলিন মুখে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে ছোট করে উত্তর করলো,
___ ও!
___” শুধুই ও, আরকিছু বলবেন না?
মিম হানিফের দিকে তাকালো, হানিফ আমতা আমতা করে পুনরায় বলে উঠলো,
___” না মানে, আমি এভাবে বলতে চাইনি, আমি বলছি, আমার বিষয়ে কিছু জানতে চাইবেন না?
মিম মন ভার করে সোজাসাপ্টা উত্তর করলো,
___” প্রয়োজন মনে করছি না।
মিমের কথায় হানিফ কিছুটা অপমানিত হয়ে গেলো, কয়েক মিনিট দুজনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো, হানিফ এদিক ওদিক তাকিয়ে মিম কে বলল,
___” শুতি শাড়িতে আপনাকে সুন্দর লাগছে।
___” ধন্যবাদ!
হানিফ পুনরায় নীরবতা পালন করে বলে উঠলো,
___”আচ্ছা শুনেন?
___”জ্বি বলেন?
মিমের নজর নিচে উঠানের শিউলি গাছের দিকে, সেদিকে তাকিয়ে জবাব দিলো,হানিফ একনজর মিম কে দেখে মিমের চোখ অনুসরণ করে শিউলি গাছের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” আপনার জীবনসঙ্গী কেমন চান?
___” জীবনসঙ্গী নিয়ে কখনো ভাবি না, কারণ আমি বিয়ে করতে চাইনা।
মিমের উত্তর হানিফ পুনরায় বলে উঠলো,
___” বিয়ে কেনো করতে চান না?
___” পড়াশোনা করতে চাই এজন্য!
হানিফ বেশ অবাক হলো, মিম সময় না নিয়ে ফটাফট উত্তর করছে, মনে হচ্ছে মিম আগে থেকেই সবকিছুর জন্য প্রস্তুত ছিলো, হানিফের এবার বেশ মিম কে নিয়ে আগ্রহ জন্মালো, মিমের সম্পর্কে জানতে পুনরায় বলল,
___”সব মেয়েদের লাইফ পার্টনার নিয়ে ভাবনা থেকে থাকে আপনাও নিশ্চয়ই থাকবে, সেই হিসাব থেকেই বলেন কেমন ছেলে আপনার পছন্দ?
মিম এবার শিউলি গাছ থেকে হানিফের দিকে চোখ রাখলো,অন্যমনস্ক হয়ে বলে উঠলো,
___”কেউ আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসবে,যার কাছে আমার রাগ অভিমানের মূল্য থাকবে, যে তাঁর ইগোর আগে আমাকে রাখবে,যার কাছে আমার জন্য সময়, ভালোবাসা, যত্ন, সন্মান সবকিছুর থাকবে!
হানিফ মুচকি হাসলো, মিম হানিফের হাসিতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরলো, হানিফ হাসি বন্ধ করে গম্ভীর গলায় বলল,
___” আমাদের এখন নিচে যাওয়া উচিত!
কথাটা বলে হানিফ আগে আগে হাঁটা ধরলো, মিম দু সেকেন্ড হানিফের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে নিজেও ছাঁদ থেকে নেমে পড়লো, মিম আর হানিফ কে পাশাপাশি নামতে দেখে সাব্বির ছেলেটা বললো,
___” হানিফ এসে গেছে আঙ্কেল!
সাব্বির কথায় সবাই মিম আর হানিফের দিকে তাকালো, মিম একনজর সামনে তাকালো, আরশ কে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মিম পুনরায় রুপোলী বেগমের দিকে তাকিয়ে ইশারায় বুঝালো রুমে যাবে, রুপোলী বেগম মেয়ের ইশারা বুঝতে পেয়ে বললেন,
___” আপনাদের যদি আর কিছু করার না থাকে মাইয়া কে রুমে পাঠিয়ে দিতাম?
রুপোলী বেগমের কথায় আরশের মা বাঁধা দিয়ে বলে উঠলেন,
___” আমি আপনার মেয়েকে অনেক আগেই দেখছি, আজকে আমার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি, যদি আপনাদের আপত্তি না থেকে থাকে মেয়েকে আমি আমার হাতের বালা পরিয়ে দিয়ে যেতে পারি?
কথাটা ড্রয়িং রুমে অনেকেরই পছন্দ হলো না, মিম মন ভার করে নিজের বাবার দিকে তাকালো, হানিফ অসহায় মুখে নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে, না এত মানুষের সামনে কিছু বলতে পারছে না সবকিছু মেনে নিতে পারছে, আরশ নিজের মায়ের কথায় বাঁধা দিয়ে বলল,
___” আম্মু জলদি কাজ শুভ হয়না, আজকে বাসায় চলো একটু সময় নেও তারপর ভেবেচিন্তে যা ইচ্ছা করা যাবে।
আরশের কথায় হানিফ সায় জানিয়ে বলল,
___” হ্যাঁ আম্মু আরশ ঠিক বলছে, এটাই ভালো হবে।
মিমের বাবা বলে উঠলেন,
___” আফা আপনারা বাড়িতে গিয়ে বুঝেন আমরা বুঝে তারপর দু পরিবার আবার বসে ঠিক করা যাবে।
মিম কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের রুমে চলে গেলো, রুপোলী বেগম মেহমান দের পুনরায় খাবার খাওয়ার কথা বললে তাড়া বারন করে, আরশ মিমের যাওয়ার দিকে তাকিয়েই নিজে বাড়ি থেকে বের হতে হতে বলল বিরবির করে বলল,
___” এই মেয়ে কে আমার ভাইয়ের জন্য ঠিক করেছে, দেশে কী মেয়ের অভাব, শেষ পর্যন্ত একটা অশিক্ষিত মেয়ের সঙ্গে আমার ভাইয়ের বিয়ে ইম্পসিবেল।
ছেলে পক্ষ চলে গেছে, রুপোলী বেগম কিচেন রুম সামলে নিয়ে মেয়ের রুমে এলো, মিম বিছানায় শুয়ে আছে, তিশা মিমের মাথায় হাত বুলে দিচ্ছে, রুপোলী বেগম চেচিয়ে উঠতে নিয়েও চিল্লালেন না, পাশের রুমে তাকবীর আরাত আছে ভেবে, নিচু স্বরে মিম কে বলল,
___” মানুষের সামনে আমাদের নাক না কাটলে ভালা লাগে না তাইনা?
মিম চোখ মেলে তাকালো, তিশা রুপোলী বেগমের কথায় বিরবির করে বলল,
___” নে মিম তোর আম্মু কে ওই সিসি ক্যামেরা আবার ঝালাই করছে, দেখ সব তাপ এবার তোর উপর দিয়ে যাইবো।
মিম তিশার কথা নিজের মায়ের কথা পাওা না দিয়ে বলে উঠলো,
___” আমি ওই ছেলেকে বিয়ে করতে পারবো না, তারউপর ছেলে ওই আরশের ভাই।
রুপোলী বেগম মিম কে বললেন,
___” আরশ পোলাডা তোর সাথে খারাপ ব্যাবহার করছে এজন্য না করার কিছুই নাই, ওরা সত্যি সত্যি মেলা বড়লোক, বিয়ে করতেই হইবো আর কোনো কথা না।
রুপোলী বেগম মিমের কথা না শুনেই রুম থেকে বের হয়ে গেলেন,মিম রুপোলী বেগমের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
___” বিয়ে দিবে তাই-না, যদি বাড়িতেই না থাকি !
মিমের কথায় তিশা ভরকে গেল, ভয় নিয়ে চিন্তিত মুখে বলল,
___” মানে কই যাবি তুই, তুই কী কোনো ছেলের সঙ্গে রিলেশন করিস তারসঙ্গে পালাতে চাইছিস?
তিশার কথায় মিম বিরক্ত মুখে তাকালো,
___” হ্যাঁ একসঙ্গে তিনচারটা করি এখন ভাবছি কার সঙ্গ পালানো যায়।
___” কীহহহ তুই সত্যি?
___” একদম আজেবাজে বকবি না আমি মরছি আমার জ্বালায়, আর মহারানী এসেছে বকবক করতে যতসব,
মিমের কথায় তিশা মুখ বাঁকা করে বলে উঠলো,
___” তাহলে কার সঙ্গে বাড়ি ছাড়বি?
মিম সয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
___” কেনো আরাত আপু আর তাকবীর ভাইয়া আছে না, শুধু সকাল টা হতে দে, আপুরা তো আগামীকাল বাসায় যাবে, আপুদের সঙ্গে আমিও যাবো।
রাত প্রায় দশটার কাছাকাছি, আরাত তাকবীরের দিকে অসহায় মুখে চেয়ে আছে, তাকবীর আরাত তে সবার সামনে রুমে আসতে বলে, নিজে রুমে এসে বিছানায় কম্বল শরীরে জরিয়ে শুয়ে পরছে, আরাত ভেবেছিলো তাকবীর হয়তো রেগে কিছু বলবে, কিন্তু না তখন থেকে তাকবীর আরাত কে না কিছু বলছে আর না কিছু করছে, শুধু শুয়ে থেকে আরাতের দিকে দেখেই যাচ্ছে, আরাত এবার বিরক্ত নিয়ে বলে উঠলো,
___” কথা বলছেন না কেনো?
___” তুমি কিছু জিজ্ঞেস করছো না এজন্য !
আরাত ভেবাচেকা খেয়ে গেলো, আরাত ভাবছে তাকবীর হয়তো রিপ্লাই করবে না, তাকবীর কে রিপ্লাই করতে দেখে আরাত দ্রুত বলে উঠলো,
___” আপনি রাগ করেন নাই?
পুনরায় তাকবীরের গম্ভীর গলায় উওর এলো,
___” রিজন কী?
আরাত এবারো অবিশ্বাস্য হয়ে তাকবীর কে দেখতে লাগলো, কিছুপলক দেখে মাথা নিচু করে পুনরায় বলল
___” বোরকা না পড়ে বাহিরের মানুষের সামনে গিয়েছিলাম।
তাকবীর গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,
___” এমন কিছু করো কেনো, যে আমার সামনে মাথা ঝুকে কথা বলতে হয়?
আরাত মাথা নিচু রেখেই নরম সুরে বলে উঠলো,
___”সরি এভাবে সবার সামনে যাওয়া উচিত হয়নাই, নেক্সট টাইম এমন হবে না।
তাকবীর হুট করেই আরাত কে নিজের কাছে টেনে নিলো, আরাতের মুখের সামনে নিজের মুখ রেখে গম্ভীর গলায় বলল,
___” মনে থাকে যেনো, নেক্সট টাইম যেন এমন ভুল না হয় ওকে?
আরাত উপর নিচ মাথা ঝাকালো, তাকবীর এতক্ষণে মুচকি হেঁসে আরাতের কপালে ভালোবাসার পরশ রেখে দিয়ে দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” সরি এতক্ষণ তোমাকে দূরে রাখার জন্য!
আরাতের এতক্ষণে সবকিছু ভালো লাগছে, তাকবীর কথা বলছিলো না যেন সবকিছু অন্ধকার হয়ে ছিলো, হেঁসে কথা বললে আরাতের মনের মধ্যে হাজারো ভালোলাগা কাজ করে, গম্ভীর হয়ে থাকলে মনে হয় অচেনা তাকবীর কে দেখছে, কেমন কথা বলতে ভয় করে, আরাত পুনরায় তাকবীর কে বলে উঠলো,
___” তারমানে আপনি আমার উপর রাগ করে ছিলেন না?
তাকবীর আরাতের গাল দু’হাতে মধ্যে নিয়ে বলে উঠলো,
___” তোমার উপর রাগ আসবে না আমার!
___” তাহলে?
তাকবীর দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” অনেক কিছুই আসে,বাট রিপ্লাই করতে পারি না!
আরাত কথায় কথায় আগপিস না ভেবে বলে উঠলো,
___” কেনো রিপ্লাই করতে পারবেন না?
তাকবীর আরাতের কথাতে মুচকি হেঁসে বলে উঠলো,
___” রিপ্লাই করতে পছন্দের মানুষের সহমত প্রয়োজন।
___”আপনার পছন্দের মানুষ কে?
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪৩
আরাতের বোকা বোকা কথার উত্তর তাকবীর হাসি মুখে দিচ্ছে, নেই কোনো বিরক্ত নেই কোনো রাগ,মনে হচ্ছে এভাবে প্রশ্ন পর প্রশ্ন করা আরাতের কর্তব্য আর সেই কর্তব্য পালন করার দায়িত্ব তাকবীরের, তাকবীর চুপচাপ আরাতের কথায় বলে উঠলো,
___” তুমি।
___”আমাকে এতটা পছন্দ করার রিজন?
__” রিজন জানতে চাওনা, পুরো রাত শেষ হয়ে যাবে বলতে বলতে।

Next part den