Unpredictable part 8
Jannatul firdaus mithila
“ হুশঁশ.. কিপ সাইলেন্স!আই জাস্ট হেট নয়েস!”
উল্লাসে মুখরিত পরিবেশ থমকে গেলো মুহুর্তে! সশস্ত্র বাহিনীর বডিগার্ডরা নড়েচড়ে দাঁড়ালো এবার। সকলের মাঝে এক ভিন্ন উৎকন্ঠা। জেডি এগোয়।লাল গালিচায় ধুপধাপ পা ফেলে এগিয়ে যায় স্টেজের দিকে। যেখানে কনফারেন্স রুম নো স্মোকিং এরিয়ায় গন্য সেখানেই ঠোঁটের কোণে সিগারেট ফুঁকছে জেডি! ভাব এমন — এখানকার একমাত্র রাজা বুঝি সে নিজেই। প্রফেসর সারাহ তৎক্ষনাৎ মাইকের কাছ থেকে সরে এলেন। জেডি স্টেজে উঠতে প্রথম সিঁড়িতে পা রাখতেই মিস সারাহ মুচকি হেসে একহাত বাড়িয়ে দিলেন তার দিকে।
জেডি কেমন দেখেও দেখলোনা সে হাতখানা।গম্ভীর যুবক নির্বিকার ভঙ্গিতে সিঁড়ি বেয়ে চলে এলো স্টেজে। এতে মনে মনে বেশ অপমান বোধ করলেন মধ্যবয়সী মিস সারাহ। রয়েসয়ে গুটিয়ে নিলেন নিজের বাড়িয়ে রাখা হাতটা।মুখে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে সরে দাঁড়ালেন তক্ষুনি। জেডি গিয়ে দাঁড়ালো স্টেজের একদম মাঝখানে। ঠোঁটের ফাঁকে সিগার রেখে দু’হাত নিয়ে গেলো পকেটে। তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে প্রফেসর মেহমেত রায়ান।বাদবাকি সকলের মুখাবয়ব স্বাভাবিক থাকলেও তার মুখাবয়বে স্পষ্ট বিরক্তির ভাজঁ! সে কেমন শক্ত মুখে তাকিয়ে রইলো স্টুডেন্টদের পানে।মিস সারাহ এবার মুচকি হেসে আবারও স্পিকারের কাছে গেলেন। সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে লাগলেন,
“ সো স্টুডেন্টস! আপনাদের গ্রুপ ইনচার্জ এন্ড প্রফেসরদের চিনে নিন আরেকবার। তাছাড়া আরেকটা কথা শুনে রাখুন সবাই..! ”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
স্টুডেন্টরা সব মনোযোগ টানলো মিস সারাহ-র দিকে। মিস একটুখানি সময় নিয়ে স্মিত হাসলেন। ভীষণ গর্বের সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বলতে লাগলেন,
“ একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আপনাদেরকে এখনো জানানো হয়নি।কথাটা হচ্ছে — মিস্টার এডওয়ার্ড জেহরান ড্যানিয়েল শুধুমাত্র এবারের আর্কিটেক্ট ডিপার্ট্মেন্ট এক্সপার্ট নন বরঞ্চ এবারের ক্যাম্পেইনের মূল জাজ ও তিনি। তাই আাশা করছি ব্যাপারটা বুঝে গিয়েছেন আপনারা!”
সামনের সারির কয়েকজন স্টুডেন্ট মাথা নাড়ায় ওপর নিচ। বাদবাকিদের মনোযোগ এখনো আঁটকে আছে দু’জন সুদর্শন এক্সপার্টদের ওপর। এদিকে আয়রার শরীর খারাপ হচ্ছে ক্রমাগত। হুট করেই কেন যে এতো এলার্জিক প্রবলেম বাড়লো তার কে জানে! আয়রা শক্ত মুখে বসে রইলো নিজ জায়গায়। অন্যদিকে, এক্সপার্ট সকলে একে একে এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করছে জেডির সাথে। ভাবা যায়? কতবড় একজন নামী-দামী আর্কিটেকচার বলে কথা! তার সঙ্গে টুকটাক কথা না বললে চলে? চারজন এক্সপার্টের মধ্যে তিনজনেই এগিয়ে এসে কথা বললো টুকটাক। অথচ মেহমেত দাঁড়িয়ে আছে শক্ত হয়ে! মিস সারাহ ব্যাপারটা খানিক আন্দাজ করতে পেরে চুপচাপ এসে দাঁড়ালেন মেহমেতের পাশে। মুখের ওপর হাত ঠেকিয়ে চাপা স্বরে বললেন,
“ স্যারের সঙ্গে কথা বলবেন না?”
জেডির প্রতি এমন মাত্রাতিরিক্ত সম্মানসূচক সম্ভাষণে বিরক্তির ভাজঁ পড়লো মেহমেতের ললাটে। ছেলেটা কেমন কর্কশ গলায় প্রতিত্তোর করে,
“ না! সবার সাথে কথা বলার রুচি হয়না আমার।”
চমকালেন সারাহ। বোকার ন্যায় তাকিয়ে শুধালেন,
“ সবাই আর মিস্টার এডওয়ার্ড জেডি কী আর এক? তিনি তো সবার উর্ধ্বে! যোগ্যতা এবং স্ট্যাটাসেও। আপনি কোন বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে বললেন এ কথাটা?”
মেহমেত বিরক্ত! বলার মতো অনেককিছু থাকলেও আপাতত চুপ করে থাকাটাকেই শ্রেয় মনে করে বিচক্ষণ যুবক। মনের কোণে একরাশ অনিচ্ছা থাকা স্বত্বেও প্রফেশনালিজম মেইনটেইন করতে সে পা বাড়ায় জেডির দিকে। লম্বা লম্বা দুটো কদম ফেলে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো অবশেষে। ঠোঁট গোল করে খানিকটা ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে আলগোছে একহাত বাড়িয়ে দেয় জেডির পানে। শক্ত মুখে কাঠকাঠ কন্ঠে বলে,
“ হ্যালো! আ’ম মেহমেত রায়ান।”
চশমার পুরু আস্তরণের আড়ালে লুকিয়ে থাকা জেডির নীলচে-সবুজ চোখদুটো কেমন সরু হয়ে গেলো মুহুর্তেই। ঠোঁটের কোণে লেগে গেলো এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ। মেহমেতের বাড়িয়ে রাখা হাতটার পানে একমুহূর্ত তাকিয়ে থেকে হুট করেই কেমন গম্ভীর মুখে বলে ওঠে,
“ আই ডোন্ট হেভ মাচ টাইম! এক্সকিউজ মি!”
অপমান! মুখের ওপর অপমান। মেহমেতের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো ধীরে ধীরে। বাড়িয়ে রাখা কেমন হাতটা গুটিয়ে ফেললো অচিরেই। কটমট দৃষ্টিতে জেডির পানে তাকিয়ে থেকে সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো মেহমেত। তাতে অবশ্য কিচ্ছু যায় আসেনা জেডির। সে বাঁকা হেসে তৎক্ষনাৎ চলে গেলো সেখান থেকে। তার পিছুপিছু চললো তার সশস্ত্র বাহিনীরা। এদিকে দু’জন এক্সপার্টদের মধ্যকার নিরব যুদ্ধ আর কারো চোখে পরুক বা পরুক মিস সারাহ-র চোখে ঠিকই পড়েছে! মানুষটা সে নিয়েই পড়েছেন আরেক ভাবনায়। তার অবচেতন মনে উত্থাপিত হয়েছে এক ভিন্ন প্রশ্ন! মেহমেত রায়ান এবং মিস্টার এডওয়ার্ড জেডি কী তবে একে অপরের পূর্ব পরিচিত?
Ottawa শহরের প্রিন্স অফ ওয়েলস ড্রাইভ রাস্তার একপাশে রিডাউ রিভার আরেক পাশে রিড্যাউ খাল। সন্ধ্যা হতে না হতেই সেখানে শুরু হয়েছে মৃদু তুষারপাত, সঙ্গে তীব্র বাতাস! আয়রা হাঁটছে আনমনে। গায়ে কালো রঙা ওভার কোট, ভেতরে পড়েছে লং ফ্রক। উঁচু একজোড়া হিল জুতোর ঠকঠক শব্দ তুলে হাঁটছে অপরুপা। চোখেমুখে স্পষ্ট গাম্ভীর্যের ছাপ! বোধহয় আপনমনে ভীষণ মনোযোগ দিয়ে ভাবছে কিছু।একহাতে তার ধরে রাখা ঔষধের প্যাকেট। সদ্য ডাক্তার দেখিয়ে এসেছে সে।তবে ডাক্তারের দেওয়া রিপোর্ট দেখার পর থেকেই চিন্তায় মজেছে আয়রা।
রিপোর্ট অনুযায়ী — আয়রা আজকে খুব বেশি মাশরুম খেয়েছে যেখানে তার মারাত্মক এলার্জি আছে মাশরুমে।অথচ আয়রার স্পষ্ট মনে আছে সে আজকে জাস্ট একটা চিকেন স্যুপ খেয়েছে! সে-তো কখনো নিজ অজান্তেও মাশরুম ছুঁয়ে অব্ধি দেখেনা।সেক্ষেত্রে তার শরীরে মাশরুমের উপস্থিতি এলো কোত্থেকে? এরমানে কী দাড়াচ্ছে?তার স্যুপেই কোনো গন্ডগোল ছিলো? কেউ তাকে ইচ্ছে করেই মাশরুম পাউডার খাইয়েছে! আয়রা তক্ষুনি দাঁড়িয়ে পড়লো নির্জন রাস্তায়। বিচক্ষণ মস্তিষ্কে খানিক জোর দিয়ে ভাবতে লাগলো দুপুরের ঘটনা। তার ঘরে খাবার রেখে গিয়েছিলো ওয়েটার। তবে কী সে-ই কিছু করেছে? কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই আয়রার চোয়াল শক্ত হলো এবার। বাদামী চোখদুটো কেমন জ্বলে ওঠে মুহূর্তেই।মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অপ্রকাশিত শত্রুকে চিনে উঠার এক অদম্য আগ্রহ জেগেছে তার মাঝে। তা কী আর ওতো সহজে মেটে? আয়রা শক্ত মুখে নিজের কোটের পকেটে একহাত গুঁজে দাঁড়ায়। রাস্তার বা-দিকে বয়ে যাওয়া নদীর পানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মাস্কের আড়ালেই বাকাঁ হাসলো মানবী। ঠোঁট কামড়ে বিরবির করে বলতে লাগলো,
“ যেখানে মরতে গিয়েও বেঁচে ফিরেছি আরেকবার, সেখানে তুই পাতালে লুকিয়ে থাকলেও তোকে খুঁজে বের করে আনার দায়িত্ব এই আয়রার!”
ঠোঁট গোল করে খানিকটা নিশ্বাস ফেললো আয়রা। মাথা ঘুরিয়ে আবারও হাঁটা ধরলো সামনের দিকে। এখান থেকে পাঁচ মিনিটের দুরত্বে রয়েছে মেট্রোস্টেশন। আপাতত আয়রার গন্তব্য সেদিকে। আকাশ ভেঙে তুষারপাত হলেও খুব একটা খারাপ লাগছেনা তার। বরঞ্চ রাস্তাঘাট নির্জন হওয়ায় তারই সুবিধে হয়েছে খুব। অন্তত গম্ভীর মুখো মেয়েটা এরইমাঝে একটু-আধটু হাসছে তো! কিয়তক্ষন বাদেই আয়রা চলে এলো স্টেশনে। মাথার ওপর তার স্তুপ জমেছে তুষার কণার। আয়রা হাত বাড়িয়ে সেগুলো ঝেড়ে ফেলছে কোনরকম। মাথা ঝাড়বার একপর্যায়ে হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে আটকালো অদূরের প্ল্যাটফর্মে কালো রঙা হুডি পড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘকায়ী ব্যাক্তির ওপর। যিনি কি-না একদম রেল ট্রেকের দ্বার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। আয়রা তেমন একটা পাত্তা দিলোনা লোকটাকে। ভাবলো — ট্রেন এলে নিশ্চয়ই সরে যাবে! আয়রা চুপচাপ চলে গেলো টিকেট কাউন্টারে। মাথাটা খানিক নিচু করে কাউন্টারে উঁকি দিতেই দেখে — কাউন্টার শূন্য! আয়রা ভ্রু গোটায়।গলা উঁচিয়ে খানিক ডেকে ওঠে,
“ হেলো! এক্সকিউজ মি! ইজ এনিওয়ান দেয়ার?”
প্রতিত্তোরে নিশ্চুপ সব! সম্পূর্ণ নির্জন প্ল্যাটফর্মটিতে এই একটিমাত্র টিকেট কাউন্টার হওয়া স্বত্বেও এটাতে আপাতত কেউ নেই? এহেন বেখাপ্পা কর্মকাণ্ডে ভীষণ রুষ্ট হলো আয়রা। বিরক্তি নিয়েই পা বাড়ালো প্ল্যাটফর্মে। অথচ মেয়েটা একটাবার ঘুরেও দেখলোনা এতক্ষণ যাবত তার পায়ের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া র*ক্তের ধারায়। যা কি-না গড়িয়ে আসছে টিকেট কাউন্টার থেকে। তা কেনো? কে জানে!
আয়রা গম্ভীর মুখে এসে দাঁড়ালো প্ল্যাটফর্মের একপাশে। আড়চোখে একবার দৃষ্টি ফেললো অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে। আশ্চর্য! লোকটা এখনো একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেনো? না একটু নড়ছে! না একটু সরছে। সে-কি কিছু দেখছে না-কি? এ নিয়ে মেয়েটার মনে একদফা কৌতুহল জাগলেও গম্ভীর মুখো আয়রা তা হাওয়ায় উড়িয়ে দিলো একপ্রকার।সময় কাটাতে হাত বাড়িয়ে ওভার কোটের পকেট থেকে ফোন বের করে এনে ঘাটাঁ শুরু করলো কোনরকম! আশেপাশে তেমন মানুষ না থাকায় একহাতে আলতো করে খুলে ফেললো মুখের মাস্কটা। প্রায় মিনিট পাঁচেক পেরুলো এমনি এমনি। ঠিক তার পরপরই প্ল্যাটফর্মে ঘন্টা বাজলো সজোরে। ট্রেনের আওয়াজ পরেছে। প্ল্যাটফর্মের চারপাশের লাইটগুলোতে জ্বলে ওঠেছে লাল লাইট। আয়রা নড়েচড়ে দাঁড়ায় এবার।ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই আবারও চোখ পড়লো হুডি পড়ুয়া লোকটার দিকে। আয়রা খানিক ভ্রু কুঁচকায় এপর্যায়ে। অনিচ্ছা থাকা স্বত্বেও গলা উঁচিয়ে অপরিচিত লোকটার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
“ এক্সকিউজ মি! ট্রেক হতে সরে দাঁড়ান।ট্রেন আসছে।”
লোকটা শুনলো কি-না কে জানে! তার ভাবভঙ্গিমায় তা বোঝা বড় দায়। সে-তো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এখনো। আয়রা লোকটার ওমন গা-ছাড়া ভাব দেখে শক্ত মুখে অন্যত্র তাকায়।বিরবির করে বলে,
“ ননসেন্স!”
ট্রেন ঢুকছে প্ল্যাটফর্ম দিয়ে। এ স্টেশনে দাঁড়াবে না এ ট্রেন।তাইতো কেমন জোরালো গতিতে ছুটছে ট্রেনটা। আয়রা আরও দু-কদম পিছিয়ে আসে ট্রেক থেকে। ঘাড় বাকিয়ে পাশে তাকাতেই দেখে — লোকটা এবার আরো একধাপ এগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ট্রেকের দিকে। আয়রার বুক কেঁপে ওঠে অজান্তেই। লোকটা কী তবে সুইসাইড করতে চাচ্ছে? আয়রা ভাবতে পারলোনা আরকিছু।সে তৎক্ষনাৎ চিৎকার করে বলে ওঠে,
“ হেই! মুভ ব্যাক!”
শুনছেনা অপরিচিত। গো ধরে দাঁড়িয়ে আছে আগের জায়গায়। আয়রা এবার নিজেই ছুটলো সেদিকে। দৌড়ে গিয়ে চেপে ধরে অপরিচিতের কালো হুডির পেছনের অংশ। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে দীর্ঘকায়ী লোকটাকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসে পেছনে। তক্ষুনি পাশের ট্রেক দিয়ে বিকট শব্দ তুলে ট্রেন চলে গেলো ঝড়ের গতিতে। আয়রা থামলো।তক্ষুনি একহাতে শক্ত এক টান বসিয়ে অপরিচিতকে ঘুরিয়ে দাঁড় করালো নিজ দিকে। অতঃপর দু’হাতে অপরিচিতের বুক বরাবর বেশ জোরালো এক ধাক্কা বসিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো,
“ হোয়াট দা ফা*ক ওয়্যার ইউ ডুয়িং ম্যান? মরার এতো শখ থাকলে ট্রেনের নিচে পড়েই মরতে হবে কেনো? আর কোনো ওয়ে পাননি?”
ভীষন রাগ নিয়ে দাতঁ কিড়মিড়িয়ে চেঁচাচ্ছে আয়রা। রাগ করার দরুন অপরুপার সরু নাকটা কেমন লাল টুকটুকে বনে গিয়েছে ইতোমধ্যে। ঘনপল্লব বেষ্টিত বাদামী চোখদুটো যেন এক নিদান ঘন জঙ্গল। একটুখানি গভীর দৃষ্টিতে তাকালেই বোধহয় হারিয়ে যাওয়া নিশ্চিত সে চোখে! অপরুপার গোলাপি অধরজোড়া সবচেয়ে বেশি নজরকাড়া সৌন্দর্যের প্রতীক। কী সুন্দর ঢেউ খেলানো নিপুন আর্ট করা মনে হচ্ছে! ঠোঁটের বা-দিকের ঠিক নিচে জ্বলজ্বল করছে কালো কুচকুচে তিলটা। তিলও যে কারো গায়ে এতো সুন্দর মানায় তা আয়রাকে না দেখলে বোঝাই যাবেনা। একদিকে আয়রা ইচ্ছেমত ঝাড়ছে অপরিচিত যুবককে আরেকদিকে অপরিচিত মাস্কের আড়ালেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আয়রার পানে। এই চোখদুটো.. হ্যা এই চোখ! এই মুখ! এই ঠোঁট! সবকিছুই তো তার বড্ড পরিচিত। বেশ যতন করে বহুবছর ধরে একেঁ যাচ্ছে সে। চিনতে না পারার ভুল হবার প্রশ্নই ওঠেনা। যুবক হতবিহ্বলের ন্যায় আলতো করে হাত উঁচিয়ে আনে আয়রার গালের কাছে।খানিকটা স্পর্শ করতেই যাবে ওমনি মেজাজ চটলো আয়রার।তৎক্ষনাৎ আগপাছ না ভেবে সজোরে চড় বসালো অপরিচিতের গালে।অপরিচিত থমকায়।ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব সে। গাল বাকিয়ে তাকিয়ে রইলো জমিনে।আয়রা কেমন সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছে। যাকে সে মরে যাওয়া থেকে বাঁচালো সে-ই কি-না তার দিকে হাত বাড়াতে চাইছে? একেই বোধহয় বলে উপকারীকে বাঘে খায়! আয়রা দাঁত খিঁচে নিচু কন্ঠে বললো,
“ স্কাউন্ড্রেল! ভুলটা আমারই ছিলো।মরে যেতে দেওয়া উচিত ছিলো।”
বলেই আয়রা তৎক্ষনাৎ গটগট পায়ে সরে গেলো অপরিচিতের সামনে থেকে। এরইমধ্যে লোকাল ট্রেন এসে হাজির। দলে দলে মানুষ নামছে ট্রেন থেকে। অপরিচিতের এতক্ষণে সম্বিত ফিরল। সে তক্ষুনি ছুটলো আয়রার খোঁজে। ভীড় ঠেলে এদিক-ওদিক সর্তক দৃষ্টি ফেলে খুঁজতে লাগলো মেয়েটাকে। একপর্যায়ে হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে পড়লো মেট্রোর ভেতর। যেথায় গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে আয়রা।অপরিচিত দারুণ বেগে ছুটলো মেট্রোর দরজার দিকে। তবে এপর্যায়ে ভাগ্য তার সহায় হয়নি। তার আসার আগেই মেট্রোর দরজা আঁটকে গেলো আপনাআপনি। অপরিচিত থমকায়।সজোরে কিল-ঘুষি বসায় মেট্রোর দরজায়।ভেতর থেকে যাত্রীসব হা করে তাকিয়ে আছে হুডি পড়া যুবকের পানে। তার ওমন উদ্ভট কর্মকান্ডে হতবাক সকলে! যুবক আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে দরজাটা একটুখানি খুলতে তবে নাহ! ব্যর্থ হলো সে।ট্রেন চললো আবারও। অপরিচিত একপা পিছিয়ে গেলো আপনা-আপনি। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একমনে তাকিয়ে রইলো মেট্রোর দিকে। মেট্রোটা যখনি চোখের আড়াল হলো তখনি অপরিচিত কেমন কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লো জমিনে। কাঁপতে থাকা হাতদুটো দিয়ে নিজেই নিজেকে জড়িয়ে ধরে বিরবির করে বলল,
“ টুইঙ্কেল! আমার টুইঙ্কেল! ও আছে।এ পৃথিবীতে ও আছে। আমার টুইঙ্কেল আছে।”
যুবকের পেশিবহুল বাহুদ্বয় জ্যাকেটের আড়ালেই ফুলেফেঁপে উঠছে ক্রমাগত। মাস্কের আবরণে লুকায়িত পুরু ঠোঁটদুটো কাঁপছে রীতিমতো। নীলচে-সবুজ চোখদুটো থেকে আচমকা গড়িয়ে পড়লো একফোঁটা অশ্রু। তা আদৌও কিসের জন্য তা ঠিক বোঝবার জো নেই!
❝ আজ রাতে হঠাৎ করেই কানাডার Ottawa শহরের সর্বত্র কারফিউ জারি করেছেন কানাডার সরকার! কিন্তু কেনো? তার বিস্তারিত কোনো রিপোর্ট আমরা এখন অব্ধি পাইনি। এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।খুব শীঘ্রই আমরা আশাবাদী — মিনিস্টার এ নিয়ে একটি সঠিক এবং বিস্তারিত বিবৃতি দিবেন। তাই এখন এ পর্যন্তই।এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে জুড়ে থাকার জন্য আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ! ভালো থাকবেন।❞
টিভির প্রতিটি চ্যানেলে একই নিউজ পঠিত হচ্ছে। চ্যানেল উল্টালেই এক খবর — কারফিউ! ইতোমধ্যেই কানাডার মিনিস্টারের বাড়ির সামনে জড়ো হয়েছে মিডিয়ার মানুষজন। সকলের মাঝেই এক ভিন্ন উৎকন্ঠা। কখন মিনিস্টার নিজে থেকে এসে হঠাৎ কারফিউ জারি করার কারণ বলবেন। এদিকে বিশাল আয়তনের সুসজ্জিত বাড়ির লিভিং রুমের সোফার নরম গদিতে বসে আছেন মিনিস্টার। হাতে তার ওয়াইনের স্বচ্ছ গ্লাস। একটু একটু করে আয়েশ নিয়ে চুমুক বসাচ্ছেন ওয়াইনের গ্লাসে। তার অপর পাশের সোফায় গম্ভীর মুখে বসে আছে নিহাদ।একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফোনের স্ক্রিনে। তার আবার ব্যাপক দাপট চারিদিকে। শত হলেও মাস্টারের ডাকপিয়ন বলে কথা!
মাস্টারকে ঠিকমতো কেউ না দেখলেও তার ডানহাতকে সবাই চেনে। মাস্টারের যত হুকুম আছে সে-ই তো পালন করে সবটা! এই যেমন আজকে হুকুম এসেছে — আজ সারারাত শহরে কারফিউ জারি চলবে।মাস্টারের নাকি পার্সোনাল কাজ আছে। নিহাদ এসে মিনিস্টারকে এসব বলতেই মিনিস্টার সাহেব নাওয়া খাওয়া ভুলে তড়িঘড়ি করে কারফিউ জারি করলেন পুরো শহরজুড়ে। ওদিকে বাইরে উৎসুক জনতা ভিড় জমালেও সেদিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা নেই তার।
গ্লাসের সবটুকু ওয়াইন গোগ্রাসে গিলে নিয়ে থামলেন মিনিস্টার। বেশ স্বস্তির একটা ঢোক গিলে গালভর্তি হাসি টানলেন ঠোঁটের কোণে। নাদুসনুদুস গায়ের গড়নের মানুষটার পেট বড় তার গা থেকে! মাথা সম্পূর্ণ টাক! কী সুন্দর ক্লিন শেভ করে রাখা। বাতির আলোয় মাথাটা কেমন চকচক করে ওঠে আনমনে। মধ্যবয়স্ক মিনিস্টার সাহেব এগিয়ে বসলেন সামান্য। নিহাদের পানে দৃষ্টি রেখে আবদারের সুরে বলল,
“ ইয়ে মানে বলছিলাম কী… মাস্টারের সাথে যদি এবার একটু দেখা করিয়ে দিতেন!”
গম্ভীর মুখো নিহাদ বাঁকা হাসলো ঠোঁট পিষে। তীর্যক ব্যাঙ্গাত্মক দৃষ্টি তাক করে ভারি কন্ঠে বললো,
“ মাস্টারের মুডের ওপর ডিপেন্ডেবল এভরিথিং! তার মুড হলে দেখা করতেই পারেন।”
মিনিস্টারের হাসিমুখটা মুহুর্তেই থমথমে হয়ে গেলো। গত চারবছরে সে দশবারের চেয়েও বেশি চেষ্টা করেছে মাস্টারের সাথে একটুখানি দেখা করতে,অথচ মাস্টারের না-কি মুডই হয়না! এ আবার কেমন কথা? মিনিস্টার শক্ত মুখে দুয়েকটা কটুবাক্য বলতে চাইলেন। তবে মুহুর্তেই বোধ ফিরলো তার।কার নামে কটুবাক্য বলবেন তিনি? মাস্টারের নামে? ওরে বাবা! এ সাধ্য তার চৌদ্দ গোষ্ঠীর আছে যে তার থাকবে? মিনিস্টার নিজের সকল উপচে পড়া কথাগুলো ঢোক গিলে নিলেন একপ্রকার। মুখে কপট হাসি ঝুলিয়ে বসে রইলেন চুপচাপ। এদিকে নিহাদের নিরব অপেক্ষা চলমান। এরইমধ্যে মেসেজের টুংটাং শব্দ বাজলো তার ফোনে।তা শোনামাত্রই দাঁড়িয়ে পড়ে নিহাদ। গম্ভীর মুখে বডিগার্ডদের উদ্দেশ্য করে বলে,
“ কাম অন বয়েজ!”
হুকুম তামিল হলো।সকলে একযোগে ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেলো বাইরে।এদিকে পেছনে হতভম্বের ন্যায় বসে রইলো মিনিস্টার। পাশ থেকে তার পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট এগিয়ে এসে আরেকগ্লাস ওয়াইন ঢেলে এগিয়ে দিলেন মিনিস্টারের হাতে। মিনিস্টার হাসলেন। মুখ কুঁচকে আরেক চুমুক বসালেন গ্লাসের গায়ে।সামান্য ঢোক গিলে আওড়ালেন,
“ বড় মানুষদের বড়সড় ব্যাপার! চারবছরেও না-কি মুড হয়না তার। ব্লা*ডি মোরন একটা! হাতে একবার পেলেই হতো!”
কানাডার Ottawa শহরের একমাত্র মেইন রোড।যার সাথে পুরো কানাডা শহর কানেক্টেড, আপাতত সেই রোড ব্লক! চারিদিকে সশস্ত্র বাহিনীর কড়া নজরদারি। পুলিশও এসেছেন এরইমধ্যে। সাধারণ জনগণ পড়েছেন আরেক ভোগান্তিতে।সকলে চুড়ান্ত পর্যায়ের বাক-বিতন্ডায় চালাচ্ছে নিরাপত্তা কর্মীর সাথে তবে নিরাপত্তা কর্মীরা আপাতত হাতের পুতুল সেজেছে একজনের। যার হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেনা।পালন না করে থোড়াই মাথা হারাবে!
রোডের একদম মাঝ বরাবর দাঁড় করিয়ে রাখা বিশটি ব্ল্যাক এডিশন মার্সিডিজ। তাদের একদম সামনে দাঁড়িয়ে আছে রোলস রয়েস ব্র্যান্ডের নয়ের ড্রপটেইল এডিশন কার!লম্বা গাড়িটির ভেতর রাজকীয় ভঙ্গিতে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে এডওয়ার্ড জেডি।ডানহাতের দু’আঙ্গুলের ভাঁজে জ্বলছে কুটস নিকারাগুয়ান সিগার। চোখদুটো বুঁজে রেখে মাথা এলিয়ে রেখেছে সিটের গায়ে। পাশে ব্যস্ত ভঙ্গিতে কতগুলো ফাইল ঘাঁটছে নিহাদ।উম্মাদের ন্যায় তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। কিয়তক্ষন বাদে, তার ফাইল ঘাঁটা শেষ হলেই সে কেমন ভয়ার্ত ঢোক গিলে বলে ওঠে,
“ জেডি!”
চোখ খুললো জেডি।সামান্য ঘাড় কাত করে চাইলো নিহাদের পানে। নিহাদ থেমে থেমে বলে,
“ এ শহরের সকলের এনআইডি কার্ড যোগাড় করা শেষ। এবার তুই যদি বলতি পরবর্তীতে কী করবো!”
জেডি রহস্যময় হাসলো।ঘাড় সোজা করে তৎক্ষনাৎ হাত গুঁজল দু- সিটের মাঝখানের ছোট্ট বাক্সটায়। কিয়তক্ষন খুঁজে অবশেষে সেখান থেকে বের করলো একটি ভিন্টেজ পেপার। ধীরেসুস্থে তা এগিয়ে দেয় নিহাদের পানে।ভরাট কন্ঠে বলে,
“ ওকে আমার চাই!”
নিহাদ ভ্রু কুঁচকে কাগজটা হাতে নেয়। রয়েসয়ে কাগজটা মেলতেই তার চোখ উঠে যায় কপালে। সে-ই মেয়েটা? জেডির কল্পনার মেয়েটা? নিহাদ কেমন অসন্তোষের মুখে বলল,
“ আবারও পাগলামি করছিস জেডি! তুই কেনো বুঝতে চাচ্ছিস না কল্পনা কখনো বাস্তব হয়না! ও শুধুমাত্র তোর কল্পনা! নাথিং এলস। তোর এই সো কলড পাগলামির জন্য তুই পুরো শহরকে ভোগান্তিতে ফেলছিস!”
মুহুর্তেই চোখমুখ শক্ত হলো জেডির।নীলচে-সবুজ চোখজোড়া যেন জ্বলে ওঠে মুহুর্তেই।চোয়াল ফুটে উঠেছে তীক্ষ্ণ ভাবে। নিহাদ ভড়কায়।তড়িৎ নিজের দুগালে হাত রেখে আমতাআমতা করে বলে,
“ সরি সরি ভাই! ভুল হয়ে গেছে। আর বলবোনা।”
দাঁতে দাঁত চাপছে জেডি। তক্ষুনি নিহাদের গ্রীবা শক্ত হাতে চেপে ধরে আচমকা! নিহাদ বেচারা ব্যাথায় চোখমুখ কুঁচকে ফেলে সঙ্গে সঙ্গে। এদিকে জেডি কেমন কটমট করছে।হিংস্র কন্ঠে গর্জন তুলে বলে ওঠে,
“ মরতে চাইলে আরেকবার শুধু কথাটা বলে দেখ! আই সয়্যার, জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে ফেলবো তোকে!
পুরো শহরের সকল জনগণের এনআইডি কার্ড চেক করা শেষ নিহাদের।তবুও জেডির কাঙ্ক্ষিত মানুষকে খুঁজে পায়নি সে।এতে অবশ্য বড্ড বিরক্ত নিহাদ।সে-তো জানে সে পাবেনা।তারপরও পাগলের সাথে তালে তাল মেলাচ্ছে কোনোরকম। এদিকে জেডি অস্থির! ঐ বাদামী চোখদুটো.. বড্ড টানছে তাকে। ভেজাঁ নরম ঠোঁটদুটো,হাসলে কুঁচকে যায় কী সুন্দরভাবে।আর ঠোঁটের নিচের তিলটা! উফফ! জেডির বুক কাঁপছে উত্তেজনায়। সে অস্থিরতায় বুক চেপে ধরে তৎক্ষনাৎ। চোখদুটো খানিক বুজঁতেই হঠাৎ তার মনে পড়লো — তখন তার টুইঙ্কেলের হাতে একটা হসপিটালের শপিং ব্যাগ ছিলো।নামটা যেন কী….জেডি আরেকটু জোর দিলো নিজের মস্তিষ্কে।কিয়তক্ষন বাদেই তার মনে পড়লো হসপিটালের নাম।মুহুর্তেই সটান হয়ে বসে সে।গর্জন তুলে ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
“ টেক দা কার টু দা সেন্ট্রাল হসপিটাল!”
সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি স্টার্ট দেয় ড্রাইভার। এদিকে জেডির এমন হুংকারে হকচকিয়ে ওঠে নিহাদ। ভড়কে গিয়ে সিটে বসলো কোনরকম। অন্যদিকে,জেডি অস্থির। পাদুকা সমানে কাঁপছে তার। নিহাদ হতবাক হয় তা দেখে। জেডিকে এতোটা অশান্ত এই প্রথম দেখছে সে! কি হয়েছে জেডির?
প্রায় মিনিট দশেক পরপরই লম্বা গাড়িটি এসে থামলো সেন্ট্রাল হসপিটালের সামনে। নিহাদ গাড়ি থেকে বেরুনোর আগেই ওপাশ দিয়ে জেডি বেরুলো তৎক্ষনাৎ। নিহাদ এবারে অবাক হয়নি একটুও। পুরোটা রাস্তা জুড়ে জেডির কত-শত অধৈর্য্যতা দেখলো নিজ চোখে, সেখানে এ-তো পানি ভাত সমান!
জেডি একপলক তাকিয়ে রইলো হসপিটালের দিকে। পরক্ষণে কেমন রহস্যময় বাঁকা হেসে ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেলো ভেতরে।
হসপিটালের রিসেপশনিস্ট হিসেবে কর্মরত দুজন নারী।তাদের দৃষ্টি আপাতত টিভির বড় পর্দায়।যেখানে দেখানো হচ্ছে একজন সুদর্শন যুবকের বিশাল কাজকর্মের নিদর্শন। সে আর কেউ না! ইউএসএর বিখ্যাত আর্কিটেকচার এন্ড স্কাল্পচার মিস্টার এডওয়ার্ড জেডি। রিসেপশনিস্ট দু’জন কী মনোযোগটাই না দিয়েছে সেদিকে। এরইমধ্যে, জেডি এবং নিহাদসহ বাকিরাও ইতোমধ্যেই ঢুকে পড়েছে হসপিটালে।নিহাদ এগিয়ে এসে দাঁড়ালো রিসেপশনে। সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে দৃষ্টি কাড়বার চেষ্টা করলো রিসেপশনিস্টের কিন্তু নাহ! তাদের মনোযোগ অন্যদিকে। নিহাদ দুবার ডাকলো।তবুও পাত্তা পেলোনা তেমন। ঠিক তখনি মেজাজ চটলো জেডির।তৎক্ষনাৎ দৃঢ় পায়ে এগিয়ে এলো রিসেপশনে।গমগমে কন্ঠে ধমকে বলল,
“ টিভির দিকে এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকলে কাজ করবেন কখন?”
হঠাৎ এহেন ধমকে ওঠা কন্ঠে মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটলো তাদের। এতে বেজায় বিরক্ত হয়ে যেইনা তারা চোখ তুলে সামনে তাকায় ওমনি চোখদুটো কেমন ছানাবড়া হয়ে গেলো রিসেপশনিস্ট দু’জনার।স্বপ্ন দেখছে কি-না যাচাই করতে দু’জনেই কেমন চিমটি কেটে বসলো একে-অপরকে। পরমুহূর্তে ব্যাথা অনুভুত হতেই বুঝলো — নাহ এটা স্বপ্ন নয়।এদিকে জেডি তিতিবিরক্ত। রাগে কটমট করছে সে। কখন না যেন সবকিছু ভেঙেচুরে ফেলে কে জানে! নিহাদ অবস্থা বেগতিক দেখে তৎক্ষনাৎ জেডিকে পাশ কাটিয়ে নিজে এগিয়ে আসে। গম্ভীর মুখে বলে,
“ গত পাঁচ ঘন্টা আগে থেকে এপর্যন্ত এ হসপিটালে যত পেশেন্ট এসেছে, তাদের সবার ডিটেইলস প্রয়োজন আমার।এন্ড ইট’স এন ইমার্জেন্সি!”
রিসেপশনিস্ট কপালে ভাজঁ ফেললেন দুয়েকটা। এহেন প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বললেন,
“ সরি স্যার! কিন্তু এটা আমাদের রুলসে নেই।”
কথাটা বলতে দেরি জেডির কোমরের পেছন থেকে বন্দুক বের হতে দেরি নেই। ছেলেটা কেমন বেপরোয়া ভঙ্গিতে বন্দুকের নল ঠেকালো রিসেপশনিস্টের কপাল বরাবর। তা দেখামাত্রই পাশেরজন চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারালো তক্ষুনি। এদিকে যার কপালে বন্দুক ঠেকানো সে-তো পারছেনা ভয়ে নিশ্বাস ফেলতে! জেডি রহস্যময় কন্ঠে আচমকাই বলে,
“ হুটহাট বন্দুক চালানোটা আবার আমার রুলসের একটা অংশ! হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড দেট!”
বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই যথেষ্ট! মেয়ে রিসেপশনিস্ট তৎক্ষনাৎ খানিকটা নুইয়ে গিয়ে আঙুল চালালো কম্পিউটারের কিবোর্ডে। গত পাঁচঘন্টার সকল পেশেন্টের এন্ট্রি ডেটা ওপেন করে এগিয়ে দেয় জেডির সামনে। জেডি তক্ষুনি ব্যস্ত হলো কম্পিউটারের স্ক্রিনে। নিহাদ এগিয়ে এসে ঘাঁটতে চাইলে বাঁধ সাধলো জেডি।গম্ভীর মুখে নিজেই দেখতে লাগলো সবটা।
Unpredictable part 7
প্রায় আধঘন্টা যাবত একনাগাড়ে ডাটা চেক করছে জেডি।তবে এখনো তার কাঙ্ক্ষিত মানুষটার দেখা পায়নি সে। জেডি ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে আরও দুটো ফাইল ঘাঁটতে গিয়েই হঠাৎ তার আঙুল থামলো কার্সরের ডগায়। একজোড়া চোখের দিকে চোখ পড়লো তার। সেই চোখদুটো! জেডি ধীরে ধীরে কার্সর নামিয়ে আনে নিচে। ফলে আস্তে ধীরে পরবর্তী ফাইলটি স্ক্রিনে ভেসে আসে সময় নিয়ে। জেডি থামলো।তার অপেক্ষার অবসান ঘটলো তক্ষুনি। কম্পিউটারের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে তার কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তির ছবি।যার নিচে নামের অংশে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা — হুমায়রা আজিম আয়রা।জাতীয়তা — বাংলাদেশী। জেডি রহস্যময় হাসলো। বিরবির করে আওড়ালো — আয়রা — টুইঙ্কেল, টুইঙ্কেল — আয়রা! বাংলাদেশে আমার পরী ছিলো এতদিন সেটার খোঁজ পেলাম না কেন আমি?
