Home unpredictable Unpredictable part 7

Unpredictable part 7

Unpredictable part 7
Jannatul firdaus mithila

বোস্টন ইউনিভার্সিটির কনফারেন্স রুম। রুমে চলছে লাইভ প্রজেক্ট। প্রফেসর লুইস হেনরী প্রজেক্টরে বিভিন্ন নির্দেশনা বোঝাচ্ছেন শিক্ষার্থীদের। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে Solar Decathlon নামক বিশ্বব্যাপি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।বিশ্বের বিভিন্ন নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নির্দিষ্ট টিম এতে অংশগ্রহন করে। এই প্রতিযোগিতার মূল বিষয় হচ্ছে এমন একটি বাড়ি নির্মাণের প্রজেক্ট সম্পন্ন করা যেখানে সৌরশক্তি ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব, টেকসই,এবং সম্পূর্ণ সোলার সিস্টেমের আওতায় পরিচালিত কার্যকরী একটি ঘরের ডিজাইন পাওয়া যাবে।প্রতিবারের মতো এবারেও বোস্টন ইউনিভার্সিটি অংশ নিচ্ছে এ প্রতিযোগিতায়। গত বারের প্রতিযোগিতায় বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে পাঠানো প্যান্থার টিম ভীষণ গৌরবের সাথে বিজয়ী হয়েছিল এই সেক্টরে। এবারেও প্রফেসর লুইস আশাবাদী তার টিম জিতবেই! ২০২৫ এর Solar Decathlon প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠিত হবে কানাডার Ottawa-এর কার্লেটন ইউনিভার্সিটিতে। দীর্ঘ তিন মাসের এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে কানাডায়।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কনফারেন্স রুমে আপাতত বসে আছে ২৫জন শিক্ষার্থীর টিম —প্যান্থার। ৫টি আলাদা আলাদা ডিপার্ট্মেন্টের স্টুডেন্টদের নিয়ে গঠিত দলটিই হচ্ছে প্যান্থার গ্রুপ। গ্রুপটিতে রয়েছে আর্কিটেক্ট ডিপার্ট্মেন্টের ৫জন সদস্য, সাইকোলজি ডিপার্ট্মেন্টের ৫জন সদস্য, ঠিক একইভাবে ম্যাকানিক্যাল ইন্জিনিয়ারিং, ইন্টেরিয়র এন্ড সাসটেইনেবলিটি ডিজাইন, এবং পরিশেষে কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্ট থেকেও রয়েছে ৫জন করে সদস্য। প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট থেকে রয়েছে একজন করে প্রতিনিধি, যাদের ডাকা হয় মেজর বলে। প্রত্যেকের দায়িত্ব যেমন ভিন্ন ঠিক তেমনি তাদের কাজের ধরনও ভিন্ন। যেমন,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

★ সাইকোলজি ডিপার্ট্মেন্টের মেজর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে — আয়রা। এনভায়রনমেন্টাল সাইকোলজি, কমফোর্ট জ়োন ডিজাইন, মানুষের মস্তিষ্কের ওপর আলো এবং রঙের মানসিক প্রভাব ইত্যাদি দেখাই তার এবং তার ডিপার্ট্মেন্টের কাজ।
★অন্যদিকে, আর্কিটেক্ট ডিপার্ট্মেন্ট থেকে মেজর নির্বাচিত হয়েছেন — অ্যাইডেন পার্কার। তার কাজ যদিও শান্ত তবে বেশ বিচক্ষণও বৈকি!ড্রাফটিং এবং থ্রিডি মডেল বানানোর দায়িত্ব তার ডিপার্ট্মেন্টের।
★মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে টিম লিড করছে কিম নোয়া। সোলার প্যানেল অপ্টিমাইজেশন আর এনার্জি ডিজাইনের দায়িত্ব তার পুরো ডিপার্ট্মেন্টের।
★ আমিরা সান্তোস – ইন্টেরিয়ার ও সাস্টেইনেবিলিটি ডিজাইন ডিপার্ট্মেন্টের মেজর। হাউস লেআউট, ইকো-ফ্রেন্ডলি মেটেরিয়াল নির্বাচন—এগুলো দেখার দায়িত্ব আমিরার।
★লিয়াম ও’কনর – কমিউনিকেশনস মেজর! জাজদের সামনে প্রেজেন্টেশন, পিআর, স্টোরিটেলিং স্ট্রাকচার সবটা সামলানোর দায়িত্ব লিয়ামের।
পাঁচজন মেজর বসেছে কনফারেন্স রুমের ডানপাশের উঁচু সিটগুলোয়।প্রত্যেকের হাতে নিজস্ব প্রজেক্ট। মনোযোগ আপাতত সবটা প্রজেক্টরের পর্দায়। প্রায় আধঘন্টা পর, প্রফেসর লুইস প্রজেক্টরে সকল নির্দেশনা দেওয়া শেষ করলেন। হাতের চিকন সেন্সর এন্টেনাটা গোটাতে গোটাতে বললেন,

“ তো মেজরস! আপনারা রেডি?”
সকলে একযোগে মাথা নাড়ায়। গম্ভীর মুখো আয়রাও আলতো করে মাথা নাড়লো। প্রফেসর খানিক সময় নিয়ে পা বাড়ালেন মেজরদের টেবিলের কাছে। অ্যাইডেনের সামনে দাঁড়িয়ে ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ সব গোছানো শেষ?”
অ্যাইডেন রহস্যময় বাঁকা হাসলো।প্রফেসরের দিকে চেয়ে রইল অদ্ভুত শান্ত চোখে। তা সকলের অলক্ষ্যে হলেও আয়রার দৃষ্টি এড়ায়নি মোটেও। সে আড়চোখে ঠিকই দেখলো সবটা। অ্যাইডেন হালকা হেসে বলে ওঠে,
“ ইয়াহ! অল সেট।”

লুইস বাঁকা হাসলেন। পরক্ষণে পা বাড়ালেন বাকিদের দিকে। একে একে সবার সাথে কথাবার্তা বলে পরিশেষে গেলেন আয়রার সন্নিকটে। গম্ভীর মুখো আয়রা কিছু একটা লিখছে খাতার মসৃণ পৃষ্ঠে। প্রফেসর লুইস সময় নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।আয়রার লেখা শেষ হতেই গলা খাঁকারি দিয়ে বলে ওঠেন,
“ আয়রা! তোমার প্রিপারেশন কেমন? কী মনে হয়,এবারেও আমরা জিতব?”
আয়রা চোখ তুললো প্রফেসরের দিকে। মুহুর্তখানেক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হুট করেই বাঁকা হাসলো রহস্যময়ী মানবী। ঘাড়টা খানিক এদিক ওদিক নাড়িয়ে, গলায় ভীষণ গাম্ভীর্যের ছাপ ফুটিয়ে বলল,
“ আয়রা কখনো হারতে শিখেনি প্রফেসর! যত যাইহোক, এবারের ট্রফিও আমাদের হবে!এন্ড দিস ইজ মাই ওয়ার্ড।”
আয়রার এহেন কথায় বাকিরা মুচকি হাসলেও কপালের চামড়ায় ভাজঁ পড়লো অ্যাইডেনের।ছেলেটার চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তির আভাস! কিন্তু সেটা কেনো? কে জানে!

বিইউ টার্মিনালের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে বোস্টন ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট বাস। বাস থেকে একে একে নামছে সবাই। প্রত্যেকের কাঁধে নিজস্ব সরঞ্জামাদির ব্যাগ। আয়রা হাঁটছে নোয়ার সাথে। হাটার মাঝেই ফোন ঘাটছে ব্যস্ত ভঙ্গিমায়।এদিকে নোয়া ভীষণ নার্ভাস। হাত-পা রীতিমতো ঘামছে মেয়েটার।কেন যেন প্রেজেন্টেশনের নাম শুনলেই নার্ভাস হয়ে যায় আয়রার সাথে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটতে গিয়েও ব্যাপক বেগ পোহাতে হচ্ছে তার। কিছুটা পথ এগোতেই থামলো মেয়েটা।জুতার লেইস খুলে গিয়েছে তার। তা বাঁধতেই উবু হয়ে বসেছে মেয়েটা। আয়রাও থামালো পায়ের গতি। পেছনে ঘুরে এসে দাঁড়ালো নোয়ার কিছুটা কাছাকাছি। একহাত মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আলতো হেসে বলল,

“ উঠে পড়ো কুইকলি!”
নোয়া কৃতজ্ঞ হাসলো।চটপট জুতার লেইস লাগিয়ে, আয়রার বাড়িয়ে রাখা হাতটা চেপে ধরলো শক্ত করে। অতঃপর সটান হয়ে দাঁড়িয়ে, অস্থির গলায় বলতে লাগলো,
“ আরু! আমার খুব ভয় হচ্ছে! আমি জাজেসদের সামনে সবটা ঠিকমতো বলতে পারবো তো?”
আয়রা স্মিত হাসলো। হাতের ফোনটায় স্থির দৃষ্টি কায়েম রেখে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“ এতো চিন্তা কিসের? আমি আছি না?তুমি জাস্ট চিল করো।”
এহেন কথায় নোয়ার মুখাবয়ব থেকে তৎক্ষনাৎ সরে গেলো তার সকল অস্থিরতা। পরমুহুর্তেই সেথায় দেখা মিললো এক অদ্ভুত কৃতজ্ঞতার। নোয়া আপ্লুত হয়ে আয়রার ডান বাহু চেপে ধরতেই, পুরো শরীর ঝাঁকিয়ে ওঠে আয়রার। সে তৎক্ষনাৎ নোয়ার হাত থেকে নিজের বাহুটা ছাড়িয়ে নেয় ঝটকা দিয়ে।দু-কদম সরে গিয়ে তর্জনী উঁচিয়ে, মুখাবয়ব যথেষ্ট গম্ভীর রেখে শক্ত গলায় বলে,

“ ডোন্ট টাচ মি নোয়া! আমার গায়ে আমি কারো হুটহাট স্পর্শ সহ্য করতে পারিনা।”
হতভম্ব বনে গেলো নোয়া।স্ট্রেঞ্জ! সামান্য হাত ধরাতে কেউ এতোটা রিয়েক্ট করে? তাছাড়া সে-তো ছেলে নয়,তাতেও এতো সমস্যা? আয়রা চলে গিয়েছে ইতোমধ্যে। অথচ পেছনে হতভম্বের ন্যায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে নোয়া।ভাবছে, মেয়েটা এমন কেন? সবার থেকে একটু অদ্ভুত টাইপ!

মেঘের ওপর পাড়ি জমিয়েছে প্লেন। উড়ছে ব্যাপক দ্রুত। প্যান্থার টিম মেম্বারস বসে আছে নিজেদের আসনে।উইনডো সিটে বসে আছে আয়রা, ঘাঁটছে নিজের ফাইলগুলো। তার পাশের সিটেই কাঁদো কাঁদো মুখে বসে আছে আমিরা। ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে নিঃশব্দে কাঁদছে মেয়েটা! ক্ষনে ক্ষনে টানছে সরু নাক। পাশ থেকে আয়রা কেমন ভ্রু গোটায় সে শব্দে। ঘাড় বাকিয়ে তাকায় আমিরার পানে।আয়রা আবার যেচে পড়ে কারো ব্যাক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাতে পছন্দ করে না।তবে বেশ কিছুক্ষণ ধরে আমিরাকে এভাবে কাঁদতে দেখে আয়রা খানিকটা চিন্তিত হলো যেন।সে মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে বলে ওঠে,

“ হোয়াট হ্যাপেন্ড আমিরা? ইজ দেয়ার এনি প্রবলেম?”
আমিরা নাক টানছে। হাতের টিস্যুতে নাক মুছে ছলছল চোখজোড়া তাক করলো আয়রার দিকে। সময় নিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলতে লাগলো,
“ মাই বয়ফ্রেন্ড এগেইন চিটেড অন মি আরু! লাস্ট নাইট দেট ফা*কিং স্কাউন্ড্রেল স্লেপ্ট উইথ এন এনাদার বিচ!”
কথাটা শোনামাত্র আয়রার কেন যেন খুব হাসতে ইচ্ছে করছে। তবুও সৌজন্য রক্ষার্থে মেয়েটা কী সুন্দর ভাব ধরে রইল। সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ ব্যস! এটুকুর জন্যই কাঁদছ?”
এহেন বাক্যে কান্না ফেলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো আমিরা। বিষয়টা কী খুব ছোট? আয়রা কি করে এতো লাইটলি নিয়ে নিলো ব্যাপারটা? আমিরার মনঃক্ষুণ্ন হলো এহেন বিহেভিয়ারে।সে নাক ফুলিয়ে অন্যত্র তাকায়।মোটা কন্ঠে বলে,

“ তুমি বুঝলে না আমার কষ্টটা আরু।বুঝলে হয়তো এতো লাইটলি নিতে না ব্যাপারটা।”
আয়রা ঠোঁটের ওপর আঙুল তুলে চুপ করে আছে। কিয়তক্ষন পেরুতেই সে কেমন ক্ষুদ্র নিশ্বাস ফেলে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,
“ যে পুরুষের গায়ে হাজারো নারীর স্পর্শ লেপ্টে থাকে,সে পুরুষের মনে কখনো এক নারী বসবাস করতে পারেনা।এন্ড ইট’স লাউড এন্ড ক্লিয়ার! তুমি বললে তুমি না-কি এগেইন চিটেড।তারমানে এর আগেও সে-ই বাস্টার্ড তোমাকে চিট করেছে। তা জানা স্বত্বেও তুমি কেনো ক্ষমা করলে তাকে? কেনো দিতে গেলে দ্বিতীয় সুযোগ?”
আমিরা সিক্ত নয়নে ঘাড় বাকিয়ে চাইলো। কাঁদতে কাঁদতে কথা বলা দায় মেয়েটার জন্য! তবুও বহুকষ্টে সে কেমন থেমে থেমে বলল,

“ ওর মিষ্টি কথায় ভুলে গিয়েছিলাম আরু। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমি ওকে খুব ভালোবাসি তাই দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছিলাম।”
এপর্যায়ে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টানলো আয়রা। তাচ্ছিল্যের সুরে বলে ওঠে,
“ ড্যাম!দ্বিতীয় সুযোগ এন্ড অল দিস ফা*কিং বুলশিট, এসব কিছুই এ জগতে এক্সিস্ট করেনা মেয়ে। যা এক্সিস্ট করে তা শুধু লোক দেখানো বুলশিট!অলওয়েজ রিমেম্বার, সাত ঘাটের পানি খাওয়া ব্যাক্তি কখনো এক ঘাটে নৌকা ভিড়ায়না।”
কথাটা বলেই আয়রা ফের মগ্ন হলো নিজের ফাইলের ভাঁজে। এদিকে আমিরা হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে রইলো শুধু।আয়রা মেয়েটা কী গভীর কথা বলে! এ বয়সেই এতো শক্ত হলো কী করে মেয়েটা?

ঘন্টা খানেক আগে প্ল্যান ল্যান্ড হয়েছে কানাডার মাটিতে। সিকিউরিটি চেকিং হতে শুরু করে, ব্যাগ-প্যাক চেকিং অব্দি সবটা শেষ হলো মাত্র। প্রতিটি স্টুডেন্ট যে যার মতো লাগেজ নিয়ে বের হচ্ছে এক্সিট দিয়ে। এক্সিটের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা স্টুডেন্ট বাস।স্টুডেন্টরা গিয়ে বসছে সেথায়।কিন্তু অ্যাইডেন এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এক্সিটের বাইরে। এদিক ওদিক সর্তক দৃষ্টি ফেলে হন্যে হয়ে খুঁজছে কাউকে। তবে কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তির কোনো দেখা নেই আপাতত। অ্যাইডেন কব্জি উল্টে ঘড়ির দিকে তাকায়।চেকিং শেষে এখান অব্ধি আসতে তো এতক্ষণ লাগার কথা নয়! তাহলে মেয়েটা আসছেনা কেনো? অ্যাইডেনের অপেক্ষা চলমান। ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে দু-হাত একত্রে ডলছে ছেলেটা। বোস্টনের তুলনায় কানাডায় ব্যাপক ঠান্ডা! গায়ে মোটা জ্যাকেট থাকা স্বত্বেও কেমন হাড়গোড় কাঁপছে তার। অ্যাইডেন বিরক্ত ভঙ্গিতে হচ্ছে এবার। এতক্ষণ লাগে মেয়েটার আসতে?

সময় যখন মিনিট পাঁচেক পেরুলো ঠিক তখনি এক্সিটের স্বচ্ছ কাচের তৈরী দেয়ালের ওপাশে দেখা গেলো আয়রাকে। গায়ে ঘিয়ে রঙা মিডিয়াম সাইজ কুর্তি, সাথে কালো রঙের ল্যাডিস প্যান্ট। মাথায় বাঁধা কালো রঙা শিফন হিজাব। গায়ে জড়ানো ব্ল্যাক কফি কালারের ওভারকোট। চোখে আটাঁ কমলা রঙের রোদচশমা। পায়ে YSL এর হিল জুতোর ঠকঠক শব্দ তুলে ভীষণ গাম্ভীর্যের সঙ্গে এগিয়ে আসছেন সুন্দরী। একহাতে লাগেজ ধরে রাখা, আরেক হাতে ধরে রাখা কফি। তার দুপাশে যথেষ্ট দুরত্ব রেখে এগিয়ে আসছে রিয়াদ আর আয়ান। আয়ানও তো সাইকোলজির স্টুডেন্ট। সে কম্পিটিশনে এলেও রিয়াদ এসেছে ঘুরতে! বাকি দুজন, আরোহী এবং স্নিগ্ধা আসতে পারেনি কারণ তাদের ডিপার্ট্মেন্টের পরিক্ষা চলছে।

অ্যাইডেন আয়রাকে দেখতে পেয়েই নড়েচড়ে দাঁড়ালো। আয়রা এক্সিট দিয়ে বের হতেই ছেলেটা কেমন পথ আঁটকে দাঁড়ায়! আয়রা ভ্রু কুঁচকায় তা দেখে। লাগেজের ওপর থেকে হাত সরিয়ে এনে চোখের ওপর থেকে চশমাটা খুলে নিলো আলগোছে। অতঃপর গম্ভীর কন্ঠে অ্যাইডেনকে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কী সমস্যা? পথ আঁটকালে কেনো?”
অ্যাইডেন তৎক্ষনাৎ জিভে দাঁত কাটে। পথ থেকে সরে গিয়ে আলতো হেসে বলে,
“ উপস সরি! আসলে আমি তোমার জন্য ওয়েট করছিলাম অনেক্ক্ষণ যাবত।”
আয়রার পা বাড়ায় সামনের দিকে। হাঁটতে হাঁটতেই ভ্রুক্ষেপহীন ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কোন দুঃখে শুনি?”
মেয়েটার এহেন কথায় থতমত খেয়ে বসলো অ্যাইডেন। খানিক আমতা আমতা করে বলে,

“ না মানে..এমনিতেই!”
ছেলেটার আমতা আমতা দেখে বাঁকা হাসলো আয়রা। বাসের কাছে এগিয়ে এসে একবার ঘাড় বাকিয়ে তাকায় অ্যাইডেনের দিকে। রহস্যময়ী রহস্যজনকভাবে অদ্ভুত হেসে শান্ত কন্ঠে বলে ওঠে,
“ আমার সামান্য একটা কথাতেই এমন আমতাআমতা করা শুরু করে দিলে? তাহলে প্রেজেন্টেশন দিবে কীভাবে কিডো? না-কি ইচ্ছে আছে ইচ্ছাকৃতভাবে হেরে যাবার?”
ভেতরের খবর সামান্য আচঁ পেয়ে যাওয়ায় অ্যাইডেনের মুখটা হয়েছে চোর ধরা পড়ার ন্যায়! ছেলেটা কেমন কাচুমাচু করতে লাগলো! অবস্থা বেগতিক দেখে নিজেই আগেভাগে গিয়ে উঠলো বাসে।এদিকে তার চলে যাওয়ার পর আয়ান হঠাৎ গম্ভীর হলো। গম্ভীর কন্ঠে আয়রাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ আই থিংক, অ্যাইডেন কিছু একটা করবে আয়রা।”
প্রতিত্তোরে আয়রা আবারও মুচকি হাসলো। বাসের সিঁড়িতে পা ফেলে বলতে লাগলো,
“ যা মন চায় করুক! সাধ্য থাকলে আমায় জেতা থেকে আঁটকে দেখাক!”
মেয়েটার এমন কনফিডেন্সে বরাবরের ন্যায় মুগ্ধ আয়ান এবং রিয়াদ।আয়রা বাসে উঠতেই তারাও উঠল পিছু পিছু।

বেস্ট ওয়েস্টার্ন প্লাস সিটি হোটেল,Ottawa. হোটেলের সামনে এসে মাত্রই থামলো বোস্টন ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট বাস। ধীরে ধীরে বাস থেকে নেমে আসে পুরো টিম। চারিদিকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামি-দামি গ্রুপ। প্যান্থার গ্রুপের সদস্যরা হোটেলের মূল দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে তড়িঘড়ি করে ছুটে এলেন প্রতিযোগিতার অ্যাকমডেশন চিফ — জন ওয়েবার। গতবারের বিজয়ী দলকে অভ্যর্থনা না জানালে কী আর হয়? জন হাসিমুখে এগিয়ে আসেন আয়রার দিকে।শত হলেও টিমের লিড মেজর সে।এটুকু অভ্যর্থনা তো বটেই তারজন্য।জন হাতের ফুলের তোড়াটা আয়রার দিকে এগিয়ে ধরতেই পাশ থেকে অ্যাইডেন এসে খপ করে টেনে নিলো সেটা। এহেন কান্ডে হতবাক বনে গেলেন জন।নিজের কো স্টাফদের সাথে এক-আধবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন ভদ্রলোক। এদিকে অ্যাইডেন কেমন স্মিত হাসি টেনে একহাত বাড়িয়ে বলে ওঠে,

“ নাইস টু মিট ইউ মিস্টার জন!”
জন জোরপূর্বক হাসলেন একটুখানি। ইচ্ছে না থাকা স্বত্তেও অ্যাইডেনের বাড়িয়ে রাখা হাতে হাত মিলালেন আলতো করে। সৌজন্য রক্ষার্থে একই সুরে বললেন,
“ ইয়াহ! সেম হিয়ার।”
বলেই তিনি দৃষ্টি ফেললেন আয়রার ওপর। হাসিমুখে ব্যাপক সম্মানের সঙ্গে বললেন,
“ চলুন মিস! আপনাদের রুমগুলো দেখিয়ে দেই।”
আয়রা সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়। লাগেজ ধরেই এগিয়ে যায় জনের পিছুপিছু। হাঁটতে হাঁটতেই জন সকলকে মনে করিয়ে দেন,
“টিম মেজরস! ঠিক দুপুর ২টোর সময় আপনাদেরকে ভার্সিটি ক্যাম্পাসে যেতে হবে। প্রতিযোগিতার অথোরিটি, প্রতিটি ডিপার্ট্মেন্টের চিফ এমনকি দায়িত্বরত সকল স্পেশালিষ্টদের সাথে দেখা করিয়ে দেওয়া হবে আপনাদের। তাই সবাই প্রস্তুত থাকবেন।”

দুপুর ২টো। কার্লেটন ইউনিভার্সিটির বড় হলরুমে বসে আছে প্রায় ৪৫টি ইউনিভার্সিটি থেকে আসা বড় বড় গ্রুপ মেজরস। তন্মধ্যে বোস্টন ইউনিভার্সিটির প্যান্থার গ্রুপও এসেছে।আয়রা হলরুমের একদম কর্নারের সিটগুলোর একটিতে বসে আছে। মুখে মাস্ক পড়া তার।হুট করেই এলার্জির সমস্যা শুরু হয়েছে মেয়েটার।তারজন্যই তো এ হাল তার! হলরুমের একদম সামনের উঁচু স্টেজে দাঁড়িয়ে আছেন ৩জন ইন্টারন্যাশনাল এক্সপার্টস। স্পিকারে দাঁড়িয়ে আছেন অবসরপ্রাপ্ত কমিউনিস্ট এক্সপার্ট মিস সারাহ। তিনি সকল স্টুডেন্টদেরকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। সকল স্টুডেন্টদের মাঝে এক ভিন্ন উৎকন্ঠা। মিস সারাহ এবার স্মিত হেসে বলে ওঠেন,
“ ডিয়ার স্টুডেন্টস! ইতোমধ্যেই আপনারা আমাদের তিনজন ইন্টারন্যাশনাল এক্সপার্টদের সাথে পরিচিত হয়েছেন তবে…এখনো কিন্তু পরিচয় পর্ব শেষ হয়নি।”

থামলেন মিস। একবার পুরো হলরুমে চোখ বুলিয়ে পরক্ষণেই মুচকি হেসে বলে ওঠেন,
“ তাহলে বাকি পর্ব শুরু করা যাক।লেটস ওয়েলকাম আওয়ার অনারেবল এক্সপার্ট মিস্টার মেহমেত রায়ান। হু ইজ ইন্টারন্যাশনালি সার্টিফাইড এক্সপার্ট ইন সাইকোলজি!”
পিনপতন নীরবতা চলছে পুরো হলরুম জুড়ে। সকল শিক্ষার্থীর নজর আপাতত হলরুমের মাঝখানে। মিনিট খানেক পেরুতেই হল রুমের লাল গালিচায় পা রাখলেন এক শ্যামবরণ সুদর্শন যুবক। গায়ে ব্লু রঙা কোট-প্যান্ট।চোখে আটাঁ কালো চশমা।যুবক দু’হাত গুঁজে রেখেছেন নিজের প্যান্টের পকেটে। চুলগুলো স্পাইক করে রাখা। তিনি ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছেন লাল গালিচা দিয়ে। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর,গম্ভীর যুবক উঠে এলেন স্টেজের ওপর। একহাতে চোখ থেকে চশমাটা খুলে আনলেন হাতে। পুরো হলরুমে একবার নজর বুলিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। এদিকে বলিষ্ঠ দেহী এ যুবককে নিয়ে ইতোমধ্যেই কানাঘুঁষা পড়ে গিয়েছে মেয়ে স্টুডেন্টদের মাঝে। তবে যুবক নির্বিকার। মিস সারাহ মেহমেতকে অভ্যর্থনা জানিয়ে স্পিকারে বলেন,

“ ডিয়ার স্টুডেন্টস! আপনাদের মধ্যে যারা যারা সাইকোলজি ডিপার্ট্মেন্টের মেজর নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের প্রজেক্ট শোডাউন থেকে শুরু করে প্রজেক্ট সিলেক্ট অব্ধি সকল কাজের তত্ত্বাবধানে থাকবেন আমাদের সাইকোলজির এক্সপার্ট মিস্টার মেহমেত রায়ান। আপনাদের যেকোনো সমস্যা উনাকে এসে জানানোর অনুরোধ রইলো।”
সাইকোলজি ডিপার্ট্মেন্টের মেজর স্টুডেন্ট বাদে বাদবাকি মেয়েরা কেমন উদাস মুখে তাকিয়ে রইলো স্টেজের পানে।ইশশ্ তাদের ভাগ্যে ওমন বুড়ো বুড়ো এক্সপার্ট না জুটে এমন একজন হ্যান্ডসাম জুটলো না কেনো? আহারে! এ নিয়ে একেকজন মেয়ের সে-কি আহত ভাবসাব!
মিস সারাহ আবারও স্পিকারে মুখ রাখলেন। স্মিত হেসে বলতে লাগলেন,

“ সো ডিয়ার স্টুডেন্টস।আপনারা চারজন এক্সপার্ট পেয়ে গিয়েছেন কিন্তু একজন এখনো বাকি তাইতো? কিন্তু জানেন কী? আমাদের লাস্ট এক্সপার্ট কে হতে চলেছেন? এনি গেস?”
স্টুডেন্টদের মধ্য থেকে তেমন কোনো উত্তর আসেনি। প্রত্যেকেই একে-অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে শুধু। মিস সারাহ মুচকি হাসলেন।আবারও বলতে লাগলেন,
“ ওকে ওকে! আপনাদের আর কষ্ট করে বের করতে হবে না।আমি-ই বলে দিচ্ছি। তো শুনুন তাহলে,আমাদের লাস্ট এক্সপার্ট হচ্ছেন — দা ফেমাস আর্কিটেকচার অফ ইউএসএ,এবং আমাদের অনারেবল অথোরিটি লিডার। একইসাথে যিনি হচ্ছেন একজন দক্ষ স্কাল্পচারিস্ট।সো গায়েস,পুট ইউর হ্যান্ডস টুগেদার এন্ড গিভ আ বিগ রাউন্ড অফ এপ্লোজ টু ওয়েলকাম — মিস্টার এডওয়ার্ড জেহরান ড্যানিয়েল!”

নাম শোনামাত্রই প্রতিটি স্টুডেন্ট বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।শুধু এককোণে চুপচাপ বসে রইলো আয়রা।এদিকে দি ফেমাস আর্কিটেকচার জেডি স্যার আসছে এ যেন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো ব্যাপার। প্রত্যেকে নিজ নিজ ফোন বের করে ভিডিও করতে তৈরি। কিন্তু মিনিট পাঁচেক পেরুলেও কারো আসার কোনো খবর নেই। সকলের মাঝে যখন এক ভিন্ন উৎকন্ঠা ঠিক তখনি দলে দলে কয়েকজন বলিষ্ঠদেহী বডিগার্ড, হাতে স্নাইপার নিয়ে এসে দাঁড়ালেন গালিচার দু’ধারে। প্রত্যেকের গায়ে কালো রঙা পোশাক, হাতে স্নাইপার।চোখে আটাঁ কালো রঙা চশমা। যাদের দেখামাত্রই ভয়ে তটস্থ বাকিরা। সকলের উৎসুক দৃষ্টি এবার গিয়ে ঠেকলো হলরুমের দরজায়। মিনিট দুয়েক পরেই হলরুমের লাল গালিচায় পা রাখলেন একজন সুদর্শন পুরুষ।লম্বা,ফর্সা বর্ণের তীক্ষ্ম মুখাবয়ব। মাথার বাদামী রঙা ঘাড় সমান উলফ কাট দেওয়া চুলগুলো টেনে পেছন দিকে ঝুঁটি বেঁধে রাখা।

সুঠাম -বলিষ্ঠ গায়ের ওপর ঢিলে হয়ে পড়ে আছে কালো ট্রেঞ্চ কোট। যুবকের তীক্ষ্ম দৃষ্টি সানগ্লাসের আড়ালে আবদ্ধ! আর ঠোঁটের ভাজে শোভা পাচ্ছে জ্বলন্ত ভিনদেশী মোটা সিগারেট —কুটস নিকারাগুয়ান! যুবক ধীর পা ফেলে এগিয়ে আসছে গালিচা দিয়ে। তার সশস্ত্র বডিগার্ডরা মাথা নুইয়ে রেখেছে। তাদের সাধ্যি আছে মনিবের দিকে চোখ তুলে তাকানোর? যুবক রয়েসয়ে টান বসায় সিগারেটের শেষভাগে।সিগারেটের ধোঁয়াও বুঝি এই রহস্যময় মানবের ঠোঁটের কোণে ঘুরপাক খাচ্ছে রীতিমতো! স্টুডেন্টরা হাততালি দিবে কী? তারা উল্টো হা করে তাকিয়ে আছে জেডির পানে। মিস সারাহ আবারও স্পিকারে বলে ওঠেন,

Unpredictable part 6

“ স্টুডেন্টস! গিভ হিম আ বিগ রাউন্ড অফ এপ্লোজ প্লিজ!”
কথাটা শোনামাত্রই স্টুডেন্টরা সজোরে হাততালি দেওয়া শুরু করলো। তা শুনতেই জেডির পাদু’টো থমকালো।সে কেমন একহাতের তর্জনী উঁচিয়ে তুলে ঠোঁটের কোণে সিগারেট রেখেই ব্যাপক বিরক্তির সুরে বললো,
“হুশঁশ.. সাইলেন্স!আই জাস্ট হেট দিস ফা*কিং নয়েস!”

Unpredictable part 8