তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫০
জান্নাতি আক্তার জারা
আনাস আইরা দুজন নিত্যদিন একসঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়, আনাস অফিসের উদ্দেশ্য আইরা ভার্সিটির উদ্দেশ্যে, আনাস আইরা কে ভার্সিটি নামিয়ে দিয়ে অফিসে যায়, আজকেও প্রতিদের মতো দুজন একসঙ্গে বেরিয়ে গেলো, ডাইনিং টেবিলে মিম আহিন আরাত তিনজন খেতে বসেছে, যদিও তিনজনের মধ্যে তাকবীর সামিল ছিলো, তাকবীর যতক্ষণ ছিলো তিনজন শান্তশিষ্ট ব্যাক্তি হয়ে ছিলো, আজকাল মিম আর আগের মতো মন খোলাসা করে কথা বলে না, আরাত আহিন টুকিটাকি কথা বলছে আর নাস্তা করছে, তাঁদের নাস্তা করার মধ্যে দিয়ে আলভী এলো আহিন কে ডাকতে, আলভী আরাত আর মিম কে একসঙ্গে দেখে বলল,
___” মায়াবতী তুমি খেয়াল করেছো সাহসী রানী কিন্তু আগের মতো কথা বলে না।
আলভীর কথায় আহিন আরাত দুজনেই মিমের দিকে তাকালো, মিম চুপচাপ আলভীর কথা শুনছে, আরাত আলভীর কথায় বলল,
___” তুই এসেই মিমের কথা বললি কেনো, আমাকে ভুলে গেয়েছিস?
আলভী আরাতের কথায় বলল,
___” তোমার তো বিয়ে হয়ে গেছে, বিবাহিত মেয়েদের দিকে আমি নজর দেই না।
বিয়ের কথা শুনতেই মিমের কাশি উঠে গেলো, মিম নিজের মাথায় হাত দিয়ে বারি দিতে দিতে কাশতে লাগলো, আলভী দ্রুত জগ থেকে গ্লাসে পানি ধেলে
মিমের সামনে ধরে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
___” সাহসীরানী জলদি পানিটা খেয়ে নেও, নয়তো গলায় ভাত বেজে তুমি আমাকে বিধবা বানাবে!
আলভীর কথায় মিমের কাশি বন্ধ হয়ে গেলো, আরাত মিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” ঠিক আছিস?
মিম মাথা ঝেকে বলল, হুম বেটার।
আহিন হেঁসে আলভী কে বলল,
___” বলদ, বিধবা হয় মেয়েরা ছেলেরা না, আর তুই বড় হতে হতে মিম আপুর এতদিনে বিয়ে হয়ে যাবে দেখিস, যেমন তোর মায়াবতীর হয়েছে!
আহিনের কথায় আরাত রেগে গেলো, রাগী গলায় বলল,
___” কী তখন থেকে শুধু বিয়ে বিয়ে করছিস বলতো, তোদের স্কুলে লেট হচ্ছে না,তাড়াতাড়ি খাবার শেষ কর।
আহিন আরাতের ধমকে মুখ গোমড়া করে বলল,
___” আপু তুমি বদলে গেছো, আগের মতো ভন্ডামী করতে চাও না, রশ্মি আপুও তেমন খবর রাখো না, আপু যে এই বাড়িতে এখন কম আসে তুমি খেয়াল করেছো কখনো?
আরাতের কাছে আহিনের কথাটা মন্দ লাগলো না, রশ্মি এখন কম আসে তালুকদার বাড়িতে, কিন্তু আরাতের সেভাবে আর রশ্মির সঙ্গে সময় কাটানো হয় না, না হয় দেখা মন খুলে কথা বলা, আরাত রশ্মি কে লক্ষ করেছে, রশ্মির মনের মধ্যে কী চলছে রশ্মি প্রকাশ করছে না, আরাতের সঙ্গে শেয়ার পর্যন্ত করছে না, আগে তো দুজনের মধ্যে কোনো দূরত্ব ছিলো না, দু’জন কী করছে কী করবে সামনে কী করতে হবে অনায়াসে শেয়ার করতো, কিন্তু এখন শুধু কিন্তু থেকে যায়, আরাত নতুন জীবন নিয়ে ব্যস্ত রশ্মি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, দু’জন যে আলেদা প্রান, কিন্তু আগে একি প্রানে বসবাস করতো এমন ছিলো, সময় পাল্টায় দিন পাল্টায় তাঁর সঙ্গে সঙ্গে মানুষও বদলে যায়, তাকবীরের যেন রুটিন হয়ে গেছে আরাত কে কলেজে পৌঁছে দেওয়া, আরাতের সঙ্গে রশ্মি মিম তো আছে, তাকবীরের এতে খারাপ লাগে না, সবার অগোচর আরাত কে চুপিচুপি দেখা, রশ্মি মিমের চোখের আড়ালে খুটিনাটি দুষ্টুমি করা, এগুলো মধ্যে আলেদা একটা শান্তি পাওয়া যায়, অনুভূতি টা এমন সবার আড়ালে লুকিয়ে নিজের বউয়ের সঙ্গে খুনসুটি, কলেজের সামনে গাড়ি এসে থামতেই রশ্মি মিম নেমে যায়, আজকে আর তাকবীর আরাতের হাত ধরে রাখে নি, আরাত নিজে থেকে বসে আছে, তাকবীর স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে সামনে দেখছে,তাকবীরের নিরবতা কিছু একটা ইঙ্গিত করছে, আরাত মুচকি হেঁসে আজকে নিজে থেকে তাকবীরের কাছে এলো, তাকবীর এখনো সামনের দিকে দেখছে, আরাত হুট করে নেকাব টা উপরে তুলে তাকবিরের গালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে তাড়াহুড়ায় গাড়ি থেকে নামতে নিলো, এতক্ষণে তাকবীর আরাতের হাত টেনে ধরলো, যেন তাকবীর আরাতের চুমুর অপেক্ষা করছিলো এতক্ষণ, তাকবীর হাত ধরাতে আরাত লজ্জা পেলো, তাকবীরের থেকে পালাতে চাইলো, তাকবীর গম্ভীর গলায় বলল,
___” কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়, তুমি তো দিয়েছো তুমি নিবে না?
কথাটা বলে তাকবীর আরাত কে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে, কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো,
___” এরভিতরে সীমাবদ্ধ থাক, বাকি টুকু অন্য সময়।
তাকবীর আরাতের হাত ছেড়ে দিলো, আরাত হাত ছাড়া পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল,
___” দিনদিনে আপনি বদলে যাচ্ছেন।
কথাটা বলে আরাত গাড়ি থেকে নামলো, তাকবীর মুচকি হেঁসে বলল,
___” শুধু তোমার কারণে।
আরাত কিছু বলল না, গাড়ি থেকে নেমে যেতে নিয়ে পিছনে তাকালো, তাকবীর এখনো আরাতের দিকে চেয়ে আছে, আরাত হাত উঁচিয়ে বিদায় জানালো তাকবীর আল্লাহ হাফেজ বলে আরাত কে কলেজে প্রবেশ করতে বলে, আরাত কলেজে প্রবেশ করে দেখলো মিম রশ্মি চলে গেছে, আরাত সোজা ক্লাস রুমের দিকে পা বাড়ালো, আজকে মিম বেশ অবাক হলো, কলেজে আসার পর থেকে আরশ একবারো চোখের সামনে পড়ে নি, মিম ব্যাপারটা মাথায় থেকে ঝেড়ে ফেলে ক্লাসে মনযোগ দিলো, একটা ক্লাস হয়ে গেলো দুইটা ক্লাস চলমান, ঠিক তখনই আরশ দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,
___” মেই আই কাম ইন স্যার?
ক্লাসের সবার নজর দরজায় দিকে গেলো, স্যার আরশ কে ভিতরে আসতে বললে আরশ ক্লাসে প্রবেশ করে, মিম যেন আরশ কে চেনে না স্বাভাবিক ভাবে নিজের বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে আছে, রশ্মিরাত একবার মিম কে দেখে পুনরায় আরশের দিকে তাকালো, আরশের নজর মিমের দিকে, আরশ মিমের দিকে চেয়ে থেকেই স্যার কে বলল,
___” মিম কে দশমিনিটের জন্য চাই স্যার!
স্যার অবাক হয়ে বলল,
___” তোমরা কী আগে থেকে পরিচিত?
স্যারের কথায় ক্লাসের অন্য মেয়ে মিম কে তাচ্ছিল্য করে বলল,
___” শুধু পরিচিত না স্যার, এই মেয়ে আরশ ভাইয়া কে ফাঁসিয়ে বিয়ে করছে।
মেয়েটার কথায় মিমের চোখে পানি এসে জমা হলো, মাথা নিচু দেখে কারো নজরে এলো না, মেয়েটার কথায় আরশ কেনো প্রতিবাত করলো না স্যার কিছুটা বিভ্রান্তবোধ করলো এতে, মেয়েটা কে ধমক দিয়ে বলল,
___”মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ, কোথায় কী বলতে হয় জানো না?
স্যারের দমকে মেয়েটা লজ্জা পেলো, চুপচাপ মাথা নিচু করে নিলো, আরাত তো পারছে না শুধু মেয়েটা কে থাপ্পড় লাগাতে, আরশ পুনরায় বলে উঠলো,
___” স্যার আমি কী নিয়ে যেতে পারি?
___” হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই।
মিম বসা থেকে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে গেলো, আরশ এখনো মিমের দিকে তাকিয়ে আছে, মিম একনজর রশ্মিরাতের দিকে তাকিয়ে হনহন করে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলো, মিম কে বেরোতে দেখে আরশ পিছনে পিছনে চলে গেলো, আরাতের আর ক্লাসে মন বসলো না, শুধু মন খজখজ করছে মিম কোথায় গেলো জানার জন্য, মিম হনহন করে মাঠে চলে এলো ক্লাস চলছে জন্য মাঠ পুরো ফাঁকা, আরশ মিম কে মাঠে দাঁড়াতে দেখে আরশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
___” ভাইয়ার সঙ্গে তোমার কী কথা হয়েছিল?
মিম মুখ অন্ধকার করে বলল,
___” আপনার ভাইয়া কে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন।
আরশ মিমের ত্যাড়া কথা রেগে গেলো, তাঁদের মাঠের মধ্যে অবস্থান দেখে আরশ স্বাভাবিক থাকতে চাইছিল, কিন্তু মিমের ত্যাড়া উওরে আর স্বাভাবিক থাকতে পারলো না, রাগী গলায় বলল,
___” ভাইয়া কে কী এমন জাদু করছিস যার জন্য একদিন দেখা করে বাড়ি ফিরে বিয়েতে রাজি হয়ে গেলো ?
মিম আরশ কে আরো রাগাতে বলল,
___” আপনার ভাইয়ের সুন্দর একটা চোখ আছে, যা আপনার মতো অহংকারীর নেই, জাদু করি নাই আপনার ভাই তাঁর সুন্দর চোখ দিয়ে দেখছে এজন্য রাজি হয়ে গেছে।
আরশ আরো তেতে উঠলো, মিমের একহাত চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
___” দেখ তুই ভু়লে গেছিস, আমার ভাই সম্পর্কে তোর ভাসুর হয়, ভাসুর মানে জানিস তো বড় ভাই, তোর মতো নোংরা মেয়ে আমি আমার লাইফে ফার্স্ট দেখছি, ভাসুরের সঙ্গে আলেদা কথা বলতে লজ্জা করে না তো?
মিম আরশের মতো করো রেগে বলল,
___” কিসের ভাসুর, কোন সম্পর্কের কথা বলছেন আপনি হ্যাঁ, আমাদের মধ্যে কোন সম্পর্ক আছে, আপনি এই বিয়ে মানেন না আমিও মানি না, তাহলে কিসের বিয়ে আর কিসের ভাসুর কিসের অধিকার, আমাদের মধ্যে কিছু নেই যা ছিলো শুধু মাএ আপনার নিষ্ঠুরপোনা আপনি একটা বাজে ছেলে, আপনি একটা নির্দয় ছেলে, আর আমরা কখনো এক হবো না আমাদের সমাপ্ত এখানেই।
মিম আরশের উপর চিল্লে চিল্লে কথা গুলো বলে থামলো, মনের ক্ষোভ যাচ্ছে না মনে হচ্ছে সামনের মানুষ টা এলোপাতাড়ি থাপ্পড় দিতে পারলে শান্তি লাগতো, কিন্তু তা তো সম্ভব না, মিমের লাস্টে বলা কথাটা আরশের বুকে এসে লাগলো, আমাদের সমাপ্ত এখানেই, আরশ নিজের অজান্তে অসহায় হয়ে পরলো, মনে হচ্ছে কোথাও একটা খুব প্রিয় কিছু ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে, আরশ মলিন মুখে বলে উঠলো,
___” কিন্তু আমি তো শুনেছিলাম সমাপ্ত থেকেই নতুন করে জীবন শুরু হয়?
আরশের কথায় মিম কিছুটা শান্ত হলো, কিন্তু মন থেকে আরশের প্রতি রাগ টা যাচ্ছে না, মিম আরশের কথায় পুনরায় বলল,
___” হ্যাঁ সমাপ্ত থেকে নতুন জীবন শুরু হয়, কিন্তু জীবন টাকে সমাপ্ত করা মানুষ গুলোর প্রতি কখনো ঘেন্না ছাড়া বিশ্বাস ফিরে আসে না।
কথাটা বলে মিম পিছু না ফিরে ওয়াশরুমের দিকে দৌড়ে চলে গেলো, আরশ অসহায় হয়ে মিমের চলে যাওয়া দেখলো, মিম ওয়াশরুমে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ নীঝরে কান্না করলো, জীবন তাকে কোথায় নিয়ে এসেছে আজ, যে পারছে অপমান করছে মানুষের অপমানের ভয়ে ভয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে, এমন জীবন তো সে চায়নি, মিম কিছুক্ষণ একা একা ওয়াশরুমে কান্না করলো, আজকাল অল্প কথাতেই কান্না চলে আসে, মিম ছিলো না এমন মিম ছিলো স্টং এক মেয়ে, অথচ এখন কথায় কথায় সবার আড়ালে কান্না করছে, নিজেকে শক্ত করতে চাইছে কিন্তু পাচ্ছে না আগের মিম হারিয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন,
হানিফের ফোনে কিছুক্ষণ পরপর মেসেজের টুংটাং শব্দে আরশ রাতের ডিনার করতে করতে সন্ধিহান চোখে বড় ভাই কে দেখছে,হানিফ খেতে খেতে বা-হাতে ফোন টাইপিং করছে,হানিফের ফোনে পুনরায় মেসেজ আসায় হানিফ দ্রুত খাবার শেষ করে ফোন টেবিলের উপর রেখে হাত ধুতে বেসিংএ গেলো, আরশ হানিফ কে বেসিংএ যেতে দেখে আশেপাশে বাবা-মার দিকে তাকালো, বাবা-মা কে খেতে খেতে নিজেদের মধ্যে গল্প করতে দেখে আরশ হালকা বাঁকা হয়ে বা-হাতে হানিফের ফোন চেক করতে লাগলো, ফোনের ওয়ালপেপারে মিমের নামটা জলজল করছে আরশ হানিফের পায়ের আওয়াজে ফোন আগের জায়গায় রেখে দিয়ে নিজে ঠিকঠাক হয়ে বসল, হানিফ এসে আঁড়চোখে আরশ কে দেখে ফোন হাতে নিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো, হানিফ কে চলে যেতে দেখে আরশ তাড়াহুড়ায় চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায় হাত ধুয়ার জন্য, আরশের মা আরশ কে খাবার শেষ না করে উঠতে দেখে বললেন,
___” খাবার শেষ না করে উঠছ কেনো ?
আরশ এঁটো হাত হালকা উঁচু করে বেসিংঙ্গের দিকে যেতে যেতে মায়ের কথায় উওর করলো,
___” পেট ভরে গেছে।
আরশ হাত ধুয়ে দ্রুত পায়ে সিড়ি বেয়ে দোতালায় উঠে চুপিচুপি পায়ে হানিফের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো, রুমের ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ শুনতে না পেয়ে আরশ গমগম পায়ে দ্রুত নিজের রুমে এসে রুমের বেলকনিতে এলো, হানিফের বেলকনি আর আরশের বেলকনি পাশাপাশি শুধু মাঝখানে দূরত্ব হয়ে দাঁড়াছে কাঁচের থাই, আরশের চোখ সামনে রাস্তায় থাকলেও আরশের পুরো মস্তিষ্ক সজাগ পাশের বেলকনিতে কী কথা হচ্ছে জানার জন্য, কিন্তু বেচারা হাজার চেষ্টা করেও ফিসফিস আওয়াজ ছাড়া কিছুই শুনতে পাচ্ছে না,রাগ লাগলো এতে মিমের পাশাপাশি নিজের বড় ভাইয়ের উপর রাগ লাগলো, বিরক্ত মুখে কয়েকটা গালিও দিলো, হানিফ কথা বলতে বলতে আঁড়চোখে নিজের ছোট ভাইয়ের বেলকনিতে তাকাচ্ছে, আরশ অনেকক্ষণ যাবত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে উঁচু গলায় হাসিফের উদ্দেশ্য চেচিয়ে উঠলো,
___” মা-বাবার সামনে ভদ্র সেজে থাকলে-ও তুমি একজন লির্জ্জজ ছেলে।
হানিফ হটাৎ আরশের এমন কথায় ভেবাচেকা খেয়ে গেলো, আরশ কথাটা বলে বেলকনিতে আর দাঁড়ালো না সোজা নিজের রুমে ডুকে গেলো, হানিফ কান থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে আরশ কে বলল,
___” এই কী বললি আমি নির্লজ্জ , নির্লজ্জ হলাম কিভাবে বলে যা, কই যাস আমার কথার উত্তর না দিয়ে?
আরশ রুমে ঢুকে বিরক্ত মুখে বেলকনির দরজা শব্দ করে বন্ধ করে দিলো, দু-হাতের দ্বারা মাথার চুলগুলো টেনে ধরে সোফাতে বসে পরলো, ভালো লাগছে না কিছু, মাথার চুল টানতে টানতে রাগের মাথায় দাঁতে দাঁত চেপে সামনে টি-টেবিলের উপর থেকে কাঁচের পানির জগটা ছিটকে মেঝেতে ফেলে দিলো, নিমেষেই কাঁচের জগটা শব্দ করে ভেঙ্গে কাঁচের টুকরো গুলো পুরো মেঝেতে ছিটকে গেলো,আরশ পুনরায় মাথার চুলগুলো টানতে টানতে রাগে বিরবির করছে,
___” দুটোই নির্লজ্জ, বড় ভাই হয়ে লজ্জা করে না ছোট ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে প্রেমআলাপ করতে, আর মহারানী ছোট হতে পারে উনার তেজ তো পুরো রাজ্যর সমান,ক্যারেক্টারলেস মেয়ে একটা আহহহ ।
আরশ চুল টেনে ধরে চিৎকার করছে,সাউন্ডপ্রুফ রুম হওয়ায় আরশের চিৎকার রুমের বাহিরে গেলো না, আরশের জানা নেই কী কারণে সে রাগ করছে, মিম কে সে ইচ্ছা করে বিয়ে করেনি, মিম কে শুধু ফাঁসাতে চেয়েছিলো, সমাজের চোখে কলঙ্ক করতে চেয়েছিলো বিয়ে করা প্লানের মধ্যে ছিলো না, বড় ভাইয়ের জন্য গ্রামে মেয়ে দেখতে গিয়ে যখন দেখতে পারে মেয়েটা মিম, তখনই ডিসাইড করে নেয় হানিফের সঙ্গে মিমের বিয়ে হতে দিবে না, মিমের প্রতি একটা দুর্বলতা প্রথম থেকেই ছিলো, কিন্তু মিম তাঁর মায়ের মতো লোভী মেয়ে হবে এমন ভুল ধারণা থেকে আরশ মিম কে ইগনোর করেছে, যাকে পছন্দ করতো সেই মেয়েকেই আবার বড় ভাইয়ের পাশে দেখবে, সারাদিন নিজের সামনে ঘুরঘুর করবে, এটা তো মেনে নিতে পারবে না, হানিফের সঙ্গে বিয়ের কথা চলতে ছিল,হানিফ আরশ না মানলেও আরশের বাবা মা মিম কে পছন্দ করেছে, উনারা মিম কেই ঘরে তুলবেন, হানিফ নির্ধারিত একজন ভদ্র ছেলে, বাবামায়ের মুখের উপর কথা বলতে পারে না,
তাইতো ছোট্ট ভাইয়ের কাছে এসে বারবার ছোট ভাই কে বলল,তুই এই বিয়ে ভেঙ্গে দে, মা-বাবা কে বুঝা আমি এই বিয়ে করবো না, আরশ বড়ভাইয়ের মনের খবর পেয়ে খুশি হয়ে যায়, বিয়ে ভাঙ্গার সব দায়িত্ব সে নিয়ে নেয় যে ভাবেই হোক সে এই বিয়ে হতে দিবে না, কিন্তু বিপত্তি বেজে মিম কে নিজেদের ভার্সিটিতে দেখে, আরশের ধারনা মিম শহরে এসেছে হানিফ কে ফাঁসাতে, ওইদিন মিম কে একা একা ক্যাম্পাসে কাউকে খুজতে দেখে সকালে হানিফের বলা কথা মনে পড়ে যায়, রুপোলী বেগম ফোন করে বলেছেন মিম কে নিয়ে লং ড্রাইভে বের হতে, আরশের মা রুপোলী বেগমের কথা শুনে খুশি মনে হানিফ কে কলেজে আসতে বলে, কথাটা মনে পরার সঙ্গে সঙ্গে আরশের ওইদিন হটাৎ মিম কে দেখে মাথা গরম হয়ে গেয়েছিল, তাই তো আরশ আগেপিছে না ভেবে ক্যাম্পাস থেকে মিম কে টানতে টানতে ফাঁকা ক্লাস রুমে এনেছিলো,
কিন্তু মিমের সাহস মিমের তেজ আরশ কে আরো রেগে তুলেছিলো, আরশের মুখের উপর একটা গ্রামের আনস্মার্ট খ্যাত মেয়ে হয়ে তেজ দেখাচ্ছে এটা আরশ মেনে নিতে পারেনি, আরশের জিদ ধরে মনে, মিমের তেজ ভেঙ্গে দিবে, মিম কষ্ট দিবে,যখন ক্লাসের বাহিরে থেকে পায়ের শব্দ কানে পরে, আরশের মনের মধ্যে চলল নিকৃষ্ট রাগ যা দুজনের জন্য ছিলো খতিকারক, মিম কে কলঙ্ক করতে চাইলো, কলঙ্ক হয়ে গেলো মিম ভেঙ্গে পরবে, কষ্ট পাবে মিমের কষ্ট কান্নাভেজা আকুতি আরশ কে পৈশাচিক আনন্দ দিবে, তাইতো আরশ সামনে কী হবে না ভেবে মিম কে সবার সামনে কলঙ্কিত করলো,যদিও মিম এখনো পবিত্র এটা তো শুধু আরশ যানে, বাকিরা তো জানে না, কিন্তু পর মুহূর্তে তাসিনের বাড়াবাড়ি আরশ নিজের নিকৃষ্ট প্লান বদলায়, মিম তো কলঙ্কিত হয়ে গেছে এই কথাটা কলেজে ছড়িয়ে পরতে বেশি সময় লাগবে না,আবার কলঙ্কিত মেয়েকে বিয়ে করে ডিভোর্স দিয়ে দিলে একসঙ্গে দুটো কাজ হবে, এক নিজের বড়ভাইয়ের সঙ্গে মিমের বিয়ে ভেঙ্গে যাবে দুই মিমের তেজ জিদ সাহস সবকিছু ধোলাই মিশে যাবে, আরশ নিজের ইচ্ছার বাহিরে মিম কে বিয়ে করে, কিন্তু বিয়ে করার পর ডিভোর্স দেওয়ার ডিসিশন থাকলেও মিম কে আর কলেজে আসতে না দেখে, কয়েকদিন মিম কে খোঁজে নিজের অজান্তে বারবার মিম কে ক্লাসে ক্যান্টিনে সবজায়গা খুঁজে, কিন্তু মিম কলেজে আসে না,
আরশ বুঝতে পারে মিম হয়তো বেশি কষ্ট পেয়েছে, মিম কলেজে ফিরবে এই আশায় নিত্যদিন কলেজের মাঠে নিজের সংগপাঙ্গ কে নিয়ে অপেক্ষা করে কিন্তু না মিম কে আর দেখতে পায় না, শুধু কী মিম, রশ্মিরাত এবং সন্ধ্যা কেউ আসে না, কিন্তু আরশের সেদিকে খেয়াল নেই আরশ তো শুধু অপেক্ষা করে মিম কলেজে আরছে কিনা, আরশ মিম কে সবার সামনে অপমান করতে চেয়ে মিমের অনুপস্থিতি আরশ কে দুমড়ে মুছরে দিচ্ছিল ভিতরে ভিতরে, নিজেকে স্বার্থপর মনে হচ্ছিল, মিম কে ভালোবাসে না অথচ মিম কে কষ্ট দিয়ে নিজেই ভালো নেই, নিজের মধ্যে বিদঘুটে বিশ্রী এক অনুভূতি নিয়ে প্রতিদিন মিমের পথ চেয়ে থাকতে লাগলো, একদিন গেলো দুইদিন গেলো এভাবে প্রায় সাতদিন পড়ে যখন মিমের পা কলেজের মাটিতে পরলো আরশের মনে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো, মিম কে জ্বালাতে মন চাইলো, মনে এক ভয়ংকর অধিকার জন্ম নিলো, মিম আমার বিবাহিত স্ত্রী, ওর সঙ্গে আমি যা ইচ্ছা করবো, ওকে কষ্ট দিবো ভেঙ্গে দিবো কান্না করাবো সবকিছুর অধিকার আছে আমার, তাইতো মিমের সামনে এসে মিম কে বাজে বাজে কথা বলল,মিমও কম গেলো না আরশ কে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কথা শোনালো, মিমের আরো সাহস বেড়েয় চলছে, সবার সামনে আরশের বউয়ের অধিকার ফলে রুপা কে নাম ধরা ডাকা, আরশের মুখের উপর কথা বলা, আরশ কে তাচ্ছিল্য করা, সবকিছু আরশ শুধু নিস্তব্ধ হয়ে দেখছিল,
সবকিছু মেনে নিতে পারলোও পারলোনা শুধু নিজের বড় ভাইয়ের সঙ্গে মিম কে কথা বলা দেখতে, নিজের মধ্যে কী হচ্ছে মন কী চায় কিছুই বুঝতে পারছে না, শুধু জানে মিম কেনো হানিফের সঙ্গে কথা বললে, নিজের ভাইয়ের উপর রাগ লাগছে, কিছুদিন আগে তো বলল সে মিম কে বিয়ে করবে না, তাহলে এখন এমন করার মানে কী, কিন্তু এতকিছুর মধ্যে আরশ ভুলে গেছে তাঁর আর মিমের বিয়ের সম্পর্কে শুধু কলেজ জানে, না জানে তালুকদার বাড়ি না জানে গ্রুপে মিমের মা-বাবা না জানে আরশের বাড়ির কেউ, আরশ আর নিতে পারলো না, বসা থেকে উঠে বিছানার কাছে ফোন নিতে আসতেই পায়ে কাঁচের টুকরো বিঁধে গেলো,
আরশ ব্যাথায় চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে ড্যামিট বলে হাত দিয়ে পা ধরলো, পরমুহূর্তে চোখ খুলে কাঁচের টুকরো এক ঝটকায় বের করলো, কেটে যাওয়া জায়গা থেকে হুরহুর করে তাজা রক্ত বের হতে লাগলো, আরশ সেদিকে অগ্রহ করে রক্ত মাখা পা সাবধানে মেঝেতে ফেলে বিছানার কাছে এসে ফোন হাতে নিলো, পা থেকে রক্ত পরছে, সাদা মেঝেতে রক্তর ছাপ লেগে থাকলো, আরশ ফোনের কললিস্টে প্রবেশ করতেই চোখে পরল, মূর্খ মেয়ে নামে সেভ করা মিমের নাম্বার, যা আজকে বিকালে আরশ কলেজ থেকে যোগাড় করেছে, আরশ কোনোকিছু না বিছানায় বসে শুঁকনো ঠোঁট জিভ দ্বারা ভিজিয়ে ফোন লাগলো মিম কে, কিন্তু নাম্বার ব্যস্ত পেয়ে আরশের রাগ বেড়ে গেলো, তিরতির মেজাজে মিমের নাম্বারে টাইপিং করল,
___”ভাসুরের ফোন কেটে হাসবেন্ডের ফোন উঠা বলছি!
মিম নিজের রুমে বিছানায় বসে হানিফের সঙ্গে কথা বলছিল, কথা বলার মধ্যে আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ এলো, মিম হানিফ কে বলে হানিফের ফোন কেটে দিয়ে কপাল কুঁচকে ফোন কান থেকে নামিয়ে মেসেজ চেক করল,মেসেজ দেখে বুঝলো মেসেজ দেওয়া ব্যাক্তি আরশ, সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ দেওয়া নাম্বার থেকে পুনরায় ফোন এলো, মিম বিরক্ত হলো কিন্তু ফোন না কেটে দিলো না রিসিভ করলো, আরশ মিম কে ফোন রিসিভ না করতে দেখে পুনরায় মেসেজ দিলো,
___” কী হলো ফোন উঠাতে বলছি না তোকে ?
দ্বিতীয় বার আরশের মেসেজ আসাতে মিম বিরক্ত মুখে টাইপিং করলো,
___”বারবার মেসেজ আর ফোন দিচ্ছেন কেনো, আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছুক না।
মিমের মেসেজ সিন করতে রাগী আরশ আরো রেগে গেলো, রাগের মাথায় পুনরায় টাইপিং করলো,
___”চুপচাপ কল উঠা নয়তো রুম থেকে উঠিয়ে আনবো!
মিম নিজেও রেগে টাইপিং করতে লাগলো,
___” হুমকি অন্য কোথাও দিবেন, আমি ভয় পায় না আপনাকে।
মিম আরশ কে মেসেজ দিয়ে ফোন সাইলেন্ট করে বিছানায় রেখে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো, আরশ মিমের মেসেজ দেখে পুনরায় মেসেজ করছে,
___” ওকে তাহলে তোর মা’কে বলে দেই তুই বিয়ে করেছিস আমাকে, কী বলবো?
আরশ মেসেজ দিয়ে অপেক্ষা করলো মিমের মেসেজ সিন করার, কিন্তু মিম আর মেসেজ সিন করলো না, আরশ এক মিনিট দুই মিনিট অপেক্ষা করতে করতে ছয় মিনিটের মতো ফোন হাতে নিয়ে অপেক্ষা করলো, না মিম আর মেসেজ সিন করলো না,আরশ রাগেতে বিছানায় থেকে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ফোন দেয়ালে সঙ্গে আচাড় দিলো, সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মেঝেতে পড়ে ফোনের ব্যাটারীতে আগুন ধরে গেলো, আরশ আগুনের দিকে তাকিয়ে কোমরে এক হাত রেখে পুরো মুখময়ে আরেক হাত বিচরণ করতে করতে বড় বড় শ্বাস নিয়ে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে লাগলো,
তালুকদার বাড়ির ড্রয়িং রুমে যেন আজকে ভরপুর খুশির আমেজ , সবার মুখে আনন্দ সরছে না, আনহা শেখ তো খুশিতে কেঁদেই দিয়েছেন, আরাত কলেজের পড়া শেষ করে গুনগুন করতে করতে নিচে নেমে এলো, আরাত কে নিচে নামতে দেখে আইরা দৌড়ে এসে আরাত কে জাপ্টে জরিয়ে ধরে খুশিতে বলতে লাগলো,
___” আরাত, আরাত আমি খালামনী হবো রে!
আইরার কথায় আরাত হকচকিয়ে উঠলো, অবাক হয়ে আইরা কে এক্সপ্লেইন করতে আমতা আমতা করে ফিসফিস করে বলল,
___” না এমন কিছু না, তুমি ভুল ভাবছো আপু, আমাদের মধ্যে আসলে তেমন কিছুই হয়নি।
আরাতের কথায় আইরা অবাক হয়ে আরাত কে ছেড়ে দিয়ে আরাতের মুখের দিকে তাকালো, আরাত আইরা কে নিজের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে চোখ লুকাতে সামনের দিকে তাকালো, সামনের দিকে তাকাতেই আরো চমকে গেলো, তাঁদের থেকে দুহাত দূরে তাকবীর কপাল কুঁচকে আরাতের দিকে চেয়ে আছে, এক হাতের ভাঁজে কোট ভাজ করা, আরাত এবার কী করবে বুঝতে পারছে না এদিকে আইরার অবাক নজর আরেকদিকে তাকবীরের কপাল কুঁচকানো চাহনি, তাকবীরের চাহনিতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে তাকবীর আরাতের বলা কথা শুনতে পেয়েছে, আরাত জিভ দিয়ে শুঁকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে ঢোক গিলল, দুজনের চাহনিতে ভেবাচেকা মুখে মাথা নিচু করে নিলো, এর থেকে বুঝি লজ্জাজনক ব্যাপার আর কিছুই নেই এই পৃথিবীতে, আইরা আরাত কে মাথা নিচু করে হাত কচলাতে দেখে আইরা হটাৎই আরাতের মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
___” বোকা আমি তোর কথা বলছি না, আরিশা আপুর কথা বলছি!
আইরার কথায় আরাত অবাক হয়ে মুখ উপরে তুলে বলল,
___” এ্যাহহ!
___” হ্যাঁহহ।
আইরা কে মুখ ভেঙ্গাতে দেখে আরাত আরো বেশি লজ্জা পেলো,আইরা এখনো দেখেনি তাঁদের পিছনে তাকবীর দাঁড়িয়ে আছে, আরাত আঁড়চোখে তাকবীরের দিকে তাকালো,তাকবীর আরাতের দিকে গম্ভীর মুখে চেয়ে তাঁদের পাশ কেটে সিড়ি বেয়ে গমগমে পায়ে চলে গেলো, আরাতের মুখ দেখার মতো ছিলো,তাকবীর কে যেতে দেখে আইরাও কিছুটা বিভ্রান্ত অনুভব করলো,আরাত লজ্জা কাটাতে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো আনহা শেখ আর আতিফ শেখ এসেছে, টি-টেবিলের উপর অনেকগুলো মিষ্টির প্যাকেট, সোফাতে আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার বসে আছেন, আরাত হাসার চেষ্টা করে আইরার দিকে তাকালো, ভাগ্যিস কথাটা জোরে বলে নি নয়তো মানসম্মত সব শেষ হয়ে যেতো, অবশ্য ভুল জায়গায় ভুলভাল বকার জন্য কম তো লজ্জা পেতে হলো না, জানা নেই রুমে উনার সামনে মুখ দেখাবো কিভাবে, বাড়ির অন্য কেউ শুনতে পায়নি এতে কিছুটা হলেও এ যাত্রায় সম্মান বেঁচে গেলো, আইরার দিকে তাকাতেই তো লজ্জা লাগছে, আর যদি বাড়ির কেউ শুনতে পেতো তাহলে কী হতো, আইরা আরাতের মুখের রিয়েকশন দেখে মুখ টিপে হাসতাছে, আরাত চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে লজ্জায় বলল,আপুওওও একদম লজ্জা দিবে না, আইরা এবার শব্দ করে হেসে উঠলো,রাবেয়া তালুকদার সিড়ির সামনে দুইবোন কে গল্প করতে দেখে হাসি মুখে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে কাছে এলেন,
___” নেও নেও হা করো মিষ্টিমুখ করো, তোমরা খালামনী হবে।
কথাটা বলে রাবেয়া তালুকদার আরাত কে মিষ্টি খাইয়ে দিলো, আরাত হাসার চেষ্টা করে মিষ্টি মুখে পুড়ে নিলো, রাবেয়া তালুকদার পুনরায় আইরা কে একিভাবে খাইয়ে দিলো, আইরা মিষ্টির প্যাকেট থেকে মিষ্টি নিয়ে রাবেয়া তালুকদার কে খাইয়ে দিলো, রাবেয়া তালুকদার খেতে খেতে বলল,
___” আমাদের বাড়িতে আমাদের দাদা দাদু ভাই কে নিয়ে এসো দ্রুত কেমন, আমরাও তো বুড়োবুড়ী হয়ে যাচ্ছি ?
আইরা আরাত দু’জনেই লজ্জা পেলো, লজ্জা পেয়ে দুজনে মাথা নিচু করে নিলো, রাবেয়া তালুকদার দু’জন কে লজ্জা পেতে দেখে হাসি মুখে ড্রয়িং রুমের সোফার দিকে গেলেন সবাই কে মিষ্টি খাওয়াতে, ড্রয়িং রুমে একদম হইহুল্লার লেগে গেছে, আনহা শেখ আর আতিফ শেখ মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে তালুকদার বাড়িতে এসে, অফিসে দু’ভাই কে জরুরী তলব পাঠিয়ে দেয়, আদিবা তালুকদার আর রাবেয়া তালুকদার কে বলার পড়ে উনারা রান্নাবান্না শুরু করে দিয়েছেন, মনে হচ্ছে বাড়িতে আজকে অনুষ্ঠান চলছে,আনহা শেখ অফিসে ফোন করে সবাই কে দ্রুত বাড়িতে ফিরতে বলাতে আহাদ তালুকদার আর আদনান তালুকদার ভেবেছে বাড়িতে কারো কিছু হয়েছে, তাইতো দুই কর্তা দুই ছেলে কে বাড়িতে ফিরতে বলে নিজেরা আগে আগে চলে এসেছে, বাড়িতে ফিরে আনন্দর খবর পেয়ে সেই থেকে বাড়িটা ঝকমকে করে তুলছে, দুই কর্তা বাড়ি ফেরার কিছুক্ষণ পর তাকবীর আর আনাস দুই ভাই একসঙ্গে বাড়ি ফিলল, আনাস রুমে না গিয়ে ড্রয়িং রুমে শশুরের পাশে বসেছে, তাকবীর সোজা নিজের রুমে যেতে নিতেই সিঁড়ির কাছে আরাতের কথা শুনতে পায়,
আরাত আহিন পড়তে বসেছে দেখে তাঁদের কে কেউ ডাক দেয়নি, আরাত পড়া শেষ করে নিচে নামতেই এতকিছু ঘটে গেলো, এদিকে রাহিমা সুলতানা কে ডেকে এনেছেন আদিবা তালুকদার,তাঁদের খুশিতে মনে হচ্ছে আরিশার বেবি পৃথিবীতে এসেছে তাই তো এত আয়োজন আনন্দ, অথচ আজকে কেবল জানতে পারলো,আরিশার বেবি পৃথিবীতে আসতে চলছে, আইরা সবার আনন্দ দেখে মায়া কে ফোন দিতে দিতে আরাত কে বলল,
___” মিম কই?
আরাত ঠোঁট উল্টে বলল,
___” উপরে হয়তো নিজের রুমে।
আইরা দুষ্টু হেঁসে পুনরায় বলে উঠলো,
___” ভাইয়া এসেছে রুমে গেলি না?
আরাত লজ্জামিশ্রিত হেঁসে বলল,
___” আপু চুপ করবে, পড়ে যাবো।
আইরা শব্দ করে হেঁসে দিলো, আরাত কথা বলার মধ্যে দিয়ে মিম কে বিরক্ত মুখে নিচে নামতে দেখা গেলো, আরাত মিম কে বিরক্ত মুখে নামতে দেখে বলল,
___” কী হয়েছে রে মুড অফ কেনো?
মিম মিমের পাশে দাঁড়িয়ে বিরক্ত মুখে বলল,
___” শহরের পন্ডিত মশাই অনগর মেসেজ আর ফোন করছে।
মিমের কথায় আইরা ফোন কানে তুলে বলল,
___” শহরের পন্ডিত মশাই মানে, আরশ?
মিম কিছু বলল না, আরাত ছোট করে বলল,হুম, আরাত পুনরায় মিম কে বলল,
___” কথা বলছিস ?
মিম গম্ভীর সরে উওর করলো,
___” না।
আরাত কিছু বলল না, মিম সন্ধারাতে ড্রয়িং রুমে আহাদ তালুকদার আদনান তালুকদার আনহা শেখ আতিফ শেখ দেখে অবাক হয়ে বলল,
___” এত দ্রুত ফুপা আঙ্কেল বাড়িতে ফিরেছে?
আরাত ছোট করে বলল,হুম ফিরেছে বলতে বলতে দেখলো আহিন কে নিচে নামতে, আরাত আহিন কে দেখেই বলে উঠলো,
___” আহিন রশ্মি কে ডেকে আন তো!
আহির বিরক্ত মুখে নিচে না নেমে পুনরায় সিড়ি বেয়ে উপরের দিকে যেতে লাগলো, আরাত চেচিয়ে বলল,
___” কী রে তোকে রশ্মি কে ডেকে আনতে বললাম না, আর তুই রুমে যাচ্ছিস?
আহিন করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মুখভার করে বলল,
___” ডাকতেই যাচ্ছি।
আরাত বুঝতে পারলো, আহিন ছাঁদ দিয়ে রশ্মিদের বাড়িতে যাবে, আইরা দু’বার ফোন করার পড়ে মায়া ফোন রিসিভ করলো না, আইরা বিরক্ত মুখে পুনরায় ফোন লাগলো মায়া কে, এবার এবার রিং হাওয়াতেই ওপাশ থেকে মাথা ফোন রিসিভ করলো, মায়া কে ফোন রিসিভ করতে দেখে আইরা বলল,
___” ফোন রিসিভ করছিলিস না কেনো ?
মায়া কোমরে থেকে পেঁচানো ওড়না খুলতে খুলতে ত্যাঁড়ামি করে বলে উঠলো,
___” মরতে গিয়েছিলাম এজন্য ।
মায়া কে ত্যাড়ামি করতে দেখে আইরা দাঁত কেলিয়ে হেঁসে বলল,
___” ও আচ্ছা, তো তোর ওখানে সিগন্যাল পাচ্ছিল না বুঝি?
মায়া কিছুটা রেগে গেলো, এমনই শাশুড়ির সঙ্গে রান্না শিখিতেছিল, শাশুড়ী বারবার বলে দেওয়াতেও মায়া বারবার ভুল করছে,শাশুড়ী হাসি মুখে বারবার বলে দিচ্ছে এদিকে মায়া বারবার রান্না করতে ভুলভাল এটাওটা দিচ্ছে, নিজেই বিরক্ত লাগছে রান্না শিখতে এসে, তারমধ্যে ফোনটা শব্দ করে বেজে চলছে ড্রয়িং রুমের সোফাতে, মায়া কিচেন রুম থেকে বের হতে হতে অলরেডি দুইবার ফোনে রিং হয়ে কেটে গেছে, ফোনের কাছে এসে ফোন হাতে নিয়ে দেখতেই দেখলো আইরার ফোন, ফোন রিসিভ করতেই আইরার মেজাজ দেখিয়ে কথা বলায় মায়া ত্যাড়া জবাব দিলো, জবাবের উত্তরে আইরা কে দাঁত কেলাতে দেখে বিরক্ত হয়ে বলল,
___” ফাউল বকা বন্ধ কর, আর যে কথা বলার জন্য ফোন করেছিস ওটা বল?
মায়ার কথায় আইরার হাসি মুখ বন্ধ হয়ে এলো, গম্ভীর গলায় বলল,
___” আমি খালামনী হবো, এই খুশিতে তোকে ফোন করেছিলাম!
___” কীহহহ তোকে এ-সব কে বলল, নিশ্চয় ওই লুচ্চা তোকে ফোন করে উল্টাপাল্টা বলেছে, আরে আমাদের বিয়ে তো হলো কিছুদিন হলো!
আইরা রাগী চোখে আরাতের দিকে তাকালো, আরাত আইরার তাকানো তে ভেবাচেকা খেলো, এভাবে কেনো আইরা তাঁকে দেখছে বুঝলো না, আইরা আরাতের দিকে তাকিয়ে রাগী গলায় মায়া কে বলল,
___” বাতাস লেগেছে সবগুলোর, বিয়ের দুইদিন না দুইদিন না যেতেই উল্টাপাল্টা ভাবনা, আমি আরিশা আপুর কথা বলছি ইডিয়েট!
আইরার কথাতে আরাত বুঝলো আইরার রাগী চোখে তাকানোর মানে, মায়া আপু ফোনের ওপাশে উল্টোপাল্টা কিছু একটা বলেছে নিজের মতো ভেবেই লজ্জা আর হাসি দু’টোই পেলো, মায়া আইরার কথা বুঝতে পেয়ে ফোনের ওপাশে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
___” ও বুঝলাম, তারমানে আমিও তো খালামনী হবো তাই-না?
___” না খালাআম্মা হবি।
আইরা মুখ গোমড়া করে কথাটা বলে ফোন কেটে দিলো, মায়া আইরা কে ফোন কাটতে দেখে অবাক হলেও বেশি পাওা দিলো না, হাসি মুখে ড্রয়িং রুম থেকে কিচেনের দিকে যেতে দিবে, তখনই কলিং বেল বেজে উঠলো, মায়া দৌড়ে এসে হাসি মুখে সদর দরজা খুলে দিলো, আশিক সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কেচ খুলতে খুলতে মায়া কে দেখলো, মায়া কে এতটা হাসিখুশি দেখে আশিক কপাল কুঁচকে বলল,
___” কী হয়েছে ম্যাম আজকে এতটা খুশি?
কথাটা বলে আশিক শার্টের বোতাম খুলতে লাগলো, মায়া কোনোদিকে না তাকিয়ে আশিক কে জরিয়ে ধরে বলল,
___” আমি খালামনী হবো আর তুমি খালু।
খালু নামটা বলে মায়া মুচকি হেঁসে উঠলো, মায়ার শেষের কথাটা আশিকের পছন্দ না হলেও হাসিমুখে বলল,
___” মাশাআল্লাহ এটা তো খুব খুশির খবর, আনাস আমাকে বলল না কেনো, দ্বাড়াও সালা কে আগে ফোন করে কয়েকটা দেই, ব্যাটা আগে আগে বিয়ে করে কাম সেরে ফেললো !
আশিক ফোন বের করে আনাস কে ফোন করতে যাবে, মায়া বিরক্ত হয়ে আশিকের হাত থেকে ফোন নামিয়ে রেখে বলল,
___” আরে আইরা না আরিশা আপু প্রেগনেন্ট।
আশিক ফোন নামিয়ে প্রথমে অবাক হলো, পরমুহুর্তে খুশি হয়ে মায়া কে জরিয়ে ধরে বলল,
___” মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ, যাঁদের বিয়ে তে তোমাকে পেয়ে গেলাম তাঁরা পরিপূর্ণ পূর্ণতা পেয়ে যাচ্ছে, এরচেয়ে খুশির সংবাদ আর কী হতে পারে।
মায়া হাসিমুখে আশিকের বুকে আঙ্গুল দিয়ে আঁকাআকি করতে করতে বলল,
___” শোনো না?
আশিক হাসি মুখে হুম বলে উঠলো, মায়া আগের ন্যায় মুখে একটু লজ্জা এনে বলল,
___”তোমার কী মনে হয় না আমাদের এখন দুই থেকে তিনজন হয়ে যাওয়া উচিত?
মায়ার কথায় আশিক মন খারাপ করে মায়া কে ছেড়ে দিয়ে বলে উঠলো,
___” এই কথা বলতে পারলে, তোমাকে আমার এমন মনে হয় ছিহহ।
মায়া আশিকের কথায় ভেবাচেকা খেয়ে গেলো, কোথায় ভেবেছিলো নিজেদের বেবির কথা বললে আশিক খুশি হবে, কিন্তু আশিক খুশি না হয়ে উল্টো মন খারাপ করছে, মায়া আশিকের রিঅ্যাকশন দেখে আশিকের বুক থেকে মাথা তুলে অবাক হয়ে বলল,
___” মানে?
আশিক একটু রাগী গলায় বলল,
___”আমি তোমার সঙ্গে এতবড় অবিচার করতে পারবো না।
মায়া এবার সত্যি সত্যি সিরিয়াস হয়ে গেলো, আশিক কে ছেড়ে দিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে আশিকের মুখের দিকে চেয়ে বলল,
___”মানে কী বলতে চাইছো তুমি?
আশিক রাগী গলায় বলল,
___” আমি তোমাকে রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবো না সরি জেদ করো না ।
আশিকের কথা মায়ার কর্ণপাত হতেই মুখ রাগে লাল হয়ে গেলো নিমেষেই, আশিক মায়া কে রাগতে দেখে বুঝানোর ন্যায় পুনরায় বলল,
___” এই দেখো রেগে যাচ্ছো, আমি তোমাকেই সামলাতে পারি না দ্বিতীয় বিয়ে করলে একজন হয়ে দুই বউ কে সামলাবো কিভাবে বলো?
মায়া কে আর আটকায় কে,আশিক কে দৌড়ানি দিয়ে আশেপাশে তাকালো,টি-টেবিলে ফুলদানী দেখে ওটাই হাতে তুলে নিয়ে আশিকের দিকে ছুড়ে মেরে বলতে লাগলো,
___” সালা লুচ্চা, আমি তোকে আমাদের বেবির কথা বলছি আর তুই দ্বিতীয় বিয়ের কথা বলছিস, দ্বারা তোকে আমি বিয়ে করাচ্ছি!
কথাটা বলে মায়া আশিকের দিকে ফুলদানি ছুড়ে মারে, আশিক বুঝতে পারে ভুল যায়গায় ভুল কথা বলে ফেলছে, আশিক এলোমেলো পায়ে নিজের জীবন বাঁচাতে সিড়ি বেয়ে রুমের দিকে দৌড় লাগায়, মায়া আশিকের পিছনে পিছনে দৌড়াচ্ছে, আশিকের মা কিছু ভাঙ্গার শব্দ পেয়ে কিচেন থেকে দৌড়ে বের হয়ে দেখেন আশিক রুমের দিকে দৌড়াচ্ছে আর মায়া তাঁর পিছনে পিছনে, আশিকের মা দুজনের কান্ডে মাথায় হাত দিলো আফসোসের নিঃশ্বাস ফিললো, মায়া যবে থেকে এ বাড়িতে এসেছে, তখন থেকে দুইজনের ক্ষণে ক্ষণে ঝগড়া মারামারি দেখতে দেখতে ভদ্র মহিলা হতাশ হয়ে গেছেন।
ড্রয়িং রুমে সবাই ঐক্য হয়ে আরিশার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলছে, আরিশা বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে, তাঁর পাশে আমান বসে থেকে ফল কেটে কেটে আরিশা কে দিচ্ছে, আজকে হটাৎই আরিশা ঘরের কাজ করতে করতে কিছুটা অসুস্থ অনুভব করে, মাথাটা ঘুরে আরিশা ব্যাপারটা পাওা না দিয়ে শাশুড়ীর সঙ্গে রান্নায় হেল্প করছে, আমান বাড়িতে নেই, রান্না করতে করতে হটাৎই আরিশা সেন্সলেস হয়ে কিচেন রুমে পড়ে যেতে নেয়, আরিশার শাশুড়ী পাশে থাকায় ভদ্র মহিলা দ্রুত আরিশা কে ধরেন, আরিশা অনেক কষ্টে ড্রয়িং রুমের সোফাতে শুয়ে দেয়, পরমুহুর্তে আমানের কাছে ফোন করেন, আমান মায়ের ফোন পেয়ে দ্রুত বাড়িতে ফিরে দেখে সোফায় আরিশা বসে আছে, তাঁর পাশে বসে আমানের মা আরিশা কে জুস খাওয়াচ্ছে, রাফি তাঁদের পাশে হাতে হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে আছে, ভিতরে আনন্দ থাকলেও তা মুখে দেখা দায়, রাফি হাসিখুশি একটা ছেলে ছিলি, আজকাল তাঁর মুখে আর হাসি দেখা যায় না সবসময় গম্ভীর আর নিজেকে একাকীত্ব করে রাখে, আমান সদর দরজা থেকে দৌড়ে এসে আরিশার সামনে মেঝেতে বসে পড়ে, মুখে লেগে আছে ক্লান্তি আর টেনশন সঙ্গে কিছু পাওয়ার আনন্দ , আরিশার হাত নিজের হাতের মুঠোয় দিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় মুখে হাসি নিয়ে বলে উঠলো,
___” আমি বাবা হবো?
আরিশা মুখে লজ্জা নিয়ে হাসি মুখে মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ বুঝালো,আমানের মা ছেলের ঘারে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,
___” হ্যাঁ বাপ, তুমি বাবা হবে, আমরা দাদাদাদি হবো, রাফি কাকু হবে।
আমান বসা থেকে উঠে হুট করে রাফি কে জরিয়ে ধরে কান্না করে দিলো, প্রথম বাবা-মা হওয়ার অনুভূতিটা এতোটা সুখময় হয় কেনো, আমান কান্না করতে করতে রাফি কে জরিয়ে ধরে বলতে লাগলো,
___” রাফি আমাদের বাড়ি একটা পিচ্চি হবে, পুরো বাড়ি ছোট ছোট পায়ে হাঁটবে দৌড়াবে, খিলখিল হাসির আওয়াজে পুরো বাড়ি ঝকমক করবে, তুই বিশ্বাস করতে পারছিস, আমার কেমন বিশ্বাস হচ্ছে না আমি বাবা হবো।
আমানের বাবা হওয়ার পাগলামি সবাই খুশি মনে দেখতে লাগলো, রাফি আমানের পিটে হাত রেখে বলল,
___”ভাইয়া ভাবিজান কে রুমে নিয়ে যাও ভাবিজানের রেস্টের প্রয়োজন।
রাফির কথায় আমান রাফি কে ছেড়ে দিয়ে চোখের পানি মুছে হাসিমুখে আরিশা কে কোলে তুলে নিয়ে রুমে এলো, রুমে এসে বিছানায় শুয়ে দিয়ে কপালে একটা ভালোবাসার পরশ রেখে দিয়ে আরিশার পাশে বসে আরিশার হাত নিজের দু’হাতের মাঝে নিয়ে বলল,
___” আমি বাবা হবো বউ,তোমাকে আমি বলে বুঝাতে পারছি না আমার কেমন অনুভূতি হচ্ছে, তোমার আমার অস্তিত্ব এই পৃথিবীতে আসতে চলছে আমরা পুরোপুরি পরিপূর্ণ হয়ে যাবো।
কথাটা বলেই আমান পুনরায় এলোপাতাড়ি চুমু রেখে দিলো আরিশার মুখে, আরিশা হাসি মুখে আমানের মুখে হাত রেখে আমানের কপালে কপাল ঠেকালো,
প্রথমবার বাবা-মা হওয়ার আনন্দটা যেনো পৃথিবীর সকল অনুভূতিকে হার মানিয়ে দেয়, রাফি বাড়িতে ছিলো, রাফি কে ডাকার পর নিজে এসে দেখে আরিশা সেন্সলেস হয়ে গেছে, রাফি দ্রুত ডক্টর কে ফোন লাগায়, ডক্টর এসে যখন খুশির সংবাদ দেয় রাফি সাথে সাথে আনহা শেখের কাছে ফোন করে বলে, রাফির সঙ্গে আনহা শেখের সম্পর্কটা অন্য রকম, রাফি ফোন করে বলার পরপর এতরাতে রাফিদের বাড়িতে আসতে পারবে না জন্য, মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে তালুকদার বাড়িতে গেছেন দু’জন, সেই থেকে আরিশার যত্নে কোনো কমতি নেই, একটার পর একটা ফলমূল দুধ যত পুষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়াচ্ছে, আরিশা এতো এতো খাবার নিজের সামনে দেখে মুখচোখ কুঁচকে বারবার না করছে, কিন্তু কে শুনে কার কথা, আমান রাগী চোখে আরিশা কে এটা ওটা খাওয়াচ্ছে, আরিশা মুখ ভার করে ভিডিও কলে মা-বাবা মামা মামনী পুরো কাজিন মহলের সঙ্গে কথা বলছে, তালুকদার বাড়িতে একটা ফোন নিয়ে সবাই কাড়াকাড়ি করছে, আনহা শেখ আরিশার সঙ্গে কথা বলতে আতিফ শেখ ফোন কেড়ে নিলো, আতিফ শেখের থেকে আইরা নিয়ে কথা বলতে লাগলো, এভাবে একজনের পর আরেকজন ফোন নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে লাগলো, আরাত আরিশার থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে নিজে বলতে লাগলো,
___” আপু পিচ্চির নাম কিন্তু আমি রাখবো বলে দিলাম?
আরাতের কথায় আনাস ব্যঙ্গ করে করে বলে উঠলো,
___” কোনো প্রয়োজন নেই, তোর চুজ অত্যন্ত খুব খুব বাজে, দেখা যাবে নামটা কোনো আদিম কালের খাদেমের নাম রেখে দিয়েছিস!
আনাস এর কথায় আরাত রাগী গলায় বলল,
___” ভাইয়া তুমি কিন্তু আমাকে অপমান করছো?
আনাস বসা থেকে উঠতে উঠতে বলল,
___” যাক তাকবীর ভাইয়ার সঙ্গে থেকে অন্তত অপমান বুঝার মতো বোধ হয়েছে।
আরাত আরো রেগে গেলো, রেগে কিছু বলতে নেবে তাঁর আগেই আইরা বলে উঠলো,
___” থাক থাক দুইভাই বোনের আর ঝগড়া করতে হবে না, নামটা আমি রেখে দিবো।
আইরার কথায় আনাস বাঁধা দিয়ে বলে উঠলো,
___” এই ভুল জীবনেও করবি না, দেখা যাবে উপন্যাসের কোনো নায়ক বা নায়িকার নাম রেখে দিয়েছিস, তোর প্রতি আমার একদম ভরসা নেই।
বাকি সবাই শব্দ করে হেঁসে উঠলো, ফোনের উপাশে আরিশা আমানও হেঁসে উঠলো, আইরা ছোট ছোট চোখ করে মন ভার করে আনাস কে দেখছে, আনাস আইরার চাহনি দেখে বলল,
___” কী হলো এভাবে তাকাচ্ছিস কেনো, সত্যি কথা মেনে নে আর রুমে চল।
আনাস কথাটা রুমে রুমের দিকে পা বাড়ালো, আনাসের রুমে যাওয়ার পরপর আইরা মুখ ভার করে পিছু পিছু চলে গেলো, ড্রয়িং রুমে বড়রা ছেলেমেয়ে খুনসুটি গুলো হাসি মুখে দেখছে, আরাত আনাস এর কথায় মন ভার করে রুমে চলে এলো, রুমে এসে দেখে তাকবীর অফিসের ড্রেস চেঞ্জ করে টি-শার্ট আর টাউজার পড়ে, বিছানায় পা তুলে দিয়ে আধশোয়া হয়ে হাতে কিছু নিয়ে পরছে, আরাত অবাক হলো অবাক হয়ে তাকবীরের কাছে এসে দেখলো তাকবীর, মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর জীবনী আর- রাহীকুল মাখতূম বই পড়ছে, আরাতের মুখের রাগ নিমেষেই শেষ হয়ে এলো, তাকবীর আরাতের উপস্থিতি বুঝতে পেয়ে, বইয়ে চোখ রেখেই গম্ভীর গলায় আরাতের দিকে এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
___” এদিকে এসো।
আরাত ভদ্র মেয়ের মতো তাকবীরের পাশে বসলো, তাকবীর একহাতে আরাত কে নিজের সঙ্গে জরিয়ে নিলো, আরাত চুপচাপ তাকবীরের বুকে মাথা রেখে বই দেখতে লাগলো, তাকবীর একনজর আরাত কে দেখে ছোট করে বলল,
___” শুনতে চাও?
আরাত মাথা ঝেকে হ্যাঁ বুঝালো, তাকবীর মুচকি হেঁসে আরাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর জীবনী আর- রাহীকুল মাখতূম পড়ে শোনাতে লাগলো, আরাত খুব মনযোগ সহকারে শুনছে তাকবীরের মুখে, কোনো বিরক্ত কাজ করছে না, শুধু উৎসাহ জাগছে শুনতে, প্রায় তিরিশ মিনিটের বেশি বইটা পড়ে তাকবীর বইটা বেড সাইডে রেখে দিলো, আরাত এখনো আগের ন্যায় তাকবীরের বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে, তাকবীর গম্ভীর গলায় বলল,
___” রাতের ডিনার করেছো?
আরাত ছোট করে জবাব দিলো,
___” না।
___” নিচে চলো!
আরাত একিভাবে তাকবীরের বুকে মাথা রেখে বলল,
___” ভালো লাগছে, আরেকটু থাকি?
তাকবীরের ভালো লাগা ছুঁয়ে গেলো, ইচ্ছা করলো না সুন্দর মুহূর্তটা নষ্ট করতে, একিভাবে দুজন কিছুক্ষণ নীরবতা কে সঙ্গী করে একিউপর কে জরিয়ে থাকলো, বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর তাকবীর দুষ্টু হেঁসে বলল,
___”বাই এনি চান্স আমাদের মধ্যে কী, তোমার তেমন কিছুটা হওয়ার চান্স থাকতে পারে?
আরাত বুঝলো না তাকবীরের কথায় মানে, কিছুক্ষণ ছোট মাথাটা ঘাঁটিয়ে আরাত লজ্জা পেয়ে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়লো, আরাত কিছুক্ষণ আগের কথা ভুলেই গেয়েছিল, কথাগুলো মনে পড়তে লজ্জারা এসে ঘিরে ধরলো, তাকবীর দুষ্টু হেঁসে আরাত কে দেখছে, আরাত এদিক ওদিক তাকিয়ে আমতা আমতা করে উঠলো,
___” খিদা,খিদা লেগেছে, আমি গেলাম।
কথটা বলে আরাত পালাতে চাইলো, তাকবীর আরাতের হাত টেনে এক ঝাটকায় আরাত কে নিজের বুকে ফিলল,আরাত তাকবীরের বুক থেকে সামান্য মাথা তুললেই তাকবীর আরাতের মুখের সামনে এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিলো,
___” এলোমেলো চুলে আসবে না নিজেকে কন্ট্রোল করা দায় হয়ে যায়।
আরাত চোখ নামিয়ে নিলো তাকবীরের থেকে, তাকবীর আরাতের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিতেই আরাত চোখ বন্ধ করে নেই,
___” আপু আমি কী ভিতরে আসতে পারি, ভাইয়ার সঙ্গে কথা ছিলো?
হটাৎই মিমের ডাকে আরাত চোখ মেলে তাকালো, তাকবীর দুষ্টু হেঁসে আরাতের দিকে চেয়ে আছে, আরাত তাকবীরের হাসিতে লজ্জা পেলো,তাকবীর এতক্ষণে আরাতের হাত ছেড়ে দিয়েছে, আরাত লজ্জা পেয়ে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে গলা খাঁকারি দিয়ে আঁড়চোখে তাকবীর কে একবার দেখে নিয়ে নিজেকে ঠিকঠাক করতে করতে মিম কে উদ্দেশ্য করে বলল,
___” ভিতরে আয়।
মিম তাকবীরের সঙ্গে কথা বলবে, তাকবীর কে তো পাওয়ার যায় না একমাত্র রাত ছাড়া, সকাল বেলা তাকবীরের গাড়ি করে কলেজ যাওয়ার সময় কথাগুলো বলা গ্রহণযোগ্য না, মিম রুমের সামনে এসে কয়েক সেকেন্ড ভাবতে লাগলো ডাকবো নাকি ডাকবো না, ডাকা কী ঠিক হবে, পড়ে মনে পড়লো এখনো তো কেউ রাতের ডিনার করেনি, তাকবীর ভাইয়া নিচ্চয় নিচে নামবে তখন বলা যাবে, কিন্তু নিচে তো সবাই আছে, এসব ভাবতে ভাবতে মিম শেষমেশ ডেকেই উঠলো, আরাত রুমে প্রবেশ করতে বললে মিম ধীর পায়ে রুমে প্রবেশ করে, আরাত সোফাতে বসে ফোন টিপছে আর তাকবীর ওয়াশরুমে, মিম রুমে ঢুকতে আরাত নিজের পাশে বসতে বলল, মিম কিছুটা ইতস্তত করছে বসতে, কারণ তাকবীর নিজের রুমে কাউকে এলাও করে না, মিম কে ইতস্তত করতে দেখে আরাত মিমের হাত ধরে সোফাতে বসালো,
___” আরে বস তো, আমিও আগে এমন ভয় পাইতাম এই রুমে প্রবেশ করতে, দেখনা মানুষ টার সঙ্গে রুমের পরিবেশ টা কেমন গম্ভীর গম্ভীর, মনে হচ্ছে নিস্তব্ধ হয়ে আছে সবকিছু।
আরাতের বকবকানিতে মিম সামান্য হাসলো, কয়েক মিনিট পড়ে তাকবীর ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলো, তাকবীর কে বের হতে দেখে আরাত বকবকানি ছেড়ে ভদ্র মেয়ে হয়ে গেলো, মিম বসা থেকে উঠে বলল,
___” ভাইয়া আপনার হেল্প লাগবে!
তাকবীর মিমের দিকে না তাকিয়ে বিছানার পাশে থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে ছোট করে বলল,
___” সিট ডাউন।
মিম আরাতের দিকে চেয়ে সোফাতে বসে পরলো, আরাত ইশারা করছে বলতে, মিম নিচু স্বরে বলতে লাগলো, তাকবীরের চোখ ফোনে থাকলেও মিমের বলা কথা গুলো তাকবীর মন দিয়ে শুনলো, আরাত মিমের কথায় নাকচ করে উঠলো, তাকবীর মিমের কথায় বলে উঠলো,
___” তোমার লাইফ তুমি যা ডিসিশন নিবে তাই হবে, বাট এখনো অনেক সময় আছে, ভেবে দেখতে পারো, বিয়ে শুধু বিয়ে না একটা পবিত্র বন্ধন।
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪৯
___” ভাইয়া আমি অনেক ভেবেছি, যে ছেলে মেয়েদের সন্মান দিতে পারে না তাঁকে কিভাবে মেনে নিবো ভাইয়া!
তাকবীর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো,
___” নারী চাইলেই নিকৃষ্ট পুরুষ কেউ ভালোবেসে সঠিক পথে আনার ক্ষমতা রাখে বাই দ্যা ওয়ে ইউর চয়েস।
মিম কথা বলল না মাথা নিচু করে রাখলো,
