তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৭
জান্নাতি আক্তার জারা
আইরা কই তুই,রেডি হইছিস? লেট হয়ে যাচ্ছে তো বোন। একটু তাড়াতাড়ি বের হ আমাদের দুজনেই জন্য রশ্মিরাত অপেক্ষা করতাছে?
কথাটা বলতে বলতে আরিশা আইরা রুমের সামনে এসে দরজা ধাক্কাতে লাগলো।
আইরা দরজা খুলতে খুলতে বলে উঠলো — আরে আপুওও দাঁড়াও না দরজা ভেঙ্গে ফেলবে নাকি? দাঁড়াও খুলতাছি ।
কথাটা বলে দরজাটা খুলে দিতেই আরিশা চিল্লিয়ে ওঠে — কিরে আইরা তুই এখনো রেডি হস নাই কেনো?
আইরা মুখে হাত দিয়ে একটা হামি তুলে বলে উঠলো। ঘুম আরছিলাম এটা তোমার সহ্য হইলো না? বলো কী চাই এখন?
কী চাই মানে? আজকে আমাদের ঘুরতে যাওয়া কথা ছিলো তুই ভুলে গেলি? আরাত ফোন করে বললো ওরা রেডি হয়ে আমাদের জন্য ওয়েট করতাছে। আর তুই এখনো রেডি না হয়ে ঘুমাইতাছোস।যা যা তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আয় অনেক দেরি হয়ে গেছে?
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
আইরা দরজা থেকে রুমের ভিতরে যাইতে যাইতে বলে উঠলো — উফফ আপু মাএ ঘুম থেকে উঠলাম আমি,তোমরা যাও আমার ভালো লাগছে না?
আমাদের সঙ্গে আনাস ভাইও থাকবে!
সঙ্গে সঙ্গে আইরা পা থেমে গেলো, আরিশা আবার বলতে শুরু করলো — আনাস ভাই আফিস থেকে বিকালে কাঁশ বাগানে আসতে রাজি হয়েছে।আরাত মামাদের কাছে আবদার করেছে। আজকের সন্ধ্যা নদীর তীরে কাটাবে, আরাতের আবদারে মামা রাজি হইছে কিন্তু শর্ত দিয়েছে আমাদের সঙ্গে আনাস ভাই কে থাকতে হবে। আমাদের খেয়াল রাখার জন্য।
আরিশার কথাটা কানে আসতেই আইরা মুখটা ফুরফুরে দেখা গেলো।
“তুই যখন রাজি হচ্ছিস না? তাহলে আর কি করার থাক তুই তাহলে। আমরা সবাই মিলে নদীর তীরে জমিয়ে আড্ডা দিবো আল্লাহ হাফেজ।
বলেই আরিশা পিছন ঘুরে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আইরা তাড়াহুড়ো করে আরিশা কে জরিয়ে ধরে বলে উঠলো!
“আরে আপু আমার মন ফুরফুরে হয়ে গেছে একদম। পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করো আমি রেডি হয়ে আরছি। সন্ধ্যায় কাঁশ বাগানের মৃদু হাওয়াটা একদম মিস করা যাবে না।
আইরা কথাটা বলেই তাড়াহুড়ো শুরু করে দিলো রেডি হতে। আর আরিশা মুচকি হাসি দিয়ে মনে মনে বলে উঠলো।
” হুম তুই যে সন্ধ্যার আবহাওয়া কে না আনাস ভাইকে মিস করতে চাইছিস না। এটা আমার ভালো করে জানা আছে। তোকে রাজি করানো মেডিসিন আমি জানি রে বোন।তোর কোন ওষুধ কাজে দেবে। তোর বোন হয়ে আমি এটা জানবো না।
রশ্মিরাত আহিন আলভী ,তালুকদার বাড়ির গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আরিশা আইরা জন্য অপেক্ষা করতে ছিলো। ওদের দুইজন কে আসতে দেখে আলভী চিল্লিয়ে ওঠলো —ওইতো আরিশা আইরা আপু চলে এসেছে ।
আলভী কথায় সবাই আরিশা দের দিকে তাকালো। আর আইরা নিজের কানে হাত দিয়ে মুখে একটু বিরক্তি ফুতে তুলে বলে উঠলো।
“দূরু এত চিল্লাস কেন বাল?
আরাত রাগ হয়ে বলে ওঠে — তো চিল্লালাবে না? তোমাদের জন্য দাড়িয়ে থাকতে থাকতে হাঁটু ব্যাথা মাথার রাগ হয়ে বের হচ্ছে, তোমাদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার কথা ছিলো কয়টাই শুনি?
আরিশা আইরা দিকে ইশারায় বলে উঠলো — ওই ঘ্যারত্যারার জন্য লেট হয়ছে।
কথাটা বলেই আরিশা আবার রশ্মিরাতের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো — পায়ে হেটে যাবি? নাকি রিক্সা নিবি?
“বেশি দূরে তো না দশবারো মিনিটের রাস্তা। চলো গল্প করতে করতে হেটে যাওয়া যাবে।
রশ্মি কথাটা বলেই , আহিন আলভী দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো — কিরে হেঁটে যাইতে পারবি না?
রশ্মির কথায় আহিন বলে উঠলো — যদি আমাকে সামনে দোকান থেকে আইসক্রিম কিনে দেও। তাহলে আর কোনো কথাই নেই বিন্দাস হেটে যেতে পারবো। কী দিবে?
রশ্মি মুখ বাঁকা করে বলে ওঠে — ওইযে বাড়ির গেইট দেখছিস না?
আহিন মাথা ঝাকালো — হুম দেখছি।
ওকে ভেরি গুড, তাহলে সোজা বাড়িতে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে পরতে বস যা। আমাদের সঙ্গে যাইতে হবে না তোকে! যা ভাগ।
আহিন মুখ বাকিয়ে বলে উঠলো — এহহহ আইছে যা ভাগ। আপনে কইলেই বুঝি আমি ভদ্রছেলের মতো চলে যাবো হুহহহ। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে এভাবে কিপ্টামি করতে শরম করে না? একটু শরম পালিও বুঝলে ?
কথাটা বলেই আহিন রাস্তা দিয়ে আগে আগে হাটা ধরলো। রশ্মিও আহিনের পিছনে যাইতে যাইতে বলে উঠলো — আহিনের বাচ্চা দাঁড়া তুই এইখানে।
আইরা এবার হাসি দিয়ে আলভী কে বলে উঠলো। — স্যার আপনারও কিছু চাওয়া পাওয়া আছে নাকি? থাকলে বলতে পারেন। আমরা আমাদের সামর্থ মতো যথাসাধ্য চেষ্টা করব আপনার ইচ্ছা পূরণ করার?
আলভী আইরার দিকে তাকিয়ে মুখে একটু লজ্জা লজ্জা ভাব ফুটে তুলে বলে উঠলো — আমার চাওয়া পাওয়া তো শুধু একজন’ই আমার মায়াবতী। তোমরা পূরণ করবে? আমার মায়াবতীর সঙ্গে হাতে হাত রেখে এই বিকালের পথ চলার ইচ্ছাটা?
আরাত হা হয়ে তাকিয়ে আছে আলভীর দিকে। আইরা কোমরে হাত দিয়ে বলে উঠলো।
এই ডের ব্যাটারী তোর সাইজ দেখ আর আরাতের সাইজ দেখ। সাইজ দেখে তো একটু ফ্ল্যাট করার চেষ্টা করবি ফাজিল। যা ভাগ এখান থেকে?
আলভী সঙ্গে সঙ্গে মুখটা গম্ভীর করে বলে উঠলো।
আইরা আপু? যদিও তুমি আমাকে অপমান করছো। তবে আমি অপমান গায়ে লাগালাম না। শুনেছি ভালোবাসা নাকি সব সহ্য করা যায়। আজ নিজেকে দেখে তার প্রমান পাইলাম।
আরাত এবার আলভী দিকে এক’দু পা এগুতে এগুতে মাথা উপর নিচ করে বলে ওঠে।
মায়াবতী!ভালোবাসা!আবার কী যেনো, ও হ্যা অপলক চোখের চাহনি! তাইনা? আয়? এদিকে আয়? তোকে ভালোবাসা শিখাচ্ছি!
আলভী কে আর পায় কে। আলভী দৌড়াতে দৌড়াতে চিল্লিয়ে বলল — আমারে বাঁচা বন্ধু? এই আহিন আমারে বাঁচা ভাই। দাঁড়া আহিন আমরা দুজন একসঙ্গে দৌড়ে নিজেদের বন্ধুত্বের দায়িত্ব পালন করবো ।
আইরা আরিশা আরাত হাসতে হাসতে ওরাও হাটা ধরলো সেই পথেই । কিছুদূর যাইতেই দোকান টার সামনে এসে আরিশা সবাইকে দাঁড়াতে বলে দোকানের ভিতরে গেলো। দুমিনিটের মাথায় আরিশা হাতে করে ছয়টা কোন আইসক্রিম নিয়ে এসে সবাইকে একটা একটা করে দিলো।
আহিন এবার আইসক্রিম হাতে নিয়ে রশ্মির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো — রশ্মি আপু তুমি আরিশা আপুর থেকে কিছু শিখো। দেখছো? ছোট ভাইদের প্রতি কেমন ভালোবাসা দেখাতে হয়।
কথাটা বলেই আরিশার দিকে তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করলো —আপু তোমারে দোয়া করে দিলাম তোমার বিয়েটা যেন খুব তাড়াতাড়ি আমরা খাইতে পারি আমিন।
এবার আহিনের কথায় সবাই একসঙ্গে আমিন বলে উঠলো। আহিন পুনরায় বলল — তোমার বিয়েতে যেন দুই টুকরো গরুর মাংস আমাকে বেশি দেওয়া হয় আমিন।
সবাই আবারো আমিন বলতেই। আরিশা বলে উঠলো — আচ্ছা দোয়া টা কিসের জন্য হ্যাঁ? মাএ দুই টুকরো মাংস খাওয়ার লোভে আমার বিয়েটা নিয়ে দোয়া করছিস। বাহ বাহ তোদের ভণ্ডামির কোনো তুলনাই হয় না।
সবাই এবার একসঙ্গে শব্দ করে হেঁসে উঠলো।
এভাবেই হাসি মজা মধ্যে দিয়ে পায়ে হেটে আইসক্রিম খাইতে খাইতে এসে দাড়ালো নদীর পাড়ে।
বিকাল ৫:২৪…. নদীর ধারে কাশফুল ঘেঁষে দাড়িয়ে। একটার পর একটা পোজ দিচ্ছে আহিন আলভী। আর সেই ফটোর ক্যামেরাম্যান হয়ে মুখে একটু বিরক্তি নিয়ে। একটার পর একটা ফটো তুলে দিচ্ছে আরাত। আহিন প্রথমে ফটো তুলতে চাইলে আলভী বলে। মায়াবতী আমি আগে ওঠাবো আমাকে আহিনের আগে উঠাইয়া দেও। আহিন বলে ওঠে আরাত আপু আমি আগে ওঠাবো আমাকে আগে ওঠায়ে দেও। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে প্রায় ঝগড়ায় লেগে গিয়েছিলো। শেষে আরাত উপায় না পেয়ে বলে ওঠে।
“এই বিচ্ছু বাহিনী এদিকে শোন?
সঙ্গে সঙ্গে আহিন আলভী আরাতের দিকে এগিয়ে এলো। আরাত ওদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুজনের দুই ঘাড়ে দুই হাত রেখে।একটু ওদের দিকে ঝুকে বলে উঠলো।
“শোন তোরা তো বেস্ট ফ্রেন্ড তাই না?
আহিন আলভী দুজনেই মাথা নাড়িয়ে হুম বুঝালো!
আরাত এবার ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল।
তাহলে তোরা যখন বড়ো হবি! তখন তো তোরা দুজন দুজনের ছোট্ট বেলায় স্মৃতি দেখতে চাইবি! এইযে যেমন দুজন একসঙ্গ কিভাবে ছোট্ট বেলাটা কাটাইছিস তাই-না?
আলভী মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ, দেখবো তো!
আহিন বলে উঠলো হ্যাঁ হ্যাঁ আপু বড়ো হয়ে। ফটোতে দেখবো এই আলভী কতটা ব’লদ ছিলো। কথাটা বলেই শব্দ করে হেঁসে উঠলো, আলভী এবার আহিন কে মারতে শুরু করলো — বুদ্ধির ভান্ডার তুইও এমন ব’লদদের মতো দেখতে বুঝতে পারছিস?
চুপপপপপপ…
আরাত নিজের কানে হাত দিয়ে চিল্লিয়ে উঠলো, আহিন আলভী এবার একদম চুপ হয়ে দাড়িয়ে গেলো, আরাত ওদের দুজনকে একসঙ্গে ঠিকঠাক ভাবে দাড়িয়ে দিতে দিতে।
“চুপচাপ কোনো কথা না বলে দুজন একসঙ্গে পোজ দে। আমি স্যারদের ঝগড়া মিটানোর জন্য অন্য টপিকে নিয়ে যাচ্ছি। আর স্যার’রা এটা নিয়েই মারামারি শুরু করতাছে বাহ কে সিন হে। দাঁড়া সুন্দর মতো? ফাজিল গুলা।
কথাগুলো বলে দুজনকে ঠিকঠাক করে দিয়ে আরাত মুখে বিরক্তি নিয়ে সেই থেকে একটার পর একটা ফটো তুলেই যাচ্ছে !
রশ্মি নদীর ধারে মনমরা হয়ে বসে এতক্ষণ জাবত সবাই কে খেয়াল করছে। এইযে আইরা একবার হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে তো একবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে কারো পথচেয়ে। আর আরিশা আমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলছে।
“কোথায় তোমরা তোমাদের আসতে কতক্ষণ লাগবে বলোতো?
ফোনের ওপাশে আমানের উত্তর আসলো,
এইতো বউ আর দশমিনিট অপেক্ষা করো আরছি!
আরিশা হুম বলে ফোনটা কেটে দিয়ে আরাতের দিকে এগিয়ে গেলো! এতক্ষণ রশ্মি এ-সব খেয়াল করে মন খারাপ করে হাঁটুতে মুখ গুঁজে নদীর পানির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে উঠলো!
দেখছো পার্থ? দেখো? তোমার রশ্মিরানী কতটা অসহায় ফিল করছে, তুমি আমাকে এ’কেমন দুটানাই ফালাইলা পার্থ? তোমাকে পেতে হলে এত,এত, ভালোবাসা খুনসুটি বন্ধুত্ব হারাতে হবে।কেন আমাকে তোমার মায়ায় ফেলাইলা?কেন? আমি এখন কী করবো পার্থ?
এখন একটু ভবিষ্যতে দিকে তাকিয়ে দেখ, তাহলে তোর উত্তর পেয়ে যাবি !
কথাটা কানে যেতেই রশ্মি চট করে মাথাটা ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই দেখতে পেলো। আইরা ওর দিকে এগিয়ে আরছে, রশ্মি অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করলো — মানে?
আইরা রশ্মির পাশে বসতে বসতে — শুনলাম আঙ্কেল নাকি তোকে কানাডায় স্টাডি জন্য সিফট হতে বলছে?
রশ্মি — হুম আপু! কালকে রাতে আব্বু ফোন করে বলে দিয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই কানাডা যাওয়া জন্য প্রস্তুতি নিতে। ওখানে নাকি বড়ো কনো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি কারাবে। কিন্তু আপু তোমাদের ছেড়ে আমার একদম ভালো লাগবে না। আমি তোমাদের ছাড়া থাকবো কিভাবে আপু?
আইরা বলে ওঠে — তোর কানাডা যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য কী? নিশ্চয়ই পার্থ চৌধুরী। আমি ঠিক বলছি না?
রশ্মি মাথা ঝাকিয়ে, হুম ঠিক বলছো!
আইরা মুখে খুশি খুশি ভাব নিয়ে — তাহলে তো আর কোনো কথায় নেই এটাই তো সুযোগ। তোর ক্যারিয়ার সহ লাইফপার্টনার দুটাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে কানাডা।
রশ্মি মুখে একটু মলিল হাসি দিয়ে — তাহলে যে তোমাদের কে হাড়াতে হবে? আরাতের থেকে দূরে থাকতে হবে? আরাত কে ছেড়ে একা থাকার কথা আমার ভাবনাতে আসতেই নিজের ভেতরে ছটফটানি শুরু হয়ে যায় আপু। আমার শুধু মনে হয় একসাথে কাটানোর সময় গুলোর কথা। ওকে ছাড়া তো আমার একটা দিন কাটতে চায় না। ওকে ছাড়া একটা ঘন্টা কাটতে চায় না? তাহলে দিনের পর দিন বছরের পর বছর কাটবে কি করে আপু?
আইরা এবার মুখে একটু মুচকি হাসি নিয়ে বলে উঠলো।
“আরে পাগল এজন্যই বললাম একবার ভবিষ্যতে দিকে তাকিয়ে দেখ। জন্ম মৃত্যু বিয়ে আল্লাহর হাতে, তারপরও একবার ভাব…
তুই যে আরাতের জন্য এখন নিজের ভালোবাসাকে দূরে সরাতে চাইছিস। দেখবি সেই আরাত কিন্তু একদিন ঠিকি তার জীবনসঙ্গী নিয়ে বিজি থাকবে। আজকে দুজন কাউকে ছাড়া থাকতে পারছিস না। দেখবি এমন দিন আসবে দিব্যি দুজন দুজনকে ছাড়া জীবনটা গুছিয়ে নিয়েছিস। পড়াশোনা পর্যন্ত তোদের বন্ধন অটুট থাকবে। কিন্তু একবার বিয়ে হয়ে গেলে সব এলোমেলো হয়ে যাবে। তুই বিজি হয়ে যাবি সংসার নিয়ে। আরাত ওর স্বামী সংসার নিয়ে বিজি হয়ে যাবে। কী বলতো? তখন চাইলেও পাবি না আগের মতো একসঙ্গে আড্ডা দিতে। একসঙ্গে বাড়ির মানুষগুলোর চোখ ফাঁকি দিয়ে স্কুটি করে পুরো শহরটা ঘুরতে। এই যে এখন দুজন দিব্যি মন খুলে কথা বলছিস, একটা সময় এমনও আসবে দুজন দুজনের সামনাসামনি দেখা হইলে, শুধু জিজ্ঞাস করবি।কেমন আছিস?
উওরে সে বলবে, আলহামদুলিল্লাহ তুই কেমন আছিস? হয়তো সে সময় দুজন কিছুক্ষণের জন্য বসবি।গল্প করবি, আগের দিনগুলো স্মৃতিচার করবি,আর একটা কথায় বলবি।আগেন দিনগুলো সত্যি খুব অন্য রকম ছিলো তাইনা রে, আরাত দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলবে হুম, সত্যিই সুন্দর ছিলো,কেমন যেন বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেরাও পরিবর্তন হয়ে গেলাম তাইনা।
এভাবে দিন কেটে যাবে বছর চলে যাবে। একটা সময় দেখবি তুই বুড়ী হয়ে গেছিস।তোদের আর দেখা হবে না সময়ের তালে তালে সবকিছু শুধু একটা জীবন্ত মরীচিকা হয়ে ধরা দেবে।
দীর্ঘক্ষণ ধরে নিজের কথাগুলো শেষ করে আইরা নদীর স্বচ্ছ পানি থেকে চোখ ঘুড়িয়ে রশ্মি দিকে রাখলো। রশ্মির চোখে পানি দেখে আইরা মলিন হেসে আবার বলতে শুরু করলো।
হ্যাঁ এখন বলবি আমাদের বন্ধুত্ব এজীবনেও শেষ হবার না। না রে পাগল। সময়ের ব্যবধানে সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যাবে।
দেখবি বিয়ের কিছুদিন পর তোদের দেখা হবে। মাস চলে যাবে তখন শুধু ফোনে কথা হবে। বছর চলে যাবে তখন শুধুই কিছুটা যোগাযোগ থাকবে। বছরের পর বছর চলে যাবে তখন সারাদিন ছেলে মেয়ে সংসার সামলে দিনশেষে কথা বলা ইচ্ছাটুকুই মরে যাবে।
হ্যাঁ তখন আপন হবে, স্বামীর সংসার, ছেলেমেয়ে আত্মীয়-স্বজন, সবকিছু দায়িত্ব পালন করার শেষে তখন আর বন্ধুত্ব কথা মনে পরবে না। তখন বন্ধুটাও দায়িত্ব মনে হবে। শুধু মাএ নিজের স্বামীর বুকেই পুরো দিনের ক্লান্তি দূর হবে।
বিয়ে তো তোদের করতেই হবে,তাইনা। সেই বিয়েটা যদি শখের পুরুষ কে করতি পারিস। তাহলে তোকে মনের বিরুদ্ধে সংসার করতে হবে না,স্বামীর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে না,তাকে আস্তে আস্তে আপন করতে হবে না। যদিও পরিস্থিতির চাপে মনের বিরক্তি থেকে মেয়েদের বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যায়। দিনশেষে সংসারের কাছে বন্ধুত্ব হেরে যায়।
“তাই বলছি বন্ধুত্ব দোহাই দিয়ে, আগামী দিনের হাসিখুশি জীবনটা হাড়িয়ে ফেলিস না।
রশ্মি এবার মুখে চওড়া হাসি টেনে নিয়ে আইরা কে জরিয়ে ধরে বলে উঠলো। পেয়ে গেছি আপু আমার উত্তর আমি পেয়ে গেছি। তোমাকে এত এত ধন্যবাদ। আমি দোয়া করি তুমি যেন তোমার শখের পুরুষ কে খুব তাড়াতাড়ি পেয়ে যাও।
কথাটা বলেই রশ্মি মুখের হাসি মিলেয়ে গেলো। আর আইরা মুখে মুচকি হাসি দিয়ে বলে উঠলো।
ইনশাল্লাহ। তোর দোয়া যেন মহান রব্বুল আলামীন কবুল করে। বল আমিন?
আমিন। রশ্মি মন খারাপ করে আইরা কে ডেকে উঠলো — আপু?
আইরা নিজের হাতের ঘড়িতে সময় দেখতে দেখতে রশ্মির কথায় জবাব দিলো —হুম, বল?
আনাস ভাই তো তোমার ভালোবাসা বুঝেও অবুঝের মতো তোমাকে এড়িয়ে চলে। তোমার খারাপ লাগে না? আনাস ভাইয়ের প্রতি রাগ লাগে না?
আইরা ঘড়ি থেকে চোখ উঠিয়ে রশ্মির দিকে তাকায়, রশ্মি মুখে প্রশ্নবোধক চাওনি দেখে, ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলাইলো তারপর কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ থেকে। রশ্মির দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো।
“খারাপ লাগবে কেনো?
যতদিন সে আমার আত্মসম্মানে আঘাত না করছে ততদিন আমি তার পিছু ছাড়বো না। আর রইলো রাগের কথা, না তার প্রতি আমার রাগ আসে না কিন্তু বিশ্বাস কর, খুব অভিমান হয় খুব। কেন? আমাকে তুচ্ছ নারী ভাবে সে তুই বলতে পারবি? আমারও তো ইচ্ছে করে আমার শখের পুরুষের ভালোবাসা পাওয়ার তার শখের নারী হাওয়ার।
রশ্মি আইরা কে শান্ত করতে বলে ওঠলো।
আপু প্লিজ শান্ত হও তুমি? নিজেকে সামলাও, দেখো ভাইয়া এখন বুঝতে পারছে না তোমার ভালোবাসা টা, কিন্তু সময় হইলে ঠিকই বুঝতে পারবে!
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬
কখন বুঝবে রে, আমার অভিমান গুলো জমে জমে পাথর হয়ে যাওয়ার পর, হুম। বললা? নাকি আমি ফুরিয়ে গেলে?
রশ্মি কী বলবে ভেবে পেলো না। চুপচাপ আইরার এক তরফা ভালোবাসার প্রতি নীরব যুদ্ধ দেখতে লাগলো। হ্যাঁ আজ নতুন দেখছে না,আজথেকে প্রায় চারবছরের মতো হবে। দেখে যাচ্ছে আইরার এক তরফা ভালোবাসা।
আইরা রশ্মির মুখের দিকে তাকিয়ে। কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে চোখ রাখলো নদীর সচ্ছ পানির দিকে। পানির ঢেউ সময়তালে বারি খেয়ে যাচ্ছে। আইরা কিছুক্ষণ নীরব চোখে দেখে গেলো সেই খেলা, মুখে মুচকি হাসি টেনে রশ্মিকে বলে উঠলো — চল ওদিকে যাওয়া যাক, সবাই মিলে কয়েটা পিক ওঠাই। স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে।
রশ্মি মলিন হেঁসে — হুম চলো।
