Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৭

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৭

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৭
জান্নাতি আক্তার জারা

আজ মিম দের বাড়িতে একটু বেশিই রান্নার সুভাস ভেসে বেড়াচ্ছে, কেনো না আরশের আব্বু আম্মু আসবে, মিম কে দেখতে, যদিও নতুন করে দেখার কিছু নেই, তবুও মিম আমেরিকা থেকে আসার পড়ে আজকেই তাঁদের সঙ্গে প্রথম দেখা হবে, সেই সাত বছর আগের মতো মিম আজকেও তাঁদের জন্য শাড়ি পড়ে সেজেগুজে বসে থাকবে, উনারা তাঁদের ছেলের হবু বউ কে দেখতে আসবে, সেদিনের উদ্দেশ্য ছিল বড় ছেলের জন্য মেয়ে দেখা, আজকের উদ্দেশ্য ছোট ছেলের জন্য পাকাপোক্ত ভাবে বউ নামের সার্টিফিকেট তৈরি করা, যদিও আরশ এখনো গ্রামে আছে, শুধু আরশের আব্বু আম্মু আর হানিফ আসবে, তিশা বাবার বাড়িতে আসার পর থেকে হানিফ প্রতিদিন গ্রাম টু শহর আসাযাওয়া করছে, সন্ধ্যার দিকে আসবে রাত থেকে সকাল বেলা পুনরায় চলে যাবে, আবার সন্ধ্যার দিকে গ্রামে আসবে, কিন্তু আজকে আর সন্ধ্যার দিকে না, একদম বাবা-মা কে নিয়ে দুপুরের দিকে আসবে, এদিকে গেস্ট দের জন্য রান্নার আয়োজন চলছে, অন্যদিকে আহিন বাড়ির পাশে আম গাছ থেকে অনেক কাঁচা আম পেড়ে আনছে, রাবেয়া তালুকদার কে বলছে কাঁচা আমের মোরব্বা বানিয়ে দিতে, রাবেয়া তালুকদার ছেলের আবদারে বিরক্ত, দিকদিন সময় না ভেবে হুদাই এক সময় একটা আবদার করে বসে, রাবেয়া তালুকদার আহিন কে বিরক্তিকর কন্ঠে বলল,

___” তোমার বোধবুদ্ধি কী লোভে পেয়েছ, দেখছো না এখন সবাই ব্যস্ত, এখন না, রাতে অবসর টাইমে মোরব্বা বানিয়ে দিবো।
মায়ের কথায় আহিন মুখ মলিন করলো,”ওকে। আমগুলো পুনরায় বাঁশের তৈরি ডালাতে ভরে নিয়ে চলে যেতে লাগলো, পাশ থেকে আনহা শেখ আহিন কে মন খারাপ করতে দেখে হাসি মুখে বলল,
___” আহিন বাবা, দেখি আম গুলো দাও, আমি বানিয়ে দিচ্ছি, আমাকে আমের খোসা ছাড়াতে হেল্প করো।
আহিন খুশি হয়ে ফুপির কাছে কাঁচা আম গুলো নিয়ে গেলো, যদিও রাবেয়া তালুকদার বারণ করলেন, এখন বানাতে, কিন্তু আদিবা তালুকদার আনহা কে বানিয়ে দিতে বললেন, আহিন ফুপির কথায় উঠানে বসে পিলার দিয়ে আমের খোসা ছাড়াতে লাগলো, অন্যদিকে আইরা বরাবরের মতো বাচ্চাদের সামলাচ্ছে, এবং আরাত তিশা আর নূরফিহা মিম কে সাজাচ্ছে, মিমের ভিতরে নার্ভাসনেস ফুটে উঠছে, একদিন যে মানুষ গুলো নিজের মেয়ের মতো আপন করে নিয়েছিল, তাঁদের মন ভেঙেছে মিম, তাঁদের মনে মিমের প্রতি কেমন অনুভূতি তৈরি হয়েছে,নেগেটিভ নাকি স্বচ্ছ, এ-সব নিয়ে মিম দ্বিধায় ভুগছে, দেখতে দেখতে মিমের সাজগোছ কমপ্লিট, মিম মুগ্ধ হয়ে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখছে, আজ কতগুলো বছর পড়ে শাড়িতে নিজেকে ফুটিয়ে তুলছে, হাতভরা কাঁচের নীল চুড়ি, মা’য়ের নীল জামদানী শাড়ি, কপালে ছোট একটা কালো টিপ, মাথার চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া, তার সাথে বেলি ফুলের গজরা, আরশ নিজে বাগান থেকে টাটকা বেলি ফুল তুলে মিমের জন্য গজরা গেঁথে দিয়েছে, ব্যাস এতেই মিমের মায়াবী শ্যামবর্ণ চেহারায় হাজারো মুগ্ধতা ফুটে উঠেছে, আরাত মিমের মুখে হাত রেখে মুচকি হেঁসে বলল,

___” তোর চেহারা এত গ্লো করছে কেনো?
মিম বোধহয় এবার একটু বেশিই লজ্জা পেলো, তিশা হাসি মুখে বলল,
___” আরে লজ্জাবতী তো দেখছি, একদম লজ্জা পেয়ে যাচ্ছে?
নূরফিহা মিমের কাঁদে হাত রেখে হাসি মুখে বলল,
___” শুনো আমার মিষ্টি ভাবী আগে থেকেই মায়াবী, তারউপর আমার ভাই মিষ্টি ভাবী কে কম ভালোবাসে নাকি হুম?
___” হুমমমম, যা বলেছিস নূরফিহা।
___” দুরু বাল, চুপ করবে তোমরা।
আরাত তিশা নূরফিহা তিনজনই শব্দ করে হাসতে লাগলো, মিমের মুখে লাজুক হাসি, দেখতে দেখতে আরশের আব্বু আম্মু হানিফ এসে পড়েছে, আদিবা তালুকদার আর রাবেয়া তালুকদার নাস্তার দিকটা সামলাচ্ছে, প্রথমে সবাই মিলে নাস্তা করতে করতে নিজেদের নিয়ে গল্প করলেন, নাস্তা শেষ করে ড্রায়িং রুমে বসে বিয়ের আলোচনা করছে বড়রা, যদিও তাঁদের মধ্যে হানিফ আর আনাস আছে, হানিফ তাঁদের আলোচনার মধ্যে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে বলল,

___” আরশ কে দেখছি না, আরশ কই আন্টি?
রুপোলী বেগম মুচকি হাসলেন, এতদিন দেখে এসেছে ছেলের পরিবার মেয়ে দেখতে এসে মেয়ের খোঁজ করে, কিন্তু এখানে ছেলের পরিবার মেয়ের বদলে ছেলের খোঁজ করছে, এদিকে তাঁদের ছেলে সালার সঙ্গে বাড়ির বাহিরে টঙে বসে আমের মোরব্বা খাচ্ছে, অথচ বাড়ির ভিতরে তাঁর বিযের কথা চলছে, রুপোলী বেগম হাসি মুখে বললেন,
___” আছে হয়তো বাহিরে, এরান দাদাভাই যাও তো আরশ আঙ্কেল কে ডেকে নিয়ে এসো।
রুপোলী বেগমের কথায় এরান, “ঠিক আছে, বলে বীরাতের হাত ধরে আরশ কে ডাকতে চলে গেলো, এদিকে আরশের আম্মু খুব গম্ভীর মুখে বললেন,

___” মেয়ে কে নিয়ে আসেন।
পরিবেশ টা যেন গমগমে হয়ে গেলো, যেন আরশের পরিবার আজকেই প্রথম মিম কে দেখতে এসেছে, বিশেষ করে আরশের আম্মু, রুপোলী বেগম আদিবা তালুকদার দুজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করে আইরা কে বলল, মিম কে নিয়ে আসতে, আইরা সবার কথা মতো মিমের রুমের দিকে পা বাড়ালো, ঠিক তখনই আরশ আর আহিন বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো, আরশের কাঁধে বীরাত আর আহিনের কাঁধে এরান, চারজন দুষ্টুমি করতে করতে হাসি মুখে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো, আরশ সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পড়েছে, মাথার এলোমেলো চুলগুলো আজকে সুন্দর করে জেল দিয়ে পরিপাটি করা, ঠোঁটের কোণে সিগ্ধ হাসি, তারমধ্যে এতদিনের বেপরোয়া ভাব টা আর নেই, আরশ বীরাত কে কাঁধ থেকে নামিয়ে সবার উদ্দেশ্য সালাম দিয়ে সোফার একপাশে ভদ্র ছেলে হয়ে বসে পরলো, আরশের এই পরিবর্তন দেখে সবাই মুখটিপে হাসতে লাগলো, এরমাঝে রাবেয়া তালুকদার সবার হাতে হাতে কফি এবং চা দিলেন, আরশ চুপচাপ বসে ফোন স্ক্রল করছে, সবাই মিলে টুকিটাকি কথা বলার মধ্যে আরাত নূরফিহা মিলে মিম কে নিয়ে এলো, তাঁদের পিছনে গল্প করতে করতে তিশা আর আইরা নেমে এলো, মিম কে আসতে দেখে আদনান তালুকদারের কোলে বসা মাহা হাসি মুখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে উচ্চ স্বরে বলল,

___” ইয়াাা মিম খালামনী এসেছে ।
সবাই মাহার উল্লাসে সেদিকে তাকালো, আরশ ফোন থেকে চোখ তুললো এবার, মিম নিজের নার্ভাসনের জন্য দু-হাত মুট করে কচলাতে কচলাতে চোখ তুলে সবাই কে একনজর দেখে সালাম দিয়ে পুনরায় মাথা নিচু করে নিলো, আরশের আব্বু সালাম নিয়ে বসতে বললেন, ভদ্রলোকের কথা অনুযায়ী মিম কে আরশের সামনে সোফায় বসালো, আরশ লাজলজ্জা ভুলে মিমের দিকে অপলক চেয়ে ফোন পকেটে রেখে দিলো, সামনে যে বাড়ির বড়রা আছে সেদিকে তাঁর কেনো ধ্যান নেই, তাঁর এখন একমাত্র প্রধান কাজ হচ্ছে, বেহায়ার মতো মিমের দিকে তাকিয়ে থাকা, আর আরশ তাই করছে, আরশ কে মিমের দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকতে দেখে পাশ থেকে তিশা দুষ্টু হেঁসে বলল,
___”নিজের নজর হেফাজত করুন, হে দেওর মশাই।
তিশার কথায় পুরো হলরুমে হাসির রোল পড়ে গেলো, তবুও আরশের চোখ মিম থেকে সরলো না, একনজর আঁড়চোখে আরশের দিকে তাকিয়ে পুনরায় মাথা নিচু করে লাজুক হাসলো, আরশের আম্মু এতক্ষণে কথা বলে উঠলেন, ভদ্র মহিলা সরাসরি কেনো প্রকার ভনিতা ছাড়া মিম কে প্রশ্ন করলেন,

___” এই বিয়েতে তোমাকে কেউ জবরদস্তি করছে?
বাড়ির সবাই এমন প্রশ্ন থতমত খেয়ে গেলো, আরশের আব্বু ভদ্র মহিলা কে ইশারা করলেন, এসব উদ্ভট প্রশ্ন করতে দেখে, কিন্তু ভদ্র মহিলা উনার হাসবেন্ডের ইশারা অগ্রহ করে কঠিন চোখে মিম কে দেখছে, মিম উওরে কী বলবে জানার জন্য, আরশের চাহনি বরাবরের মতো মিমের দিকে, যদিও মিম আগেই তাঁর ভালোবাসা শিকার করছে, তারপরও সবার সামনে মিমের মুখ থেকে জানতে চাইছে, মিম কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে ভদ্র মহিলার দিকে তাকালো, ভদ্র মহিলা যে মিম কে বাজিয়ে দেখছে এটা এতক্ষণে মিম ঠাহর করে নিয়েছে, কেনো না মিম এর আগেও ভদ্র মহিলার সঙ্গে মিশেছে, উনি উপরে উপরে যতটা কঠিন দেখায়, আসে তিনি ভিতরে তাঁর থেকেও হাজার গুণ নরম, যদিও মিমের দূরে যাওয়া তে উনার ছেলে অনেক কষ্ট পেয়েছে, সেই তরফ থেকেই তিনি এতটা কঠিনত্ব দেখাচ্ছেন, মিম বাড়ির সবাই কে এক নজর দেখলো, সবাই একিভাবে মিমের দিকে তাকিয়ে আছে, মিম এবার কোনো ভনিতা না করে ছোট করে বলল,

___” না।
মিমের কথায় রুপোলী বেগম যেন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো, ভদ্রমহিলা মিমের কথায় আরো বেশি কঠোর হয়ে বলল,
___” তুমি বলতে চাইছো, তোমার ইচ্ছা তে তোমার বাড়ির মানুষ বিয়ে তে এগুচ্ছে, ডোন্ট ওরি, কেউ কিছু বলবে না তুমি নির্দ্বিধায় বলতে পারো?
মিম এবার ভদ্র মহিলার মুখোমুখি হলো, মুখে কিছুক্ষণ আগের সেই লাজুকলতার ছিটেফোঁটা নেই,
___” ডোন্ট মাইন্ড আন্টি, আমি আর সাত বছর আগের মিম নই, আমি সম্পূর্ণ অ্যাডাল্ট, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শিখে গেছি, আর আপনি মেবি এতদিনে বুঝতে পেরেছেন, আমার চাওয়ার বিরুদ্ধে আমাকে কেউ জোর করতে পারবে না, আর এটা আগেও কেউ পারেনি, সো, বিয়েটা সম্পূর্ণ আমার পারমিশনেই হচ্ছে।
ভদ্র মহিলা পুনরায় বললেন,

___” ভালোবাসো আমার ছেলেকে?
সবার সামনে ভদ্র মহিলার এমন কথায়, মিম অস্বস্তিতে পরলো, বড়রা বিস্ময় হয়ে গেলো, মিম কী উত্তর দিবে দ্বিধা বোধ করছে, আরাত আইরা আনাস দের চোখমুখ খুব স্বাভাবিক, হানিফ নিজের মায়ের এরূপ কথা শুনে বলল,
___” আম্মু, থাক না এসব, আমরা বিয়ের ডেট নিয়ে এগোই?
___ ” হানিফ, ডোন্ট টক, আম্মু কথা বলছে তো।
হানিফ কে থামিয়ে পুনরায় মিমের দিকে তাকালো, ভদ্র মহিলা ভিষণ সিরিয়াস হয়ে আছে,
___” তো বলো, ভালোবাসো আমার ছেলেকে?
মিম আঁড়চোখে আরশের দিকে তাকালো, আরশের চাহনিতে কিছু একটা ছিলো বোধহয়, মিম কে চোখ দিয়ে আশ্বাস করছে যেন, মিম একটু নড়াচড়া করে বসে আরশের অপলক গভীর চাহনির দিকে চেয়ে বলতে লাগলো,
___” হ্যাঁ ভালোবাসি, হয়তো নিজের থেকে বেশি না, তবে আপনার ছেলে আমার কল্প পুরুষ, আপনার ছেলেকে আমার ভাবতে ভালো লাগে, তাঁর দূরত্ব আমার অন্তর পুড়িয়ে দেয়, চুরমার হয়ে যাই আমি, আমি উপলব্ধি করেছি,তাঁকে ছাড়া আমি নিঃস্ব,কারো প্রতি এতটা আসক্ত হবো কল্পনাও করিনি,অথচ সে আমার কল্পনায় ছিলো সবসময়,এক দীর্ঘ অপেক্ষা আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে, আমি যতই দূরে পালাই সে ততই এক অদৃশ্য শক্তিতে আমার কিশোরী মনে তান্ডব চালায়, আপনার অবাধ্য ছেলে এই জেদি মেয়েটাকে তাঁর ভালোবাসায় ডুবতে বাধ্য করেছে আন্টি।
পুরো পরিবেশ থমথমে হয়ে আছে, সবার অবিশ্বাস্য চাহনি মিমের দিকে, কেউ ভাবিনি মিম আরশ কে এতটা ভালোবাসে, এতদিনের মানঅভিমানের আড়ালে কেউ কী গোপনে এতটা ভালোবাসতে পারে, হয়তো পারে জানা নেই, থমথমে পরিবেশ ভেঙে রাবেয়া তালুকদার সিড়ির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

___” পার্থ, এসো এসো, তোমাকে তো সকাল থেকে নিচে নামতে দেখা যায় নি, এসে আরশের আব্বু আম্মুর সাথে পরিচয় হও।
বলেই তিনি পার্থ কে আরশের বাবা-মার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো, পার্থ নিচে এসেছিলো এক মগ কফি নিতে, রুম থেকে বের হয়ে নিচে নামতেই মিমের মুখে আরশের প্রতি ভালোবাসার কথা শুনে সবার মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলো, শাড়ি পার্থর দুর্বলতা, একদিন এভাবেই অন্য কারো জন্য হৃদয় থমকে গিয়েছিল, সেদিনের সামান্য বোকা ভাবনার জন্য একজন কে সারাজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলছে, আর আজকে সেই একি ভুল জেনে-বুঝে করেছে,দপার্থ নিজের জীবনের সঙ্গে কাউকে জরাতে চায়না, কেমন করে যেন জরিয়ে যায়, রাবেয়া তালুকদার এর ডাকে নিজের হুঁশে ফিরে আসে পার্থ, হাসার চেষ্টা করে আরশের বাবা-মা কে সালাম দিলো, ঠিক একিভাবে আরশের আম্মু সালাম নিয়ে জানতে চাইলো,

___” ছেলেটা কে?
হানিফ ওর মাকে বলল,
___” আম্মু, পার্থ চৌধুরী, মিমের ফ্রেন্ড, আমেরিকায় দু’জনের পরিচয় হয়, তারপর থেকে ফ্রেন্ডশিপ।
মিমের ফ্রেন্ড শুনে ভদ্র মহিলা একটু ভ্রু কুঁচকালো, পরমুহুর্তে ভদ্র মহিলা হাসি মুখে পার্থ কে বললেন,
___” তোমার ফ্রেন্ডের বিয়ে তে থাকছো তো, নিজ হাতে কিন্তু বিয়ের সব ব্যবস্থা করতে হবে?
পার্থ ভদ্র মহিলার কথায় একনজর শাড়ি পরিহিত মিম কে দেখে নিয়ে মলিন হেঁসে আগের ন্যায় বলে উঠলো,
___” হ্যাঁ, থাকবো না কেন, লাইফে প্রথমবার বাঙালি বিয়ে অ্যাটেন্ড করবো, তার ওপর মানুষটা আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান একজন।
পার্থ কথায় সবাই খুশি হলো, আহাদ তালুকদার পার্থ কে একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বরলেন,
___” দাঁড়িয়ে আছো কেন, এদিকে এসো, সবার সাথে এনজয় করো।
___” নো থ্যাঙ্ক আঙ্কেল, মাথাটা ভীষণ ধরেছে, আন্টি? এক কাপ কফি হবে প্লিজ?
পার্থ রাবেয়া তালুকদার এর দিকে তাকিয়ে বলল,

___” হ্যাঁ কেনো না, এক মিনিট বসো আমি নিয়ে আরছি।
রাবেয়া তালুকদার কফি বানাতে গেলেন, আরশ এতক্ষণে পার্থর মাথা ব্যাথার কথা শুনে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
___” মাথা ব্যথার মেডিসিন নাও, ঠিক হয়ে যাবে।
পার্থ ছোট করে বলল,”থ্যাঙ্ক, মুখে তাচ্ছিল্য হাসি নিয়ে বিরবির করলো,
___” মেডিসিন খেয়ে মাথা ব্যাথা কমবে, এই ভাঙা হৃদয়ের ব্যাথা কিভাবে কমবে, আমার ভাঙা হৃদয়ের মেডিসিন চাই ডক্টর, ভাঙা হৃদয়ের মেডিসিন, ব্লো তুমি তো ডক্টর না রোগীর খুনী।
রাবেয়া তালুকদার কফি এনে পার্থর হাতে দিলো, পার্থ কফি নিয়ে আঁড়চোখে মিম কে দেখে নিজের রুমে পা বাড়ালো, আতিফ শেখ মিম কে ঘরে নিয়ে যেতে বললেন, কিন্তু আরশের মা সোফা থেকে উঠে এসে মিমের পাশে বসে মিমের গালে আদুরে হাত রেখে নিজের খোলসে বেরিয়ে এলেন,
___” তুমি তো জানো, আমার মেয়ে নেই, মেয়ে হয়ে থেকে যেতে, আমি তোমাকে খুব আদরে রেখে দিতাম, আমাদের থেকে দূরে থেকে আমার ছেলেটা কে কষ্ট দেওয়ার পাশাপাশি এক মাকে ও কষ্ট দিয়েছো,একবার মেনে নিয়েছি তোমার এই ছেলেমানুষী, দ্বিতীয় বার নিবো না মনে থাকবে?
মিম চোখে পানি নিয়ে,

___” হুম।
___” দ্বিতীয় বার আমাদের ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবলে, তোমাকে থাপ্পড় দিয়ে সোজা করে ফেলবো, মনে থাকবে?
___” আর কখনো যাবো না আন্টি, সারাজীবন আপনার মেয়ে হয়ে থেকে যাবো।
মিমের কথায় ভদ্র মহিলা ধমকে উঠলেন,
___” এই মেয়ে আন্টি কাকে বলছো, আম্মু বলো?
মিম কান্নাভেজা কন্ঠে বলল,
___” সরি আম্মু, তোমাদের ছেড়ে আর কোথাও যাবো না প্রমিস।
___” এই তো এবার ঠিক আছে।

আরশ মুগ্ধ হয়ে দেখছে সবকিছু, হানিফ আরশের কাঁধে হাত রাখলো, আরশ নিজের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি উপহার দিলো, বাড়ির পরিবেশ টা মুহূর্তের মধ্যে আনন্দে উচ্ছ্বসে মেটে উঠলো, বাড়ির বড়রা বিয়ের দিনতারিখ ঠিক করতে লাগলো, যেহেতু তালুকদার বাড়ির সবাই গ্রামে আগে থেকেই উপস্থিত, তারউপর ঈদের ছুটিতে কয়েকদিন যাবত অফিস এ্যাটেন করছে না কেউ, সেই মোতাবেকে সিদ্ধান্ত পৌঁছালো জলদি বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে সবাই সবার কর্মজীবনে ফিরে যেতে চায়, আগামীকাল থেকে বিয়ের অনুষ্ঠান চলমান হবে, বড়রা লাঞ্চ করতে করতে নিজেদের মধ্যে বিয়ে নিয়ে আলোচনা করতে লাগলো, আইরা আরাত রা মিলে খাবার সার্ভ করছে, ওদিকে মিম আর আরশ কে আলেদা কথা বলার জন্য বাড়ির বাহিরে পাঠিয়ে দিলো, যেমন অচেনা ছেলে যখন মেয়ে দেখতে যায়, তাঁদের সব আয়োজন ঠিক সেভাবেই চলছে, আরশ মিম একিউপরের হাত ধরে ফুল বাগানে হাঁটতে লাগলো, বেলকনিতে দাঁড়িয়ে কফি খেতে খেতে পকেটে হাত গুঁজে আরশ মিম কে দেখতে লাগলো পার্থ, শুধু কী পার্থ, না আহিন আর নূরফিহা তাঁদের পিছনে পিছনে এসেছে, এরান মাহা আর বীরাত কে নিয়ে, মাহা আহিনের কাছে বাহানা ধরেছে মিম খালামনীর কাছে যাবে, বেচারা আহিন এটা ওটা করে মাহা কে বোঝাচ্ছে বারবার, তবুও মাহা জেদ কমছে না, নূরফিহা তাঁদের থেকে কয়েক হাত দূরে ছিলো, মাহার জেদ দেখে আহিনের কাছে এসে মাহা কে একটা ফুল দিয়ে কোলে তুলে নিয়ে বলল,

___” চলো তোমাকে একটা গল্প শোনাবো।
মাহা ফেলফেল চোখে নূরফিহা কে দেখতে লাগলো, গতকাল থেকে দেখতে নূরফিহা কে, কিন্তু কথা হয়নি তাদের মধ্যে, আজকেই নূরফিহা মাহা কে কোলে নিলো, আহিন মাহা কে চুপ করতে দেখে অবিশ্বাস্য চোখে একবার নূরফিহা তো আরেকবার মাহা কে দেখতে লাগলো, দু’জনের খাতির জমেছে বেশ, মেয়েটার কয়েক মিনিটের মধ্যে মাহা কে আপন করে নিয়েছে, মাহা ও চুপচাপ নূরফিহার কোলে বসে গল্প শুনছে, আরশ আঁড়চোখে দুজন কে দেখে মুচকি হেঁসে বীরাত আর এরান এর সঙ্গে খেলতে লাগলো, আহিন বীরাত আর এরান এর সাথে খেলার মধ্যে, নূরফিহা মাহার সঙ্গে গল্প করতে করতে একনজর আহিন কে দেখলো, এতবড় একটা ছেলে হয়ে কী সুন্দর ছোট্ট বাচ্চাদের সাথে খেলছে, যেন সেও একটা বাচ্চা, নূরফিহা সেদিকে তাকিয়ে আহিনের অগোচর মুচকি হেঁসে পুনরায় মাহার সঙ্গে গল্প করতে মগ্ন হয়ে গেলো,
মিম আরশের হাত ধরে চুপচাপ হাঁটছে, আরশ দুজনের হাতের বন্ধনের দিকে তাকিয়ে আছে, আরশ কে কিছু বলতে না দেখে মিম আরশের হাত সেড়ে দিয়ে, আরশের সামনে দাঁড়িয়ে মুখ গোমড়া করে আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করলো,

___” শাড়িতে আমাকে কেমন লাগছে?
আরশ মিমের চোখের দিকে মনোমুগ্ধকর নয়নে তাকিয়ে বলল
___” না বললে হয় না?
মিম কিছুই বললো না, রাগ করে সামনে হাঁটতে লাগলো, আরশ মুচকি হেঁসে মিমের হাত ধরে নিজের বুকে ফেললো, মিমের কানের কাছে মুখ লাগিয়ে ফিসফিস করে বলল,
___” আচ্ছা, তোমার চোখে কী আছে বলো তো,এত ডুব দিতে মন চায় কেনো?
কব্জিতে টান পড়ার সাথে সাথে মিম হকচকিয়ে যায়, আরশের বুকে মাথা এসে লাগতেই মিম চোখ বুঝে নেয়, মনের মধ্যে ধরফর করতে লাগে, তারপর পড়েই আরশের ঠোঁট এসে মিমের কান ছুঁই ছুঁই হয়,ভেসে আসে স্লো ভয়েজে প্রেমময় বাক্য, মিম শুঁকনো ঠোঁট জিভ দ্বারা ভিজিয়ে নিলো, মুখশ্রী লজ্জায় লাজুক হয়ে আছে, মিম চোখ খুলে আরশের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

___” মায়া, আর ভালোবাসা।
কেটে গেলো কয়েক সেকেন্ড, আরশ আজ বেহায়ার মতো বারবার মিম কে দেখছে, মিম এবার আহ্লাদী সুরে বলল,
___” আপনি তো আমাকে প্রপোজ করলেন না, এই বিয়ে আমি করবো না, বিয়ে ক্যানসেল।
মিমের কথায় আরশ হকচকিয়ে গেল, যেন মিম সত্যি সত্যিই বিয়ে ক্যানসেল করছে, আরশ দ্রুত মিমের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পাশ থেকে গোলাপ না পেয়ে একটা সাদা গোলাপের কলি ছিঁড়ে নিয়ে মিমের সামনে ধরলো, তাড়াহুড়ায় ফুল ছিঁড়তে গিয়ে গোলাপের কাটায় আঙ্গুলে আঘাত লাগলো, এক ফোঁটা র*ক্ত সাদা গোলাপ ফুলের কলিতে দাগ লেগে গেলো,

___” ভালোবাসা প্রকাশ করার বেলায় আমি বরাবরই দুর্বল, আমার অনুভূতি তোমাতেই সীমাবদ্ধ, হয়তো আমি সবার মতো মুখ ফুটে বলতে পারি না ‘ভালোবাসি’ কিন্তু আমার নীরবতাই আমাদের ভালোবাসার প্রমাণ, তুমি আমার নেশা, যাকে আমি শরীরে না মেখেও অনুভব করি, এই ডাক্তারের পার্সোনাল স্টেথোস্কোপ হয়ে যাও, সবসময় আমার বুকের সাথে মিশে থাকবে, আমার হৃদস্পন্দনের কম্পন শোনার জন্য, খুব যত্ন করেই ভালোবাসি মিম, আই লাভ ইউ, মাই লাভ,বিয়ে করবে এই বেপরোয়া বদমেজাজি ছেলেকে? খুব সুখে রাখবো,ভালোবাসার সুখে,আমার ঘরে তোমাকে বিন্দুমাত্র ভালোবাসার কষ্ট পেতে হবে না, উইল ইউ ম্যারি মি?
মিম বিস্মিত হয়ে আরশ কে দেখছিলো, মিমের কল্পনাই ছিলো না আরশ এভাবে প্রপোজ করবে, মিম আবেগপ্রবণ হয়ে কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে দিয়ে আরশের হাত থেকে সাদা গোলাপের কলি নিয়ে কম্পিত গলায় অস্ফুট স্বরে বলল,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৬

___” ইয়েস, আই উইল ম্যারি মাই ডাক্তার সাহেব।
আরশ বসা থেকে উঠে মিম কে দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন ছেড়ে দিলেই হাড়িয়ে যাবে, কিছুক্ষণ পড়ে বাড়ির ভিতর থেকে তাঁদের ডাক পরলো, দুজনেই মুচকি হেঁসে বাড়ির ভিতরে পা বাড়ালো,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৮

1 COMMENT

Comments are closed.