তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২০
নীতি জাহিদ
পুরো ড্রইং রুম জুড়ে আ/ত/ঙ্ক। সবাই জোর করছে ইমরানকে হাসপাতালে যেতে। ইমরান নাছোড়বান্দা হয়ে সোফায় গা এলিয়ে বসলো। মনে হয় যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো খবর চলছে টিভিতে আরাম করে বসতে হবে,নাহলে মিস হয়ে যাবে। মায়া দৌঁ/ড়ে এসে একটা সুতি ওড়না ভেতর থেকে এনে হাত বেঁধে দিলো। কৃতজ্ঞতার হাসি দিলো ইমরান। মোনা চিৎকার দিয়ে বলছে,
‘আপনি এখানে বসেছেন কেনো,হাসপাতালে চলুন।’
ইমরানের মুখে হাসি লেগেই আছে, অবলীলায় বলল,
‘ আমি মরলেই তুমি শান্তি পাবে। আই সিউ এর ব্যবস্থা করব বলেছিলাম না সেদিন। বিধাতার ইশারা দেখেছো। এত চিন্তা করো না আমার জন্য।’
নয়ন ধমকে বললো,
‘পাগলামি বন্ধ কর। তুই বসে আছিস কেনো ইমরান? উঠ। চল আমি নিয়ে যাব।’
‘এমন করছিস কেনো,আমি তো আজ প্রথম গুলি খাইনি। সেদিন ও খেয়েছিলাম যেদিন প্রকাশ মিনহাজ ভাইকে শ্যুট করেছিলো। আমার কিচ্ছু হবে না। হলে আরো আগেই হত।’
মিনহাজ চোখ মেলাতে আজ কুন্ঠাবোধ করছে।
রক্তাক্ত হাতের দিকে তাকিয়ে ইমরান বক্র হাসি দিলো। মিনহাজ এগিয়ে আসতে চাইলে হাত দিয়ে বারণ করে। সবার সামনেই বললো,
‘ মোনালিসা আমি তোমাকে বলেছিলাম তোমার বন্ধুত্ব আমাকে আঘাত করে,আজ তোমার ভালোবাসা আবার র*ক্তা*ক্ত করলো। ‘
একটু থামলো ইমরান..জোরে নিশ্বাস ছেড়ে বললো,
গত এক সপ্তাহ বিনা দোষে আমাকে তোমরা বাবা-মেয়ে দুজন যে পরিমাণ শা*স্তি দিয়েছো আমি একজীবনে ভু*লবোনা। একটা বার ও মনে দয়া হলোনা তোমাদের, লোকটা অসুস্থ একবার খোঁজ নিই। মোনালিসা তুমি কি করে পারলে বলো তো,আমার এই অবস্থায় আমাকে একা ফেলে যেতে! ফোন হাতে নিয়ে ছটফট করেছি, দিন গুনেছি কবে আমার মোনালিসা ফোন দিবে, মিষ্টি স্বরে বলবে,ইমরান সাহেব কেমন আছেন? সবার কপালে সুখ জুটেনা। আমি তো সবচেয়ে বড় অভাগা। এত এত সুনাম,টাকা, পাওয়ার সবই আছে কিন্তু আপন বলতে আছে শুধু আমার ছেলেটা। আমাকে খুব কম মানুষ কাঁদতে দেখেছে। গত এক সপ্তাহ প্রতি রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে কেঁদেছি আমি। ভালোবাসা এত কষ্ট দেয় কেনো বলতে পারো! দু দুটো ভুল করলাম আমি। কাঁকনকে ভালোবেসেছি। ও বিশ্বাসঘাতক, বেঈমান প্রমানিত হলো। তোমাকে ভালোবেসেছি,অবিশ্বাস করলে। হ্যাঁ মানছি আমি স্বীকার করিনি আমি তোমাকে ভালোবাসি।কেনো করিনি তাও তোমার অজানা নয়। এখন আমার গায়ে দাগ লাগার আগে তোমার গায়ে লাগলো দেখলে। বলেছিলাম আমি সুগার ডেডি হয়ে যাবো।দেখলে তো???
কিন্তু মিনহাজ ভাই, তোমাকে তো সেদিন হাসপাতালে হাত জোর করে বলেছিলাম, মোনালিসাকে আমাকে দিয়ে দাও। রানী বানিয়ে রাখবো। তুমি ও সেদিন আমাকে সুগার ডেডি বললে। হয়তো আমি তাই। তবে তোমার মেয়ের সাথে আমার এখনো তেমন সম্পর্ক হয়নি। পবিত্র তোমার মেয়ে। ‘
তুশি আজ ভাসুরের অন্যরূপ দেখলো। মেয়েটা ভাসুরকে ভীষণ সম্মান করে,ভয় ও পায়। এই মানুষটার ভালোবাসা কিভাবে কেউ অবজ্ঞা করে ভেবে পাচ্ছে না। ভালোবাসার কাছে সবাই অনেক অসহায়।
হাত থেকে অবিরত র*ক্ত যাচ্ছে। আইরিন এগিয়ে আসলো ভাই এর দিকে।বোনকে করূন স্বরে বললো,
‘ আরেহ আপা,এমন করোনা। কথা শেষ হয়নি। এই আ!ঘা!তে কিছুই হবে না। গুলি আজ প্রথম লাগে নি। বুকের ভেতর যে ক্ষত তা কখনো শুকাবে না। মিনহাজ ভাই, যা হওয়ার হয়েছে। আমার হারাবার কিছু নেই আর,পাওয়ার ও কিছু নেই। শুধু আফসোস আমার ইশানের এই প্রথম কোনো ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে যাবে। ও আমাকে বলেছিলো, মোনা আন্টিকে আমার মা বানিয়ে এনে দাও পাপা। ছেলের মুখে এমন কথা শুনে সেদিন মনে হয়েছিলো ছেলে আমার বড় হয়েছে। কিন্তু হ/তা/শা ঘিরে ধরেছিলো, তোমার মোনা আমাকে অবিশ্বাস করেছে। ওর চোখে অবিশ্বাস দেখেছি আমার জন্য। ভাবতে পারো এই ব্যাথা আমি ইমরান সহ্য করতে না পেরে স্ট্রোক করে বসেছি। তোমার মেয়ে আমাকে কিভাবে দূর্বল বানিয়েছে? যাই হোক, যদি কোনো ভুল করে থাকি কষ্ট দিয়ে থাকি মাফ করে দিও। আমি বয়সে তোমার ছোট। ভুল করতেই পারি। আমার শ্বাস নিতে ক*ষ্ট হচ্ছে। হাতের ব্যাথাও বাড়ছে। মনে হয়ে আর বেশিক্ষন কথা বলতে পারবোনা। মোনালিসার দিকে খেয়াল রেখো। ভালো থেকো। আমি একটু সুস্থ হলেই ইতালি ব্যাক করছি ইশানকে নিয়ে যাব। বাংলাদেশের বিজনেসের ফিফটি পার্সেন্ট অনেক আগেই আমার প্রেয়সীর নামে উইল করা আছে। ওর যেকোনো প্রয়োজনে,আমার বা তোমার অনুপস্থিতিতে ও কখনো যেনো কারো কাছে হাত পাততে না হয় সেই ব্যবস্থা আমি করে দিয়েছি। শার্ট এর হাতা উল্টিয়ে চোখের পানি মুছলো। আজ ইমরান কেঁদেছে সবার সামনে।ইমরান হাত চেপে ধরে বেরিয়ে যেতে যেতে খুব সুন্দর হাসি দিয়ে বলে, ভালো থেকো মোনালিসা। আমার সব টুকু সুখ যেন তোমার হয়, তোমার নামেই লিখে দিলাম।’
গাড়ি পর্যন্ত নামতেই শরীর ছেড়ে দিয়েছে। আর মনে নেই কিছু ইমরানের।
ভালোবাসা ভুল সময়ে এসে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মত সব ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। যার তীর নেই,কিনারা নেই।আছে শুধু সীমাহীন স্রোতের গর্জন। স্রোত আছড়ে পড়ছে,আর ঘরহীন, আশ্রয়হীন করে দিয়েছে মনের মালিকগুলোকে।মোনা ধপ করে মাটিতে বসে পড়েছে। চয়ন এসে আগলে ধরলো। বাবার দিকে তাকাচ্ছে না। শুধু একবার ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে বলেছে,
‘ বাবা আমাকে তোমার মত আগলে রাখার মানুষটা চলে যাচ্ছে তাই না! আমি তাকে চাইবোনা তোমার কাছে,তার অসম্মান আমি করবোনা বাবা।’
মায়ার দিকে একবার তাকালো মোনা। আজ কেনো যেন মনে হলো মায়ার চোখে এক রাশ ক্ষোভ,হিংসা। মায়া কি মোনাকে হিংসা করছে। একবার ও তো কাছে এসে ধরলো না। এটাও সম্ভব। চয়ন মোনাকে নিয়ে ধীর পায়ে রুমে গিয়ে বসে পড়লো। মোনা চিৎকার দিয়ে বলছে..
‘আজ সব শেষ চয়ন। আমি ইমরান সাহেবের কাছে যাব। আমাকে একবার বুকে টেনে নিন ইমরান সাহেব। আপনার হাতে অনেক জখম দেখেছি। ‘
চয়ন থামাতে পারছেনা।
ফোনটা নিয়ে তড়িঘড়ি করে ফোন দিলো ইশানের ফোনে। ফোনে রিং হলো ঠিকই রিসিভ হলো না। ও ঘুমানোর পর চয়ন চলে যায়।
রাত তখন সাড়ে বারোটা। সহসা রিং হলো। মোনা ফোন রিসিভ করতেই ইশান কথা বলে উঠলো। মোনার প্রশ্নের জোয়ার,
‘ ইশান, তোমার বাবাকে দেখবো। উনি কেমন আছেন?প্লিজ একবার দেখাও। ‘
‘ওয়েট’
ইশান কেবিনের দরজা খুলে ঘুমন্ত ইমরানকে দেখালো কি স্নিগ্ধ লাগছে। চোটপাট করা, হাসি খুশি মানুষ টাকে হাসপাতালের বিছানায় একদম মানায় না। এই পোষাকটা কি বে/মা/না/ন।কালো মানুষ এসব পরলে মানায় নাকি। কেমন বাজে রঙ। ইমরান হাসে না, প্রকান্ড দেহটা আজ হাসপাতালের বিছানায়। আর কি দেখা হবে না মানুষ টার সাথে। মানুষ টা যদি সায় দিত পালিয়ে যেতাম। কি হাস্যকর চিন্তাভাবনা। এমন একজনকে ভালোবাসলাম যার সাথে পালাতে ও পারবোনা। ইশানের কথায় হূঁশ এলো,
‘আন্টি আসবে একবার পাপার কাছে,জানো পাপা তোমাকে অনেক ভালো রাখবে। একবার জ্ঞান এসেছিলো। আমাকে বললো, আমি যেন তোমার খেয়াল রাখি পাপা না থাকলে। আমিও তোমাকে মা বানাবো। আসোনা। আমার পাপা শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১৯
মোনা ওড়না দিয়ে মুখ চেপে ধরে কাঁদছে। কারণ আজ সে সত্যি নিঃস্ব। তার যে ইমরান সাহেবকে চাই। বাবা সব জেনে কেনো এমন করলো! বাবা কি পারতো না মেনে নিতে? বয়সের গ্যাপটাই আজ তাদের বাঁধার কারন হলো!!! আজ থেকে ফুফিকেও হারিয়ে ফেললো। ফুফির তো বিয়ে হয়েছে,ছেলে আছে তাহলে কেনো ফুফি এখনো ভালোবাসে? ইমরান সাহেব শুধু আমার। আমি যাবোই যত রাত হোক। মা থাকলে শেয়ার করতো ওর তো মা নেই। তাই শেয়ার করার মানুষ নেই। মোনা দরজা খুলে বেরোনোর জন্য পা বাড়ায়।
