তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩০
নীতি জাহি
মোনার এই কথার পিঠে কি কথা বলবে মিনহাজ বুঝতে পারলো না। মেয়ের মনে ফুফি সম্পর্কে কোনো রাগ নেই। মোনা বড় একটা শ্বাস ছেড়ে বললো,
‘বাবা বলতে পারো ফুফির কি দোষ? ফুফির একটাই দোষ ভালোবেসে ভু*ল করেছে। ভু*ল মানুষের প্রেমে পড়েছে।’
টেবিলে সবাই প্লেট থেকে হাত উঠিয়ে মোনার দিকে তাকালো। মোনা এক হাতে চোখ মুছলো। গ্লাস থেকে এক ঢোক পানি খেলো।পুনরায় বলা শুরু করলো,
‘ ওয়ান সাইডেড বা বোথ সাইডেড যেমনই হোক ভালোবাসলে সহজে ভু*লা যায় না তুমিই নিজেই তো প্রমাণ। যদি না আঘাত আসে। মাকে ভুলতে পেরেছো?পারো নি তো। আমার বয়স একুশ বছর। ফুফি ওনাকে ভালোবাসে আজ পঁচিশ বছর ধরে। সে কি করে ভু*লবে। যার ভালোবাসার বয়স আমার বয়সের চেয়েও বেশি। স্বয়নে,স্বপনে,রাতে,দিনে একটাই মানুষকে ভালোবেসেছে। যখন ব্যপারটা মানিয়ে নিলো যে মানুষটা তার হবেনা,তখন বিয়ে হলো সংসার ও শুরু করলো। সেই মুহুর্তে শুনলো তার একমাত্র আদরের ভাস্তি,যাকে রাত দিন কোলে পিঠে মানুষ করেছে, অসুখে নিজে না ঘুমিয়ে সেবা করেছে, জ্বরে পুড়ে যখন মা মা করে কাঁদতো তখন সারা রাত বুকে আগলে রেখেছে, নিজে না খেয়ে কত রাত ভাস্তিকে খাইয়েছে সেই মেয়ে কিনা তার ভালোবাসার মানুষকে এভাবে ছি/নি/য়ে নিলো। কেমন লাগবে এই অনুভুতি বাবা তুমি বুঝবে না। নিজের ভালোবাসার মানুষ চোখের সামনে অন্য কাউকে ভালোবাসি বললে ওই মুহুর্ত টা দুনিয়া জ্বা/লি/য়ে পু/ড়ি/য়ে ভস্ম করে দিতে ইচ্ছে করে জানো বাবা। আমার ও ইচ্ছে করেছিলো সেদিন যেদিন….
চোখ বন্ধ করে ফেললো মোনা… যেদিন জেনেছিলাম সে অন্য কারো স্বামী,যেদিন দেখেছিলাম তার সাবেক স্ত্রীর সাথে অন্তরঙ্গ অবস্থায়। পরে অবশ্য সত্যটা জেনেছি। আমার দেখার ভু*ল ছিলো। ভুলের মাশুল আজ ও গুণছি। কিন্তু দেখেছিলাম তো! আমার ফোনে মেসেজ আসত তাদের ভালোবাসার কথা বলে, দাম্পত্য জীবনের ভিডিও পাঠাতো অপরিচিত নাম্বার থেকে। আমার কেমন লাগতো বলো! খুব ভালো তাই না! এই মানুষটাকে বাবা আমি পাগলের মত ভালোবাসতাম জানো, সমাজ,পরিস্থিতি, লোকজনের কথা আমি কিচ্ছু কেয়ার করিনি। ফ্রেন্ডদের বলেছি তোরা জানিস আমার একটা ইমরান সাহেব আছে। কিন্তু আমি জানি মানুষটা আমাকে ভালোবাসে না, যা বলে সব ক্ষনিকের টান আমার প্রতি। এসব ভুলতে এন্টি ডিপ্রেশন পিল খেতাম বুঝতে পেরেছো।
আমি তোমাদের একটা স্বীকারোক্তি দিই বাবা? আমি তোমার মেয়ে মোনাশা ইকবাল গত ছয় বছরে দুই দুই বার সু*ই*সা*ই*ড এটেম্পট করেছি। ভাগ্য ভালো ছিলো বেঁচে গিয়েছি। দীপ্তকে মা হারা করোনা। আমি বুঝি মা না থাকার কষ্ট, ফুফি ওই কষ্ট অনেকটা কমিয়ে দিয়েছিলো। ইশান বুঝে মা না থাকার কষ্ট। আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করবো ওর জন্য। তোমাদের কোনো প্রশ্ন থাকলে করতে পারো?’
মিনহাজ মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে৷ কথা নেই মুখে। খাবার টেবিলে সবাই এক আকাশ বিস্ময় নিয়ে সামনের বসে থাকা কিশোরীকে দেখছে। ইমরান হতবিহ্বল। মনসুর প্রশ্ন করলো,
‘ মা তুই এই কাজ কখন করছিস আমরা টের পেলাম না।’
হাসছে মোনা। চাচার দিকে তাকিয়ে বলে,
‘ প্রথম বার করেছি এস এস সি পরীক্ষার আগে বিরহের যন্ত্রণা সহ্য হয়নি।যাকে এত ভালোবাসলাম সে ফেলে চলে গেলো। জেনেছিলাম তার প্রথম স্ত্রী সন্তানের কথা।হ্যাঁ এটা ঠিক আমার টাও ফুফির মত এক তরফা ছিলো। কারণ ৯৯% এপ্রোচ আমার ছিলো। দ্বিতীয় বার করেছি মানুষটা যখন দ্বিতীয় বার ছেড়ে চলে গেলো। চাচী জানে। প্রথমবার চয়ন দেখেছিলো হাত কে টে ফ্লোরে অচেতন হয়ে পড়েছিলাম। চয়নের বোন সাদিয়া আপু তখন নতুন মেডিকেল অফিসার। আপু তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলো। হাত কা টা ছিলো অনেক দিন। দেখোনি তোমরা। নিজেদের কাজে ব্যস্ত ছিলে। দ্বিতীয় বার তোমরা বাসায় ছিলে না। গলায় দড়ি দিয়েছিলাম চাচী এসে ধরেছে দরজার নব ভেঙে। জানিনা চাচী কিভাবে বুঝেছিলো আমি এই কাজ করতে যাচ্ছিলাম। থাক বাদ দাও এসব। যার মন ভা*ঙ্গে সে বুঝে ভা*ঙ্গার কষ্ট।
বাবা শুনো, তুমি দূরেই থাকো, মোনা অনেক আগে নিজের চাঞ্চল্য হারিয়ে পথহারা হয়েছে। তুমি আমাকে বিয়ে দিয়েছো সেই মানুষ টার সাথে যে আমার চোখে নিষ্ঠুরতম একজন। যে অন্যকারো অনুভূতি বুঝে না। আচ্ছা পুরুষ মানুষ এমন কেনো? এই যে, আপনি ইমরান শরীফ খান,ভালোবাসলেই তো পারতেন আমার ফুফিকে।তাহলে আজ এই দূর্দিন দেখতে হত না আমাদের?? ”
আর বেশি মুখ খোলানো যাবে না মিনহাজ স্পষ্ট বুঝতে পারছে। এখন ওকে সামলাতে পারবে একমাত্র ইমরান। কিন্তু ও তো জেদ ধরে বসে আছে। মিনহাজ উঠে গেলো টেবিল থেকে।
‘আপা এখন আর খাবোনা, এখন উঠবো। মায়াটাকে সামলাতে হবে বাসায় গিয়ে। মোনাকে দেখে রাখবেন। এখন আর ম রতে যেও না। যা করেছো আগে করেছো,তোমার এহেন কান্ডে আমার কবরে যাওয়ার টিকিট কাটতে হবে। ইমরান আর মোনা নিজেদের সমস্যা যত তাড়াতাড়ি পারো মিটিয়ে নাও। তোমরা সুখে থাকলে আমরা ভালো থাকবো।এত কষ্টের পরে এক হয়ে বাচ্চামি করোনা। ইমরান তুই সব সামলে নিবি আমি জানি।’
আইরিন খাবার প্যাক করে দিয়েছে ওই বাড়ির জন্য ইমরান টেবিল থেকে উঠে এগিয়ে দিয়ে আসলো ওদের। মোনাই শুধু মাত্র খাবার ঠিক মত খেলো। সবাই বিস্মিত নয়নে দেখছে। রুবিনা এবং তুশি এগিয়ে রুমে নিয়ে আসলো মোনাকে। ইমরান নিজের রুমে মোনাকে না রাখাতে সবাই অসন্তুষ্ট অন্য দিকে মুখের উপর কথা বলার সাহস ও নেই কারো। ওরা চলে গেলে মোনা রুমের দরজা দিবে তৎক্ষনাৎ ইশান দরজায় উঁকি দিয়ে বললো,
‘মা আসি?
মোনার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠলো।
‘আসো।’
‘আজ রাত তোমার সাথে থাকি। আমি ডিভানে থাকবো। কিন্তু তোমার কাছাকাছি থাকতে চাই।’
বাকহারা মোনা ইশানের দিকে তাকিয়ে আছে। মায়ের কাছে থাকার জন্য কত আকুল আবেদন। অথচ এই ছেলে জীবনের ১৮ টা বছর মা ছাড়াই কাটিয়েছে। নতুন মা পেয়ে লোভ সামলাতে পারেনি। মোনা তো জানেই না মায়েরা কেমন হয়।সে নিজে ও মা হারা। তাও সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এই ছেলেটা যেন কিছুটা মা ফিল পায়। ডিভানে আরাম করে বসলো ইশান। ওখান থেকেই গল্প করছে মোনার সাথে। মোনা খাট ছেড়ে উঠে ইশানের পাশে বসে কোলে মাথা দিতে বললো। চুলে বিলি কেটে দিতে লাগলো। খেয়াল করলো ইশান কাঁদছে।
‘ ইশান কাঁদছো কেনো?’
লজ্জা পেয়ে চোখের পানি মুছে বলে,
‘ধন্যবাদ মা আমার কাছে আসার জন্য। সবাই আমাকে আগে বলতো মা হারা ছেলে।এখন আর কেউ বলবে না।পাপার উপর রাগ করেও কখনো ছেড়ে যাবার কথা ভাববে না। মনে থাকবে?’
মোনার ও চোখের কোণে পানি। উজ্জ্বল মুখ করে অধর প্রসারিত করে মোনা উত্তর দিলো,
‘ ঠিক আছে বাবা মনে থাকবে। এখন ঘুমান।আপনি ঘুমালে আমিও ঘুমাবো।’
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২৯
ইশান কথা না বাড়িয়ে চোখ বন্ধ করলো। কিছুক্ষণের মধ্যে ছেলে ঘুমিয়ে পড়লো। ‘মা’ ডাকটা শুনেই মোনার বুকের ভেতর টা কেমন যেনো করলো। এই ডাকটা এত মধুর কেনো? আসতে না আসতেই ইশান মা ডাকাও শুরু করে দিলো? মা ডাক শুনতেই এত সুখ লাগছে তাহলে যারা মা তাদের জীবনে কত সুখ?
