তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৩
নীতি জাহি
ক্রোধ মানুষকে ধীরে ধীরে ধ্বং*সের পথে নিয়ে যায়। নিজেকে বরাবর সংযত করা শিখেছে ইমরান। যখনই ক্রোধের পরিধি বেড়েছে তখনই সেজদায় পড়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছে।দু রাকাত নফল সালাত আদায় করে উঠে পড়ে ইমরান। নিকষ কালো অন্ধকার রজনী। বাতাসের ঝাপটায় ব্যালকনিতে পর্দা গুলো নড়ে উঠছে। ফোন টা চার্জ থেকে খুলে বাইরে পা বাড়ালো। পরশু দিন বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান। কালকে থেকে সব অতিথি আসা শুরু করবে। আজকের মধ্যেই সব ঠিক করতে হবে। কিছু সমস্যার সমাধান দ্রুত হওয়াই ভালো আর কিছু ধীরে সুস্থে। এখন যে সমস্যাটি সামনে আছে তার সমাধান করে কাজে লেগে যেতে হবে। ইমরান কিচেনে পা বাড়ালো। কড়া একটা কফি প্রয়োজন, মাথাটা বেশ ধরেছে। মোনার পরিবর্তনটা ভালো লাগছে না।
দমকা বাতাস,হালকা বৃষ্টির ঝাপ্সা ঝাপটা,অঙ্গ শিহরিত হওয়ার মত সুবাতাস,মন ভালো না হওয়ার দ্বিতীয় অপশনই নেই। বাগানের ফুল গাছ গুলো দুলছে। মোনার গান ধরতে ইচ্ছে করছে। ইমরানের বারান্দার দিকে তাকালো। ইমরানের আর ইশানের বারান্দা দুটো বেশি সুন্দর। হঠাৎই চোখ যায় বাগানের কোণায় টুপ টুপ পানি পড়া ছাদটার দিকে। ছোট একটা ঘর। সে ঘরে বাস করে এই বাড়ির সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। প্রথম দিকে মোনা ভয় পেত কিন্তু ইশান সেই ভয় ভাঙিয়ে দিয়েছে। শেপার্ড কে দেখলে যে কেউ ভয় পাবে।কিন্তু এই কুকুরশাবকটি আদর ব্যতীত অন্য কিছুই চায় না বিনিময়ে সে প্রাণ ও দিবে। তবে মোনা শুনেছে ইমরান সাহেব নাকি এই কুকুরের কথা বুঝেন। কুকুর ও উনার সব বুঝে। এটা কি আদৌ সম্ভব!
মোনা খালি গলায় গান ধরলো,
একটু যদি তাকাও তুমি
মেঘগুলো হয় সোনা,
আকাশ খুলে বসে আছি
তাও কেন দেখছো না?
একই আকাশ মাথার উপর
এক কেন ভাবছো না?
আকাশ খুলে বসে আছি
তাও কেন দেখছো না?
কাধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে পেছন ফিরে দেখে ইমরান সাহেব, কেমন মোহ নিয়ে তাকিয়ে আছে মোনার দিকে। সাদা টি-শার্ট আর এডিডাস এর একটা নেভি ব্লু ট্রাউজার। অকস্মাৎ ইমরান গেয়ে উঠলো ব্যালকনির বর্ডারে দু হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে,
আসবে বলে ঐ যে দেখো
মেঘেরা দাঁড়িয়ে,
আকাশটাকে দেখি চলো
মেঘটাকে তাড়িয়ে!
মেঘের মতো হাটবো দুজন
হাত কেন রাখছো না?
আকাশ খুলে বসে আছি,
তাও কেন দেখছো না?
ইমরান থেমে গেলো। মোনার কান্নার আওয়াজ শুনে। সে জানে মোনা কেনো কাঁদছে। আর মেয়েটাকে এভাবে কাঁদতে দিতে ইচ্ছে করছে না।
‘মোনা কাঁদছো কেনো?’
মোনা চোখ মুছে নিজেকে প্রস্তুত করে বললো,
‘কই নাতো এমনি।’
‘হুম।’
‘ঘুমান নি আপনি?’
‘নাহ,আসছে না।’
‘একটা কথা বলি ইমরান সাহেব? ‘
এই আবদারটা কত আকুলতা ব্যকুলতা নিয়ে করা মোনার গলা শুনে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। ইমরান মাথা নেড়ে সম্মতি দিতেই মোনা বলল,
‘আমি আর পারছিনা নিতে,আর পারছিনা। আর কি কি শাস্তি পেতে হবে আমাকে?’
ইমরান চোখ খিচে নিজেকে সংযত করে এক হাত দিয়ে মোনার বাম কাঁধে হাত রেখে নিজের কাছে টেনে নিলো। ওর মাথাটা ইমরানের বুকে চেপে ধরলো। মোনা ফুফিয়ে কেঁদেই যাচ্ছে। ইমরান বাঁধা দিচ্ছে না। অনেকক্ষণ কাঁদার পর থামলো।
‘ মানুষ কেঁদে নিজের বুক বাসায়,আর আপনি ভাসালেন স্বামীর বুক।’
ইমরানের কথা শুনে মোনা চরম লজ্জায় পড়ে গেলো। লোকটা এভাবে লজ্জা দিলো কেনো। সে কি জানেনা এই মেয়েটি তার এসব কথায় ভীষণভাবে লজ্জা পাবে। মোনা মাথা উঠিয়ে নিতে চাইলো বুক থেকে, তখনি ইমরান আরো চেপে ধরলো।
‘এভাবে থাকেন ফেইরী কুইন, কিছুটা শান্তি দিন। বুকটা এতদিন কতটা তৃষ্ণার্ত ছিলো জানেন? মোনালিসা নামক প্রেমপ্রিয়াকে জড়িয়ে ধরার আশায় ভেতরটা মরুর মত শুকিয়ে গিয়েছে। স্রষ্টার কাছে একটাই প্রার্থনা ছিলো যেন ফেইরী টা ইমরানের কুইন হয়ে যায়।বলতে পারেন আমার একমাত্র প্রেম -প্রার্থনা।’
ইশ আবেগের কত সুন্দরতম বহির্প্রকাশ । কিছুক্ষন থাকার পর ইমরান মোনাকে বুক থেকে তুলে দু হাতের আজলায় মোনার মুখ ধরলো। ছোট্ট একটা মুখ,কি স্নিগ্ধতা,কতটা সুরভিত। ইমরান মোনার কাছে এসে জোরে শ্বাস নিলো। মোনালিসা আজ আবার কি মেখেছো গায়ে? সেই বেলী ফুল। তোমার শরীর থেকে এমন বাচ্চাদের ঘ্রান আসে কেনো?
‘পাউড়ার লাগিয়েছিলাম,মাঝে মাঝে লোশন দিই।’
‘লাগাবেনা এইসব জিনিস, এই বয়সে কোনো ভাবে নেশাখোরের মত আচরন করতে চাই না। আশ্চর্য মাথা ঝিম ঝিম করছে। দম আটকে আসছে আমার। মনে হচ্ছে মারাত্নক কিছু একটা করে ফেলব।এতক্ষন বুকের মধ্যে আছো বুঝতে পারছো না আমার ভেতরে কি চলছে?? যুদ্ধ করছি নিজের সাথে।’
মোনা ইমরানের এই রূপের সাথে সম্পূর্ণ অপরিচিত। দুই অধর আলগা করে হা হয়ে আছে। চোখদুটো অক্ষিকোটর থেকে বেরিয়ে আসার অবস্থা। শুকনো ঢোক গিলছে। কি বলছে না বলছে মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। কিছুটা
আ/ত/ঙ্কি/ত হয়ে আছে,এখনো চোখ দিয়ে পানি ঝরছে,
‘এই মেয়ে আর কাঁদবেনা। হাসলে সুন্দর লাগে বলে কাঁদাতে চাইলাম যেন আমার তোমার প্রতি কোনো আকর্ষণ না জাগে। এখন দেখি কাঁদলে তো টসটসা চেরী ফল হয়ে যাও। নাক চোখ গাল সব গোলাপী রঙ ধারণ করে। যত জ্বালা আমার। এমনিতেই সামলাতে পারছিনা নিজেকে।এই বেয়াল্লিশ বছরের জীবনে এত যুদ্ধ কখনো করিনি নিজের সাথে। কাউকে কাছে পেতে কোনো কসরত করতে হয়নি। একা যখন ছিলাম এসব মাথায় ও আসেনি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে বেসামাল হয়ে পড়ছি।’
মোনা কেমন হা করে ড্যাব ড্যাব চোখে তাকিয়ে আছে। এসব কথা কি বলছে এই কঠিন যন্ত্র মানবটা। নিজেকে স্থির করে মোনা বলল,
‘ এগুলো কি বলেন?’
‘কেনো তুমি বুঝো না?’
‘বুঝি বলেই তো জিজ্ঞেস করলাম। কেমন যেন এডাল্ট কথাবার্তা। কি সব ইঙ্গিত দিচ্ছেন।’
‘মোনালিসা, কি বলো এসব। আমি মানুষটা এডাল্ট, কথাবার্তা কি চাইল্ডিশ হবে?’
মোনার চোখে বিস্ময়। বড় বড় ঢোক গিলছে। এ কোন ইমরান। ইমরান মোনাকে ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে বলে রুমে ডুকলো। ৫ মিনিট পর ফিরে এলো দুটো মগ হাতে। বারান্দায় বেতের চেয়ার দুটো টেনে একটাতে মোনাকে বসিয়ে অন্যটাতে নিজে বসে। মোনার দিকে একটা মগ এগিয়ে দিলো।
‘ মিল্কশেক তো বানাতে পারিনা,এটা দিয়ে কাজ চালিয়ে নাও।’
মগটা নিয়ে এক চুমুক নিয়ে ইমরানের দিয়ে বড় গোল অক্ষি নিক্ষেপ করলো।
‘এটা তো হরলিক্স ইমরান সাহেব?’
‘হ্যা, তোমার পছন্দের ‘
‘এ্যই, আপনি আমাকে কি ভাবেন? আমি গত ছয় মাস থেকে হরলিক্স খাই না আগের মত। আমি বড় হয়েছি না।’
‘কে বলেছে বড় হতে,ছোট থাকো তুমি।’
কথা শেষ করে ইমরান অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। এখনো পিচ্চিটা হরলিক্স খায়। আবার গর্ব করে বলছে ছয়মাস আগে ছেড়েছে।
‘মোনালিসা তুমি এখন কোন ইয়ারে?’
‘ সেকেন্ড ইয়ারে।’
‘অনেক বড় হয়েছে একদম বুর্জ খলিফার মতো।’
মুখ টিপে হাসছে ইমরান।
‘একদম মজা করবেন না,আমাকে কাঁদিয়ে,কষ্ট দিয়ে আসছে মজা করতে। কোনো কথা নেই আপনার সাথে।’
মোনাকে চেয়ার থেকে টেনে উঠিয়ে নিজের কোলে বসালো। মনে হচ্ছে একটা আদুরে ছোট্ট বাবু কোলে নিয়েছে। মোনার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ইমরান। মোনা চুপটি করে ইমরানের কোলে বসে বুকের সাথে লেপ্টে আছে।
‘আর কখনো এমন করবে? নিজেকে আ/ত্ন/হু/তি দিতে কি আনন্দ? যত কষ্টই হোক এসে আমাকে জানাবে ঠিক আছে? মনে থাকবে?’
মোনা উপর নিচে মাথা নাড়লো। সহসা ইমরান টুপ করে মোনার কপালে আলতো করে ওষ্ঠ ছোঁয়ালো। মোনা লজ্জা পেয়ে মিইয়ে গেলো।
‘মোনালিসা এটা তোমাকে আমার দেওয়া প্রথম এবং বৈধ স্পর্শ। তোমার কি খারাপ লেগেছে?’
আর কত লজ্জা দিবে এই লোক। মানলাম মোনা উনার তুলনায় অনেক ছোট তাই বলে এভাবে বলবে।
‘হরলিক্স টা শেষ করো,ঘুমোতে হবে।আমার কফি তো শেষ।’
ইমরান পুনরায় বললো,
‘ লজ্জা পেয়ে আর গাল লাল করতে হবে না। এভাবে আর দশ মিনিট লজ্জা পেলে আমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসব। আমি চাইনা এখন এসব কিছু হোক। শুনো পরশু একটা প্রোগ্রাম আছে বাড়িতে অতিথিরা আসা শুরু করবে। সবাইকে সামলে নিতে পারবে না সুইটহার্ট? তুমি কিন্তু এখন ইমরানের একমাত্র মল্লিকা। মল্লিকা মানে বুঝো মনের মালকিন। সব দায়িত্ব তোমার।’
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩২
‘ হুম পারবো ‘
ইমরান এবার লাজে রাঙা গাল দুটোতে দুইবার অধর ছুইয়ে মোনাকে কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে কাঁথা টেনে লাইট নিভিয়ে নিজেই রুম থেকে বেরিয়ে আসলো। মনে মনে ভাবলো, চেয়েছিলাম মেয়েটাকে স্বাভাবিক করে সামলে নিতে আর নিজেই অস্বাভাবিক,বেসামাল হয়ে হয়ে রুম থেকে বের হলাম। এই মেয়ের আশে পাশে আমার মত পুরুষ থাকা ঘোর বিপদজনক। নিজেও নিজের কাজে লজ্জা পেয়ে হাসি দিলো।
