তুমি এলে অবেলায় শেষ পর্ব
আতিয়া আদিবা
জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ, নির্ঘুম আর নিঃস্ব একটা রাত কাটাল শেহজাদ। প্রতিটা সেকেন্ড যেন তার বুকের ওপর চাবুক মেরে পার হচ্ছিল। একদিকে লাইফ সাপোর্টে থাকা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া জন্মদাত্রী মা, অন্যদিকে নিজের সমস্ত অহংকার ধূলিসাৎ করে দেওয়া সামাইরার সেই অবরুদ্ধ প্রস্থান। প্রভাতের সূর্যটা যখন কাঁচের দেয়াল ফুঁড়ে হাসপাতালের মেঝেতে পড়ল ঠিক তখনই আইসিইউ-এর স্পেশাল কেবিন থেকে ডাক্তার হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। ওনার মুখে তখন অবিশ্বাস্য এক স্বস্তির হাসি।
-মি. রহমান! ইটস আ মিরাকল! আই ক্যান্ট বিলিভ ইট।
-কি হয়েছে ডাক্তার?
– আপনার মায়ের ভাইটালস স্ট্যাবল হতে শুরু করেছে।
শেহজাদের চোখ ভিজে উঠল। সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলল,
-সত্যিই আনবিলিভেবল। উনার হার্টবিট এখন পুরোপুরি নরমাল। আমরা ওনাকে লাইফ সাপোর্ট থেকে বের করে এনেছি। ওনার জ্ঞান ফিরেছে!
ডাক্তারের এই একটিমাত্র কথা যেন শেহজাদের মৃতপ্রায় শরীরে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করল। সে এক দীর্ঘ, অবরুদ্ধ শ্বাস ফেলে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখটা ঢাকল। মনের ভেতরের সবটুকু কৃতজ্ঞতা ওপর ওয়ালার চরণে জড়ো করল। চোখের কোণ দিয়ে জল হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। অস্ফুট স্বরে বলল, আলহামদুলিল্লাহ!
শেহজাদ ধীর পায়ে লাউঞ্জ ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরের ওয়েটিং জোনে পা রাখল। আর তখনই তার চোখ দুটো থমকে গেল।
সোফার এক কোণায় বসে আছেন আমিনুল হক। আর ওনার কোলে মাথা রেখে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে গর্ভবতী সামাইরা। তার মুখটা ক্লান্তিতে বড় ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। চোখের কোণায় এখনো শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ স্পষ্ট। এই মেয়েটি সারারাত এখানে জেগে ওনার মায়ের জন্য প্রার্থনা করেছে!
এই দৃশ্যটা শেহজাদের বুকের ভেতরের সমস্ত পুরুষালি জড়তাকে কিছুটা গলিয়ে দিল।
সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে আমিনুল হকের সামনে এসে দাঁড়াল। ওনার কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল,
-বাবা, মা এখন ভালো আছেন। লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়েছে।
আমিনুল হক চোখ মেলে তাকালেন। ওনার চোখেও তখন স্বস্তির জল। শেহজাদ আলতো করে সামাইরার কাঁধে হাত রাখল।
-সামাইরা… ওঠো।
সামাইরা ধড়ফড় করে উঠে বসল। চোখ মেলতেই শেহজাদকে সামনে দেখে কিছুটা অবাক হল। শেহজাদ শান্ত গলায় বলল,
-মায়ের লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হয়েছে। উনি ভালো আছেন। চলো তোমাদের ব্রেকফাস্ট করিয়ে আনি।
হাসপাতালের ক্যাফেটেরিয়াতে বসে সামাইরা আর আমিনুল হক ব্রেকফাস্ট করলেন। পুরোটা সময় শেহজাদ সামাইরার সাথে এক অদ্ভুত দূরত্ব বজায় রাখল। সহজ গলায় বলল,
-সামাইরা, তুমি বাবার সাথে বাড়িতে ফিরে যেতে পারো। এখানে আর কষ্ট করার প্রয়োজন নেই।
সামাইরা এক মুহূর্তের জন্য শেহজাদের মুখের দিকে তাকাল। শেহজাদ আজ তাকে কত সহজে চলে যেতে বলছে! সামাইরা কথা বাড়াল না। একদম বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে আমিনুল হকের হাত ধরে সে শান্ত পায়ে হাসপাতালের করিডোর ধরে বিদায় নিল। শেহজাদ দূর থেকে শুধু তার চলে যাওয়া দেখল।
পরবর্তী বেশ কয়েকটা দিন সুফিয়া রহমানকে হাসপাতালের স্পেশাল কেবিনে কড়া অবজারভেশনে রাখা হলো। এই কদিনে সামাইরা নিয়ম করে প্রতিদিন হাসপাতালে এসেছে। সে সুফিয়া রহমানের পাশে বসে গল্প করেছে, ওনার মুখে নিজ হাতে স্যুপ তুলে দিয়েছে।
অবশেষে সেই দিনটা এলো।
ডাক্তাররা সুফিয়া রহমানকে সম্পূর্ণ ফিট ঘোষণা করে আজই ডিসচার্জ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ভিলার গাড়ি অলরেডি নিচে এসে দাঁড়িয়েছে ওনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
সামাইরাও যখন বিদায় নিতে যাবে, ঠিক তখনই শেহজাদ ওর সামনে এসে দাঁড়াল। সে নিচু স্বরে বলল,
-সামাইরা, নিচে নামার আগে আমার সাথে একটু হাসপাতালের ছাদে আসবে? কিছু জরুরি কথা ছিল।
সামাইরা কোনো আপত্তি করল না। সে শান্ত পায়ে শেহজাদের পেছন পেছন হাসপাতালের বিশাল খোলা ছাদে এসে পা রাখল। এখানে সাধারণ মানুষদের আসা নিষেধ। হয়ত শেহজাদের কাছে এই নিয়ম নিতান্তই তুচ্ছ!
শেষ বিকেলের মিষ্টি হাওয়া বইছিল ছাদে। বাতাসে সামাইরার গায়ের কালো শাড়ির আঁচল আর অবাধ্য চুলগুলো উড়ছিল। শেহজাদ রেলিং-এর পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
একটু পরেই ঢাকার নিয়ন বাতিগুলো জ্বলে উঠবে। গোধূলির আলোয় চারপাশটা বড্ড ম্লান দেখাবে।
শেহজাদ সামাইরার দিকে না তাকিয়েই বলতে শুরু করল,
-মা আজ পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। আমি জানি, স্কাইলাইন ভিলায় কাটানো প্রতিটা মুহুর্ত তোমার কাছে জাস্ট লাইক হেল। আমি তোমাকে প্রমিজ করেছিলাম, মা ফিরে এলে তোমাকে আর এক মুহূর্তও এই খাঁচায় আটকে রাখব না। আমি আগামীকালই আমার লইয়ারকে দিয়ে আমাদের অফিশিয়াল ডিভোর্স পেপার তোমার বাবার বাড়ির ঠিকানায় পাঠিয়ে দেব। তুমি যেখানে সই করলেই আমাদের এই বাধ্যবাধকতার সম্পর্কটা চিরকালের জন্য শেষ হয়ে যাবে।
শেহজাদ একটু থামল। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামাইরার মুখোমুখি হয়ে বলল,
-কিন্তু সামাইরা… এই সন্তান যেহেতু আমার নিজেরও, তাই বাচ্চার ফিউচার আর তোমার সিকিউরিটির জন্য আমি অনেকগুলো ব্ল্যাংক চেক আর রহমান গ্রুপের অর্ধেক প্রপার্টি তোমার নামে লিখে দিতে চাচ্ছি। ওটাতে তুমি কোনো অমত না করো। ওটা তোমার অধিকার। আমার সন্তানের অধিকার।
সামাইরা এতক্ষণ কাঠের মূর্তির মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে শেহজাদের এই বিদায়ের ভাষণ শুনছিল। সহসা একটি বিকট শব্দ হল।
ঠাস!
সামাইরা নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে কষে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল শেহজাদের গালে।
সেই থাপ্পড়ের তীব্রতায় শেহজাদের মাথাটা একপাশে ঘুরে গেল। তার গালটা এক নিমেষে লাল হয়ে উঠল। জীবনের প্রমবারের মতো কেউ তার গায়ে হাত তোলার দুঃসাহস দেখিয়েছে! সে হতভম্ব হয়ে সামাইরার দিকে তাকাল।
সামাইরার চোখ দিয়ে তখন অবাধ্য কান্নায় জল গড়িয়ে পড়ছে। তার ফর্সা মুখটা রাগে আর অভিমানে লাল হয়ে উঠেছে। সে শেহজাদের বুকের ওপর সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,
-আপনার কী মনে হয় মিস্টার রহমান? আমি আপনাকে এত সহজে ছেড়ে দেব? আপনার মতো একজন অহংকারী, জানোয়ারের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে আমি বড্ড শান্তিতে চলে যাব? সত্যিই যদি ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছে হতো, তবে আমি কবেই ছেড়ে চলে যেতাম!
শেহজাদ নিজের গালের ব্যথা ভুলে সামাইরার এই রূপ দেখে বড্ড অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
-এর মানে কী? তুমিই নিজেই তো ওই শর্তের কাগজ তৈরি করেছিলে!
সামাইরা নিজের চোখের জল এক হাত দিয়ে মুছে ঝড়ের গতিতে নিজের হাতব্যাগটা খুলল। ব্যাগ থেকে সে ভাঁজ করা সেই চুক্তিপত্র বের করল। আর তার সাথেই বের করল তাদের নিকাহনামার এক কপি। সে দুটো কাগজই এক ঝটকায় শেহজাদের বুকের ওপর ছুড়ে মেরে বলল,
-নিন! নিজের চোখ দুটো ভালো করে বুলিয়ে নিন কাগজগুলোতে। দেখুন এর মানে কী!
শেহজাদ অবাক হয়ে কাগজ দুটো হাতে নিল। সে কোনো সমীকরণ মেলাতে পারছিল না। তাই অবুঝের মতো কাগজ দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল।
সামাইরা তখন কাঁপাকাঁপা গলায় নিজের ভেতরের জমানো সবটুকু অভিমান উগরে দিতে লাগল,
-বিয়ের রাত নিয়ে প্রতিটা মেয়ের কত শত স্বপ্ন থাকে, জানেন? আমিও ভেবেছিলাম আমার স্বামীকে আমি আমার জীবনের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসা। ওর জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেব। কিন্তু বিয়ের প্রথম রাতেই আপনার মুখে প্রেমিকার কথা শুনলাম। সারা রাত ভিডিও কলে ওর সাথেই সময় কাটালেন। আমার ভেতরে ঠিক কতটা ক্ষত তৈরি হয়েছে জানেন? জানেন না। আমার স্বামী শুধুমাত্র আমার থাকবে। তার সবকিছুতে একমাত্র আমার অধিকার থাকবে। তার প্রতিটা নিঃশ্বাসে আমি থাকব। কিন্তু….
সামাইরা এবার শব্দ করে কেঁদে উঠল,
-বাসর ঘরে আপনাদের প্রেম দেখলাম। আপনার একগুঁয়ে ব্যবহার সহ্য করলাম। কথায় কথায় অহংকার আর পজেসিভনেসের অত্যাচার দেখলাম। আমার আত্মসম্মানে অনেক লেগেছিল সেসব।
কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি আমার সংসার ভেঙে, আমাদের বাচ্চাকে এতিম করে আপনাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম!
শেহজাদ এবার চমকে উঠল। সে হাতের কাগজটা দেখিয়ে বলল,
-তাহলে… তাহলে এই লিগ্যাল কন্ট্রাক্ট পেপার? এইসব শর্ত?
সামাইরা বিরক্ত হয়ে বলল,
-মাথামোটা! ওই চুক্তিপত্রে আমার যে স্বাক্ষরটা আছে, ওটার দিকে তাকান। আর আমাদের নিকাহনামায় আমার যে সই আছে, ওটার দিকে তাকান। দুটো মিলিয়ে দেখুন তো একবার!
শেহজাদের মাথায় যেন মুহূর্তেই বিশাল এক বাজ পড়ল। সে দ্রুত দুই কাগজের নিচের সই দুটোর দিকে তাকাল। নিকাহনামার নিচে অত্যন্ত নিখুঁত টানে লিখা,
সামাইরা বিনতে হক।
আর চুক্তিপত্রে যে সই করেছিল, সেটার নিচে কোনো নাম লিখা নেই! হিজিবিজি করে অন্য কিছু একটা আঁকিবুঁকি করা। যা কোনো সই হিসেবেই গণ্য হবে না! অর্থাৎ, সামাইরা নিজের আসল স্বাক্ষর ওই কাগজে কোনোদিন করেইনি!
শেহজাদ হতবাক হয়ে কাগজের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর চোয়ালের হাড় আলগা হয়ে এলো। সে অবাক হয়ে বিড়বিড় করে বলল,
-তারমানে এসব জাস্ট ড্রামা ছিল? এতগুলো দিন তুমি আমাকে স্রেফ বোকা বানিয়েছ?
সামাইরা নিজের ওড়নার আঁচলটা ঠিক করতে করতে নিস্পৃহ গলায় বলল,
-ড্রামা ছিল না মিস্টার রহমান। ওটা আপনাকে একটু শিক্ষা দেওয়ার একটা ছোট্ট উপায় ছিল মাত্র।
শেহজাদ কাগজগুলো মুঠোর মধ্যে চেপে ধরল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠতে চাইল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল দ্রুত। সে এক পা এগিয়ে সামাইরার চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় শুধাল,
-তোমার শিক্ষা দেওয়া কি শেষ হয়েছে? আর ইউ ডান?
সামাইরা কোনো উত্তর দিল না। সে মুখ ঘুরিয়ে চুপ করে রইল। ওর চোখের সেই নীরবতা বলছিল, হ্যাঁ, শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। বেশ ভালোভাবেই হয়েছে। বোধহয় অভারডোজই হয়েছে।
এবার শেহজাদ ওর আগের রূপে ফিরে গেল। এক মিষ্টি প্রতিশোধের খেলায় মেতে উঠল। সে সামাইরাকে একটু কষ্ট দেওয়ার জন্য নিজের চেনা দাম্ভিক মুখটা তৈরি করে অত্যন্ত অবহেলার সুরে বলল,
-শিক্ষা তো দিলে। কিন্তু সামাইরা, আমি সত্যিই এখন তোমাকে ডিভোর্স দিতে চাই। তোমার মতো থার্ড-ক্লাস, মিডল ক্লাস মেলোড্রামাটিক মেয়ের সাথে সংসার করার ইচ্ছা আমার আর বিন্দুমাত্র নেই। আই অ্যাম ডান উইথ ইয়োর ড্রামা!
শেহজাদের মুখ থেকে এই আকস্মিক নিষ্ঠুর কথাটি শুনে সামাইরার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে ছ্যাঁত করে উঠল। তার চোখ দুটো আবার নোনা জলে ভরে গেল। সে ভাবতেই পারেনি শেহজাদ সত্যি সত্যি তাকে এভাবে রিজেক্ট করে দেবে। সে নিজের ভেতরের সবটুকু কষ্ট চেপে নিয়ে মাথা নিচু করে কান্নাভেজা গলায় বলল,
-ঠিক আছে। আপনার যা ইচ্ছে তা-ই হোক।
কথাটা বলেই সে অত্যন্ত অভিমান নিয়ে ছাদ থেকে নেমে যাওয়ার জন্য উল্টো দিকে এক পা বাড়াল।
ঠিক তখনই শেহজাদের বলিষ্ঠ ডান হাতটা ধেয়ে এসে খপ করে সামাইরার নরম কবজিটা চেপে ধরল। এক হ্যাচকা টানে সে সামাইরাকে নিজের দিকে নিয়ে আসল। সামাইরা টাল সামলাতে না পেরে সরাসরি এসে আছড়ে পড়ল শেহজাদের চওড়া বুকের ওপর।
শেহজাদ নিজের অন্য হাত দিয়ে সামাইরার কোমরটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের সাথে লেপ্টে নিল। ওর তপ্ত নিঃশ্বাস সামাইরার কপালে আছড়ে পড়ছিল। সে সামাইরার মুখের দিকে তাকিয়ে বিজয়ী হাসি হেসে ফিসফিস করে বলল,
-ব্লাডি মিডল ক্লাস উইমেন! ভেতরে ভেতরে ভালোবেসে মরে যাবে, কিন্তু নিজের এই মাথাটা কোনোদিন নত করবে না তাই না? তুমিও কী ভেবেছিলে? এত সহজে ‘কিং’ এর ডেরা থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে?
সামাইরা লজ্জা পাওয়ার বদলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-‘কিং’ কে?
শেহজাদ সন্তপর্ণে জিভ কেটে অস্ফুটে বলে উঠল,
-ফা*ক! কেউ না কেউ না! নিজেকেই নিজে বিজনেস এর কিং বলছি আর কি।
সামাইরাকে আরোও শক্ত করে ধরল এবার শেহজাদ।
সামাইরা লজ্জায় নিজের মাথাটা নিচু করে ওর বুকে মুখ লুকালো।
শেহজাদ নিজের দুই আঙুল দিয়ে সামাইরার চিবুকটা আলতো করে ধরে ওপরে তুলল। সামাইরার ঠোঁটের ঠিক কয়েক ইঞ্চি দূরত্বে নিজের মুখটা নামিয়ে এনে, এক অনন্ত ভালোবাসার প্রলেপ মাখিয়ে বলল,
-এই পুরো ঢাকা শহর শাসন করা আমার কাছে বড্ড সহজ, সামাইরা। কিন্তু আমাকে পদে পদে শায়েস্তা করার জন্য এই পৃথিবীতে একজন ‘সামাইরা বিনতে রহমান’-ই প্রয়োজন। ইউ আর মাইন, ফর আ লাইফটাইম!
সামাইরা চোখ দুটো বড় বড় করে বলল,
-বিনতে রহমান! আমি কি আপনার মেয়ে নাকি? আপনি ‘বিনতে’ শব্দের আসল অর্থ জানেন তো মিস্টার? বিনতে মানে হলো কন্যা। আমি আপনার মেয়ে নাকি যে আমার নামের শেষে বিনতে রহমান লাগাচ্ছেন?
শেহজাদ সামাইরার এই লজিক্যাল কথায় বিন্দুমাত্র লজ্জিত হলো না। সে নিজের ডান চোখটা আলতো করে টিপে দিয়ে হেসে বলল,
-তো কী হয়েছে? আজ থেকে প্রতি রাতে ইউ হ্যাভ টু কল মি ‘ড্যাডি’। তাহলে সম্পর্কে তো তাই-ই হয়, নাকি?
শেহজাদের এই ডাবল-মিনিং কথার গভীরতা বুঝতে সামাইরার এক মুহূর্তও সময় লাগল না। তার গাল দুটো লজ্জায় এক নিমেষে আপেলের মতো লাল হয়ে উঠল। সে শেহজাদের বুকের ওপর নিজের দুই হাত দিয়ে সামান্য কিল মেরে বড্ড মিষ্টি গলায় ফিসফিস করে বলল,
-” ড্যাডি…”
সামাইরার মুখ থেকে এই একটিমাত্র শব্দ শোনা মাত্রই শেহজাদ আর নিজের ভেতরের সেই গম্ভীর রূপটা ধরে রাখতে পারল না। দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হা হা করে মুক্ত হাসিতে ফেটে পড়ল।
পরিশিষ্ট:
দেখতে দেখতে শেহজাদ-সামাইরা দম্পতির জীবন থেকে চারটি বছর বিদায় নিয়েছে।
স্কাইলাইন ভিলায় এখন সারাদিন রাজত্ব করে বেড়ায় এক জোড়া ছোট্ট নূপুরের নিক্বণ আর আধো আধো মিষ্টি বুলির গুঞ্জন। শেহজাদ আর সামাইরার সাড়ে তিন বছরের কন্যাসন্তান, সিরাত।
রাতের নিঝুম প্রহরে নিজের ঘরের ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে সিরাতের রেশমি চুলগুলো অত্যন্ত মায়ায় আঁচড়ে দিচ্ছিল সামাইরা। সিরাত আজ একচুলও নড়বে না, তার ডাগর ডাগর চোখ দুটোতে রাজ্যের দুষ্টুমি। সে আজ এক মস্ত বড় বায়না ধরে বসেছে।
-মাম্মাম আমি আজ দাদুর কাছে ঘুমাব। দাদু পরীর গল্প শোনাবে। মজা গল্প। পরীর গল্প।
ছোট্ট সিরাত তার তুলতুলে ঠোঁট নাড়িয়ে ভাঙ্গা উচ্চারণে কথাগুলো বলল।
সামাইরার ঠিক পাশে বসে ছিল শেহজাদ। এই মানুষটি যে কি পরিমাণ তার মেয়ের পাগল! মেয়ের এমন আদুরে বায়না শুনে শেহজাদের গালে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। সে এগিয়ে এসে সিরাতকে কোলে তুলে নিল। নিজের দাড়িভরা গালটা মেয়ের নরম গালে আলতো ঘষে আদর করতে করতে বলল,
-আচ্ছা আমার রাজকুমারী, তুমি আজ দাদুর কাছেই ঘুমাও। চলো, বাবা তোমাকে দিয়ে আসছি।
মেয়ের খিলখিল হাসির শব্দে পুরো ঘরটা মুখরিত হয়ে উঠল। শেহজাদ সিরাতকে পরম মায়ায় কোলে নিয়ে সুফিয়া রহমানের ঘরে দিয়ে এলো। বৃদ্ধা দাদীও ওনার নাতনিকে বুকে টেনে নিয়ে এক বুক প্রশান্তির হাসি হাসলেন।
মেয়েকে মায়ের ঘরে রেখে শেহজাদ আবার নিজেদের বেডরুমে ফিরে এলো। মৃদু নীল আলোয় ঘরের চারপাশটা কেমন মায়াবী লাগছে!
সামাইরা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে গুনগুন করে কোনো একটা গান গাইছে। টেবিলের ওপর ছড়ানো তার প্রিয় প্রসাধনীর কৌটো থেকে আলতো করে সামান্য ক্রিম নিয়ে মাখছে নিজের ধবধবে ফর্সা গায়ে। আয়নায় সামাইরার এই মনকাড়া রূপ দেখে শেহজাদের চোখ দুটোতে এক গভীর নেশা নেমে এলো।
সে নিঃশব্দে এগিয়ে এলো সামাইরার ঠিক পেছনে। সামাইরা আয়নায় স্বামীর প্রতিবিম্ব দেখার আগেই শেহজাদ দুই হাত বাড়িয়ে তার কাঁধের ওপর থেকে রেশমি চুলগুলো একপাশে সরিয়ে দিল। তার উন্মুক্ত, নরম ঘাড়ে নিজের ঠোঁট দুটো ডুবিয়ে দিয়ে এক গভীর উষ্ণ চুমু খেল।
সামাইরার সারা শরীর এক মৃদু শিহরণে কেঁপে উঠল। সে আয়নার মাধ্যমেই স্বামীর চোখের দিকে তাকাল।
শেহজাদ সামাইরার ঘাড়ের চুলে নিজের মুখ গুঁজে বড্ড শান্ত গলায় বলল,
-সিরাতের একটা ভাই দরকার, সামাইরা।
সামাইরা সামান্য চমকে উঠল। সে চট করে স্বামীর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অবাক হওয়ার ভান করে চোখ দুটো বড় বড় করে বলল,
-তাই নাকি? এ কথা কে বলল আপনাকে? সিরাত বলেছে আপনাকে?
শেহজাদ আলগোছে সামাইরার একদম কানের লতিতে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। বড্ড আদুরে ভঙ্গিতে একটা আলগা কামড় দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
-আমিতো ওর বাবা, মেয়ের মনের কথা আমি এমনিই বুঝে নিয়েছি।
সামাইরা এবার এক দুষ্টুমিভরা মিষ্টি হাসি হাসল। সে স্বামীর দিকে পুরোপুরি ফিরে নিজের দুটো নরম হাত শেহজাদের চওড়া কাঁধের ওপর রাখল। রোমান্টিক সুরে শুধাল,
-সিরাতের ভাই চাই, নাকি সিরাতের বাবার নিজের বউকে একান্তে চাই?
শেহজাদ হাসল। সে এক ঝটকায় সামাইরাকে পাজাকোলা করে নিজের কোলে তুলে নিল। সামাইরা আলতো মৃদু চিৎকার করে শেহজাদের গলা জড়িয়ে ধরল। শেহজাদ তাকে বিছানার নরম চাদরের ওপর শুইয়ে দিল।
সামাইরার ওপর সামান্য ঝুঁকে এসে ওর কপালে এক দীর্ঘ ভালোবাসার সিলমোহর এঁকে দিল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
-ইশ! ধরা খেয়ে গেলাম!
সামাইরা লজ্জায় লাল হয়ে মুচকি হাসল।
শেহজাদ এই চার বছর পরেও স্ত্রীর মুখে চিরচেনা লজ্জা দেখে ওর গালটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল,
-বিয়ের এতগুলো বছর পেরিয়ে গেল, আমাদের একটা সন্তানও আছে, এখনো এত লজ্জা কেন পাও, সামাইরা?
সামাইরা নিজের দুই হাত দিয়ে শেহজাদের চওড়া বুকে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
-ভালোবাসার মানুষের স্পর্শ কোনোদিন পুরোনো হয় না।তাই হয়তো আপনার সামনের আমার এই লজ্জা পাবার ব্যাপারটাও কোনোদিন হারিয়ে যাবে না।
এই উত্তর শুনে শেহজাদের চোখের মণি দুটো আরও গভীর হয়ে উঠল। ঘরের মৃদু নীল আলোটাকে সে এক টানে পুরোপুরি উজ্জ্বল করে দিয়ে বলল,
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২৪
-তাহলে লাইটটা জ্বলুক আজ, সামাইরা। আমার এই লজ্জাবতীর লাল হয়ে যাওয়া মুখটা আজ আমি মন ভরে দেখতে চাই। কী বলো, আপত্তি আছে?
সামাইরা আর কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে শুধু স্বামীর বুকে নিজেকে আরও গভীরভাবে সঁপে দিল।
সমাপ্ত
