Home তোমাতেই আসক্ত তোমাতেই আসক্ত পর্ব ৮৭

তোমাতেই আসক্ত পর্ব ৮৭

তোমাতেই আসক্ত পর্ব ৮৭
তানিশা সুলতানা

দিনগুলো খুব সুন্দর কাটছে। আদ্রিতা আবরার মালদ্বীপ থেকে ঘুরে এসেছে সপ্তাহখানেক আগে। সেখান থেকে ফিরে আবরার কাজে ডুবে গিয়েছে পুরোপুরি। যেন সেই আগের বদমেজাজ হাতি হয়ে গিয়েছে। দরজার সামনে নতুন করে লাগানো হয়েছে “ডু নট ডিস্টার্ব” সাইনবোর্ড। অবশ্য আদ্রিতা এবং সিয়াম সাইনবোর্ড উপেক্ষা করেই আবরারকে ডিস্টার্ব করতে হাজির হয়ে যায়।

আজকে শনিবার। আতিয়া বেগম বাংলাদেশ থেকে ফিরে এসেছে গতকাল। একটা দিন মেয়ের সঙ্গে মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে কাটিয়ে আজকে বাসায় ফিরেছে। মানুষের জীবনটা কত অদ্ভুত। এই আতিয়া বেগম আগে চাইতো ছেলে মেয়ের সঙ্গে থাকতে। তাদের দেখার জন্য মনটা ছটফট করত।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

কিন্তু এখন আর ইট পাথরের এই শহর তার ভালো লাগেনা। কাঁচা মাটির গন্ধের সন্ধান খুঁজতে থাকে সব খানে।
তার মনে হয় “ছেলে মেয়ের সঙ্গে প্রতিদিন ফোনে কথা বলে একটা জীবন বাংলাদেশে কাটিয়ে দিলেই ভালো হয়। এই আরাম আয়াশের থেকে দেবর ভাসুরের সংসারে উটকো ঝামেলা হয়ে থাকাটাই ভালো।
আদ্রিতা বুঝতে পারে মায়ের মন খারাপের গল্প। তার নিজেরও খারাপ লাগে। বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য মনটা আনচান করে। মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ইচ্ছে করে।
তবে সব মন খারাপ বিলিন করে দিয়েছে আবরারের মুখপানে চেয়ে। মানুষটা তার খুশির জন্য এত কিছু করে। সে দুঃখ পাবে এমন কাজ না করাই ভালো।

আবরার তার কক্ষে সিয়াম আমান আহাদ এবং ইভানকে ডেকেছে। জরুরী কিছু কথা বলার আছে তাদের। আদ্রিতা আসতে চেয়েছিলো তাদের সাথে। কি কথা বলে শোনার বড্ড ইচ্ছে তার। কিন্তু আবরার ধমকের স্বরে তাকে আসতে বারণ করে দিয়েছে। আপাতত মন খারাপ করে ইশারার কক্ষে বসে আছে আদ্রিতা। টিশাও উপস্থিত সেখানে। ইশারার জন্য ফলের জুস বানিয়ে নিয়ে এসেছে।

মাঝেমধ্যে আদ্রিতার বেশ অবাক লাগে। টিশা মেয়েটা ভীষণ ভালো। খুবই দায়িত্বশীল। খুব সহজেই মানুষকে ভালোবেসে ফেলে। আদ্রিতা ইশারা কারো সঙ্গেই মন খুলে কথা বলে না। ওই খুব প্রয়োজন হলে দু একটা কথা বলবে। অথচ নিজে খাওয়ার জন্য কিছু রান্না করলেও তিনজনের জন্য করবে। ওরা খেতে না বসলে নিজেও খাবেনা। ওদের শরীর খারাপ লাগলে নিজে থেকে ওষুধ খাবার এগিয়ে দেবে। ইশারা প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর থেকে ওর সব দায়িত্ব যেনো মেয়েটা নিয়ে নিয়েছে। এইতো কয়েকদিন আগে মাদার হরলিক্স সহ মাল্টা ডালিম সহ ডাক্তারদের পরামর্শে কিছু ওষুধ পত্র নিয়ে এসেছে।
সকালে মাদার হরলিক্স গুলে দেবে। ডালিমের জুস বানিয়ে দেবে। মাল্টা কেটে দেবে।
মানে সারাটা দিন সে শুধু ইশারায় ভালোলাগা খারাপ লাগা নিয়েই চিন্তা করবে। অথচ ইশারার সাথে কথা বলবে না।

এটা নিয়ে অবশ্য আদ্রিতা এবং ইশারা আড়ালে গসিপ করতে ভুলে না।
“এটা খেয়ে নাও। খেতে মজা না হলেও বেশ উপকারী।
ইশারা লক্ষী বাচ্চার মত মাথা নেড়ে গ্লাসটা হাতে নেয়। এবং এক চুমুকে সবটা খেয়ে নে।
আদ্রিতা একটু আফসোসের সুরেই বলে
“এমন এক্সট্রা কেয়ার পাওয়ার জন্য এখন দেখছি প্রেগন্যান্ট হতে হবে।
টিশা চলে যেতে যেতে বলে
“তোমাকে আমি সব সময়ই কেয়ার করি। খেয়াল করো না এটা তোমার দোষ।

“আই থিংক আমানের এখন বেবি দরকার।
আবরারের মুখে এমন কথা শুনে চার বন্ধুই একটুখানি অবাক হয়।
সিয়াম তো সঙ্গে সঙ্গেই কবিতার সুরে বলে ওঠে
” ভুতের মুখে রামের নাম শুনতে হলো ভাই
আমি সিয়াম অবাক হয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে গেছি তাই
বাচ্চা নেওয়া সহজ কথা নয়
থাকতে হয় মেশিন
আমান ভাইয়ের পাখি নাই
নষ্ট হয়ে গেছে ডেশিন।
সিয়ামের ভুলভাল কবিতার সকলেরই বিরক্ত লাগল। আমান তো নাক মুখ কুঁচকে বলেই ওঠে
“ভাই এখানে একটা ইম্পর্টেন্ট বিষয়ে কথা হচ্ছে। তোর ফালতু কবিতা পাখির মধ্যে লুকাই রাখ।
সিয়াম মুখ বাঁকায়। কোন একটা কবি ঠিকই বলেছিল
এই শহরে প্রতিভার কোন মূল্য নাই। নিজের ক্রিয়েটিভিটি প্রকাশ করলে মানুষ হিংসের ঠেলায় নিন্দা করে। ঠিক আছে। সিয়াম নিজের প্রতিভা পেটের মধ্যে রেখে দিল। আর জীবনেও কবিতা বলবে না। প্রয়োজনে কবিতা পেটের মধ্যে জমতে জমতে পেট ফুলে ঢোল হয়ে যাবে তবুও বলবে না। মুখে কসটিউব লাগিয়ে দিলো।
আহাদ বলে

“আমানের এখনই বেবি নিতে হবে কেনো?
” টিশা আমাদের পছন্দ করে না। তবুও এখানে রয়েছে। মানে আমাদের প্রতি দুর্বল হয়ে গিয়েছে। এখন একটা বেবি আসলে সুন্দর করে সংসারে মন দেবে।
আমি আর কিছু বলতে চাই না।
কাজ করব।
তোরা প্লিজ এখন বের হ।

গত তিন মাস হবে আদ্রিতা কোনো পিল খাচ্ছে না। বিষয়টা অবশ্য আবরার জানে না। ইশারা এখন ৫ মাসের প্রেগন্যান্ট। খানিকটা বেবি বাম্প বেরিয়ে গিয়েছে। দেখতেও বেশ সুন্দর লাগে। মাতৃত্ব আসলেই সুন্দর। শুধু সুন্দর নয় একটু বেশি সুন্দর।
আদ্রিতাও মা হতে চায়। এই সুন্দর অনুভূতির সাথে পরিচিত হতে চায়। একটা ছোট্ট প্রাণকে দুনিয়াতে আনতে চায়। যে মায়া মিশিয়ে তাকে মা বলে ডাকবে। তার বুকের মাঝে গুটি শুটি মেরে ঘুমাবে।
কিন্তু দিনকে দিন ভরসা হারিয়ে ফেলছে আদ্রিতা। কোন প্রটেকশন নেই না তবু কেনো সে প্রেগন্যান্ট হচ্ছে না?
কোনো সমস্যা রয়েছে কি তার?
হয়তো রয়েছে।
অতি দ্রুত ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন।
দুই দিনের জন্য থাইল্যান্ড গিয়েছে আবরার। সেখানেও তাদের কোম্পানির একটা শাখা খোলার প্ল্যানিং চলছে।
সিয়াম আমান ইভান অফিসে গিয়েছে। টিশা ইশারাকে নিয়ে একটুখানি হাঁটতে বেরিয়েছে। আর আতিয়া বেগম ঘুমোচ্ছে।

এটাই সুযোগ
এই সুযোগেই বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে আদ্রিতা। উদ্দেশ্য হাসপাতাল।
এখানকার কোন কিছুই ভালো করে চিনে না সে। যেখানেই যাওয়ার প্রয়োজন পড়েছে আবরার সঙ্গে গিয়েছে। কোন কিছু চিনে রাখার প্রয়োজন মনে করে নি।
রাস্তার এক কোনা দিয়ে আনমনে হাঁটতে থাকে আদ্রিতা। জুরিখ নদীর ছোট্ট ব্রিজটা পার হতেই একটা হাসপাতালের দেখা মেলে। খুশিতে চোখ দুটো চক চক করে ওঠে আদ্রিতার। ঢুকে পড়ে হাসপাতালের মধ্যে।
আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে অনেকেই তাকে চিনতে পারে। আবরার তাসনিনের ওয়াইফ বলে ডাকতে থাকে। সালাম দেয়, কি প্রয়োজন এখানে এসেছে জিজ্ঞেস করে, আদ্রিতা ঘাবড়ে যায়।
কারো কথার উত্তর দিতে পারে না।
মাথা নিচু করে আমতা আমতা করতে থাকে। একটা মেয়ে এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দেয় আদ্রিতাকে। সে একটা কেবিনে নিয়ে গিয়ে মিষ্টি স্বরে জানতে চায় “কিভাবে সাহায্য করতে পারি”
আদ্রিতা একজন ডাক্তারের নিকট নিয়ে যেতে অনুরোধ করে।
মেয়েটি নিয়ে যায় ডাক্তারের চেম্বারে।

নিজের সমস্যা এবং সন্দেহের কথা ডাক্তারের সঙ্গে শেয়ার করে আদ্রিতা। ডাক্তার কিছু টেস্ট দেয়। এখনই এখান থেকে টেস্টগুলো করে নিতে পারবে। আদ্রিতা আর দেরি করে না।
ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সবগুলো টেস্ট করে ফেলে।
২ ঘণ্টার মতো সময় লেগে যায়। সাথে করে ফোনটাও নিয়ে আসেনি। কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। নিশ্চয়ই সকলে বেশ টেনশনে আছে।

তোমাতেই আসক্ত পর্ব ৮৬

এই মুহূর্তে পুনরায় ডাক্তারের সামনে বসে আছে আদ্রিতা।
গম্ভীর মুখে নাকের ডগায় চশমা ঝুলিয়ে গভীর মনোযোগে রিপোর্টগুলো দেখছে ডাক্তার।
দীর্ঘ 20 মিনিট পরে চিন্তিত আদ্রিতার মুখ পানে তাকায় ডাক্তার।।
এবং বলে
“আপনি কোনোদিনও মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ করতে পারবেন না।

তোমাতেই আসক্ত পর্ব ৮৮