তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৫
জেরিন আক্তার
প্রাণেশার মনটা কেমন করছে। স্নিগ্ধর এভাবে চলে যাওয়া মোটেও স্বাভাবিক ভাবে নিলো না। কাউকে জিজ্ঞাসা করবে কি যে, স্নিগ্ধ আর ওর বাবা কোথায় গেলো? কিন্তু স্নিগ্ধ আবার বলল এসে সব বলবে। প্রাণেশা বিছানায় বসে ওর জন্যই অপেক্ষা করতে থাকলো।
এদিকে স্নিগ্ধ আর সাঈদ রেজা চৌধুরী বেরিয়ে গেলেন হসপিটালের উদ্দেশ্যে। হসপিটালে এসে সামনেই কাউন্টারে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলো ৩ তলায় সৌরভকে ওটিতে নেওয়া হয়েছে। দুজনে সেখানেই গেলো। কিন্তু এসে শুনলো ওকে কেবিনে দেওয়া হয়েছে। কেবিনের সামনেই আরশাদ খান, নাহার বেগম, আনোয়ার হোসেন, ইভা আর রোকেয়া বেগম বসে আছেন। স্নিগ্ধ তড়িৎ পায়ে এগিয়ে গিয়ে আরশাদ খানকে বলল,
“সৌরভ কেমন আছে এখন? ডক্টর কিছু বলেছে?”
আরশাদ খান মাথা তুলে তাকালেন। স্নিগ্ধকে দেখে অবাক কণ্ঠে বললেন,
“তুমি এসেছো? প্রাণেশা কোথায়?”
স্নিগ্ধ পাশে বসে বলল,
“প্রাণেশা আসেনি। ওকে বলিনি।”
সাঈদ রেজা চৌধুরী বললেন,
“সৌরভ কেমন আছে বলেছে কিছু?”
আরশাদ খান শ্বাস ছেড়ে বললেন,
“ওটি থেকে বের করে বলল চিন্তার কিছু নেই। আবার বলল জ্ঞান ফিরতে সময় লাগবে।”
স্নিগ্ধ বলল,
“কোথায় কোথায় ব্যাথা পেয়েছে?”
আরশাদ খান মুখটা শুকনো করে বললেন,
“পায়ে, আর মাথায়। আরও কত জায়গায় ছিলে গিয়েছে।”
স্নিগ্ধ বলল,
“ও কি একা গিয়েছিলো? কেউ সাথে ছিলো না?”
“না একাই গিয়েছিলো।”
“হামিমকে কিছু করেননি আপনারা?”
আরশাদ খান শক্ত মুখে বললেন,
“সৌরভই ওর ব্যবস্থা করে দিয়েছে।”
রাত ১ টারও পরে ফিরলো স্নিগ্ধ আর সাঈদ রেজা চৌধুরী। দুজনই যে যার যার মতো রুমে চলে এলো। স্নিগ্ধ এসে দেখলো প্রাণেশা ঘুমিয়ে পড়েছে। ও আর ডাকলো না। রুমটা লক করে এসে শুয়ে পড়লো। সৌরভকে দেখার পর থেকে মনটাও খুব খারাপ। শেষে প্রাণেশাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়লো। সৌরভকে ওইভাবে রেখে আসার পরে বাসর করারও মুড নেই ওর। বেশ খারাপও লাগছে।
সকাল সকাল প্রাণেশার ঘুম ভাঙতেই চোখের সামনে স্নিগ্ধর মুখটা দেখে মুচকি হাসলো। স্নিগ্ধর মুখে হাত রেখে বিড়বিড় করে বলল,
“কি ব্যাপার বান্ধবীর বড় ভাই, …. রাতে কখন ফিরলেন?…. ডাকলেন না কেনো?…. নিশ্চই এক্সের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন, নাহলে নতুন বউ রেখে কোথায় আর যাবেন?”
প্রাণেশা স্নিগ্ধর দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন। এরপরে টুস করে স্নিগ্ধর গালে চুমু দিলো। স্নিগ্ধ চোখ খুলল। প্রাণেশা তাজ্জব বনে চলে গেলো। হাঁসফাঁস করে বলল,
“আপনার গালে মশা বসেছিলো। সেটাই সরিয়ে দিলাম আমি।”
স্নিগ্ধ অবাক কণ্ঠে বলল,
“ওমা সে কি! মশা বসেছিলো?”
“হুমম। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার কোমরে হাত রেখে বলল,
“আরে আগেই যেও না, মশা কোথায়, কেমন করে বসেছিলো বর্ণনা দিয়ে যাও।”
প্রাণেশা ঝাড়ি মেরে বলল,
“মশা কেমন করে বসেছিলো আমি বর্ণনা দিবো কেমনে?”
স্নিগ্ধ বাকা হেসে বলল,
“যেভাবে চুমু দিয়েছো সেভাবে।”
প্রাণেশা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো।
দুজনই ফ্রেশ হয়ে নিচে এলো। সুবহা দুজনকে দেখে রসিকতা সুরে বলল,
“আমরা তো ভেবেছি তোমাদের ঘুমই ভাঙবে না। তা দেখি সকাল সকাল উঠে গিয়েছো।”
স্নিগ্ধ সুবহার মাথা গাট্টা মেরে বলল,
“এই চুপ করবি!”
প্রাণেশা চলে গেলেন রাজিয়া বেগমের কাছে।
সাঈদ রেজা চৌধুরী সোফায় বসে আছেন। স্নিগ্ধ তার পাশে গিয়ে বসে আস্তে করে বলল,
“সৌরভের কি খবর কল দিয়েছিলো?”
সাঈদ রেজা চৌধুরী চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,
“উহু, একটু পরে দেখতে যাবো।”
সুবহা তীক্ষ্ণ চোখ তাকিয়ে আছে। এগিয়ে এসে সাঈদ রেজা চৌধুরীর পাশে বসে বলল,
“কি হয়েছে বাবা?”
সাঈদ রেজা চৌধুরী আস্তে করে বললেন,
“সৌরভকে কালকে হামিমরা মেরেছে, হসপিটালে রয়েছে। আর প্রাণেশার কাছে যেনো কোনো খবর না যায়।”
সুবহা কথা বলতেও ভুলে গেলো। থম মেরে বসে রইলো। সাঈদ রেজা চৌধুরী আর স্নিগ্ধ চলে গেলো বাড়ির বাহিরের দিকে।
প্রাণেশা সুবহার কাছে এসে বলল,
“কিরে কি হলো তোর?”
সুবহা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“কই কিছুনা। তু্ই বস আসছি।”
বেলা ১০টার দিকে,, স্নিগ্ধ শুয়ে আছে। প্রাণেশা ওর আশেপাশে নিজের মোবাইলটা খুঁজছে। স্নিগ্ধ বুঝতে না পেরে বলল,
“কি খুঁজছো?”
“কালকে মোবাইল নিলেন দিলেন না তো!”
“মোবাইল দিয়ে কি করবে?”
প্রাণেশা নরম কণ্ঠে বলল,
“ওই একটু ভাইয়াকে কল দিতাম। কি করছে একটু শুনতাম। ভালো লাগছে না।”
স্নিগ্ধ থমথমে মুখে তাকিয়ে রইলো। প্রাণেশার ভাই যে ভালো নেই সেটা নিয়ে ওর মনেও খুঁতখুঁত করছে। যারপরনাই ভাইয়ের সাথে কথা বলার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছে।
প্রাণেশা সৌরভের নাম্বারে কল দিলো। আরশাদ খান কল ধরলেন। প্রাণেশা বলল,
“কখন থেকে কল দিচ্ছি ধরছো না কেনো?”
আরশাদ খান গলা পরিষ্কার করে বললেন,
“আমি বাবা বলছি।”
“ওহ, কেমন আছো বাবা?”
“ভালো তুমি কেমন আছো?”
“ভালো। বাবা ভাইয়া কোথায় গো?”
আরশাদ খান শ্বাস ছেড়ে বললেন,
“তোমার ভাইকে কোম্পানির কাজে সিলেট পাঠিয়েছি রাতে। আমার শরীরটা ভালো না তাই আমি যেতে পারিনি।”
প্রাণেশা কপাল কুঁচকে নিয়ে বলল,
“কিহ! রাতে? ফোন নিয়ে যায়নি ভাইয়া?”
আরশাদ খান বললেন,
“ও আরেকটা ফোন নিয়ে গিয়েছে। এটা রুমে রেখে গিয়েছে।”
প্রাণেশা এর আগাগোড়া কিচ্ছু বুঝলো না। সৌরভের ফোনতো একটাই। আবার আরেকটা ফোন বেরোলো কোথায় থেকে? প্রাণেশা টুকটাক কথা বলে কল কেটে দিলো।
দুপুরে—
স্নিগ্ধ হসপিটালে থেকে ফিরলো। ঘন্টা দুইয়েক আগে ওর জ্ঞান ফিরেছে, কথাও হয়েছে। যাক অনেকটাই চিন্তামুক্ত সবাই। স্নিগ্ধ সৌরভের কথা ভাবতে ভাবতে রুম নক না করেই ঢুকলো। অবশ্য নিজের রুমে ঢোকার জন্য কোনোই বা নক করবে।
প্রাণেশা শাড়ি পড়ছিলো। স্নিগ্ধ সেই সময় রুমে ঢোকায় বলে উঠল,
“এইযে এটা কি এখন নিজের রুমে পেয়েছেন? এখন এই রুমটা আমার।”
স্নিগ্ধ দরজা লাগিয়ে দিয়ে অবাক কণ্ঠে বলল,
“ম্যাডাম রুমটা আপনার হলে তাহলে আমি কি এই রুমের অতিথি?”
“হুমম অতিথি।”
স্নিগ্ধ এগিয়ে এসে প্রাণেশার সামনে টুলে বসলো। প্রাণেশা পিটপিট করে তাকিয়ে বলল,
“কি ব্যাপার! আমি শাড়ি পড়ছি দেখছেন না, একটু অন্য জায়গায় যান।”
স্নিগ্ধ বাকা হেসে বলল,
“নাহ আমি তোমার শাড়ি পড়া দেখবো।”
“দেখতে হবে না।”
“নাহ দেখবোই। পারলে সরিয়ে দেখো।”
প্রাণেশা জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে বলল,
“শাড়ি পড়াতে পারেন?”
“ট্রাই করে দেখতে পারি।”
“না পারলে মাকে ডাক দিন।”
স্নিগ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে প্রাণেশার হাত থেকে শাড়িটা নিয়ে বলল,
“প্রয়োজন হবে না।”
আধঘন্টা চেষ্টা করার পরে স্নিগ্ধ শাড়ি পড়ালো ওকে। প্রাণেশা চুলগুলো মেলে দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“যাক স্বামী আর যাই পারুক না পারুক শাড়ি পড়াতে পারে।”
স্নিগ্ধ বাকা হেসে বলল,
“আরও অনেক কিছু পারি। করবো নাকি?”
“অসভ্য লোক কোথাকার।”
স্নিগ্ধ বিছানায় গিয়ে আয়েসি ভঙ্গিতে শুয়ে বলল,
“এখনও তো বাসর বাকি। তার আগেই অসভ্য বলা শুরু করে দিলে?”
এদিকে রিসেপশন অনুষ্ঠানের সকল গেস্ট আস্তে আস্তে আসতে শুরু করেছে। খান বাড়ির লোক রওনা দিয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। সৌরভকে হসপিটালে রেখে এসেছে বলে সবার মন খারাপ। সাঈদ রেজা চৌধুরী নিজে বলেছেন অনুষ্ঠান দুইদিন পরে করবেন, সৌরভ সুস্থ হোক। কিন্তু আরশাদ খান বললেন সব গেস্টকে বলে দিয়েছেন এখন না করবেন কি করে।
অনুষ্ঠান শেষে আরশাদ খান প্রাণেশা আর স্নিগ্ধকে সাথে নিয়ে গেলেন। সৌরভকে দুইদিন পরে ডিসচার্জ করে দেবে। সেপর্যন্ত ওদের ওখানেই রাখবে।
রাত ১০ টা ছুঁইছুই।
আরশাদ খান সবাইকে নিয়ে খান বাড়িতে এলেন। প্রাণেশা স্নিগ্ধকে নিয়ে রুমে ফিরলো। দুজনই ফ্রেশ হলো। এরপরে স্নিগ্ধ রেস্ট নিতে শুলো আর প্রাণেশা চলে গেলো বাহিরে।
ড্রইং রুমে এসে নাহার বেগমকে চিন্তিত হয়ে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করলো,
“কি হয়েছে ফুপ্পি?”
“কিছু হয়নি রে মা। আয় বস।”
“ফুপ্পি ইভা কোথায়?”
“রুমে মনে হয়। তু্ই কিছু খাবি? জামাইকে কিছু বানিয়ে দিবো নাকি?”
“না ফুপ্পি কিছু খাবো না আমরা।”
আরশাদ খান বের হলেন। সাথে আনোয়ার হোসেন। প্রাণেশা জিজ্ঞাসা করলো,
“কোথায় যাচ্ছো?”
আরশাদ খান বললেন,
“একটু কাজ পড়ে গিয়েছে।”
উনারা চলে যেতেই প্রাণেশা চলে এলো সৌরভের রুমে। রুমটা যেমন তেমনই আছে। ভাইয়ের ল্যাপটপ থেকে শুরু করে জুতো সব জায়গার টা জায়গায় আছে। সাইড টেবিলে আবার ফোন। ও হাতে নিলো। কিন্তু লক খুলতে না পেরে আবার রেখে দিলো। ওর মনে কেমন একটা খটকা লাগছে। এরপরে চলে গেলো কাভার্ডে। সৌরভের সব লাগেজই এখানে রাখা তাহলে কি জামাকাপড় নেয়নি।
ও রুম থেকে বেরিয়ে ইভার রুমে চলে এলো। ওকে বলল,
“এই ভাইয়া কি সত্যি সত্যি সিলেট গিয়েছে।”
ইভা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হুমম। তুমি চলে যাওয়ার পরেই ও চলে গিয়েছে।”
“কিন্তু কোনো জামাকাপড় নেয়নি যে?”
“ইয়ে মানে ভাইয়া তাড়াহুড়ো করেই চলে গিয়েছে নেওয়ার সময় পায়নি।”
প্রাণেশা বিশ্বাস করে আর কথা বাড়ালো না রুমে চলে এলো। স্নিগ্ধ শুয়ে আছে। প্রাণেশা দরজা লাগিয়ে দিয়ে এসে শুয়ে পড়লো।
স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে নিজের দিকে আলগোছে ঘুরিয়ে ওর ঠোঁটে ঠোঁট মিশিয়ে নিলো। আস্তে আস্তে প্রাণেশার গলায় মুখ ডুবিয়ে দিলো। আর একহাত দিয়ে ল্যাম্প লাইট অফ করে দিলো।
আরও একটা নতুন দিন—
ভোরের দিকে রোকেয়া বেগম আর নাহার বেগম রান্না করছেন। আরশাদ খান কিচেনের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন,
“রোকেয়া আপা রান্নায় ঝাল দিবেন একটু। কালকে সৌরভ বলল রান্না মিষ্টি মিষ্টি লাগে। আবার বেশি ঝাল কিন্তু ও খেতে পারে না।”
রোকেয়া বেগম বললেন,
তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৪
“ঠিক আছে ভাই।”
নাহার বেগম আরশাদ খানকে বললেন,
“যান ভাই রেডি হয়ে আসুন। আমরা তাড়াতাড়িই করছি। ছেলেটা তো খাবে। নিশ্চই খিদে পেয়েছে। আপনারা সৌরভকে দেখে আসুন। আমরা একটু পরে যাবো দেখতে।”
সৌরভ বাহিরের খাবার খায়না। তাই বাড়িতে থেকে রান্না করেই নিয়ে যাওয়া হয়। আর বেশি ঝাল খেতে পারে না। কিন্তু অন্যদিকে প্রাণেশা মায়ের মতো হয়েছে খুব ঝাল খায়।
ওদের কথাবার্তা শুনতে পেলো প্রাণেশা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলো,
“বাবা! ভাইয়াকে হসপিটালে মানে…কি হয়েছে ভাইয়ার? আমার থেকে কিছু লুকাচ্ছ তোমরা?”
