তোমার আমার গল্প পর্ব ১২
noorayn
স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই আলিশা অজান্তেই আরহামের হাত শক্ত করে চেপে ধরলো। চোখ দুটো চিকচিক করছে অশ্রুতে। এই অনুভূতিটা যেন সম্পূর্ণ নতুন তার জন্য – মমতা। যা সে প্রথমবার নিজের সন্তানের জন্য অনুভব করছে। এতদিন পর্যন্ত গর্ভে বেড়ে ওঠা ছোট্ট প্রাণটার প্রতি তার অনুভূতিগুলো ছিল অস্পষ্ট ; যেন কুয়াশায় ঢাকা। অথচ আজ? স্ক্রিনে তাকে প্রথমবার দেখার পর সবকিছুই পানির মতো স্বচ্ছ হয়ে গিয়েছে। হ্যাঁ, সে চায় এই ছোট্ট প্রাণটাকে নিজের কোলজুড়ে আগলে রাখতে, বুকভরা ভালোবাসায় বড় করে তুলতে।
আরহাম বরাবরের মতোই নীরব ; কোনো কথা নেই। শুধু একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে স্ক্রিনের দিকে। তার শান্ত মুখের পিছে লুকিয়ে আছে এক অজানা অনুভূতি। তার হৃদস্পন্দ যেন আগের তুলনায় বেড়ে গেছে ; সে বুঝে উঠতে পারছেনা কেন এমন লাগছে?
–হঠাৎ দুজনের ধ্যান ভাঙল ডাক্তার নিলুফারের কণ্ঠে।
“দেখেছো তোমরা?”
দুজনেই একসঙ্গে মাথা নাড়লো।
“হুম”
“বেবীর হার্টবিট শুনবে?”
“শুনবো” (আলিশা)
–ডাক্তার নিলুফার আলিশার কানের কাছে সোনোগ্রাফার হেডফোন নিয়ে আসেন।
“শুনো”
–নিজের গর্ভে বেড়ে উঠা ছোট্ট প্রানের হার্টবিট এর সল্প শব্দ কানে এসে ঠেকতেই যেন আলিশার অন্তরে এক অজানা প্রশান্তিতে ছেয়ে গেলো।
–এটা তার প্রান, তার ছোট্ট অংশ ; যাকে সে এতদিন যাবত কতই না অবহেলা করেছে!
–ডাক্তার নিলুফার এবার আরহামের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন –
“আরহাম, তুমি কি শুনতে চাও?”
–আরহাম চুপচাপ দাড়িয়ে। মুখে কোনো শব্দ নেই।
তার নিশ্চুপ থাকাকে সম্মতি হিসেবে ধরে ডাক্তার নিজেই আরহামের কানে সোনোগ্রাফি হেডফোন লাগিয়ে দিলো।
–আরহামের কানে ‘ধুক ধুক’ শব্দ এসে পৌঁছাতেই সে আচমকা চোখ খেচে বন্ধ করে নিলো। এই কেমন অজানা অনুভূতি? এতো সুন্দর, এতো শান্তির শব্দও কি হয়? তবে তার চেহারায় তখনও গম্ভীরতার ছাপ বিদ্যামান।
আলিশা আরহামকে জিজ্ঞেস করলো –
“কিছু অনূভব করলে?”
–আরহাম নিশ্চুপ।
–আল্ট্রাসাউন্ড শেষ তাই ডাক্তার আলিশাকে তাড়া দিলেন উঠে বসতে ; তার এখনো অনেক মেডিকাল টেস্ট বাকি রয়েছে।
আলিশা আরহামের সাহায্যে ধীরে ধীরে উঠে বসলো। তারপর বাকি টেস্ট এবং ফর্মালিটিস পূরন করে দুজনেই আবার গেলো ডাক্তারের ক্যাবিনে।
আরহাম-আলিশা ডাক্তারের ক্যাবিনে বসে আছে।
ডাক্তার নিলুফার বেশ কিছুক্ষন যাবত আলিশার রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করছেন।
“সব ঠিক আছে?” (আরহাম)
–আরহামের প্রশ্নে ডাক্তার নিজের চোখের চশমা ঠিক করে তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে জবাব দিলেন –
“রিপোর্ট নরমাল আছে…তবে বেবী এখনো সময়ের তুলনায় অনেক দুর্বল।”
–কথাটি শুনেই আলিশার বুক ধক করে উঠলো।
“বেবী ঠিক আছে তো?”
“রিলেক্স আলিশা, কমপ্লিকেটেড প্রেগন্যান্সিতে এটি স্বাভাবিক বিষয়। তাই এত চিন্তার কিছু নেই। তবে তোমাকে কিছু দিকের বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে।”
–কথাটি শেষ করে ডাক্তার আলিশাকে প্রয়োজনীয় সবকিছু বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। আর আরহাম?
সে তো অবাক! এই কোন আলিশাকে দেখছে সে? তার কাছে যেন হঠাৎ করেই আলিশাকে প্রাপ্তবয়স্ক নারী মনে হচ্ছে।
–সব শেষে আলিশা আচমকা এক প্রশ্ন করে বসলো,
“আন্টি, আমার ছেলে হবে নাকি মেয়ে?”
–আলিশার নাদান প্রশ্নে আচমকা হেসে উঠলেন ডাক্তার। যে মেয়ে নিজেই বাচ্চা সে কিনা জিজ্ঞেস করছে তার কি হবে? ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং তো।
“তুমি কি চাও?”
আলিশা আরহামের দিকে আড়চোখে চেয়ে মিনমিন স্বরে জবাব দিলো – “আমার তো একটা মিনি আরহাম চাই ; যাকে আমি ইচ্ছামতো মারতে পারবো, বকতে পারবো আর সে চুপচাপ আমার সব কথা শুনবে। বড় আরহামের মত গন্ডার হবে না।”
আলিশার কথা শুনে আরহামও দাঁতে দাঁত চেপে পাল্টা জবাব দিলো – “তাহলে আমারও একটা মিনি আলিশা চাই যাকে আমি সারাদিন মারতে পারবো আর অবশ্যই সে যদি নিজের বয়সের আগে মোবাইল চাই তবে ধরে চারটা চটকনা দিতে পারবো।”
“তোমার এত বড় সাহস! তুমি আমার মেয়েকে মারবে?”
“তোর এত বড় সাহস! তুই আমার ছেলেকে মারবি?”
–দুজনের তর্কাতর্কির মাঝে বিপাকে পড়লেন নিলুফার আক্তার। তিনি দুজনকেই থামতে বললেন।
“ব্যাস! দুজনেই থামো।”
–ডাক্তারের ডাকে দুজনে থেমে গেছে ঠিকই তবে একে অপরের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন এখান থেকে বের হলেই কেউ কাউকে ছাড় দিবেনা।
এরমধ্যেই, আলিশা আবারও প্রশ্ন করে উঠলো তার কি বাবু হবে?
“দেখো আলিশা, কি বাবু হবে সেটা বলা মেডিক্যাল টার্মে নেই। যদিও অনেক ডাক্তারই তা বলে দেন তবে আমি চাই তোমরা অপেক্ষা কর। এমনিতেই আর বেশি সময় নেই।”
“ঠিক আছে।”
হসপিটাল থেকে বেড়িয়েই দুজনে এগিয়ে গেলো পার্কিং লটের দিকে ; সেখানে তাদের গাড়ি রাখা আছে।
গাড়ির কাছে এসে আরহাম ড্রাইভিং সিটে বসতে বসতে আলিশাকে বললো – “উঠতে পারবি একা?”
“পারবো।” আলিশাও উঠে বসলো গাড়িতে।
“এই শুনো?”
“বল”
“আমাকে কি গিফ্ট দিবে তুমি?”
“কিসের গিফ্ট?”
আলিশা কাঁদো কাঁদো মুখে জিজ্ঞেস করলো –
“ভুলে গেছো?”
“কিছু মনে রাখার কথা ছিলো কি?”
“গন্ডার! তুই আমার বার্থডে ভুলে গেছিস?”
“এই গোল আলু, তোর বার্থডে কবে? ইশ ভুলেই গিয়েছিলাম।”
“আমি জানি, তুমি ভুলোনি। এসব ইচ্ছা করে বলছো যাতে আমায় জ্বালাতে পারো।”
আরহাম অসহায় মুখ করে বললো –
“সত্যি ভুলে গিয়েছি রে লিশা।”
–আলিশা কোনো জবাব না দিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে মুখটা ফুলিয়ে বসে থাকলো।
এই গন্ডার আসলেই কি তার ১৭ তম বার্থডে ভুলে গেছে?
এসব ভাবতে ভাবতেই আলিশা গাড়ির মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লো। আজকাল তার বড্ড ঘুম পায় কেবল রাত ছাড়া।
বাড়ির মেইন গেট দিয়ে গাড়ি ঢুকাতেই আরহাম আলিশাকে ঘুম থেকে জাগাতে লাগলো।
“এই ধানিলঙ্কা? উঠে পড়, বাড়ি চলে এসেছি আমরা।”
–এত ডাকার পরও আলিশার কোনো হুশ নেই। সে ঘুমে বেহুশ।
আরহাম জানে, আলিশা ইচ্ছা করেই উঠছেনা। তাই সে ইচ্ছা করেই পানির বোতল হাতে নিয়ে শব্দ করে বলতে লাগলো –
“ভালোই হয়েছে যে এই মেয়ে ঘুম। এই সুযোগে মুখের উপর পানি ছুড়ে দেই, হা হা হায়ায়া।”
–পানি ছুড়ার কথা শুনেই আলিশা ধরফর করে উঠে গেলো।
“এই না না, উঠে গিয়েছি আমি। একদম পানি মারবেনা বলে দিলাম।”
“নাটকবাজ মহিলা।”
“এই মহিলা কাকে বললে তুমি?”
–আরহাম জবাব না দিয়েই গাড়ি থেকে নেমে দাড়ালো।
তাকে নামতে দেখে আলিশা হাতদুটো বাচ্চাদের মতো এগিয়ে দিয়ে বললো –
“কোথায় যাচ্ছো তুমি? আমাকে নামাও।”
“কেন? নিজে নাম। তুই না সব পারিস?”
“নামাও না। এমন করছো কেন?”
“ঠিক আছে নামাবো। তবে তোর রিকুয়েষ্ট করতে হবে। বল দেখি, আরহাম ভাইয়া প্লিজ হেল্প মি।”
“দুইদিন পর আমার বাচ্চার বাপ হবি। তোকে কোন আক্কেলে ভাইয়া ডাকবো?”
“আমি বলেছি তাই ডাকবি। তোর মুখে ভাইয়া ডাক শুনতে বড্ড ভালো লাগে রে লিশা। আহা কি সম্মানীও ডাক।”
“সুযোগ নিচ্ছিস? যা লাগবেনা তোকে। আমি নিজেই নামবো।”
“আচ্ছা দাড়া হেল্প করছি। আমার আবার দয়া বেশি।”
“একবার বাড়ির ভেতরে যেতে দে আমায় তারপর তোকে সসম্মানে সাইজ করবো আমি।”
“মুখের ভাষা ঠিক কর বেয়াদব। তোর থেকে চার বছরের বড় আমি।”
তোমার আমার গল্প পর্ব ১১
রাত ১১ টা….
আলিশা অপেক্ষা করছে আরহামের জন্য। আজও কি দেরি করে ফিরবে সে? কাল আলিশার ১৭ তম জন্মদিন।
১২ টা বাজতে বেশি সময় নেই। তবে কি সত্যিই আরহাম তার
জন্মদিন ভুলে গেলো?
–এসব ভেবেই মন খারাপ করে বসে রইলো আলিশা।
হঠাৎ তার ফোনে একটা ভিডিও আসলো ; যেখানে আরহামের হাতে এবং মাথায় ব্যান্ডেজ করা।
–এসব দেখে ঢুকরে কেঁদে উঠলো আলিশা।
তার কান্নার শব্দে ছুটে আসলেন শাইনা বেগম।
