Home তোমার আমার গল্প তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৩

তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৩

তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৩
noorayn

আজ বিকেলের দিকেই খান বাড়ির সকলে দেশে ফিরেছে।সবার মেজাজ বেশ থমথমে। কারও মুখে কোনো কথা নেই। বাড়িতে ফিরেই যে যার কামড়ায় প্রস্থান করেছে।
আলিশা গতকাল রাত থেকেই আরহামের সাথে কথা বলছেনা। আরহাম নিজেও সেধে কথা বলতে চায়নি। এই ছোট মরিচের মাকে পরে হ্যান্ডেল করা যাবে ; আগে আপাতত মিডিয়া সামলাতে হবে। কালরাত থেকে শখানেক কল এসেছে তার ফোনে – সব ডিরেক্টর আর মিডিয়ার লোকজন। এসব সামলাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে বেশ।
আরাফ এদিকটা যাও একটু সামলে রেখেছে তবে বেশিক্ষন পারবেনা তাই কাল আগামীকালকের জন্য প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করেছে আরাফ। আরহাম কিভাবে কি করবে এই ভেবেই কূল পাচ্ছেনা। এসব জানলে সে দার্জিলিং যেতোই না।
আজ রাতে সবার সাথে দেখা করে আলোচনা করবে এই নিয়ে।

–আরহামের রাগের পারদ যেন বেড়েই চলছে। পুরা ফিড জুড়ে আলিশার ছবি! সে দেড়ি না করে কাহাফ কে কল দিলো ; দুই রিং যেতেই ওপাশ থেকে কাহাফ ফোন উঠিয়ে বললো – “হেই ব্রো? হোয়াটস আপ?”
“রাখ শালা তোর হোয়াটস আপ। কাজ হয়েছে?”
“হুম প্রায়। তবে আরহাম ভেবে দেখ?”
“ভেবে দেখার কি আছে?”
“কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? আলিশা জানলে অনেক রিয়েক্ট করবে।”
“তোকে যা বলেছি তাই কর। আমার বউকে আমি সামলে নেবো।”
“এতজনের আইডি হ্যাক করা সহজ বিষয় নয়। সময় লাগবে।”
“সময় নেই। যত টাকা লাগবে ঢাল তবে যেসব পেজ/আইডি থেকে লিশার ছবি শেয়ার/পোস্ট হয়েছে সবগুলা হ্যাক করিয়ে ডিলিট করবি।”
“সবারটা নাহয় মানলাম তবে আলিশার আইডি রেহায় দে অন্তত।”
“তোর এতো মন পুড়ছে কেন আমার বউয়ের জন্য? একদম ঠ্যাং ভেঙে দেবো শালা। আমার বউয়ের নামও যেন আর না শুনি তোর মুখ থেকে।”

“তোর সংসারে আগুন লাগা থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। শুনলিনা…আফসোস।”
“সংসারে অলরেডি আগুন লেগে গেছে আমার। এসব নিয়ে তোর ভাবতে হবেনা। যা কাজ দিয়েছি তা যত দ্রুত সম্ভব কমপ্লিট চাই। দরকার পড়লে আমাদের সাইবার সিকিউরিটি টিমেকে দ্বিগুন টাকা অফার কর তবে আমার চট জলদি রেজাল্ট চাই।”
“হয়ে যাবে কালকের মধ্যে।”
“তাই যেন হয়। আমার বউয়ের একটা ছবিও যেন আমি কোথাও না পাই। যদি পেয়েছি তো তোর খবর আছে।”
“ধুর মিয়া কিছু না কইরাও আমারে বাঁশ খাওয়া লাগে।”
“কাজ না হলে বাঁশ তোর পিছে দিয়ে বের করবো আমি।”
“হইয়া যাবে আব্বাজান।”
“এই কাকে আব্বাজান বললি তুই?”
“কেন তোকে?”
“তোর কোন জনমের বাপ লাগি আমি?”
“আপাতত এই জনমে আরশানের আব্বাজান।”
ওপাশ থেকে কল কাটার টুট টুট শব্দ কানে আসতেই কাহাফ হো-হো করে হেসে উঠলো।

আলিশা এসেছে থেকেই ছেলেকে নিয়ে ঘুমুচ্ছে। আরহামের দিকে ফিরেও তাকায়নি।
আরহাম আলিশার ফোন হাতে নিয়ে কিছুক্ষন ঘাটাঘাটি করলো। তারপর যে কাজে নিয়েছিলো তা শেষ করে ফোনটা আবারও আলিশার পাশে রেখে দিলো। যা হওয়ার হবে – আপাতত আলিশাকে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে রাখতে হবে। আগের আইডি আর কোনোভাবেই চালাতে দেয়া যাবেনা – সবার নজরে এসে গিয়েছে সেটা।
প্রায় ঘন্টাখানেক পর….
— আলিশা ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে এসেছে। ডোরা এখনো ঘুমাচ্ছে তাই সে অবসর সময় কাটানোর জন্য ফোন হাতে নিলো – গতকাল থেকে ফোন দেখার সুযোগ পায়নি। ফোন হাতে দেখলেই ডোরা তা নিয়ে টানাটানি শুরু করে দেয়।
ফোন হাতে নেওয়ার কিছুক্ষন পর আলিশার ভ্রু কুচকে গেলো। এটা কি হচ্ছে বারবার?
“কিরে আমার আইডিতে লগিইন করতে পারছিনা কেন?”
আরহাম ল্যাপ্টপের কি-বোর্ডে হাত চালাতে চালাতে জবাব দিলো – “আমি ডিলিট করে দিয়েছি তাই।”

“মানে?”
“মানে তাই যা বলেছি।”
“কি ডিলিট করেছো?”
“তোর সোশ্যাল মিডিয়া যত একাউন্ট আছে সব।”
“এমনটা করতে পারোনা তুমি…”
“পারি বলেই করেছি।”
আলিশা হতবাক হয়ে চেয়ে আছে আরহামের দিকে। বলার মতো শব্দ খুজে পাচ্ছেনা সে।
আলিশাকে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরহাম শুধালো – ” হোয়াট? এভাবে চেয়ে আছিস কেন? ডোন্ট প্যানিক। পরে আরেকটা খুলতে পারবি।”
“ইউ কান্ট ডু দিস টু মি…”
আরহাম যেন শুনেই নি এমন ভান করে বললো –
“সামান্য একাউন্ট এর জন্য এমন করা লাগে? পরে খুলে নিবি আরেকটা। দরকার পড়লে আমি নিজেই খুলে দেবো। আর এমনিও সারাদিন ফোন নিয়ে পড়ে থাকিস। এই সুবাদে কিছুদিন নাহয় দূরে থাকলি।”
“তুমি…”
“ফোন রেখে বাচ্চার দিকে খেয়াল দে। ডোরা উঠে গিয়েছে – ক্ষিদে পেয়েছে ওর ; সেই কবে খেয়েছে, ওকে ফিড করা।” বলেই আরহাম কোনোদিকে না তাকিয়ে হনহনিয়ে বের হয়ে গেলো নিজের স্টুডিওর উদ্দেশ্য।

এ.এম.কে স্টুডিওতে এখন বসে আছে আরহামের বন্ধুমহল।
সবার মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
“কি করবি কাল?” (আরাফ)
“তাই ভাবছি।” (আরহাম)
“কিছু কি আর ভাবার আছে? যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। এইজন্যই বলেছিলাম এতো অল্প বয়সে এইসব বিয়ের চক্করে না পড়তে।” (নেহা)
নেহার কথায় সকলে বিরক্তিবোধ করলো। সব বিষয়ে এই মেয়ের নেগেটিভ ভাইব দেয়া লাগে।
রিহান নেহার মাথায় গাট্টি মেরে বললো – “এই পাপা কি পরি চুপ থাক। সব কথায় তেতে উঠবিনা।”
“হুম, উচিত কথা বললেই দোষ হয়ে যায়।”
“স্টপ গায়েস! আমরা এখানে প্রবলেম মিটাতে এসেছি বাড়াতে না।” (নিধি)
“সব সত্যি বলে দিলে কি হয়?” কাহাফের কথায় সকলে চমকে উঠার মতো তার দিকে তাকালো।
“আর ইউ ক্রেজি কাহাফ? এই কথা কিভাবে বলিস তুই? আরহাম এখন ক্যারিয়ারের পিক পয়েন্টে আছে এখন এসব স্ক্যান্ডেলে জড়ানো উচিত নয়।” (নেহা)

“নেহা ইজ রাইট। এখন কিছু ফাস হলে আমাদের স্টুডিওর জন্যও কোনো সুনাম বয়ে আনবেনা।” (রিহান)
“সত্য কোনোদিন চাপা থাকেনা। এক না এক সময় এসব বেড়িয়ে আসবে। তখন?” (আদি)
“তখনের টা তখনই দেখা যাবে।” (নেহা)
“আরহাম কি ভাবছিস?” (আরাফ)
” ভাবছি পুরা সত্যি না বলেও আধা সত্যি দিয়ে ব্যাপারটা সুন্দরভাবে কভার করা যায়।” বলেই আরহাম বাঁকা হাসলো।
“কিভাবে?” সকলে সমস্বরে জিজ্ঞেস করলো।
“ব্রেইন এন্ড মানি – এই দুটো এক হলে সব সমস্যার সমাধানই করা সম্ভব।”
” তোর মাথায় কি চলছে আরহাম?” (আরাফ)
“কাল প্রেস কনফারেন্সে দেশের সব টপ জার্নালিস্টদের চাই আমি।”
“সকলেই আসবে – হাতে পায়ে ধরে শিডিউল নিয়েছে নিধির থেকে।” (আদি))
–আরহাম নিধিকে কিছু জার্নালিস্ট এর নাম বলে তাদের সাথে আলাদাভাবে যোগাযোগ করতে বললো আর বাকিদের শিখিয়ে দিলো কি কি করতে হবে।

আরহাম বাড়ি ফিরলো রাত ১২ টা নাগাদ। রুমে এসেই দেখে আলিশা গুনগুনিয়ে গান করছে আর ডোরাকে নিয়ে খেলছে – যা দেখে আরহামের কঁপাল কুচকে গেলো! এই ছোট মরিচের মা এতো চিল মুডে কেমনে? এতক্ষনে তো কেঁদেকেটে বুক ভাসানোর কথা। আরহাম আর বেশিকিছু না ভেবে ফ্রেশ হয়ে এসে ছেলেকে কোলে নিলো।
“বাব্বা..বা” ছোট্ট ডোরা এতক্ষন পর বাবাকে পেয়ে তার ছোট গুলুমুলু হাত দিয়ে বাবার গালে আদর দিচ্ছে।
“এই ছোট মরিচ, খেয়েছিস?”
“উম…মাম তুত্তু ইয়াম ইয়াম।”
আরহাম ছেলের গালে আলতো কামড় দিয়ে শুধালো – “আছেই তো এক তুত্তু। শীগ্রই তোর এই তুত্তু খাওয়া বন্ধ করতে হবে।”
ডোরার যেন বাবার এই কথা বিশেষ পছন্দ হলোনা তাইতো মায়ের কোলে ফিরে যাওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলো।
আরহামও দিয়ে দিলো ডোরাকে – তার এখন কাজ আছে। সে ডোরাকে দিয়ে চলে গেলো রুমের ভিতর আরেক রুম অর্থাৎ তার হোম স্টূডিওতে।
নিজের শখের সাজানো স্টুডিওতে ঢুকে আরহামের চোখ ছানাবড়া! এইসব কি? তার গিটার কই?
আরহামের গিটারের হিউজ কালেকশেন – যেখানের প্রায় সব ইম্পোর্টেড এবং লিমিটেড এডিশেন। এতোসব গিটারের মাঝে আরহামের দুটো গিটার বেশ প্রিয় যা এই মুহুর্তে কোথাও খুজে পাচ্ছেনা সে। সব জায়গায় খুজেও যখন পায়নি তখন তড়িঘড়ি করে আলিশার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো – “লিশা? আমার গিটার কই?”

আলিশা হেলতে দুলতে জবাব দিলো –
“নেই।”
“নেই মানে! কি বলছিস এসব?”
“যা শুনেছো তাই।”
“আমার গিটার কই?”
“ভেঙে ফেলেছি।”
আরহামের মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো।
“তুই এমনটা করতে পারিস না…”
” পারি বলেই করেছি।”
“আমার লিমিটেড এডিশেনের গিটার ছিলো….”
“ডোন্ট প্যানিক…পরে আবার কিনতে পারবে। দরকার পড়লে আমিই কিনে দেবো।”
“ডু ইউ হেভ এনি আইডিয়া দেট হোয়াট হেভ ইউ ডান?”
“ভালোই করেছি। সারাদিন গিটার নিয়ে পড়ে থাকো এখন এই সুবাদে নাহয় একটু কম নিলে। ডোরা বোর হচ্ছে ওর সাথে খেলো।” এই বলে আলিশা আরহামের কোলে ডোরাকে দিয়ে বের হয়ে গেলো রুম থেকে।
পিছে হতবিহ্বল আরহাম যেন এখনো মানতে পারছেনা হলোটা কি? আলিশা কি তবে ইটের বদলে পাটকেল ছুড়ে মারলো?

আরহাম ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে এগিয়ে গেলো আলিশার দিকে, “আমার গিটার কোথায় আলিশা?”
আরহাম রেগে গেলে আলিশা তার পুরা নাম ধরেই ডাকে।
“বললাম তো ভেঙে ফেলেছি।”
“এমনটা কেন করলি?”
“তুমি এমনটা কেন করলে?”
“আমার অনেক শখের গিটার ছিলো…”
“আমারও অনেক শখের আইডি ছিলো…”
“তোর ভালোর জন্যই করেছি।”
“আমার পারমিশেন নিয়েছিলে?”
“প্রয়োজন মনে করিনি।”
“আমিও করিনি। সমানে সমান। ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়।”
আরহাম আলিশার কোমড় খামচে ধরে বললো –

তোমার আমার গল্প পর্ব ৪২

“সাহস অনেক বেড়ে গিয়েছে তাই না?”
“তা তো অবশ্যই। মিসেস মেহতাব বলে কথা।”
আরহাম আলিশার কোমড় আরও জোড়ে খামচে ধরলে আলিশা ঘাবড়ালো না বরং নিজেই আরহামের গলা জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো।
আরহাম শুরুতে রেসপন্স না করলেও সময় যেতেই যেন আলিশার ঠোঁটের উপর নিজের সব রাগ মেটাতে শুরু করলো ; এই যেন এক নিরব যুদ্ধ চলছে দুজনের ভিতর।

তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here