তোমার আমার গল্প পর্ব ৫০
noorayn
দুদিন পর থেকেই আরহামের পরীক্ষা শুরু তাই সে নিজের বেডরুমের ভেতর থাকা স্টাডি রুমটাতেই পড়াশোনায় মগ্ন।
এই সেমিস্টারেও যদি ফেইল করে তাহলে খাটাশ প্রিন্সিপাল আবার ইজাজ খানকে ফোন করে অভিযোগ করবেন। তারপর শুরু হবে বাবার বকাঝকা আর সেই বকাঝকার শুরু এবং শেষ দুটোই গিয়ে ঠেকবে তার মিউজিক ক্যারিয়ারে।
তাই আরহাম এবার কোনো ঝামেলায় যেতে চায় না।
আপাতত এ.এম.কে স্টুডিওর সব কাজ পেন্ডিংয়ে রেখে সে এখন পড়ালেখায় মন দিয়েছে।
বেডরুমের ভেতর আলিশা ঘুমাচ্ছে আর ডোরা আছে তার দাদুমনির কাছে।
তবে, দাদুমনির কাছে থাকলেও ডোরার নিয়ম হচ্ছে তার একটু পরপরই মাম্মা-বাবাকে দেখতে হবে ; বেশিক্ষন কাউকে না দেখলে কেঁদে উঠে।
অনেক্ষন দাদুমনির কাছে থাকার পর এখন ডোরার বাবাকে চাই – “বাবা দাই…দোরা বাবা দাই।”
শাইনা বেগম তাই তাকে এনে আরহামের কাছে দিয়ে গেছেন।
আরহাম প্রথমে নিতে চায়নি কিন্তু না নিয়েও উপায় নেই। এই ছোট মরিচ এমন গলা ফাটিয়ে কান্না শুরু করেছিলো যাতে কি না কি হয়ে গেছে।
আলিশাও ঘুমাচ্ছে নাহলে এতক্ষণে ডোরাকে মায়ের কাছেই রেখে আসতো।
অগত্যা ডোরাকে কোলে নিয়েই পড়তে বসেছে আরহাম।
ডোরা বাবার কোলে বসে কুটুরমুটুর চোখে সব পর্যবেক্ষণ করছে। নিজের গুলুমুলু হাতটা মুখে পুরে চুষতে চুষতে এবার তার নজর গেলো বাবার বইয়ের দিকে। সে বইয়ের দিকে আঙুল তুলে বললো,
“ইটা কি?”
“বই।”
আরহাম উত্তর দিয়েই আবার বইয়ের দিকে তাকালো।
“ইটা বুই?”
“হুম।”
“বুই ডিয়ে কি কলে?”
“পড়াশোনা করে।”
“পড়াচুনা?” ডোরা বড় বড় চোখ করে তাকালো।
“হুম।”
“পড়াচুনা কলে কি কলে?”
“পরীক্ষা দেয়।”
“পলীক্কা?”
“হুম।”
“পলীক্কা ডিয়ে কি কলে?”
একটার পর একটা প্রশ্নে আরহামের নাজেহাল।
সে পড়তে পারছে না আবার ডোরাকেও নামিয়ে দিতে পারছে না। এই বাচ্চাকে নামিয়ে দিলেই যে আবার কান্নার সাইরেন বেজে উঠবে সেটা সে খুব ভালো করেই জানে।
“চুপ থাক ছোট মরিচ।”
ডোরা কিছুক্ষণ ভেবে বললো,
“তুপ তাকবো?” নিজের ফোলা এক হাত ঠোঁটের উপর রেখে বললো।
“হ্যাঁ। আর কথা বলবি না। বাবা পড়ছে।”
“কতা বুলবুনা? বাবা পলে?”
আরহাম বিরক্ত হয়ে আর উত্তরই দিলো না।
বাবার কোলে বসে ডোরা বড় বড় চোখে তার পড়াশোনা পর্যবেক্ষণ করছে আর একবার নিজের ছোট্ট জিহ্বা দিয়ে বাবার টি-শার্ট চেটে দিচ্ছে তো আবার পরক্ষণেই দাঁত বসিয়ে দিচ্ছে।
আরহাম একবার নিজের লালায় ভিজে যাওয়া টি-শার্টের দিকে তাকালো তারপর ডোরার দিকে। তবে, কিছু বললো না কারন এটা ডোরার নিত্যদিনের কাজ। বাবার কোলে উঠলেই টি-শার্ট চাটা, কামড়ানো, টানাটানি ; সবই তার দৈনন্দিন রুটিনের অংশ।
টি-শার্টের পর এবার তার নজর গেলো বাবার খোলা বাহুর শক্ত মাসেলের দিকে।
ডোরা সেখানে নিজের আঙুল দিয়ে টোকা দিচ্ছে তারপর আবার ছোট্ট দাঁত দিয়ে কামড়েও দেখছে ; যেন পরীক্ষা করছে – বাবার হাত এত শক্ত কেন?
আরহামেরও অভ্যাস হয়ে গেছে এসবের তাই কিছু না বলে এক হাতে ডোরাকে আগলে অন্য হাতে বই ধরে পড়তে থাকলো।
–টি-শার্ট, মাসেল, চুল, নাক – সব নিয়ে খেলা শেষ করে ডোরা অবশেষে শান্ত হলো।
কিন্তু সেই শান্তি পাঁচ মিনিটের বেশি আর স্থায়ী হলো না।
“আ…বাবা।”
আরহাম বই থেকে চোখ না তুলেই বললো,
“কি চাই?”
“দোরা তুত্ত কাই।”
“দুধ খাবি?”
“কাই কাই…”
আরহাম ডোরাকে পড়ার টেবিলের ওপর বসিয়ে রুমের দিকে গেলো ফিডার আনতে। আলিশা ঘুমানোর আগে ডোরার দুধ বানিয়ে ফিডারে রেখে দিয়েছিলো।
এদিকে টেবিলের ওপর বসে ডোরা নিজের নাদুসনুদুস শরীরটা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর টেবিলের ওপর থাকা কলম, পেন্সিল, খাতা ; যা হাতের কাছে পেয়েছে সবকিছু এলোমেলো করে ফেলেছে। খেলতে খেলতে হঠাৎ তার নজরে এলো এতক্ষণ বাবার পড়া বইটা…
সে দুই হাত দিয়ে বইটা জাপটে নিজের কাছে টেনে আনলো। তারপর বইয়ের ওপর ছোট ছোট হাত দিয়ে বারি দিতে দিতে নিজ মনে বলছে –
“আ…উউ…ইই…”
ঠিক তখনই ফিডার হাতে ফিরে এলো আরহাম।
দরজার কাছে আসতেই আরহামের চোক্ষু চড়কগাছ।
দুই মিনিট…মাত্র দুই মিনিটের জন্য গিয়েছিলো সে!
এই দুই মিনিটেই ছোট মরিচ তার পুরো পড়ার টেবিলের চেহারা পাল্টে দিয়েছে।
আরহাম অবাক চোখে সব পরোখ করলো। আর ডোরা?
সে নিষ্পাপ মুখে বাবার দিকে তাকিয়ে একগাল ফোকলা হেসে বললো,
“বা…বাবা।”
“এসব কি করেছিস তুই?”
ডোরা সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত নেড়ে মায়া মায়া মুখ করে বললো,
“না…ন্নাই। দোরা গুট বয়। দোরা কিচ্চু কলেনাই।”
“তাহলে এসব কে করেছে?”
ডোরা কিছুক্ষণ চারপাশে তাকিয়ে রইলো তারপর দূরে থাকা বড় টেডি বিয়ারের দিকে আঙুল তুলে বললো,
“টেডু কলেছে চব… দোরা কিচ্চু কলেনাই। দোরা গুট গুট।”
–যেন সে বোঝাতে চাইছে সব দোষ টেডি বিয়ারের! ডোরা তো একদম নিষ্পাপ।
আরহাম ছেলের বুদ্ধিতে অবাক না হয়ে পারলো না।
“সব এখন টেডির দোষ?”
“টেডু দুশ।”
আরহাম আর কিছু বললো না। চেয়ারে বসে টেবিলের ওপর ফিডার রাখলো।
কিন্তু ডোরার এখন ফিডারের দিকে কোনো মনোযোগ নেই। সে আবার বাবার বইটা নিয়ে ব্যস্ত…
“এই…তুই আমার বই নিয়ে কি করছিস?”
“পড়াচুনা কচ্চি।”
আরহাম কপালে হাত চাপড়ালো।
“দে আমার বই দে। আমার পরীক্ষা আছে, পড়তে হবে।”
কথাটা শুনে ডোরা ছোট ছোট ভ্রু কুঁচকে তাকালো যেন বই ফেরত দিতে বলায় সে অপমানিত বোধ করেছে।
সে তার ফোলা ফোলা গাল আরও ফুলিয়ে বাবার দিকে নিজের গুলুমুলু আঙুল তুলে শাসিয়ে বললো,
“আ…তা…তাইত তাইত! দোরার ও পলীক্কা… দোরাও পব্বে।”
“তোর কিসের পরীক্ষা?”
“বুইয়ের পলীক্কা।”
আরহাম ডোরার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
“আন্ডার দাঁত উঠেনি চারটা আর সে নাকি দেবে পরীক্ষা!”
বলেই আবার বইটা নিতে হাত বাড়ালো।
“দে আমার বই দে।”
ডোরা সঙ্গে সঙ্গে বইটা নিজের নিজের গুলুমুলু হাত দিয়ে ঢাকার ব্যার্থ প্রচেষ্টা করলো ; তার ছোট ছোট হাতে সে বইয়ের একাংশ ও ঢাকতে পারেনি।
“তুপ কলো। দোরা পচ্চে…ডোন ডিস্টাপ।”
“আচ্ছা? কি পড়ছিস?”
ডোরা এবার চুপ করে গেলো ; যেন সে কিছু ভাবছে। তারপর কপাল কুঁচকে বইয়ের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একগাল হেসে বললো,
“দন্দার বুই পচ্চি।”
“ছোট মরিচচচ…”
এই ডাক সে মায়ের কাছ থেকে শিখেছে। সব ওই ভোটকির দোষ! ভাবতে ভাবতেই আরহাম তেতে উঠে বইটা কেড়ে নিতে হাত বাড়াতেই ডোরা সঙ্গে সঙ্গে বাবার চুল মুঠো করে ধরে ফেললো।
“এই…ছাড় বলছি, আমার চুল ছাড়।”
ডোরা ছাড়ার বদলে আরও জোরে টান দিলো।
আরহামও কম যায় কিসে? সে’ও ডোরার ছোট্ট চুল মুঠো করে ধরে বললো,
“ছাড়!”
কয়েক সেকেন্ডের সেই টানাটানির পর ডোরা গলা উঁচিয়ে কান্না শুরু করলে আরহাম তড়িঘড়ি বললো,
“এই বাপ আমার! চুপ, চুপ… আচ্ছা, দেখ তোকে চকলেট দিবো।”
ডোরাএ কান্না মুহূর্তেই থেমে গেলো। সে বড় বড় চোখ করে বাবার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“চক্কেট ডিবা?”
“দিবো।”
“দোরা চিপ চিপ ও কাই।”
“চিপসও দিবো।”
ডোরার চোখ আরও চকচক করে উঠলো।
“আচকিমও কাই।” সু্যোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়েনি সে। Gen-Z বাপের সেয়ানা বাচ্চা বলে কথা।
“আইসক্রিমও খাবি?”
ডোরা মাথা দোলালো।
আরহাম অসহায় মুখে বললো,
“সব দিবো বাপ। শুধু তোর মায়ের সামনে বলিস না এসব। ডিল?”
ডোরা সঙ্গে সঙ্গে নিজের ছোট্ট হাতটা বাবার দিকে বাড়িয়ে দিলো।
“দিল দিল… দোরা বাবা দিল।”
আজ আরহামের পরীক্ষা ছিলো ; খুব বেশি ভালো না হলেও একেবারে খারাপও হয়নি। গত দুদিন এই সাবজেক্টটা নিয়ে এমন পেরেশানিতে ছিলো যে ঠিকমতো ঘুমানোরও সুযোগ হয়নি। তাই পরীক্ষা শেষ করেই আর কোথাও না গিয়ে সোজা খান ম্যানশেনে চলে এসেছে।
–বাসায় ফিরেই জুতো-মোজা খোলারও যেন ধৈর্য নেই নেই তার। বেডরুমে ঢুকেই এক ঝাঁপে বিছানায় শুয়ে পড়লো।
তখন ডোরা প্লেয়িং ম্যাটে বসে ছোট ছোট খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলছে। এক হাতে গাড়ি ঠেলছে আর মুখ দিয়ে নিজের মতো করে শব্দ করছে,
“বুম…বুম… বুম।”
ডোরার সেই খেলায় মগ্ন থাকার মাঝেই ড্রেসিং রুম থেকে বের হলো আলিশা। বিছানার দিকে তাকিয়েই তার চোখ কপালে…
আরহাম ফ্রেশ না হয়েই বিছানায় শুয়ে গেছে…
“এই… তুমি ফ্রেশ না হয়ে শুয়েছো কেন? উঠো।”
আরহাম চোখ বন্ধ রেখেই বিরক্ত গলায় বললো,
“উফ লিশা…জ্বালাস না তো। একটু রেস্ট নিতে দে।”
“ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নাও।”
“যাহ তো এখান থেকে। এখন উঠতে পারবো না আমি। অনেক টায়ার্ড লাগছে।”
আলিশা হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
“এমন ভাব করছো যেন তুমি ছাড়া কেউ কোনোদিন এক্সাম দেয়নি!”
আরহাম এবার চোখ খুলে তার দিকে তাকালো।
“দিয়েছে। তবে সারারাত বাচ্চা পেলে না ঘুমিয়ে এক্সাম দিতে যায়নি। তুই নিজে তো ঘুমালে হুশ থাকে না। এদিকে ডোরা রাতে ক্ষিদে পেলে কান্না করে। তখন আমার উঠে ওকে খাওয়ানো লাগে।”
আলিশা জানে কথাটা মিথ্যে নয়। ডোরা প্রায়ই মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে যায়। আরহাম খেয়াল না রাখলে হয়তো আলিশাকেই উঠতে হতো কিন্তু একবার ঘুমিয়ে পড়লে আলিশার যেন দুনিয়ার সবকিছুর সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাই রাতের বেলায় ডোরার দায়িত্বটা বেশিরভাগ সময় আরহামই সামলায়।
আলিশা একটু নরম হয়ে বললো,
“ওকে খাইয়ে আবার ঘুমিয়ে গেলেই তো হয়। সারারাত জেগে থাকো কেন?”
আরহাম এবার বিরক্ত হয়ে সোজা হয়ে বসলো।
“তোর ছেলে একবার উঠলে সহজে ঘুমায়? একবার চোখ খুললে তাও ভোরের আগে তার চোখে ঘুমের লেশমাত্র থাকে না।”
বলতে বলতে বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিলো সে।
এদিকে ডোরা একপলক মাম্মা-বাবার দিকে তাকিয়ে আবার নিজের খেলায় মন দিলো।
ছোট ছোট গাড়িগুলো এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে মুখ দিয়ে নানান শব্দ করছে –
“বুম… বুম দাই।”
আলিশা এবারর বেডের দিকে তাকালো ; সেখানে আরহামের ব্যাগ, মোজা, ঘড়ি – সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। এলোমেলো রুম আলিশার একেবারেই পছন্দ নয়। কিন্তু ডোরা হওয়ার পর থেকে তার রুম আর আগের মতো গোছানো থাকে না।
সে একবার ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে দেখলো পুরো জায়গাজুড়ে ডোরার খেলনার ছড়াছড়ি।
–শান্তা (সার্ভেন্ট) একটু পরেই আসবে ফ্লোর ঝাড়ু দিতে তাই আলিশা ডোরার কাছে গিয়ে তাকে কোলে তুলে বেডের ওপর বসিয়ে দিলো। ব্যস!
খেলার মাঝখান থেকে তুলে নেওয়ায় ডোরার চোখ মুহুর্তেই ছলছল করে উঠলো –
“আ…ইই…আ…”
আলিশা সঙ্গে সঙ্গে বললো,
“ডোরা! একদম কান্না করবে না।”
“আ…ইই…”
“চুপ করো বলছি। কিছু হলেই কান্না করতে হবে কেন তোমার?”
ডোরা নাক টেনে বললো,
“দোরা কেলবে।”
“অনেক খেলেছো। আর না। এখন ঘুমাবে তুমি।”
ডোরা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লো।
“দোরা গুমি গুমি না…ন্নাই।”
“কেন নাই?”
“দোরা গুমি বেড়ু বেডু গেচে।”
“ডোরার ঘুম বেড়াতে গেছে?”
“গেচে গেচে।”
ডোরা সঙ্গে সঙ্গে জানালার দিকে আঙুল তুলে দেখালো। তার ঘুম নাকি জানালা দিয়ে বের হয়ে বাইরে বেড়াতে গেছে।
আলিশা হাসি চেপে বললো,
“আচ্ছা…তবে ঘুমাতে হবে না। চুপচাপ বসে থাকো।”
“আচ্চা।”
ডোরা সঙ্গে সঙ্গে ভালো বাচ্চার মতো বসে গেলো।
কারণ সে জানে, এখন বেশি দুষ্টুমি করলে মাম্মা তাকে জোর করে ঘুম পাড়িয়ে দেবে।
আলিশা ডোরাকে বেডের ওপর বসিয়ে তার ফিডার বানাতে গেলো।
মাম্মা রুম থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ডোরার দুষ্টুমি আবার শুরু। বেডের ওপর বসে থাকা অবস্থায় সে চারপাশে তাকালো। মাম্মা নেই, বাবাও নেই।
ডোরা ধীরে ধীরে হামাগুড়ি দিয়ে বেডের কিনারায় গিয়ে আস্তে আস্তে বেড থেকে নেমে দাঁড়ালো।
তারপর ছোট ছোট পা টিপে টিপে চলে গেলো আলিশার ভ্যানিটির সামনে।
ভ্যানিটির নিচের দিকে একটা ড্রয়ার আছে যা ভুলবশত আজ একটু খোলা রয়ে গিয়েছে।
ডোরা ছোট্ট হাত বাড়িয়ে ভেতরের জিনিসপত্র নেড়েচেড়ে ঘাটতে লাগলো।
একটা জিনিস হাতে এলো ; আলিশার ফাউন্ডেশন।
সে ফাউন্ডেশনটা বের করে ঘুরিয়ে, উল্টে খোলার ব্যার্থ প্রচেষ্টা করলো কিন্তু ঢাকনাটা খুলেই না। তাই ডোরা রাগে ফাউন্ডেশনটা দিলো এক আছাড়!
–ঠাস…তারপর? চুরমার।
ডোরা স্থির হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর একটা আঙুল মুখে পুরে ভাঙা ফাউন্ডেশেনের দিকে তাকালো।
সে চারপাশে তাকালো। মাম্মা দেখেনি তো?
আলিশা আসার আগেই ডোরা হামাগুড়ি দিয়ে ড্রেসিং রুমের দিকে চলে গেলো ; সেখানে কাপড় রাখার একটা ছোট খালি বাস্কেট আছে। সে কোনো রকমে নিজের নাদুসনুদুস শরীরটা তার ভেতরে ঢুকিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে পড়লো।
–এদিকে আলিশা ফিডার হাতে গুনগুন করতে করতে রুমে ঢুকলো।
“লা…লা…লা…”
তারপর বিছানার দিকে তাকিয়েই থেমে গেলো।
ডোরা কোথায়? আলিশা ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকালো।
“এই মিনি গন্ডারটা আবার কোথায় গেলো?”
আলিশা সামনে এগিয়ে আসতেই হঠাৎ তার চোখ আটকালো ফ্লোরে। এক মুহূর্ত, দুই মুহূর্ত…তারপর তার চোখ বড় হয়ে গেলো!
মেঝেতে পড়ে থাকা নিজের মেকআপের দিকে তাকিয়ে রইলো সে।
দুদিন! মাত্র দুদিন আগেই কিনেছিলো এটা…
আর আজই সব শেষ!
আলিশার চুপ থেকে হঠাৎই চিৎকার করে উঠলো,
“আরশাননন! কি করেছিস তুই এটা?”
রেগে গেলে আলিশা ডোরাকে আরশান বলে ডাকে।
কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়ায় দবার আলিশা চোখ ছোট করে পুরো রুমে তাকালো ; বেডের নিচে নেই, পর্দার পাশে নেই, প্লেয়িং ম্যাটের কাছেও নেই!
তারপর তার সন্দেহ আরও বাড়লো।
আবার! আবার…এই মিনি গন্ডারটা তার মেকআপ নষ্ট করে কোথাও লুকিয়েছে!
আলিশা ফিডারটা টেবিলের ওপর রেখে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালো।
“এই গন্ডারের বাচ্চা মিনি গন্ডার…বের হ বলছি!”
“কোথায় লুকিয়েছিস? আজ তোর একদিন কি আমার একদিন!”
–বাস্কেটের ভেতর থেকে ডোরা খুব সাবধানে নিজের ছোট্ট মুখটা একটু একটু করে বের করে মাম্মার দিকে তাকাচ্ছে।
মাম্মার মুখের অবস্থা দেখে আবারও ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে…
আলিশা কোমরে হাত দিয়ে চেঁচিয়ে বললো,
“তুই বের হবি কিনা? আমি কিন্তু কাউন্ট করছি…”
“ওয়ান…টু…”
ডোরার চোখ গোল গোল হয়ে এলো ; সে এবার গুলুমুলু দুই হাত দিয়ে নিজের ছোট মুখটা ঢেকে ফেললো।
“থ্রী…ফোর…ফাই…”
ফাইভ বলার আগেই বাস্কেটের ভেতর থেকে ধীর একটা আওয়াজ এলো,
“না…ন্নাই… দোরা নাই।”
আলিশা শব্দের উৎসের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইলো।
“ডোরা কোথায়?”
ভেতর থেকে উত্তর এলো,
“দোরা নাই নাই… দোরা বেড়ু গেচে।”
আলিশা ধীরে ধীরে বাস্কেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
তারপর ভেতরে তাকাতেই দেখলো ; ডোরা গুটিশুটি মেরে বসে আছে, মুখের ওপর দুই হাত দিয়ে ঢাকা।
এমন ভাব যেন হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখলেই পৃথিবীর কেউ তাকে দেখতে পাবে না।
আলিশা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে এক ঝটকায় তাকে কোলে তুলে বের করে আনলো।
“তবে এটা কে?”
–ধরা পড়ে যাওয়ায় ডোরার মুখটা সঙ্গে সঙ্গে কাঁদো কাঁদো হয়ে এলো। ঠোঁটটা নিচের দিকে নামিয়ে কান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো সে…
কিন্তু আলিশা পরের প্রশ্ন করতেই কান্না সাময়িকভাবে ভুলে গেলো।
“আমার মেকআপ ভেঙেছিস কেন?”
ডোরা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো।
“দোরা কলেনাই।”
“কে করেছে তাহলে?”
ডোরা কয়েক সেকেন্ড একেবারে নিষ্পাপ চোখে মাম্মার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর মাসুম চেহারা করে বললো,
“বাবা কলেছে।”
ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হলো আরহাম।
মাত্রই লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছে সে। গায়ে এখনো শুধু কোমর সমান একটা টাওয়াল জড়ানো।
বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কানে এসে ঠেকলো ডোরার সেই “বাবা কলেছে” কথাটা।
আরহাম ভ্রু কুঁচকে থেমে গেলো। সামনে এগিয়ে জিজ্ঞেস করলো – “আমি কি করেছি?”
বাবাকে দেখে ডোরার চোখ মুহুর্তেই চকচক করে উঠলো।
সে আলিশার কোলে থেকেই ছোট্ট আঙুল তুলে আরহামের দিকে ইশারা করে বললো,
“চব বাবা কলেছে। দোরা কিচ্চু কলেনাই… দোরা গুট বয়।”
আরহামের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো।
“কী! কি করেছে সে?”
সে ভয় ভয় চোখে আলিশার দিকে তাকালো।
আলিশা তখন এমনভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে যেন আরহামকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে।
আরহাম নিজের অপরাধ না জেনেই আলিশার দিকে তাকিয়ে বললো,
“বিশ্বাস কর লিশা..আমি কিছুই করিনি। আমি জানিও না আমি কি করেছি।”
তারপর ডোরার দিকে তাকিয়ে ছোট ছোট চোখ করে বললো – “এই ছোট মরিচ নিজের দোষ আমার ওপর দিচ্ছে।”
ডোরা তখনও মায়া মায়া মুখ করে তাকিয়ে আছে।
আরহাম এবার তার দিকে আঙুল তুলে বললো,
“আবার কি আকাম করেছিস, পটকা?”
ডোরা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেললো।
মুখটা এমন নিষ্পাপ করে রেখেছে যেন তার থেকে ভদ্র বাচ্চা আর দুটো নেই।
আলিশা এবার রাগে কটমট করতে করতে বললো,
“সব তুমিই করেছো। এসব কিছু ডোরা তোমার থেকেই শিখেছে।”
আরহাম হতভম্ব।
“আমি?”
“হ্যাঁ, তুমি!”
“আমি আবার কি শেখালাম?”
আলিশা আর কোনো উত্তর না দিয়ে ডোরাকে তার কোলে তুলে দিতে দিতে বললো –
“যেমন বাপ, তেমন ছেলে।”
বলেই গটগট করে রুম থেকে বের হয়ে গেলো।
আরহাম কয়েক সেকেন্ড দরজার দিকেই তাকিয়ে রইলো।
তারপর নিজের দিকে তাকালো ; গায়ে শুধু একটা টাওয়াল।
মাত্রই শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছে আর বের হতে না হতেই অপরাধী হয়ে গেলো! তাও আবার এমন এক অপরাধের জন্য যেটা সে জানেই না!
আরহাম ধীরে ধীরে ডোরার দিকে তাকালো।
ডোরা তখন তার দিকে মায়া মায়া চোখে তাকিয়ে আছে।
ডোরার চেহারা দেখে কে বলবে, একটু আগেই এই শান্ত-শিষ্ট, ইনোসেন্ট মুখের বাচ্চাটা সব দোষ বাপের উপর চাপিয়ে দিয়েছে…
“আকাম করবি তুই আর দোষ হবে আমার! সব দোষ ডোরার বাপ ঘোষ!
খান বাড়ির সবাই এখন রাতের ডিনার করছে।
নিয়াজ সাহেব আজ বাইরে একটা মিটিংয়ে ছিলেন ; সেখান থেকেই ডিনার করে এসেছেন বলে এখন লিভিং রুমের সোফায় আরাম করে বসে টিভিতে নিউজ দেখছেন।
বাকিরা সবাই ডাইনিং টেবিলে বসে খাচ্ছে আর এদিকে আরহামের অবস্থা একেবারে করুণ।
ডোরাকে কোলে নিয়ে সে করিডোরের এদিক-সেদিক হাঁটছে। আজ আরহাম ডিনার করতে যায়নি। তার নাকি ক্ষিদে নেই ; একটু আগেই রামেন খেয়েছে।
তাই ভেবেছিলো ডিনারের সময়টুকুতে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে গিয়ে একটু আড্ডা দিয়ে আসবে।
কিন্তু তার সেই পরিকল্পনার ভেস্তে দিয়েছে এই ছোট মরিচ।
–ডোরা বাবার কোল থেকে নামার নামই নিচ্ছে না।
দুই হাত দিয়ে বাবার গলা পেঁচিয়ে ধরে ঝুলে আছে।
ডোরাকে সামলাতে সামলাতে আরহামের অবস্থা প্রায় নাজেহাল।
আলিশা আর বাকিরাও এখন ডিনার করছে। তাই ডোরাকে কারও কাছে দেওয়ারও উপায় নেই।
–শেষমেশ ডোরাকে কোলে নিয়েই লিভিং রুমে এসে থামলো আরহাম। সামনেই নিয়াজ সাহেব মনের সুখে টিভি দেখছেন।
অন্যদিকে, মেয়ের জামাইয়ের অবস্থা দেখে উনার মনে এক রকম পৈশাচিক আনন্দ অনুভব হচ্ছে।
আরহামের আবার শ্বশুরের এমন সুখ সহ্য হলো না।
সে ধপ করে পাশের সোফায় বসতে বসতে বললো,
“শুশু আব্বা…”
নিয়াজ সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বিরক্ত মুখে তার দিকে তাকালেন।
আবার এসেছে এই অসভ্য ছেলে উনাকে জ্বালাতে!
“নিজের সম্বোধন ঠিক করো। আমি তোমার শ্বশুর হই, সেই সঙ্গে চাচাও।”
আরহাম ঠোঁট পাউট করে বললো,
“এত গভীর সম্পর্ক বলেই তো ভালোবেসে শুশু আব্বা ডাকিইইই…”
নিয়াজ সাহেব কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার টিভির দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
এই ছেলের সঙ্গে কথায় পেরে ওঠা সম্ভব নয়।
এদিকে ডোরা বাবার কোলে বসে বেশ আয়েশে আছে।
কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত বাবার গলা জড়িয়ে ছিলো আর এখন বাবার নাক নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে।
ছোট্ট আঙুল দিয়ে বারবার বাবার নাকে টোকা দিচ্ছে।
“উফ ডোরা… কি করছিস?”
ডোরা বাবার নাকের দিকে তাকিয়েই বললো,
“তোমাল নোচ দেকচি।”
“দেখতে হবে না। হাত সরা।”
ডোরা হাত সরালো না। বরং এবার তার হাত বাবার কানের ভেতর ঢোকানোর চেষ্টা করছে।
আরহাম সঙ্গে সঙ্গে মুখ কুঁচকে ফেললো।
“এই! কানে হাত দিস না!”
ডোরা আরও উৎসাহ নিয়ে কানে আঙুল ঢোকানোর চেষ্টা শুরু করেছে…
আরহাম এবার বিরক্ত হয়ে নিয়াজ সাহেবের দিকে তাকালো।
“টিভি থেকে চোখ সরিয়ে নিজের নাতিকেও তো একটু নিতে পারেন।”
নিয়াজ সাহেবের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটলো।
মনে মনে বললেন – হাহ! এখন এসেছে সাহায্য চাইতে।
তিনি বেশ নিশ্চিন্ত গলায় বললেন,
“অফিস থেকে আসার পর থেকেই আমার কাছেই ছিলো আমার নাতি। তুমি তো কেবলমাত্র এখনই নিয়েছো।”
আরহাম চোখ কুঁচকে বললো,
“তুমি চাইলেই কিন্তু আমাকে একটা হেল্প করতে পারো।”
নিয়াজ সাহেব এবার টিভি থেকে চোখ সরিয়ে তার দিকে তাকালেন।
“কেমন হেল্প?”
আরহাম ডোরাকে একটু ঠিক করে কোলে বসিয়ে খুবই গম্ভীর মুখে বললো,
“এই যে, আজ যদি ডোরার কোনো খেলার সঙ্গী থাকতো, তাহলে তার সঙ্গে ডোরা বিজি থাকতো। আর আমাকেও জ্বালাতো না।”
“মানে? কী বলতে চাইছো তুমি?”
আরহাম যেন খুব স্বাভাবিক একটা কথা বলছে এমন ভঙ্গিতে বললো,
“আপনি চাইলেই কিন্তু আমার জন্য নতুন শালা বা শালী আনার ব্যবস্থা করতে পারেন।”
নিয়াজ সাহেবের মুখের রঙ মুহূর্তেই পরিবর্তন হয়ে গেলো।
আরহাম থামলো না।
“ঘরে নতুন বাচ্চা আসলে ডোরাও অনেক খুশি হবে।”
নিয়াজ সাহেবের চোখ কপালে উঠে গেলো।
“কি বললে?”
“আমি তো বলেছি…”
আরহামের কথা শেষ হওয়ার আগেই নিয়াজ সাহেব খুকখুক করে কেশে উঠলেন।
মাথার ভেতর যেন একসঙ্গে হাজারটা চিন্তা ঘুরতে শুরু করেছে। নানা হওয়ার পর আবার বাবা? এই বয়সে?
ছিঃ ছিঃ! কেউ শুনলে কী বলবে?
নিয়াজ খান কিনা বুড়ো বয়সে আবার বাবা হতে চলেছেন!
নিজের চিন্তাতেই তিনি নিজে অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন।
তারপর হঠাৎ নিজেকেই মনে মনে ধমক দিলেন।
এসব কী ভাবছেন তিনি!
আরহাম তখনও নির্বিকার মুখে বসে আছে ; ঠোঁটের কোনে মিটিমিটি হাসি।
নিয়াজ সাহেব এবার রেগে বললেন,
“অসভ্য…বেয়াদব ছেলে! লাজলজ্জা কি সব ফেলে এসেছো?”
“দেখেন শুশু আব্বা, আমি কিন্তু কোনো অন্যায় আবদার করিনি। আমি নিজের ছেলের জন্য শালা-শালীর রূপে খেলার সঙ্গী চাইতেই পারি।”
“চুপ করো ছেলে…চুপ।”
“যদিও বয়সের একটা ব্যাপার আছে আপনার…
“আর একটা কথাও বলবে না।”
আরহাম হাসি চেপে বললো,
“কিন্তু তা নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না। আপনি রাজি থাকলে আমি আপনাকে কলিকাতা হারবা…”
পুরো কথাটাও শেষ করতে পারলো না আরহাম।
নিয়াজ সাহেব ধপ করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
তারপর আর এক মুহূর্তও সেখানে না থেকে এমনভাবে ভোঁ দৌড় দিলেন যে মনে হলো কেউ পেছন থেকে তাকে ধরতে আসছে…
“এই…শুশু আব্বা! কথা তো শেষ করতে দেন!”
কোনো উত্তর নেই।
নিয়াজ সাহেব ততক্ষণে পর্দার আড়াল পেরিয়ে সোজা অন্যদিকে চলে গেছেন।
এখানে আর এক মুহূর্ত থাকলে উনার ইজ্জতের যা অবশিষ্ট রয়েছে সেটুকুও আর থাকবে না।
শ্বশুররূপী ছোট বাবাকে এভাবে পালিয়ে যেতে দেখে আরহাম হো হো করে হেসে উঠলো।
ছোটবেলা থেকেই নিয়াজ খানের সঙ্গে তার সম্পর্কটা এমন।
কেউ কাউকে কথায় এক ইঞ্চিও ছাড় দেয় না।
একজন আরেকজনকে জ্বালাতে পারলে দুজনেরই যেন দিন সার্থক। তবে, এই দুজনের সম্পর্কটা খুনসুটির হলেও বেশ গভীর। আরহামের জীবনের প্রথম বন্ধু কিন্তু তার ছোট বাবাই।
–আরহাম হাসতে হাসতে কোলে থাকা ডোরার দিকে তাকালো। ডোরা ততক্ষণে বাবার নাক ছেড়ে বাবার জামার বোতাম নিয়ে ব্যস্ত…
“দেখলি ডোরা? তোর নানা তোর জন্য খেলার সঙ্গী চাওয়াতে কিভাবে পালালো…”
ডোরা কিছুই বুঝলো না।
সে বাবার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো।
“নানাবাই পালাইচে?”
“হ্যাঁ।”
আলিশা ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ; ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুলে বেনী করে নিচ্ছে। আর এদিকে আরহাম নিজের হোম স্টুডিওতে নতুন কেনা গিটারটা নিয়ে ব্যস্ত।
নতুন গিটারটা হাতে নিয়ে কখনো স্ট্রিং টেনে দেখছে, কখনো টিউনিং মিলিয়ে নিচ্ছে। এতটাই মনোযোগ দিয়ে দেখছিলো যে পাশের রুমে কী হচ্ছে ; সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই।
অন্যদিকে, ডোরা বেশ কিছুক্ষণ ধরেই দুষ্টুমি করছে।
একবার বেডের ওপর উঠছে তো আবার নেমে যাচ্ছে। কখনো বালিশ টেনে নিচ্ছে, কখনো খেলনা ছুড়ে দিচ্ছে।
শেষমেশ আলিশা বিরক্ত হয়ে পাশ থেকে আরহামের ফোনটা তুলে নিয়ে তাতে বেবি শার্ক চালু করে ডোরার হাতে ধরিয়ে দিলো। ব্যস! ডোরা শান্ত।
সে গান শুনতে শুনতে নিজের মতো করে হাত-পা ছুড়াছুড়ি শুরু করে দিয়েছে।
–কিছুক্ষণ পর আরহাম স্টুডিও রুম থেকে বের হয়ে বেডরুমে ফিরলো। রুমে ঢুকেই তার চোখ আটকে গেলো ডোরার হাতে থাকা ফোনে। তার ফোন!
আর ডোরা তাতে গান শুনতে শুনতে উচ্ছ্বসিত হয়ে ফোনের উপর একের পর এক বারি মারছে।
আরহাম এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়ালো।
“এই, দে তো আমার ফোনটা।”
ডোরা সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা গুলুমুলু দুই হাত দিয়ে চেপে ধরলো।
“না..ন্নাই!”
“দে বলছি।”
ডোরা মাথা ঝাঁকালো। সে দিবেনা।
আরহাম এবার ফোনটা নেওয়ার চেষ্টা করতেই ডোরা পা দাপিয়ে প্রতিবাদ শুরু করেছে।
আরহাম ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললো,
“এতটুক আন্ডা আমার ফোনটা জব্দ করে বসে আছে!”
পাশ থেকে আলিশা নির্বিকার গলায় বললো,
“ওর বাপের ফোন ও নিয়েছে। তাতে তোমার কী?”
আরহাম দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“কারণ ওর বাপটা আমি নিজেই।”
আরহাম এবার ডোরার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো।
“এতটুকু বাচ্চার হাতে ফোন দিয়েছে কে?”
“আমি দিয়েছি।” আলিশা।
“এতটুকু ইঁদুরকে এসব কী শেখাচ্ছিস তুই?”
আলিশা সঙ্গে সঙ্গে বললো,
“বাপের মতো বড় ইঁদুর হতে শেখাচ্ছি।”
আরহাম কিছু বলার আগেই ডোরা নিজের গুলুমুলু পা দাপিয়ে হাত তালি দিতে দিতে বলছে,
“বাবা ইদুল…দোরা ইদুল..”
দুদিন পর…
আজ সকাল থেকেই কেমন যেন অস্থির লাগছে আলিশার।
কেন এমন লাগছে তা সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছেনা।
বুকের ভেতরটা কেমন ধুকপুক করছে, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে দমটা যেন আটকে আসছে।
অথচ এমন তো কোনোদিন হয় না তার।
তাই সে নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্যই কিচেনে এসে দাঁড়িয়েছে। ডোরা সেরেলাক আর সুজি ছাড়া তেমন কিছুই খেতে চায় না। তাই ডাক্তার যে বেবি ফুড চার্টটা দিয়েছেন, সেটার কথা মাথায় রেখে সেইসব উপকরণ দিয়েই ইউটিউব দেখে নতুন নতুন রেসিপি ট্রাই করছে আলিশা।
–হয়তো খাবারটা একটু মজা করে বানাতে পারলে ডোরা খেতে চাইবে। কিন্তু আজ তার মনটাই যেন কোনো কাজে বসছে না। কারণ ডোরা বাসায় নেই।
প্রায় দুই ঘণ্টা আগে ঘুরতে বের হয়েছে সে। সাধারণত ডোরা সারাক্ষণ তার আশেপাশে থাকে। তাকে খাওয়ানো, খেলানো, দুষ্টুমি সামলানো ; সব মিলিয়ে কখন যে দিনের অর্ধেক সময় কেটে যায় তা আলিশা টেরই পায় না।
অথচ আজ? দুই ঘণ্টা যেন দুই যুগ সমান লাগছে তার কাছে।
ডোরাকে এর আগে কোনোদিন এভাবে একা বাইরে যেতে দেয়নি আলিশা। কিন্তু আজ বাচ্চাটা যাওয়ার জন্য এতই জেদ করছিলো যে শেষ পর্যন্ত দিতে হয়েছে।
–হয়তো এটাই প্রথমবার বলে তার এমন অস্থির লাগছে।
নিজেকে বোঝালো আলিশা।
এই তো, আর কিছুক্ষণ পরই ডোরা ফিরে আসবে।
তারপর আবার দুষ্টুমি শুরু করবে।
এই ভেবেই নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখছে সে।
ডোরার জন্য আজ একটা নতুন রেসিপি বানাবে। দেখতে সুন্দর করে বানিয়ে দিলে নিশ্চয়ই বাচ্চাটা খেতে চাইবে।
সবজি, কিছু ফল আর ডাক্তার অনুমোদিত কয়েকটা উপকরণ ব্লেন্ড করে একটা মজার খাবার বানানোর চেষ্টা করছে আলিশা।
–সবজি ব্লেন্ডারে বসিয়ে যেই না সুইচ অন করার জন্য হাত বাড়াবে ঠিক তখনই ভেসে এলো নীলার চিৎকার…
আলিশার হাত সেখানেই থেমে গেলো।
এক মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠলো।
আবারও চেঁচামেচির আওয়াজ কানে এসে ঠেকতেই আলিশা আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকলো না।
কিচেনের কাজ, ব্লেন্ডার, রেসিপি ; সবকিছু ভুলে ছুটে গেলো ড্রয়িংরুমের দিকে।
তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৯ (২)
“কি হয়েছে?”
কিন্তু মুখ থেকে কথাটা বের হওয়ার আগেই নীলার কাঁপা কাঁপা গলা আবার কানে এলো…
“গাড়ি… এক্সিডেন্ট করেছে…”
