Home তোমার আমার গল্প তোমার আমার গল্প পর্ব ৬

তোমার আমার গল্প পর্ব ৬

তোমার আমার গল্প পর্ব ৬
noorayn

মজার ব্যাপার হলো এতোকিছুর মাঝেও আরহাম একবারের জন্য ও বিরক্ত হয়নি। আলিশা ও যেন হঠাৎ করে শান্ত হয়ে গেলো। এখন আর লাফালাফি করেনা বরং শান্ত হয়ে থাকে।
ঘরে বসে থাকা ছাড়া তার আর কোনো কাজ আপাতত নেই। বাড়িতে তাকে কেউ বিনা কারনে এক পা ও আগাতে দেয়না।এক্সামের পর আর পড়াশোনার টেনশন ও নেই। এবং আরহাম? সে তো বের হয় সকালে আর ফিরে রাত্রির বেলা। কিছুদিনের মধ্যে তার নতুন একটা গান রিলিজ হবে – যা নিয়ে আপাতত সে মহাব্যাস্ত।

সকাল ৮ টা বাজে…
খান ম্যানশনের কিচেনে তখন সকালের নাস্তার তোড়জোর চলছে।
আরহাম আর আলিশা তখন ও ঘুম।
তন্মধ্যে, আরহামের ফোন বেজে উঠলো শশব্দে। সে ঘুমঘুম চোখে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আরাফ ধমকে বলে উঠে – “শালা এখনো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস? মনে নেই? আজ ডিরেক্টরের সাথে মিটিং আছে ১০ টায়।
“হুম উঠেছি। এতো প্যারা নিতে হবেনা। আমি ১০ টার আগেই চলে আসবো।”
“ঠিক আছে, আয়।”
আরহাম ফোন রেখে নিজের হাতের উপর তাকালো যেখানে আলিশা নিশ্চিন্তে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে।
সে আস্তে করে আলিশাকে সরিয়ে তাকে ভালোভাবে কম্ফোটার দিয়ে ঢেকে উঠে বসলো।
আরহাম ফ্রেশ হতে গেলেও, একেবারে শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়ে এলো। তার পড়নে কেবল কোমড় অব্ধি টাওয়াল। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বডি স্প্রে দেওয়ার সময় খেয়াল করলো আলিশা উঠে বসেছে।
আলিশা হায় তুলতে তুলতে বললো –

“আমাকে ছেড়ে উঠলে কেন?”
“১০ টায় মিটিং আছে আমার।”
“আমাকেও নিয়ে যাও।”
“পাগল হয়েছিস? আমি কাজে যাচ্ছি ঘুরতে না।”
“জানি, তাও নিয়ে যাও প্লিজ। আমার সারাদিন ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগেনা। মা এবং বড় মা মিলে তো রুম থেকেও বের হতে দেয়না। আর দাদির কাছে গেলেই শুরু হয়ে যায় তার আর দাদাজানের প্রেম কাহীনির গল্প। এসব আর কত শুনবো?”
“মুভি দেখ, যা ইচ্ছা কর। তবুও এখন জেদ ধরবিনা। তোর এসব আবদার মেটানোর জন্য বসে নেই আমি।”
“এভাবে বলছো কেন? বাচ্চাটা কি আমার একার? তোমারও তো অংশ। তাহলে সব কষ্ট আমি একা করবো কেন?”
“দোষ তোর, তাই বেশি কষ্ট তুই করবি। বুঝলি? এখন উঠে ফ্রেশ হয়ে নে। সবাই অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। একসাথে ব্রেকফাস্ট করবো।”

“সব দোষ আমার কিভাবে হয়? আমি বলেছিলাম কাছে আসতে? এসেছিলে কেন?”
“বাধা ও তো দেসনি। তোর পুর্ন সম্মতি নিয়েই এগিয়েছি আমি।”
“হ্যাঁ, তার শাস্তিই তো ভোগ করছি এখন।” – এটা বলেই আলিশা উঠে ওয়াশরুমে চলে গেলো।
–আলিশা যেতেই আরহামও ব্রেকফাস্ট টেবিলে গিয়ে বসলো।
তাকে একা আসতে দেখে ইজাজ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন –
“আলিশা কোথায়?”
“আসছে তোমরা শুরু করো।”
বলতে বলতেই আলিশা চলে এসেছে তবে অবাক করা বিষয় হলো সে এসে আরহামের পাশের চেয়ারে বসেনি। বসেছে তার বাবা নিয়াজের পাশে।
এতে আরহাম ওর দিকে কটমটিয়ে তাকালে আলিশা তআ দেখেও না দেখার ভান করলো।
আরহাম বুঝেছে এই মেয়ে রাগ করেছে তার সাথে।
নিয়াজ সাহেব আলিশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন –

“শরীর ভালো আছে আমার প্রিন্সেসের?”
“জ্বী, বাবা।”
“কিছু লাগবে মা? বাবা এনে দেবো?”
“না বাবা।”
ইতিমধ্যে, আয়শা নিজের মেয়ের দিকে এক গ্লাস দুধ ও ডিম পোচ এগিয়ে দিলো। আর বেশি কিছু দেয়নি কারন আলিশা এখন সকালে তেমন কিছুই খেতে পারেনা যা খায় তা সব বমি করে উগ্রে দেয়।
দুধ দেখেই আলিশা মুখ কুচকালো।
“আমি মানা করেছি না দুধ দিতে? আমি এটার স্মেল একদম নিতে পারিনা মাম্মা।”
“তোমার জন্য দেইনি। বাবুর জন্য দিয়েছি। শুনোনি ডাক্তার কি বলেছে? তোমার শরীরে রক্ত কম তাই এখন বেশি বেশি খেতে হবে।”
আলিশাকে খাবার নিয়ে তাল করতে দেখে শাইনা আদর করে বললেন – “পুতুল খেয়ে নে। খাবার নিয়ে একদম তাল করবিনা।”

–আলিশা বহুকষ্টে ২ ঢোক দুধ খেয়েই উঠে চলে গেলো।
মেয়েকে চলে যেতে দেখে আয়শা রাগে বকতে শুরু করলেন –
“এই মেয়েকে নিয়ে আমি আর পারিনা। কিছু খায়না সারাদিন আর যা খায় তা সব বের করে ফেলে। এভাবে চললে কেমনে হবে?”
ছোট বউকে চিন্তিত দেখে মেহরোজা আক্তার তাকে আসস্ত করতে বললেন – “বেশি চিন্তা করবেনা ছোট বউ। এই সময়ে এমন হয়। দেখবা কিছুদিনে ঠিক হয়ে যাবে। তোমরা ওকে জিজ্ঞেস করো কি খেতে চায়। যা চাইবে তাই বানিয়ে দেবে।”
“আমরা তাহলে উঠছি।” – বলেই অফিসের উদ্দেশ্য রওনা হলেন ইজাজ এবং নিয়াজ সাহেব।
–আরহাম নাস্তা শেষে রুমে গিয়ে দেখে আলিশা নেই।
সে জানে আলিশা কোথায় আছে তাই সেখানেই গেলো।
–আলিশা নিজের রুমে (বিয়ের আগে যেখানে থাকতো) শুয়ে শুয়ে দিহানের সাথে চ্যাট করছিলো। হঠাৎ একটা হাত পিছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরলো। আলিশা জানে এটা কে তাই কোনো রিয়েক্ট করলোনা। বরং হাত সরিয়ে দিতে দিতে বললো –

“ছাড়ো।”
“রাগ করেছিস?”
“না, আমি কেন রাগ করবো তাও আবার তোমার সাথে?”
“জানি, রাগ করেছিস। কিন্তু তোর রাগে আমার কিছুই যায় আসেনা।” বলেই আলিশার ঘাড়ে আলতো চুমুর স্পর্শ আঁকলো।
হঠাৎ আরহামের কাছে আসাতে আলিশা ইয়াক-ইয়াক করে নাকে হাত চেপে বললো –
“দূরে সরো। ছিহ, কি বাজে স্মেল তোমার গায়ে।”
–আরহাম অবাক হয়ে নিজের গায়ে গন্ধ শুকে বললো –
“এক থাপ্পর দিবো ধরে। একটু আগেই শাওয়ার নিয়েছি আমি। এরপর এতো ভালো ব্র‍্যান্ডের পারফিউম দিয়েছি আর তুই বলছিস বাজে স্মেল?”
“হ্যাঁ, এই পারফিউমটা আর দিবেনা। এটার স্মেল নাকে এসে ঠেকলেই বমি পাচ্ছে আমার।”
আরহাম অবাক হয়ে শুধালো – “এটা তোর প্রিয় পারফিউম ছিলো লিশা!”
“আমার প্রিয় কিন্তু বেবীর এই পারফিউমটা পছন্দ হচ্ছেনা তাই ও বলেছে – মাম্মাম, তুমি পাপাকে বলবে এটা আর না দিতে।”

“বেবী কথাও বলতে পারে?”
“না পারেনা, তবে আমি বুঝতে পারি ও কি চায়। – বলেই আলিশা উঠে গেলো আরহামের পাশ থেকে।
“তুমি কেন এসেছো আমার রুমে? তোমার না মিটিং আছে? যাও তাহলে। এখানে এসে নিজের সময় নষ্ট করছো কেন?”
“যাচ্ছি।”
আলিশা এটা শুনে কাঁদো কাঁদো চেহারা করে বললো –
“সত্যিই যাবে? আমাকে নিবেনা?”
“জেদ করবিনা জান। সেখানে অনেক মিডিয়ার লোকজন থাকবে আর তোকে আমার সাথে দেখলে নানান প্রশ্ন করতে পারে।”
“ঠিক আছে যা তুই যাহহহহ। আমি একা একাই ঘুরতে যাবো। তোর দরকার হবেনা আমার। তোকে ছাড়াও যেতে পারি আমি। তোকে তো কেবল ভদ্রতার খাতিরে বলেছিলাম।”
“থাপড়ে গাল ফাটিয়ে দেবো বেয়াদব। যদি আর একবারও তুই করে বলেছিস তো।”
“একশো বার বলবো, কি করবি তুই? আমি কোথাও নিতে বললেই পারবোনা বলিস। কিন্তু তোর নিধি যদি বলতো তখন তো ঠিকই নিতি।”

“এখানে নিধি কোথা থেকে আসলো? আর ওকেও বা কেন নিতাম আমি? আর কি করবো বলছিস? এখনই তোর মোবাইল নিয়ে ফেলবো আমি। ছোট মাকেও বলবো যে তুই সারাদিন মোবাইল দেখে দেখে চোখ নষ্ট করছিস। তোকে যাতে আর মোবাইল না দেয়।”
“তোকে আমি ছাড়বোনা গন্ডার।” – বলেই আরহামের চুল টেনে ধরলো আলিশা।
“লিশা ছাড় বলছি ছাড়। নাহলে একটা মাইরও মাটিতে পড়বেনা।”
–শেষে আরহামও আলিশার চুল টেনে ধরলো। দুজন মারামারিতে কখন যে বেডে গিয়ে পড়লো তা নিজেরাও জানেনা।
তাদের চিৎকার চেচাঁমিতে আয়শা তড়িঘড়ি এসে, দুজনকে ছাড়ালেন। আর আলিশাকে বকলে লাগলেন –

“কি শুরু করেছো তুমি এসব? দুদিন পর বাচ্চার মা হবে আর এখনো এসব বাচ্চামো করছো!”
-“আরহাম তোকে কতবার বলেছি পুতুল (শাইনা আলিশাকে আদর করে পুতুল ডাকে) এর সাথে মারামারি করবিনা। এখন থেকেই দায়িত্ব নেওয়া শিখতে হবে তোদের। কিছুদিন পর মা-বাবা হবি আর একটু আগেই কি করছিলি? এসবের মধ্যে যদি ওর পেটে আঘাত লাগতো তখন কি হতো ভাবতে পারছিস?” (শাইনা)
“স্যরি মা। আর হবেনা এমন তবে শুরুটা এই ছাগল করেছিলো।”
“কাকে ছাগল বললি তুই? তুই নিজেই তো একটা গন্ডার তাই তোর কাছে আমাকে ছাগল মনে হয়।”
“আলিশা…!” (ধমকে উঠলেন আয়শা)
“দেখেছো ছোট মা দেখেছো? কিভাবে বড়দের সাথে বেয়াদবি করছে।”
“বাবা তুমি যাও। তোমার না মিটিং আছে? এই বেয়াদব মেয়েকে আমি বকে দিবো। তুমি মাথা গরম করোনা। (আয়শা)

–আরহাম আলিশার দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে চলে গেলো বাইরে। ও যেতেই আলিশা কেঁদে উঠলো।
শাইনার বুকে মুখ গুজে নালিশ দিতে দিতে বললো –
“চুলে ব্যাথা পেয়েছি আমি।”
“আজ বাড়ি আসুক এই ছেলে। আমি ওর বাবাকে বলে তার খবর করে দিবো।”
–এটা শুনেই আলিশা মুখ তুলে বললো, “সত্যি?”
“হ্যাঁ, সত্যি। এখন বল কি খাবি? ব্রেকফাস্টেও তো কিছু খেলিনা।”
“কিছুই খাবোনা এখন, ভালো লাগছেনা।”
–আয়শা অনেক আগেই রুম থেকে প্রস্থান করেছেন। তিনি জানেন তিনি এখানে থাকলে আলিশার কান্না থামবেনা কারন তিনি আরহামের সাইড নিয়েছেন।

তোমার আমার গল্প পর্ব ৫

–মিটিং শেষ করতে করতে বিকেল হয়ে গেলো আরহামের। তাই সে তাড়াতাড়ি করে বাড়ি ফিরতে চাইলো। কারন সকালে আলিশার সাথে ঝগড়া করে এসেছে আবার মেরেছেও তাই তার মন কেমন যেন করছে। বেশি কিছু তো চায়নি মেয়েটা শুধু একটু বের হতে চেয়েছিলো কিন্তু আরহামও নিরুপায় ছিলো। এতো মিডিয়ার সামনে সে আলিশাকে আনতে চায়নি।
তাই ভাবলো, বাড়ি গিয়েই আলিশাকে নিয়ে বের হবে সে।
এই ভেবে জলদি বাড়ি পৌঁছে দেখলো, আলিশা কোথাও নেই। সে নাকি ঘুরতে বের হয়েছে তাও আবার নোমানের সাথে!
এটা শুনেই আরহামের রাগ যেন আকাশ ছুঁলো।

তোমার আমার গল্প পর্ব ৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here