তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৩২
আশফিয়া হিয়া
সময় প্রবাহমান, সময় কখনো থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে আরু ও ইয়াজের এইচএসসি পরীক্ষা চলে এসেছে। আগামীকাল থেকে তাদের পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। আগামীকাল তাদের বাংলা পরীক্ষা, আরু সেই ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে বই নিয়ে বসেছে এখনো তার নিচে আসার নাম নেই। সকলেই খাবার টেবিলে নাস্তা করছে, আরুকেও বহুবার ডাকা হয়েছে কিন্তু সে পরে খাবে বলছে। মিতা বেগম বললেন,
– ” কতবার বলেছি পরীক্ষার আগে সব পড়া শেষ করে রিভিশন দিয়ে রাখ, পরীক্ষার আগে কেউ এত চাপ নেয়। মেয়েটা অসুস্থ না হয়ে যায়।”
সুমিতা বেগম বলল,
– ” আরু তো তাও পড়ছে আপা,আর আমার এই ছেলেকে দেখো ওর যে কাল এত বড় পরীক্ষা ওর সেই খেয়াল আছে? কিছু বললেই বলবে আমি সব পারি। আমি শুধু ওর রেজাল্টটা দেখব।”
ওমনি ইয়াজের খাওয়ার হাত থেমে গেল, মায়ের দিকে তাকিয়ে ভাব নিয়ে বলল,
– ” আরেএ মা তুমি চিন্তা করো না আমার রেজাল্টই কথা বলবে এবার।”
– ” দেখা যাবে।”
এর মাঝেই রুদ্ধর গম্ভীর গলা শোনা গেল,
– ” সন্ধ্যায় বই – খাতা নিয়ে আমার রুমে আসবি কেমন প্রিপারেশন নিয়েছেন আমিও দেখি।”
ইয়াজ মাথা নাড়াল। আজাদ শেখ বললেন,
– ” মেয়েটার খাবারটা না হয় ওপরে দিয়ে আসো, আমার আম্মাজানের ওপরে কত পরিশ্রম যাচ্ছে।”
আসলাম শেখও ভাইয়ের কথায় তাল মিলিয়ে বললেন,
– ” হ্যাঁ, আর ও আজ কি খেতে চায় শুনে নিও ওর আর ইয়াজের পছন্দ মতো খাবার রান্না করো ।”
মিতা বেগম মাথা নাড়ালেন, আরুর খাবার প্লেটে গুছিয়ে ওপরে যেতে নিলে রুদ্ধ বাঁধ সাজল।
– ” মেঝো মা খাবার নিয়ে যেতে হবে না, আমি দেখছি।”
আসলাম শেখ বিরক্তির স্বরে বলল,
– ” আহ তুমি আবার আটকাচ্ছো কেনো, মেয়েটা কত কষ্ট করছে ওর এখন নিচে নামার প্রয়োজন নেই, ও ওপরেই খেয়ে নিবে। ”
– ” সকলের সাথে বসে খেলে, গল্প করলে ওর মাইন্ড ফ্রেশ হবে, আমি ডেকে নিয়ে আসছি।”
– ” মিতা তো যাচ্ছেই তোমার যাওয়ার কি দরকার?”
– ” কারণটা তুমি ভালো করেই জানো বাবা।”
আসলাম শেখ কিছুটা থতমত খেয়ে গেছে সকলের সামনে এভাবে বলায়, সে আর কিছু না বলে খাওয়ায় মনোযোগ দিল। ছেলেটা হয়েছে একটা ফাজিল। তার ওমন দুষ্টু মিষ্টি মেয়েটা এই ছেলের মাঝে পেয়েছেটা কী? রুমা বেগম বাবা – ছেলের কান্ড দেখে মুখ টিপে হাসল। আজাদ শেখ রুদ্ধ যাওয়ার দিকে একবার তাকাচ্ছে তো একবার বড় ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। তার মাথায় কিছু একটা ঘুরছে যেটা সে বোঝার চেষ্টা করছে।
আরু নিজের রুমে কিছুক্ষণ টেবিলে বসে পড়ছে , আবার কিছুক্ষণ বেডে গড়াগড়ি খেয়ে পড়ছে। পরীক্ষার আগের দিন তার সাথে সবসময় এমনটাই হয়, সারাবছর আনন্দ উল্লাস করে কাটিয়ে দিলেও পরীক্ষার আগেরদিন মনে হয় পাহাড় সমান পড়া জমে রয়েছে। তার আজ ক্ষিদেরও পাচ্ছে না। অন্যদিন তো এতক্ষণে পেটে ইঁদূর দৌড়াতো আজ কিছুই হচ্ছে না। রুদ্ধ আরুর রুমের দরজায় দুবার টোকা দিয়ে ডেকে উঠল,
– ” আরু?’
রুদ্ধর কন্ঠস্বর শুনতে পেয়েই আরু শোয়া থেকে উঠে গায়ে ওড়না জড়িয়ে ভদ্র মেয়ের মতো বসল। রুদ্ধ গলা খাঁকারি দিয়ে রুমে প্রবেশ করল। আরু ঘুম থেকে উঠেই পড়তে বসেছিল, এখনো পর্যন্ত ফ্রেশও হয়নি। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে, মুখটা হালকা তেলতেলে। তবুও তাকে দেখতে রুদ্ধর কাছে ভীষণ সুন্দর লাগছে। সে ছোট এক ঢোক গিলে হালকা কেশে উঠল।আরু তাকে দেখে বলল,
– ” আপনি এখনো অফিস যাননি?”
রুদ্ধ জবাব দিল না এগিয়ে এসে তার পাশে বসল। আরুর হাত থেকে বইটা নিয়ে বন্ধ করে বেডে রেখে দিল। আরু তড়িঘড়ি করে বলল,
– ” আরেএ কি করছেন আমি পড়ছিলাম তো।”
– ” এখন আর পড়তে হবে না অনেক পড়েছিস। এখন সোজা নিচে যাবি।”
– ” আমার খেতে একদমই ইচ্ছে করছে না বিশ্বাস করুন।”
রুদ্ধ আরুর মাথায় আলতো হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
– ” না করলেও খেতে হবে। পরীক্ষার আগের দিন এত পেশার নেওয়া ঠিক নয়, মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। তুই যে কিছু পারিস না এমনটা তো নয়, তোর প্রিপারেশন খুব ভালো এটা আমি জানি তাই কথা না বাড়িয়ে নিচে আয়।”
– ” আসছি।”
রুদ্ধ আরুর এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে গুছিয়ে দিল। নাকে আলতো টোকা দিয়ে বলল ফ্রেশ হয়ে নিচে আসতে সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে।
– ” কাল আপনি আমার পরীক্ষাকেন্দ্রে যাবেন তো?”
রুদ্ধ দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল আরুর কথা শুনে থমকে দাঁড়াল। স্বাভাবিক ভাবে পেছনে ঘুরে আরুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
– ” আমার যাওয়াটা কি খুব জরুরি?”
– ” হুহ।”
– ” কেনো?”
– ” আমার প্রিয় মানুষগুলো আমার জন্য ভীষণ লাকি, আমার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিনে, আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানুষটাকে দেখতে পেলে আমার দিনটাও নিশ্চয়ই ভালো কাটবে।”
রুদ্ধ ঠোঁট জুড়ে হাসি ফুটে উঠল। যেটা আরুর নজরে স্পষ্ট ধরা পড়ল। এই মানুষটার সবকিছুই তাকে ভীষণ আকৃষ্ট করে। ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়? যাকে আমরা ভালোবাসি তার সবকিছুই আমাদের ভালো লাগে তার ধমকানো, শাসন করা, আগলে রাখা, অল্প স্বল্প কাছে আসা সবটা। রুদ্ধ ওভাবে থেকেই বলল,
– ” ঠিক আছে।”
ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে সকলে চা পান করছে, আর টুকটাক কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন। আহি বাবার সাথে লেপ্টে বসে আছে। আজাদ শেখ মেয়ের সাথে গল্প করছেন ও ফাঁকে ফাঁকে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। রুদ্ধকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে সকলের দৃষ্টি তার দিকেই পড়ল। আজাদ শেখ বললেন,
– ” আরু আসবে না?”
– ” আসছে।
রুদ্ধ সোফায় বসতেই রুহানি ভাইয়ের জন্য চা নিয়ে এল। ইয়াজকে এখনো ড্রয়িং রুমে দেখে রুদ্ধ তাকে ধমকে উঠল।
– ” তোর এখনো এখানে কি পড়া নেই? নিজের রুমের যা। ”
ইয়াজা মিনমিন করে বলল,
– ” চা টা খেয়েই যাচ্ছি ভাইয়া।”
আহি ইয়াজকে ধমকাতে দেখে মুখ টিপে হাসল। সেটা দেখে ইয়াজ তাকে মারার ভঙ্গি করে চোখ রাঙাল। আহিও তাকে পাল্টা ভেংচি কাটল। তাদের এই খুটশুটি সবসময় চলতেই থাকে। শেখ বাড়ির সকলে এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
মিনিট কয়েকবাদেই আরু নিচে নেমে এল। চুলগুলো এখন পরিপাটি করে বাঁধা। মুখটাও বেশ ফ্রেশ লাগছে তখনকার এলোমেলো ভাবটা এখন আর নেই। রুদ্ধ একবার তার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দৃষ্টি বুলিয়েই চোখ সরিয়ে নিয়েছে। আসলাম শেখ আরুকে ডেকে নিজের পাশে বসালেন, মাথায় হাত বুলিয়ে পকেট থেকে হাজার টাকার নোট বের করে তার হাতে গুজে দিল। আরোও বললেন রেজাল্ট ভালো হলে আরু যা চাইবে তাকে তাই দেওয়া হবে। আরু মুচকি হেসে তাকে আলতো জড়িয়ে ধরে বলল,
– ” থ্যাঙ্কিউ চাচ্চু।”
আরু এবার বাবার পাশে বসল আজাদ শেখ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে স্বরে অনেক কথায় বললেন। দুই মেয়েকে দুইহাত দিয়ে কিছুক্ষণ জড়িয়ে রাখলেন এই মেয়ে দুটো তার কলিজা। এদের ছাড়া সে কি করে থাকবে ভাবলেই তার চোখে জল এসে জমা হয়। আজাদ শেখও পকেট থেকে হাজার টাকার নোট বের করে আরুর হাতে গুজে দিল। তা দেখে আহি গাল ফুলাল আপুকে দিয়েছে মানে তারও চাই আজাদ শেখ আহির গাল ফুলানো দেখে শব্দ করে হেসে দিল, এরপর আহির হাতেও হাজার টাকার নোট গুজে দিল।
ইয়াজ আহিকে বলল,
– ” আমাদের কাল পরীক্ষা তাই বাবা -চাচ্চুরা ভালোবেসে আমাদের টাকা দিয়েছে, তোকে কেনো দেবে?”
– ” তোমাদের পরীক্ষা আমার কিছু খাটাখাটুনি আছে না? সেই হিসেবে আমিও টাকা পাই।”
ইয়াজ ও আরু এক যোগে বলল,
– ” তোর আবার কিসের খাটাখাটুনি? ”
– ” তোমাদের পরীক্ষা তোমরা এখন দিন – রাত পড়বে কিছু লাগলেই আমাকে ডাকবে আহি এটা দে ওটা দে, এইগুলো তো আমাকেই করতে হবে তাই না? সেই হিসেবে এটা আমার পারিশ্রমিক। ”
আরু তার মাথায় এক গাট্টা দিল। বাবা – চাচারা থাকায় ইয়াজের হাতের মারটা মিস হয়ে গেল তার। উপস্থিত সকলে আহির কথায় হাসল। আজাদ শেখ বললেন,
– ” ঠিকই তো বলেছে, আমার আম্মার কত পরিশ্রম হবে।”
আরু ও ইয়াজ দুজনে একই কলেজে পড়ায় তাদের পরীক্ষার কেন্দ্র একই জায়গায়। দুজনেই তৈরী হয়ে নিচে অপেক্ষা করছে। মিতা বেগম ও সুমিতা বেগম দুজনকে এটা সেটা ভালো করে বুঝিয়ে বলছে, যেগুলো আগে পারবি ওগুলোই আগে লিখবি, ঠান্ডা মাথায় পরীক্ষা দিবি। আরু বলল,
– ” ঠিক আছে মা – ছোট মা আমরা বুঝেছি, এগুলো আমাদের মুখস্থ হয়ে গেছে।”
আজ প্রথম পরীক্ষা হওয়ায় আজাদ শেখ তাদের সাথে যাচ্ছে, আরু ভেবেছিল রুদ্ধও বুঝি তাদের সাথে যাবে তার কথা রাখতে কিন্ত গাড়িতে উঠে বসার পড়েও আরু রুদ্ধর দেখা পেল না। সে গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করে বাড়ির দিকে তাকাল কিন্তু রুদ্ধর দেখা নেই। আরুর মনটাই খারাপ হয়ে গেল। তার শুক্ন মুখ দেখে আজাদ শেখ বললেন,
– ” কি হয়েছে মা মুখটা ওমন ছোট হয়ে আছে কেনো? টেনশন হচ্ছে।”
– ” না বাবা আমি ঠিক আছি।”
আজাদ শেখ মেয়ের মন খারাপের কারণটা বুঝতে না পারলেও ইয়াজ ঠিকই বুঝল আরুর মন খারাপের কারণ।গাড়ি চলতে শুরু করেছে আরু মন খারাপ নিয়েই বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে রুদ্ধর প্রতি ভীষণ অভিমান জমেছে। সে কি এমন চেয়েছে, শুধু বলেছিল আজকের দিনটা একটু তার পাশে থাকতে। কিন্ত সেই মানুষটা এলই না।
কিছুক্ষণ যেতেই গাড়িটা থেমে গেল। আরু কিছু বুঝতে পারল না হঠাৎ গাড়িটা থেমে গেল কেনো? রাস্তায় তো কোনো জ্যামও নেই। ইয়াজ তাকে সামনের দিকে ইশারা করল আরু সামনে তাকাতেই দেখল রুদ্ধ গাড়ির দিকে হেঁটে আসছে। আরু রুদ্ধকে দেখে ভীষণ অবাক হয়েছে সাথে খুশিও হয়েছে বেশ যা তার মুখ থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। রুদ্ধ এসেই তার পাশে বসে পড়ল। আজাদ শেখ পেছনে ঘুরে রুদ্ধকে বলল,
– ” কাজ শেষ হলো?”
– ” হ্যাঁ আজকের মতো শেষ, কাল এসে একবার দেখে যেতে হবে।”
– ” ওহ। ”
আজাদ শেখের সুক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একটা জিনিস ধরা পড়ল, আরুর মুখটা কিছুক্ষণ আগেও আঁধারে ডেকে ছিল, কিন্ত রুদ্ধ আসার পর থেকে তার কন্যার মুখটা কেমন ঝলমল করছে না? তাহলে তার মেয়েটার মন খারাপের কারণ ছিল রুদ্ধ অনুপস্থিতি?
রুদ্ধ সবার অলক্ষে আরু হাত জোড়া চেপে ধরল। আরু সেই হাতের দিকে একপলক তাকিয়ে রুদ্ধর চোখের দিকে তাকাল যেই চোখের ভাষা তাকে অনেক কিছুই বলে দিচ্ছে, আরু অভিমানি স্বরে ফিসফিসে বলল,
– ” এতক্ষণে আসার সময় হলো?”
রুদ্ধও তার মতো ফিসফিসে স্বরে কৈফিয়ত দেয়ার ভঙ্গিতে বলল,
– ” কাজ ছিল।”
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৩১
বাবা গাড়িতে থাকায় আরু রুদ্ধ কেউই আর কোনো কথা বলল না। তাছাড়া পাশে ইয়াজও রয়েছে। রুদ্ধ ওভাবেই পুরোটা রাস্তা আরুর হাত ধরে বসে রইল। আরু তাদের হাতের ওপর গলায় পেঁচানো ওড়না দিয়ে ডেকে দিল যেন কারোর নজরে না পড়ে। পুরোটা রাস্তায় আরুর মুখে মৃদ্যু লাজুক হাসির রেখা দেখা গেল। আর রুদ্ধ সে মুখটা স্বাভাবিক করেই রেখেছে যেন সে কিছুই করেনি।
