দহনসুধা পর্ব ৯
১৫ জন রাইটার
“কি হলো কথা বলছিস না কেন?”
শুদ্ধ এক প্রকার ধমকে উঠল। উমেরা প্রায় চমকে উঠে নিজের ভাবনার জগত থেকে ফিরে আসে। মুখে একটা কৃত্রিম হাসি টেনে বলল,
“আ.. আসলে আমি চাইনি.. তোমরা আমাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করো। তাছাড়া এসব ছোটখাটো ব্যাপার। আমি নিজেই সামলে নিতে পারি। ওই পাটোয়ারীদের কথা বাদ দাও তো! ওদের নাম শুনলেই আমার গা জ্বলে যায়।”
শেষের কথাগুলো বলার সময় তার চোখে এক ঝলক ঘৃণা জমে উঠল। কিন্তু শুদ্ধ এবার পুরোপুরি রেগে গেল। চোয়াল শক্ত করে গর্জে উঠল,
“উমেরা! তোর ধারনা আছে, তোর সাথে কী হতে পারত? আমি কতবার বলেছি, রাতবিরাতে বাইরে থাকবি না! কবে বুঝবি সেটা?”
একটু নীরবতার পর বলল,
“আমি এবার আর তোকে নিয়ে কোন রিস্ক নিব না। তোর বিয়ের ব্যবস্থা করবো। আর খুব শীঘ্রই।”
উমেরা এতক্ষণ চুপচাপ ভাইয়ের কথা শুনলেও বিয়ের কথা আসতেই র’ক্ত গরম হয়ে গেল। শরীরে যেন আগুন ধরে গেছে। ব্যাগের ফিতাটা মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। রাগে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,
“তুমি আর আম্মু আমার বিয়ে নিয়ে কেন পরেছো বলো তো? আমি কতবার বলেছি, আমি এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করব না! আমার বিয়ের কথা বাদ দিয়ে নিজের বিয়ের কথা ভাবো! জারারও কিন্তু বিয়ের বয়স হয়েছে, আর ও বিয়ে করতেও চাইছে।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
শুদ্ধ চোখ বড় বড় করল,
“তোর বান্ধবি বিয়ে করতে চাইছে সেটা আমাকে কেন বলছিস? আমাকে কী ঘটক মনে হয়?”
“উহুম, জারার যোগ্য পাত্র মনে হয়।”
“উমেরা!”
শুদ্ধ বিরক্ত হয়ে ডাকতেই উমেরা মুখ টিপে হেসে ফেলল। নিকাবের ভেতর থেকে তার উজ্জ্বল চোখদুটো দেখলেই সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়। শুদ্ধ তার মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলল,
“চল, বাসায় চল। বাসায় গিয়ে আজ আম্মুর কাছে বিচার দিব, তুই কী কী করে বেড়াচ্ছিস!”
“আম্মুকে আবার এসব বলতে হবে কেন? আম্মু এমনিতেই আমায় বাহিরে আসতে দেয় না। এখন এসব শুনলে তো আরো আসতে দিবে না।”
“সেটা আগে ভাবা উচিত ছিল। শত্রুর মুখে নিজের বোনের জীবন বাঁচানোর গল্প শুনতে হচ্ছে, সিরিয়াসলি?”
উমেরা নিচু স্বরে বলল, “ভাইয়া..”
“কোন কথা নাই। বাড়ি চল।”
শুদ্ধ বড় বড় পা ফেলে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। উমেরা থ মেরে জায়গায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। শুদ্ধ আবার ডাকতেই সেও দ্রুত এগিয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, দূরে দাঁড়ানো কালো গাড়ির ভেতর থেকে এক জোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পর্যবেক্ষণ করছিল তাদের ভাই-বোনের এই এই খুনসুটি। কালো গাড়িটার কাঁচে প্রতিফলিত আলোয় শুধু তার চোখদুটিই দেখা যাচ্ছে শিকারির মত। উমেরাদের গাড়ি চলতে শুরু করলেই সেই কালো গাড়িটাও তাদের পিছু নেয়। পুরোটা পথ সেই আগন্তুক তাদেরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষন করেছে।
যখন তারা বাড়ির মূল গেটে ঢুকল, তখনই উমেরা লুকিং গ্লাসে পিছনের গাড়িটা দেখতে পেল। সে ভ্রু কুঁচকে তাকালো, কিন্তু সেকেন্ডের মধ্যেই গাড়িটা বাঁ দিকে ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল। উমেরার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শীতলতা নেমে এলো। আসলেই কেউ তাদের অনুসরণ করছিল? না কি শুধুই তার ভ্রম?
শুদ্ধ গাড়ির দরজা খুলে নামতেই উমেরা তাড়াতাড়ি নিজের ভাবনাগুলো ঝেড়ে ফেলল। চুপচাপ নেমে এল গাড়ি থেকে, ভাইকে এসব কিছু বলল না। এমনিতেই তো ঝামেলার শেষ নাই। তার উপর শেহরাজ পাটোয়ারী দিল আরেক গ্যাঞ্জাম লাগিয়ে। আস্ত একটা উটকো ঝামেলা এই শেহরাজ পাটোয়ারী। উমেরা ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে যত রকমের গালি তার জানা আছে, সব একে একে শেহরাজের উপর ঝাড়তে লাগল!
রাতের অর্ধ প্রহর চলছে। চারদিকে এক অদ্ভুত নিরবতা। শুধুু মাঝেমাঝে দু-একটা কুকুরের ডাক ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছে না। এই নিস্তব্ধতার মাঝে মূল ফটক পেরিয়ে ক্লান্ত দেহ নিয়ে বাড়িতে ঢুকল শেহরাজ। ভিতরে ঢুকতেই সামনে পড়ল তার চাচাতো বোন শিরিন। শিরিন তার ছোট চাচা শওয়েব পাটোয়ারীর একমাত্র মেয়ে। তার চাচা তার বাবার ছোট হলেও শিরিন তার থেকে বয়সে দুই বছরের বড়। স্বভাবেও অনেক বেশি কড়া ও রুক্ষ। তার কণ্ঠে সাধারণত ৮০% কর্কশতা থাকে, বাকিটুকু শুধু দায়িত্ব। পেশায় সেও একজন ডাক্তার, আর নিজস্ব পারিবারিক হাসপাতালেই কর্মরত। বাগেরহাট সদরেই শশুড়বাড়ি, কিন্তু কাজের কারণে বেশিরভাগ সময়ই পাটোয়ারী বাড়িতেই থাকা হয়।
শিরিনের হাতে অনেকগুলা ফাইল। চোখে স্পষ্ট চাপা ঝড়।তবুও শেহরাজকে দেখে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“এতো রাত অবধি কী করছিলি? এটা কোন বাসায় আসার সময় হলো?”
শেহরাজ বিরক্ত ভঙ্গিতে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে এক লম্বা শ্বাস ফেলে বলল,
“কী করব বল? সব তো আমার উপর চাপিয়ে দিয়ে চলে এসেছিস! বসে বসে আরাম করছিস? আমারই তো সামলাতে হয় সবকিছু!”
শিরিন বিরক্তিতে চোখ পাকিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল। একরাশ বিরক্ত নিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল,
“বসে বসে আরাম করছি না শেহরাজ! এই রিপোর্টগুলা দেখ! এখানে এতো গড়বড় হয় কী করে? আমি কিছুদিন দেশে ছিলাম না এর মধ্যেই সব গুলিয়ে ফেলেছিস? ভরসা করব কী করে তোর উপর?”
“গড়বড় হয়েছে মানে? শেহরাজ পাটোয়ারী কাঁচা কাজ করে না আপা! সেটা তুই ভালো করেই জানিস। নিজের দায়িত্ব সে নিজের জীবন দিয়েও হলেও পালন করে।”
শিরিন ফাইলগুলো শেহরাজের সামনে ধরল,
“তাহলে এগুলো কী? দেখ ভালো করে।”
শেহরাজ রিপোর্টগুলো শিরিনের হাত থেকে নিয়ে এক এক করে সব দেখতে লাগল। মুহূর্তেই তার মুখে তীব্র বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে কপাল চুলকে কিছু একটা ভাবল। চোয়াল শক্ত করে বলল,
“এসব হয়েছে ওই গর্দভ, জাওয়াদের জন্য। কতবার বলেছি, বাওতাবাজি না করে কাজে ফোকাস কর! তা না করে লীলা খেলা দেখাতে আসে, ইউজলেস!”
শিরিন এবার চিন্তিত গলায় বলল,
“এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে হাসপাতালের নামে গুঞ্জন উঠবে। সামনে নির্বাচন, নির্বাচনের আগে যদি এমন কিছু হয় তাহলে পাটোয়ারীর নাম ধুলোয় মিশে যাবে শেহরাজ! তোর বাবা কিন্তু আমাকে এসব নিয়ে অলরেডি কথা শুনিয়েছে।”
শেহরাজ একটু ভঙ্গি করে ঠাণ্ডা কন্ঠে বলল,
“আহা.. মে হু না.. শেহরাজ আছে যেখানে, আপদ নাই সেখানে!”
এমন সময় শেহরাজের ফোনটা বেজে উঠে। ফোন হাতে নিয়ে দেখে জাওয়াদের কল। অনিচ্ছা সত্তেও রিসভ করে সে। ওপাশ থেকে জাওয়াদের গলায় ভেসে আসে,
“ভাই….”
“তোর মুণ্ডু মাথার ছাই! যা বলবি দ্রুত বল। একটু শান্তিতে থাকতে চাই।”
জাওয়াদ ভয়ে ভয়ে কাঁপা স্বরে বলল,
“ভাই একটা ঝামেলা হয়ে গেছে।”
“লে.! শেহরাজ আছে যেখানে, আপদ অলওয়েজ সেখানে। তো অনুগ্রহ পূর্বক বলবেন, আপদটা কোন দিকে থেকে উদয় হয়েছে?”
“আজকে যে লা’শটা বেওয়ারিশ ভেবে ম’র্গে পাঠিয়েছেন, তার পরিবার এসে হাসপাতালে তান্ডব করতেছে। কোন কিছুতেই মানতেছে না।”
শেহরাজ চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর গলা নামিয়ে বলল,
“ইচ্ছে তো করছে, সবকটাকে মে’রে ওই বেওয়ারিশ লা’শ’টার সাথে মর্গে পাঠিয়ে দেই। যখন হাসপাতালের কোনায় পরে ছিল তখন কোথায় ছিল পরিবার? একবারও তো খোঁজ নেয়নি! এখন হুট করে গোটা পরিবারের উদয় হলো?”
“ভাই, বিষয়টা সিরিয়াস।”
“তো আমি কী তোর সাথে ফান করতেছি?”
“সরি ভাই।”
“ফোন রাখ। আমি আসতেছি।”
কল কেটে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে নিল শেহরাজ। একরাশ বিরক্তি নিয়ে বাহিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। তখনই পিছন থেকে শিরিন বলে উঠল,
“আরেকটা কথা।”
শেহরাজ থেমে গেল, তবে ঘুরে আর তাকাল না। শিরিন আবার বলল,
“আগামিকাল তোকে বান্দারবান যেতে হবে। প্রস্তুত থাকিস।”
“কেন?”
“ড. মহিদ জানিয়েছে, তাদের হাসপাতাল থেকে কিছু স্টুডেন্ট নিয়ে ক্যাম্পে যাবে। ওরা তোর সাহায্য চেয়েছে। অনুরোধ করেছে তুই যেনো ক্যাম্পের স্টুডেন্টদের গাইড করিস! আর আমি জানি তুই এসব কাজে না করবি না। তাই তাদের হ্যাঁ বলে দিয়েছি।”
শেহরাজ বিরক্তি আরও দ্বিগুণ বেড়ে গেল। ভ্রু জোড়া কুচঁকে বোনের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু জাওয়াদের বিপত্তির কথা মনে পড়তেই আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত বেরিয়ে গেল বাড়ির বাইরের দিকে। শিরিন তার চলে যাওয়া পিঠের দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিল। ফোন হাতে নিয়ে একটা নাম্বারে কল দিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“শেহরাজ রাজি হয়েছে। আগামিকাল ও বান্দরবান যাবে তিন দিনের জন্য। আশা করি এবার আর আমাদের নিরাশ হতে হবে না।”
ওপর প্রান্তের আগন্তুক কী বলল তা আর বোঝা গেল না। শিরিন আলাপ আলোচনা শেষ করে কল কেটে দিল। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে দ্রুত পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
দীর্ঘ জার্নির পর উমেরাদের পুরো টিম বান্দরবনে এসে পৌঁছায় সকাল নয়টায়। তাদের ক্যাম্পিংয়ের উদ্দেশ্য যেহেতু গ্রামের দুঃস্থ মানুষের জন্য, তাই তাদের ক্যাম্পিংটা হয় থানচির মারমা ও ত্রিপুরাদের গ্রামে। সেখানে একটা পাহাড়ে পাশের উঁচু ঢিবিতে তাদের ক্যাম্পিংয়ের জন্য ছোট ছোট তাবু টানানো হয়। আসার পর থেকেই সবাই মোটামুটি ব্যস্ততার মধ্যে আছে। যেহেতু ফ্রী চিকিৎসা, তাই গ্রামের অনেক অসহায়, গরিব মানুষের ভিড় জমেছে তাদের ক্যাম্পে। প্রতেকটা টিমকে একজন সিনিয়র ডাক্তার গাইড করছে। উমেরাদের টিমের দায়িত্ব পড়ে ড.শেহরাজের উপর। শেহরাজ নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করছে কাজে মনোযোগ দেয়ার। কিন্তু তার ভাষ্যমতে, এই বেড়াল বাঘিনী মাতব্বরি দেখিয়ে তার প্রত্যেকটা কাজে বাধা দিচ্ছে। এবার তো শেহরাজের ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করেছে। মনে মনে ভাবছে,
“যদি জানতম এই অকৃতজ্ঞ শত্রুর বংশধরকে গাইড করতে হবে, তাহলে নিজের আড়ামের ঘুম হারাম করে এখানে আসতাম না! কসম, কখনোই না!”
শেহরাজ একজন অল্পবয়সী তরুণীর চেকআপ করছে। মেয়েটার বয়স কতই বা হবে, ষোল কী সতেরো! অথচ এই বয়সে মেয়েটার কোলে দুইটা বাচ্চা। মেয়েটার হিমোগ্লোবিন নেই বললেই চলে। আরো কিছু জটিল রোগ বাধিয়ে রেখেছে। এতে শেহরাজ চট গেল মেয়েটার উপর।
“নিজের তো নাক টিপলে দুধ বের হবে। আবার ঢেবা ঢেবা দুইটা বাচ্চাও পয়দা করে নিয়েছ। বাহ! প্রশংসা করতেই হয়। হিম্মত আছে বলতে হবে।”
শেহরাজের কথায় মেয়েটা লজ্জা পেল কিছুটা। মাথা নিচু করে নিল, কিন্তু পাশে থাকা উমেরা রাগে লাল হয়ে গেল। চুপ থাকতে পারল না।
“ডাক্তার হওয়ার আগে একজন রোগীর সাথে ডাক্তার হয়ে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেটা আগে শিখে নেওয়া উচিত ছিল। অবশ্য পাটোয়ারীদের থেকে এর বেশি কিছু আশা করাটাও বোকামি!”
শেহরাজ মুখ তুলে তাকাল উমেরার দিকে। ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি।
“হাহ! আসছে মহামান্য বাধ্যযন্ত্রওয়ালা ওয়াজেদের অকৃতজ্ঞ বংশধর। যার নিজের কথায় নাই এক পরিমাণ রস কস, তেতো করল্লার কাচকির মতো সারাক্ষণ পকর পকরই করতে থাকে। সে আসছে শেহরাজ পাটোয়ারীকে কথা শিখাতে! ইন্টেরসিটং, ভেরি ইন্টেরসিটং।”
উমেরা দাঁত কিড়মিড় করে উঠল,
“কী বললেন আপনি? আমি তেতো করল্লার মত কথা বলি!”
“জ্বি অবশ্যই! শোনেন মিস বিড়াল বাঘিনি পাতি ডাক্তার সাহেবা, ডাক্তারি করতে বুদ্ধি আর যুক্তি দুটোই প্রয়োজন। যেটার কোনটাই আপনার নাই। একটা কাজ করেন, এসব ছেড়ে দিয়ে বিয়ে শাদী করে শশুড় বাড়ি গিয়ে চুলা জ্বালান। স্বামির সেবা করেন। কাজে আসবে।”
“আমি কী করব না করব, সেটা আপনার মতো কাপুরুষকে বলে করব না নিশ্চয়ই!”
“কাপুরুষ?”
শব্দটা শুনে শেহরাজের চোখ লাল হয়ে উঠল।এই শব্দ কোন সুস্থ পুরুষই সহ্য করে না, আর সে তো শেহরাজ পাটোয়ারী। এক ঝটকায় উমেরার বাহু চেপে ধরে টেনে নিল কাছে। উমেরা ভারসাম্য হারিয়ে তার দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ল। শেহরাজ মুখটা নামিয়ে তার কানের ঠিক কাছে ফিসফিস করে বলল,
“আমি কাপুরুষ না বীরপুরুষ সেটা কী পার্সোনালি দেখাতে হবে? দেখার শখ থাকলে বলতে পারেন, আমি তাবু খালি করে দিচ্ছি।”
শেহরাজের এমন বেহায়াপনা দেখারই বাকি ছিল উমেরার। উমেরার কান গরম হয়ে গেলো। লজ্জায় নাকি ক্রোধে বোঝা মুশকিল। সে ঝটকা মেরে শেহরাজের হাত ছাড়িয়ে নিল। তাবুর ভিতরের যে কয়জন ছেলে-মেয়ে ছিল সবাই অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকাল। কী হলো সঠিক বুঝতে পারল না। শেহরাজ উমেরার এমন চেহারা দেখে বেশ আনন্দিত হলো। এই মেয়েটাকে শেষমেশ জব্দ করতে পেরেছে। তার ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির ছাপ।
একটু নীরবতার পর, স্বাভাবিক হয়ে সামনে বসা মেয়েটার চেকআপ শেষ করে কিছু পরামর্শ দিচ্ছিল। ঠিক তখনই একটা ছেলে দৌড়ে এসে জানাল,
“স্যার, তিন নাম্বার তবুতে কয়েকজন অসহায় মানুষ এসেছে। তাদের কেউ নেই দেখাশোনা করার, এক কথায় বেওয়ারিশ.. আর প্রতেকেরই কঠিন কঠিন রোগ ধরা পরেছে।”
শেহরাজ ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কতজন?”
“সাত-আটজন হবে স্যার।”
শেহরাজ চোখের কোণ দিয়ে উমেরার দিকে তাকাল।
সে দাঁড়িয়ে আছে তাবুর বাইরে। উমেরার চোখে জ্বলন্ত ঘৃনা। শেহরাজ আবার দ্রুতই দৃষ্টি সড়িয়ে নিল। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“জাওয়াদকে বল, ওদের সবার দায়িত্ব আমি নিয়েছি। তাদেরকে আমার হসপিটালে শিফট করার ব্যবস্থা করতে বল, ইমিডিয়েটলি।”
“ঠিক আছে, স্যার।”
ছেলেটা মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে বেড়িয়ে গেল। শেহরাজ ফোন হাতে নিয়ে কিছু একটা দেখে আবার রেখে দিল। উমেরা তাবুর বাহিরে দাঁড়িয়ে ঘৃনা ভরা দৃষ্টিতে তাকাল শেহরাজের দিকে। তার ভঙ্গি দেখে বুঝে গেছে কাউকে মেসেজ করেছে হয়তো। একটু আগের কথাটা মনে পড়তেই তার শরীর ঘিনঘিন করে উঠল। এমন সময় জারা এসে দাঁড়াল তার পাশে। জারা যেহেতু অন্য টিমের, তাই একটু আগের ঘটনা সম্পর্কে সে অজ্ঞাত! সে কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,
“কীরে তুই বেলুনের মত ফুলে আছিস কেন? আবার কী হয়েছে?
উমেরা ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“আমি উমেরা ওয়াজেদ। নিজেকে নিজে কথা দিলাম, এই পাটোয়ারীর ভালোমানুষির মুখোশ আমি খুব শীঘ্রই খুলব। আমার পরিবারে সাথে করা প্রত্যকটা অন্যায়ের প্রতিশোধ আমি নিব।”
দহনসুধা পর্ব ৮
তার চোখের কোণে লালচে রাগ, চোয়াল শক্ত। সারা শরীর কাঁপছে তীব্র ঘৃণায়। উমেরার সেই রাগি মুখটা ভাসমান হলো, আর্শিয়ান মির্জার টেলিস্কোপে। সে পাশের একটা পাহাড় থেকে উমেরাকে কড়া নজরে রাখছে। উমেরা যে তার পরী, তার অপ্সরা, তাকে চোখের আড়াল করা যে তার জন্য দুষ্কর! তবে এই মূহুর্তে তার পরীকে রেগে থাকতে দেখে তারও ভীষণ রাগ হচ্ছে। এতো স্পর্ধা কার হতে পারে তার অপ্সরাকে রাগানোর? আর্শিয়ানের চোখ জোড়া মূহুর্তেই র’ক্ত লাল হয়ে উঠে। পাগলের মতো হাত পা নাড়তে লাগল, তার হাত উসখুস করছে কিছু একটা করার জন্য। আজকে হয়তো অনেক বড় কিছু ঘটে যাবে। অনেক বড় কিছু, যার নিয়ন্ত্রণ তার হাতে নেই!
