Home দহনসুধা দহনসুধা পর্ব ৮

দহনসুধা পর্ব ৮

দহনসুধা পর্ব ৮
১৫ জন রাইটার

আগন্তুক ব্যক্তি উমেরার শিয়রে হাঁটু মুড়ে বসে উমেরার মায়াবী মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে আছে পলকহীন। অতি নিকটে বসে থাকার কারণে উমেরার শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণ তার ভেতর পর্যন্ত প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। ছটফট করতে থাকা হৃদয়টা এখন শান্ত হয়ে গেছে। নেশা ধরে যাচ্ছে শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণ আর চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে। তীব্র ইচ্ছে জাগছে একটাবার প্রাণ প্রিয় উমেরাকে শক্ত জড়িয়ে ধরতে। জড়িয়ে ধরলে আরও ভালো লাগতো।
হাত বাড়িয়ে উমেরার গালে হাত রাখতে যাবে তখনই কারো পায়ের শব্দ শুনতে পায়, এই রুমের দিকেই এগিয়ে আসছে শব্দটা। সতর্কতা স্বরুপ নিজের অবস্থান থেকে সরে বেলকনিতে চলে আসে আগন্তুক। তখনই রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেন নাসিফা বেগম। ওনার নজর প্রথমেই পড়ে বেলকনির খোলা দরজার দিকে। সেদিকে পা বাড়িয়ে বিড়বিড় করে বললেন,

“এই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা যায় না, কতবার করে বলি সন্ধ্যার পর যেন বেলকনির জানালা দরজা খুলে না রাখে তবুও বার বার একই কাজ করে। দরজাটা খুলে রেখেই ঘুমিয়ে গেছে।”
দরজা জানালা লাগিয়ে দিয়ে মেয়ের শিয়রে এসে বসেন। বেলকনির দরজার ওপারে যে কেউ একজন রয়েছে সেদিকে লক্ষ্যই করেননি। বেলকনিতে থাকা আগন্তুক কটমট করে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। ও এখন ওর উমেরার কাছে কীভাবে যাবে? এই দরজা এখন কে খুলে দেবে?

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

রাতের খাবার খেয়ে বাবার সঙ্গে আলাপ আলোচনা শেষ করে মাত্রই নিজ কক্ষে ফিরেছে শেহরাজ। মা’রা’মা’রি করার কারণে শরীর ম্যাজম্যাজ করছে। ওই শত্রুর মেয়ে শত্রুর জন্য কোনদিন মা’রা’মা’রি করবে কস্মিনকালেও ভাবেনি। ওর কি যে হয়েছিল গতকাল।
উমেরার কথা স্মরণ হতেই শেহরাজের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। আশ্চর্য হয়ে বুকের বাম পাশে ডান হাত চাপে। ওই বজ্জাত মেয়ে উমেরা ওয়াজেদের কথা স্মরণ করলে ওর সঙ্গে এমন কেন হয়? চোখ বন্ধ করে লম্বা একটা শ্বাস টেনে নিয়ে ফোস করে ছাড়ে। উমেরা ওয়াজেদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে এখন থেকে। উমেরার বলা পুরোনো কথা স্মরণ করে দাঁতে দাঁত চাপে শেহরাজ। ওই মেয়ে আজকে ওদের একাধিকবার কাপুরুষ বলেছে। ওই মেয়ের সঙ্গে আর কোনো কথা নয়, কোনোভাবেই নয়। চোখের সামনে ম’রে গেলেও সাহায্যের জন্য এক কদম আগাবে না।

অকৃতজ্ঞ মেয়ে একটা। এত বড়ো সাহায্য করলো অথচ একটা ধন্যবাদ অব্দি দিলো না কৃতজ্ঞতা স্বীকার করবে তো দূর। অকৃতজ্ঞের বংশ।
সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে লাইটার আর ফোন হাতে নিয়ে বেলকনিতে আসে। এখন ঘুম আসবে না। চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে ঠোঁটে চেপে লম্বা একটা টান দেয়। ধোঁয়া উপরের দিকে ছেড়ে দিয়ে ফোন আনলক করে। হসপিটালে কল করে রোগীদের খোঁজ খবর নেয়। বাড়িতে থাকলেও রোগীদের নিয়ে ওর চিন্তার শেষ নেই।
কথা শেষ করে আবার ডায়াল করে অন্য একটা নাম্বারে। রিসিভ হতেই গম্ভীর হয়ে কথা শুরু করে তার সঙ্গে।

সকাল সাতটা। উমেরা রুম থেকে বেরিয়ে আসে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। পায়ের ব্যথা বেড়ে গেছে আবার। পিচঢালা রাস্তায় আছড়ে পড়ার কারণে হাতে-পায়ে আর হাঁটুতে ছিলে গিয়েছিল। হাঁটার সময় হাঁটুর চামড়ায় টান লাগছে। কাপুরুষের বাচ্চা কাপুরুষ, কীভাবে দৌড়ের উপর হাত ছেড়ে দিয়েছিল। ভাগ্য ভালো মুখ থুবড়ে পড়েনি নয়তো এখন এত সুন্দর চেহারার নকশা চেঞ্জ হয়ে যেত। দু’দিন পরেই হসপিটাল থেকে ক্যাম্পেইনে বান্দরবান যেতে হবে। এর আগে পা-টা ঠিক হলেই হলো।
নানান ধরনের চিন্তা ভাবনা করতে করতে ড্রয়িং রুমে পৌঁছায় উমেরা। সোফায় বাবাকে বসে থাকতে দেখলেও ভাইকে দেখতে পায় না। মা হয়তো রান্না ঘরে রয়েছেন।
এগিয়ে এসে বাবার পাশে বসে সোফায়। উমর ওয়াজেদ হাতে থাকা খবরের কাগজ ভাজ করে নামিয়ে নেন মুখের সামনে থেকে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে মায়া ভরা সুরে বললেন,

“এখন কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ, ঠিক আছি, বাবা।”
“পায়ের এই অবস্থা নিয়ে বান্দরবান যাবে? না গেলে।”
“না, যেতেই হবে। পায়ে তো সেরকম কিছু হয়নি, আজকেই ঠিক হয়ে যাবে চিন্তা করবেন না।”
“কারা ছিল ওরা? চিনতে পেরেছো কাউকে?”
“না।”
“ওরা আবার পাটোয়ারীদের পাঠানো লোক ছিল না তো?”
“না, বাবা। ওরা বখাটে ছিল, পাতি মাস্তান।”

মুখে কথাগুলো বললেও মনে মনে বাবার বলা কথাগুলোই ভাবতে শুরু করেছে উমেরা। ওই পাতি মাস্তানগুলোকে পাটোয়ারীরাই কী পাঠিয়েছিল? ওই সময় শেহরাজ ওখানে কীভাবে আসলো? সবকিছু প্ল্যান করে করা হয়নি তো?
উমেরার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সংবরণ করে। নিশ্চই এই ঘটনা ইচ্ছাকৃত ছিল।
খাবার খেয়ে তৈরি হয়ে বড়ো ভাই শুদ্ধর সঙ্গে হসপিটালে যাওয়ার জন্য রওনা হয় উমেরা। শুদ্ধ আজকে ওকে একা ছাড়তে রাজি হচ্ছে না। তার মধ্যে স্কুটিটা এখনো গ্যারেজে রয়েছে।
উমেরাকে হসপিটালে পৌঁছে দিয়ে শুদ্ধ নিজ গন্তব্যে রওনা হয়। হসপিটালের ভেতরে আসতেই জারার সঙ্গে দেখা হয়। জারা আজকে একটু সকাল সকাল এসেছিল কিছু কাজের জন্য।

“পায়ের কী অবস্থা এখন?”
“নখটা উঠে যাবে, অর্ধেক লেগে আছে।”
“ইস্, কীভাবে কী হয়েছিল?”
উমেরা সবকিছু খুলে বলে জারার কাছে। সব শুনে জারা হা হয়ে গেছে। বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে বান্ধবীর মুখের দিকে যদিও চোখ জোড়া ব্যতীত আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
অবাক হয়ে বলে,

“শেহরাজ পাটোয়ারী তোকে কোলে নিয়েছিল?”
মাথা নাড়ে উমেরা,
“সিনেমার নায়কের মতো সোজা কোলে নিয়ে দৌড়! বা বাহ্।”
উমেরা দুম করে কিল বসিয়ে দেয় জারার পিঠে। জারা পিঠ বাঁকিয়ে বলে,
“মা’র’ছিস কেন?”
“উল্টাপাল্টা কথা বলছিস কেন? আরেকবারও ওই শ’য়’তা’ন লোকের নাম নিবি না আমার সামনে, শুনলেই মেজাজ গরম হয়ে যায়। ইচ্ছে করে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে ওরা।”
“ইচ্ছে করে এমন ঘটনা ঘটিয়ে ওদের কী লাভ?”
“সেটা তো ওরাই জানে। ইচ্ছাকৃত না হলে ওই সময় শেহরাজ পাটোয়ারী ওখানে আসলো কীভাবে? সবকিছু প্রিপ্ল্যান করে করা হয়েছে।”

গোধূলির লগ্ন, সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে, আকাশ লাল আভায় রাঙিয়ে আছে। দ্রুত পায়ে বাইরের দিকে এগিয়ে আসছে শেহরাজ। ওর সাথে সাথে পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে হাঁটছে জাওয়াদ।
হাসপাতাল থেকে বের হতেই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আবারও মুখোমুখি হয় উমেরার। উমেরাকে দেখে শেহরাজের কপাল ভ্রু কুঁচকে যায়। বিরক্তিতে “চ” সূচক শব্দ উচ্চারণ করে বিড়বিড় করে। এই মেয়েকে এখনই ওর সামনে পড়তে হলো?
শেহরাজ এখানে এসেছিল একটা কাজে। কাজ শেষ করে বের হওয়ার সময়ই উমেরার সঙ্গে দেখা। উমেরার পাশ কাটিয়ে পার্কিং লটের দিকে পা বাড়ায়। উমেরা পেছন থেকে গলার স্বর একটু বাড়িয়ে বলে,

“পালাচ্ছেন কেন আজ?”
শেহরাজের পা দুটো থেমে যায়। না ঘুরে শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় পেছনে। ওর সঙ্গে জাওয়াদ-ও থেমে গেছে, ও ঘুরে দাঁড়ায়। উমেরা হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শেহরাজের দিকে। পারলে বোধহয় এখনই ঝাপিয়ে পড়তো ওর উপরে জান কেড়ে নেওয়ার জন্য। গতকাল এই লোক ওকে কোলে নেওয়ার তালে কোথায় কোথায় ছুঁয়ে দিয়েছে ঠিক নেই। ঘৃণায় উমেরার গা ঘিনঘিন করছে।
“গতকালের ঘটনা আপনি ইচ্ছে করে ঘটিয়েছেন তাইনা? সব আপনার প্ল্যান ছিল।”
এবার শেহরাজ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়। ধীর পায়ে কয়েক কদম এগিয়ে এসে দাঁড়ায় উমেরার সামনে। কটাক্ষ করে বলে,

“অকৃতজ্ঞ দেখেছি কিন্তু এই আপনি হবু ডাক্তার মিস ওয়াজেদ একটাও দেখিনি। আপনাকে সাহায্য করলাম আমি আর সেই আপনি আমাকে দোষী সাব্যস্ত করছেন? গ্রেট! এই আপনি আশি কেজির বস্তাকে কোলে নিয়ে দৌড়ে এখনও আমার সারা শরীর ব্যথা করছে। একটা ধন্যবাদ অব্দি দেননি অথচ দোষারোপ করছেন, ওহ-হো, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম আপনাদের র’ক্তে মিশে আছে অন্যকে দোষারোপ করা।”
“একদম র’ক্ত নিয়ে কথা বলবেন না, আমি জানি আপনিই ওই বখাটেগুলোকে পাঠিয়েছিলেন ওখানে।”
“প্রমাণ কোথায়? কাউকে দোষারোপ করলে আগে প্রমাণ জোগাড় করে রাখবেন নয়তো হ্যারাসমেন্টের দায়ে চৌদ্দ শিকের ভেতর থাকবেন।”
“ভয় দেখাচ্ছেন? এই উমেরা ওয়াজেদ আপনাকে ভয় পায় না মিস্টার। আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে না করলে ওখানে ওই সময় পৌঁছালেন কীভাবে? নাকী গন্ধ পেয়েছিলেন আমি বিপদে পড়বো? সাহায্য করার জন্য গন্ধ শুঁকে শুঁকে পৌঁছে গিয়েছিলেন?”

“জাস্ট শাট আপ, মিস ঝগড়ুটে। ওটা শুধু আপনার বাড়িতে পৌঁছানোর রাস্তা নয়, আমারও বাড়িতে পৌঁছানোর রাস্তা। আল্লাহ তা’আলা তো আমাকে ডানা দেননি যে রাস্তা দিয়ে না যেয়ে আকাশে উড়ে উড়ে যাব। মিস অকৃতজ্ঞ ব্রেনলেস মহিলা শুনুন, এর পর আপনি আমার সামনে পড়ে ম’রে গেলেও সাহায্য তো দূর তাকিয়েও দেখবো না।”
“মুখ সামলে কথা বলুন, আপনি কাকে অকৃতজ্ঞ ব্রেনলেস বলছেন?”

“আপনাকেই বলেছি। আপনার জন্য কতগুলো গুন্ডার সঙ্গে মা’রা’মা’রি করলাম, ওদের হাত থেকে আপনাকে বাঁচানোর জন্য কোলে নিয়ে কতটা পথ দৌড়ালাম বিনিময়ে একটা ধন্যবাদ দেননি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, উল্টো আমাকেই ভিলেন বানিয়ে দিচ্ছেন। ব্রেন যে হাঁটুর নিচে সেটা স্পষ্টই বুঝতে পারছি আমি। জাওয়াদ চল।”
ঘুরে দাঁড়াতেই দেখে ওদের পেছনে শুদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। উমেরা নিজেও এতক্ষণ বড়ো ভাইকে খেয়াল করেনি, এখন দেখে চমকে উঠেছে। বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে। শুদ্ধ শেহরাজের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
“কী বললেন আপনি? কী ঘটেছিল গতকাল?”
“কেন, আপনার বোন কিছু বলেনি?”
“আপনি বলুন।”

“গতকাল আপনার বোন বাড়ি ফেরার পথে মানুষ রূপী কিছু হিংস্র হায়েনাদের কবলে পড়েছিল। তখন আমি সেই রাস্তায় না থাকলে এতক্ষণে আপনার আদরের বোন ওদের ভোগের বস্তু হয়ে কোনো এক নর্দমায় বা ড্রেনে পড়ে থাকতো। আমি ওদের হাত থেকে আপনার বোনকে বাঁচিয়েছিলাম, বাকিটা তো বোধহয় শুনেছেনই এতক্ষণ। নিজের বোনকে সামলে রাখবেন নয়তো দেখা যাবে কবে যেন কে এসে আপনার হাফ ইঞ্চির বোনকে পকেটে ভরে নিয়ে চলে গেছে।”
গম্ভীর স্বরে কথাগুলো বলে পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে যায় ধুপধাপ পা ফেলে। জাওয়াদ দ্রুত ওর পেছন পেছন যেতে যেতে বিস্ময় নিয়ে বলে,

“ভাই, আপনি সত্যি সত্যিই উমর ওয়াজেদের মেয়েকে কোলে নিয়েছিলেন?”
শেহরাজ আগের মতোই গম্ভীর স্বরে বলে,
“তোরও নেওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে নাকী? হলে গিয়ে কোলে তুলে দৌড় দে।”
“না ভাই, এমন কিছু না।”
শুদ্ধ বোনের দিকে তাকিয়ে কিছুটা রাগী গলায় বলে,

দহনসুধা পর্ব ৭

“শেহরাজ পাটোয়ারী কী বলে গেলো এসব? আমাদের কাছ থেকে এসব কেন লুকিয়েছিস?”
উমেরা কী উত্তর দেবে বুঝতে পারছে না। পরিবারের কাছ থেকে ঘটনাটা লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল কিন্তু সফল হলো না। শেহরাজের সঙ্গে ঝগড়া করতে করতে ভুলেই গিয়েছিল যে শুদ্ধ ওকে নেওয়ার জন্য আসছে। কী বলবে এখন? কী উত্তর দেবে?

দহনসুধা পর্ব ৯